অনন্তের পথে ফাদার রিগন : বাংলায় ফেরা হলো না -পলাশ রহমান

Print Friendly and PDF

ঘড়ির কাঁটায় সকাল ১০টা বেজে মাত্র ক’মিনিট পার হয়েছে। আমরা পৌঁছে গেলাম ভিল্লাভেরলার ক্যাথলিক গির্জায়। চারদিকে লোকে লোকারণ্য। মনে হচ্ছে গোটা গ্রাম ভেঙে পড়েছে ভিল্লাভেরলার গির্জায়। আমাদের দেখে ক’জন শ্বেতাঙ্গ মানুষ এগিয়ে এলেন। বুঝতে অসুবিধা হলো না, তারা মারিনো রিগনের স্বজন। বেশ বিনয় করে জানতে চাইলেন, আপনারা বাংলাদেশ থেকে এসেছেন? বললাম, না, ভেনিস থেকে এসেছি। ভিড়ের মধ্যে থেকে কেউ একজন প্রশ্ন করলেন, আপনারা বাংলাদেশি?
আমাদের উত্তরের অপেক্ষা না করেই মারিনো রিগনের ভাই লুইজি রিগন বললেন, আপনারাই পাদরের (ফাদার) আপনজন। তিনি আপনাদের মতোই একজন বাংলাদেশি ছিলেন। মনেপ্রাণে বাংলাদেশ ধারণ করতেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি নিজেকে বাংলাদেশি বলেই পরিচয় দিতেন। লুইজির কথা শেষ হতে না হতেই এগিয়ে এলেন তার বোনের ছেলে। তিনি বললেন, প্রথা অনুযায়ী ইতালিতে লাশের কফিন বহন করেন মৃত ব্যক্তির আপনজনরা। আমরা মনে করি আপনারাই পাদরের বেশি আপনজন। বাংলাদেশিদেরই তিনি স্বজন মনে করতেন। সুতরাং আমরা চাই আপনারা পাদরের কফিন বহন করবেন।
আমি এবং ভেনিস বাংলা স্কুলের সভাপতি সৈয়দ কামরুল সরোয়ার রাজি হয়ে গেলাম। এর মধ্যে ছুটতে ছুটতে এলেন পুঁথিশিল্পী কাব্য কামরুল। তিনিও আমাদের সঙ্গে হাত লাগালেন। মোট ছয় জনের কাঁধে তোলা হলো মারিনো রিগনের কফিন। গির্জার বাইরে অপেক্ষমাণ লাশটানা গাড়িতে রাখা হলো কফিন। ধীরগতিতে এগিয়ে চলল মারিনো রিগনের শবযাত্রা।
দুই ঘণ্টাব্যাপী মারিনো রিগনের শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে প্রায় তিন শতাধিক মানুষ যোগ দিয়েছিলেন। এর মধ্যে প্রায় অর্ধশত ছিলেন সাবেরিয়ান ক্যাথলিক মিশনের ধর্মগুরু এবং মারিনোর সহকর্মী। বাকি সবাই তার আত্মীয়স্বজন এবং শুভানুধ্যায়ী। ধর্মগুরুদের মধ্যে দুজন বাংলাদেশিকে দেখলাম। পরে জেনেছি মারিনোর উৎসাহে তারা ধর্মগুরুর দীক্ষা নিয়েছেন, ইতালিতে এসেছেন। শেষকৃত্যে মারিনো রিগনের জীবনী পাঠ করা হয়। এতে শুধুমাত্র তার জন্ম, মৃত্যু এবং প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বাদে বাকি সব কথা ছিল বাংলাদেশকে ঘিরে। বাংলাদেশে মারিনো কখন গেলেন, কীভাবে গেলেন, কী কী করলেন, সে এক বিস্তর আলোচনা।
শেষকৃত্যে ঢাকা থেকে শোকবার্তা পাঠিয়েছেন ইতালীয় রাষ্ট্রদূত মারিয়ো পালমা। স্থানীয় মেয়র রুজ্জেরো গনযো নিজে উপস্থিত হয়ে শোক প্রকাশ করেন। বাংলাদেশের সাবেরিয়ান ক্যাথলিক মিশনের পক্ষ থেকে শোক প্রকাশ করেন তাপস বিশ্বাস। তিনি ভিসেনসার সাবেরিয়ান মিশনে ধর্মগুরুর দায়িত্ব পালন করেন। তাপস বলেন, ফাদার মারিনোকে দেখেই তিনি ‘ফাদার’ হওয়ার অনুপ্রেরণা পান। মারিনো রিগনের শেষ বিদায়ে ইতালীয় ভাষায় শোকসংগীত পরিবেশনের পাশাপাশি বাংলা ভাষায়ও শোকসংগীত পরিবেশন করা হয়।
বার্ধক্যজনিত কারণে মারিনো রিগনকে ২০১৪ সালে বাংলাদেশ থেকে ইতালিতে ফিরিয়ে আনা হয়। সে সময় তিনি একটা লালসবুজের পতাকা নিয়ে এসেছিলেন বাংলাদেশ থেকে। শেষের বেলায় মারিনোর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে সেটা দিয়েই তার কফিন ঢেকে দেয়া হয়।
ভিল্লাভেরলার গির্জা থেকে প্রায় ১০ মিনিট পায়ে হেঁটে মারিনোর শবযাত্রা ক্যাথলিক কবরস্থানে পৌঁছায়। সেখানে আগে থেকেই মারিনোর জন্য কংক্রিটের কবর প্রস্তুত করা ছিল। অন্য ধর্মগুরুদের কবরের পাশেই তাকে সমাহিত করা হলো। কংক্রিটের দেয়ালের মধ্যে কফিন ধরার মতো একটা জায়গায় মারিনোর কফিন ঢুকিয়ে দিয়ে প্রথমে কাঠ এবং সিলিকন দিয়ে মুখ বন্ধ করে দেয়া হলো। এর পর লাগিয়ে দেয়া হলো পাথরের ঢাকনা।
