গোলটেবিল আলোচনা : মহাধমনীর ব্যবচ্ছেদ সচেতনতা দিবস-২০১৭

Print Friendly and PDF

সাপ্তাহিক-এর উদ্যোগে গত ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৭ মঙ্গলবার সকাল ১০টায় রাজধানীর ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতাল ও রিসার্চ ইনস্টিটিউটে ‘মহাধমনীর ব্যবচ্ছেদ সচেতনতা দিবস-২০১৭’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
গোলটেবিল আলোচনায় সঞ্চালকের দায়িত্ব পালন করেন মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর। আলোচনার শুরুতে দিবসটির বিষয়বস্তুর ওপরে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ডা. মো. ফাইজুস সাজ্জাদ। গোলটেবিল আলোচনার  সারসংক্ষেপ নিয়ে প্রকাশিত হলো ক্রোড়পত্রটি। গ্রন্থনা : সায়েম সাবু
 

সূচনা বক্তব্য
ডা. মো. ফাইজুস সাজ্জাদ
ন্যাশনাল পেট্রন, মহাধমনীর ব্যবচ্ছেদ সচেতনতা দিবস-২০১৭
এসোসিয়েট কনসালটেন্ট, কার্ডিয়াক সার্জারি ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতাল ও রিসার্চ ইনস্টিটিউট


মহাধমনী ব্যবচ্ছেদ সচেতনতা দিবস-২০১৭ আন্তর্জাতিক কমিটির অনুষ্ঠান উপলক্ষে গোলটেবিল আলোচনায় অংশগ্রহণের জন্য সবাইকে অভিনন্দন জানাচ্ছি। শুভেচ্ছা জানাচ্ছি আজকের এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার জন্য।
 মহাধমনী সচেতনতা দিবস এই ধারণাটি তৈরি হয়েছে ২০১৩ সালে সুইডিস একটি টিম কর্তৃক। বর্তমানে বিশ্বের ৪৫টি দেশে এক  সঙ্গে এ দিবসটি পালিত হচ্ছে।
গত তিন বছর যাবৎ ১৯ সেপ্টেম্বর দিবসটি পালন করা হয়। দিবসটির মূল উদ্দেশ্য হলো এই রোগে আক্রান্ত প্রতিটি রোগীকে খুঁজে বের করা এবং এই জটিল রোগ থেকে বাঁচতে সাধারণ মানুষকে করণীয় সম্পর্কে অবহিত করা।
আপনারা জানেন, হৃৎপি- থেকে যেসব রক্তনালি বের হয়ে আসে, এই রক্তনালিগুলোই সারা শরীরে রক্ত সরবরাহ করে থাকে। কোনো কারণে যদি হৃৎপি-ের রক্তনালিগুলো ছিঁড়ে যায়, তাহলে সেটাকে আমরা মহাধমনীর ব্যবচ্ছেদ বলে থাকি। একে একটি জটিল ও দুরারোগ্য রোগ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক গবেষণার তথ্য অনুসারে বাংলাদেশে প্রতি বছর কমপক্ষে ৫ হাজার মানুষ এ জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। পুরুষের তুলনায় নারীদের এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার মাত্রা হচ্ছে প্রায় দ্বিগুণ। আক্রান্ত  হওয়ার পর যদি সঠিক চিকিৎসা না পায় তাহলে প্রথম ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ৩৩ শতাংশ রোগীই মারা যায়। চিকিৎসা না পেলে ৫০ শতাংশ রোগী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে মারা যায়। আর প্রথম দুই সপ্তাহের মধ্যে মৃত্যুহার ৭৫ শতাংশ।
প্রতিটি রোগীর-ই কিছু সুনির্দিষ্ট ঝুঁকি থাকে। এই রোগের ঝুঁকি হচ্ছে উচ্চ রক্তচাপ, ষাটোর্ধ্ব বয়স, কোলাজেন ভাসকুলার ডিজিজ- যেমন মার্ফান সিনড্রম, দুর্ঘটনাজনিত বুকে আঘাত।
প্রশ্ন হচ্ছে, কীভাবে মানুষ এ রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। শতকরা ২৫ ভাগ রোগী বংশগত কারণে আক্রান্ত হয়ে থাকে। বিভিন্ন বংশগত জিন দ্বারা এই রোগ বাহিত হতে পারে। প্রতি  মিলিয়ন জনসংখ্যার মধ্য থেকে বছরে প্রায় ৩০ জন এ রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।
এই রোগের ক্ষেত্রে সময় খুবই মূল্যবান বিষয়। আক্রান্ত হওয়ার পরপরই উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন দেখা দেয়। সঠিক সময়ে যদি অপারেশনের মতো চিকিৎসা রোগীকে দেয়া যায়, তাহলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সফলতা পাওয়া যায়। উপযুক্ত অপারেশন হলে শতকরা ৯৮ ভাগ রোগীকেই ভালো করা সম্ভব।
আক্রান্ত রোগী বুকে তীব্র ব্যথা অনুভব করে থাকেন। শতকরা ৭৪ ভাগ থেকে ৯৫ ভাগ রোগীই বুকে ব্যথা অনুভব করেন এবং এ রোগের এটিই প্রধান লক্ষণ। ব্যথাহীন মহাধমনীর ব্যবচ্ছেদ সাধারণত দেখা যায় না। ব্যথার সঙ্গে অনেক সময় অজ্ঞান হয়ে যেতে পারেন, হার্ট অ্যাটাকও হতে পারে। অনেক সময় আমরা মনে করি বুকে ব্যথা হলেই হার্ট অ্যাটাক হয়েছে। কিন্তু মহাধমনীর কারণেও বুকে ব্যথা হতে পারে। মহাধমনীর ব্যবচ্ছেদের কারণে পিঠেও ব্যথা অনুভব হতে পারে।
সাধারণ ডায়াগনস্টিক টেস্টের মাধ্যমে এই রোগ শনাক্ত করা যায়। যেমন ইসিজি, এক্সরে, কার্ডিয়াক অ্যানজাইমস, সিটিস্ক্যান, এমআরআই জাতীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে আমরা সহজেই এ রোগ শনাক্ত করতে পারি।  বাংলাদেশের সর্বত্রই এখন এমন পরীক্ষা সম্পন্ন হয়ে থাকে। রোগ নির্ণয় হচ্ছে রোগ নিরাময়ের অন্যতম মাধ্যম।
এই রোগের অপারেশন অবশ্যই ঝুঁকিপূর্ণ কিন্তু এর ফলাফল ভালো। তবে মনে রাখতে হবে অপারেশনে এখনও রোগীর মৃত্যু হার শতকরা ১০ ভাগের কাছাকাছি। তবে এই ধরনের জটিল রোগের ব্যয়বহুল এবং ঝুঁকিপূর্ণ অপারেশনের চাইতে রোগ প্রতিরোধের ওপরেই অধিক গুরুত্ব দেয়া দরকার বলে মনে করি।
সুষ্ঠু জীবন ও এই রোগ প্রতিরোধের জন্য মূলত চারটি পরামর্শ আবশ্যক। ধূমপান এবং তামাক বর্জন করা, অতিরিক্ত ওজন নিয়ন্ত্রণ, উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ এবং শরীরচর্চাই পারে এই রোগের প্রতিরোধ করতে।


মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর
সঞ্চালক
‘আজ একটি ভালো দিন’।  এবারের মহাধমনী ব্যবচ্ছেদ দিবসের সেøাগান এটি। সাধারণত এই ধরনের সেøাগান চোখে পড়ে না।  সেøাগানটি অত্যন্ত সুন্দর বলে মনে করি এবং যিনি এই সেøাগানের উদ্ভাবন করেছেন তাকে অভিনন্দন জ্ঞাপন করছি।
মহাধমনীর ব্যবচ্ছেদ বিষয়ে এখনও অনেকের ধারণা পরিষ্কার নয় বলে আমরা অবগত।
আজকের এই গোলটেবিল আলোচনার মাধ্যমে মহাধমনীর ব্যবচ্ছেদ সম্পর্কে আমরা জানতে পারব বলে আশা করি। আলোচনায় ডা. মো. ফাইজুস সাজ্জাদ মহাধমনীর ব্যাপারে সম্মুখ ধারণা দিলেন। সংক্ষিপ্ত অথচ তার আলোচনায় রোগটি সম্পর্কে  মৌলিক ধারণা পাওয়া গেল।
আজকের আলোচনায় আমরা নিজেদের মতামত এবং প্রশ্ন-উত্তরের মাধ্যমে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হতে পারব বলে মনে করছি।

