স্বাধীন কাতালোনিয়া : দুরবর্তী স্বপ্ন -আনিস রায়হান

Print Friendly and PDF

একটি পরাজয় কোনো জাতিকে শত বছর পিছিয়ে দিতে পারে। পরাজিতের পক্ষে দাঁড়ানোর লোক পাওয়া ভার। বিজয়ী দৃপ্ত পদক্ষেপে এগিয়ে যায়, ইতিহাস লেখে। আর পরাজিতরা চাপা পড়ে সেই ইতিহাসের নিচে। পরাজয়ের গ্লানি ভীষণ ভয়ঙ্কর। জয় যেমন এগিয়ে চলার প্রেরণা জোগায়, পরাজয় তেমনি প্রজন্মের পর প্রজন্ম হতাশা উৎপাদন করতে পারে। পরাজয় থেকে শিক্ষা নেয়ার মতো অবশিষ্ট শক্তি, সামর্থ্য ও সুযোগ না থাকলে সেই পরাজয়ের বৃত্ত থেকে বের হওয়া কঠিনতর। কাতালান জনগণ যেন সেই বৃত্তেই বন্দী হতে চলেছেন। ব্যর্থতার শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে কাতালান উত্থান। স্বাধীনতার স্বপ্ন ক্রমশ ডুবছে অন্ধকারের গভীর গহ্বরে। কিন্তু কেন?
জাতিরাষ্ট্র হিসেবে কাতালোনিয়ার গোড়াপত্তন যে একেবারে অসম্ভব, তা কিন্তু নয়। আকারে ছোট হলেও একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হয়ে ওঠার সব গুণাবলিই তার মধ্যে আছে। কাতালোনিয়া হলো স্পেনের একটি স্বায়ত্তশাসিত অঙ্গরাজ্য। এটি বার্সেলোনা, গিরোনা, লেইদা এবং তারাগোনা প্রদেশ নিয়ে গঠিত। এর রাজধানী এবং সর্ববৃহৎ শহর বার্সেলোনা, যা রাজধানী মাদ্রিদের পর স্পেনের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর। কাতালান অঞ্চলের আয়তন ৩২ হাজার ১১৪ বর্গকিলোমিটার। জনসংখ্যা প্রায় ৭৬ লাখ, যা কিনা সুইজারল্যান্ডের জনসংখ্যার সমান। তাদের রয়েছে নিজস্ব পতাকা, আছে একটি পার্লামেন্ট। অর্থনৈতিক দিক থেকে স্পেনের সবচেয়ে সমৃদ্ধ এ অঞ্চল থেকেই আসে সে দেশের মোট জিডিপির এক-পঞ্চমাংশ। কাতালান অঞ্চলের নিজস্ব পুলিশ বাহিনীও রয়েছে। রয়েছে নিজস্ব সম্প্রচার নিয়ন্ত্রক, বিদেশে কিছু ‘মিশন’ ও মিনি দূতাবাসও পরিচালনা করে তারা। কাতালানদের রয়েছে নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি। তাদের লিখিত ইতিহাস এক হাজার বছরেরও পুরনো। এমনকি কাতালান জাতীয়তাবাদী দলও বেশ জনপ্রিয়। স্থানীয় পার্লামেন্টের ক্ষমতায়ও ছিল তারা। তাদের আয়োজনেই কাতালোনিয়ার স্বাধীনতার প্রশ্নে ১ অক্টোবর ২০১৭ গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। ২৭ অক্টোবর ২০১৭ দলটির নেতা কার্লোস পুজেমনের কণ্ঠে ঘোষিত হয় কাতালোনিয়ার স্বাধীনতা। তা সত্ত্বেও কেন এই পশ্চাদপসরণ? কাতালান স্বাধীনতার সূর্য কেন পাচ্ছে না দিগন্তের দেখা? তবে কি ইউরোপে আর নতুন করে জাতিরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নেই? নাকি স্পেনের সাম্রাজ্যবাদী পুঁজির বন্ধন থেকে কাতালান পুঁজিপতিদের মুক্তি অসম্ভব বিধায় আটকে গেছে স্বাধীনতার চাকা? এসব প্রশ্নের গভীরে গেলেই জবাব মিলবে যে, কেন কাতালান স্বাধীনতা অনিশ্চয়তার পথে!

