নির্বাচনী রাজনীতি : অনিশ্চয়তা কাটছে! -শুভ কিবরিয়া

Print Friendly and PDF

রাজনীতিতে মুখের লড়াই চলছে। বাকযুদ্ধ থামার লক্ষণ নাই। দলের যারা মুখরা মুখপাত্র, তাদের মুখ সজোরে চলছেই। পরস্পরকে ঘায়েল করতে, যুক্তিতর্কের বদলে দোষারোপ আর পাল্টা দোষারোপের রাজনীতির বাক্যস্রোত বিপুল বেগেই বহমান। এই রাজনীতি মাঠের রাজনীতিতে উষ্ণতা আনতে না পারলেও কখনো কখনো আশার সম্ভাবনা জাগিয়ে তুলছে। একদিকে বিশেষ আদালত বানিয়ে, আদালত সীমার বাইরে, বকশিবাজারে চলছে বিএনপি নেত্রী বেগম জিয়ার দুর্নীতি মামলার বিচার। আবার অন্যদিকে ঢাকা টু কক্সবাজার সড়কপথে সফর করার সুযোগও পেলেন তিনি। ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের দুদিনের হঠাৎ বাংলাদেশ সফরের ওছিলায় ফিরলেন বেগম জিয়া লন্ডন থেকে তিন মাসের নীরব সফর শেষে। তারপরই গেলেন রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির পরিদর্শনে। বেগম জিয়ার মাথার ওপর ঝুলছে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা। তবুও তিন মাস পর দেশে ফিরে তিনি সুষমা স্বরাজের সঙ্গে সাক্ষাৎ পেলেন। রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্প ঘুরে এলেন। সরকার নিশ্চুপ। বেগম জিয়ার সড়কপথে সুদীর্ঘ সফর নির্বিঘেœই ঘটেছে। তাহলে কি ধরে নিতে হবে সরকার বেগম জিয়ার প্রশ্নে কোনো নমনীয় নীতি গ্রহণ করেছে? এটি কি আমাদের বিরোধপূর্ণ রাজনীতিতে সরকারি দলের শুভবুদ্ধির সুআচরণ? নাকি এটিও একটি রণকৌশল? নাকি, আঞ্চলিক শক্তিধর দেশগুলোর মধ্যস্থতায় এক ধরনের মীমাংসাবাদী সমঝোতার আভাস?
এসব হরেক প্রশ্ন এখন রাজনীতির ময়দানজুড়ে। সব প্রশ্নের সব উত্তর সবসময় পাওয়া মুশকিল। তবে কতগুলো ইঙ্গিত বিবেচনাযোগ্য। চলমান রাজনীতির কতগুলো বৈশিষ্ট্য আলোচনা করা যেতে পারেÑ রাজনীতির এই গতিমুখ বুঝতে চাইলে।

০২.
আমাদের রাজনীতিতে এখন বিতর্ক এবং শঙ্কার জায়গা একটিই। সেটি হলো ২০১৯ সালে একাদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান ঘিরে। এই নির্বাচন ঘিরে হরহামেশাই যেসব প্রশ্ন উঠছে, উড়ছেÑ
এক. ২০১৯ সালেই কি একাদশ সংসদ নির্বাচন হবে?
দুই. নির্বাচনে কি সব দলের অংশগ্রহণে অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, গ্রহণযোগ্য হবে?
তিন. নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা কী হবে?
চার. বিএনপি কি আওয়ামী লীগের অধীনেই নির্বাচনে অংশ নেবে?
পাঁচ. আওয়ামী লীগ কি বিএনপির সহায়ক সরকারের দাবি মেনে নেবে?
ছয়. নির্বাচন কমিশন কি সরকারের প্রভাবমুক্ত থাকতে পারবে?
সাত. নির্বাচনে ভারতের ভূমিকা কী হবে? ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির মতোই কি ভারতের সক্রিয় ভূমিকা থাকবে?
আট. দশম সংসদ নির্বাচনে আমেরিকা যেরকম নীরব ভূমিকা পালন করেছিল, এবারও কি সেরকম ভূমিকাই পালন করবে, নাকি সরব হবে?
নয়. বিএনপির ন্যূনতম দাবি পূরণ না হলেও কি বিএনপি নির্বাচনী মাঠে থাকবে? নাকি, অবশেষে নির্বাচন বয়কটের ঘোষণা দেবে?
দশ. দুর্নীতি মামলায় বেগম জিয়ার সাজা হলে, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় তারেক জিয়া দ- পেলেও কি বিএনপি তাদের ছাড়াই নির্বাচনে অংশ নেবে?