প্রফেসর এ কে আজাদ খান
সভাপতি, বাংলাদেশ ডায়াবেটিক এসোসিয়েশন
 ডা. সাজ্জাদ তার আলোচনায় যে বিষয়টি অধিক গুরুত্ব দিলেন, তা হচ্ছে বহুলাংশেই এই মহাধমনীর ব্যবচ্ছেদ রোগটি প্রতিরোধ করা যায় বলে মনে করি। তার মানে আগে থেকেই যদি আমরা সচেতন থাকতে পারি অর্থাৎ কী কী কারণে এই রোগ হতে পারে তার যদি ধারণা থাকে তাহলে অনেকটাই প্রতিরোধ করা সম্ভব।
যেমন, উচ্চ রক্তচাপের কারণে মহাধমনীর ব্যবচ্ছেদ ঘটতে পারে বলে আলোচনা করা হলো। তাহলে নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা করাই হচ্ছে এ রোগ সম্পর্কে সচেতনতার অন্যতম প্রকাশ। আমরা জানি অতিরিক্ত লবণ খাওয়ার কারণে সাধারণত উচ্চ রক্তচাপ আরও বেড়ে যায়। তাহলে লবণ খাওয়ার ক্ষেত্রে অবশ্যই সচেতন হতে হবে।
অতিরিক্ত ওজনের কারণেও এই রোগ হতে পারে। ওজন কমানোর নানা পদ্ধতিই এখন বিদ্যমান। ওজন নিয়ন্ত্রণে থাকলে শুধু মহাধমনীর ব্যবচ্ছেদ-ই নয়, অন্যান্য রোগকেও প্রতিরোধ করা সম্ভব। ওজন কমাতে পারলে ডায়াবেটিসও নিয়ন্ত্রণে থাকে।
আলোচনায় ধূমপানের প্রসঙ্গ এলো। আসলে ধূমপানে ক্ষতি ছাড়া কোনোই লাভ নেই। এর বহুবিদ ক্ষতি জীবনের সর্বনাশও ডেকে আনে। ধূমপান একেবারে নিষিদ্ধ করা দরকার। বিড়ি-সিগারেট থেকে সরকার বড় অঙ্কের ট্যাক্স পায় বলে অনেকে মনে করেন এবং এ কারণেই সিগারেটের ফ্যাক্টরির অনুমোদন দেয়া হয়। আসলে সরকার যে পরিমাণ ট্যাক্স পায় এই সেক্টর থেকে তার চেয়ে অধিক পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয় ধূমপানজনিত রোগের চিকিৎসায়। এটি একবারে হিসাব-নিকাশ থেকে প্রমাণিত। ধূমপানের মাত্রা বাড়ছে, বাড়ছে ধূমপানজনিত রোগের মাত্রাও। সুতরাং সচেতনতাই পারে ধূমপানের হাত থেকে মানুষকে রক্ষা করতে।
উদাহরণ দিয়ে একটি প্রসঙ্গ টানি। প্রজনন মৌসুমে ইলিশ ধরা নিষিদ্ধ করেছে সরকার। এই বিশেষ সময়ের জন্য ইলিশ মাছ ধরা জেলেদের জন্য বিশেষ সহায়তা বা ভর্তুকির ব্যবস্থাও করেছে সরকার। তাতে কিন্তু সবাই লাভবান হয়েছে। প্রচুর ইলিশ এখন ধরা পড়ছে। ঠিক তামাক চাষিদের ক্ষেত্রেও এমন বিশেষ ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে। তামাকের বিকল্প চাষে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করতে পারলে একজন ব্যক্তি মানুষও যেমন উপকৃত হবে, রাষ্ট্রও উপকৃত হবে।

