‘বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাত চলছে ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণ ও অনুশাসনে’-অধ্যাপক এম শামসুল আলম

Print Friendly and PDF

অধ্যাপক এম শামসুল আলম। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবস্থার খুঁটিনাটি সমস্যা থেকে শুরু করে বিরাটাকারের দুর্নীতি- সব অসঙ্গতির বিরুদ্ধেই ভোক্তা পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন ধরে সরব আছেন তিনি। জ্বালানি খাতের নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) জ্বালানি ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির শুনানিগুলোতে তিনি প্রচুর তথ্য, উপাত্ত ও যুক্তি নিয়ে হাজির হন। ফলে এ খাতে মূল্যবৃদ্ধির যে কোনো প্রক্রিয়ায় এখন গণস্বার্থের বিষয়টি বিবেচনায় নিতেই হয়। যা অধ্যাপক আলমকে ‘জনগণের জ্বালানি বিশেষজ্ঞ’ হিসেবে বেশ জনপ্রিয়তা এনে দিয়েছে।
বিইআরসিতে এখন চলছে পাইকারি বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির গণশুনানি। মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাবের আদৌ কোনো যৌক্তিকতা আছে কিনা, মূল্য বরং কীভাবে কমতে পারে এবং এ বিষয়ক আরও অনেক প্রশ্ন নিয়ে এবার আমরা এই জ্বালানি বিশেষজ্ঞের মুখোমুখি হয়েছি। দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে তিনি এ খাতে সরকারের দর্শন, মূল্য নির্ধারণের বিভিন্ন কারিগরি দিক ব্যাখ্যার পাশাপাশি সমাধানের পথও বাতলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আনিস রায়হান

সাপ্তাহিক : বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব এসেছে আবারও, চলছে গণশুনানি। আগের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে এবারের মূল্যবৃদ্ধির কোনো পার্থক্য রয়েছে কি?
অধ্যাপক এম শামসুল আলম : মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব আগেও এসেছে, এখনও আসছে। কিন্তু এক্ষেত্রে সরকারের আদর্শগত জায়গাটা বরাবরই যে এক রকম, তা নয়। আমাদের পর্যবেক্ষণ বলছে, এটিকে দুই পর্বে ভাগ করা যায়। সরকারের বর্তমান মেয়াদ ও গত মেয়াদÑ এই দুই পর্বে আমরা বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির পেছনে সরকারের আদর্শিক অবস্থানে পরিবর্তন ঘটতে দেখেছি। যেমন ধরুন, ২০০৯ সালে এলপিজির দাম কমানো হয়। বিশ্ববাজারে তেলের দরপতনের প্রেক্ষিতে সরকার দেশে তেলের দাম আশানুরূপ না হলেও কিছুটা কমায়। সাশ্রয়ী মূল্যে যে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে না, সরকার তার রূপরেখায় স্বীকার করে। সরকারের তখন পরিকল্পনা ছিল পিএসসি-২০০৮-এর আওতায় সাগর বক্ষের গ্যাসব্লক উন্নয়ন এবং ফুলবাড়ী থেকে কয়লা উত্তোলনের মাধ্যমে প্রাথমিক জ্বালানি হিসেবে কয়লা ও গ্যাসের জোগান নিশ্চিত করা। এর মাধ্যমে তখন সাশ্রয়ী মূল্যে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা করা হয়। সরকার তাৎক্ষণিক সংকট সমাধানের জন্য তেলবিদ্যুৎ উৎপাদনের পথে যায় এবং জানায় যে, এটা স্বল্পমেয়াদে চলবে। এর মধ্যে কয়লাবিদ্যুৎ আসবে এবং তখন তেলবিদ্যুৎ বন্ধ করা হবে। সরকারের পরিকল্পনার মূলে তখন কয়লাই ছিল। পার্টিসিপেটরি পার্সপেক্টিভ প্লানে ২০৩০ সাল পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে অবিরাম গতিতে কয়লা খাত উন্নয়ন এবং কয়লাবিদ্যুৎ উৎপাদন ও সম্প্রসারণের কথা বলা আছে। এসব পরিকল্পনা কতখানি সঠিক ও জনস্বার্থসম্মত ছিল, সেটি ভিন্ন আলাপ। ঘটনা হলো, পরিকল্পনা করলেও কয়লা ও গ্যাসের সংস্থান করতে সরকার পারেনি। আমি বলতে চাইছি যে, নানা কারণে সরকারের ওই পরিকল্পনাগুলো ব্যর্থ হলেও এটা পরিষ্কার যে, ২০০৯-২০১৩ মেয়াদের সরকার সাশ্রয়ী মূল্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং বিদ্যুতের দাম কম রাখার বিষয়ে আগ্রহী ছিল। ২০১৪ সাল নাগাদ জ্বালানি তেলের দাম কমিয়ে আনার ঘোষণাও তখনকার সরকার দিয়েছিল।
কিন্তু বর্তমান মেয়াদের সরকারের নীতি ঠিক সে-রকম নয়। ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর আমদানি ব্যয় হ্রাস অত্যধিক হওয়া সত্ত্বেও তারা আগের মেয়াদের ঘোষণা অনুযায়ী জ্বালানি তেলের দাম কমানোর পথে যায়নি। এর মধ্যে এই খাতে ধীরে ধীরে মাথাচাড়া দিয়ে উঠল ব্যক্তি খাত ব্যবসায়ীরা। এই খাতে তাদের প্রসার, প্রভাব ও আধিপত্য বিস্তার লাভ করল। ২০১৪ সালের আগে এই খাতে ব্যক্তি খাত ব্যবসায়ীদের প্রসার ঘটলেও তখনও তারা ততটা প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। কিন্তু ২০১৪ সালের পর দেখা গেল কেবল প্রভাবই নয়, এই খাতে ব্যক্তি খাত ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা পেল। রেন্টাল, কুইক রেন্টাল প্লান্ট বিদায় নেয়ার কথা থাকলেও এই ব্যবসায়ীদের আগ্রহেই তা টিকে গেল। সরকারের পক্ষ থেকে রেন্টালের পক্ষে যে যুক্তি দেখানো হয় যে, চাহিদামাফিক বিদ্যুৎ না পাওয়ায় এগুলোর মেয়াদ বাড়াতে হচ্ছেÑ তা সঠিক নয়। মূলত ব্যবসা বজায় রাখার স্বার্থেই এগুলোর মেয়াদ বেড়েছে। আরও দেখা গেল যে, তেলের দাম কমানো হয়েছে, কিন্তু জনগণ তার সুবিধা পায়নি। পুরো সুবিধাটি গেল ব্যবসায়ীদের পকেটে। আবাসিক গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি, এলপিজির বাজার সম্প্রসারণের ক্ষেত্রেও দেখা গেল, ব্যবসায়ীদের স্বার্থই প্রাধান্যে। পরিস্থিতি এখন এমন জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে যে, এই ব্যবয়ায়ীদের বাদ দিয়ে চাহিদামাফিক বিকল্প পদ্ধতিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা আর সরকারের নেই। কারণ এখন বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাত চলছে ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণ ও অনুশাসনে।
উদাহরণস্বরূপ সাম্প্রতিক একটি উদ্যোগের কথা উল্লেখ করা যায়। এই যে ২৮০০ থেকে ৩৪০০ মেগাওয়াট তরল জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের সিদ্ধান্ত জরুরি ভিত্তিতে নেয়া হলো, এতে বড়জোর ৫০০ কোটি ইউনিট বাড়তি বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে। অথচ বর্তমানে সরকারের যে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা রয়েছে, তরল জ্বালানির অভাব বা কম ব্যবহারের কারণে তার একটা অংশ ব্যবহার হচ্ছে না। জ্বালানি সংস্থান করা গেলে সরকারের বিদ্যমান উৎপাদন ক্ষমতা ব্যবহার করেই ওই পরিমাণ বাড়তি বিদ্যুৎ পাওয়া সম্ভব। ভাবা যায়, বিকল্প জ্বালানি সংস্থান- এই সহজ পথে না গিয়ে তরল জ্বালানিভিত্তিক নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পথে হাঁটছে সরকার! খুব পরিষ্কার যে, বিদ্যুৎ ব্যবসায়ীরাই এটি করাচ্ছে। সরকারের মধ্যেকার নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে থাকা কোনো কোনো অসহায় কর্মকর্তাকে আমি বলতে শুনেছি, এই সিদ্ধান্ত নিতে সরকারকে বাধ্য করা হয়েছে। ব্যক্তি খাতের বিদ্যুৎ ব্যবসায়ীদের ষড়যন্ত্রেই হঠাৎ করে বিদ্যুৎ সংকট প্রকট হয় এবং লোডশেডিং বেড়ে যায়।
সরকারের দুই মেয়াদের মধ্যেকার এই গুণগত পার্থক্যটিতে আমাদের নজর দিতে হবে। প্রথম মেয়াদে সরকারই ব্যবসায়ীদের জড়ো করেছে। নিজের পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করিয়েছে। আর বর্তমান মেয়াদে ব্যবসায়ীরাই সরকারকে দিয়ে কাজ করাচ্ছে, নিজেদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করিয়ে নিচ্ছে। আগের সরকার ব্যবসায়ীদের কামলা হিসেবে নিয়োগ দিলেও, বর্তমান সরকার নিজেই ব্যবসায়ীদের কামলায় পরিণত হয়েছে। যে কারণে আগের সরকারের তুলনায় বর্তমান সরকারের পদক্ষেপগুলো বেশি জনস্বার্থের বিরুদ্ধে যাচ্ছে। আর ঠিক এজন্যই দাম বৃদ্ধির বিষয়টি মানুষের উপকারে আসবে নাকি অপকার হবে, তা বিবেচিত হচ্ছে না বরং যারা এখানে ব্যবসা করবে তাদের লাভ হচ্ছে কিনা, পাশাপাশি সরকারের কতটুকু আয় বাড়ছে এটাই হিসাব করা হচ্ছে বেশি। এ-সব ক্ষেত্রে আবার সরকারের মধ্যে যারা ব্যক্তিগতভাবে কাজ করছে তাদের কমিশন বৃদ্ধি, ঘুষ বৃদ্ধির বিষয়টিও আছে। সরকার ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে লেনদেন যত বাড়ে, যত বিচিত্র রকমের কাজকর্ম সৃষ্টি হয়, সরকারি কর্মকর্তাদের বাড়তি আয়ের সুযোগও তত বেড়ে যায়। ব্যবসায়ীদের ১০ টাকা লাভের ব্যবস্থা হবে, এমন একটি পরিকল্পনা গৃহীত হলে তা থেকে তারা এক টাকা কমিশন পেতে পারে। এ কারণে ব্যক্তি খাতে টাকা যাওয়ার ব্যাপারে সরকারি কর্মকর্তাদের উৎসাহ অনেক বেশি থাকে। ব্যক্তি খাতকে কাজ দেয়ার দুটো প্রক্রিয়া আছে। তাদের মালিকানায় দিয়ে দেয়া অথবা তাদের নিয়োগ দিয়ে কাজ করিয়ে নেয়া। দুই ক্ষেত্রেই সরকারের নিয়ন্ত্রণ বজায় না থাকলে সেখানে কেবল টাকাই লেনদেন হয়, কাজের কাজ কিছু হয় না। কিন্তু এখন আমরা দেখছি সরকারের কর্তৃত্ব নষ্ট করে, সরকারকে পঙ্গু ও অকার্যকর করে ব্যক্তি খাতের সঙ্গে কর্মকাণ্ড চালানো হচ্ছে। মোটকথা, বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতে এখন আর নীতি ও ন্যায্যতা বলে কিছু নেই। এই খাতের সিদ্ধান্ত ও গতি-প্রকৃতি সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের স্বার্থে তাদের দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে।
সাপ্তাহিক : কীভাবে ব্যক্তি খাত উদ্যোক্তারা এই খাত থেকে লাভবান হচ্ছে, যদি আরও খোলাসা করতেন?
