'ষোড়শ সংশোধনীর রায়ে কিছু পর্যবেক্ষণ একেবারেই অনাকাক্সিক্ষত'-শ ম রেজাউল করিম

Print Friendly and PDF

শ ম রেজাউল করিম। বিশিষ্ট আইনজীবী, সুপ্রিমকোর্ট। সম্প্রতি দায়িত্ব পেয়েছেন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের আইন বিষয়ক সম্পাদক পদে। সাবেক সাধারণ সম্পাদক, সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতি। ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় নিয়ে সম্প্রতি মুখোমুখি হন সাপ্তাহিক-এর। দীর্ঘ আলোচনায়, সংবিধান, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা, নিম্ন আদালতের শৃঙ্খলাবিধিসহ উঠে আসে সরকার ও বিচার বিভাগের নানা বিষয়।
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সায়েম সাবু, ছবি তুলেছেন কাজী তাইফুর

সাপ্তাহিক : ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ে বিতর্ক থামছেই না। এই বিতর্ক নিয়ে আপনার মন্তব্য জানতে চাইছি।
শ ম রেজাউল করিম : দলের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে আনুষ্ঠানিক মন্তব্য না করা পর্যন্ত আমার পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য করা ঠিক হবে বলে মনে করি না।
সাপ্তাহিক : একজন আইনজীবী হিসেবে বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছেন?
শ ম রেজাউল করিম : এরপরেও এই মুহূর্তে কিছু বলতে চাইছি না। দল কীভাবে দেখতে চাইছে এই রায়, তার পরেই বিশ্লেষণ করতে চাই।
সাপ্তাহিক : দলের নেতারা তো এই রায়ে নাখোশ। শনিবার (৫ আগস্ট) অর্থমন্ত্রী মন্তব্য করেছেন, ‘যতবার ষোড়শ সংশোধনী বাতিল হবে, ততবার সংসদ বহাল রাখবে।’ তিনি তো মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে আছেন।
শ ম রেজাউল করিম : মাননীয় অর্থমন্ত্রীর মন্তব্য দলের কথা না। বিচ্ছিন্ন ঘটনার প্রেক্ষিতে তিনি বলে থাকতে পারেন। ষোড়শ সংশোধনী রায়ের ইস্যু স্পর্শকাতর বলে মনে করি। দল আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া না জানালে কিছু বলা ঠিক হবে না।
সাপ্তাহিক :  দল আপনাদের মতো বিজ্ঞজনেরই মন্তব্য নিতে চাইবে। সংসদের পক্ষ থেকে সর্বশেষ কী সিদ্ধান্ত আসতে পারে?
শ ম রেজাউল করিম : কল্পনাপ্রসূত কিছু বলা ঠিক নয়। সংসদীয় কমিটি রয়েছে। তারাই আলোচনা সাপেক্ষে সিদ্ধান্ত নেবে।
সাপ্তাহিক : বিএনপি নেতা মওদুদ আহমেদ বলেছেন, ‘ষোড়শ সংশোধনী ফের বহাল করতে চাইলে, তা হবে সরকারের জন্য আত্মঘাতী।’ আরেক নেতা বলেছেন, ‘এতে সরকারের পতন ত্বরান্বিত হবে।’ এর জবাবে কী বলবেন?   
শ ম রেজাউল করিম : আওয়ামী লীগ একটি ঐতিহ্যবাহী সংগঠন। বয়স অনুপাতে আওয়ামী লীগ খুব বেশি দিন ক্ষমতায় থাকেনি। আওয়ামী লীগের ওপর বারবার আঘাত এসেছে। এই আগস্ট মাসেই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছে। জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার ওপর বারবার হত্যার জন্য হামলা করা হয়েছে। আওয়ামী লীগকে বারবার বিভক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে। এমনকি ১/১১ এর সময়েও দলের অনেকে বিতর্কিত ভূমিকা রেখেছেন।
এত আঘাতের পরেও আওয়ামী লীগ টিকে রয়েছে এবং সেটা সাংগঠনিক ভিত্তির কারণেই। এ কারণেই আমি মনে করি, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদের মন্তব্য একেবারেই অগ্রহণযোগ্য এবং অবাস্তব। ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে-পরেও বিএনপি-জামায়াত তাণ্ডব চালিয়েছিল সরকারের পতনের জন্য। পারেনি।
সুতরাং আমি করি না, ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ের ব্যাপারে পার্লামেন্ট সিদ্ধান্ত নিলে সরকারের পতন ঘটবে।
সাপ্তাহিক : ঘাত-প্রতিঘাতের কথা বললেন। ষোড়শ সংশোধনী বাতিল হওয়ায় সরকার পক্ষ যে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছে, তাতে করে এই রায় সরকারের জন্য আঘাত কিনা?