ইতালীয় বংশোদ্ভূত বাংলাদেশি নাগরিক এবং মুক্তিযুদ্ধের অকৃত্রিম বন্ধু মারিনো রিগন একজন সাবেরিয়ান ক্যাথলিক ধর্মগুরু। ১৯২৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি ইতালির ভিসেনসা প্রভিন্সের ভিল্লাভেরলা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। মাত্র ২৮ বছর বয়সে সাবেরিয়ান ক্যাথলিকদের ধর্মগুরু হিসেবে তিনি বাংলাদেশে যান এবং ২০১৪ সালে ইতালিতে ফিরে আসেন। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি আমাদের মুক্তিযুদ্ধে সহযোগিতা করেছেন। দরিদ্রতা নিয়ে কাজ করেছেন। নারী উন্নয়নের জন্য কাজ করেছেন। শিক্ষার জন্য কাজ করেছেন। সাংস্কৃতিক বিষয় নিয়ে কাজ করেছেন এবং রবীন্দ্রনাথ, লালনসহ অনেক কবি লেখক সাহিত্যিকের প্রায় ৭০টি বই ইতালীয় ভাষায় অনুবাদ করেছেন।
৯২ বছর বয়সে তিনি গত ২০ অক্টোবর ২০১৭, শুক্রবার সন্ধ্যায় ইতালির ভিল্লাভেরলায় পরলোক গমন করেন। ২৮ অক্টোবর, ২০১৭ মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টায় ভিল্লাভেরলার ক্যাথলিক গির্জায় তার শেষকৃত্য অনুষ্ঠান শেষে স্থানীয় কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।
মারিনো রিগন সবসময় নিজেকে একজন বাংলাদেশি বলে পরিচয় দিতে পছন্দ করতেন। জীবিত অবস্থায় বহুবার বলেছেন, তিনি বাংলাদেশে থাকতে চান। মৃত্যুর পর খুলনার শেলাবুনিয়ায় শেষ শয্যা নিতে চান। বার্ধক্যজনিত কারণে ২০১৪ সালে তাকে ইতালির সাবেরিয়ান মিশনে ফিরিয়ে আনা হলে আমি তার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম। তখন তিনি ‘সাপ্তাহিক’ এর জন্য একটা দীর্ঘ সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন, যা ২০১৫ সালে তার জন্মদিন উপলক্ষে ৫ ফেব্রুয়ারি সংখ্যায় ছাপা হয়।
মারিনো রিগনের মৃত্যুর পর বা অসুস্থ অবস্থায় ইতালিস্থ বাংলাদেশ মিশন থেকে তার পরিবারের বা তার কোনো খোঁজখবর নেয়া হয়নি। কোনো শোকবার্তা প্রকাশ করা হয়নি। তার শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধি হিসেবে কেউ যোগ দেয়নি। অথচ তিনি আমাদের মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা প্রাপ্ত একজন ইতালীয় বংশোদ্ভূত বাংলাদেশি নাগরিক। ২০০৯ সালে বাংলাদেশ সরকার তাকে নাগরিকত্ব প্রদান করে। তিনি টানা ৬১ বছর বাংলাদেশে বসবাস করেন। বিশ্বজুড়ে বাংলা সাহিত্য ছড়িয়ে দিতে বিশেষ অবদান রাখেন। বাংলাদেশের কবি সাহিত্যিকদের প্রায় ৭০টি বই ইতালীয় ভাষায় অনুবাদ করেন। এ বিষয়ে কথা হয় মারিনোর বোনের মেয়ে আলেসসান্দ্রা জানিনের সঙ্গে। তিনি বলেন, মিলানোস্থা বাংলাদেশের কনস্যুলেট অফিসে ফোন করে পাদরের শেষকৃত্যের কথা জানানো হয়েছে, কিন্তু কেউ আসেনি বা কোনো শোকবার্তাও পাঠায়নি।
মারিনোর মৃতদেহ গির্জা থেকে বের করে যখন কবরস্থানের দিকে নেয়া হচ্ছিল তখন আর আবেগ ধরে রাখতে পারেননি পুঁথিশিল্পী কাব্য কামরুল। তিনি চিৎকার করে বলেন, মারিনো বাংলাদেশের মানুষ। তিনি বাংলাদেশ পছন্দ করতেন। বাংলাদেশে সমাহিত হতে চেয়েছিলেন। তোমরা কেন তাকে এখানে কবর দিচ্ছ? তাকে বাংলাদেশে পাঠাও। এ সময় মারিনোর ভাগ্নি আলেসসান্দ্রা কাব্যকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন, আমরা জানি তিনি বাংলাদেশে থাকতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এর জন্য তো একটা নিয়মকানুন আছে, প্রক্রিয়া আছে। আমরা ইচ্ছা করলেই তাকে বাংলাদেশে পাঠাতে পারি না। আলেসসান্দ্রা বলেন, এখনও সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায়নি। বাংলাদেশ সরকার চাইলে রিগন পরিবার বিষয়টি আন্তরিকতার সঙ্গে বিবেচনা করবে।

২.
