আদালতের রায়ে বাংলাদেশ -শুভ কিবরিয়া

Print Friendly and PDF

সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীকে সংবিধান পরিপন্থী ঘোষণা করে সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগ রায় ঘোষণা করেছেন। সম্প্রতি ষোড়শ সংশোধনী নিয়ে আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়েছে। এই পূর্ণাঙ্গ রায়টি সুদীর্ঘ (৭৯৯ পৃষ্ঠার) এবং এই রায়ে রাষ্ট্র-সমাজ-রাজনীতি বিষয়ে বেশ কিছু মন্তব্য করা হয়েছে। ইতোমধ্যে এসব মন্তব্যে ক্ষুব্ধ হয়েছে সরকারি দল। সরকারি দলের পক্ষে অর্থমন্ত্রী প্রকাশ্যে জনসভায় এই ক্ষুব্ধতা প্রকাশ করেছেন। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের মন্ত্রী, বুদ্ধিজীবীসহ অনেকেই রাষ্ট্র-সমাজ-রাজনীতি সম্পর্কে এই রায়ে করা মন্তব্যকে অপ্রাসঙ্গিকও বলেছেন। অন্যদিকে বিএনপি মহাসচিব এই রায়কে যুগান্তকারী রায় হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। বলাবাহুল্য, এই রায়ের মাধ্যমে আদালতের বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাত থেকে সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিলের হাতে ন্যস্ত হবে। এখন দেখা যাক এ রায়ে এমন কি মন্তব্য করা হয়েছে যা রাষ্ট্র-সমাজ-রাজনীতির একদল মানুষকে ক্ষুব্ধ করছে, অন্যদলকে করছে উচ্ছ্বসিত।

দুই.
এ রায়ে প্রধান বিচারপতি যা বলেছেন তার কিয়দংশ এরকম,
১. ‘অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা ও প্রতিরোধের স্পৃহার মাধ্যমে আমরা সামরিক শাসনের থাবা থেকে মুক্ত হয়েছি। কিন্তু পরাজিত হয়েছি স্বাধীন রাষ্ট্রে। এমনকি স্বাধীনতার ৪৬ বছর পরও আমরা আমাদের একটি জনপ্রতিষ্ঠানকেও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পারিনি। কোথাও আমাদের ভারসাম্য নেই। তদারককারী নেই। আর এ কারণেই সুবিধাভোগীরা ক্ষমতার অপব্যবহারে উৎসাহিত হন এবং যত্রতত্র ক্ষমতার অপব্যবহারের ধৃষ্টতা দেখান।
 রাষ্ট্রক্ষমতার যা রাজনৈতিক ক্ষমতার আরেক রূপ, সাম্প্রতিক সময়ে তা গুটিকয়েক মানুষের একচ্ছত্র বিষয়ে পরিণত করেছে। ক্ষমতা কেন্দ্রীভূতকরণের আত্মঘাতী প্রবণতা ক্রমেই বাড়ছে। ক্ষমতার লিপ্সা মহামারীর মতো, যা একবার ধরলে তা দ্রুত সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলতে চাই, এটি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন ও উদ্দেশ্য ছিল না। আমাদের পূর্বপুরুষেরা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করেছিলেন, কোনো ক্ষমতাধর দৈত্যের জন্য নয়।’