প্রফেসর ডা. এম এ রশিদ
সিইও, ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতাল ও রিসার্চ ইনস্টিটিউট
আজকে এমন একটি রোগ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, যাকে নীরব ঘাতকও বলা যেতে পারে। এমন একটি বিষয় নিয়ে আজকে যারা এই আলোচনা সভার আয়োজন করেছেন, তাদের সবাইকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছি।
মহাধমনীর ব্যবচ্ছেদকে নীরব ঘাতক বললাম এই কারণে যে, এটি উচ্চ রক্তচাপ থেকেও হয়ে থাকে। অনেক সময় এই রোগের কোনো লক্ষণ প্রকাশ হয় না। হঠাৎ হাটঁ অ্যাটাক হয়ে যায়,  অথবা হঠাৎ স্ট্রোক  হয়ে যায়।  আর এটিই হচ্ছে এ রোগের লক্ষণ, যখন অনেক সময় আর কিছুই করার থাকে না।
এ কারণেই মহাধমনীর ব্যবচ্ছেদ রোগটি সম্পর্কে বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশে যারা সচেতনতা সৃষ্টি করছেন তাদের আমি সাধুবাদ জানাই। এর জন্য গর্ববোধ করছি।
প্রতিরোধেই রক্ষা। আমাদের মতো গরিব দেশে রোগ প্রতিরোধ করার মধ্য দিয়েই চিকিৎসা ব্যয় কমাতে হবে । মরণব্যাধি মহাধমনীর ব্যবচ্ছেদ থেকেও রক্ষা পেতে  প্রতিরোধের কোনো বিকল্প নেই। কী কারণে এই রোগ হতে পারে, সে ব্যাপারে সঠিক ধারণা থাকলে এই রোগ থেকে অনেকটাই রক্ষা পাওয়া যাবে বলে আমার বিশ্বাস।
উচ্চ রক্তচাপই এই রোগের প্রধান কারণ বলে গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে। রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে কী করণীয় তার জন্য দেশব্যাপী ক্যাম্পেইন করা যেতে পারে। ওজন নিয়ন্ত্রণ, ডায়াবেটিস কমানোর ব্যাপারে সচেতন করে তোলা উচিত। ধূমপান পরিহার করা সময়ের দাবি। সরকার বিড়ি-সিগারেট থেকে যে অর্থ ট্যাক্স পায় তার থেকে অনেক টাকা ধূমপানজনিত চিকিৎসায় ব্যয় বলে প্রফেসর এ কে আজাদ উল্লেখ করলেন। এটি প্রমাণিত। তাহলে কেন এই আত্মঘাতী নীতি থাকছে।
ইব্রাহিম কার্ডিয়াক এই রোগ সম্পর্কে সচেতন করার ক্ষেত্রে যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা সময়ের ব্যবধানে ব্যাপকতা পাবে বলে আমি বিশ্বাস করি। আমরা সবাই এই মহতী উদ্যোগের সঙ্গে থাকতে চাই। আমরা চাই সরকারও এই সচেতনতায় এগিয়ে আসুক। গণমাধ্যমও এ ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারে। সম্মিলিত চেষ্টায় মানুষকে সচেতন করে তুলতে পারলেই সবাই সুস্থ জীবনযাপন করতে পারব।

প্রফেসর সরোকিন ভিটালি
কনসালটেন্ট, কার্ডিয়াক সার্জারি
টিম লিডার, এওর্টিক সার্জারি, ন্যাশনাল  ইউনিভার্সিটি হাসপাতাল, সিঙ্গাপুর

অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় নিয়ে আজকের এ আলোচনায় সবাইকে স্বাগত। আজকের বিষয়বস্তু অর্থাৎ মহাধমনীর ব্যবচ্ছেদ সম্পর্কে সচেতন করে তোলার লক্ষ্য নিয়েই আজকের এই আলোচনা। ইতোমধ্যেই আলোচকরা এ রোগ প্রতিরোধে কী করণীয় সে ব্যাপারে আলোচনা করলেন। আমিও আলোচকদের সঙ্গে একমত পোষণ করছি। মহাধমনীর ব্যবচ্ছেদ খুবই জটিল একটি রোগ।
আমি সিঙ্গাপুরে এ রোগের চিকিৎসায় অংশ নিয়ে দেখেছি, সাধারণত উচ্চ রক্তচাপ থেকেই মহাধমনীর ব্যবচ্ছেদ ঘটে থাকে। উচ্চ রক্তচাপ কমাতে পারলে মহাধমনীর ব্যবচ্ছেদ অনেকাংশেই কমে যাবে বলে মনে করি। এর জন্য মানুষকে সচেতন করে তোলাই প্রধান কাজ। মানুষ এই রোগের কারণ এবং চিকিৎসার ব্যাপারে অবগত থাকলেই রক্ষা মিলবে।
তবে মনে রাখতে হবে সময় এক্ষেত্রে খুব গুরুত্বপূর্ণ। উপযুক্ত সময়ে যথশীঘ্র সম্ভব আমাদের এই জাতীয় রোগীর ডায়াগনোসিস করতে হবে। যেমন সিটিস্ক্যান একটি খুব গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা, যার মাধ্যমে আমরা সহজেই এই রোগ নির্ণয় করতে পারব। রোগ নির্ণয়ের সঙ্গে সঙ্গে রোগের চিকিৎসার ব্যাপারেও দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতালের মতো একটি বিশেষায়িত হাসপাতালে এই ধরনের রোগের অপারেশন সহজেই করা সম্ভব। কিছু উন্নততর প্রযুক্তি এ ক্ষেত্রে সহযোগী ভূমিকা পালন করে, যেমন ট্রান্সইােসফেজিয়াল ইকো।
আপনারা জানেন, আমরা এই রোগের জন্য বিভিন্ন ধরনের অপারেশন করতে পারি। যেমন, এওর্টিক রুট রিপ্লেসমেন্ট, বেন্টেল অপারেশন, ক্যাব্রল অপারেশন, এসেন্ডিং এওর্টিক রিপ্লেসমেন্ট, আর্চ রিপ্লেসমেন্ট, ফ্্েরাজেন এ্যালিফেন্ট ট্রাঙ্ক প্রসিডিউর ইত্যাদি। এই সব অপারেশনের পদ্ধতিগত জটিলতা থাকলেও জীবনরক্ষাকারী এসব অপারেশন খুব জরুরি। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এসব অপারেশনের ফলাফল ভালো। সচেতনতার পাশাপাশি এসব উন্নত অপারেশন আমাদের করতে হবে।

