চীন-ভারত যুদ্ধের সম্ভাবনা আছে? -আনিস রায়হান

Print Friendly and PDF

দুই মাসেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। চীন-ভুটান সীমান্তে মুখোমুখি অবস্থায় আছে ভারত ও চীনের সামরিক বাহিনী। দুই দেশের বিভিন্ন পর্যায় থেকে একে অপরের বিরুদ্ধে হুমকি প্রদান এখনও অব্যাহত আছে। গণমাধ্যমগুলো প্রতিনিয়ত এই উত্তেজনার খবর হাজির করে জানান দিচ্ছে যুদ্ধশঙ্কার। আসলে কী ঘটছে দুই দেশের মধ্যে। এই উত্তেজনার দৃশ্যমান ঘটনাবলির পেছনে নেপথ্য কোনো কারণ রয়েছে কী? যুদ্ধ লেগে যাওয়ার বাস্তব কারণ কি ততটা পরিপক্ক হয়েছে? বিশ্লেষণে গেলে দেখা যায়, দৃশ্যমান ঘটনাগুলোর তুলনায় নেপথ্য বিষয়াদিই এই উত্তেজনা সৃষ্টিতে বেশি ভূমিকা রেখেছে। তা সত্ত্বেও যুদ্ধ বেধে যাওয়ার মতো কোনো পরিস্থিতি এখনও দেখা যাচ্ছে না।

উত্তেজনার বর্তমান চিত্র
ঘটনার শুরু গত মে মাসের মাঝামাঝি। ভুটানের দোকলাম সংলগ্ন সীমান্তে চীন যেন কোনো রাস্তা নির্মাণের উদ্যোগ না নেয়, এই বলে তখন ভারতের পক্ষ থেকে চীনা বাহিনীকে সতর্ক করা হয়। এর আগে ২০১২ সালে ভারতীয় সেনাবাহিনী ভুটান-চীন সীমান্তে টহল দেওয়ার সুবিধার্থে দুটি বাংকার তৈরি করেছিল। রাস্তা নির্মাণে বাধা দেয়ার প্রতিবাদে চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি (পিএলএ) ১ জুন ওই বাংকার দুটি সরিয়ে নিতে ভারতের প্রতি আহ্বান জানায়। ভারত সেই আহ্বানে সাড়া না দিলে পিএলএ ৬ জুন, ২০১৭ হামলা চালিয়ে ভারতীয় সেনাদের বাংকার দুটি ধ্বংস করে দেয়। এরপর তারা রাস্তা নির্মাণে যন্ত্রপাতি জড়ো করতে থাকে। জুনের মাঝামাঝি নাগাদ ভারত সেখানে সেনা সমাবেশ ঘটায়। ১৮ জুন, ২০১৭ চীনের দুটি বাংকার ধ্বংস করে ভারত এবং ওই এলাকায় চীনের রাস্তা নির্মাণে বাধা দেয়। এরপর দুই দেশই সেখানে সেনা সমাবেশ ঘটায় এবং এখন পর্যন্ত তারা মুখোমুখি অবস্থানে আছে।
দৃশ্যত চীন তার দখলে থাকা সীমার মধ্যেই রাস্তাটি নির্মাণ করছে। কিন্তু চীন-ভুটানের এই সীমান্ত এলাকা ভারতীয় সীমান্তের খুবই কাছে এবং ওই এলাকায় সীমানা নির্ধারণ প্রশ্নে দেশগুলোর মধ্যে মতভেদ আছে। চীনের দখলে থাকা এলাকাটি তাদের ভাষায় দংলাং নামে পরিচিত। ভুটান ও ভারতের দাবি, এটি ভুটানের ভূমি দোকলাম। ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে মাত্র ২০ কিলোমিটার বা ১২ মাইল দূরে এ রাস্তা হলে কৌশলগতভাবে তা ভারতকে কিছুটা অরক্ষিত করবে। কারণ এ রাস্তা তৈরি হলে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের উপায় হবে চীনের। তাছাড়া খুব অল্প সময়ের মধ্যে চাইলেই তারা ‘চিকেন নেক’ হিসেবে অভিহিত ভারতের ওই ৯০ কিলোমিটার বিস্তৃত সরু এলাকায় হামলা চালিয়ে ভারতকে সাতকন্যার রাজ্যগুলো থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিতে পারবে। চিকেন নেকের ঠিক নিচেই বাংলাদেশের পঞ্চগড় জেলা।
