রোহিঙ্গা সংকট : স্থায়ী সমস্যায় বাংলাদেশ -শুভ কিবরিয়া

Print Friendly and PDF

নিরাপত্তা পরিষদের সর্বশেষ আনুষ্ঠানিক বৈঠকে রোহিঙ্গা ইস্যুতে কোনো সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা মেলেনি বরং চীন ও রাশিয়ার অবস্থান পরিষ্কার হয়েছে। কোনো রাখঢাক না করে রাশিয়া ও চীন মিয়ানমারকে সমর্থন করেছে। অন্যদিকে আমেরিকা, ব্রিটেন, ফ্রান্স এই ইস্যুতে শক্ত অবস্থান নিলেও সমস্যা সমাধানে মিয়ানমারের ওপর চাপ তৈরি করে এ রকম কোনো দৃঢ় প্রস্তাব ঘোষণা করেনি জাতিসংঘ।
অর্থাৎ কূটনৈতিকভাবে এই সমস্যা সমাধানের দীর্ঘমেয়াদি ইস্যু জিইয়ে থাকল। এই আলোচনায় কারও কারও পরামর্শ হচ্ছে সমস্যাটি দ্বিপক্ষীয়ভাবে আলোচনার মাধ্যমে সুরাহা করা হোক। বোঝা যায় মিয়ানমার তাদের এ গণহত্যা কার্যক্রমে ভারত, চীন ও রাশিয়াকে নিশ্চিতভাবেই পাশে পাচ্ছে। মিয়ানমারের কূটনীতি এই ক্ষেত্রে সফল। যদিও বিশ্বব্যাপী রোহিঙ্গা ইস্যুতে নিন্দিত হচ্ছে মিয়ানমার ।
ভারত, চীন ও রাশিয়ার এই মিয়ানমারমুখো একমাত্রিক নীতি পরিবর্তনে বাংলাদেশ এখনো কোনো বড় ধরনের কূটনৈতিক সাফল্য পায় নাই। অনেকের অভিযোগ রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের বিপক্ষে অবস্থান নেয়া এই তিন দেশের মত পরিবর্তন করাতে বাংলাদেশ এখনো তেমন কোনো বড় কূটনৈতিক উদ্যোগও গ্রহণ করে নাই। এসব আলোচনা-সমালোচনা যখন চলছে তখন নতুন করে মিয়ানমার থেকে নির্যাতিত হাজার হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে ঢুকছে। মিয়ানমার সেনাবাহিনী তাদের রোহিঙ্গা নিধন কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছে। বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের মিয়ানমার অংশে সে দেশের সেনাবাহিনী স্থলমাইন পুঁতে রাখার কার্যক্রমও চালিয়ে যাচ্ছে।

০২.
এ অবস্থায় বাংলাদেশের জন্য দুর্ভাবনা হচ্ছে, লাখ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী বা অনুপ্রবেশকারীর দায় দীর্ঘদিন বাংলাদেশের বহন করার সম্ভাবনা উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হচ্ছে। কেন এমন মনে হচ্ছে সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগে দেখা যাক নিরাপত্তা পরিষদের সর্বশেষ বৈঠকে মোড়ল দেশগুলোর অভিব্যক্তি কী রোহিঙ্গা ইস্যুতে।

এক. নিরাপত্তা পরিষদে বক্তব্য রাখা রাশিয়ার প্রতিনিধি ভাসিলি এ নেবেনজিয়ার কথার মূল সুর দুটো। প্রথমত, আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি বেসামরিক লোকজনকে হত্যার অপরাধে অপরাধী। দ্বিতীয়ত, কোনো কিছুকে গণহত্যা এবং জাতিগত নিধন হিসেবে আখ্যায়িত করার আগে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অবশ্যই সাবধান হতে হবে।
দুই. এই বৈঠকে চীনের প্রতিনিধি উ হাইতাও মন্তব্য করেন, রাখাইনের পরিস্থিতি এখন ক্রমেই স্থিতিশীলতার দিকে যাচ্ছে। তার মতে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে আলোচনায় সহযোগিতা করতে হবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এবং মিয়ানমার সরকারকে যে অসুবিধা ও চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করতে হচ্ছে, তা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অবশ্যই বস্তুনিষ্ঠতার সঙ্গে দেখতে হবে।
তিন. জাপানের প্রতিনিধি মানবিক সাহায্যের কথা বললেও জাতিগত নিধন কিংবা গণহত্যার বিষয়ে কোনো কথা বলেন নাই। তাদের এই অবস্থান মিয়ানমারের পক্ষেই যায়।
রাশিয়া, চীন ও জাপানের এই অবস্থানের বিপরীতে নিরাপত্তা পরিষদের ১৫ সদস্যের অন্যান্য দেশ আমেরিকা, ব্রিটেন, ফ্রান্স, সেনেগাল, সুইডেন, ইতালি, ইউক্রেন, বলিভিয়া, ইথিওপিয়া, মিসরসহ জাতিসংঘের মহাসচিবও কঠোর অবস্থান নেন এই জাতিগত নিধন ও গণহত্যার বিরুদ্ধে।
এতদসত্ত্বেও বলা যায় এখানে এমন কোনো সমন্বিত প্রস্তাব আসেনি যেটা মিয়ানমারের সেনাবাহিনীকে এই গণহত্যা থামাতে বা বন্ধ করতে বাধ্য করবে।
চার. সব পক্ষই কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় মিয়ানমারের ভেতরে শান্তিরক্ষী বাহিনী পাঠানো বা মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রস্তাব আসেনি। যদিও দাবি উঠেছে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাকে সেখানে যেতে দিতে হবে। এই দাবির প্রতি মিয়ানমার সেনাবাহিনী আদৌ কর্ণপাত করবে কি না, না করলে তাদের বাধ্য করা যাবে কি না, সেই পথ আবিষ্কৃত হয়নি নিরাপত্তা পরিষদের এই বৈঠকে। বলা যায় মিয়ানমার সেনাবাহিনীর জন্য একটা স্বস্তিদায়ক পরিবেশই এনেছে নিরাপত্তা পরিষদের সর্বশেষ এই বৈঠক।

