মুন্সিগঞ্জ-বিক্রমপুর সোসাইটি জাপান, ঈদ পুনর্মিলনী

Print Friendly and PDF

অবশেষে অত্যন্ত আনন্দঘন মনোরম পরিবেশে মুন্সিগঞ্জ-বিক্রমপুর সোসাইটি জাপানের ঈদ পুনর্মিলনী অনুষ্ঠান ‘ঈদ আনন্দ ২০১৭’ সম্পন্ন হয়েছে। অবশেষে লেখার কারণ হচ্ছে, অনুষ্ঠানকে ঘিরে জাপান প্রবাসীদের প্রত্যাশা অতি উচ্চমাত্রায় বিরাজ করে। কারণ, ২০০৭ সালে মুন্সিগঞ্জ-বিক্রমপুর সোসাইটি জাপান নিয়মিতভাবে কোরবানির ঈদ অর্থাৎ ঈদুল আজহার পর সকলের জন্য উন্মুক্ত রেখে করে আসছে।
মূলত পবিত্র ঈদুল আজহার মাহাত্ম্য সকলের সঙ্গে সমান ভাগে ভাগ করে নেয়ার জন্য মুন্সিগঞ্জ-বিক্রমপুর সোসাইটি জাপান কোরবানির মাংসে আপ্যায়নের মাধ্যমে সমস্ত জাপান প্রবাসীকে একত্রিত করে বিভিন্ন বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ‘ঈদ আনন্দ’ নামে অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য নজির চিরাচরিত আবহমান কালের বাংলাদেশের উৎসবের আমেজে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের প্রতি সম্মান জানিয়ে আপ্যায়নের ম্যানুতেও বৈচিত্র্য রাখা সংগঠনটির অনন্য বৈশিষ্ট্য।
২৪ সেপ্টেম্বর রোববার টোকিওর অদূরে সাইতামা প্রিফেকচারের মিসাতো সিটির সবুজে ঘেরা এবং লেক সংলগ্ন মিসাতো পার্কের নির্মল খোলা উদ্যানে এবারের ঈদ আনন্দ অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হয়। আনন্দে উদ্বেলিত প্রবাসীদের মধ্যে প্রশান্তি ফিরে আসে।
১৭ সেপ্টেম্বর ঈদ আনন্দ অনুষ্ঠানটি হওয়ার কথা ছিল পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী। সেই মোতাবেক যথাযথ প্রস্তুতিও সম্পন্ন ছিল। কিন্তু তাতে বাদসাধে প্রকৃতি। টাইফুন নামক জাপানিজ ঝড় ওইদিন টোকিও এবং আশপাশ জেলাগুলোর উপর দিয়ে বয়ে যাবে বলে আবহাওয়ার পূর্বাভাসে জানা যায়। সম্ভাব্য ওই প্রাকৃতিক দুর্যোগে করণীয় সম্পর্কে সভাপতি বাদল চাকলাদারের ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান পদ্মা কোম্পানি লিমিটেডের কার্যালয়ে সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম নান্নুর পরিচালনায় এক জরুরি সভায় বসেন সংশ্লিষ্টরা। প্রবাসীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য অনুষ্ঠানটি এক সপ্তাহ পিছিয়ে দেয়ার জন্য সবাই মত দেন। ২৪ তারিখ ঈদ আনন্দ অনুষ্ঠান আয়োজনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। আবারও আবহাওয়া সূত্রে ওইদিন বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনার কথা প্রচার পেতে থাকে।
আয়োজকরা বৃষ্টি হলেও পার্কের ছাউনিতলে অনুষ্ঠান আয়োজনের সিদ্ধান্ত নিলে প্রবাসীদের মধ্যে প্রাণচাঞ্চল্যতা ফিরে আসে। আয়োজনকে ঘিরে প্রবাসীদের মধ্যে এক ধরনের উৎসব উৎসব আমেজ বিরাজ করে। ১ সেপ্টেম্বর জাপানে পবিত্র ঈদ উদযাপিত হলেও প্রবাসীদের মধ্যে তা যেন পরিপূর্ণতা পায় না। মুন্সিগঞ্জ-বিক্রমপুর সোসাইটি ঈদ পুনর্মিলনী সেই পরিপূর্ণতা যেন ষোলোকলায় পূর্ণ হয়।
দুপুর ১২টা থেকে অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার কথা থাকলেও সকাল থেকেই বিভিন্ন সাজে প্রবাসীরা মিসাতো পার্কে জমা হতে শুরু করে। খোলা উদ্যান হওয়া বিভিন্ন ধরনের খেলাধুলায় মেতে ওঠে সব বয়সের অতিথিরা। প্রকৃতিও যেন উদার হয়ে প্রবাসীদের আনন্দে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। লেকের পাড়ে সবুজ ছায়াঘেরা মনোরম পরিবেশের উপর নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা যেন মাঝেমধ্যেই প্রবাসীদের খেলার সাথী হয়ে লুকোচুরি খেলায় মেতে ওঠে।