ভারত সরকার বারবার একই বক্তব্য রেখেছে যে, উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর নিরাপত্তার স্বার্থে তাকে এখানে হস্তক্ষেপ করতে হচ্ছে। তাছাড়া ভুটান ও ভারতের মধ্যে নিরাপত্তা সমঝোতা চুক্তি রয়েছে। চুক্তি মোতাবেক ভুটানের নিরাপত্তার জন্য ভারত দায়বদ্ধ। ফলে ভুটানের ডাকে বাধ্য হয়েই তাকে সাড়া দিতে হয়েছে। রাস্তা নির্মাণের পদক্ষেপ বাতিল করে চীন সেনা প্রত্যাহার না করলে তারা এখান থেকে পিছু হটবে না।
চীন বলছে, ভুটান একটি স্বাধীন দেশ। তার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ভারতের হস্তক্ষেপ অনাকাক্সিক্ষত। চীন ও ভুটানের মধ্যে সীমান্ত নিয়ে আলোচনা সুষ্ঠুভাবে চলছিল এবং ব্যাপক মতৈক্য হয়েছে। ভারতের হস্তক্ষেপের কারণে এ আলোচনার আনুষ্ঠানিক দলিল এখনো স্বাক্ষর হয়নি। ফলে দু’দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক এখনো প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি। তাছাড়া চীন নিজস্ব ভূখণ্ডের মধ্যেই রাস্তা নির্মাণ করছে। ১৮৯০ সালে চীন এবং ব্রিটেনের সরকার সমঝোতার মাধ্যমে ওই সীমানা নির্ধারণ করেছিল। ভারত ১৯৪৭ সাল অবধি ব্রিটেনের উপনিবেশ ছিল। পরে ভারত সরকারের সঙ্গেও ১৮৯০ সালের ওই সমঝোতা বহাল থাকে। কাজেই ভারতের বর্তমান কার্যক্রম অবশ্যই চীনা ভূখণ্ডের সীমানা লঙ্ঘন এবং আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলার পরিপন্থী। ভারত নিঃশর্তভাবে চীনের ভূমি থেকে সেনা সরিয়ে না নেয়া অবধি কোনো আলোচনাই হতে পারে না।
দুই পক্ষের এই অনড় অবস্থানের মধ্যেই দিন যাচ্ছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, চীন তার ঐতিহ্য ভেঙে এবারের ঘটনায় অতিরিক্ত কড়া অবস্থান নিয়েছে। ঘটনার সূত্রপাত যেমন তাদের হাত ধরে, তেমনি ব্যাপক হুমকি-ধমকিও তারাই দিচ্ছে। ভারতও জবাব দিচ্ছে, উত্তেজনা জিইয়ে রাখতে তাদের ভূমিকা মোটেই কম নয়। চীনা সীমান্তের মধ্যে তাদের বাহিনী এখনও অবস্থান করছে। বাগযুদ্ধ যদিও দোকলামের সীমানা নিয়েই চলছে, তবে এটা খুব স্পষ্ট যে, এই উত্তেজনার উৎস আরও গভীরে, এর পেছনে সক্রিয় রয়েছে আরও অনেক কারণ।

দ্বন্দ্বের নেপথ্য কারণ
চলমান উত্তেজনা সৃষ্টিতে এবং তা দীর্ঘদিন ধরে টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে দুই পক্ষেরই যথেষ্ট ভূমিকা রয়েছে। কার্যত ভারত ও চীন দুই পক্ষই দোকলাম ইস্যুকে, পরস্পরকে বেকায়দায় ফেলার এবং একে অন্যের ওপর বিজয় অর্জন করার একটি সুযোগ হিসেবে দেখছে।