প্রফেসর ডা. মাসুম সিরাজ
বিভাগীয় প্রধান, কার্ডিয়াক সার্জারি বিভাগ, ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতাল ও রিসার্চ ইনস্টিটিউট
সবাইকে ধন্যবাদ এমন একটি আলোচনায় অংশ নেয়ার  জন্য। সাধারণত আমরা জানি এই রোগটি নীরবেই হয়ে থাকে এবং বিশেষ কোনো লক্ষণের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায়। হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের মধ্য দিয়ে মহাধমনীর ব্যবচ্ছেদ রোগটি প্রকাশ পেতে পারে। এবং এই প্রকাশ হচ্ছে একজন রোগীকে চূড়ান্ত পরিণতিতে ঠেলে দেয়।  
এই রোগে আক্রান্ত রোগীদের চিহ্নিত করা, চিকিৎসার আওতায় নিয়ে আসা বা ডায়াগনসিসের পর ভালো ফল পাওয়া আসলে জটিল ব্যাপার। কারণ এই রোগটিই জটিল। এই রোগের চিকিৎসার ক্ষেত্রে সময়ও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলে মনে করি। আসলে মহাধমনীর ব্যবচ্ছেদ ঘটলে রোগী খুব বেশি সময় আর পায় না বলেই ধরে নেয়া হয়।
 এ কারণে আমি কেউ এই রোগে আক্রান্ত হোক সেটা প্রত্যাশা করি না। অর্থাৎ আমি  বোঝাতে চাচ্ছি, এই রোগ যাতে না হয় সেই  ব্যবস্থা বা সচেনতার উপরেই জোর দেয়া হোক। কারণ রোগ চিহ্নিত হলেই যে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ভালো চিকিৎসা দিয়ে ইতিবাচক ফলাফল মিলবে সেটা মনে করার কারণ নেই। এর চিকিৎসা ব্যয়ও প্রচুর।
এ কারণেই মহাধমনীর ব্যবচ্ছেদ ঘটার আগেই প্রতিজন মানুষকে সচেতন হতে হয় এবং সচেতন মানুষরাই এ ব্যাপারে সঠিক ধারণা দিতে পারেন। এই রোগের কারণ হিসেবে যেসব ফ্যাক্টরের কথা বলা হয় তা যদি নিয়ন্ত্রণ করা যায় তাহলে, অন্যান্য মরণব্যাধি থেকেও রক্ষা  মেলে। যেমন উচ্চ রক্তচাপ কমাতে শরীরচর্চা আবশ্যক। আর নিয়মিত শরীরচর্চা করলে শত রোগ থেকে নিজেকে দূরে রাখা যায়।
এ কারণেই আমি রোগটি প্রতিরোধের ওপরেই অধিক গুরুত্ব আরোপ করব। এরপরেও এ রোগে আক্রান্তদের চিহ্নিত করে হাসপাতালে এনে যাতে সঠিক চিকিৎসা দেয়া যায় তারও ব্যবস্থা করতে হবে। অর্থাৎ এই রোগের চিকিৎসা ব্যবস্থাও উন্নত করা জরুরি বলে মনে করি।