০৩.
বোঝা যাচ্ছে রোহিঙ্গাদের জাতিগত নিধন এবং তাদের গণহত্যা শুরুর আগে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী যথেষ্ট হোমওয়ার্ক করে মাঠে নেমেছে। তারা এটা নিশ্চিত করেছে দেশের ভেতর অং সান সূচি যেনো কোনোভাবেই এই ঘটনায় ভিন্নতর কোনো ভূমিকা না নেয়। তারা এই অঞ্চলের শক্তিমান ভারতকে খুবই সক্রিয় বন্ধু হিসেবে পাশে নিয়েছে। মিয়ানমারের কূটনীতি এক্ষেত্রে যথেষ্ট তৎপর থেকেছে। ভারত শুধু মিয়ানমারের সকল মানবতাবিরোধী কাজে সহায়তাই দেয় নাই, এই ঘটনার পর বাংলাদেশ যেনো বড় ধরনের কূটনৈতিক প্রতিবাদ চালু করতে না পারে সেই চাপও অভ্যন্তরীণ এবং কূটনৈতিকভাবে বহাল রেখেছে। অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থে ভারতের সরকার এক্ষেত্রে বাংলাদেশ-ভারত চলমান উন্নতর সম্পর্কের অবনতির ঝুঁকি নিয়ে হলেও মিয়ানমারের পাশে থাকতে চেয়েছে ভারত। চীন ও রাশিয়ার ক্ষেত্রেও মিয়ানমার তার সফল কূটনীতি চালু রাখতে সমর্থ হয়েছে। পশ্চিমা দেশগুলোর চাপের পরও যাতে কোনো অবরোধ চালু না হয় বা শান্তিরক্ষী বাহিনী মিয়ানমারে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়া না হয় সে ব্যাপারে চীন, রাশিয়ার সমর্থন অক্ষুণœ রাখার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে মিয়ানমার।
অবস্থাদৃষ্টে এটা এখন দিবালোকের মতোই স্পষ্ট যে, মিয়ানমার এই গণহত্যার ব্লুপ্রিন্ট তৈরির সময় সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবিলার সব উপায় ভেবে রেখেছে এবং চীন, রাশিয়া ও ভারত যাতে তাদের পাশে থাকে সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করেছে।