মারিনো রিগনের জন্ম ১৯২৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি ইতালির ভিসেনসা প্রভিন্সের ভিল্লাভেরলা গ্রামে। বাবা রিকার্দো রিগন ছিলেন একজন কৃষক, অভিনেতা এবং গায়ক। তিনি কৃষি কাজের পাশাপাশি গ্রামের নাট্যদলে অভিনয় করতেন এবং গান-বাজনায় মগ্ন থাকতেন। সাহিত্যের প্রতিও তার ব্যাপক আগ্রহ ছিল। মা মনিকা রিগন ছিলেন স্কুলের শিক্ষিকা। আট ভাইবোনের মধ্যে মারিনো সবার বড়। ছোট সময় থেকে তিনি সংস্কৃতি, শিক্ষা এবং ধর্মীয় পরিবেশে বেড়ে উঠেছেন। বাবা রিকার্দোকে দেখেই সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন। সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ সৃষ্টি হয় মা মনিকার উৎসাহে। ছেলেবেলা থেকেই মারিনো বেশ শান্ত এবং মেধাবী ছিলেন। তখন থেকেই তার মধ্যে মানবিক বিভিন্ন গুণাবলি ফুটে উঠতে শুরু করে। মাত্র ৫/৬ বছর বয়স থেকেই মারিনো ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হন। ওই একপাতা বয়সেই তিনি পুরোহিত হওয়ার স্বপ্ন দেখেন। আর্তমানবতার সেবায় নিজেকে বিনিয়োগের সংকল্প করেন। মারিনোর কচি মনে ধর্মীয় পুরোহিত হওয়ার স্বপ্ন প্রথম অঙ্কুরিত হয় তার বাবার অভিনীত একটা মঞ্চ নাটক দেখে। ধর্মীয় কাহিনীর ওই নাটকে বাবা রিকার্দো যিশুর চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন।
মারিনোর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা জীবন শুরু হয় ১৯৩১ সালে নিজ গ্রামের প্রাথমিক স্কুল থেকে। সেখানে ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করে তিনি যোগ দেন ক্যাথলিক মিশনারিতে। এরপর ওই মিশনারির তত্ত্বাবধানে একে একে হাইস্কুল এবং কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। একই সময়ে মারিনো ক্যাথলিক মিশনের ধর্মতত্ত্ব বিষয়েও শিক্ষা অর্জন করেন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার শেষ এক বছর তিনি কাটিয়েছেন আমেরিকায়। সেখানের এক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মানবকল্যাণ বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। মারিনো ছাত্র সময় থেকেই গ্রিক, ফ্রেঞ্চ, ল্যাটিন এবং ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেন। ধর্ম প্রচারক হিসাবে বাংলাদেশে অভিবাসী হওয়ার পর বাংলা ভাষা রপ্ত করেন।
১৯৫৩ সাল, মারিনো রিগনের বয়স মাত্র ২৮ বছর। ধর্মে দীক্ষা নেয়া এক টগবগে যুবক। ধর্মগুরুরা নির্দেশ দিলেন তোমাকে বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্ববঙ্গ) যেতে হবে ক্যাথলিক ধর্ম প্রচারক হিসেবে। ক্যাথলিক মিশনের প্রথা অনুযায়ী ‘না’ বলার কোনো সুযোগ নেই। ব্যাগ-পেট্রা গুছিয়ে রওনা করলেন মারিনো। জানুয়ারির ৬ তারিখে এসে পৌঁছালেন ভারতের কলকাতায়। সেখান থেকে ট্রেনে চেপে ৭ জানুয়ারি তিনি যশোরের মাটিতে পা রাখেন এবং এরপর স্টিমারযোগে ঢাকায় যান। ১৯৫৩ সালের ৭ জানুয়ারি, অর্থাৎ বাংলাদেশের জন্মের আগেই বাংলাদেশে আসেন মারিনো রিগন।
মারিনো ঢাকার আর্চবিশপ মিশনে থাকেন চার মাস। ওখানে বসেই বাংলাদেশ, বাংলাদেশের মানুষ এবং সংস্কৃতি বিষয়ে প্রাথমিক ধারণা অর্জন করেন। নতুন দেশ, নতুন মানুষ, নতুন ভাষা, নতুন আবহাওয়া, নতুন পরিবেশ, নতুন সংস্কৃতি, এসব কিছুর সঙ্গে নিজেকে খাপ খাওয়াতে হলে প্রথমেই ভাষা জানা দরকার, বুঝতে দেরি হয় না যুবক মারিনোর। সে সময়ের ঢাকা শহর দেখেও বেশ অবাক হন তিনি, কিন্তু একটুও ঘাবড়াননি। চার মাস পর মারিনোকে পাঠিয়ে দেয়া হয় মুজিবনগরের (সে সময়ের কুষ্টিয়া) ভবেরপাড়া ক্যাথলিক মিশনে। সেখানে তিনি সহকারী পুরোহিত হিসেবে কাজ শুরু করেন।
