এক দলবদলেই ভঙ্গ সব রেকর্ড

Print Friendly and PDF

মোয়াজ্জেম হোসেন রাসেল

জুলাই মাস থেকে যে নাটকের শুরু তা শেষ হতে হতে আগস্টের প্রথম কয়েকটা দিন লেগে গেল। ব্রাজিলিয়ান তারকা নেইমারের স্প্যানিশ ক্লাব বার্সেলোনা ছেড়ে প্যারিস সেন্ট জার্মেইতে যোগ দেওয়ার গুঞ্জন, আলোচনা, সম্ভাবনার ইতি টানা হয়ে গেছে। এক দলবদল দিয়েই ইতিহাসে নিজেকে নিয়ে গেলেন ব্রাজিল অধিনায়ক। এখন তো কেউ কেউ বলছেন, নেইমারের দলবদল নিয়ে হলিউডের জনপ্রিয় একটা সিনেমাও তৈরি হতে পারে! শঙ্কা, বাধা, রোমাঞ্চ, নাটকীয়তা কোনো কিছুরই কমতি ছিল না। গত কয়েক সপ্তাহজুড়েই ফুটবল বিশ্বে আলোচনার বড় অংশজুড়ে নেইমারের দলবদল। দুনিয়া কাঁপানো দলবদল নাম কি আর এমনি এমনি শোভা পেয়েছে! আলোচিত দলবদলটা কূল-কিনারায় পৌঁছাল এইতো সেদিন। বার্সেলোনার শত চেষ্টা, লা লিগা কর্তৃপক্ষের বাধা পেরিয়ে নেইমারের সঙ্গে চুক্তি সেরেই ফেলেছে পিএসজি। বলা যায় পেট্রো-ডলার দিয়েই তাকে বাগিয়ে নেওয়া হয়েছে। আর বার্সার হার হয়েছে টাকার কাছে। পাঁচ বছরের জন্য ব্রাজিল সুপারস্টারের সঙ্গে চুক্তি করেছে পিএসজি। চুক্তি নিশ্চিত হওয়ার অনুষ্ঠানিক ঘোষণার পর ইতিহাসও হয়ে গেল নেইমারের। বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে দামি ফুটবলার তিনি। দামের ব্যবধানে আগের রেকর্ডধারীকে এতটাই পেছনে ফেলেছেন যে, বেশি কিছুই বলা উচিত নেইমারের ক্ষেত্রে। জুভেন্টাস থেকে পল পগবাকে কিনতে ১০৫ মিলিয়ন ইউরো খরচ করতে হয়েছিল ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডকে। এতদিন পগবাই ছিলেন সবচেয়ে দামি ফুটবলার। আর বার্সেলোনা থেকে নেইমারকে ভাগিয়ে নিতে ২২২ মিলিয়ন ইউরো খরচ করতে হলো পিএসজিকে! অর্থাৎ পগবার দ্বিগুণেরও বেশি দাম নেইমারের! নেইমারের বার্সেলোনা ছাড়ার গুঞ্জন শুরু হয়েছিল জুলাইয়ের ১৬ তারিখ। এরপর যত আলোচনা, গুঞ্জন সবই মেলেছে ডালপালা, জড়িয়েছে অনেকের নাম।
সতীর্থদের কাছেও আবেগঘন বিদায় নেন নেইমার। তারপর লিওনেল মেসিসহ অনেকে নেইমারের উদ্দেশে বিদায়ী বার্তা দিয়েছেন। যদিও হঠাৎ বেঁকে বসে লা লিগা কর্তৃপক্ষ। উয়েফার বাধ্যবাধকতার কথা উঠিয়ে নেইমারের রিলিজ ক্লজ নিতে অস্বীকৃতি জানায় লা লিগা কর্তৃপক্ষ। তবে বিষয়টি সমাধান হয়েছে নেইমার নিজেই বার্সেলোনাকে রিলিজ ক্লজের অর্থ পরিশোধ করার মধ্য দিয়ে। তার পরপরই ‘নেইমার এখন থেকে আমাদের’ ঘোষণা দিয়েছে পিএসজি। প্যারিসে গিয়ে পিএসজির হয়ে প্রথম সংবাদ সম্মেলনেও অংশ নিয়েছেন নেইমার। যত ঝামেলাই হোক, নেইমারকে যে তারা পাচ্ছে পিএসজি সেটা অনেক আগে থেকেই নিশ্চিত ছিল। নেইমারকে পিএসজির ফুটবল হিসেবে বিশ্বের কাছে পরিচিত করে দেয়ার জন্য আয়োজন চালাচ্ছে অনেকদিন ধরে প্যারিসের ক্লাবটি। নেইমারের জার্সিও তৈরি করা ছিল আগেই। পিএসজিতে ১০ নম্বর জার্সিটি বরাদ্দ করা হয়েছে নেইমারের জন্য।
নেইমার পিএসজিতে শুধু বেতন হিসেবে বছরে পাবেন ৩০ মিলিয়ন ইউরো। কর বাদ দিয়েই এই পরিমাণ অর্থ পকেটে ভরবেন তিনি। বার্সেলোনা থেকে বর্তমানে বছরে তার বেতন ৯.১৮ মিলিয়ন ইউরো। যেখানে লিওনেল মেসির বেতন ৪০ মিলিয়ন ইউরো। এছাড়া পিএসজিতে গেলে নেইমারের বাবা যিনি তার এজেন্ট হিসেবে কাজ করেন- একবারে পাবেন ৪০ মিলিয়ন ইউরো। সর্বশেষ গত বছর বার্সেলোনার সঙ্গে চুক্তি নবায়ন করেন নেইমার। তখনতার রিলিজ ক্লজ ছিল ২২২ মিলিয়ন ইউরো। অর্থাৎ চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে নেইমারকে কোনো ক্লাব নিতে চাইলে এই পরিমাণ অর্থ দিতে হবে। চুক্তি অনুযায়ী বার্সেলোনার ২২২ মিলিয়ন ইউরো দিতে হবে পিএসজি’র। এছাড়া এখানে ট্রান্সফার ট্যাক্স বলে একটা বিষয় আছে। তারজন্য পিএসজিকে গুনতে হবে ১০০ থেকে ১২০ মিলিয়ন ইউরোর মধ্যের কোনো একটি পরিমাণ।
কাতার মালিকানাধীন ক্লাবটি অন্যতম সেরা দলবদলের রেকর্ড গড়েছেন। কাতারের নাসের আল খেলাইফি ফরাসি ক্লাব প্যারিস সেইন্ট জার্মেই’র মালিকানায় আসেন ২০১১ সালে। ক্লাবটির সভাপতিও তিনি। শুরু থেকেই ক্লাবটি নিয়ে উচ্চাকাক্সক্ষী তিনি। বিশ্বের বড় বড় খেলোয়াড় দলে ভেড়ানোর চেষ্টা করেছেন তিনি। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ও লিওনেল মেসির জন্যও চেষ্টা করেছেন। জøাতান ইবরাহিমোভিচ, এডিনসন কাভানি, ডেভিড লুইস ও অ্যাঙ্গেল ডি মারিয়ার মতো খেলোয়াড় দলে ভিড়িয়েছেন তিনি। তবে এবার সবচেয়ে বড় চমক দেখালেন তিনি। বিশ্বরেকর্ড গড়ে ২২২ মিলিয়ন ইউরোতে বার্সেলোনা থেকে নেইমারকে দলে ভিড়িয়েছেন তিনি। নেইমারকে দলে ভেড়ানো তার স্বপ্ন ছিল। ইউয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের শিরোপা জয়ের মিশনে নেইমার অন্যতম কাণ্ডারি হবে বলেই তার বিশ্বাস।