চীনের বর্তমান সরকার আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আগ্রাসী এবং উগ্র জাতীয়তাবাদী। শি জিনপিংয়ের দায়িত্ব গ্রহণের পর চীন অর্থনৈতিক শক্তি সম্প্রসারণের সঙ্গে জাতীয় ক্ষমতা বিস্তৃতকরণের নীতি গ্রহণ করেছে। চীন মনে করে যে, অন্য জাতিগুলোর সংবেদনশীলতার জন্য বসে থাকার কৌশলগত যুগ শেষ হয়ে গেছে। প্রেসিডেন্ট শির খোলামেলা ঘোষণা হলো, এখন এশিয়ার মধ্যে সর্বাধিক শক্তি হিসেবে বেইজিংয়ের উত্থানের সঙ্গে অন্যদের অভিযোজন করে নিতে হবে। ভারত যদিও অর্থনৈতিকভাবে চীনের তুলনায় অনেক পেছনে, এমনকি সামরিকভাবেও, তবু তারা গত কয়েক বছর চীনের সঙ্গে টেক্কা দেয়ার চেষ্টা করছে। মার্কিন এবং জাপানের সঙ্গেও হাত মিলিয়েছে তারা। চীনা প্রশাসন এতে বিরক্ত, ক্ষুব্ধ।
চীন এই ধারণাটি কখনই গ্রহণ করেনি যে, উপমহাদেশ ভারতের একচেটিয়া প্রভাবের অধীনে থাকবে। এখন তারা একটি রুটিন ভিত্তিতে সে অবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য তাদের ইচ্ছা এবং সম্পদকে কাজে লাগাচ্ছে। গত কয়েক বছর ধরে পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও মিয়ানমারের মধ্যবর্তী সমুদ্রপৃষ্ঠের ক্ষমতার রূপান্তর ঘটাতে সক্রিয় চীন। পাকিস্তানে ইতোমধ্যে তারা গোয়াদর বন্দর পরিচালনা করছে, যা কিনা ভারতের যে কোনো বন্দরের চেয়ে বড়। শ্রীলঙ্কা অবশেষে হাম্বানতোতা বন্দর একটি চীনা কনসোর্টিয়ামকে হস্তান্তর করেছে। মিয়ানমারের সরকার বঙ্গোপসাগর উপকূলের কিউকপিউ দ্বীপের বাণিজ্যিক উন্নয়নের জন্য চীনা কোম্পানির সঙ্গে একটি চুক্তির বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছেছে।
এদিকে ভারত তার কৌশলগত অবস্থা কাজে লাগিয়ে চীনকে চাপে রাখার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। গত এপ্রিলে অরুণাচল প্রদেশে দালাইলামার সফর আটকাতে না পেরে চীন ভীষণ অপমানিত। তখনই তারা বলেছিল, ভারতকে এর ফল ভোগ করতে হবে। চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং-এর ‘ওয়ান বেল্ট, ওয়ান রোড ইনিশিয়েটিভ’ প্রকল্পে যোগ না দিয়ে চীনা কর্তৃত্ববোধে ভারত ঘা দিয়েছে। চীন-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডর (সিপ্যাক) তৈরিতে ভারত ক্রমাগত বাধা দিয়ে চলেছে। অথচ এখানে যেমন চীনের বিরাট বিনিয়োগ আটকে যাচ্ছে, তেমনি এই করিডরের ওপর ভর করে ইরান থেকে পাইপলাইনে জ্বালানি আমদানির পরিকল্পনাও পিছিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমারের মধ্যে প্রস্তাবিত বিসিআইএম সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা বাস্তবায়িত করতেও গাফিলতি দেখাচ্ছে ভারত। এসব কারণে দেশের অভ্যন্তরে শি জিনপিংয়ের সরকার কিছুটা চাপ অনুভব করছে। ফলে ভারতের সঙ্গে তাদের দৃশ্যমান একটি বিজয় দরকার। তবে কেবল এসব কারণেই তারা দোকলামকে বেছে নেয়নি। নেপালের মতো ভুটানকেও ভারতের মুঠি থেকে বের করে আনার উদ্দেশ্যও এখানে কাজ করছে। যে চেষ্টা কিনা দীর্ঘদিন ধরেই তারা গোপনে চালিয়ে আসছে।