অধ্যাপক এম শামসুল আলম : এই ব্যবসায়ীরা যদি কয়লা আমদানি করে বা গ্যাস আমদানি করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করত, সরকার তার অনুমতি দিত। তাতে বেশি মূল্যের বিদ্যুতের চাপ জনগণের কাঁধে কম পড়ত। তা না করে তারা বেশি ব্যয়ের ডিজেল ও ফার্নেসঅয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথেই হাঁটছে। এটিকে বৈধতা দিতে তারা আগে থেকেই একটি কৌশলী পথ অনুসরণ করে আসছে। দেখা যাচ্ছে, সরকারের তরল জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুতের চেয়ে ব্যক্তি খাতের তরল জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুতের দাম অনেক কম। কারণ সরকারি খাত বিপিসি থেকে বেশি দামে তেল কেনে, প্রক্রিয়াগত কারণে বিপিসি’র আমদানিকৃত তেলের দাম এমনিতেই একটু বেশি। আবার দরপতন সমন্বয় না হওয়া সে-দাম আরো বেশি।  বিদ্যুৎ উৎপাদনে কোনো কোনো ব্যক্তি খাত নিজেরাই তেল আমদানি করে, দরপতন সমন্বয় হওয়ায় সে তেলের দাম অনেক কম পড়ে। তাই সরকারের তরল জ্বালানিভিত্তিক যে বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা রয়েছে, তা অব্যবহৃত রেখে ব্যক্তি খাত   বিদ্যুৎ কেনা হচ্ছে বেশি। অর্থাৎ কম দামি বিদ্যুৎ বেশি কেনা হচ্ছে।  এই অজুহাত দেখিয়ে ব্যক্তি খাত থেকে তরল জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ বেশি বেশি কেনা হচ্ছে। তরল জ্বালানিভিত্তিক নতুন নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন হচ্ছে। যদিও এ-সব বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিদ্যুৎ বিদ্যুতের মূল্যহার আরো বেশি বাড়াবে। ব্যক্তি খাত ব্যবসায়ীদের নানা ধরনের কারসাজির দামও সে-মূল্য বৃদ্ধিতে যোগ হবে এবং মূল্যবৃদ্ধির গতি বাড়াবে। জনগণের ওপর চাপ বাড়বে। অথচ এর সহজ সমাধান ছিল, ব্যক্তি খাতের মতো সরকারি খাত বিদ্যুৎ উৎপাদনেও জ্বালানি তেলে দরপতন সমন্বয় সুবিধা দেওয়া। তাহলেই নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্রের আর প্রয়োজন হতো না, জনগণের ব্যয়ও কম হতো।
ভারতীয় রিলায়েন্স কোম্পানি এলএনজি দিয়ে মেঘনাঘাটে ৭৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে। চট্টগ্রামের এলএনজি টার্মিনাল থেকে গ্যাস এ-বিদ্যুৎকেন্দ্রে আনা হবে। অযাচিত প্রস্তাব, অর্থাৎ আনসলিসিটেড প্রোপোজালের ভিত্তিতে তারা এই বিদ্যুৎকেন্দ্র করছে। নির্মাণ ব্যয় অস্বাভাবিক বেশি। এই বিদ্যুতের মূল্যহার নির্ধারণ কিন্তু বিইআরসি’র ওপর নির্ভর করবে না। বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তিতে বিদ্যুৎ ক্রয় মূল্যহার উল্লেখ থাকবে। সে মূল্যহার ন্যায্য ও যৌক্তিক না হওয়ায় স্বাভাবিক। এসব ক্ষেত্রে কমিশন এজেন্টরা ব্যক্তি খাত বিনিয়োগকে অসম চুক্তির সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়। লেনদেন হয়। এখানে জনস্বার্থ রক্ষার কোনো সুযোগ নেই।
বিদ্যুৎ খাত নিয়ে এই যে ব্যবসা হচ্ছে, এখানেও লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বলে কিছু নেই। এই খাতের ব্যবসায়ীদের মধ্যে নির্দিষ্ট কয়েকজনই বিশেষ সুবিধাগুলো ভোগ করছে। অন্যদের বাজার থেকে বিতাড়িত করে গোষ্ঠী বা ব্যক্তিবিশেষদের হাতে পুরো খাতকে তুলে দেয়া হচ্ছে। এভাবে সবাইকে জিম্মি করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, এখন এটা সময়ের ব্যাপার মাত্র। এটা হয়ে যাওয়ার অর্থ হলো, চালের বাজারের মতো বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দামও তারা সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ করবে।
সাপ্তাহিক : মূল্যবৃদ্ধির বর্তমান প্রস্তাবের পেছনের যুক্তিগুলো কী?
অধ্যাপক এম শামসুল আলম : প্রথমেই বলে নেয়া দরকার, আইন অনুযায়ী ভোক্তা পর্যায়ে বিদ্যুৎ বিক্রি করার পর ঘাটতি তৈরি হলে কেবল তখনই বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি ঘটবে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি হলেও বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি হতে পার। ২০১৪ সালের গণশুনানির ভিত্তিতে এর পরের বছর মূল্যবৃদ্ধির যে আদেশ হয়েছিল, তখন এই খাতে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা ঘটতির হিসাব দেখানো হয়। এখানে ফাঁকি ছিল। বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমলেও দেশে তখন সরকার তেলের দাম কমায়নি। ওই বাড়তি তেলের দামেই বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় নির্ধারণ হয়। সেই উৎপাদন ব্যয়হার সমন্বয়ের জন্যই তখন বিদ্যুতের মূল্য বাড়ানোর প্রস্তাব আসে। অথচ তেলের মূল্যহার সমন্বয় হলে দেখা যেত ঘাটতি নয়, উদ্বৃত্ত থাকে। অর্থাৎ ৫ হাজার কোটি টাকার ওই ঘাটতি ছিল কৃত্রিমভাবে তৈরি করা। তাই সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সংশয় ছিল যে, এই কৃত্রিম ঘাটতি পুরোটার দায় জনগণের কাঁধে চাপানো যাবে কিনা। যে কারণে ৯০ দিনের মধ্যে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির আদেশ দেওয়া আইনি বাধ্যবাধকতা থাকা সত্ত্বেও তা কার্যকর হয়নি। ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে এসে মূল্যবৃদ্ধির আদেশ কার্যকর করা হয়। সে সময় দেখা গেল, ৪ হাজার ৩০০ কোটি টাকা সরকার নিজের হাতে রেখে দিল- অর্থাৎ ভর্তুকি দিল। ভোক্তা পর্যায়ে ৩ শতাংশ দাম বাড়িয়ে বাকি ৭২৫ কোটি টাকার দায় জনগণের কাঁধে দেয়া হলো। মূল্যবৃদ্ধির অভ্যাসটা একপ্রকার চর্চায় রাখার মতো।