একদম অজপাড়াগাঁ। কাঁচা রাস্তা, কাঁচা বাড়িঘর। সামান্য বৃষ্টি হলেই রাস্তাগুলো চলাচলের অযোগ্য হয়ে যায়। কিন্তু একদণ্ড থেমে থাকেন না মারিনো। কখনো গরুর গাড়ি, কখনো ঘোড়ার গাড়ি, কখনো সাইকেল বা পায়ে হেঁটে ধর্ম প্রচার করতে নেমে পড়েন। পাশাপাশি মনোযোগ দেন বাংলা ভাষা আয়ত্ত করতে। সেখানে কোনো শিক্ষক ছিল না, নিজে নিজে শেখার চেষ্টা করতেন। যা পারতেন তাই নিয়েই চেষ্টা চালিয়ে যেতেন। মুজিবনগরের রতনপুর এবং বল্লভপুর ক্যাথলিক পল্লীর মানুষের সঙ্গে বেশি সময় কাটতো মারিনোর। তখন তিনি ওই অঞ্চলের মানুষের মতো টেনে টেনে কিছু বাংলা বলা শিখেছিলেন।
১৯৫৩ সাল থেকে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত মাত্র এক বছর মুজিবনগরের ভবেরপাড়া মিশনে কাজ করেন মারিনো রিগন। এরপর চলে আসেন সুন্দরবনের পাশে মালাগাজি মিশনে। সেখানে ১৯৫৪ থেকে ১৯৫৭ সাল পর্যন্ত তিনি ধর্মগুরুর দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৭ সাল থেকে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত কাজ করেন খুলনার ক্যাথলিক মিশনে। এরপর ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত কাজ করেন গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরের বানিয়ারচর মিশনে এবং ১৯৭৯ সাল থেকে শুরু করে ইতালিতে ফিরে যাওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি সুন্দরবনের শেলাবুনিয়ার সেন্ট পল মিশনে ধর্ম প্রচারকের কাজ করেছেন। তিলে তিলে গড়ে তুলেছেন শেলাবুনিয়ার ক্যাথলিক মিশন। ব্যাপক উন্নতি সাধন করেছেন ওই এলাকার। শেলাবুনিয়াকে তিনি একটি পর্যটন পল্লীতে রূপ দেন। সোঁদা মাটির গন্ধ মাখা ওই এলাকার মানুষের সঙ্গে তার গড়ে উঠেছে আত্মার সম্পর্ক। মিশনের সিদ্ধান্তে তিনি শেলাবুনিয়া ছাড়তে বাধ্য হলেও মৃত্যু পর্যন্ত নাড়ির টান অনুভব করেন ওই অঞ্চলের প্রতি। আর তাই মারিনোর মনে শেষ ইচ্ছা ছিল, সমাহিত হবেন খুলনার শেলাবুনিয়ায়।
বাংলা ভাষার দখল নিতে ফাদার মারিনোর সময় লেগে যায় ৫ থেকে ৬ বছর। এই সময়ের মধ্যে তিনি বলা এবং লেখা দুটোই আয়ত্ত করেন। বাংলা ভাষা শেখার সঙ্গে সঙ্গে বাংলা সাহিত্যের প্রতি ঝুঁকে পড়েন মারিনো। ১৯৫৪ সাল থেকে তিনি পুরোমাত্রায় বাংলা সাহিত্য বিষয়ে পড়াশুনা শুরু করেন। মেহেরপুর থেকে খুলনায় আসার পরে স্থানীয় একজন শিক্ষক ললিত পল সরকার মারিনোকে পরামর্শ দেন বাংলা শিখতে হলে শরৎ পড়তে হবে। তখন ওই শিক্ষকের পরামর্শে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘পণ্ডিত মশাই’ পড়তে শুরু করেন মারিনো। বলা যায় ‘পণ্ডিত মশাই’ দিয়েই মারিনোর বাংলা সাহিত্যের হাতেখড়ি। একে একে শরৎচন্দ্রের ৩০টারও বেশি বই পড়ে ফেলেন মারিনো। এর মধ্যে ‘পল্লী সমাজ’ সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে তার। ‘দেবদাস’ সম্পর্কে মারিনোর মূল্যায়ন হলো ওটি একটি ব্যর্থ প্রেমের কাহিনী। তবে আধ্যাত্মিক বিবেচনায় তিনি বেশি পছন্দ করেন ‘পণ্ডিত মশাই’। শরৎচন্দ্রের পর মারিনো বঙ্কিম সাহিত্য পড়তে শুরু করেন। বঙ্কিম চন্দ্রের ‘কপালকুণ্ডলা’ দিয়ে শুরু করেন এবং একে একে তার সব বই পড়ে ফেলেন। ওই সময় অনেকেই মারিনোকে নিষেধ করতেন বঙ্কিম পড়তে। তারা বলতেন বঙ্কিম সাহিত্য অনেক কঠিন। এত তাড়াতাড়ি তুমি বঙ্কিম পড়লে বাংলার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে। তারা মারিনোকে পরামর্শ দেন রবীন্দ্রনাথের বই পড়তে। ১৯৫৭ সালের মার্চ থেকে তিনি রবীন্দ্রনাথ পড়া শুরু করেন। সেই যে রবীন্দ্রনাথ তার মাথায় ঢুকেছে আর কখনো বের হয়নি। রবী সাহিত্যের প্রেমে পড়ে যান মারিনো। শুরু করেন নিজ ভাষায় (ইতালীয়) অনুবাদের কাজ। ‘গীতাঞ্জলি’ সরাসরি বাংলা থেকে ইতালীয় ভাষায় অনূদিত তার প্রথম বই। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাননি মারিনো রিগন। রবীন্দ্রনাথের প্রায় অর্ধশত বই অনুবাদ করেন তিনি। এর মধ্যে প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ৪৭টি। একই সঙ্গে কোনো বিদেশি ভাষায় রবীন্দ্রনাথের সর্বোচ্চ সংখ্যক বইয়ের অনুবাদক তিনি। মারিনোর মতে রবীন্দ্রনাথের কাব্যের মধ্যে ‘বলাকা’ এবং উপন্যাসের মধ্যে ‘গোরা’ শ্রেষ্ঠ।