দুই
প্রক্রিয়াগত দিক থেকে দেখলে স্বাধীনতার দিকে কাতালোনিয়া অনেক দূরই এগিয়ে গেছে। স্বাধীনতার প্রশ্নে গণভোটে ৯০ ভাগ ভোট পড়েছে কাতালান স্বাধীনতার স্বপক্ষে। যদিও ভোটে অংশ নিয়েছেন মাত্র ৪৩ ভাগ জনগণ। এই ফলাফলের ওপর ভিত্তি করেই স্বাধীনতার ঘোষণা এসেছে কাতালান পার্লামেন্ট থেকে। স্থানীয় পুলিশও স্বাধীনতার পক্ষেই অবস্থান নিয়েছে। কাতালান ব্র্যান্ডমার্ক প্রতিষ্ঠান বার্সেলোনা ফুটবল টিমও স্বাধীনতার পক্ষে তাদের অবস্থান ঘোষণা করেছে। ইউরোপের কোনো দেশে এতখানি অগ্রসর হওয়া গেলে, স্বাধীনতা আর খুব বেশি দূরে থাকে না। শুরুতে স্পেনেও তেমনটাই ঘটবে বলে মনে হচ্ছিল। যেভাবে কাতালোনিয়ায় একের পর এক ঘটনা ঘটতে লাগল, তাতে মনে হচ্ছিল যেন স্পেন ভাঙাটা সময়ের ব্যাপার মাত্র। কিন্তু সেরকম কিছু ঘটতে যে এখনও অনেক দেরি- তা এখন মোটামুটি পরিষ্কার।
স্বাধীনতা ঘোষণার পর তা বাস্তবায়নের জন্য যে লড়াইয়ের দরকার ছিল, তার ছিঁটেফোঁটাও দেখা যাচ্ছে না। কাতালানরা যেন এক গণভোট করতে গিয়েই সব শক্তি নিঃশেষ করে ফেলেছে। ১ অক্টোবরের গণভোটের পরই এর আয়োজকরা স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি। কাতালান নেতারা আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার কথা বললেও স্পেন সরকার অনমনীয় অবস্থান নেয়। কাতালান পার্লামেন্ট বাতিল, ওই অঞ্চলের স্বায়ত্তশাসন রদ এবং পুলিশসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ব্যাপক পরিবর্তনের ঘোষণা দেয় স্পেনের কেন্দ্রীয় সরকার। এর বিপরীতে স্বাধীনতার ঘোষণা এলেও তা বাস্তবায়নের চেষ্টা দেখা যায়নি। কাতালান প্রেসিডেন্ট কার্লোস পুজেমন কার্যত দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছেন। আরও চার মন্ত্রীসহ তিনি আশ্রয় নিয়েছেন বেলজিয়ামে। তার সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীরা অধিকাংশ ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছেন। আটজন মন্ত্রী রিমান্ডে গেছেন। তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ, জনগণকে বিক্ষোভে অংশ নিতে উস্কানি দেওয়া এবং সরকারি তহবিল অপব্যবহারের অভিযোগ আনা হয়েছে। একই অভিযোগে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে পুজেমন ও তার চার সহযাত্রীর বিরুদ্ধেও।
স্পেন সরকারের শক্তির অন্যতম একটি উৎস হলো সে দেশের আইন। স্পেনের সংবিধানে উল্লেখ আছে যে, দেশটিকে বিভক্ত করা যাবে না। তাই কাতালান গণভোটের দাবি সে দেশের সাংবিধানিক আদালতে নাকচ হয়ে গিয়েছিল। তারপরও যখন কাতালোনিয়ায় গণভোটের প্রস্তুতি চলে, সরকারের আবেদনের প্রেক্ষিতে তখন সাংবিধানিক আদালত এই গণভোটের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করেই শেষ অবধি গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু গণভোট করার পর বা স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েও কাতালোনিয়া নিজেদের পক্ষে ইউরোপ বা পৃথিবীর অন্য কোনো দেশের সমর্থন আদায়ে সক্ষম হয়নি। ফলে স্পেন সরকার দ্রুততার সঙ্গে কাতালোনিয়ার পার্লামেন্ট ভেঙে দিয়েছে এবং তার নেতাদের গ্রেপ্তার করেছে। ইতোমধ্যে কাতালোনিয়ায় আগামী ডিসেম্বরে নতুন নির্বাচনের ডাকও দিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার।