শ ম রেজাউল করিম :  বিচারপতিদের অপসারণ নিয়েই মূলত এই রায়। কিন্তু ষোড়শ সংশোধনীর রায়ে কিছু পর্যবেক্ষণ একেবারেই অনাকাক্সিক্ষত, অপ্রত্যাশিত এবং অগ্রহণযোগ্য।
সাপ্তাহিক : কেন এমনটি মনে করছেন?
শ ম রেজাউল করিম : রায়ের পর্যবেক্ষণে সরকারের বিভিন্ন উইং নিয়ে  মন্তব্য করা হয়েছে। বলা হয়েছে, সরকারের এই উইং ঠিকমতো কাজ করছে না। প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ করছে না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কথা বলা হয়েছে।
দেশের বড় অর্জনের ক্ষেত্রে একজনকে প্রধান করে যে কথা বলা হয়, যেটা প্রকারান্তরে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলাদেশ এসেছে, সে নামটা না বললেও একক কৃতিত্বের কথা বলা হয়েছে। এই কথাগুলো অনাকাক্সিক্ষত। এই মন্তব্যগুলো মূল মামলার রায়ের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হতেই পারে না।
সাপ্তাহিক : আদালতের রায়ে তো পর্যবেক্ষণ থাকে। মামলার রায়ের গ্রাউন্ড দাঁড় করাতে অনেক কিছুই আমলে নিতে পারে আদালত। অনাকাক্সিক্ষত বলছেন কেন?  
শ ম রেজাউল করিম : বিচার্য বিষয়ের সঙ্গে এগুলো সঙ্গতিপূর্ণ না। গরুর রচনা করতে গিয়ে নদীকে টেনে আনার কোনো প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না।
সাপ্তাহিক : প্রসঙ্গক্রমে গরুর আলোচনায় নদীর বিষয়ও আসতে পারে?
শ ম রেজাউল করিম :  এখানে তেমন কোনো প্রসঙ্গ নেই। আলোচ্য বিষয় হচ্ছে, সুপ্রিম জুডিসিয়াল ব্যবস্থা থাকবে নাকি বিচারপতিদের অপসারণ সংসদের কাছেই থাকবে। এর সঙ্গে রাষ্ট্র, সরকার, মুক্তিযুদ্ধের সকল বিষয় এখানে টেনে আনা অপ্রাসঙ্গিক বলে আমার কাছে মনে হয়েছে।
সাপ্তাহিক : আদালতের পর্যবেক্ষণে সরকারপ্রধানের ক্ষমতার প্রসঙ্গও এসেছে। দলীয়প্রধান সরকারপ্রধান হয়ে তো মহাপরাক্রমশালী হয়ে উঠছেন, এটি তো সত্য?
শ ম রেজাউল করিম :  দলপ্রধানের দায়িত্ব ছেড়ে সরকারপ্রধান হওয়ার নজির একমাত্র বঙ্গবন্ধুই দেখিয়েছিলেন। এ ছাড়া বাংলাদেশে আর কেউ এমন নজির দেখাতে পারেনি।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট আর দুনিয়ার অন্য দেশের প্রেক্ষাপট আলাদা। রাজনৈতিক শিষ্টাচার, সৃজনশীলতা, সততা এবং আদর্শিক বিষয় আমরা যেভাবে প্রত্যাশা করি, সেভাবে হয় না। বাংলাদেশে রাজনৈতিক উন্নয়ন সেই অর্থে হয়নি। এ কারণেই হয়তো দলীয়প্রধানরাই রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
সাপ্তাহিক : কিন্তু এই সংস্কৃতি থেকে তো বেরিয়ে আসা সময়ের দাবি?