১৯৬৪ সালে রবীন্দ্রনাথের ‘গীতাঞ্জলি’ বাংলা থেকে সরাসরি ইতালীয় ভাষায় প্রকাশিত মারিনো রিগনের প্রথম বই। পরে তা ইউরোপের আরও কয়েকটি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। এছাড়াও লালনের ৩৫০টি গান, জসীম উদ্দীন, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, সুকান্ত ভট্টাচার্য এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন কবিদের নির্বাচিত কবিতার সঙ্কলন ও বাউল গানসহ অনেক বই তিনি ইতালীয় ভাষায় অনুবাদ করেছেন। রবীন্দ্রনাথ এবং শেলাবুনিয়ার উপর মৌলিক বইও লিখেছেন। তার উল্লেখযোগ্য অনুবাদের মধ্যে রয়েছে, রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলি, কড়ি ও কমল, সুঙ্গিল, সোনারতরী, নৈবেদ্য, চিত্রা, বলাকা, চৈতালী, লেখন, কনিকা, শান্তি নিকেতন উপদেশমালা (১ম, ২য় এবং ৩য় খণ্ড), কথা, চিনা, কল্পনা, শিশু, স্মরণ, শেষ লেখা, মহুয়া, শ্যামলী, নবজাতক, খ্রিস্ট, রোগশয্যা, জন্মদিনে, আরোগ্য, কাহিনী, স্ফুলিঙ্গ, চিত্রাঙ্গদা, পূর্বদিকে (সংকলন) ইত্যাদি। জসীম উদ্দীনের নকশী কাঁথার মাঠ, সুচয়নী, সোজন বাদিয়ার ঘাট ও নির্বাচিত কবিতা। শরৎচন্দ্রের পণ্ডিত মশাই ও চন্দ্রনাথ। সুকান্তর নির্বাচিত কবিতা সংকলন। তার অধিকাংশ বই প্রকাশিত হয়েছে ইতালির বিভিন্ন বিখ্যাত প্রকাশনী থেকে এবং পরে তা ফ্রেঞ্চ, স্প্যানিশ, পর্তুগিজ, ডয়েজসহ ইউরোপের বেশ ক’টি প্রধান ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে।
কবি জসীম উদ্দীন এবং মারিনো রিগন ছিলেন হরিহর আত্মা। তারা দু’জন পরস্পরকে খুবই পছন্দ করতেন। ১৯৬৫ সালের জানুয়ারি মাসে তাদের মধ্যে পরিচয় হয়। ধীরে ধীরে তা গড়ায় পারিবারিক পর্যায়ে। কবির মৃত্যুর পরেও তাদের সেই পারিবারিক সম্পর্ক অব্যাহত ছিল। ১৯৭৩ সালে জসীম উদ্দীন মারিনোকে নিয়ে গিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে। সেদিন তারা টানা একঘণ্টা কথা বলেছিলেন। মারিনো বঙ্গবন্ধুকে গীতাঞ্জলির ১০৯ নম্বর কবিতাটি আবৃত্তি করে শুনিয়েছিলেন- ছাড়িস নে, ধরে থাক এঁটে। / ওরে হবে তোর জয় / অন্ধকার যায় বুঝি কেটে / ওরে আর নেই ভয় / ওই দেখ পূর্বাশার ডালে / নিবিড় বনের অন্তরালে / শুকতারা হয়েছে উদয়...
১৯৭১ সাল, বাংলাদেশে শুরু হয় মহান মুক্তিযুদ্ধ। এ সময় বাংলাদেশে যেসব বিদেশিরা ছিলেন তারা অনেকেই নিজ দেশে ফিরে যান। মারিনো রিগনকেও ইতালিতে ফিরে যাওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল তার দেশ ইতালি, ছুটি নেয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল তার ধর্মীয় মিশন। তিনি রাজি হননি। বাংলাদেশিদের বিপদ দেখে তিনি চলে যাননি নিরাপদ আশ্রয়ে। মুক্তিযুদ্ধের পুরাটা সময় মারিনো রিগন গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরের বানিয়ারচরে অবস্থান করেছেন। সেখানের ক্যাথলিক মিশনের প্রধান পুরোহিত হিসেবে কাজ করেছেন। দিনের আলোতে মারিনো একজন পুরোহিত হলেও রাতের আঁধারে বনে যান একজন পুরোদস্তুর মুক্তিযোদ্ধা। বানিয়ারচরে তখন তার একটা ছোট চিকিৎসাকেন্দ্র ছিল। রাত গভীর হলে আহত মুক্তিযোদ্ধারা সেখানে আসতেন। মারিনো নিজে উপস্থিত থেকে তাদের চিকিৎসাসেবা দিতেন। খাবার এবং আশ্রয়ের ব্যবস্থা করতেন। অবসর সময়ে লিখতেন একাত্তরের দিনলিপি। একাত্তরের ১৪ জুলাই মুক্তিযুদ্ধের দ্বিতীয় বৃহত্তম গেরিলা বাহিনীর প্রধান হেমায়েত উদ্দিন রামশীলের সম্মুখযুদ্ধে মুখমণ্ডলে গুলিবিদ্ধ হন। মারাত্মক আহত অবস্থায় হেমায়েত উদ্দিনকে তার সহযোদ্ধারা নিয়ে আসেন মারিনোর চিকিৎসাকেন্দ্রে। তিনি সারা রাত দাঁড়িয়ে থেকে হেমায়েত উদ্দিনকে চিকিৎসা সেবা দেন। বানিয়ারচর এলাকার কৃষক এবং মৎস্যজীবীদের নিয়ে মারিনো একটি সমিতি গড়ে তোলেন। যুদ্ধের প্রথম দিকে তিনি ওই সমিতির সদস্যদের জন্য একটি বড় নৌকা তৈরি করে তার নাম দেন ‘সংগ্রামী বাংলা’। যুদ্ধের মাঝামাঝি সময় আরও একটা নৌকা বানান, নাম দেন ‘রক্তাক্ত বাংলা’। দেশ স্বাধীন হলে যে নৌকাটি বানান তার নাম রাখেন ‘স্বাধীন বাংলা’ এবং এরপর আরও একটা নৌকা বানান, নাম দেন ‘মুক্ত বাংলা’।