ভারতের দিক থেকেও ব্যাপারটা মোটেই ভুটানের নিরাপত্তা রক্ষা নয়। যুক্তরাষ্ট্রের ওবামা সরকারের ‘এশিয়া পাইভট’ নীতির লক্ষ্য ছিল চীনকে কাবু করা, ভারত ছিল এ লক্ষ্য অর্জনে তার সহযোগী। তাই মোদি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের সহযোগিতা যেমন ব্যাপক হারে বেড়েছে, তেমনি চীনের সঙ্গে দ্বন্দ্বের ক্ষেত্রগুলো ক্রমশ বিস্তৃত হয়েই চলেছে। মোদি ভারতে উগ্র ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী নেতা হিসেবে স্বীকৃত। তার দল ঐতিহাসিক চীন-ভারত দ্বন্দ্ব উসকে দেয়াটাকে বরাবরই জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। ফলে যেকোনো প্রশ্নে চীনের চেয়ে এগিয়ে আছি, এটা প্রমাণ করাটা তার সরকারের কর্তব্যের মধ্যে পড়ে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সাম্প্রতিক সময়ে কাশ্মীরসহ আরও কিছু ইস্যুতে চীনের বিরোধী ভূমিকা। কাশ্মীরে চলে আসা সংকটে পাকিস্তান সরকারের অবস্থানকে টানা সমর্থন দিয়ে চলেছে চীন। ভারতের অভিযোগ এই সংকট পাকিস্তানের উসকানির কারণেই টিকে আছে। আর চীন সেখানে প্রকাশ্যে পাকিস্তানের সমর্থন করছে। কিছুদিন আগে কাশ্মীর প্রশ্নে মধ্যস্থতার প্রস্তাবও দিয়েছে তারা, ভারত তা নাকচ করেছে। জাতিসংঘে জৈশ-ই-মহম্মদ প্রধান মাসুদ আজহারকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করার ভারতীয় প্রস্তাবে ভেটো দিয়েছিল চীন। ফলে কাশ্মীর নিয়ে চীনের আচরণে ভারত ক্ষুব্ধ। কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতি তো গত জুলাই মাসে প্রকাশ্যেই অভিযোগ করেছেন যে ‘দুর্ভাগ্যবশত চীনও এখন কাশ্মীরে নাক গলাচ্ছে।’
তবে দোকলামকে ইস্যু করার ক্ষেত্রে ভারতের দিক থেকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে ভুটানের ভূমিকাই। নিঃশব্দে হলেও ধীরে ধীরে ভারতের অবাধ্য হতে শুরু করেছে ভুটান। এত উত্তেজনার মধ্যেও দোকলাম নিয়ে ভুটান এ যাবৎকালে মাত্র একটি বিবৃতি দেয় ২৯ জুন। ওই বিবৃতিতে থিম্ফু এমন কোন কথা বলেনি যে চীনের রাস্তা তৈরি বন্ধ করতে সে ভারতের সাহায্য চেয়েছে। এদিকে চীন অভিযোগ করছে যে, ক্ষুদ্র এই প্রতিবেশীর সঙ্গে সকল সীমান্ত বিরোধ মিটিয়ে ফেলতে চীন ‘প্যাকেজ প্রস্তাব’ দিয়েছিল। যাতে দোকলামের ওপর দাবি ছেড়ে দেয়ার বিনিময়ে টানকে অন্য জায়গাগুলোতে সুবিধা দিতে রাজি হয় চীন। চুক্তি চূড়ান্ত করতে ভুটানের সঙ্গে তারা ২৪ দফা আলোচনায় বসেছে। কিন্তু ভুটানের সঙ্গে চুক্তির কথাবার্তা এগিয়ে গেলেও ভারতের বাধায় তা কার্যকর করা যাচ্ছে না। ভুটান দোকলামে চীনের তৎপরতা অনুমোদন করতে পারে, এই আশঙ্কায় ভারত ভুটান সরকারকে না জানিয়েই দোকলামে সেনা প্রেরণ করে। ভুটানকে অন্ধকারে রেখেই দোকলামে গিয়ে তারা চীনের সড়ক নির্মাণ কাজে বাধা দেয়।
নেপথ্যে এতসব গোপন রাজনীতি ও কূটনীতির বিষয় সক্রিয় থাকা সত্ত্বেও বলা যায় যে, চীন-ভারত সর্বাত্মক যুদ্ধ লাগার মতো পরিস্থিতি এখনও সৃষ্টি হয়নি।

যুদ্ধ কেন হওয়ার নয়