এবারের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাবে দেখা যাচ্ছে, ঘাটতি ৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। সরকার এখন এই ঘাটতির পুরোটাই ভোক্তাদের কাঁধে চাপাতে চায়। ৭২ পয়সা মূল্যহার বৃদ্ধির প্রস্তাবের এটাই প্রধান ও প্রথম কারণ। আগে যেখানে ঘাটতির সামান্য অংশ ভোক্তাদের ওপর দেয়া হয়েছিল, এখন সেখানে পুরোটাই তাদের ওপর চাপানো হচ্ছে। এই খাতটিতে যদিও বরাবরই সরকার ভর্তুকি দিয়ে আসছে। কারণ সরকারের লক্ষ্য হলো দারিদ্র্য বিমোচনে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির অভিঘাত থেকে প্রান্তিক জনগণ ও খাদ্য নিরাপত্তাকে সুরক্ষা দেওয়া। বিদ্যুতের দাম কম হলে কৃষি ও প্রান্তিক জনগণের বিদ্যুৎ ব্যবহার বাড়ে। খাদ্য উৎপাদন ও জনগণের জীবনযাত্রার মান বাড়ে। ফলে তাদের ও দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি হয়। তাছাড়া রাজনৈতিক কারণও রয়েছে। তাই সব সরকারই এ খাতে ভর্তুকির বিধান চালু রেখেছে। মূল্যবৃদ্ধির অভিঘাত থেকে  জনগণকে কিছুটা হলেও সুরক্ষা দিয়েছে।
কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, সরকার এই খাতকে রাজস্ব আহরণের  খাত হিসেবে ব্যবহার করতে চায়। এ কারণে সরকার এখন থেকে আর যে ভর্তুকি দেবে না শুধু তা নয়, ইতিপূর্বে এই খাতে দেয়া ভর্তুকির অর্থকে সরকার ঋণ হিসেবে শ্রেণিভুক্ত করেছে। সেই ঋণের টাকা এখনই শোধ না চাইলেও সুদ চাইছে তারা। এবারের মূল্যবৃদ্ধির ক্ষেত্রে এটি দ্বিতীয় কারণ। ভর্তুকি দিয়েছিল ৪ হাজার ৩০০ কোটি টাকা, এর সুদ হিসেবে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতে ২১ পয়সা দাম বাড়ানোর প্রস্তাব এসেছে। তৃতীয়ত, বিদ্যুৎ উন্নয়ন তহবিল বাবদ ২৬ পয়সা রাজস্ব চাহিদা আকারে দাবি করা হয়েছে। মেঘনাঘাট আইপিপিতে যদিও ফার্নেসঅয়েল বা গ্যাস দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কথা, কিন্তু ডিজেলে উৎপাদন করে তারা ব্যয় বাড়িয়েছে। এর ফলে সৃষ্ট ঘাটতি বাবদ দাবি করা হয়েছে ১৪ পয়সা। আবার পাইকারি বিদ্যুতের মূল্যহারে ৫ পয়সা ঘাটতি দেখানো হয়েছে। এভাবে প্রতি ইউনিট পাইকারি বিদ্যুতে মোট ৭২ পয়সা মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব এসেছে।
সাপ্তাহিক : এসব যুক্তি কতখানি গ্রহণযোগ্য?
অধ্যাপক এম শামসুল আলম : প্রথমত, ৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকা ঘাটতি আছে বলা হচ্ছে। জ্বালানির দরপতন মূল্যহারে সমন্বয় করলে কিন্তু এই ঘাটতি আর থাকে না। অর্থাৎ সরকার চাইলে কোনো ভর্তুকি না দিয়েও দাম বাড়ানো থেকে বিরত থাকতে পারে। কেবল জ্বালানির মূল্য সমন্বয় করলেই সেটি সম্ভব।
দ্বিতীয়ত বিদ্যুৎ উন্নয়ন তহবিলের ২৬ পয়সার সঙ্গে সরকারের আয়-ব্যয়ের কোনো সম্পর্ক নেই। এটা তার আয় নয়, ব্যয়ও নয়। বিদ্যুতের মূল্য যেহেতু ঘাটতি সমন্বয়ের জন্য বাড়ে, সেহেতু এটাকে ঘাটতির মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়া এবং এজন্য দাম বৃদ্ধি করাটা কোনোভাবেই যুক্তিসঙ্গত নয়।
তৃতীয়ত, সরকার যেভাবে ভর্তুকিকে ঋণে রূপান্তর করল, এটাও অন্যায় এবং অযৌক্তিক। আমরা তো নতুন করে আর কোনো ভর্তুকি নিচ্ছি না, তাহলে পুরনো ভর্তুকি কেন ঋণ হবে? কেন সেজন্য সুদ বাবদ ২১ পয়সা গুণতে হবে। সরকারের যাতে নতুন করে ভর্তুকি দেয়া না লাগে, সেজন্য আমরা বিদ্যুৎ রক্ষণাবেক্ষণ তহবিলে বিদ্যুৎ বিলের সঙ্গে প্রতি একক বিদ্যুতে বাড়তি ২৬ পয়সা দিচ্ছি। আর যদি নতুন করেও সরকার ভর্তুকি দেয়, তাতেও তো সুদ হতে পারে না। কারণ তা তো ভর্তুকি।
চতুর্থত, ১৩২ কেভি লেভেলে বিদ্যুৎ বিক্রিতে মুনাফা হয় প্রতি ইউনিটে ৮ পয়সা। আবার পাওয়ার ফ্যাক্টর কারেকশন চার্জ বাবদ অর্থ আদায় হয় প্রতি ইউনিটে ৪ পয়সা। এ-সব হিসাবে আসেনি। হিসাবে আসলে ব্যয়হার ১২ পয়সা কমে যায়।
এসব বিষয় আমলে নিয়ে আমরা সুষ্ঠু বিশ্লেষণ ও হিসাব করে দেখিয়েছি যে, প্রতি ইউনিট বিদ্যুতে ৬ পয়সা করে উদ্বৃত্ত আছে। তাই বিদ্যুতের দাম ১ পয়সা বাড়ানোও কোনোক্রমেই যৌক্তিক নয় বরং শুনানি হওয়া উচিত বিদ্যুতের দাম কমানোর জন্য।
সাপ্তাহিক : সাশ্রয়ী মূল্যে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কথা বলছিলেন...