২. ‘১৯৭১ সালে আমরা যে অলঙ্ঘনীয় ঐক্য গড়েছিলাম, তা শত্রুরা নস্যাৎ করতে ব্যর্থ হয়েছিল। আজ আমরা একটি মুক্ত, স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশে বাস করি। অথচ আজ ঔদ্ধত্য এবং অজ্ঞতাকে আমরা প্রশ্রয় দিয়ে চলছি। কোনো একজন ব্যক্তি দ্বারা কোনো একটি দেশ বা জাতি তৈরি হয়নি। আমরা যদি সত্যিই জাতির পিতার স্বপ্নে সোনার বাংলায় বাঁচতে চাই, তাহলে এই আমিত্বর আসক্তি এবং আত্মঘাতী উচ্চাভিলাষ থেকে আমাদের মুক্ত থাকতে হবে। এই আমিত্ব হলো কেবল এক ব্যক্তি বা একজন মানুষ সবকিছুই করতে পারেন এমন ভাবনা।’
৩. ‘এমন একটি পঙ্গু সমাজে আমরা আছি, যেখানে ভালো মানুষ আর ভালো স্বপ্ন দেখে না, কিন্তু খারাপ লোকেরা আরও লুটপাটের জন্য বেপরোয়া।’
৪. ‘মেধা নয়, ক্ষমতার মাধ্যমেই এখন দেশের সব সরকারি প্রতিষ্ঠানকে নিয়ন্ত্রণের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।’
৫. ‘এখন রাজনীতি মুক্ত নয়। এটি বাণিজ্যিক বিষয়। আর অর্থ রাজনীতি পরিচালনা করে। আর সেটিই তার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নির্ধারণ করে দেয়। এখন মেধা নয়, ক্ষমতাই সব জনপ্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণকারী।’
৬. ‘ক্ষমতার অপব্যবহার এবং দাম্ভিকতা দেখানোর ক্ষেত্রে বাধা দেওয়ার মতো কোনো নজরদারি বা তদারককারী প্রতিষ্ঠান নেই। এমন প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষারও ব্যবস্থা নেই। নির্বাহী দাম্ভিক নিয়ন্ত্রণহীন হওয়ায় আমলাতন্ত্র কখনোই দক্ষতা অর্জনে সচেষ্ট হবে না।’
৭. ‘মানবাধিকার ঝুঁকিতে, দুর্নীতি অনিয়ন্ত্রিত, সংসদ অকার্যকর, কোটি মানুষ স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত। প্রশাসনে বিশৃঙ্খলা। আর প্রযুক্তির উন্নতির সহায়তা নিয়ে অপরাধের প্রকৃতি বদলে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। জনগণের জানমালের নিরাপত্তা ভীষণ রকম ক্ষতিগ্রস্ত। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পরিস্থিতি সামাল দিতে সক্ষম নয়। এমন পরিস্থিতিতে নির্বাহী বিভাগ আরও অসহিষ্ণু ও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে এবং আর আমলাতন্ত্র দক্ষতা অর্জনে চেষ্টাহীন।’
৮. ‘এই বাজে রোগের কারণে নীতিনির্ধারকরা সবকিছু ব্যক্তিকরণ করে ফেলেছেন। তাঁরা তাঁদের ক্ষুদ্র এবং সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থে একটি ভুয়া ও “মেকি গণতন্ত্র” প্রতিষ্ঠা করেছেন। আর এটা তাঁরা লজ্জাজনকভাবে আমাদের সংবিধানের অন্যায্য সুবিধা নিয়ে করেছেন। অথচ ১৯৭১ সালে আমাদের শহীদেরা রক্ত দিয়ে এ সংবিধান লিখেছিলেন। আমাদের অবশ্যই এই নোংরা “আমাদের লোক” মতবাদ পরিহার করতে হবে। পরিত্যাগ করতে হবে এই আত্মঘাতী “আমি একাই সব” দৃষ্টিভঙ্গি। দলীয় আনুগত্য বা অর্থবিত্ত নয়, জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে প্রতিষ্ঠান তৈরিতে শুধু মেধার বিবেচনাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।’