যে কোনো দুটি পক্ষের মধ্যে যুদ্ধের কারণ হতে পারে তিনটি। অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও মতাদর্শিক। যখন এই তিন প্রশ্নের কোনো একটিতে দুই পক্ষ অমীমাংসেয় অবস্থায় পৌঁছায়, তখন যুদ্ধ করেই তার মীমাংসা করতে হয়। তবে চলমান বিশ্বে যুদ্ধের প্রধান কারণ হিসেবে অর্থনীতিকেই বেশি সক্রিয় দেখা যায়। অর্থনৈতিক লাভ নিশ্চিতের উদ্দেশ্য ছাড়া কোনো পক্ষ যুদ্ধ সংঘটনের উদ্যোগ নেয় না। অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়াটাই থাকে এই যুদ্ধ শুরুর উদ্দেশ্য। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধগুলো এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ। রাজনৈতিক পরিস্থিতি অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় অস্তিত্ব বিস্তৃতি বা সংকটের প্রশ্নেও যুদ্ধ হয়। নিজস্ব সীমানা বৃদ্ধি বা ধরে রাখাটাই থাকে এর উদ্দেশ্য। ইউক্রেনের উদাহরণ এখানে স্মরণ করা যায়। মতাদর্শিক কারণেও যুদ্ধ হয়, হতে পারে। প্রধানত এর মধ্য দিয়ে সরকার বদল ঘটে। একটি দেশকে আক্রমণকারীরা তাদের ইচ্ছামাফিক চালাতে চায়। তবে এর সঙ্গে অবশ্যই অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কারণও যুক্ত থাকে। এক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে উত্তর কোরিয়াকে আনা যায়।
ভারত-চীন দ্বন্দ্ব এখনও এমন কোনো অবস্থায় পৌঁছেনি যে, তাদের যুদ্ধ করে তার মীমাংসা করতে হবে। মতাদর্শিক দিক থেকে ভারত-চীন একই অবস্থানে। উভয়েই পুঁজিবাদী বিশ্বায়ন ও মুক্তবাজার অর্থনীতির প্রধান ধারক-বাহক। সীমান্তে চীন-ভারত যেসব এলাকায় বিভিন্ন সময় দ্বন্দ্বে পৌঁছেছে, এগুলো অধিকাংশই পতিত মালভূমি। এসব ভূমি বেশ খানিকটা দখল করেও আত্মতুষ্টি ছাড়া কোনো লাভালাভের প্রশ্ন নেই। তবে সেটাও সম্ভব নয়। দুই দেশের সামরিক ক্ষমতা যে আকারের, তাতে বিশ্বযুদ্ধ না লাগিয়ে কেউ কারও বিরুদ্ধে জয়ের সম্ভাবনা খুবই কম। আর মূল কারণ তথা দুই দেশের অর্থনীতি তো মোটেও যুদ্ধকে অনুমোদন করে না।
বর্তমান প্রেক্ষিতে ভারত-চীন যুদ্ধের সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। দুই দেশের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা তেমনই সাক্ষ্য দেয়। চীন-ভারতের বাণিজ্যিক সম্পর্ক প্রায় ২ হাজার বছরের পুরনো। আধুনিক বাণিজ্যিক সম্পর্কও শুরু হয়েছে কম দিন নয়, ১৯৫০ সালের দিকে। দুটি দেশই বিশ্বের বৃহৎ জনশক্তি। সেইসঙ্গে দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়নের তালিকায়ও রয়েছে ভারত-চীন। যে কোনো দেশের কাছেই পণ্য রপ্তানির জন্য ভারত একটি আকর্ষণীয় বাজার। চীনের দিক থেকে দেখলে ভারত ছেয়ে আছে তাদের পণ্যে। যুদ্ধ বাধিয়ে এই ১২৫ কোটি জনগোষ্ঠীর বাজার হারানোটা চীনের মতো চৌকস অর্থনীতির দেশের লক্ষ্য হতে পারে না। ভারতের ইলেক্ট্রনিক পণ্য বাজারের ৮০ শতাংশই চীনের দখলে। খেলনা থেকে শুরু করে নিউক্লিয়ার রিয়েক্টর, জৈব রাসায়নিক পণ্য থেকে সার, লোহা ও স্টিল খাতে চীনা পণ্যই আধিপত্য করছে।