তিন
কাতালান জনগণ যে রুখে দাঁড়াচ্ছে না বা একেবারেই চুপ করে আছে, তেমন কিন্তু নয়। কিন্তু তাদের প্রতিবাদের তুলনায় স্পেন সরকারের গৃহীত পদক্ষেপগুলোই যেন সফলতার মুখ বেশি দেখছে। স্পেনের কেন্দ্রীয় সরকারের শক্তির আরেকটি উৎস ঠিক এখানেই। কাতালান জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশকে এখনও স্পেনের দিকে ধরে রাখতে পেরেছে তারা। গণভোটের আগে পুজেমনের সরকারের আয়োজিত গণভোটে দেখা যায়, স্বাধীনতার পক্ষে আছে ৪১ ভাগ কাতালান, আর বাকিরা স্বাধীনতার বিপক্ষে। পার্লামেন্টের বিরোধী দলগুলোও ছিল স্বাধীনতার বিপক্ষে। কাতালানদের একাংশ যেমন স্বাধীনতার দাবিতে রাস্তায় নেমেছে, বিক্ষোভ করেছে, তেমনি তাদের আরেক অংশ স্পেনের ঐক্যের পক্ষে সে­াগান দিয়েছে, অবস্থান নিয়েছে। ফলে মাদ্রিদ সরকারের জন্য আন্দোলন ঠেকানো বেশ সহজই হয়ে গেছে।
পুজেমনের দল ইতোমধ্যে নির্বাচনে অংশগ্রহণের ঘোষণা দিয়েছে। কিন্তু এই নির্বাচন আয়োজনের মধ্য দিয়েই তাদের সমর্থন ও রাজনীতিতে ধস নামবে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। পুজেমন প্রশাসনের গণভোট ঠেকানোটা ছিল স্পেন সরকারের কাছে এক মারাত্মক চ্যালেঞ্জ। অর্ধেকেরও বেশি ভোটারকে ভোট দিতে না দিয়ে সেক্ষেত্রে তারা কিছুটা সফল হলেও শেষ রক্ষা হয়নি- গণভোট তারা ঠেকাতে পারেনি। এই গণভোটের প্রক্রিয়ায় কাতালোনিয়া আলাদা হতে পারলে তা হতো স্পেনের বর্তমান ক্ষমতাসীন পিপলস পার্টির জন্য এক চরম আঘাত। এই ব্যর্থতার দায় পুরোটা তাদের কাঁধেই চাপত। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী মারিয়ানো রাহোয় শক্ত হাতেই সংকট সামাল দিচ্ছেন। ঠিক একইভাবে স্বাধীনতার দাবিকে সামনে রেখেই জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে পুজেমনের দল। এখন যদি স্বাধীনতার ঘোষণার পরে সরকার তা সামাল দিতে সক্ষম হয় এবং স্বাধীনতার দাবিতে পাত্তা না দিয়ে পুনরায় নির্বাচন আয়োজন করে, সেটা হবে পুজেমনের দলের জন্য চরম ব্যর্থতার এক স্মারক। স্পেন সরকার যদি ডিসেম্বরে নির্বাচন আয়োজন করতে পারে, তাহলে প্রমাণ হবে- কাতালোনিয়ার মানুষ স্পেনের আইনকে মান্য করে, গণভোটের ফল অগ্রাহ্য করে সরকারের দেয়া নির্বাচনকে তারা বৈধ মনে করে, স্পেনের কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশ নিতেও তাদের আপত্তি নেই। অর্থাৎ যা কিছু সমস্যা হয়েছে তার দায় চাপবে পুজেমনদের ঘাড়ে।