 বেলা ১টার সময় সংগঠনের সভাপতি বাদল চাকলাদার সবাইকে স্বাগত ও ধন্যবাদ জানিয়ে ঈদ আনন্দ আয়োজনের প্রধান আকর্ষণ কোরবানির মাংসে ঈদ আপ্যায়ন পর্বের সূচনা ঘোষণা করেন। বিক্রমপুরের ঐতিহ্যে সবাইকে আপ্যায়ন করানো হয়। বেলা ৪টা পর্যন্ত আপ্যায়ন পর্ব চলে। আপ্যায়নের বিশেষ আয়োজন শৌখিন চাষিদের বারান্দায় উৎপন্ন বিভিন্ন ধরনের লঙ্কা। যার মধ্যে অন্যতম ছিল মেক্সিকান হাবানের এবং বিক্রমপুর এলাকার ঐতিহ্য কালো কাঁচামরিচ। অনেকে আবার তা ব্যাগে স্থান দিতে কার্পণ্য করেননি। বিশেষ করে মরিচপ্রেমী ভাবীরা।
বিনোদন পর্বটি শুরু হয় বেলা ৩টা থেকে। প্রতিবছরের মতো এ বছরও শিশুদের জন্য বিশেষ আয়োজন বিস্কুট দৌড় প্রতিযোগিতা ছিল অন্যরকম আকর্ষণ। অর্ধশতাধিক শিশু এতে অংশ নিয়ে থাকে। আয়োজনে বিশেষ পুরস্কারের পাশাপাশি অংশগ্রহণকারী সকলকে উপহার দেয়া হয়।
প্রতিবছর মহিলাদের জন্য মিউজিক্যাল চেয়ার এং চোখ বাঁধানো অবস্থায় তরমুজ ভাঙা খেলার আয়োজন থাকলেও এ বছর ভিন্নতা আনা হয়। এ বছর কুইজভিত্তিক মেধা পরীক্ষা খেলার আয়োজন থাকে মহিলাদের জন্য। মুন্সিগঞ্জ জেলা, বাংলাদেশ এবং জাপানের উপর পাঁচটি করে কুইজ লিখার উত্তরের জন্য পাঁচ মিনিট সময় বেঁধে দেয়া হয়। সর্বোচ্চ ১১ প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিয়ে প্রথম স্থান অধিকার করে নেন অ্যাডভোকেট হাসিনা বেগম রেখা। এরপর দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন ফারজানা নান্নু এবং তৃতীয় স্থান অধিকার করেন আফিয়া। প্রতিযোগিতাটি সবাই উপভোগ করেন।
বিনোদন পর্বের সবচেয়ে আকর্ষণীয় পর্ব ছিল বিংগো গেইম। বরাবরের মতো এবারও সব বয়সী অতিথিরা এতে অংশ নিয়ে থাকেন। যদিও এবার বিংগো গেইম-এ অংশ নেয়ার জন্য নিয়ম বেঁধে দেয়া ছিল। কিন্তু বাঙালি যে নিয়মের ধার ধারে না। অনিয়মটাই যেন এখানে নিয়ম। তা বাংলাদেশ, জাপান, আমেরিকা কিংবা মঙ্গলগ্রহেই হোক না কেন, এমনকি খোদ স্বর্গেও নাকি বাঙালিদের অনিয়ম নিয়ে নানা কৌতুক চালু রয়েছে। সময় এবং নিয়ম না মানা বাঙালি চরিত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য এবং তা ছড়িয়ে দেয়া হয় সন্তান-সন্তুতিদের উপরও। যে বাচ্চাটি স্কুলে, খেলার মাঠে জাপানিদের সঙ্গে সবকিছু মেনে চলছে, সেই একই বাচ্চা নিজ ঘরে কিংবা বাঙালিদের অনুষ্ঠানে এমন করছে যা অকল্পনীয়।
বিংগো গেইম পরিচালনা করেন কামরুল আহসান জুয়েল। তাকে সহযোগিতা করেন সহিদুল ইসলাম নান্নু এবং শেখ নজরুল ইসলাম রনি।
বিনোদন অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা এবং সার্বিক দায়িত্বে ছিলেন রাহমান মনি।
ঈদ আনন্দ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে বন্যা দুর্গতদের পুনর্বাসনের জন্য অনুদান সংগ্রহ করা হয়। সংগৃহীত অর্থের পরিমাণ ছিল ৩৭৪১০০ ইয়েন। যার মধ্যে নগদ ২৩২১০০ ইয়েন, ১০০ ডলার এবং ১৩০০০ এর আশ্বাস। সংগৃহীত অর্থ বাংলাদেশে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের কাজে ব্যয় করা হবে জাপানে বাংলাদেশ কমিউনিটির পক্ষ থেকে।
একই আয়োজনে রোহিঙ্গাদের ত্রাণ সহায়তার জন্য অর্থ সংগ্রহ করা হয়। সংগৃহীত নগদ অর্থের পরিমাণ ছিল ১৬০০০০ ইয়েন প্রায়।
বাংলাদেশের যে কোনো প্রয়োজনে জাপান প্রবাসীরা সবসময় অগ্রগামী, আবারো তা প্রমাণ হলো।
rahmanmoni@gmail.com

সাপ?তাহিক পতিবেদন

 মতামত সমূহ
পিছনে 
 আপনার মতামত লিখুন
English বাংলা
নাম:
ই-মেইল:
মন্তব্য :

Please enter the text shown in the image.