০৯. ‘নির্বাচন কমিশনের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ হয়নি। জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিরপেক্ষভাবে এবং কোনো হস্তক্ষেপ ছাড়া স্বাধীনভাবে না হতে পারলে গণতন্ত্র বিকশিত হতে পারে না। গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ছাড়া গ্রহণযোগ্য সংসদ প্রতিষ্ঠা হয় না।’
১০. ‘এই আদালত লক্ষ্য করেছেন যে প্রতিটি জাতীয় নির্বাচনে রাজনৈতিক দল যারাই নির্বাচনে হেরে যায়, তারা নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে এবং বিরোধী দল সংসদে সহযোগিতা করে না। শেষ পর্যন্ত দশম সংসদ নির্বাচনে একটি বড় রাজনৈতিক দল অংশ নেয়নি। এই আদালতের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন করতে সব ক্ষমতা দিয়ে নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করা। সরকারের কোনো হস্তক্ষেপ ছাড়াই নির্বাচন কমিশনের শূন্যপদগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে পূরণ হবে। কিন্তু পরবর্তী সরকারগুলোর কেউ এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। এমনকি বিরোধী রাজনৈতিক দলও সংসদে কিংবা কোনো ফোরামে এই প্রশ্ন তোলেনি এবং তার ফল দাঁড়িয়েছে, নির্বাচন কমিশনের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ ঘটেনি।’
১১. ‘ক্ষমতালোভীরা দুবার আমাদের রাষ্ট্রকে “ব্যানানা রিপাবলিকে” পরিণত করেছিল, যেখানে ক্ষমতালোভীরা তাদের অবৈধ ক্ষমতাকে বৈধতা দেওয়ার জন্য জনগণকে পণ্যরূপে দেখেছে, ধোঁকা দিয়েছে। তারা জনগণের ক্ষমতায়ন করেনি, অপব্যবহার করেছে। তারা নানা রকম ধোঁকাবাজির আশ্রয় নিয়েছে। কখনো ভোটের নামে, কখনো জোরপূর্বক নির্বাচনের মাধ্যমে, কখনো নির্বাচন না করে। এর সবটাই করা হয়েছে তাদের ক্ষমতাকে দীর্ঘায়িত করতে। আর এর মধ্য দিয়েই সুস্থ ধারার রাজনীতি পুরোপুরি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। এসব অগণতান্ত্রিক শাসনামলের নোংরা রাজনীতির চর্চা আমাদের সার্বিক জনরাজনীতিকে মারাত্মক ক্ষতি করেছে।’
১২. ‘বিচারক অপসারণের ক্ষমতা যদি সংসদ সদস্যদের হাতে যায়, তবে তার প্রভাব বিচার বিভাগে পড়বে এতে কোনো সন্দেহ নেই। এ ছাড়া দীর্ঘদিন সুপ্রিম জুডিসিয়াল ব্যবস্থা অনুপস্থিত থাকায় প্রধান বিচারপতির প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। যদি কোনো একজন বিচারকের তাঁর প্রতিষ্ঠানপ্রধানের কাছে জবাবদিহি না থাকে, তবে ওই বিভাগ ধসে পড়তে বাধ্য।’
১৩. ‘এই সীমাহীন চ্যালেঞ্জের মুখে বিচার বিভাগই তুলনামূলকভাবে স্বাধীন অঙ্গ হিসেবে কাজ করছে, ডুবতে ডুবতে নাক উঁচিয়ে বেঁচে থাকার মতো। কিন্তু এই পরিস্থিতিতে বিচার বিভাগও খুব বেশি দিন টিকে থাকবে না। এখন পর্যন্ত উচ্চ আদালতের বিচারকদের নির্বাচন ও নিয়োগের কোনো আইন হলো না। নির্বাহী বিভাগ বিচার বিভাগের ক্ষমতা সংকুচিত করতে আগ্রহী। আর যদি তা হয় তাহলে এর চেয়ে ধ্বংসাত্মক আর কিছু হবে না।’