নেইমারের টাকা দিয়ে যা করা যাবে
নেইমারের জন্য পিএসজি খরচ করেছে ২২২ মিলিয়ন ইউরো। বাংলাদেশি মুদ্রায় ২১০৬ কোটি টাকা। এই অর্থে কী পাওয়া যেতে পারে
১.    ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের সবচেয়ে দামি তিন ফুটবলার পল পগবা (১০৫ মিলিয়ন ইউরো), রোমেলু লুকাকু (৮৫ মিলিয়ন ইউরো) ও মাতিচ (৪০ মিলিয়ন ইউরো)।
২.    বাহামায় যে ২২৪ একরের ব্যক্তিগত দ্বীপ রয়েছে, তার সম্মিলিত দাম নেইমারের চেয়ে অনেক কম। প্রায় দশ গুণ।
৩.     মাইক্রোসফটের অন্যতম মালিক পল অ্যালেনের ৪১৪ ফুট ইয়ট রয়েছে। যেখানে ৪১ স্যুট, দুটি হেলিকপ্টার, একটি সুইমিংপুল, একটি থিয়েটার। তার দামও নেইমারের দামের চেয়ে কম।
৪.     ডোনাল্ড ট্রাম্পের দুটি প্রাইভেট জেটের মোট দাম প্রায় ১৭৩ মিলিয়ন ইউরো। নেইমারের দাম তার চেয়েও বেশি।
৫.     নেইমারের দামে পিএসজি ৭৯ কোটি ২০ লাখ ফ্রেডো চকলেটবার কিনতে পারত।
নেইমারের মাঠের অঙ্ক
১.     ২০১৩ সালে বার্সেলোনায় আসার পর নেইমার গোল করানোর সুযোগ তৈরি করেছেন ২৮৭টি। তার আগে শুধু মেসি (৩২৬)।
২.     গোল অ্যাসিস্ট করায় তিনি স্পেনে পাঁচ নম্বরে। ৩৮ গোল করেছেন। মেসি (৫৪), কোকে (৪৫), সুয়ারেজ (৪৩) ও রোনাল্ডো (৪২)-র পর।
৩.     বার্সায় যোগ দিয়ে ৬৮ গোল করেছেন। রোনাল্ডো (১৩৯), মেসি (১৩৪), সুয়ারেজ (৮৫), গ্রিজমান (৭৬) ও আদুরিজের (৭০) পর।