শ ম রেজাউল করিম :  ১৯৮১ সালে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা দেশে ফেরেন। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর দলে নেতৃত্বের কোন্দল ছিল। শেখ হাসিনা দেশে ফেরার পরেই দলে গতি আসে এবং তাকে ঐক্যের প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাকে ঘিরেই আওয়ামী লীগের রাজনীতি।
বাংলাদেশের সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় আস্থাভাজন ব্যক্তি দলের প্রধান না থাকলে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়।
সাপ্তাহিক : এমন ক্ষমতার চর্চায় স্বৈরতান্ত্রিক মনোভাব প্রকাশ পায় কিনা?
শ ম রেজাউল করিম :  স্বৈরতান্ত্রিক মনোভাব প্রকাশ করে ব্যক্তিবিশেষের ওপর নির্ভর করে। আওয়ামী লীগে প্রতিটি ব্যক্তি মতামত ব্যক্ত করার সুযোগ পেয়ে থাকেন। আওয়ামী লীগের কার্যকরী পরিষদ, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্যরাও মুক্তমনে মত দিয়ে থাকেন।
সাপ্তাহিক : এমন মত অন্য দলেও মেলে, যা অনেকে লোক দেখানো মনে করে থাকেন। সিদ্ধান্ত একজনই নিয়ে থাকেন।
শ ম রেজাউল করিম :  আওয়ামী লীগের সব সিদ্ধান্তই লোক দেখানো হয় না। আওয়ামী লীগে কখনই কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়া হয় না। তবে বাস্তবতাও স্বীকার করতে হবে। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার চেয়ে অভিজ্ঞ নেতা আওয়ামী লীগে আর নেই। সবাই তার ওপর আস্থা রেখে বলেন, আপনি যে সিদ্ধান্ত দেবেন, তাই আমাদের সিদ্ধান্ত। কোনো স্বৈরতান্ত্রিক চিন্তা থেকে এমনটি নয়।
বিএনপি এবং জাতীয় পার্টির গঠনতন্ত্রে দলীয়প্রধানকে অসীম ক্ষমতা দেয়া আছে। আওয়ামী লীগে তা নেই। চাইলেই আওয়ামী লীগ প্রধান সব করতে পারবেন না।
সাপ্তাহিক : এমনটি কিতাবি বিষয়। অঘোষিত নিরঙ্কুশ ক্ষমতা তো আওয়ামী লীগ প্রধানও ভোগ করে থাকেন?
শ ম রেজাউল করিম :  আমি তা মনে করি না। নেতারা শ্রদ্ধা, ভালোবাসার জায়গা থেকে দলীয় প্রধানকে সিদ্ধান্ত নেয়ার দায়িত্ব দিলে তা ক্ষমতার অপপ্রয়োগ হয় না।
সাপ্তাহিক : ষোড়শ সংশোধনী বাতিলে আদালতের ওপর নাখোশ সরকার ও আওয়ামী লীগ। কিন্তু আদালতের ওপর ভর করেই ত্রয়োদশ/পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ফের ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ।
শ ম রেজাউল করিম :  সংবিধানের ৭ (২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘জনগণের অভিপ্রায়ের পরম অভিব্যক্তি রূপেই সংবিধান প্রজাতন্ত্রেও সর্বোচ্চ আইন। অন্য কোনো আইন যদি এই সংবিধানের সঙ্গে অসামঞ্জস্য হয়, তাহলে সে আইনের যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ ততখানি বাতিল হবে।’
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা অন্য আইন দ্বারা করা হয়েছিল। এটি মূল সংবিধানে ছিল না। কিন্তু বিচারপতিদের অপসারণের বিষয়টি সংবিধানেরই অংশ।
সাপ্তাহিক : কিন্তু বাস্তবতার নিরিখেই তত্ত্বাবধায়ক আইন করা হয়েছিল।
শ ম রেজাউল করিম : সে আইন ছিল পরীক্ষাধীন। মাগুরা উপনির্বাচনের প্রেক্ষিতেই তত্ত্বাবধায়ক আইন। আবার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান নিয়ে বিএনপি যে জটিলতা সৃষ্টি করল, তাতেই এই আইনের কবর রচনা হলো।
তত্ত্বাবধায়ক সৃষ্টি এবং ধ্বংসের উভয়ের পেছনেই বিএনপি’র ভূমিকা রয়েছে। এরপরেও হয়তো এই সরকার ব্যবস্থার আবেদন আছে। কিন্তু আদালত যখন এই ব্যবস্থাকে সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে এই আইনকে বাতিল করে দিল। আদালত অবৈধ ঘোষণা করলে তো আর কিছু করার থাকে না।
সাপ্তাহিক :  সংবিধানের আলোকেই ২০১৪ সালের নির্বাচন। এই নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক তো চরমে?