১৪. ‘আমাদের সংবিধানের ভিত্তি হচ্ছে, “আমরা জনগণ” সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী। জাতীয় সংসদ সংবিধানের পরিপন্থী কোনো আইন প্রণয়ন করতে পারে না এবং কোনো আইন সংবিধানসম্মত কি না, তা বিচার করার অধিকার সংবিধান সুপ্রিমকোর্টকেই দিয়েছে।’
১৫. ‘এই অনুচ্ছেদ (সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ)  সংসদ সদস্যদের বেদনাহত এবং অসঙ্গতভাবে তাঁদের অধিকারকে শৃঙ্খলিত করেছে। তাই সংসদের কোনো ইস্যুতেই তাঁরা দলীয় অবস্থানের বিরুদ্ধে কোনো অবস্থান নিতে পারেন না।’
১৬. ‘সংসদ সদস্যদের যদি সন্দেহের চোখেই দেখা হয়, তাহলে তাঁদের কী করে উচ্চ আদালতের বিচারকদের অপসারণের মতো দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত নেওয়ার কাজে ন্যস্ত করা যায়। তাই এই অনুচ্ছেদের উদ্দেশ্যের চেতনা হলো সংসদের নির্বাচিত সদস্যরা তাঁদের মনোনীত করা দলের প্রতি আনুগত্য বজায় রাখবেন। আসলে তাঁরা তাঁদের দলের উচ্চপর্যায়ের হাতে জিম্মি। তাই ৭০ অনুচ্ছেদের বিষয়ে হাইকোর্ট বিভাগ যে দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েছেন, তার মধ্যে আমরা কোনো বৈকল্য দেখি না। সংসদের হাতে বিচারক অপসারণের ক্ষমতা দেওয়া হলে বিচারকরা দলের হাইকমান্ডের অনুকম্পানির্ভর হয়ে পড়বেন।’
১৭. ‘দুই বছরের জরুরি অবস্থার (১/১১) নামে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। আর সেটা ঘটেছিল সেই সময়ের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের দূরদর্শিতার অভাব এবং গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণে তাদের অনীহার কারণে।’
১৮. ‘আমরা যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নগর পরিকল্পনার দিকে তাকাই, তাহলে দেখি যেই ব্যক্তি তাদের নগরের পরিকল্পনা করেছেন, তাঁকেই তারা স্বীকৃতি দিয়েছে। দাসপ্রথা বিলুপ্তির জন্য আব্রাহাম লিংকনের স্ত্রী মেরি টড স্বীকৃতি পেয়েছেন। নারী অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আরও অনেকে স্বীকৃতি পেয়েছেন। তাঁদের মধ্যে চারজন জেনারেলও রয়েছেন। কিন্তু আমাদের দেশে একটি রোগ আমাদের মধ্যে সংক্রমিত হয়েছে। আর সেই রোগের নাম ‘অদূরদর্শী রাজনৈতিকীকরণ’। এটা একটা ভাইরাস এবং দুর্ভাগ্যবশত আমাদের সংস্কৃতিকে তা এমন বিস্তৃতভাবে সংক্রমিত করেছে যে আমাদের নীতিনির্ধারকরা এমন একটি ভবিষ্যৎ দেখতে বা কল্পনা করতেও পারছেন না যে ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে পুরো জাতি, কোনো একজন ব্যক্তি নন।’

তিন.