০৪.
এখন তাহলে বাংলাদেশ কী করতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য শরণার্থী সংকট দীর্ঘায়িত হলে তা মোকাবিলার উপায়ই বা কী?
এই শরণার্থী সংকট নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করলে সেটাই বা বাংলাদেশ মোকাবিলা করবে কী উপায়ে।
আর এই বিপুলসংখ্যক শরণার্থীকে মর্যাদা ও নিরাপত্তা সহকারে নিজ দেশ মিয়ানমারে ফেরত পাঠাবেই বা কী করে?
এসব প্রশ্নের খুব চটজলদি কোনো জবাব নেই। কেননা, বাধ্য হয়েই বাংলাদেশকে এই বিপুলসংখ্যক শরণার্থীকে জায়গা দিতে হয়েছে। এই বিপুলসংখ্যক মানুষের আশ্রয়, বাসস্থান, খাদ্য, চিকিৎসা, মানবিক ন্যূনতম মর্যাদার ব্যবস্থা করাই এখন বাংলাদেশের জন্য জরুরি কাজ। এর জন্য সম্পদ সংগ্রহ, সম্পদ বিতরণের নেটওয়ার্ক তৈরির কার্যাদিকেই বাংলাদেশ প্রাধিকার দিচ্ছে। দ্বিতীয়ত, এই রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে যে আন্তর্জাতিক বহুবিধ বহুমাত্রিক স্বার্থভিত্তিক প্রচেষ্টা চলছে তার মধ্য থেকে বাংলাদেশের স্বার্থ অক্ষুণœ রেখে সঠিক পথটি বাতলে নেবার চ্যালেঞ্জটিই এখন প্রধান।
বাংলাদেশকে তাই অনেক বিষয়ের দিকে নজর দিতে হবে।
এক. বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক-সামাজিক বিভাজন যেন প্রতিপক্ষকে বাড়তি সুবিধে না দেয় সেদিকে নজর দিতে হবে। রোহিঙ্গা ইস্যু এতটাই জ্বলন্ত ইস্যু, যেটা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিভাজনকে উসকে দিলে তা দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ ক্ষুণœ করতে পারে। আন্তর্জাতিক এবং আঞ্চলিক খেলোয়াড়রা এই বিভাজনের সুযোগ নিয়ে বড় বিপদের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। সরকার এবং অপরাপর রাজনৈতিক পক্ষকে তাই সতর্ক থাকতে হবে।
দুই. মিয়ানমার কূটনৈতিকভাবে এখনও সুবিধাজনকভাবে এগিয়ে আছে রাশিয়া-চীন-ভারত-জাপান এই শক্তিমান দেশগুলোর সমর্থনে। মিয়ানমার চাইবে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার কথা বলে এই সংকটকে দীর্ঘায়িত করতে। দ্বিপক্ষীয় আলোচনার জন্য মিয়ানমারের একজন মন্ত্রী বাংলাদেশ সফরে এসে সেই পথ চালু করছে। এটা মিয়ানমারের একটি কৌশলও বটে। এই আলোচনা চালু রেখেই জাতিসংঘকে এর সঙ্গে সম্পৃক্ত করা দরকার। শুধু দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় এই সংকট সমাধানের স্তর বহু আগেই পেরিয়ে গেছে।
তিন. বাংলাদেশের কূটনীতিকে আরও সোচ্চার করতে হবে। এই ঘটনাকে মিয়ানমারের শাসকগোষ্ঠীর উদ্যোগে নেয়া গণহত্যা হিসেবে প্রচারণা তীব্র করতে হবে। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে গণহত্যার জন্য মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর বিচারের দাবিতে আরও সোচ্চার হতে হবে। রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেবার দাবির সঙ্গে গণহত্যার বিচারের দাবিটিও জোরদার চালাতে হবে।
চার. চীন, রাশিয়া, ভারত, জাপান- মিয়ানমারের প্রতি সহানুভূতিসম্পন্ন দেশগুলোর মনোভাব পরিবর্তনে সরকার টু সরকার তো বটেই এসব দেশের সরকারকে প্রভাবিত করতে পারে এরকম মিডিয়া, সিভিল সোসাইটির সঙ্গেও পারস্পরিক আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে।
পাঁচ. মিয়ানমার যে এক্ষেত্রে দোষী এবং তার অন্যায্য কাজের চাপ যে এই অঞ্চলের নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে, সন্ত্রাসবাদকে উসকে দিতে পারে সেই কথাটাও আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলতে হবে বড় করে।

০৫.
সংকটটা তৈরি করেছে মিয়ানমার। এতে তার বড় কোনো স্বার্থজাত পরিকল্পনা আছে। রোহিঙ্গা মুসলমানদের জাতিগত নিধন করে এবং গণহত্যা চালিয়ে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী হীন কিছু অর্জন করতে চায়। তার এই মানবতাবিরোধী কাজে সমর্থন জুগিয়ে যাচ্ছে চীন-রাশিয়া এবং ভারত। চীন-রাশিয়া-ভারতের স্বার্থ সামরিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক। কিন্তু বিপদে পড়েছে বাংলাদেশ। মিয়ানমারের তৈরি গণহত্যার চাপ পড়ছে বাংলাদেশের ওপর। মিয়ানমারের তৈরি সংকট বাংলাদেশকে ফেলছে স্থায়ী বিপদে। রোহিঙ্গা শরণার্থী ফেরত প্রশ্নে বাংলাদেশ পড়ে যাচ্ছে এক স্থায়ী সমস্যায়।
বিশ্ব সমাজ এই সমস্যার সমাধানের পথ বাতলাতে পারছে না। একদল হৈ চৈ করছে। একদল মিয়ানমারকেই সমর্থন করছে। মাঝখান থেকে বাংলাদেশ জ্বলেছে এক অনতিক্রম্য সরকার। যদিও এই রোহিঙ্গা সংকটে তার দায় নেই বিন্দুমাত্রও।

সাপ?তাহিক পতিবেদন

 মতামত সমূহ
পিছনে 
 আপনার মতামত লিখুন
English বাংলা
নাম:
ই-মেইল:
মন্তব্য :

Please enter the text shown in the image.