শ ম রেজাউল করিম :  ২০১৪ সালের নির্বাচন সুন্দর ছিল না। কিন্তু সাংবিধানিকভাবে এই নির্বাচনের আর কোনো বিকল্প ছিল না। ওই নির্বাচন না হলে রাষ্ট্রে সাংবিধানিক শূন্যতা তৈরি হতো। তখন রাষ্ট্র কে পরিচালনা করত?
সাপ্তাহিক : সংবিধান তো ঐশ্বরিক কোনো বিধান নয়। ক্ষমতায় এসে সবাই পরিবর্তন করলও বটে। তার মানে যার যতটুকু প্রয়োজন, ততটুকুই কাটা-ছেঁড়া চলে?
শ ম রেজাউল করিম : আগেই বলেছি, বাংলাদেশের রাজনীতি এখনও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেনি। এরপরেও তুলনামূলক বিচার করতে হবে। সংবিধানে বলা আছে, কোনো ব্যক্তি আইনগত আচরণ থেকে বঞ্চিত হবেন না। অথচ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতাকে এই আগস্ট মাসে হত্যা করে সংবিধানে যুক্ত করা হলো যে, এই হত্যাকাণ্ডের বিচারই করা যাবে না। এই রকম সুবিধাজনক আইন আওয়ামী লীগ কখনো করেনি।
জিয়াউর রহমান এবং এরশাদ ক্ষমতায় এসে ১৯৭২ সালের সংবিধানের মূল স্পিরিটকে ধ্বংস করলেন। আওয়ামী লীগ যে সংশোধনী করেছে, তাতে সংবিধানের মূল কাঠামো পরিবর্তিত হয়েছে বলে মনে করি না।
সাপ্তাহিক : জিয়াউর রহমান এবং এরশাদের সংশোধনী বহাল রেখেই কিন্তু আওয়ামী লীগের সংশোধনী।
শ ম রেজাউল করিম : এখানে আওয়ামী লীগ বা সরকারের কোনো ভূমিকা নেই। পঞ্চম এবং অষ্টম সংশোধনী আদালত বাতিল করেছেন। জিয়াউর রহমানের ক্ষমতা গ্রহণকেই অবৈধ ঘোষণা করেছে।
সাপ্তাহিক : রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম রাখার পক্ষে প্রধানমন্ত্রীও মত দিয়েছেন। ১৯৭২ সালের সংবিধানে ফিরতে আওয়ামী লীগও আন্তরিক না।
শ ম রেজাউল করিম : অসম্প্রদায়িক, ন্যায়ভিত্তিক একটি গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য যা করা দরকার, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাই করে যাচ্ছেন। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় না এলে মানবতাবিরোধীদের কোনোদিন বিচার হতো না।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নে যে চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে, তা শেখ হাসিনার সরকার ছাড়া সম্ভব হতো না। অন্য সরকারের আমলেও পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু শেখ হাসিনার আমলেই উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়েছে বলে মনে করি। এ কারণেই দেশে উন্নয়ন। মানুষ না খেয়ে মরছে না। লঙ্গরখানা খুলতে হচ্ছে না। কাপড়ের পরিবর্তে কেউ জাল পেঁচিয়ে থাকে না। সামাজিক সূচকে বাংলাদেশ এখন পাশের দেশ ভারত থেকেও এগিয়ে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে।
সাপ্তাহিক : বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় বাংলাদেশ কতটুকু এগিয়ে যেতে পারল বলে মনে করেন?