ডা. প্রশান্ত কুমার চন্দ
সহযোগী অধ্যাপক, কার্ডিয়াক সার্জারি, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল ও রিসার্চ ইনস্টিটিউট
মহাধমনীর ব্যবচ্ছেদ নিয়ে আজকের আলোচনায় অংশ নিতে পারায় নিজেকে ধন্য মনে করছি। ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে সভায় অংশ নেয়া সবাইকে স্বাগত জানাচ্ছি।
মহাধমনীর ব্যবচ্ছেদ নিয়ে সচেতনার লক্ষ্যেই আজকের এই আলোচনা। আলোচনায় ইতোমধ্যেই নানা বিষয় উঠে এসেছে, যার মধ্যে সচেতনতাই মুখ্য। আমি মনে করি জনসাধারণকে সচেতন করার পাশাপাশি এই রোগের চিকিৎসকদের সচেতন হওয়াও গুরুত্ব বহন করে।
মহাধমনীর ব্যবচ্ছেদের প্রতিরোধ নিয়ে নানা আলোচনাই হলো। সাবধান হলে এ রোগ থেকে মানুষ অনেকটাই রেহাই পায়। যেমন বংশগত কারণে কারও এ রোগ হলে পরের প্রজন্ম হয়ত সাবধান হওয়ার সুযোগ পায়। কিন্তু যার এ রোগ হয়েছে, তার উপায় কী? এ কারণে সচেতনতার পাশাপাশি এর চিকিৎসার উন্নয়নে জোর দিতে হবে। ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতাল ও রিসার্চ ইনস্টিটিউটে ভাসকুলার সার্জারির জন্য স্বতস্ত্র ইউনিট হয়েছে। আমি মনে করি, মহাধমনীর ব্যবচ্ছেদ রোগের চিকিৎসা সেবার জন্য এরকম একটি স্বতন্ত্র ইউনিট করা সময়ের দাবি। বাংলাদেশে এই রোগের চিকিৎসা সম্ভব এবং এটি নিশ্চিত করতে পারাই হচ্ছে সার্থকতা।
ইব্রাহিম কার্ডিয়াক বা সরকারি হাসপাতালগুলো যদি এই রোগের চিকিৎসা উন্নয়নে এগিয়ে না আসে তাহলে মানুষ বিদেশ বা বেসরকারি হাসপাতাল নির্ভর হয়ে পড়বে। এতে সাধারণ মানুষ চিকিৎসা সেবার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে। আমি মনে করি, এই রোগের চিকিৎসকদেরও নিষ্ঠাবান এবং দায়িত্বশীল হতে হবে। কারণ এই রোগে আক্রান্ত রোগীরা পর্যাপ্ত সময় পান না। ঢাকার মতো যানজটের শহরে তো রোগীর বিপদ আরও বেড়ে যায়। এ কারণে চিকিৎসকদের সর্বদাই প্রস্তুত থাকতে হয়।
এ রোগের চিকিৎসা কোথায় হয়, কার কাছে গেলে ভালো চিকিৎসা মিলবে, ভালো পরীক্ষা মিলবে তাও জানেন না রোগীরা। যে কারণে অনেকেই ভুল জায়গায় গিয়ে হয়রানির শিকার হন। আমার অভিজ্ঞতায় এমন বহু রোগীকে হয়রানির শিকার হতে দেখেছি। সঠিক সময়ে হাসপাতালে পৌঁছাতে পারে না বলে অনেকেই মৃত্যুবরণ করেন।  কোথায় এর সেবা মিলবে এবং সেখানে যাওয়ার উপায় কী, সে ব্যাপারে পূর্ব ধারণা থাকলে রোগীরা উপকৃত হবেন।
আসলে শুরুটা করতে পারাই হচ্ছে প্রধান কাজ। শুরু করতে পারলে যে কোনো সেবারই ব্যাপকতা বাড়ে।
আশা করছি, সকলের সম্মিলিত প্রয়াসে আমরা উপকৃত হব।

ডা. মাসুদা মোহসেনা
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ
সহযোগী অধ্যাপক, কমিউনিটি মেডিসিন বিভাগ, ইব্রাহিম মেডিক্যাল কলেজ

