গুচ্ছগ্রামের বেহাল দশা

Print Friendly and PDF

কপিল ঘোষ, চিতলমারী (বাগেরহাট) থেকে

বাগেরহাটের চিতলমারী উপজেলার আদর্শ গ্রামের মানুষেরা মৌলিক অধিকার বঞ্চিত হচ্ছে। শিশু, বৃদ্ধ, প্রতিবন্ধীরা সেখানে ঝুঁকির মধ্যে আতঙ্কিত হয়ে বেঁচে থাকছে বছরের পর বছর।  উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার দূরে সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্পের আশ্রিত নিরীহ পরিবারগুলো চরম মানবেতর জীবনযাপন করছে।
সরকারি কর্মকর্তারা পরিদর্শনে যান, গ্রামবাসী দুঃখবেদনার কথা শোনেন, যাপিত জীবন দেখেন- কিন্তু কাজের কাজ হয় না কিছুই। সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত আবেদন করেও তাদের দুঃখ ঘোচেনি।  উপজেলার চরবানিয়ারী ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ডে গ্রামটির অবস্থান। ‘গুচ্ছগ্রাম’ নামে পরিচিত।
সরেজমিনে দেখা যায়, ভগ্নাবস্থায় পড়ে আছে সরকারি বসতঘরগুলো। বিগত ১৯ বছরে হয়নি কোনো সংস্কার। জংধরা টিনের গুঁড়ি প্রতিনিয়ত খসে পড়ছে সেখানে। ঘর বসতের অনুপযোগী হওয়ায় ২০টি পরিবারের মধ্যে ৮টি পরিবার চলে গেছে অন্যত্র। বৃষ্টি কিংবা কুয়াশায় ভেজা থাকে ঘরের ছাউনি থেকে উঠোন। চারিদিকে গাছের ছায়ায় স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ থাকলেও সরকারি গাছগুলোর ডাল ঝুরে ফেলার অধিকার
ছিন্নমূল ২০টি পরিবারের নিশ্চিত জীবনযাপনের জন্য দুই একর ৭৫ শতক জমিতে ১৯৯৮ সালের ৮ জুলাই সেনাবাহিনী  এই গ্রামটি প্রতিষ্ঠা করে। প্রথম কয়েক বছর তাদের জীবন বেশ সুখের ছিল। বলেশ্বর ও মধুমতি নদীর মোহনার চরে প্রতিষ্ঠিত গ্রামটিতে চিতলমারী উপজেলার বিভিন্ন প্রান্ত হতে আসা নিরীহ সনাতন হিন্দু পরিবারগুলোর শান্তিতে কাটছিল দিন। কিন্তু স্থানীয় প্রভাবশালী কতিপয় জোতদার তাদের জন্য নির্ধারিত জমির অধিকাংশ দখল করে নেয়।
দখলদারদের জোরজবরদস্তির সামনে সেনাবাহিনী কর্তৃক এই গ্রামের জন্য নির্ধারিত জমির সীমানা পিলার হয়ে পড়ে ‘ঠুঁটো জগন্নাথ!’ অতঃপর ভূমির জন্য মামলা রজু হয় আদালতে। খাসভূমিতে আশ্রয়ণ প্রকল্পের স্বল্পআয়ী আশ্রিতরা সেই মামলার খরচ জোটাতে হিমশিম খায়, তবুও চালায়- শেষ আশ্রয়স্থলটুকু হারাতে চায় না বলে। স্থানীয় সমাজ ওই বিত্তশালী দখলদারের বিরুদ্ধে রা’শব্দটিও উচ্চারণ করতে সাহস পায় না। আদর্শ গ্রামের পক্ষে সরকার বনাম স্থানীয় দখলদারদের মামলা এখনও আদালতে চলমান। সরকার পক্ষের মামলার খরচ মেটাতে হিমশিম খেতে হয় ওই গ্রামের দরিদ্র পরিবারগুলোর।
আদর্শ গ্রামের সত্তরোর্ধ বয়সী সাধন চক্রবর্ত্তী ও কলেজ ছাত্র শুভঙ্কর মিস্ত্রি অভিযোগ করে বলেন, ‘সেনাবাহিনী দুই একর ৭৫ শতক জমিতে আশ্রয়ণ প্রকল্প করে। ২০টি পরিবারের বসতঘরসহ জায়গা বুঝিয়ে দিয়ে সেনাবাহিনী চলে যায়। এরপর স্থানীয় প্রভাবশালীরা তাদের জায়গা অর্ধেকেরও বেশি অংশ দখল করে নিয়েছে। দখলদাররা হলো খলিশাখালী গ্রামের গোবিন্দ ঘরামী, ভুপেনঘরামী, বাবুগঞ্জ বাজারের শান্তি বালা, মধু মণ্ডল ও ব্রজেন মাঝি। জায়গার বিষয়ে আদালতে মামলা চলছে।’
কাঁদতে কাঁদতে তারা বলেন, ‘আমরা দিনমজুর, দিনে আনি-দিনে খাই। কাজ না পালি খাবার জোটাতি কষ্ট হয়। তারপর বছরের পর বছর জমির মামলার ঘানি আমাগে টানতি হচ্ছে- কী যে জ্বালায় আছি, কত কথা কবো আপনাগে?’     