পরিস্থিতি কিছুটা প্রতিকূল হতে পারে পুজেমনের দল পুনরায় জয়লাভ করলে। সেই সম্ভাবনা একেবারে বাতিল করা যায় না। কারণ স্পেন সরকারের তীব্র নিপীড়ন। স্পেনের কেন্দ্রীয় সরকারের নিপীড়নের ফলে স্বাধীনতার দাবির সপক্ষে জনসমর্থন বাড়তে পারে। যেকোনো ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি চরম বাঁক নিতে পারে। তেমন কিছু ঘটতে পারে, স্পেন সেজন্য আগে থেকেই প্রস্তুত। পুজেমনের দলের সমর্থক সংঘ, স্থানীয় ক্লাব, আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে নজরদারির মধ্যে আনছে তারা। এসব চাপ এবং স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েও আলাদা হতে না পারার হতাশা পুজেমনের দলকে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলবে বলে আশা স্প্যানিশদের। এর বিপরীত কিছু ঘটলে স্পেন সরকার চাপে থাকবে। তবে তাতেও কাতালান স্বাধীনতা আদায় হয়ে যাবে না। কারণ স্পেন সরকার বিচ্ছিন্নতা প্রশ্নে কোনো গণভোটে যেতেই রাজি নয়। ফলে স্বাধীনতার পক্ষের কোনো দল নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও শান্তিপূর্ণ উপায়ে যে কাতালানরা এই সংকটের সমাধান করতে পারবে, তেমন কোনো সম্ভাবনা নেই।

চার
কেন পৃথক কাতালানিয়ার দাবি উঠেছে? এই দাবির শিকড় কত গভীরে গ্রোথিত, তার ওপরেই নির্ভর করে যে স্বাধীনতার জন্য কাতালানরা কতটা মরণপণ সংগ্রাম চালাবে। কাতালোনিয়া পৃথক হতে চাওয়ার অন্যতম কারণ রাজনৈতিক। স্পেনের সংসদে ২০০৬ সালে প্রণীত এক আইনে কাতালোনিয়াকে স্বায়ত্তশাসনের ঊর্ধ্বে কিছু ক্ষমতা দেয়া হয়। ওই আইনে কাতালেনিয়াকে উল্লেখ করা হয় একটি ‘জাতি’ হিসেবে। কিন্তু সংবিধানে কাতালোনিয়াকে দেয়া এরকম অনেক ক্ষমতা পরে স্পেনের সাংবিধানিক আদালত বাতিল করে দেয়, যা কাতালোনিয়ার স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে ক্ষুব্ধ করে তোলে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় বছরের পর বছর ধরে চলা অর্থনৈতিক মন্দা, সরকারি খরচ কমানোর ধাক্কাও।
এই অবস্থায় কাতালোনিয়ায় ২০১৪ সালে অনানুষ্ঠানিক স্বাধীনতার প্রশ্নে একটি গণভোটের আয়োজন হয়। তখন ভোটার ছিল ৫৪ লাখ। ভোটে অংশ নেয় ২০ লাখেরও বেশি ভোটার। কর্মকর্তারা ঘোষণা করেন, ৮০ শতাংশেরও বেশি ভোটার স্পেন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পক্ষে রায় দিয়েছে। অর্থাৎ জনরায় ছিল- কাতালোনিয়া চায় স্বাধীনতা। কিন্তু সেটা ছিল অনানুষ্ঠানিক এক গণভোট। এরপর বিচ্ছিন্নতাবাদীরা ২০১৫ সালে কাতালোনিয়ার নির্বাচনে জয়লাভ করে। তখন তারা এমন একটি গণভোট আয়োজনের কথা বলে যার আইনি বৈধতা থাকবে এবং সেটা মানতে কেন্দ্রীয় সরকার বাধ্য হবে। স্পেনের সংবিধানকে লঙ্ঘন করেই তারা এই ঘোষণা দেয়। কারণ সংবিধানে বলা আছে, স্পেনকে ভাগ করা যাবে না। ফলে সংবিধান উপেক্ষা করেই তারা শেষ অবধি নির্বাচনের পথে হেঁটেছে।

পাঁচ