আলোচিত দলবদল

৪ আগস্ট ২০১৭ : নেইমার
নেইমারের দলবদল নিয়ে নতুন কিছু বলার নেই। কয়েক দিনেই সব ফাঁস হয়ে গেছে। আর ৪ আগস্ট শুক্রবার ফ্রান্সের পার্ক দে প্রিন্সেস স্টেডিয়ামে নেইমারের সর্বকালের সেরা দলবদলের আনুষ্ঠানিকতা হয়ে গেল। ১৯ কোটি ৮০ লাখ পাউন্ডে বা ২২ কোটি ২০ লাখ ইউরোতে নেইমারের দলবদলটি ছাড়িয়ে গেছে গেল মৌসুমে পল পগবার শত মিলিয়ন ইউরোর রেকর্ড দলবদলটিকে। এ দলবদল করে ইউরোপে সর্বোচ্চ আয়ের ফুটবলারও হয়েছেন নেইমার। পিএসজিতে বছরে ৩ কোটি ইউরো পাবেন ব্রাজিল তারকা। এতে সপ্তাহে তার আয় হবে ৬ লাখ ইউরো (প্রায়)।

৯ আগস্ট ২০১৬ : পল পগবা
স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনের সময়ই ম্যানইউর বয়সভিত্তিক দলে ছিলেন পগবা। কিন্তু ফার্গুসনের সুনজর পড়েনি তার ওপর। তাই সিনিয়র দলে সুযোগ পেলেও ম্যানইউতে ক্যারিয়ার গড়তে না পারা পগবা নিজেকে চেনান জুভেন্টাসে। তাই আবারও হোসে মরিনহোর মাধ্যমে ওল্ড ট্রাফোর্ডে আসতে হয় তাকে। ১০০ মিলিয়ন ইউরোতে ম্যানইউতে এলেও গেল মৌসুমে নিজের নামের প্রতি সুবিচার করতে পারেননি এ ফরাসি। তাই সমালোচনাও শুনতে হচ্ছে তাকে।

১ সেপ্টেম্বর ২০১৩ : গ্যারেথ বেল
২০১৩ সালে রিয়াল মাদ্রিদের টার্গেট নেইমারকে বার্সেলোনা ছিনিয়ে নিলে একজন উঠতি তরুণ কিনতে মরিয়া হয়ে যান মাদ্রিদ জায়ান্টরা। তখনকার সেরা পারফর্ম করা তরুণ গ্যারেথ বেলের দিকেই যায় নজর। তাই বেলকে সর্বোচ্চ মূল্য দিয়ে কিনে নেয় রিয়াল মাদ্রিদ মালক ফ্লোরেন্তিতো পেরেজ। বেলকে বিক্রি করতে পেরে দারুণ লাভ হয়েছিল টটেনহ্যামের। কারণ মাত্র ১০ লাখ পাউন্ডে এ ওয়েলস ফুটবলারকে কিনে ৭৫ লাখ পাউন্ডে বিক্রি করেছিল টটেনহ্যাম। রিয়ালের বেলের সাপ্তাহিক পারিশ্রমিক দাঁড়ায় ৩ লাখ পাউন্ড।

