আগাম নির্বাচন দিলেন প্রধানমন্ত্রী আবে

Print Friendly and PDF

জা পা ন

রাহমান মনি

জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে ডায়েট এর নিম্নকক্ষ ভেঙে দিয়ে আগাম নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছেন। ২৫ সেপ্টেম্বর সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে এ ঘোষণা দেন। তবে নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট দিন তারিখ তিনি বলেননি। ধারণা করা হচ্ছে অক্টোবর মাসে এ নির্বাচন হতে যাচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে যে আগাম নির্বাচন দিতে যাচ্ছেন তার পূর্বাভাষ ইতোমধ্যে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের বরাত দিয়ে মিডিয়ায় প্রচার পেয়ে আসর্ছিল। বিশেষ করে টোকিওর গভর্নর কোইকে ইউরিকোর রাজনৈতিক উত্থান এবং নতুন দল গঠনের জল্পনায় আবে কিছুটা অস্বস্তিতে ছিলেন বৈকি! এই কোইকে এক সময় আবের রাজনৈতিক সহকর্মী ছিলেন এবং আবে ছিলেন তার রাজনৈতিক গুরু।
২০০৬ সালে আবে প্রথমবারের মতো ক্ষমতায় এলে ইউরিকো কোইকেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে (৮ জুলাই ২০০৭-২৭ আগস্ট ২০০৭) দায়িত্ব দেয়া হয়।
আবের বিরুদ্ধে নানা কেলেঙ্কারির অভিযোগ থাকলেও মন্দের ভালো হিসেবে অতিসম্প্রতি সর্বশেষ জরিপে আবের জনসমর্থন কিছুটা বেড়ে যায়। উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে আবের উগ্র জাতীয়তাবাদী অবস্থানকেই সমর্থন দান করেন ভোটাররা। আর এই সমর্থন আবের আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায়। তাই তড়িঘড়ি করে আরেকটি আগাম নির্বাচন দিয়ে নিজের অবস্থান আরও চার বছরের জন্য পাকাপোক্ত করে নিতে চান আবে।
অবশেষে সকল জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে ২৫ সেপ্টেম্বর সোমবার আকস্মিক সংবাদ সম্মেলন ডাকেন আবে। স্বীয় কার্যালয়ের সংবাদ সম্মেলন কক্ষে সান্ধ্যকালীন এই সংবাদ সম্মেলনে তিনি ২৮ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার ডায়েট এর নিম্নকক্ষ ভেঙে দেয়ার ঘোষণা দেন। এই নিম্নকক্ষই জাপানের প্রধানমন্ত্রীর ভাগ্য নির্ধারণ করে থাকে।
পরবর্তী নির্বাচনের সঠিক তারিখ ঘোষণা না দিলেও জাপানের নির্বাচনী আইনের বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী আগামী ২২ অক্টোবর ২০১৭ পরবর্তী নির্বাচনের সম্ভাব্য তারিখ হিসেবে বিশ্লেষকরা মনে করেন। ২২ অক্টোবর ২০১৭ পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন হতে যাচ্ছে এই ব্যাপারে অনেকটা নিশ্চিত করেই বলা যায়। সেই হিসেবে ১০ অক্টোবর থেকে অফিসিয়ালভাবে নির্বাচনী প্রচারণা আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে।
জাপানের ব্যবসা সংক্রান্ত অত্যন্ত প্রভাবশালী পত্রিকা ‘ডেইলি নিক্কেই শিমবুন’ মধ্য সেপ্টেম্বর জাপানের ভোটারদের উপর এক জরিপ চালায়। জরিপটি ছিল এক মাসের ব্যবধানে উত্তর কোরিয়া কর্তৃক জাপানের আকাশ দিয়ে দুটি মিশাইল ছোড়া এবং এক মাসের মধ্যেই জাপানকে সাগরে ডুবিয়ে দেয়ার হুমকির পরিপ্রেক্ষিতে জাপানের কঠোর অবস্থানের কথা জানান দেয় সমসাময়িক সময়ে। জরিপে ভোটাররা আবের কঠোর অবস্থানের প্রতি সমর্থন জানান। ৪৪% ভোটার ক্ষমতাসীন দলকে পুনর্বার ভোট দেয়ার পক্ষে মত দেন। মাত্র ৮% ভোটার বিরোধী দল ভিপিজের পক্ষে তাদের সমর্থনের কথা জানান দেন। ২০% এখনও মনস্থির না করার কথা জানান।