অধ্যাপক এম শামসুল আলম : সব পরিকল্পনায়ই এটা বলা আছে, কম দামের জ্বালানিই বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাবে। সব সময়ই মেরিট অব অর্ডার অনুসরণ করতে হবে। অর্থাৎ বিদ্যুৎ যখন কম দরকার, তখন সবচেয়ে কম খরচের কেন্দ্রগুলো চলবে। যখন আরেকটু বেশি দরকার, কিন্তু এত কম খরচের বিদ্যুৎকেন্দ্র আর নেই, তখন আরেকটু বেশি খরচের কেন্দ্র চালু হবে। এভাবে যখন বিদ্যুতের চাহিদা সর্বোচ্চ অর্থাৎ পিক-আওয়ার, তখন সবচেয়ে বেশি খরচের কেন্দ্রগুলো চালু হবে। এগুলো ওই অল্প সময়টুকুতেই বিদ্যুৎ দেবে এবং পিক ডিমান্ড কমার সঙ্গে সঙ্গেই আবার বন্ধ হয়ে যাবে।
২০১৫ সালে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রাক্কালে বিইআরসি আদেশ ছিল যে, স্বল্পতম ব্যয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণ, সেজন্য পরিকল্পনা প্রণয়ন ও ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। বিইআরসির আদেশ না মানা একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ, সংশ্লিষ্ট আইনের এটি স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে। কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, বেশি খরচে বিদ্যুৎ উৎপাদন বেশি করা হয়েছে এবং সে ব্যয় সরাসরি অন্তর্ভুক্ত করে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। একদিকে আদেশ অমান্য করা হয়েছে, সাশ্রয়ী মূল্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়নি। সেজন্য তো সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের জরিমানা হওয়ার কথা। অথচ তারা আসছে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর আবেদন নিয়ে।
কয়লা বিদ্যুতের কথা সব সময়ই বলা হচ্ছে। ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা, সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা, পার্টিসিপেটরি পার্সপেক্টিভ প্লান, মাস্টার প্লান, সর্বত্রই কয়লা বিদ্যুতের কথা আছে। কিন্তু বড়পুকুরিয়ার নির্মাণাধীন ১২৫ মেগাওয়াট কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে এখনও গ্রিডে কোনো বিদ্যুৎ আসেনি।
এক সময় বিইআরসি’র সুপারিশ ছিল যে, রেন্টালের মেয়াদ আর বৃদ্ধি না করা। তখন বিজিএমইএ, এফবিসিসিআই, ডিসিসিআই, এমসিসিআই, কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন এবং বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড সবাই সম্মত হয়েছিল যে, রেন্টালের মেয়াদ বৃদ্ধি করা যাবে না। কিন্তু তা কার্যকর হয়নি, পরে ২০২১ সাল পর্যন্ত রেন্টালের মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়। বিদ্যুৎ খাতের ব্যবসায়ীদের চাহিদাতেই যে, এই মেয়াদ বৃদ্ধি হয়েছে, তা নির্দ্বিধায় বলা যায়।
সরকারি খাতের গ্যাসচালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো উৎপাদন ক্ষমতার ৪৩ শতাংশ ব্যবহার হয়। এতে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে তাদের ব্যয় হয় ২ টাকা ২ পয়সা। রেন্টাল, কুইক রেন্টালে তা ৭১ শতাংশের বেশি। প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে তাদের ব্যয় হয় ৩ টাকা ৩৭ পয়সা। সরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো যদি রেন্টালের মতো উৎপাদন ক্ষমতার ৭১ শতাংশ ব্যবহার করত, তাহলে প্রতি ইউনিটে তাদের ব্যয় হতো ১ টাকা ৫৫ পয়সা। অর্থাৎ ১ টাকা ৫৫ পয়সায় যে বিদ্যুৎ পাওয়া সম্ভব, তা সরকার ৩ টাকা ৩৭ পয়সায় কিনছে। এতে বছরে প্রায় ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ক্ষতি হয়। যাদের সিদ্ধান্তের কারণে আমরা এই ক্ষতির শিকার হচ্ছি তারা কেন এর দায় বহন করবে না, তা আমার বুঝে কিছুতেই আসে না।
সাপ্তাহিক : বিদ্যুতের মূল্য কমানোর দাবির যৌক্তিকতা যদি ব্যাখ্যা করতেন...