রাজনৈতিক ইস্যুর চেয়েও বেশি প্রভাব রেখেছে অর্থনীতির নানা হিসাব নিকাশ। অভিযোগ রয়েছে, তুলনামূলক ধনী কাতালোনিয়া রাষ্ট্র থেকে যা পাচ্ছে তার চেয়ে বেশি দিচ্ছে। যদি কাতালোনিয়া পৃথক হয়ে যায়, তবে স্পেনের অর্থনীতির ২০ শতাংশের মালিকানা চলে যাবে কাতালানদের হাতে। কাতালোনিয়া স্বাধীন হলে অর্থনৈতিকভাবে একটি সমৃদ্ধ রাষ্ট্র হিসেবেই আত্মপ্রকাশ করবে। অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (ওইসিডি) হিসাব অনুসারে কাতালোনিয়ার মোট জিডিপি দাঁড়াবে ২৯২ বিলিয়ন ইউরো, যা পর্তুগাল ও হংকংয়ের থেকে বেশি। জিডিপিতে বিশ্বের ৩৪তম স্থানে থাকবে কাতালানরা। মাথাপিছু জিডিপি কমবেশি ৩০ হাজার ইউরো, যা দক্ষিণ কোরিয়ার থেকে বেশি। স্পেনের মোট বৈদেশিক রপ্তানির এক-চতুর্থাংশের বেশি হয় কাতালোনিয়া থেকে। কাতালোনিয়া ৬৫ দশমিক ১ বিলিয়ন ইউরো রপ্তানি থেকে আয় করে, যা স্পেনের যেকোনো প্রদেশের দ্বিগুণ। পর্যটন শিল্পেও অঞ্চলটি অনেক সমৃদ্ধ। গত বছর স্পেন ভ্রমণ করা সাড়ে সাত কোটি পর্যটকের মধ্যে এক কোটি ৮০ লাখের প্রাথমিক গন্তব্য ছিল কাতালোনিয়া। ইউরোপের সবচেয়ে বড় রাসায়নিক বাণিজ্য কেন্দ্রও সেখানে অবস্থিত। রাজধানী বার্সেলোনা ইউরোপ মহাদেশের প্রধান ২০টি সমুদ্রবন্দরের মধ্যে একটি।
অর্থনীতির এসব হিসাব স্বাধীনতাকামী কাতালানদের মধ্যে যে সে­াগানটিকে জনপ্রিয় করে তুলেছে, তা হলো- ‘মাদ্রিদ আমাদের ডাকাতি করছে’। কাতালোনিয়ার বড় শহরগুলোর অধিবাসী, শিক্ষিত জনগোষ্ঠী এবং ধনী ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, পৃথক হলে কাতালোনিয়া অর্থনৈতিকভাবে আরও বেশি সমৃদ্ধ রাষ্ট্র হবে। অর্থনৈতিক মন্দার সময় স্পেনের অর্থনীতির ভার তাদের অনেকটাই বহন করতে হয়েছে। এজন্য রাষ্ট্রীয় কৃচ্ছ্রতার নীতি কাতালোনিয়াকেও অনুসরণ করতে হয়েছে। এটা তাদের মোটেও পছন্দের নয়। দীর্ঘদিন ধরেই ইউরোপে অঞ্চলভেদে অর্থনৈতিক বৈষম্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। অর্থনৈতিকভাবে অগ্রসর অঞ্চলের শাসকরা অনগ্রসর অঞ্চলের সঙ্গে আর সম্পদের ভাগাভাগিতে যেতে চাইছেন না। কাতালানদের একটি অংশও তেমনি মনে করছে, স্পেনের অর্থনীতিতে তাদের যে অবদান, সে হিসেবে প্রাপ্তি কম। পরিসংখ্যান দেখিয়ে তারা বলছে, স্পেনে বেকারত্বের হার এই মুহূর্তে ১৮ শতাংশ, আর কাতালোনিয়ায় তা ১৩ শতাংশর কম।

ছয়
কিন্তু জনপ্রিয় এসব হিসাব-নিকাশ ও দাবি দাওয়াই পুরো সত্য নয়। সত্যের কিছু অংশ এখানে বাদ পড়েছে বা চেপে রাখা হয়েছে। কাতালান আঞ্চলিক সরকারের ৭ হাজার ৭০০ কোটি ইউরো ঋণ রয়েছে। যার মধ্যে ৫ হাজার ২০০ কোটি ইউরো পাবে স্পেনের কেন্দ্রীয় সরকার। স্বাধীনতার পর কাতালোনিয়া তা কীভাবে পরিশোধ করবে তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। সেই সঙ্গে প্রশ্ন রয়েছে, মাদ্রিদের জাতীয় ঋণের অংশ কি বার্সেলোনার কাঁধে চাপবে? কাতালোনিয়ায় থাকা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো অধিকাংশই স্পেনের জাতীয় সক্ষমতার অংশীদার। অর্থাৎ স্পেন যে সাম্রাজ্যবাদী ক্ষমতার অধিকারী, এর ফলে বিশ্বজোড়া তারা যেসব সুবিধা ভোগ করে কাতালান প্রতিষ্ঠানগুলো তার বাইরে নয়। তাই ব্যবসার প্রয়োজন বা মুনাফার হিসাবেই কাতালান বড় পুঁজিপতিরা স্পেনের সাম্রাজ্যবাদী ক্ষমতা কাঠামোর অংশীদার থাকতে ইচ্ছুক।