০৩.
একাদশ সংসদ নির্বাচন যদি একটা নিশ্চয়তার পথ না পায়, তাহলে বিবাদ-বিভেদ দেশের ওপর যে চাপ তৈরি করবে, তা সহ্য করার ক্ষমতা কি দেশের অর্থনীতি বা রাজনীতির আছে? এই প্রশ্নটিও খুব গুরুত্বপূর্ণ।
দশম সংসদ নির্বাচন যে প্রক্রিয়ায় হয়েছে, তা গণতান্ত্রিক রীতিকে শুধু পর্যুদস্তই করেনি, দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে ভীষণতরভাবে চরমপন্থা এবং বলপ্রয়োগের দিকে ঠেলেছে। কাজেই এই বিভীষিকাময় রাজনৈতিক প্রতিশোধপরায়ণতা যদি স্বাভাবিক নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দম ফেলার সুযোগ না পায়, তবে তা অস্বাভাবিক পথেই বেরুতে চাইবে। সেটিই হচ্ছে বিপদের কথা।
এখন, বিবেচ্য বিষয় হচ্ছে, বাংলাদেশের উন্নয়ন, অর্থনীতি, সামাজিক প্রবৃদ্ধি সেই চরমপন্থার চাপ সইতে সক্ষম হবে কিনা?
বাংলাদেশের রাজনীতি অধিকতর চরমপন্থা প্রবণতার দিকে ঝুঁকলে তা আমাদের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর যে চাপ তৈরি করবে, তা সইবার ক্ষমতা এই প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে তৈরি হয়েছে কিনা?
শুধু নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক বিবাদ দেশের রাজনৈতিক কর্তৃত্বকে যেভাবে ক্রমাগতভাবে খাটো করেছে, তা আরও দীর্ঘায়িত হলে, নিয়মতান্ত্রিক পথ ছেড়ে অগণতান্ত্রিক পথে হাঁটতে চাইলেÑ রাজনৈতিক কর্তৃত্বের বদলে অরাজনৈতিক শক্তির কবলে পড়তে পারে দেশের সকল রাজনৈতিক-সামাজিক প্রতিষ্ঠান। যেটা উন্নয়ন, স্থানীয় বিনিয়োগ, বৈদেশিক বিনিয়োগ, কর্মসংস্থানের পরিবেশ, সহনশীল বাজারদর সবকিছুকেই বিনষ্ট করতে পারে। এরকম বিপদময় পরিবেশ, প্রতিবেশী দেশগুলোকে, আঞ্চলিক-আন্তর্জাতিক খেলোয়াড়দেরও উদ্বিগ্ন করতে পারে।
ইতোমধ্যে রোহিঙ্গা শরণার্থী প্রত্যাবাসন প্রশ্নে, বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মহলের দ্বারস্থ হয়েছে দারুণতরভাবে। বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসন, খাদ্য, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা সহায়তার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মহলের উদ্যোগ বাংলাদেশকে আরও বেশি বিশ্বমহলের সঙ্গে সম্পৃক্ত হবার সুযোগ তৈরি করেছে। জাতিসংঘ, ওআইসি, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের নৈকট্য যে বিস্তার লাভ করেছে, আগামী নির্বাচনে সেই ঘনিষ্ঠতা কোনো প্রভাব বিস্তার করে দেশের গণতান্ত্রিক আবহকে সুস্থিত করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখবে কিনা সেটাও একটা বড় বিবেচনার বিষয়।