অধ্যাপক এম শামসুল আলম : জ্বালানি তেলের মূল্যহার সমন্বয় করা হলে অনেক টাকা বেঁচে যায়। ডিজেলের আমদানি ব্যয় হ্রাস-সমন্বয় করা হলে প্রতি ইউনিট ডিজেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে ৬ টাকা উদ্বৃত্ত থাকবে। মোট হিসাব করলে কেবল ডিজেলভিত্তিক বিদ্যুৎ থেকেই প্রায় ২ হাজার ১০০ কোটি টাকা সাশ্রয় করা সম্ভব। এই মূল্যহার সমন্বয় সুবিধা পাওয়া তো আমাদের অধিকার। সরকার তো উদ্বৃত্ত অর্থ রেখে দিতে পারে না, এটা অন্যায়। একদিকে উদ্বৃত্ত অর্থ রেখে দেয়া হচ্ছে, অন্যদিকে সেই উদ্বৃত্তের মূল্য শোধ করার জন্য আবার ব্যয় বাড়ানো হচ্ছে, বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি করা হচ্ছে। এটা কোনোক্রমেই যুক্তিযুক্ত হতে পারে না।
রেন্টাল-কুইক রেন্টাল প্রথম যে মেয়াদে এসেছিল, ধরা যাক তিন বছর, সেই তিন বছরে তার কাছ থেকে সরকার যে মূল্যহারে বিদ্যুৎ কিনেছে, তার মধ্যেই ওই কেন্দ্র স্থাপনের ব্যয় রয়েছে। এরপর মেয়াদ বাড়ানোর সময় তাদের আর জ্বালানি খরচের বাইরে অজ্বালানি ব্যয় আগের মতো থাকার কথা নয়। কিন্তু দেখা যায়, দ্বিতীয় বা তৃতীয় মেয়াদের রেন্টাল-কুইক রেন্টালের অজ্বালানি ব্যয় সরকারি খাতের বিদ্যুৎ কেন্দ্রের অজ্বালানি ব্যয়ের চেয়ে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ বেশি। যৌক্তিক হারে মূল্য নির্ধারণ হলে এখান থেকে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা সাশ্রয় করা সম্ভব।
মেরিট অব অর্ডার অনুযায়ী, কম দামের বিদ্যুৎ বেশি কিনব, আর বেশি দামের বিদ্যুৎ কম কিনব। ডিজেল বিদ্যুতের দাম সবচেয়ে বেশি। সরকারি খাতের উৎপাদন ক্ষমতা ১৪ শতাংশ ব্যবহার হয়। নজোপাডিকো’র উৎপাদন ক্ষমতা ৩০ শতাংশ ব্যবহার করে বেশি ডিজেল বিদ্যুৎ কেনায় সেখানে প্রায় ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে। এখানে কম উৎপাদন করা গেলে সাশ্রয় হতো। মেঘনাঘাটে ফার্নেস অয়েল ব্যবহার করা যেত। ৪০ শতাংশ উৎপাদন ক্ষমতা ব্যবহার করে ডিজেল বিদ্যুৎ উৎপাদন করে সেখানে প্রায় ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। এখানে ফার্নেস অয়েল বা গ্যাসে উৎপাদন করা গেলে সাশ্রয় হতো।
সব হিসাব মিলিয়ে দেখা যায়, পাইকারি বিদ্যুতের বিদ্যমান মূল্যহারেই ভোক্তাদের কাছ থেকে প্রায় ৬ হাজার ৬৬০ কোটি টাকা ভোক্তার কাছ থেকে অতিরিক্ত আদায় করা হচ্ছে। আমরা বলতে চাই যে, এই টাকাটা আমাদের বিদ্যুৎ ব্যয় থেকে কমিয়ে দিতে হবে। প্রতি ইউনিটে এটা প্রায় ১ টাকা ২৬ পয়সা। অর্থাৎ জ্বালানির মূল্যহার সমন্বয়, রেন্টাল থেকে যৌক্তিক মূল্যহারে বিদ্যুৎ ক্রয় এবং মেরিট অব অর্ডারের নীতিতে সাশ্রয়ী মূল্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন হলে বর্তমানে বিদ্যুতের মূল্য তো বাড়ানো লাগবেই না বরং প্রতি ইউনিট পাইকারি বিদ্যুতের দাম ১ টাকা ২৬ পয়সা করে কমানো সম্ভব।
সাপ্তাহিক : পাইকারি বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির পরই তো খুচরা মূল্য সমন্বয়ের প্রস্তাব আসে?
অধ্যাপক এম শামসুল আলম : সঞ্চালন খাত ও বিতরণ খাতই হলো খুচরা বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির কারণ। সঞ্চালন মার্জিন তথা হুইলিং চার্জ হিসেবে আগে তারা প্রায় ২৩ পয়সা পেত, এখন পায় ২৭ পয়সা। অথচ তখন ঘাটতি ছিল খুবই কম, শূন্য দশমিক সাত ভাগের মতো। সঞ্চালন ক্ষমতার তুলনায় বিদ্যুৎ সরবরাহ কম থাকায় এটা ঘটেছিল। যা কিনা দ্রুতই ঠিক হয়ে যাওয়ার কথা। অথচ তখন সে চার্জ প্রায় ২১ শতাংশ ঘটে। বিইআরসির কারগরি কমিটি বলেছিল, এ চার্জ না বাড়ালেও চলবে। তবে প্রভাবে এটা বেড়ে গেল। সঞ্চালন ব্যয় এই যে ২১ শতাংশ বাড়ানো হলো, এতে কিছুদিন বাদে দেখা গেল, তাদের বাড়তি মুনাফা হচ্ছে। সঞ্চালন কোম্পানি মুনাফায় আছে, সুতরাং এটা ব্যক্তি খাতে ছেড়ে দেয়ার আলাপ শুরু হয়ে যায়। শেয়ার বিক্রির কাজ আগেই শুরু হয়েছে। এখন সঞ্চালন কোম্পানি ভেঙে ব্যক্তি খাত কোম্পানি বানানো হবে। এভাবে জোর করে দাম বাড়িয়ে যে মুনাফা করা হলো, তা জনগণের না হয়ে ব্যক্তিবিশেষের হয়। অর্থাৎ যখন লস বা ক্ষতি হচ্ছে, তখন সেটা দেখিয়ে মূল্য বাড়ানো হয় অর্থাৎ জনগণের কাঁধে তা চাপিয়ে দেয়া হয়। স্বাভাবিকভাবে মুনাফা হলে মূল্যহার কমে যাওয়ার কথা থাকলেও তা ঘটে না, সেটা চলে যায় ব্যবসায়ীদের পকেটে। সঞ্চালনের ক্ষেত্রে এটাই দেখা যাচ্ছে।