মহাধমনীর ব্যবচ্ছেদ একটি জটিল রোগ এবং এর চিকিৎসাও জটিল বলে আজকের আলোচনায় উঠে এলো। এমন একটি আলোচনা সভায় বিজ্ঞজনের গুরুত্বপূর্ণ মতামতে দিবসটির সার্থকতা প্রকাশ পেল। যে কোনো রোগের ক্ষেত্রেই সচেতনতা অতিজরুরি। রোগ হওয়ার আগে যেমন সচেতন হতে হয়, তেমনি রোগ হওয়ার পরেও সচেতনতার দরকার পড়ে।
 দেশের সাধারণ মানুষ এখনও মহাধমনীর ব্যবচ্ছেদ বিষয়ে অবগত বা সচেতন বলে মনে করি না। কারণ এ ক্ষেত্রে শিক্ষা একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা সচেতন করে তোলার ক্ষেত্রে কতটুকু সহায়ক তা আগে ভাবতে হবে। এ কারণে আমি মনে করি এই রোগ এবং রোগে চিকিৎসা ব্যাপারে যারা অবগত তারাই সর্বপ্রথম সচেতন করে তোলার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারেন।
প্রযুক্তির ছোঁয়ায় তথ্য মুহূর্তে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে যাচ্ছে। মানুষের হাতে হাতে এখন মোবাইল। অনলাইনে মানুষ তথ্য পেতে বেশি আগ্রহ বোধ করছেন। এই বিষয়টি আমলে নিয়েই সচেতনতা বৃদ্ধি করা সম্ভব। মনে রাখতে হবে দুরারোগ্য বলতে আসলে আর কিছু নেই। সব রোগেরই চিকিৎসা মিলছে। হয়ত চিকিৎসা ব্যয়ের ব্যাপার থাকে। রোগের ব্যাপারে সঠিক ধারণা দিতে প্রযুাক্তির মাধ্যমে ক্যাম্পেইন করা সম্ভব। সামাজিক মাধ্যমগুলোও এ ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা যায়। যেটি অনেকেই করছেন।
অটিজম নিয়ে ব্যাপক প্রচার হচ্ছে, চিকিৎসা হচ্ছে। আসলে অটিজম রোগের মাত্রা খুব বেড়েছে এটি মনে করার কোনো কারণ নেই। মূলত ব্যাপকহারে চিকিৎসার আওতায় আনা হচ্ছে বলে অটিজম নিয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে। এভাবে চিকিৎসা সেবা মিললে মহাধমনীর ব্যবচ্ছেদ নিয়েও আলোচনা হবে।
সচেতনতার পাশাপাশি রোগীরা কোথায় গেলে চিকিৎসা পাবে, কোন পন্থায় চিকিৎসা কেন্দ্রে যেতে পারবে এ নিয়েও ক্যাম্পেইন করতে হবে। যারা এই রোগের সেবা দিয়ে থাকেন তাদেরই বেশি সচেতন হওয়া দরকার বলে মনে করি এবং সেটা মেডিকেলের নানা টার্ম ব্যবহার করেই সম্ভব।
সচেতনতার জন্য যেহেতু আলোচনা শুরু হয়েছে, সেহেতু অতি অল্প সময়ের মধ্যেই এর সার্থকতা মিলবে। মানুষ মহাধমনীর ব্যবচ্ছেদ নিয়ে সজাগ থাকুক এবং রোগ থেকে মুক্তি পাক এটিই প্রত্যাশা করি।

ডা. এসএমজি সাকলাইন রাসেল

সহকারী অধ্যাপক, ভাসকুলার সার্জারি, ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতাল ও রিসার্চ ইনস্টিটিউট
মহাধমনীর ব্যবচ্ছেদের ব্যাপারে যে মাত্রায় আলোচনা হওয়া দরকার আমরা এখনও তা করতে পারিনি। মানুষ এ রোগ সম্পর্কে ওয়াকিবহালও নন। হার্টের সমস্যা, কিডনির সমস্যা, ডায়াবেটিস ইত্যাদি রোগকে জনপ্রিয় রোগ বলা হয়। অর্থাৎ সচেতন করে তোলা হয়েছে বলেই এসব রোগ  সম্পর্কে আলোচনা মানুষের মুখে মুখে।
যে কোনো বিষয়-ই প্রচারে গণমাধ্যম অগ্রাধিক ভূমিকা পালন করে আসছে। এ ক্ষেত্রেও ঠিক সে ভূমিকা রাখতে পারে গণমাধ্যমসমূহ। সব চিকিৎসাই এখন সহজ হয়ে গেছে। ঠিক মহাধমনীর চিকিৎসাও প্রযুক্তির কারণে অধিক সহজ হয়েছে বলে মনে করি। রিং বসিয়েও এখন এই রোগের চিকিৎসা দেয়া সম্ভব হচ্ছে। তবে তা অধিক ব্যয়বহুল। শুধু জানতে পারা এবং জানাতে পারার ব্যাপার।
আর এই রোগের সফল চিকিৎসকরাই পারেন সঠিক তথ্য তুলে ধরতে। তথ্য মিললেই সচেতনতা মিলবে। গণমাধ্যমও এই সচেতনতার সারথি হতে পারে।