অচলাবস্থা সৃষ্টির শুরুতেই দেখা গেল, একে একে সব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কাতালোনিয়া থেকে নিজেদের সদর দপ্তর গুটিয়ে চলে যাচ্ছে। এরই মধ্যে ব্যাংক, বীমা, আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ শতাধিক কোম্পানি কাতালোনিয়া থেকে ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে নির্ঘাত অর্থনৈতিক মন্দায় পড়বে কাতালোনিয়া। অঞ্চলটির স্বাধীনতার ঘোষণায় গ্রাহকরা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে আমানত তুলে নিতে পারে, এ ধরনের আভাস থেকে এমন সিদ্ধান্তের কথা বিবেচনা করছে ব্যাংকগুলো। স্পেনের পঞ্চম বৃহৎ ব্যাংক বাংকো সাবাদেল প্রতিষ্ঠানের সদর দপ্তর স্প্যানিশ শহর আলিকান্তে স্থানান্তর করেছে। অন্যদিকে নিজেদের রেজিস্টার্ড দপ্তর বেলারিক দ্বীপপুঞ্জে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে কাইসাব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ। ব্যাংকগুলো চায় না মাদ্রিদের গ্রাহকরা তাদের কাতালান ব্যাংক হিসেবে দেখুক। এসব প্রতিষ্ঠান আসলে খুব নাজুক অবস্থায় ব্যবসা করছে। শেয়ারবাজারে ইতোমধ্যেই বিপাকে আছে দুই পক্ষই, তবে কাতালান প্রতিষ্ঠানগুলোতেই দরপতনের হার সবচেয়ে বেশি।

সাত
কাতালোনিয়ার স্বাধীনতার দাবি অন্ধকারে পাঠাতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভূমিকাও কম নয়। ইইউ গোড়াতেই স্পেনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। নিজেদের স্বার্থেই ফ্রান্স, জার্মানির মতো ইইউভুক্ত বড় সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলো স্পেনের পুঁজিপতি ও শাসকশ্রেণির নিরাপত্তার প্রশ্নে খুবই নিবেদিত। তাই তারা শুরুতেই কাতালোনিয়াকে আইনের ভয় দেখিয়েছে। ইইউ আইন অনুযায়ী স্পেন থেকে আলাদা হলে কাতালোনিয়াকে ইইউর সদস্যপদ পেতে নতুন করে আবেদন করতে হবে। আর তা বাস্তবায়নে স্পেনসহ ইইউর সব দেশের সম্মতি লাগবে। সে পর্যন্ত যাওয়া তো দূরে থাক, কাতালান গণভোটের পরই ইউরোপিয়ান কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড টাস্ক এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, এই সংকট নিয়ে উদ্বিগ্ন হলেও এ বিষয়ে নাক গলাবে না ইউরোপ। তিনি স্পষ্ট জানান, এ বিষয়ে মধ্যস্থতা, আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ বা প্রতিক্রিয়া দেখানোর কোনো সুযোগ নেই। জার্মানির চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মরকেল এবং ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাঁক্রোসহ অন্যান্য ইউরোপীয় নেতাও মাদ্রিদের প্রতি তাদের সমর্থন জানিয়েছেন। ফলে কাতালোনিয়া একেবারেই একা হয়ে গেছে, একা রয়ে গেছে।
