[সাফল্য] লড়াকু মনির হোসেন

Print Friendly and PDF

সুইটি আক্তার

আমাদের দেশে প্রায় সবখানেই নানা ধরনের দোকান দেখতে পাওয়া যায়। যেমন চা-নাস্তার দোকান, খাবারের দোকান, পিঠার দোকান, মুদির দোকান ইত্যাদি। চা বা খাবারের দোকানগুলোতে মূলত তৈরি করা নানা ধরনের খাবার পাওয়া যায়। কিন্তু একটি মুদির দোকানে দৈনন্দিন জীবনে দরকারি প্রায় সব ধরনের জিনিস আমরা পেতে পারি। যেমন নানা ধরনের প্যাকেটজাত খাবার থেকে শুরু করে টর্চলাইট, ব্যাটারি, চাল-ডালসহ নানা ধরনের মসলা ইত্যাদি। আর এ ধরনের দোকানগুলো সবসময়ই বেশ ভালো চলে। তাই আর্থিকভাবে লাভবান হবার একটি ভালো উপায় হিসেবে মুদির দোকান স্থাপন করা আজ বেশ জনপ্রিয় একটি বিপণি বলে পরিচিতি লাভ করে।
গ্রামগঞ্জে ও ঢাকা শহরের অলিতে-গলিতে, চৌরাস্তায় এ ধরনের মুদির দোকান দেখা যায়। একটি লাভজনক ব্যবসা হিসেবে সামান্য পুঁজি নিয়েই একটি মুদির দোকান চালু করা যায়। নিজে বা পরিবারের অন্য সদস্যদের সাহায্য নিয়ে এই ব্যবসা করে বাড়তি আয় করা যেতে পারে। কারণ সবখানে ও সবসময়ে এর চাহিদা আছে।
যে কোনো মুদির দোকানে যত বেশি দরকারি জিনিস থাকবে বিক্রির পরিমাণও তত বেশি হবে। যে কোনো আকারেই এই দোকান করা যায় তবে তা অর্থ, সামর্থ্য ও সুযোগের উপর নির্ভর করে। এমনটি করে কথা বলছিলে একজন মুদি ব্যবসায়ী মো. মনির হোসেন।
মনির হোসেন স্টোরÑ এই দোকানটির মালিক মো. মনির হোসেন। ১৯৮১ সালে রাজধানী ঢাকার নিউ ইস্কাটন এলাকায় অতি সাধারণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। জন্মের পর থেকেই তিনি ঢাকাতেই বসবাস করছেন। মনির হোসেন বলেন, ‘আমি অতি সাধারণ পরিবারের একজন সন্তান। আমার বাবা মো. শুকুর মাহমুদ পেশায় একজন বাবুর্চি ছিলেন। বাবাকে দেখেছি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে রান্নার কাজ করতে। আমরা ৬ ভাই ও ৪ বোন ছিলাম। আমি ছিলাম সবার ছোট। তাই বাবা-মা, ভাইবোনদের অনেক আদরের ছিলাম। বাবা অনেক কষ্ট করে আমাদের সংসার চালাতেন। বাবা বাবুর্চির কাজ করে যা আয় করতেন তা দিয়ে আমাদের সংসারের সকল আর্থিক চাহিদা মেটাতে হিমশিম খেত। আর্থিক সমস্যার কারণে ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ে লেখাপড়ায় ইতি টানতে হয়েছে। আমি অনেক ছোট থাকতেই বাবার কষ্ট বুঝতে পারতাম। আমাদের একটি ছোট মুদি দোকান ছিল। বাবা একাই দোকানটি চালাতেন। বাড়তি আয়ের উৎসের জন্য বাবা এই দোকানটি প্রতিষ্ঠা করেন। আমাদের এই মুদি দোকানটি নিউ স্কাটন রোডে অবস্থিত। একসময় আমিও বাবার সঙ্গে মুদি দোকানে বাবাকে সহযোগিতা করতাম।
