[মতামত] রোহিঙ্গা ইস্যু : বাংলাদেশ সরকার কী চাচ্ছে!

Print Friendly and PDF

পলাশ রহমান

বাংলাদেশ কী চায়, কেন চায়, কীভাবে চায়, তা কি পরিষ্কার হয়েছে? আমাদের সরকার, সরকারপ্রধানের মনোভাব কী, তারা কী চাচ্ছেন, কোন পথে হাঁটছেন, তা কি বোঝা  গেছে? উনারা কি বুঝাতে পেরেছেন বা চেষ্টা করেছেন?
রোহিঙ্গা সমস্যা অনেক পুরনো। মিয়ানমারের মগরা ওদেশে রোহিঙ্গাদের রাখতে চায় না। তারা ওদের মুছে ফেলতে চায়। এ সমস্যা বাংলাদেশের নয়, এটা মিয়ানমারের রাজনৈতিক সমস্যা। বাংলাদেশ কেন এককভাবে তাদের রাজনৈতিক সমস্যার চাপ গ্রহণ করবে? কী দায় পড়েছে বাংলাদেশের?
রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী। তাদের মধ্যে অশিক্ষা দরিদ্রতার হার ভয়াবহ। মিয়ানমার পরিকল্পিতভাবে তাদের বাংলাদেশে ঠেলে দিচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশ কী করছে? বাংলাদেশ কেন বিশ্ব দরবারে হাঁক-ডাক, শোরগোল করছে না? মিয়ানমার শুধু রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে ঠেলে দিয়েই ক্ষান্ত হচ্ছে না, তারা নানা উপায়ে উসকানি দিচ্ছে। সীমান্তের ওপারে সেনা উত্তেজনা সৃষ্টি করছে। বারবার বাংলাদেশের আকাশসীমা, নদীসীমা অতিক্রম করছে। তাদের পত্রপত্রিকায় বাংলাদেশ, বাংলাদেশের সরকার সম্পর্কে নানা কিসিমের অপপ্রচার করছে। প্রশ্ন হলো বাংলাদেশ কী করছে?
বাংলাদেশ সীমান্তে সেনা মোতায়েন করেনি। আকাশসীমা, পানিসীমা লঙ্ঘনের উত্তর দেয়নি। দৃশ্যমান কোনো কূটনৈতিক তৎপরতা নেই। এই ইস্যুতে বাংলাদেশের প্রতি সহানুভূতিশীল কোনো দেশ, এনজিও বা আন্তর্জাতিক মিডিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশ যোগাযোগ করছে না।
কারণ কি?
বাংলাদেশ কেন বিবিসি, সিএনএস, আল জাজিরার মতো মিডিয়াগুলোকে দেশে ডেকে আনছে না? কেন আমাদের সমস্যা, সীমাবদ্ধতা এবং সীমান্তের বিভীষিকা বিশ্ববাসীকে দেখাচ্ছে না? বাংলাদেশ কেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানবতাবাদী লেখক, শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, সমাজকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে না? কেন তাদের বাংলাদেশে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে না? কেন বিশ্বমানের এনজিও এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দ্বারস্থ হচ্ছে না? কেন মিয়ানমারের প্রতি সর্বাত্মক চাপ সৃষ্টি করার চেষ্টা করছে না?
যুদ্ধ কোনোভাবেই কাম্য নয়। তবু পৃথিবীতে যুদ্ধ হয়। যুগ যুগ ধরে হয়ে আসছে। কারণ যুদ্ধ কোনো কোনো সময় অনিবার্য হয়ে উঠে। যেমন একাত্তরে হয়েছিল। মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের যুদ্ধে জড়ানোর কোনো সম্ভাবনা নেই। প্রয়োজনও নেই। তাই বলে নতজানু হয়ে থাকতে হবে? তাদের সব অন্যায়, অত্যাচার মাথা পেতে নিতে হবে? এটাই কি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা? এর আগেও তারা জলসীমা নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে বিরোধ করেছে। আন্তর্জাতিক আদালতের রায় নিয়েও তারা বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ব্যাপক অপপ্রচার করেছে, করছে। এখনো কি সময় হয়নি বাংলাদেশের উত্তর দেয়ার?