ইউরোপীয় নেতারা কাতালান ইস্যুর মধ্য দিয়ে একটি বার্তাও দিয়ে রাখলেন। সেটা হলো, ছোট ও শান্তিপূর্ণ রাষ্ট্রের চেয়ে তারা বরং শক্তিশালী ও বড় ইউরোপীয় রাষ্ট্রের পক্ষে। ইইউ নেতাদের আশঙ্কা, কাতালোনিয়ার স্বাধীনতা ইউরোপের অন্যান্য অঞ্চলে স্বাধীনতার চেতনাকে উসকে দিতে পারে। জার্মানির বাভারিয়া, ইতালির সার্দিনিয়া, উত্তর আয়ারল্যান্ড, ফ্রান্সের ব্রিটানি অঞ্চলে পৃথক হওয়ার রাজনীতি জোরদার হতে পারে। ফ্রান্সের নরম্যান্ডি, ব্রিটেনের অর্কনি দ্বীপ, ডেনমার্কের বর্নহম অঞ্চলে অধিকতর ক্ষমতা অর্জনের কর্মসূচি জোরালো হচ্ছে। ব্রিটেনের ইইউ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত এসব অঞ্চলের পৃথক হওয়া বা অধিকতর স্বায়ত্তশাসনের চিন্তাভাবনাকে প্রভাবিত করছে নিশ্চিত করেই। একইসঙ্গে কাতালোনিয়ার স্বাধীনতা আন্দোলনও তাদের শক্তি জোগাচ্ছে। কাতালানদের দাবির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন স্কটিশ নেত্রী নিকোলা স্টারজেন। স্বাধীনতার দাবি উঠেছে, ইতালির দক্ষিণ টিরোল রাজ্যেও। ইউরোপের আরেক দেশ- বেলজিয়ামের ফ্ল্যান্ডার্স অঞ্চলেও সোচ্চার স্বাধীনতাকামীরা। কাতালানদের মতো তাদেরও অভিযোগ, তাদের লাভের অংশ চলে যাচ্ছে দেশের অন্যত্র।
কার্যত পুরো বিশ্বের মতো ইউরোপও এখন হাঁটছে উগ্রপন্থার পথে। এই ইউরোপ উগ্র ডানপন্থিদের জোট গঠনের সম্ভাবনাই ভীত। তারা ভীত ইইউ ভেঙে পড়ার আশঙ্কায়। এরকম একটা অবস্থায় ঐক্যবদ্ধ থাকাটাই টিকে থাকার বড় শর্ত হিসেবে দেখছে তারা। ইইউর এই নীতিকেই ইউরোপের অনেকে মনে করছেন জবরদস্তি। ইইউ থেকে যে অর্থনৈতিক কর্মসূচি বা প্যাকেজ স্থানীয় পর্যায়ে পৌঁছে দেয়া হচ্ছে, সেগুলো জনসাধারণ গ্রহণ করছে না। মন্দা মোকাবিলায় ইইউর চাপিয়ে দেয়া সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করায় রাষ্ট্রগুলোর আঞ্চলিক পর্যায়ে তাই ক্ষোভ, বিক্ষোভ বাড়ছে। এভাবে ইইউ যেমন একদিকে কাতালান স্বাধীনতাকে কঠিন করে তুলেছে, তেমনি কাতালোনিয়ার শিক্ষা ইইউর অস্তিত্বকেই দীর্ঘমেয়াদে হুমকির মুখে ফেলছে।

আট.
কার্যত কাতালান জাতীয়তাবাদ জনপ্রিয় হয়ে ওঠার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে সেখানকার মিডিয়া। স্থানীয়ভাবে সবচেয়ে প্রভাবশালী পত্রিকা কাতালোনিয়া টুডে’তে এক সময় কাজ করেছেন কার্লোস পুজেমন। কাতালান নিউজ এজেন্সির পরিচালকও ছিলেন ২০০৬ সালে রাজনীতিতে আসার আগ পর্যন্ত। ফলে কাতালান জনগণ সেখানকার মিডিয়ার নানা খবরে স্বাধীনতার আকাক্সক্ষার ছাপ দেখেছে। এভাবে পুজেমনের সমর্থন বেড়েছে, জনগণের স্বাধীনতার আকাক্সক্ষাও হাওয়ায় পাল তুলেছে। কিন্তু বড় পুঁজিপতিরা সরে দাঁড়ানোয়, এর ফলে অর্থনৈতিকভাবে স্পেনকে চ্যালেঞ্জ করতে না পারায় আন্দোলন বাধাগ্রস্ত হয়েছে, হচ্ছে। এর চেয়েও বড় একটি কারণ হলো কাতালান অঞ্চলের নিপীড়িত বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সঙ্গে এই আন্দোলনের বিচ্ছিন্নতা। গ্রামাঞ্চলের কম শিক্ষিত কাতালানরা এবং এই অঞ্চলে এসে বসতি গড়া বিভিন্ন অঞ্চলের স্প্যানিশরা স্বাধীনতার ফল সম্পর্কে দ্বিধাগ্রস্ত। ফলে সবচেয়ে সংগ্রামী ও লড়াকু হওয়ার কথা যাদের, তাদের বাদ দিয়েই আন্দোলন হয়েছে। যে কারণে আন্দোলন জঙ্গি হয়নি, শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলা যায়নি, স্পেনের কেন্দ্রীয় সরকারের নিপীড়ন এবং ইইউর বিরোধিতার জাল ছিন্ন করা সম্ভব হয়নি।