শ ম রেজাউল করিম : বিচার বিভাগের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা শেখ হাসিনার সরকারই নিশ্চিত করেছে। ১৯৯৬ সালের আগে এমন স্বাধীনতা ছিল না। আদালতগুলোর অবকাঠামো নির্মাণ শেখ হাসিনার সরকার করেছে। বিচারকদের মানসম্মত বেতন এই সরকার করে দিল। প্রধান বিচারপতিকে জাতীয় পতাকা বহনের স্ট্যাটাস এই সরকার দিয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের অ্যানেক্স ভবন আওয়ামী লীগ সরকারই করে দিচ্ছে। সুপ্রিমকোর্টের জন্য বিশ তলা ভবন করে দিচ্ছে সরকার। বিচারকের সংখ্যা বাড়িয়েছে।
সাপ্তাহিক : বিচারকার্যে সরকারের পক্ষ থেকে হস্তক্ষেপের অভিযোগও আছে। দুধ-কলা খেতে দিয়ে পায়ে শিকল পরানো হয় কিনা?
শ ম রেজাউল করিম : সরকার কোথায় শিকল বেঁধে রেখে আমাকে একটি উদাহরণ দিন।
সাপ্তাহিক : বিচারের রায় এবং প্রধান বিচারাপতির সমালোচনা করে সরকারের লোকেরা যেসব কথা বলছেন, তাতে অঘোষিত বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছে কিনা?
শ ম রেজাউল করিম : আমি মনে করি, ভাষা প্রয়োগে সকলের সংযমী হওয়া উচিত। একইভাবে বিচারকদের মাথায় রাখতে হবে প্রতিনিয়ত জনসম্মুখে গিয়ে সকল বিষয়ে মন্তব্য করা যায় না।
সাপ্তাহিক : কথা বলার বিধান তো আছে।  
শ ম রেজাউল করিম : বিচারাধীন বিষয় নিয়ে আগেই কথা বলা যায় না। সুপ্রিমকোর্টের কোনো কার্যক্রমের ওপর সরকারের কোনো কর্তৃত্ব নেই। একজন ম্যাজিস্ট্রেটের বদলিও সুপ্রিম কোর্ট করে থাকেন।
সাপ্তাহিক : কিন্তু নিম্ন আদালতের বিচারকদের বদলি, পদায়ন তো আইন মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবের আলোকেই হয়।
শ ম রেজাউল করিম : এই ধারণা সঠিক না। আমি চ্যালেঞ্জ করে বলছি, ঢাকার আদালতে ৯ মাস জেলা দায়রা জজের পোস্টিং বন্ধ ছিল। আইন মন্ত্রণালয় একটি প্রস্তাব দিয়েছিল। সুপ্রিমকোর্ট সে প্রস্তাব মানেনি। শেষ পর্যন্ত সুপ্রিমকোর্টের সিদ্ধান্তই বহাল থেকেছে। আইন মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাব সুপ্রিমকোর্ট মানতে বাধ্য হয়েছে, এমন কোনো নজির নেই।
সাপ্তাহিক : আইন মন্ত্রণালয় থেকে প্রস্তাব যাওয়াই তো কর্তৃত্বের প্রকাশ।
শ ম রেজাউল করিম : বাংলাদেশের সংবিধানকে আপনি বদলিয়ে না ফেললে আপনাকে সংবিধান মানতেই হবে। বদলিয়ে ফেললে ভিন্ন কথা।
সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদে বলা আছে ‘বিচারকর্ম বিভাগে নিযুক্ত ব্যক্তিদের এবং বিচার বিভাগীয় দায়িত্ব পালনরত ম্যাজিস্ট্রেদের নিয়ন্ত্রণ, কর্মস্থল নির্ধারণ, পদোন্নতি, ছুটি প্রদান এবং শৃঙ্খলা বিধান রাষ্ট্রপতির ওপর ন্যস্ত থাকবে ও সুপ্রিম কোর্টের সহিত পরামর্শক্রমে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক উহা প্রযুক্ত হবে।’
সাপ্তাহিক :  এখানে কিন্তু আইন মন্ত্রণালয়ের কথা বলা হয়নি, যা এখন করছে মন্ত্রণালয়।
শ ম রেজাউল করিম : আইন মন্ত্রণালয় এখানে পোস্ট অফিসের দায়িত্ব পালন করছে মাত্র। সরকারের কথাও বলা নেই। বলা আছে রাষ্ট্রপতির কথা। বিচারপতির নিয়োগও রাষ্ট্রপতি দেন সুপ্রিমকোর্টের পরামর্শক্রমে। একইভাবে বিচার বিভাগের ম্যাজিস্ট্রেটের বিষয়টিও রাষ্ট্রপতি দেখবেন সুপ্রিমকোর্টের পরামর্শ অনুযায়ী।  
আইন মন্ত্রণালয় এ ক্ষেত্রে কিছুই করতে পারে না।
সাপ্তাহিক : তাহলে এ নিয়ে প্রধান বিচারপতির মন্তব্যের ভিত্তি কি?