 বাংলাদেশ কি পারে না বুদ্ধিদৃপ্ত উত্তর দিতে। বিশ্বের মানবতাবাদী মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে কি পারে না বাংলাদেশ?
এখন বাংলাদেশের বন্ধুরা কোথায়?
সরকারের বন্ধুরা কোথায়?
যাদের প্ররোচনায় কেয়ারটেকার সরকার বাতিল করা হলো, একদলীয় নির্বাচন করা হলো, গণতন্ত্র শিকেয় তোলা হলো, যাদের সঙ্গে দেশের স্বার্থবিরোধী চুক্তি করা হলো, জনমত উপেক্ষা করে যাদের কাছ থেকে অস্ত্র কেনা হলো, বাণিজ্য করা হলো, বিদ্যুৎ প্রকল্প গ্রহণ করা হলো, করিডোর দেয়া হলো, বন্দর দেয়া হলো, তারা এখন কোথায়?
তাদের অবস্থান কেন বাংলাদেশের বিরুদ্ধে? এসব প্রশ্নের উত্তরে কেন সরকার মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছে?
বাংলাদেশের মানুষের এতো আবেগ আসে কোথা থেকে? আমাদের দেশে কি দরিদ্রতার অভাব পড়েছে? মোটা চালের দাম প্রায় ৭০ টাকা। সেদিকে কারো খেয়াল আছে? প্রতিদিন যারা ত্রাণ নিয়ে রোহিঙ্গা পাড়ায় দৌড়াচ্ছেন, তারা কি নিজেদের প্রতিবেশী দিনমজুরের ঘরে চুলা জ্বলছে কি জ্বলছে না সে খবর নিয়েছেন, নিচ্ছেন? পথের পাশে যারা ঝুপড়ি করে জীবন যাপন করে তাদের কাছে কদিন ত্রাণ নিয়ে গিয়েছেন? কটা ঘর বেঁধেছেন তাদের জন্য? ক’কাঠা জায়গা ছেড়েছেন? কয়টা পানির কল পুঁতেছেন? তারা কী খায়, কোথায় খায়, কোথায় প্রাকৃতিক প্রয়োজন সারে, কদিন খবর নিয়েছেন?
মানবেতর জীবন দেখতে চান, অসহায় মানুষের জন্য মন কাঁদে? হাওর এলাকায় যান, বন্যাকবলিত এলাকায় যান, পাহাড় ধসে সর্বহারা মানুষকে দেখতে যান। মঙ্গাকবলিত এলাকায় যান। জেলে পাড়া, বেদে পাড়ায় যান। এসব কথার অর্থ এই নয় যে, আমি শরণার্থী রোহিঙ্গাদের সাহায্য করতে নিষেধ করছি। তাদের প্রতি মানবতা দেখাতে বাধা দিচ্ছি বরং সব কিছু একটা নিয়ম শৃঙ্খলায় থেকে করার কথা বলছি। বাংলাদেশ সরকারের উচিত ছিল রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিয়ন্ত্রণ করতে প্রথম দিন থেকেই সেনা মোতায়েন করা। রোহিঙ্গা দুর্যোগ মোকাবিলায় সাধারণ মানুষের সহযোগিতা দরকার, কিন্তু সব কিছু সাধারণ মানুষের হাতে ছেড়ে দেয়া ঠিক নয়। অন্তত রোহিঙ্গাদের মতো নাজুক এবং আন্তর্জাতিক ইস্যু তো নয়ই।
সরকার দেরিতে হলেও রোহিঙ্গাপাড়ায় সেনা পাঠিয়েছে। এখন যা করার সেনারা করবে।
যারা সাহায্য করতে চায় সরকারি ত্রাণ তহবিলে সাহায্য করবে। সেনাদের মাধ্যমে তা বিতরণ এবং রোহিঙ্গাদের সাময়িক থাকার ব্যবস্থা করা হবে।
আজ যারা অতি আবেগে গদ গদ হচ্ছেন তারা কি ভবিষ্যৎ চিন্তা করেছেন? মিয়ানমার কোনো দিনও রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেবে না, যদি তাদের বাধ্য করা না যায়। বাংলাদেশ তাদের বাধ্য করার পথে হাঁটছে না।
রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের কোনো বন্ধু নেই। যারা এগিয়ে এসেছে, মানবতা দেখিয়েছে বর্তমান সরকার তাদের সঙ্গে কখনোই সুসম্পর্ক রক্ষা করেনি, এখনো করছে না। এক অদ্ভুত কারণে বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গা সমস্যার কথা বিশ্বদরবারে তুলে ধরার চেয়ে ‘মানবতার মা’কে তুলে ধরার চেষ্টা করছে।