এদিকে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন যে স্পেন সরকারকে টলাতে পারবে না, এটা পরিষ্কার। গণভোটের সময় স্পেন সরকারের ঘোষণা ও পদক্ষেপ এটা প্রমাণ করেছে। পুরনো ইতিহাসও সুখকর নয়। এর আগে কাতালোনিয়ার স্বাধীনতা ঘোষণার কারণে ১৯৩৪ সালে দ্রুত বিচারে লুইস কমপ্যানিসের ৩০ বছরের কারাদণ্ড হয়। পরবর্তীকালে ১৯৪০ সালে ফ্রাঙ্কোর জমানায় তার ফাঁসি হয়। এবারেও কাতালান মন্ত্রীদের একই পরিণতি হবে বলে স্পেনের কেন্দ্রীয় সরকারের কর্তারা হুমকি দিয়ে রেখেছেন।
সব মিলিয়ে পরিষ্কার যে, স্বাধীনতার জন্য কাতালানদের আরও ঐক্য ও তীব্র সংগ্রামের বাইরে আর তেমন কোনো পথ খোলা নেই। কিন্তু কাতালান নেতারা এখন ভিন্ন পথ খুঁজতেই বেশি ব্যস্ত। কাতালান পার্লামেন্টের বিরোধী দলগুলো, যারা স্পেনের ঐক্যের পক্ষেই অবস্থান নিয়েছিল, তারা এখন এই সংকটের একটি সম্মানজনক সমাধান বের করার চেষ্টা করছে। স্বাধীনতার জন্য যে লড়াই হলো, তার কিছু ফলাফল জনগণকে দিতে হবে, নইলে জনগণ নতুন সরকারকে ভালো চোখে দেখবে না বলে তারা মনে করছে। এরই অংশ হিসেবে স্বাধীনতার দাবি ত্যাগ করে বরং বিশেষ স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল হিসেবে স্পেনের সঙ্গে থাকার প্রস্তাব আনছে তারা। যেখানে কাতালোনিয়ার জন্য আরও সুবিধা আদায় করে নেয়াটাই তাদের লক্ষ্য।

কাতালান স্বাধীনতার দাবি অন্ধকারে ডুবতে বসলেও, আপাতত তা, দুরবর্তী স্বপ্ন মনে হলেও, দুনিয়ার মানুষের জন্য এখান থেকে শিক্ষা নেয়ার অনেক কিছুই রয়েছে। ইউরোপ যে গণতন্ত্রহীনতায় ভুগছে তা আবারও প্রমাণ হলো। প্রমাণ হলো, স্কটিশ পুঁজিপতিদের মতো কাতালান পুঁজিপতিরাও রাষ্ট্রের সাম্রাজ্যবাদী ক্ষমতার সমঝদার। দেখা গেল, স্থানীয় জনগণের দ্বিধা-দ্বন্দ্ব দূর না হলে, সবচেয়ে দুর্গত জনগোষ্ঠীকে আন্দোলনে টেনে আনতে না পারলে সেই আন্দোলনের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। ইউরোপে ক্ষমতার ভারসাম্যে পরিবর্তন না এলে সেখানে নতুন জাতিরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ একেবারেই অনিশ্চিত। কাতালান জনগণের কোনো অংশ হয়তো এ থেকে শিক্ষা নেবে, নইলে অন্য কেউ এগিয়ে যাবে এই ভুল-ত্রুটি থেকে মুক্ত হয়ে। সামাজিক আন্দোলনের এটাই মূল ইতিবাচক দিক যে, এখানে এক দল নেতিবাচক ফল পেলেও অন্যদের জন্য তা ঠিকই ইতিবাচক শিক্ষা রেখে যায়।

সাপ?তাহিক পতিবেদন

 মতামত সমূহ
পিছনে 
 আপনার মতামত লিখুন
English বাংলা
নাম:
ই-মেইল:
মন্তব্য :

Please enter the text shown in the image.