৬ জুলাই ২০০৯ : ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো
তখন পর্যন্ত ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে জাঁকজমকপূর্ণ দলবদল ছিল এটি। মেসির পাশাপাশি ফুটবল অঙ্গন দাপিয়ে বেড়ানো সেরা তারকাকে ম্যানইউ থেকে নিজেদের ডেরায় নিয়ে আসে রিয়াল মাদ্রিদ। এ এক দলবদলেই মূলত দলবদলের রেকর্ড ৫০ শতাংশ বেড়ে যায়। ৮০ লাখ পাউন্ডে রোনালদোকে এনে আনুষ্ঠনিক পরিচয়ের দিন বার্নাব্যুতে ৮০ হাজার দর্শক উপস্থিতি দেখিয়েছিল রিয়াল। স্প্যানিশ মিডিয়াগুলোয় এ দলবদলকে ‘দুর্দান্ত দিন’ বলা হয়।

৯ জুন ২০০৯ : কাকা
রোনালদোর আগে এসি মিলান থেকে কাকার রিয়াল মাদ্রিদে উড়াল দেয়াটাও কম আলোড়ন ছড়ায়নি। তবে এসি মিলানের সেরা তারকার দলবদলটি রিয়ালের জন্য কাজের হয়নি। ইনজুরির কারণেই মূলত বেশিরভাগ সময় রিয়ালের সেরা একাদশের বাইরে থাকতে হয়েছে কাকাকে। তাই ব্রাজিল তারকা রিয়ালে বেশি দিন টেকেনওনি।

১০ জুলাই ২০০১ : জিনেদিন জিদান

বছরে ৩ লাখ ৫০ হাজার পাউন্ড আর মোট ৪৫ লাখ পাউন্ডে ফ্রান্স ১৯৯৮ বিশ্বকাপজয়ী এবং ২০০০ ইউরোজয়ী তারকাকে দলে ভেড়ায় রিয়াল মাদ্রিদ। ফিফার দলবদলের নতুন নিয়মও প্রবর্তন হয়েছিল ওই সময়। তাকলাগানো দলবদল দিয়ে শিরোপা নামে আসার ধারাটা ধরে রাখেন মাদ্রিদ জায়ান্টরা।

২৪ জুলাই : ২০০০ লুইস ফিগো
বলা হয় ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে কালো দলবদল এটি। বার্সেলোনার ঘরের ছেলে লুইস ফিগো তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী রিয়াল মাদ্রিদের ডেরায় নাম লেখান। ৩৭ লাখ পাউন্ডের দলবদলটি ওই সময় দারুণ আলোড়ন তোলে। এ দলবদলে বার্সার চিরকালীন বিরাগভাজনও হয়ে যান ফিগো। তবে এ দলবদল দিয়েই দলবদলের বাজারে সবসময় বড় চমক দেয়ার ধারা শুরু করে রিয়াল মাদ্রিদ।

১৩ জুলাই ২০০০ : হারনান ক্রেসপো
৩৬ লাখ পাউন্ডে ওই সময়কার রেকর্ড দলবদল করে সাবেক আর্জেন্টিনা তারকা হারনান ক্রেসপো দলবদলের বাজার গরম করেন। কিন্তু বেশি দিন রেকর্ডটি ধরে রাখতে পারেননি তিনি। এ দলবদলটিই ছিল ইউরোপে ক্রেসপোর প্রথম দলবদল। তাই দলবদল নিয়ে নিজেই রোমাঞ্চিত ছিলেন।

৮ জুন ১৯৯৯ : ক্রিশ্চিয়ান ভিয়েরি
ইতালিয়ান এ স্ট্রাইকারের নাম একদমই অজানা। তবে এ স্ট্রাইকার নিজ দেশে দলবদলের বাজারে উচ্চমূল্যই পেতেন। ওই সময়ে বরাবরই ইতালির ফুটবল অঙ্গনে সেরা সময় কাটাতেন তিনি।

২০ জুন ১৯৯৭ : রোনাল্ডো
বার্সার হয়ে ৪৯ ম্যাচে ৪৭ গোল করা রোনাল্ডোকে কিনে আলোড়ন ফেলে দিয়েছিল ইন্টার মিলান। তখনকার ১ কোটি ৯৫ লাখ পাউন্ডের দলবদল দিয়ে ব্রাজিল লিজেন্ডকে ১০ বছরের জন্য ধরে রাখতে চেয়েছিল ইন্টার। অবশ্য শেষটায় সফল হয়নি তারা।
mhrashel00@gmail.com

সাপ?তাহিক পতিবেদন

খেলা
 মতামত সমূহ
পিছনে 
 আপনার মতামত লিখুন
English বাংলা
নাম:
ই-মেইল:
মন্তব্য :

Please enter the text shown in the image.