আর বিতরণের ক্ষেত্রে অনেকগুলো ঘটনা ঘটছে। ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছানো এবং সেচ ব্যবস্থায় কম দামে বিদ্যুৎ দেয়াটাই নীতি। পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি) এই কাজটি করে। গ্রামে তারা যে বিদ্যুৎ দেয়, সেখানে বিদ্যুতের ব্যবহার কম। এই কম ইউনিটের বিদ্যুৎ বা লাইফ লাইন ট্যারিফ এবং সেচের বিদ্যুতের দাম কম, প্রতি ইউনিট গড়ে ৩ টাকা ৮০ পয়সা। আরইবির মোট বিদ্যুতের প্রায় ২০ ভাগ বিক্রি হয় এখানে। যদিও প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের মোট ব্যয় প্রায় ৬ টাকা ৬৫ পয়সা। এই যে ঘাটতি এটা ভাগ হয়ে যায়। বড় পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলো বেশি আয় করে, তারা ছোটগুলোকে দেয় ক্রস সাবসিডি হিসেবে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা। আর মূল্যহার সমন্বয়ের মাধ্যমে আরইবির বাইরে থেকে বাল্ক বিদ্যুতে অন্যান্য লাভে থাকা কোম্পনির কাছ আসে প্রায় ১৬০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ গড় দামের চেয়ে ডেসা, ডেসকো, পিডিবির ভোক্তারা পাইকারি বিদ্যুতে যে বাড়তি মূল্য শোধ করে, তা সমন্বয় করা হয়। এভাবে অভ্যন্তরীণভাবে আরইবি পাচ্ছে ২ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। এটাও কিন্তু দিচ্ছে ভোক্তারাই। অথচ এই যে ব্যয়, এর দায় কিন্তু সরকারের। পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলো তো সরকার সম্প্রসারণ করছে। কারিগরি দিক থেকে ও আর্থিকভাবে যেখানে সমিতি সম্প্রসারণ করা উপযোগী নয়, সেখানেও সম্প্রসারণ করা হয়। নানা পদক্ষেপের মাধ্যমে আয়ের চেয়ে ব্যয় বাড়ে। এটা তো সরকারের নীতির ব্যাপার। কৌশলের ব্যাপার। এই টাকার জোগান কে দেবে? এর একটাই উত্তর, “সরকার।” এর জন্য সরকার অনুদান দেবে। এর দায় ভোক্তার ওপর চাপানো উচিত না হলেও ভোক্তার ওপরই চাপানো হচ্ছে। অথচ সরকার  কোন কিছুরই দায় নেবে না।  কিন্তু সরকার মুনাফা নেবে, উদ্বৃত্ত নিজের দখলে নেবে, শেয়ার বিক্রি করে ভোক্তার অর্থ ব্যক্তিকে দেবে এবং ঘাটতিজনিত ব্যয়বৃদ্ধির কর্মসূচি বাস্তবায়ন করবে। এ-সব কারণে যে সব ঘাটতি তা ভোক্তাকে বহন করতে হবে।  এ কেমন কথা!
বিতরণ কোম্পানিগুলোর অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রেও সংকট আছে। বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির ক্ষেত্রে তাদের জনবল ব্যয় বৃদ্ধি অন্যতম উপাদান। জনবলের বেতন বৃদ্ধিও তার একটি কারণ। আমরা বলেছি যে, জনবল নিয়োগ ও তাদের বেতন বৃদ্ধির বিষয়টিও বিইআরসির এখতিয়ারে রাখতে হবে। কারণ মূল্যহার বৃদ্ধির কারণ সঠিক কিনা এটা দেখার দায়িত্ব বিইআরসির। পিবিএসগুলো ২০১৪ সালে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি করে ব্যয় ৩০ কোটি টাকা বাড়ায়। সেজন্য বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির দাবি করে। সেটা ব্যয় বৃদ্ধি গণশুনানিতে গৃহীত হলেও পরবর্তীতে কোনো উন্নয়ন বা জনবল ব্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাব বিইআরসি’র পূর্বানুমতি নেয়া বাধ্যতামূলক বলা হয়েছিল। কিন্তু তার ব্যত্যয় ঘটেছে। পূর্বানুমোদন ছাড়াই তারা বেতন-ভাতাদি বৃদ্ধি বাবদ জনবল ব্যয় ২০০ কোটি টাকা বাড়িয়ে এনেছে। বিষয় আটকাতে বলা হয়েছে। রিভিউ হতে হবে।
সাপ্তাহিক : বেসরকারি কোম্পানিগুলোর মতো সরকারি কোম্পানিগুলোও কি একই আচরণ করছে?
অধ্যাপক এম শামসুল আলম : অনিয়ম সবক্ষেত্রেই হচ্ছে। এই দুর্নীতি বা অনিয়ম বন্ধ করা গেলে বিদ্যুৎ খাতে ব্যয় বৃদ্ধির প্রবণতা অনেক কমে আবে। সরকারি কোম্পানির শেয়ার বিক্রিতে অনিয়ম হচ্ছে। ৪ হাজার কোটি টাকার সম্পদ মূল্য ৪০০ কোটি টাকা ধরে শেয়ার বিক্রি হয়। কারণ সরকারি কর্মকর্তারা শেয়ার কেনার সুযোগ নেয় এবং এর দ্বারা তারা লাভবান হয়। এই শেয়ার ব্যবসা বন্ধের দাবি করেছি আমরা। বলা হয়েছে, সমস্ত শেয়ারের মালিক হবে পিডিবি। পিডিবির আয় বাড়লে, তার লাভের অর্থ সমন্বয় হয়ে বিদ্যুতের মূল্যহার কমায়। এতে জনগণের ব্যয়ের বোঝা কিছুটা কমবে। এখন লাভের অংশ ব্যক্তি খাতে দিয়ে ক্ষতির অংশটা দেয়া হচ্ছে জনগণের কাঁধে।
উন্নয়ন ব্যয় বাড়াচ্ছে। ডিপিডিসি মাটির ওপর থেকে বিদ্যুৎ সিস্টেম মাটির নিচে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছে। তাদের বলা হয়েছে, যদি বিতরণ ব্যয়হার বাড়ে, তাহলে তা করা যাবে না। তারা কিন্তু ব্যয় বাড়া বা কমার হিসাব থেকে এ পরিকল্পনা গ্রহণ করেনি। এটা তারা করেছে নিজেদের লাভালাভের হিসাব থেকে। আমরা আপত্তি তুলে বলেছি যে, কেবল বিদ্যুৎ কেনাবেচার মধ্যেই তাদের সীমাবদ্ধ থাকতে হবে।
আরইবি ১৩২ কেভির গ্রাহক চায়। তাতে সে ৭.৩৫ টাকা ইউনিট দামে বিদ্যুৎ বিক্রি করতে পারবে। এভাবে তার লাভ হবে। তাদের থামানো হয়েছে। বলা হয়েছে, প্রয়োজনীয় ভর্তুকি দেয়া হচ্ছে, আপনারা সেবা দিন। লাভ করা আপনাদের কাজ নয়।
বিদ্যুৎ নেই, কিন্তু সম্পদ ব্যয় বাড়ানো হচ্ছে- এটা আমরা আগেও দেখেছি। আরইবিতে তার বিতরণ ক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিদ্যুৎ প্রবাহ বৃদ্ধি হচ্ছে না। ফলে অবচয় হার বৃদ্ধি অস্বাভাবিক। আবার উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে, কিন্তু বিদ্যুৎ সেই অনুপাতে পাওয়া যাচ্ছে না। যে পরিমাণ বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য যে পরিমাণ বিতরণ ক্ষমতা দরকার, সেই তুলনায় বিতরণ ক্ষমতা বেশি বেড়ে গেছে। এ কারণে সম্পদের বিপরীতে তাদের অবচয় ব্যয়হার বেশি হচ্ছে। ফলে এ অবচয় ব্যয় আংশিক সমন্বয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। এমন অবস্থা সব বিতরণ কোম্পানির ক্ষেত্রে কম-বেশি প্রযোজ্য।
সাপ্তাহিক : বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির ন্যায্যতা-অন্যায্যতার দেখভাল করে যে বিইআরসি, তারা কি নিজেদের কাজগুলো ঠিকঠাক করছে?