টাইমস অব ইন্ডিয়া সম্প্রতি চীন-ভারত উত্তেজনার প্রেক্ষিতে দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্ক নিয়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানায়, চীনের কোম্পানিগুলো রীতিমতো ভারতের টেলিকম সেক্টরে আধিপত্য করছে। ৮ বিলিয়ন ডলারের চেয়েও বেশি বড় ভারতের সেলফোন বাজারের ৫১ ভাগই তাদের নিয়ন্ত্রণে। বিদ্যুৎ খাতেও আধিপত্য চীনাদের। উৎপাদন ক্ষমতার প্রায় ৩০ ভাগই চীন থেকে আমদানিকৃত। ভারতে সৌর বিদ্যুৎ ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। এপ্রিল ২০১৬ থেকে জানুয়ারি ২০১৭’র মধ্যে চীন ১.৯ বিলিয়ন ডলারের সোলার প্যানেল ভারতে বিক্রি করেছে। যা কিনা এ সময়ে ভারতের মোট সোলার প্যানেল ক্রয়ের ৮৭ শতাংশ।
ভারতে চীনের প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগও (এফডিআই) বিরাট অঙ্কের। ফ্লিপকার্ট, পেটিম, মেক মাই ট্রিপ থেকে শুরু করে ফার্মাসিউটিক্যাল, অটোমোবাইল, ব্যাংক খাত পর্যন্ত বিনিয়োগ করছে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো। এত বড় বিনিয়োগ নিশ্চয়ই চীন ঝুঁকিতে ফেলবে না। তাছাড়া ক্রমপ্রসারমান এই বিনিয়োগ নির্দেশ করে যে, ভারতকে ঘিরে চীনের পরিকল্পনা ভিন্ন।
ভারতের দিক থেকেও যুদ্ধ লাগানোর পরিকল্পনা দেখা যায় না। বরং দেখা যায় তারা চীনের বাজারে ঢোকার পরিকল্পনা নিয়েই এগুচ্ছে। চীনের সঙ্গে আগে ভারতের বিপুল বাণিজ্য ঘাটতি ছিল। এখন তা পর্যায়ক্রমে কমিয়ে আনার প্রক্রিয়ায় এগুচ্ছে ভারত সরকার। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে চীনের সঙ্গে ভারতের প্রায় ৭১ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য হয়েছে। এক্ষেত্রে ভারতের রপ্তানি ছিল ৯ বিলিয়ন ডলার, বাকিটা ছিল তাদের আমদানি। ২০১৬-১৭ সময়কালে তারা রপ্তানি করতে পেরেছে ১০.২ বিলিয়ন ডলার। চীনা বাজারে ভারতের লৌহজাত, স্টিল, টিন, চামড়া, প্লাস্টিক, তুলা রপ্তানি করা হচ্ছে। পাশাপাশি ভারত এখন তাদের মহিষের গোশত চীনা বাজারে প্রবেশের সুবিধার ওপর জোর দিচ্ছে। আরও কিছু পণ্যেরও শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার চাইছে তারা। চীনে যেসব পণ্য উৎপাদন হয় না, সেগুলোর ক্ষেত্রে শুল্ক কমই চাপানো হয়। চীনা সরকারের এই নীতির সুযোগ নিতে চাইছে ভারত। বাণিজ্য ঘাটতি কমানোসহ দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে অবকাঠামোর উন্নয়নে চীনের বড় বিনিয়োগও আশা করছে ভারত।