স্বামী সাধন চক্রবর্ত্তীকে ডাকতে ডাকতে দ্রুতবেগে হেঁটে আসেন দুলালী চক্রবর্ত্তী (৪৮)। চড়া সুরে তিনি বলেন, ‘আপনাগো মতো লোকেরা বহুত আসে, লিখে নিয়ে যায়। মন্ত্রণালয়ের সাহায্য আসে আর উপজেলায় বইসে ভাগ করে খায়।’
তার পাশে দাঁড়িয়ে কলেজ ছাত্র অশোক বিশ্বাস বলেন, ‘বছরখানেক আগে আশ্রয়ণ প্রকল্প সংস্কারের টেন্ডার হয়। আমরা টেন্ডারের কাগজ দেখতি উপজেলায় যাই। ইউএনও অফিসের বিষ্ণুবাবু টেন্ডারের কথা স্বীকার করেন, তিনি কাগজের একটি কপি দেবেন বলে তল্লাশির জন্য ১০০ টাকা রাখেন। দিনের পর দিন তার পেছনে ঘুরে টেন্ডারের কাগজের দেখা না পেয়ে আসা ছেড়ে দিয়েছি। আমাদের এই গ্রাম হতে উপজেলা পরিষদের দূরত্ব প্রায় ৮ কিলোমিটার। প্রতিদিন বাইসাইকেল চালিয়ে যাতায়াতে যে কী কষ্ট হয়েছে!’
জুতা-স্যান্ডেলের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সুমন্ত বিশ্বাস (৩৬) বলেন, ‘বিদ্যুতের জন্য সরকারিভাবে ২১টি মিটার বরাদ্দ হয়েছে তিন বছর আগে। কিন্তু আমাদের বসতঘরগুলোর ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা দেখে মিটারগুলো ফেরত গেছে।’
তিনি আরও বলেন, আশ্রয়ণ প্রকল্পের সময় ১৯ বছর আগে নির্মিত ল্যাট্রিনগুলো এখন ভেঙেচুরে গড়ের মাঠ। তাই কাঁচা পায়খানা ব্যবহার করতে হয় সবাইকে। আর্সেনিকযুক্ত দুইটি ল্যাট্রিন এখন অকেজো। খাবার পানি আনতে প্রতিদিন হেঁটে যেতে হয় এক কিলোমিটার দূরে পার্শ্ববর্তী নাজিপুর উপজেলার চর-মাটিভাঙ্গায়।
স্থানীয় ৬নং ওয়ার্ডের ইউপি মেম্বার পরিমল হীরা বলেন, আদর্শ গ্রামের অবস্থা ভীষণ খারাপ, বসবাসের অনুপযোগী। বর্তমান ইউএনও মো. আবু সাঈদ স্যারকে সঙ্গে নিয়ে তিনবার ওই গ্রাম পরিদর্শন করিয়েছি। লিখিত আবেদনপত্রও দেয়া হয়েছে বিভিন্ন দপ্তরে। কিন্তু কাজের কাজ তো কিচ্ছু হয় না।
চরবানিয়ারী ইউপি চেয়ারম্যান অশোক কুমার বড়াল বলেন, অনেক আগেই তাদের ১০টি ঘর পুড়ে গেছে। ওরা মানবেতর জীবনযাপন করছে। এ বিষয়ে আমি উপজেলা আইনশৃঙ্খলা সভায় আলোচনা করেছি। জেলা প্রশাসককে বারবার জানিয়েছি। কিন্তু কোনো সুফল আজও পাইনি। তোমরা পারলে একটু ওদের কথা লেখ।’
চিতলমারী উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আবু সাঈদ বলেন, ‘আদর্শ গ্রামের দুরবস্থার কথা লিখে মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছি গত জুন, ২০১৭ মাসে। কিন্তু এখনও তার উত্তর আসেনি, কিছুটা সময় তো লাগবে।’  
চিতলমারী উপজেলা চেয়ারম্যান আলহাজ মুজিবর রহমান শামীম বলেন, ‘আদর্শ গ্রামের দুরবস্থার কথা আমি জানি। সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান মুকুল কৃষ্ণ মণ্ডল (মুকুল তড়–য়া) আমাকে নিয়ে ওই গ্রাম পরিদর্শন করিয়েছেন। আসলেই তারা সমস্যায় আছে। বর্তমান ইউপি চেয়ারম্যান অশোক কুমার বড়াল তাদের জন্য কিছু করেছেন কি-না আমার জানা নেই। তবে সমস্যা সমাধানে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

সাপ?তাহিক পতিবেদন

 মতামত সমূহ
পিছনে 
 আপনার মতামত লিখুন
English বাংলা
নাম:
ই-মেইল:
মন্তব্য :

Please enter the text shown in the image.