এই রায়ে সন্তুষ্ট নয় আওয়ামী লীগ।
আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য, সাবেক আইন ও বিচারমন্ত্রী আবদুল মতিন খসরু প্রথম আলোকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মন্তব্য করেছেন, ‘এ রায়ে যেসব বিষয় আনা হয়েছে, তা মামলার মূল বিষয়বস্তু থেকে সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক। এ রায়ে আমরা ক্ষুব্ধ, আহত এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি।
মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব সম্পর্কে নিষ্ঠুর, নির্দয় মন্তব্য করা হয়েছে। আমরা মনে করি, এসব বিষয় মামলার মূল বিচার্য ছিল না। এবং মূল বিচার্যের সঙ্গে এর কোনো প্রাসঙ্গিকতা ছিল না। দেশের প্রধান বিচারপতির কাছ থেকে আমরা এটা কোনোভাবেই আশা করি না। সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সুপ্রিমকোর্টের রায় মানতে আমরা বাধ্য। কিন্তু তাই বলে এ রকম অসামঞ্জস্য বক্তব্য আমরা কোনোভাবেই আশা করিনি।
আমাদের এখন উদ্বেগ হলো প্রধান বিচারপতির রাজনৈতিক মন্তব্য, যা আমাদের জন্য অত্যন্ত অপমানজনক হয়েছে।
পৃথিবীর কোনো দেশে প্রধান বিচারপতি কোনো দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব সম্পর্কে এ রকম একতরফা মন্তব্য করেছেন কি না, তা আমাদের জানা নেই। আমরা আহত, ক্ষতিগ্রস্ত ও ক্ষুব্ধ। ওই বক্তব্য অযাচিত ও অসমীচীন এবং তা কোনো অবস্থাতেই গ্রহণযোগ্য নয়।’
অর্থমন্ত্রী এম এ মুহিত আরও তীব্র ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে বলেছেন,  ‘আমরা আবার সংসদে এটি পাস করব এবং অনবরত করতে থাকব। দেখি জুডিসিয়ারি কতদূর যায়।...মানুষের প্রতিনিধিদের ওপর তারা খবরদারি করবে? তাদের আমরা চাকরি দিই।’
অন্যদিকে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি তো মনে করি ষোড়শ সংশোধনী নিয়ে সর্বোচ্চ আদালতের পূর্ণাঙ্গ রায়টি বাংলাদেশের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ রায়। বর্তমান প্রেক্ষাপটে এটি একটি ঐতিহাসিক এবং যুগান্তকারী রায়।’

চার.
বাংলাদেশ রাষ্ট্র যে রাষ্ট্র হয়ে ওঠেনি তার প্রধানতম উপসর্গ হচ্ছে, তার প্রাতিষ্ঠানিক অক্ষমতা। এখানে প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠানের চাইতে ব্যক্তিকে প্রাধান্য দিয়েছে। কখনো কখনো সেই ব্যক্তিগত আকাক্সক্ষা দেশের চাইতে বড় হয়ে উঠেছে। দেশের সবচাইতে গৌরবময় প্রতিষ্ঠানগুলোর অন্যতম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচাইতে বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তার নৈতিক অবস্থান। দেশের যে কোনো অনৈতিকতা, অগণতান্ত্রিকতা, স্বৈরাচারী কর্তৃত্ববাদিতা, সংবিধানের লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে নিজের গ-ির সীমা ছেড়ে বেরিয়ে এসে হলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার বিরুদ্ধে নৈতিক অবস্থান নিতে কখনোই পিছপা হয়নি। অথচ সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন শুধু রীতি-নীতি-নৈতিকতা লঙ্ঘন করেই নয়, প্রচলিত আইন ও মানদ- অমান্য করেও শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হচ্ছে সম্পূর্ণ হীনস্বার্থে দলীয় বিবেচনায়। নিয়োগকৃত শিক্ষকরা যতটা শিক্ষাদানে পটু, জ্ঞান সৃজনে যোগ্য তার চাইতে অনেক বেশি দক্ষ দলীয় ভোটার হিসেবে তাদের আনুগত্য প্রকাশে। সকল প্রকার ভব্যতা লঙ্ঘন করেই বছরের পর বছর অনির্বাচিত উপায়ে অথবা প্রতারণামূলক নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় টিকে থাকছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি।