২০১১ সালে বাবা মারা গেলেন। ওই সময়টাতে আমাদের অনেক সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে। সবচেয়ে বেশি আর্থিক সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে। বাবা চলে যাওয়ার পর আমি ভিতর থেকে অনেকটা ভেঙে পড়েছিলাম। একসময় আমাদের দোকানটির অবস্থাও খারাপ হতে থাকে। হতাশা যেন চারদিক থেকে ঘিরে রেখেছে। এমনটি ব্যক্ত করছিলেন মনির হোসেন। মানুষের জীবনযুদ্ধের পথ অনেকটা দুঃখ-কষ্ট নিয়েই অতিক্রম করতে হয়। এই পথে অনেক বাধার সম্মুখীন হতে হয়। অনেক বাধা বিপত্তি পেরিয়ে যারা জীবনযুদ্ধে জয়ী হতে পারে তারাই হলেন জীবনের শ্রেষ্ঠ যোদ্ধা।’
মনির বলেন, ‘আমি যখন দেখছি আমার পরিবারের মানুষ অনেক কষ্টে জীবনযাপন করছে তখন থেকেই আমি জীবনকে নতুন করে সাজানোর চেষ্টা করি। নিজেকে বোঝাতে চেষ্টা করি জীবনে অনেক কষ্ট আসবে। আর এই কষ্টই আমাকে জয় করতে হবে। তাই বাবার তৈরি করা মুদি দোকান নিয়ে আমার জীবনযুদ্ধের পথ চলতে শুরু করি। আস্তে আস্তে দোকানটির পরিসর বড় করতে থাকি। এলাকার লোকজনের সকল পণ্যের চাহিদা পূরণ করতে চেষ্টা করি। সবাই যেন আমার দোকান থেকে তাদের নিত্যদিনের পণ্যসামগ্রী সংগ্রহ করতে পারে। নিজের জমানো টাকা ও পরিবারের সকলের সহযোগিতায় আমি আমার দোকানের জন্য প্রায় ২ লাখ টাকার পণ্য কিনি। নিউ ইস্কাটন এলাকায় আমার দোকানের অনেক জনপ্রিয়তা আছে। এলাকার সকল মানুষ আমার দোকান থেকেই পণ্য সংগ্রহ করে থাকে।
বাবা বলেছিলেন এই মুদি দোকানটি যেন আমি আমার নিজের মতো করে গড়ে তুলি। দৈনিক আমার দোকানে অনেক লোকের ভিড় জমে থাকে। প্রতিমাসে আমি ১৫-২০ হাজার টাকা আয় করি। এখন আর আমাকে কষ্টের ছারা নাড়াতে হয় না। জীবনে অনেক কষ্ট করেছি। নিঃশেষ হয়েও জীবনযুদ্ধে হার মানিনি।
আমার পরিবারের আর্থিক উৎস হচ্ছে আমার এই মুদির দোকান।’
তিনি আরও বলেন, একজন অর্থনৈতিক সফল উদ্যোক্তা হতে চাইলে সমাজের সব স্তরে মানুষের সঙ্গে পেশার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। আর আমি এই মুদির দোকানের মাধ্যমে এই অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি। আমার দোকানে সমাজের সব স্তরের মানুষ তাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সংগ্রহ করেন।
তাছাড়া আমি মনে করি মানুষ যদি তার উদ্দেশ্য ঠিক রাখে এবং তার সততা ও পরিশ্রম কোনো কাজে লাগাতে পারে তাহলে সে যে কোনো কাজ থেকে সফলতা অর্জন করতে পারবে।
২০০৭ সালে মনির হোসেন বিয়ে করেন। এক কন্যা সন্তানের জনক তিনি। মনির হোসেনের প্রত্যয়Ñ আমি নিজে লেখাপড়া করতে পারিনি আর্থিক সমস্যার জন্য কিন্তু আমি আমার মেয়েকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করব। পরিবার পরিজন নিয়ে তিনি এখন সুখে শান্তিতে বসবাস করছেন।

সাপ?তাহিক পতিবেদন

দেশজুড়ে
 মতামত সমূহ
পিছনে 
 আপনার মতামত লিখুন
English বাংলা
নাম:
ই-মেইল:
মন্তব্য :

Please enter the text shown in the image.