[মুক্তগদ্য] সুধীন দাশ তার কোনো তুলনা নাই

Print Friendly and PDF

আমীরুল ইসলাম

সেদিন শহীদ মিনারে হাজির হয়েছি সকালবেলা। কিছুক্ষণের মধ্যে  সদ্য প্রয়াত সুধীন দাশের মরদেহ আসবে। সমাজের সর্বস্তরের মানুষ তাকে শেষ শ্রদ্ধা জানাবেন। সুধীন দাশ নজরুল ইনস্টিটিউট থেকে আসবেন। খুব ঝাঁ ঝাঁ রোদ আজ। মাত্র ঈদ শেষ হয়েছে।
২৯ জুন ২০১৭। বিষণœভাবে আমি দাঁড়িয়ে আছি। মনটা ভয়ানক খারাপ। সুধীন দাশ নাই। এ যেন পিতৃবিয়োগ। সর্বস্তরের শিল্পীদের চোখে অশ্রু। তিনি ছিলেন শিক্ষকদের গুরু। সুধীন দাশের অবদানের সীমা পরিসীমা নাই। তার কিছু অবদান দুই বাংলার বাঙালি মাত্রই জানেন। নজরুল সঙ্গীতের প্রায় সংগৃহীত সকল গানের স্বরলিপি তৈরি করেছেন। এ যে কী দুঃসাধ্য কাজ! যেন সাগর মন্থন করে মুক্তো সংগ্রহ। নজরুল সঙ্গীতের স্বরলিপিকার হিসেবে তিনি অমর হয়ে থাকবেন। যৌবনে তিনি বিখ্যাত গায়ক ছিলেন। প্রথম জীবনে রবীন্দ্রসঙ্গীত পরিবেশন করতেন। পরে নজরুল সঙ্গীতে সমর্পণ করেন নিজেকে। আমি সঙ্গীত সাধকদের কেউ নই। কিন্তু সুধীন দাশের প্রচণ্ড ভক্ত ছিলাম। তাকে চরম শ্রদ্ধা করতাম। সুধীন দাশও আমাকে খুব পছন্দ করতেন।
চ্যানেল আই ছিল সুধীন দাশের পরিবার। তিনি মাঝেমধ্যে আসতেন। আমাদের সঙ্গে শিশুর মতো মিশতেন। গল্প করতেন। ঠাট্টা রসিকতা করতেন।
ছিপছিপে একহারা গড়নের ঋজু ব্যক্তিত্ব। শাদা পাজামা-পাঞ্জাবি পরতেন। একই রকম পোশাক পরেছেন আজীবন। খুব সাধারণ জীবনযাপন। নজরুল ইনস্টিটিউটের সঙ্গে আমৃত্যু জড়িত ছিলেন। নজরুল একাডেমিতে সঙ্গীত শিক্ষার ক্লাস নিয়েছেন দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের অধিককাল।
সুধীন দাশ সঙ্গীতমগ্ন এক ব্যক্তিত্ব। জীবনটা উৎসর্গ করেছেন সঙ্গীত শিক্ষার জন্য।
বিখ্যাত শিল্পী ফেরদৌসী রহমানকে তিনি আপন বোন জ্ঞান করতেন। অসুস্থ অবস্থায় তিনি বোনকে স্মরণ করতেন। ফেরদৌসী রহমানের সঙ্গে দেখা হলে খুশি হয়ে উঠতেন শিশুর মতো।
তার শিক্ষার্থীদের মধ্যে শাহিন সামাদ, ডালিয়া নওশীন, ফেরদৌস আরা, ইয়াসমিন মুস্তারি, সাদিয়া আফরিন মল্লিক প্রমুখ। প্রত্যেকের সঙ্গে তার অতি মিষ্টি সম্পর্ক। তারা অনেক গান শুদ্ধস্বরে শিখেছেন সুধীন দাশের কাছে। সুধীন দাশের দ্বার ছিল সবার জন্য অবারিত, উন্মুক্ত । তিনি সবাইকে সঙ্গীত  শিক্ষার ব্যাপারে সহায়তা করেছেন।
চ্যানেল আই স্মরণসভায় ফেরদৌস আরা সুধীন কাকুকে নিয়ে কিছু বলতে গিয়ে হায় হায় করে কেঁদে উঠলেন। তিনি বললেন, আমরা শুদ্ধ শিল্পী হয়ে ওঠার সাধনা শিখেছি কাকুর কাছে। যখনই গান শিখতে গেছি কাকু কখনো বিরক্ত হননি। তিনি ছিলেন প্রকৃত গুরু। সবসময় আগ্রহীদের শিক্ষা দিতে চাইতেন।
শাহিন সামাদ বললেন, উনি আমার চিরকালের গুরু। সারাজীবন শিশুদের মতো উনি আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন। আমি যে নজরুল সঙ্গীতের শিল্পী হয়েছি সেজন্যে আমি চিরকৃতজ্ঞ সুধীন কাকুর কাছে।