উল্লেখ্য, যুদ্ধের সময় হেমায়েত উদ্দিন ভারতে না গিয়ে ৫৫৫৮ জন মুক্তিযোদ্ধাকে সম্পূর্ণ স্থানীয়ভাবে প্রশিক্ষণ দেন এবং পাকিস্তানি হানাদারদের বিরুদ্ধে তুমুল প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। যুদ্ধের পর তাকে বীর বিক্রম উপাধি দেয়া হয়। তার গেরিলা বাহিনী খুলনা, বরিশাল, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, ফরিদপুর এবং গোপালগঞ্জ অঞ্চলে যুদ্ধ করেছে।
২০০৬ সালের ২৮ নভেম্বর মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর আয়োজিত ‘স্মারক সংগ্রহ’ অনুষ্ঠানে ফাদার রিগন যুদ্ধের সময় তার লেখা ‘একাত্তরের দিনলিপি’ ও তার তোলা আলোকচিত্র মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে দান করেন। ফাদার রিগনের স্মারকগুলো গ্রহণ করেন মুক্তিযুদ্ধের উপপ্রধান সেনাপতি ও ভেতরে বাইরে বইয়ের লেখক এয়ার ভাইস মার্শাল (অব) এ কে খন্দকার। দিনলিপিতে মারিনো রিগন লেখেন, ১৯৭১ সালের ১২ জুন সকাল ৮টায় ২৩ জন মিলিটারির দুটি লঞ্চ জলিলপাড়ে ভিড়লো। তাদের সঙ্গে কয়েকজন বাঙালিও ছিল। সৈন্যরা সমস্ত বাজার আগুন দিয়ে পোড়াল। শুধু বাজার নয়, তারা গ্রামে ঢুকে কলিগ্রামের ৫০টি, জলিলপাড়ের ১৮টি এবং বনগ্রামের ২৬টি বাড়ি আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিল। বাজারে একজন ক্যাথলিক খ্রিষ্টানকে দা দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করল। কলিগ্রামের পাষাণের ছেলে রবিদাস কোনো মতে জীবন বাঁচালো। তারা কলিগ্রাম অক্সফোর্ড মিশনের সামুয়েল বিশ্বাসকেও আঘাত করল। বনগ্রামে মিলিটারিরা ৪ জনকে হত্যা করে। শিশির, তন্ময়, উপেন দাস, বাবু মালাকার, নারায়ণ বাড়ৈ এবং আর অনেককে আহত করল। বিকেলে তারা ধ্বংসযজ্ঞ শেষ করে ৬টি খাসি ও অনেক জিনিসপত্র নিয়ে গ্রাম ত্যাগ করল। এই বীভৎস ধ্বংসযজ্ঞের পর আমি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে দেখতে গেলাম। কী করুণ সে আর্তনাদ! বাঁচার জন্য মানুষের কী আকুতি!
শিক্ষা এবং সংস্কৃতি অনুরাগী মারিনো রিগন খুলনার সুন্দরবন এবং এর আশপাশের এলাকায় ছোট-বড় মোট ১৭টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে নামকরা স্কুল হলো সেন্ট পলস স্কুল। তিনি বহু দরিদ্র ছেলেমেয়ের লেখাপড়ার খরচ জুগিয়েছেন নিয়মিত। গ্রামের মানুষকে ভালো চিকিৎসাসেবা দিতে গড়ে তুলেছেন হাসপাতাল। কৃষক মৎস্যজীবীদের জন্য সমবায় সমিতি গঠন করেছেন। সহায়সম্বলহীন বাস্তুভিটাহারাদের জন্য আবাসন প্রকল্প নির্মাণ করেন। ফাদার মারিনো যেখানে গিয়েছেন সেখানেই গঠন করেছেন সাংস্কৃতিক দল। ১৯৫৪ সালে যখন মুজিবনগরের মেহেরপুর থেকে খুলনার মালগাজিতে আসে সেই সময় গ্রামের মানুষ নিয়ে গড়ে তোলেন যাত্রাদল। এরপর কীর্তন ও নাট্যদলও গঠন করেছেন। তার গঠন করা যাত্রাদলের শিল্পীরা পরবর্তীতে দেশের বড় বড় যাত্রাদলে যোগ দিয়ে অনেক খ্যাতি অর্জন করেছেন। সেন্ট পল্স  স্কুলের শিক্ষার্থীদের জন্যও তিনি নাচ, গান, নাটক এবং হাতের কাজ শিক্ষার ব্যবস্থা করেন। ব্যক্তিগত জীবনে মারিনো বাংলাদেশের নাটক এবং যাত্রা খুবই পছন্দ করতেন। সেই প্রথম যখন মেহেরপুরের ভবেরপাড়ায় এসেছিলেন তখনই প্রথম গ্রাম্য শিল্পীদের যাত্রাপালা দেখেন। এরপর থেকে যত দিন তিনি বাংলাদেশে থেকেছেন কখনোই নিজেকে এসব থেকে দুরে সরিয়ে রাখতে পারেন নিই। কোনো কাজে ঢাকায় গেলেই তিনি শিল্পকলা একাডেমিতে যেতেন নাটক দেখতে। কলকাতায় গিয়েও তিনি