নতুন, পুরাতন মিলিয়ে প্রায় এক মিলিয়ন রোহিঙ্গা বাংলাদেশে বসবাস করছে। গত এক মাসে যারা এসেছে, শুধু তারাই নয়, মহিলারা পেটের মধ্যে পুরে আরো প্রায় এক লাখ শিশু নিয়ে এসেছে। তাদের সঙ্গে অনেক যুবতী, কিশোরী, বিধবা আছে। এদের নিয়ে স্থানীয়ভাবে সামাজিক, পারিবারিক নিয়ম শৃঙ্খলার অবনতি ঘটবে। এত মানুষের জায়গা দিতে শত শত একর জমি-জিরেত বেদখল হয়ে যাচ্ছে। স্থানীয় মানুষের ওপর এর প্রভাব পড়বে। তাদের ফসলি জমির ক্ষতি হবে। দুষ্টু রাজনীতিক এবং স্থানীয় দুষ্টু মানুষ এদের বিভিন্ন অপকর্মে ব্যবহার করবে। এরা ব্যবহার হতে বাধ্য হবে, যা নিকট অতীতেও হয়েছে। কীভাবে সামাল দেবে আমাদের সরকার? স্থানীয় মানুষের সঙ্গে যখন রোহিঙ্গাদের বিরোধ হবে, প্রায় এক মিলিয়ন মানুষ দাঙ্গা করবে, তখন কী হবে? কতো মানুষের প্রাণহানি ঘটবে? সুতরাং বাস্তবতা মাথায় নিয়ে এগুনোই বুদ্ধিমানের কাজ।
এর আগে যখন মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের নির্যাতন করে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দিয়েছিল তখন বাংলাদেশ তাদের ঢুকতে দেবে না বলে জানিয়েছিল। মৃদু বাধাও দিয়েছিল। তখন কিন্তু অল্প দিনেই আরাকানের রোহিঙ্গা নির্যাতন বন্ধ হয়েছিল। এবার যখন বাংলাদেশ অতি মানবিক হয়ে উঠেছে, তাদের জন্য সীমান্ত খুলে দিয়েছে তখন কিন্তু মগদের অত্যাচার কোনোভাবেই বন্ধ হচ্ছে না। প্রতিদিনই তারা আরো বেশি জঙ্গি হয়ে উঠছে। রোহিঙ্গাদের প্রতিদিনই বাংলাদেশে ঠেলে দিচ্ছে। তারা যাতে ফিরতে না পারে সে জন্য সীমান্তে মাইন পুঁতে রাখছে। কাঁটাতারের বেড়া তুলছে। এর পরেও কি বাংলাদেশ বলবে, দেখি না কী করে?!
এভাবে কতো দিন চলবে? কীভাবে চলবে? দেশি বিদেশি ত্রাণ দিয়ে হয়তো রোহিঙ্গাদের বাঁচিয়ে রাখা যাবে, বসবাসের ব্যবস্থা করা যাবে, কিন্তু স্থায়ী কোনো সমাধান হবে না বরং বাংলাদেশের জন্য স্থায়ী সমস্যা সৃষ্টি করা হবে, হচ্ছে।
পৃথিবীর অনেক দেশের প্রতিনিধিরা বাংলাদেশের মানবিকতার প্রশংসা করছেন। বাংলাদেশের পাশে থাকার কথা বলছেন। ত্রাণ পাঠাচ্ছেন, কিন্তু তারা মিয়ানমার সরকারের প্রতি চাপ প্রয়োগ করছেন না। তাদের বিরুদ্ধে কথা বলছেন না। তাদের বিরুদ্ধে হুমকি ধমকি দিচ্ছেন না। কী অদ্ভুত ব্যাপার! তারা বাংলাদেশের পেছনে মলমের বাটি নিয়ে দৌড়াচ্ছেন, কিন্তু ক্ষত সৃষ্টিকারীদের কিছুই বলছেন না।
এদিকে বাংলাদেশের সরকার এবং মিডিয়া তাদের কথাগুলোয় গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করছে। নিজেরা ধন্য হচ্ছে। গদ গদ হচ্ছে। নিজেদের কূটনৈতিক সাফল্য দেখাচ্ছে। অথচ এই মুহূর্তে বাংলাদেশের প্রশংসার চেয়ে মিয়ানমারকে ধমক দেয়া, তাদের সমালোচনা করা, সামরিক অবরোধ করা, বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে চাপ দেয়া, কফি আনানের প্রস্তাব বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নেয়া বেশি দরকার। বেশি জরুরি। তারা তা না করে বাংলাদেশের সঙ্গে রাজনীতি করছে। ছেলে ভুলানো কথা বলছে। আর আমরা আবেগে আপ্লুত হচ্ছি।

সাপ?তাহিক পতিবেদন

 মতামত সমূহ
পিছনে 
 আপনার মতামত লিখুন
English বাংলা
নাম:
ই-মেইল:
মন্তব্য :

Please enter the text shown in the image.