উল্লেখ্য, বিরোধী দল ডেমোক্রেটিক পার্টি অব জাপান (ডিপিজে)’র নেতৃত্ব নিয়ে অভ্যন্তরীণ সমস্যায় তথৈবচ অবস্থা। এই অবস্থায় ভোটে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় ফিরে আসার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। আর এই সুযোগটি কাজে লাগাতে চান রাজনৈতিক তীক্ষèবুদ্ধিসম্পন্ন এবং রাজনৈতিক পরিবারের বেড়ে ওঠা শিনজো আবে।
জাপানের অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারের তৃতীয় প্রজন্মের সদস্য হচ্ছেন শিনজো আবে। আবের দাদা কান আবে একজন ঝানু রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন। ইয়ামাগুচি প্রিফেকচারে ছিল তার একচ্ছত্র নেতৃত্ব। আবের পিতা শিনতারো আবে ছিলেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ উত্তর জাপানের অন্যতম সফল প্রধানমন্ত্রী ইয়াসুহিরো নাকাসোনের ক্যাবিনেটের পর রাষ্ট্রমন্ত্রী (২৭ নভেম্বর ১৯৮২-২২ জুলাই ১৯৮৬)।
শিনজো আবের নানা (পিতামহ) নোবুসুকে কিশি ছিলেন জাপানের ৫৭তম প্রধানমন্ত্রী (৩১ জানুয়ারি ১৯৫৭-১৯ জুলাই ১৯৬০)। তিনি ৯০ বছর বয়সে ৭ আগস্ট ১৯৮৭ (১৮৯৬-১৯৮৭) মৃত্যুবরণ করেন। এমনি একটি বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক পরিবারে বেড়ে ওঠা আবে জাপানের কনিষ্ঠতম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ৫২ বছর বয়সে ২০০৬ সালে প্রথমবারের মতো ইতিহাসে স্থান করে নেন।
আরও দুই বছর মেয়াদ থাকা সত্ত্বেও বিরোধী ক্যাম্পের কোন্দলের সুযোগ নিয়ে আগাম নির্বাচনের মাধ্যমে বিপুল জনসমর্থন নিয়ে পুনরায় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হবার পথ পাকা করতে চান আবে।
এ ছাড়াও আবের সামনে রয়েছে আরও একটি চ্যালেঞ্জ। যা ধীরে ধীরে আবের নেতৃত্বের প্রতি জোরালো চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিবে। এলডিপি থেকে বেরিয়ে নতুন রাজনৈতিক দল (তোমিন নো কাই) টোকিও রেসিডেন্স ফার্স্ট গঠন করে ইউরিকো কোইকে চলতি বছর জুলাই মাসে টোকিওর স্থানীয় নির্বাচনে আবের এলডিপিকে বিপুল ভোটের ব্যবধানে পরাস্ত করেন। কোইকে ২২ সেপ্টেম্বর ২০০৩-২৬ সেপ্টেম্বর ২০০৬ সাল পর্যন্ত জুনইচিরো কোইজুমির পরিবেশমন্ত্রী এবং ৪ জুলাই ২০০৭-২৭ আগস্ট ২০০৭ আবের ক্যাবিনেটে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পালনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। যার মধ্যে ওকিনাওয়া বিষয়কমন্ত্রীর দায়িত্ব অন্যতম।
আবের ঘোষণা অল্প কিছুক্ষণ আগে কোইকে (কিবো নো তো) পার্টি অব হোপ নামে একটি জাতীয় রাজনৈতিক দল গঠন করার ঘোষণা দেন। নতুন দল যেন আগামী নির্বাচনের আগে শক্ত ভীত তৈরি করতে না পারে সে জন্যই আবে আগাম নির্বাচন দিচ্ছেন বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
উত্তর কোরিয়ায় সমস্যায় জাপান একটি কঠিন সময় পার করছে। এমতাবস্থায় আবের মতো একজন উগ্রপন্থিদের হাতে দেশের ভার অর্পণ করা উচিত হবে না বলে কোইকে মনে করেন। তাই নতুন দল গঠন করে জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর স্থান দিতে চান কোইকে।
সংবাদ সম্মেলনে আবে শিক্ষা প্যাকেজে প্রণোদনা, ঋণ হ্রাসসহ সামাজিক ব্যয় সঙ্কোচনের ঘোষণাসহ আসন্ন নির্বাচনে জয়ী হয়ে শক্তিশালী কূটনীতির মাধ্যমে বিশ্বে জাপানকে নতুনভাবে তুলে ধরার আশা ব্যক্ত করেন। আসন্ন জাতীয় নির্বাচনটি হবে জাপানের ৪৮তম জাতীয় নির্বাচন।

সাপ?তাহিক পতিবেদন

প্রবাসে
 মতামত সমূহ
পিছনে 
 আপনার মতামত লিখুন
English বাংলা
নাম:
ই-মেইল:
মন্তব্য :

Please enter the text shown in the image.