০৪.
সমঝোতা না হলে, দেশের দুই বিবদমান বড় রাজনৈতিক পক্ষের মধ্যে সহিংসতার আশঙ্কা বিদ্যমান। কিন্তু সেই সহিংসতা কি সহ্য করতে চাইবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারকারী পক্ষগুলো। সাম্প্রতিক রাজনীতির দিকে তাকালে সেই বিষয়ে নতুনতর ভাবনার দেখা মেলে। বিশেষত, বেগম জিয়াকে সড়কপথে কক্সবাজার যেতে দিয়ে সরকার যে নমনীয় আচরণ দেখিয়েছে তাতে নতুনতর সমঝোতার ইঙ্গিত মেলে। সামনে ছয়টি সিটি করপোরেশন নির্বাচন হবার কথা। ইতোমধ্যে রংপুর সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হয়েছে। এই ৬টি সিটি করপোরেশন নির্বাচন শুধু নির্বাচন কমিশন নয়। সরকারের চলমান মনোভাবেরও পরীক্ষা হবে এখানে। দেখা যাবে সরকার কী আচরণ করে, প্রশাসন কী ভূমিকা পালন করে, নির্বাচন ব্যবস্থা কতটা সুষ্ঠু থাকে। বিএনপি যদি ৬টি সিটি করপোরেশন নির্বাচনেই শেষ পর্যন্ত নির্বাচনী লড়াইয়ে টিকে থাকে তাহলে নির্বাচন বিষয়ে তাদের মনোভাব এবং রণকৌশল সম্পর্কেও একটি আগাম ধারণা মিলবে।
একাদশ দশম সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত রাজনীতির পানি কতদূর গড়াবে তা আগাম বলা মুশকিল। তবে, প্রধানমন্ত্রী একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের কথা বলেছেন। তার দলের সম্ভাব্য প্রার্থীদের বিষয়ে যেসব নীতিনির্ধারণী নির্দেশনা দিচ্ছেন, তাতে বোঝা যায় একটি শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনের প্রস্তুতি ভেতরে ভেতরে নিতে চাইছে আওয়ামী লীগ।

০৫.
গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল হিসেবে আরেকবার ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির চেহারার নির্বাচনের দায় সহ্য করা কঠিন আওয়ামী লীগের জন্য। আবার, ক্ষমতা কাঠামোর বাইরে ছিটকে পড়তে পারে এরকম কোনো বিধি ব্যবস্থাতে সায় দেয়াও সহজ নয় আওয়ামী লীগের জন্য। এরকম একটি পরিস্থিতিতে কোনদিকে দল ঝুঁকবে দেখার বিষয় সেটা।
বিএনপির জন্য নির্বাচনই হচ্ছে তার রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার একমাত্র পথ। ক্ষমতাকাঠামো কিংবা সংসদের বাইরে আরও অধিককাল অপেক্ষার মতো ভার বইবার ক্ষমতা এই দলের পক্ষে ক্রমশ দুর্বল হয়ে আসছে। সুতরাং ন্যূনতম সমঝোতার শর্তে নির্বাচনে যেতে চাইবে বিএনপি। তবে বেগম জিয়ার সাজা হলে, তারেক জিয়ার দ- ঘোষিত হলে, দলের মধ্যে যে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া হবে, সেটিকে মাথায় নিয়ে নির্বাচনে বিএনপি যেতে চাইবে কিনা সেটাও একটা বড় প্রশ্ন।
এসব ‘যদি’, ‘কিন্তু’ রাজনীতিতে আছে, থাকছে। কিন্তু তারপরও রাজনীতিতে যে শান্ত অবস্থা বিরাজ করছে, যে সমঝোতার ইঙ্গিত উঁকি মারছে, তাতে মনে হয়, বড় কোনো ধরনের বিপর্যয়কর ঘটনা না ঘটলে, এক ধরনের বড় সমঝোতার পথে হাঁটতে চাইবে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি। সেক্ষেত্রে ভারত, আমেরিকার নিজেদের মধ্যে সমঝোতাও একটা বড় ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করতে পারে।
ভারত-আমেরিকা, বাংলাদেশ সম্পর্কে সমঝোতায় পৌঁছাতে পারলে এখানে বিবদমান পক্ষগুলোর দূরত্ব কমতে পারে। যার ইঙ্গিত কিছুটা হলেও দেখা যাচ্ছে হালের রাজনীতিতে।

সাপ?তাহিক পতিবেদন

প্রচ্ছদ কাহিনী/প্রতিবেদন
  • ‘মানি লন্ডারিং এবং সন্ত্রাসবাদে অর্থায়ন প্রতিরোধ’ বিষয়ে ব্র্যাক ব্যাংকের কর্মশালা
  •  মতামত সমূহ
    পিছনে 
     আপনার মতামত লিখুন
    English বাংলা
    নাম:
    ই-মেইল:
    মন্তব্য :

    Please enter the text shown in the image.