মঞ্চ নাটক দেখেছেন। সময় পেলেই টেলিভিশনে বাংলাদেশের নাটক দেখতেন। গ্রামের দরিদ্র নারীদের জন্য তিনি ১৯৮২ সালে একটি সেলাই কেন্দ্র নির্মাণ করেন। সেখানে প্রায় শতাধিক নারী প্রশিক্ষণ নিয়ে বাণিজ্যিকভাবে আবহমান বাংলার ঐতিহ্য নকশিকাঁথা সেলাই করেন। তাদের সুঁচের ফোঁড়ে ফোঁড়ে ফুটে ওঠে গ্রামবাংলার অনেক গল্পকথা। তারা সুঁই-সুতায় আমাদের লোকঐতিহ্যের ছবি আঁকেন। ফুল, ফল, হাতি, ঘোড়া, বাঘ, কুমিরসহ বিভিন্ন পশুপাখি, রাখাল, গরুর গাড়ি, সবুজ ধানক্ষেত, পালতোলা নৌকা, ধানভানা, ঢেঁকিতে পাড় দেয়া, পালকি, বরবধূ, হলুদ বরণ, দইওয়ালা, নাগরদোলা, বৈশাখী মেলা, গ্রাম্য হাটবাজারসহ সব কিছু তারা ফুটিয়ে তোলেন নিখুঁতভাবে। ফাদার রিগনের প্রতিষ্ঠিত সেলাই কেন্দ্রের নকশিকাঁথা ছড়িয়ে যায় বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে। এতেও তৃপ্ত হননি তিনি। ১৯৮৬ সালে তার জন্মস্থান ইতালির ভিসেনসায় প্রথম নকশিকাঁথার প্রদর্শনী করেন। এরপর ধারাবাহিকভাবে রাজধানী রোম, বাণিজ্যিক শহর মিলানো, জলকন্যা ভেনিসসহ ইতালির বিভিন্ন শহরে বাংলাদেশের নকশিকাঁথার প্রদর্শনী করেন এবং ইতালীয়দের কাছে বাংলাদেশের ঐতিহ্য তুলে ধরেন। ইতালীয়দের কাছে জনপ্রিয় করে তোলেন আমাদের লোকঐতিহ্যের স্মারক নকশিকাঁথা। এ কাজে রিগনকে সার্বিক সহযোগিতা করেন তার ভাইবোনসহ পরিবারের অন্য সদস্যরা।
বাংলায় বিমুগ্ধ মারিনো রিগন তার দেশ ইতালিতে শুধু নকশিকাঁথা পাঠিয়েই থেমে থাকেননি, তিনি বাংলাদেশের সাহিত্য সংস্কৃতির বিশ্ব বিকাশের চেতনা থেকে ১৯৮৬ সালে ইতালির ব্লোনিয়া শহরে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক শিশুসংগীত প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের শিশুশিল্পী অরিন হককে পাঠান। অরিন সেখানে রবীন্দ্রনাথের ‘আমরা সবাই রাজা, আমাদের এই রাজার রাজত্ব’ পরিবেশন করে প্রথম স্থান অধিকার করে। ইতালীয়রা পরিচিত হয় বাংলা সাহিত্য সংস্কৃতির সঙ্গে। ১৯৮৭ তে মিলানো, ভেনিস, ভিসেনসা, ফিরেন্সেসহ বেশ ক’টি শহরে পল্লীকবি জসীম উদ্দীনের নকশীকাঁথার মাঠ অবলম্বনে নৃত্যনাট্য প্রদর্শিত হয় মারিনোর উদ্যোগে। এছাড়াও নৃত্যশিল্পী শামীম আরা নিপার নেতৃত্বে দুইবার বাংলাদেশের শিল্পীরা ইতালির বিভিন্ন শহরে নৃত্য পরিবেশন করেন।
উল্লেখ্য, ইতালিতে অভিবাসী বাংলাদেশিদের কম্যুনিটি মূলত গড়ে ওঠে ৯০ এর দশকে। সুতরাং বলা যায় ইতালিতে বাংলাদেশি কম্যুনিটি গড়ে ওঠার আগেই ইতালিয়দের কাছে বাংলাদেশের এবং বাংলা সাহিত্য সংস্কৃতির ইতিবাচক পরিচয় করিয়ে দেন মারিনো রিগন।
রবীন্দ্রনাথে আকণ্ঠ নিমজ্জিত মারিনো তার ভাইবোন এবং স্বজনদের নিয়ে ১৯৯০ সালে ইতালিতে প্রতিষ্ঠিত করেন রবীন্দ্র অধ্যয়নকেন্দ্র। রবীন্দ্রনাথ চর্চা এবং বিকাশই মূলত ওই কেন্দ্রের মূল উদ্দেশ্য। ১৯৯১ সাল থেকে রবীন্দ্র কেন্দ্রের উদ্যোগে প্রতিবছর ইতালিতে রবীন্দ্র উৎসব পালিত হয়। ওই কেন্দ্রের উদ্যোগ এবং প্রচেষ্টায় মারিনোর জন্মস্থান ভিল্লাভেরলার একটি সড়কের নাম পরিবর্তন করে রবীন্দ্রনাথের নামে রাখা হয়েছে, ‘ভিয়া তাগোরে’।
উল্লেখ্য, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ইতালীয় ভাষায় ‘তাগোরে’ বলা হয়।
মারিনো রিগনের ভাইবোনসহ অনেক আত্মীয়স্বজন বাংলাদেশে এসেছেন। তারাও বাংলাদেশিদের আতিথেয়তা এবং বাংলা সংস্কৃতির প্রেমে পড়েছেন। তাদের কেউ কেউ বাংলা সংস্কৃতিতে এতটাই মুগ্ধ হয়েছেন যে তারা বহুবার বাংলাদেশে এসেছেন। বারবার ফিরে এসেছেন শেলা নদীর পাড়ে। মারিনোর এক ভাইয়ের মেয়ে মনিকা এবং এক বোনের ছেলে এনরিকো বিয়ে করেছেন বাংলাদেশি রীতিতে। মনিকা তার বন্ধু মিকেয়েলেকে বিয়ে করেন ২০১২ সালে এবং এনরিকো তার বান্ধবী মিরকাকে বিয়ে করেন ২০০০ সালে। তারা শেলাবুনিয়ায় আসেন এবং বাংলাদেশের লোকরীতিতে হলুদ মেখে, লুঙ্গি, শাড়ি পরে, মাইক বাজিয়ে বিয়ে করেন।