বর্তমানে ভারতের সবচেয়ে উদীয়মান আর্থিক খাত দেশটির প্রযুক্তি শিল্প। ভারতীয় প্রযুক্তিপণ্যের সবচে বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্য। তবে সম্প্রতি ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতাগ্রহণের পর রক্ষণশীল বাণিজ্য নীতির পথে এগোচ্ছে মার্কিন প্রশাসন। একই ধরনের নীতির কথা বলছে ইউরোপের দেশগুলোও। এতে যুক্তরাষ্ট্রে কমতে শুরু করেছে ভারতীয় প্রযুক্তিপণ্যের বাজার। আর এজন্য আশপাশের প্রতিবেশী দেশগুলোর দিকে ঝুঁকতে শুরু করেছে ভারতের ব্যবসায়ীরা। এই তালিকায় তারা প্রথমেই রাখছে চীনকে।
ভারতের অর্থনীতি এখন উত্থানমুখী। এই অবস্থায় চীনের সঙ্গে যুদ্ধ লাগালে বড় অর্থনীতির দেশ চীনের বন্ধু দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যে সমস্যায় পড়তে হবে। চীনের দ্বারা কিছু এলাকা ঘেরাও হয়ে পড়ার সম্ভাবনাও আছে। দেশের সীমানায় পাকিস্তানের উৎপাত আরও বেড়ে যাবে। ইতোমধ্যে তারা দোকলাম সংকটকে ঘিরে ভারতকে চাপে ফেলতে উদ্যোগ নিয়েছে। পাক নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর অংশের সিন্ধু নদীতে ছয়টি বাঁধ স্থাপনের কাজ শুরু করেছে দেশটি। এছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন এলাকায় যেভাবে চীন বন্দর নিয়ন্ত্রণে অগ্রসর, তাতে ভারতের বড় ধরনের সমস্যাই হবে।
আন্তর্জাতিক মিত্ররাও এ মুহূর্তে তার সঙ্গে নেই। ভারত-চীন যুদ্ধে পশ্চিমা উসকানি একটি বড় কারণ হতে পারত। কিন্তু ট্রাম্পযুগে সেই সম্ভাবনা ক্ষীণ। ওবামা প্রশাসন ভারতকে এই লক্ষ্যে সমর্থন জোগালেও ট্রাম্প আমলে দেখা গেছে যুক্তরাষ্ট্র সফরে গিয়েও মোদি তেমন কোনো পাত্তা পাননি। চীন নিয়ে হম্বিতম্বিতে ব্যস্ত থাকলেও বাস্তব ব্যবসাজ্ঞান দ্বারা চালিত ট্রাম্প জানেন যে, চীন কোনো যুদ্ধে গেলে তার দেশের অর্ধেকের বেশি পণ্যের দাম বেড়ে যাবে। চীন-ভারত যুদ্ধ লাগলে আক্রান্ত হবে বিশ্বের সবচেয়ে বড় দুটি শ্রমবাজার। প্রায় তিনশ’ কোটি মানুষ যুদ্ধের মধ্যে পড়বে। বৈশ্বিক চাহিদা মোতাবেক পণ্য উৎপাদন ও বিক্রি উভয়ই ক্ষতির মধ্যে পড়বে।

অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি নির্দেশ করছে যে, চীন-ভারত যুদ্ধসম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। তবে যুদ্ধ না হলেও চীন-ভারতের এই দ্বন্দ্ব সহসা থামার নয়। এতে এশীয় অঞ্চলের ভূ-রাজনীতি ও অর্থনীতির প্রচুর ক্ষতি হবে। পশ্চিমা শক্তিগুলো এখানে আরও বেশি নাক গলানোর সুবিধা পাবে। ভারত যেহেতু বেশি উন্মুক্ত, তাদেরই বেশি ক্ষয়ক্ষতি পোহাতে হবে। আঞ্চলিক ছোট দেশগুলোকে এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় আরও কৌশলী কূটনীতির আশ্রয় নিতে হবে। নইলে বড় ধরনের বিপদে পড়তে হবে তাদের। আর সার্বিকভাবে বৃহৎ এই দুই দেশের দ্বন্দ্বের জের ধরে এশিয়ার সামরিকায়ন ও যুদ্ধের উত্তেজনা আরও বাড়বে। সে পথেই এগুতে থাকলে পরিস্থিতি খারাপ দিকে মোড় নিতে খুব বেশিকাল সম্ভবত অপেক্ষা করা লাগবে না। 

সাপ?তাহিক পতিবেদন

 মতামত সমূহ
পিছনে 
 আপনার মতামত লিখুন
English বাংলা
নাম:
ই-মেইল:
মন্তব্য :

Please enter the text shown in the image.