শ ম রেজাউল করিম : প্রধান বিচারপতি রায়ে লিখছেন, ‘এখানে যে রাষ্ট্রপতি শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, তা ঠিক হয়নি।’
তাহলে সিদ্ধান্ত কে নেবে?
সাপ্তাহিক : এমনটি কেন বলছেন প্রধান বিচারপতি, আপনার ধারণা কী?
শ ম রেজাউল করিম : সুপ্রিমকোর্ট বোঝাতে চাইছে সবই তারা করবেন। সংবিধানের ধারা বাতিল না করে তো এমন রায় দিতে পারেন না। তিনি রায়ে বলেছেন, ‘এই ধারায় রাষ্ট্রপতি শব্দ ব্যবহার করা অসাংবিধানিক হয়েছে।’
সাপ্তাহিক : অন্য বিচারপতিরা এটি কীভাবে নিচ্ছেন?
শ ম রেজাউল করিম : অন্য বিচারপতিরা তার এই মতের সঙ্গে একমত হননি। যে কারণে চূড়ান্ত রায়ে এই অংশটুকু সংযুক্ত করতে পারেননি।
সাপ্তাহিক : প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সরকারের এক প্রকার দূরত্ব দৃশ্যমান। গণমাধ্যম এবং সরকারের মন্ত্রীদের নানা প্রতিক্রিয়ায় বিষয়টি স্পষ্ট হচ্ছে। কেন এমনটি হচ্ছে বলে মনে করেন?
শ ম রেজাউল করিম : আমার কাছে মনে হয়েছে, সরকারের সঙ্গে বিচারপতিদের কোনো দূরত্ব নেই। প্রত্যেকের কাজের সীমারেখা আছে। আইন বিভাগ, নির্বাহী বিভাগ এবং বিচার বিভাগে একে অপরকে মনিটরিং করবে।
নিজেদের দায়িত্ব নিজেরা পালন করলে কোনো সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার কথা নয়। এখন কেউ যদি মনে মনে নিজেকে সুপ্রিম অথরিটি মনে করেন, এটি তার ব্যাপার। কিন্তু এটি আইন সমর্থন করে না। নিজেই নিজেই আজ্ঞাবহ হয়ে যায়, তাহলে তো কারও কিছু করার নেই।
সাপ্তাহিক :  এই যে আজ্ঞাবহ হওয়ার প্রবণতার কথা বললেন, এই দ্বন্দ্বের শেষ কোথায়?
শ ম রেজাউল করিম : আমার মনে হয়, এই দ্বন্দ্বের অবশ্যই নিরসন হবে। কেউ কারো গণ্ডিতে প্রবেশ করতে পারবে না, কারও কাজে হস্তক্ষেপ করারও সুযোগ নেই। আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, সরকার নির্বাহী বিভাগ এবং বিচার বিভাগের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ছে। কিন্তু এর কোনো ভিত্তি নেই। দূরত্ব বাড়বে বলেও মনে করি না।
তবে সবাইকে মনে রাখতে হবে যার যার গণ্ডির মধ্যে থেকেই ক্ষমতার প্রয়োগ করতে হবে। সীমানা অতিক্রম করা ঠিক নয়।

সাপ?তাহিক পতিবেদন

 মতামত সমূহ
পিছনে 
 আপনার মতামত লিখুন
English বাংলা
নাম:
ই-মেইল:
মন্তব্য :

Please enter the text shown in the image.