ফাদার মারিনো রিগন যেমন বাংলাকে ভালোবেসেছেন তেমনি বাংলার মানুষও তাকে ভালোবেসেছে উদারভাবে। ক্যাথলিক ধর্ম প্রচারক মারিনো বাংলাদেশের যে প্রান্তে গিয়েছেন সেখানের মানুষই তাকে হৃদয় নিঙড়ানো আতিথেয়তা দিয়ে গ্রহণ করেছে। শেলাবুনিয়া ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকার মানুষের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ফাদার রিগন শিক্ষা এবং উন্নয়ন ফাউন্ডেশন। প্রতি বছর ফাদারের জন্মদিনে ওই ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে মংলায় তিন দিনের রিগন মেলা করা হয়। সেখানে বাংলার ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্প, কুটির শিল্প, নকশিকাঁথা, রিগনের বই, আলোকচিত্রসহ বিভিন্ন জিনিসের প্রদর্শনী করা হয়। এছাড়াও মেলায় নৃত্য, গান, যাত্রা, কীর্তন, কবিতা, পদাবলিসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এ মেলায় সংসদ সদস্য, সচিব, মেয়রসহ বিভিন্ন পর্যায়ের সামাজিক প্রতিনিধি এবং প্রশাসনিক ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত থাকেন।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইতিবাচক অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার ফাদার মারিনো রিগনকে ২০০৯ সালে সম্মানসূচক বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান করে এবং ২০১২ সালে মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা প্রদান করে। এছাড়াও বহু পুরস্কার, সম্মাননা, সংবর্ধনা ও মানুষের ভালোবাসা পেয়েছেন তিনি। এর মধ্যে ফাদার মারিনো রিগন খুব আনন্দের সঙ্গে উল্লেখ করেন ১৯৮২ সালের ১৪ মার্চের কথা। ওইদিন রাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তার তার হাতে তুলে দেন কবি জসীম উদ্দীন একাডেমির সাহিত্য পুরস্কার।
উল্লেখ্য, ব্যক্তিগত জীবনে কবি জসীম উদ্দীন এবং মারিনো ছিলেন খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু।
ফাদার মারিনোকে নিয়ে ইতালীয়দেরও গর্বের কোনো শেষ নেই। সাহিত্য এবং মানবকল্যাণে বিশেষ ভূমিকা রাখার জন্য ইতালি থেকেও তিনি পেয়েছেন অনেক পুরস্কার। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, ১৯৯৪ সালে ভেনিসের লায়ন্স ক্লাব পুরস্কার, একই বছরে ইতালির রকো দি অরো পুরস্কার, ১৯৯৫ সালে ড. রবার্ট ডব্লিউ পিয়াসের ম্যান অব দ্যা ইয়ার পুরস্কার, ১৯৯৯ সালে ভিসেনসার অলিম্পিক একাডেমি পুরস্কার, ১৯৯৭ সালে ভিসেনসার বিশেষ নাগরিক সম্মাননা, ২০০২ সালে মারিয়েলে ভেস্ত্রে পুরস্কার, ২০০৩ সালে খ্রিষ্টীয় যোগাযোগ কেন্দ্রের সম্মাননা পদক এবং ২০১২ সালে সাবেরিয়ানি ফাদার্স মিশনের বিশেষ সংবর্ধনা এবং সম্মাননা।
‘ফাদার মারিনো রিগন : ভেনিস টু সুন্দরবন’ শিরোনামে মারিনোর কর্মমুখর এবং বহুমাত্রিক জীবন নিয়ে একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মিত হয় ২০১২ সালে। এটি নির্মাণ করেন আবৃত্তি শিল্পী রবিশঙ্কর মৈত্রী এবং গবেষণায় ছিলেন পুঁথিশিল্পী কাব্য কামরুল। এছাড়াও ২০১০ সালে মারিনোর বাংলাদেশ জীবন ভিত্তিক একটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করে ইতালীয় একটি সংস্থা। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ এবং বাংলা সাহিত্যে বিশেষ অবদান রাখার জন্য ২০১৫ সালে ভেনিস বাংলা স্কুলের ‘কম্যুনিটি অ্যাওয়ার্ড ২০১৫’ প্রদান করা হয় এই বহুমাত্রিক গুণী মানুষটিকে।
আমরা তার আত্মার শান্তি কামনা করছি।

সাপ?তাহিক পতিবেদন

প্রচ্ছদ কাহিনী/প্রতিবেদন
  • ‘মানি লন্ডারিং এবং সন্ত্রাসবাদে অর্থায়ন প্রতিরোধ’ বিষয়ে ব্র্যাক ব্যাংকের কর্মশালা
  •  মতামত সমূহ
    পিছনে 
     আপনার মতামত লিখুন
    English বাংলা
    নাম:
    ই-মেইল:
    মন্তব্য :

    Please enter the text shown in the image.