ইয়াসমিন মুশতারি বললেন, উনি আমার আপন কাকু। ছোটবেলা থেকে উনাকে দেখছি। আমাকে সারাজীবন বলেছেন- তুই একটা ছাগল, অই ছাগল এদিকে আয়। ঐ গানটা তুলছস? গাইতে পারবি?
এই ছিল সুধীন কাকু। আপন সন্তানের মতো তিনি আমাদের ভালোবাসতেন। একই কথা বললেন ডালিয়া নওশীন। সাদিয়া আফরিন মল্লিক।
শহীদ মিনারে তখন ভিড় জমতে শুরু করেছে। মরদেহ এলো। পেছনে কালো কাপড়ের ব্যানার। সামনে শহীদ মিনার। উঁচু উঁচু কৃষ্ণচূড়া গাছগুলো ছায়া দেয়ার চেষ্টা করছে। মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, মন্ত্রী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আসাদুজ্জান নূর এলেন। দূরে বিষণœ মনে একা দাঁড়িয়ে আছেন আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক সম্পাদক অসীম কুমার উকিল। বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিবর্গ ভিড় করে আছেন। নিপু, বিশ্বজিৎ, সুইটি মাইক্রোফোনের সামনে অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করছেন। পুরো দায়িত্ব মাথায় নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন নাসিরউদ্দিন ইউসুফ।
আমরা চ্যানেল আইয়ের পর্দায়। ১১.০৫ মিনিটে লাইভ সম্প্রচার হবে। উপস্থাপনায় বিশিষ্ট শিশুসাহিত্যিক আলী ইমাম । জামাল রেজা আর মোস্তাফিজুর রহমান নান্টু প্রযোজক। শিল্পী ফেরদৌস আরা ক্রন্দনরত। ফরিদুর রেজা সাগর উপস্থিত হয়েছেন।
আলী ইমাম কথা বলা শুরু করলেন। অনেক শব্দের ফুলঝুরি। কিন্তু কোনো বিশেষণ দিয়েই সুধীন দাশকে মূল্যায়ন সম্ভব নয়। তিনি আমাদের প্রশংসার ফুলঝুরির চেয়েও অনেক বড়। মগ্ন মানুষেরা, ভক্ত মানুষেরা চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছেন। তারা কথা বলছেন না। একেবারে মৌন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আরেফিন সিদ্দিক, কালি ও কলম সম্পাদক আবুল হাসনাত, নাট্যব্যক্তিত্ব মামুনুর রশিদ, চেনা অচেনা অনেক শিল্পীÑ সবাই ভিড় করে আছেন।
আমি মৌন। সঙ্গে আছে শোকসন্তপ্ত মৌসুমী বড়–য়া। মাথায় ঘোমটা মৌসুমীর। সুধীন কাকু আমাদের চ্যানেল আইয়ের মেয়েদের অনেক ভালোবাসতেন। রুমা, মৌসুমী, সাথী ওদের সঙ্গে খুব আড্ডা দিতেন সুধীন দাশ।
সুধীন দাশের সঙ্গে আমার অনেক স্মৃতি। নজরুল মেলা, নজরুল মৃত্যুবার্ষিকী কিংবা নিজের জন্মদিনে সুধীন কাকু ছুটে চলে আসতেন। কেউ তাকে আটকে রাখতে পারতো না। নিজের শারীরিক অবস্থা যতই খারাপ থাকুক তিনি চ্যানেল আই প্রাঙ্গণে আসবেনই, এই তো সেদিন তার জন্মদিন ছিল। ৮৭তম জন্মদিন। ৩০ এপ্রিল।
আমরা সবাই স্থির করলাম, কাকু খুব অসুস্থ। বাসা থেকে বের হতে পারেন না। তাহলে আমরাই চ্যানেল আইয়ের পক্ষ থেকে তার বাসায় যাব। কারণ তিনি হাঁটতে পারেন না। মিরপুরের সেই বাসা থেকে লাইভ দিব।
কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার সকালে তিনি আমাদের জানালেন যে, কষ্ট হলেও চ্যানেল আইতে তিনি আসবেন। এবং ঠিক ঠিক তিনি এসে উপস্থিত হলেন তারকা কথনে।
শাহিন সামাদ, ফেরদৌস আরা, রাহাত আরা গীতি, আসমা খান, রেবেকা খাতুন আরও অনেকে এলো। লাইভ অনুষ্ঠানে অনেক আনন্দ হলো। কেক কাটা হলো। সেদিন দুপুরে তিনি কিছুই খেলেন না। কিন্তু অন্যবার কাকু চ্যানেল আইয়ের ছাদ বারান্দায় গিয়ে ডাল-ভাত খেতেন। বিভিন্ন রকমের মাছ তার খুব প্রিয়। মাছ কিনতে পছন্দ করতেন। খেতে পছন্দ করতেন।
এই প্রসঙ্গে আরেক কিংবদন্তী সোহরাব হোসেনের কন্যা রাহাত আরা গীতি জানালেন, সুধীন কাকু আমার বাবার ছোটবেলার বন্ধু। একসঙ্গে প্রায় ষাট বছর তারা পাশাপাশি হেঁটেছেন। দুজনের মধ্যে গভীর বন্ধুত্ব! তারা আড্ডা দিতে ভালোবাসেন। দুষ্টুমি করতে ভালোবাসেন। দুজন একসঙ্গে হলেই নানা রঙ্গ-তামাশায় মেতে উঠতেন। তাদের সামনে সন্তানসম ছাত্রীরা থাকলেও তারা ভ্রƒক্ষেপ করতেন না। শ্লীল-অশ্লীল, শ্রাব্য-অশ্রাব্য নানা প্রসঙ্গ। হৃদয় মেলে তারা আড্ডা দিতেন।
আমারও অনেক সময় সৌভাগ্য হয়েছে- এই দুই কিংবদন্তীর আড্ডা উপভোগ করার। তারা দীর্ঘ ফেলে আসা জীবনের গল্প করতেন।
দুজনেই পায়জামা-পাঞ্জাবি পরতেন। পায়ের ওপর পা তুলে আসন। পিঁড়ি হয়ে বসে আড্ডা শুরু হতো তাদের। আড্ডা কাহাকে বলে?
এক পর্যায়ে সুধীন দাশ উত্তেজিত বাড়া সোহরাব, তুই কি কবর থেকে উইঠা কথা কইতাছস?
তখন সোহরাব হোসেন বললেন, তবে তুই যে চিতা থাইকা উইট্যা আইছস সেটা ১০০ ভাগ সত্যি। এ রকম কৌতুকময় প্রাণবন্ত আড্ডাবাজ ছিলেন তারা।
রাহাত আরা গীতি আরও জানালেন, অনেক সময় দুজনের মধ্যে তীব্র ঝগড়া হতো। কথা কাটাকাটি। তারপর তারা কিছুদিনের জন্য কথা বন্ধ রাখতেন। কিন্তু কথা বন্ধ থাকলেও বাসায় আসা-যাওয়া ঠিকই থাকতো। এ যুগে এমন মানুষ পাওয়া বিরল। নিজেকে উৎসর্গ করলেন শিল্পীদের জন্য।
আমি একজীবনে খুব বেশি মহান, উদার, প্রগতিশীল ব্যক্তির দেখা পাইনি। যারা যুগের চেয়ে অগ্রবর্তী, যারা সমাজ উন্নয়নের স্বপ্ন দেখেন, যারা নির্দিষ্ট একটি কাজ করেন নিষ্ঠার সঙ্গে- তাদেরই অন্যতম প্রতীক সুধীন দাশ।
শহীদ মিনার থেকে তার মরদেহ যাবে পোস্তগোলা শ্মশানে। ঢাকেশ্বরী মন্দিরে তার সৎকার্য হবে। সুধীন দাশের নশ্বর দেহ অবিনশ্বর স্মৃতিতে পরিণত হলো।
কবি রেজাউদ্দিন স্টালিন বললেন, তাদের হৃদয় ছিল বাংলাদেশ। তাই তারা হৃদয়ে বাংলাদেশ গ্রহণ করেছিলেন।
সুধীন দাশকে আর কোনোদিন চাক্ষুষ প্রত্যক্ষ করব না। তার সঙ্গে আর দেখা হবে না। ভাবতেই হৃদয় ভেঙে যায়। উদগত কান্না এসে চোখ ভিজিয়ে দেয়।
সেখানেই থাকুন, সুধীন দাশ আপনি ভালো থাকবেন। আমাদের সকলের স্মৃতিতে চিরভাস্বর হয়ে থাকবেন।

সাপ?তাহিক পতিবেদন

 মতামত সমূহ
পিছনে 
 আপনার মতামত লিখুন
English বাংলা
নাম:
ই-মেইল:
মন্তব্য :

Please enter the text shown in the image.