অধ্যাপক এম শামসুল আলম : দামবৃদ্ধির ক্ষেত্রে তেলের মূল্য নির্ধারণের ক্ষমতা বিইআরসির। কিন্তু সেই ক্ষমতা অবৈধভাবে দখলে নিয়ে সরকার নিজেই তেলের মূল্যবৃদ্ধি করে। এমনভাবে তেলের মূল্যবৃদ্ধি হলো যে, বিদ্যুতের দাম না বাড়িয়ে উপায় রইল না। এই মূল্যবৃদ্ধি তো কখনই যৌক্তিক হতে পারে না, আইনসিদ্ধ হতে পারে না। তেলের মূল্য যৌক্তিক হলে বিদ্যুতের মূল্য কমে যায় বা আর বাড়ানোর দরকার হয় না। অথচ তেলের মূল্য এমনভাবে নির্ধারণ করা হলো, যাতে আবারও ভোক্তাদের কাছ থেকে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির নামে অর্থ আদায় করা যায়। এরকম কাজে বিইআরসিকে ব্যবহার করা হলে তার আর গ্রহণযোগ্যতা বলে কিছু থাকে না। সরকারকে যদি সে না মানাতে পারে, তাহলে জনগণকে আদেশ দেয়ার ক্ষমতা সে কীভাবে রাখে? বর্তমানে বিইআরসি এই ঝুঁকির মধ্যে আছে। এবারের রায় দিতে গিয়ে তারা মহাসংকটে পড়বে। তবে বিইআরসির সুফল জনগণ কিছুটা হলেও পাচ্ছে। অন্য সব খাতে তো কোনো বাধাই নেই। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে কমিশনের আয়োজিত এই গণশুনানি ইচ্ছেমতো মূল্যবৃদ্ধির ক্ষেত্রে একটা প্রতিবন্ধক। এটা থাকার ফলে খানিকটা বাধা পাচ্ছে, নইলে এই খাতে মূল্যবৃদ্ধি আরও চরম রূপ ধারণ করত।
বিইআরসি যদি সুষ্ঠুভাবে চলে, তার আইন সঠিকভাবে প্রয়োগ করে, তাহলে কারিগরি কমিটি, ভোক্তারা, মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাবকরা- আমরা সকলেই আরও সক্ষম হবো। এই খাতে জবাবদিহিতা ও জনস্বার্থ সুরক্ষার কৌশলগুলো বাস্তবায়ন সম্ভব হবে। এখন তো আমাদের মধ্যে কোনো প্রতিযোগিতা নেই। সবাই মনে করে যে, সরকার যে মূল্যসীমা নির্ধারণ করে দিচ্ছে, তার মধ্যেই কিছু একটা ঘটবে। ফলে কেউই নিজ যুক্তি প্রমাণের দায় অনুভব করছে না। কারও প্রস্তুতিই যথেষ্ট মানসম্মত হচ্ছে না।
আমি মনে করি, বিইআরসি প্রশ্নে আমাদের সংবেদনশীল হওয়া উচিত। কারণ অসুস্থ হলে আমরা এক হাসপাতাল রেখে অন্য হাসপাতালে যেতে পারি, শিক্ষার জন্য আমরা এক প্রতিষ্ঠান থেকে আরেক প্রতিষ্ঠানে যেতে পারি, কিন্তু বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতে ভোক্তার স্বার্থ নিশ্চিত ও অধিকার সুরক্ষিত করতে  চাইলে আমাদের হাতে বিইআরসি’র কোনো বিকল্প নেই। ফলে এই প্রতিষ্ঠানটি দুর্বল হয়ে যায়, এমন কিছু ঘটতে দেয়া যায় না। আমরা বরাবরই জনস্বার্থের প্রেক্ষিত থেকে কমিশনকে চাপে রাখার পক্ষপাতি। এই কমিশনের আইনটি এমনভাবে করা হয়েছিল যে, এখানে মূল্য পরিবর্তনের গণশুনানি হতে হবে। আমাদের দীর্ঘ প্রচেষ্টার ফলে এখন মূল্য কমানোর শুনানি প্রস্তাব প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আমলযোগ্য হলো। এটি এক পা এগিয়ে যাওয়া বা একটি অগ্রগতি। অনেক দেশে এ ধরনের কমিশনে বিচারক পর্যায়ে ভোক্তাদের পক্ষ থেকে সদস্য নেয়া হয়। হয়তো এক সময় এখানেও আমরা সেটা দেখতে পাব। তাহলে হয়তো জনস্বার্থের প্রশ্নগুলো আরও বেশি মনোযোগ পাবে। যেহেতু এই প্রতিষ্ঠানের বাইরে গিয়ে আমরা এ বিষয়ে কার্যকর কোনো ভূমিকা রাখতে পারছি না, তাই এটিকে এগিয়ে নেয়া, ভোক্তাদের প্রয়োজন মতো গড়ে নেয়ার জন্য চেষ্টা ভোক্তাদেরই চালিয়ে যেতে হবে।

সাপ?তাহিক পতিবেদন

 মতামত সমূহ
পিছনে 
 আপনার মতামত লিখুন
English বাংলা
নাম:
ই-মেইল:
মন্তব্য :

Please enter the text shown in the image.