সমাপনী   
ডা. মো. ফাইজুস সাজ্জাদ
ন্যাশনাল পেট্রন, মহাধমনীর ব্যবচ্ছেদ সতেচনতা দিবস-২০১৭

ধন্যবাদ জানাচ্ছি আজকের সভায় প্রাণবন্ত আলোচনা রাখার জন্য। আমাদের দেশে যারা এই ধরনের চিকিৎসা নিচ্ছেন তাদের কোনো নিবন্ধন নেই। মূলত আমাদের দেশে ডাটা সিস্টেমের উন্নয়ন না হওয়ার কারণেই রোগীদের তালিকাভুক্ত করা সম্ভব হয়নি। সেটা হার্টের রোগীর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। জাতীয়ভাবে এই মুহূর্তে মহাধমনীর ব্যবচ্ছেদ রোগীদের কোনো তালিকা নেই।  
তবে আন্তর্জাতিক ডাটার দিকে তাকালে দেখা যায় বাংলাদেশের জন্য প্রতি বছর প্রায় ৫ হাজার করে মানুষ নতুন করে এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। যেটা আমাদের মতো বিপুলসংখ্যক মানুষের একটি দেশের জন্য বোঝা।
এ রোগের ক্ষেত্রে মনে করা হয় অপারেশনই একমাত্র পন্থা। ঠিক তা নয়। উপযুক্ত ওষুধেও এ রোগ ভালো হয়। এছাড়া স্ট্যান্টিংয়ের মাধ্যমেও এ রোগের চিকিৎসা মেলে।  
তথ্য-প্রযুক্তির মাধ্যমে এখন মহাধমনীর ব্যবচ্ছেদ সম্পর্কে নানা তথ্যই প্রচার পাচ্ছে। অনলাইনের বিভিন্ন সাইটে ইংরেজিতে এ ব্যাপারে ধারণা দেয়া আছে। সেখান থেকে আমরা চিকিৎসকরা হয়ত ধারণা নিতে পারব। কিন্তু সাধারণের জন্য এটি দুষ্কর।
আন্তর্জাতিক কমিটি ইতোমধ্যেই অনুরোধ করেছে যে, এই জটিল রোগ সম্পর্কে যাবতীয় তথ্য যেন বাংলায় লিপিবদ্ধ হয়, যাতে করে একজন সাধারণ মানুষও সম্মুখ ধারণা লাভ করতে পারেন। বাংলা ভাষার মাধ্যমে মহাধমনীর ব্যবচ্ছেদ বিষয়ে সকলের মাঝে পৌঁছে দেয়া এখন সময়ের দাবি বলে মনে করি।
আজকের আলোচনা থেকে আমরা মহাধমনীর ব্যবচ্ছেদ সম্পর্কে সম্মুখ ধারণা পেলাম। সুস্থ ও সুন্দর জীবনযাপনে সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। আজকের দুনিয়ায় কোনো রোগ-ই আর দুরারোগ্য নয় এবং আলোচকদের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আলোচনা থেকে তা বেরিয়ে আসল।
আশা করি, ভবিষ্যতে এই দেশে মহাধমনীর ব্যবচ্ছেদ সংক্রান্ত সচেতনতা বৃদ্ধি পাবে এবং আমাদের রোগীরা এর মাধ্যমে উপকৃত হবেন।

সাপ?তাহিক পতিবেদন

 মতামত সমূহ
পিছনে 
 আপনার মতামত লিখুন
English বাংলা
নাম:
ই-মেইল:
মন্তব্য :

Please enter the text shown in the image.