নৈরাজ্য আর প্রতিষ্ঠানহীনতার সংস্কৃতিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একটি উদাহরণ। অন্যত্র বিশেষ করে দেশের শিক্ষা খাত, স্বাস্থ্য খাত, পরিবহন খাত, অবকাঠামোগত খাত, আমলাতন্ত্র সর্বত্র এখন দলীয় রাজনীতির এক নৈরাজ্যকর উপস্থিতি সবকিছুকে মানহীন, গুণহীন করে তুলেছে। প্রতিদিন সংবাদপত্রে ক্ষমতাবানদের নির্লজ্জ দখল, রাহাজানি, ধর্ষণ, পাশবিক অত্যাচারের যে চিত্র পাওয়া যাচ্ছে তাতে প্রমাণিত হয় দেশে আইনের শাসন শুধু অনুপস্থিতই নয়, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার সকল সম্ভাবনাই সুদূর পরাহত হয়ে পড়ছে।
মাননীয় প্রধান বিচারপতির রায়ে উল্লিখিত মন্তব্য বিশেষ করে ‘এমন একটি পঙ্গু সমাজে আমরা আছি, যেখানে ভালো মানুষ আর ভালো স্বপ্ন দেখেন না’- সেই সত্যকেই আইনি ভাষায় স্থান দিয়েছে মাত্র।
তিনি বলেছেন, ‘রাজনীতি এখন আর মুক্ত নয়। এটি এখন বাণিজ্যে পরিণত হয়েছে’- এই সত্য কি রাজনীতিবিদরা অগ্রাহ্য করতে পারবেন? আমরা যে সর্বত্র দলীয়করণের মহোৎসব দেখছি, যে যোগ্যদের উপরে অযোগ্যদের স্থান দেখছি, তা কি প্রধান বিচারপতির ‘মেধা নয়, ক্ষমতার মাধ্যমেই এখন সরকারি প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে’- এই বক্তব্যকেই সত্য বলে প্রমাণ করে না!

চার.
রাষ্ট্র ও সমাজের এক চিত্রই বড়ভাবে ফুটে উঠেছে এই রায়ে। রাজনীতিবিদদের একাংশ অসন্তুষ্ট হচ্ছেন বটে কিন্তু আর্থ-সামাজিক রাজনৈতিক বাস্তবতা তো এর বাইরে নয়। রাজনীতিবিদদের যে অংশ উল্লসিত হচ্ছেন তারা রায়ের খ-িত অংশে আনন্দ পাচ্ছেন। তারা মাননীয় প্রধান বিচারপতির রায়ে উল্লিখিত, ‘‘ক্ষমতালোভীরা দুবার আমাদের রাষ্ট্রকে ‘ব্যানানা রিপাবলিকে’ পরিণত করেছিল, যেখানে ক্ষমতালোভীরা তাদের অবৈধ ক্ষমতাকে বৈধতা দেওয়ার জন্য জনগণকে পণ্যরূপে দেখেছে, ধোঁকা দিয়েছে। তারা জনগণের ক্ষমতায়ন করেনি, অপব্যবহার করেছে।”-এই অংশকে উপেক্ষা করেছেন।
এই রায়ে রাজনীতিবিদদের সন্তুষ্টি কিংবা অসন্তুষ্টির চাইতে দরকার তাদের আত্মোপলব্ধির। দরকার তাদের সতর্ক হওয়ার। ভবিষ্যতে দেশ যাতে আর ব্যানানা রিপাবালিকে পরিণত না হয় সেই বিষয়ে সতর্ক হবার এক বড় ইঙ্গিত আছে এই রায়ে।

সাপ?তাহিক পতিবেদন

 মতামত সমূহ
Author : আমিরুল খান
সর্বোচ্চ আদালতের রায় ও পর্যবেক্ষণে সংক্ষুব্ধ দল্টি যেভাবে তাদের প্রতিকৃয়া ব্যক্ত করছে তাতে দেশবাসী আতঙ্কিত। এতদিন তারা আদালতের ঘাড়ে বন্দুক রেখে স্বার্থ সিদ্ধি করেছে। এখন মতের মিল না হওয়ায় আদালতকে ধমকাচ্ছে। সর্বোচ্চ আদালতের যদি এই পরিণতি হয় তাহলে সাধারণ মানুষের মত প্রকাশের, সংগঠন করা, সমাবেশ করার মত মৌলিক আধিকার বলে এদেশে কিছুই থাকবে না। মনে হচ্ছে কবর থেকে হিটলারের প্রেতাত্মারা উঠে আসছে।
পিছনে 
 আপনার মতামত লিখুন
English বাংলা
নাম:
ই-মেইল:
মন্তব্য :

Please enter the text shown in the image.