[মুক্তগদ্য] ধ্রুব এষ : সংসারে এক সন্ন্যাসী

Print Friendly and PDF

আমীরুল ইসলাম

ধ্রুব এষকে নিয়ে স্মৃতিগদ্য লেখা খুব কঠিন আমার জন্য। ১৯৮৬ সালে ফেব্রুয়ারির বইমেলায় ধ্রুব’র সঙ্গে দেখা অনিন্দ্য প্রকাশনের স্টলে। তখন বইমেলা ছিল খুব ছিমছাম। অল্প কিছু স্টল। খোলামেলা।
ধ্রুব প্রতিদিন আসত অনিন্দ্য’র স্টলে। এক ইউনিটের স্টল। কিছু ভালো বই প্রকাশ করে তারা খুব আলোচিত। সেই স্টলে পাওয়া যাবে আমীরুল ইসলামের ‘আমি সাতটা’। স্টলে একটা পোস্টার ঝুলছে। ধ্রুব সেই পোস্টার দেখে বারবার বইটার খোঁজে স্টলে আসত। একদিন বইটা মেলায় এলো। ধ্রুব বইটা কিনল। আমার সঙ্গে টুকটাক কথা হলো। আমি খুব মুগ্ধ। আশ্চর্য! পরদিন ধ্রুব বইটার প্রশংসা করে আমাকে আরও লজ্জায় ফেলে দিল।
তারপর একটা জীবন কেটে গেল ধ্রুব’র সঙ্গে বন্ধুত্বে। হাজার হাজার দুপুর-বিকেল শিল্পসাহিত্য নিয়ে আলোচনা করে। ছাত্র জীবনে ধ্রুব থাকত নিউ মার্কেটের পাশে শাহনেওয়াজ হলের ৩ নম্বর রুমে আর্ট ইনস্টিটিউটের ছাত্র হিসেবে। একতলায় ভাঙা নড়বড়ে একটা চৌকি। জানালার ধারে ভাঙা টেবিল। জীর্ণ লকার। ছেঁড়া তোশক। পরিচ্ছন্ন চাদর। সেই বিছানায় বহু দুপুর ঘুমিয়েছি। ধ্রুব রুমে এসে আবার কাজে চলে গেছে। আমি হয়তো ঘুমিয়েই আছি।
তখন সদ্য বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে জড়িত হয়েছি। প্রকাশনা ও আসন্ন সম্পাদনা নিয়ে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের কাছাকাছি পৌঁছাতে পেরেছি। সব কাজে ছায়ার মতো আছে ধ্রুব এষ। ধ্রুব তখন ইলাস্ট্রেশন ও বুক কাভার শুরু করেছে। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের পাঠাগারের বই এবং গানের রেকর্ডের কাভারের ডিজাইন নিয়ে আমরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলাপ করি। আমিও পেইন্টিং ও গ্রাফিক ডিজাইন নিয়ে খুব কৌতূহলী। লালবাগে আমাদের শৈশব কেটেছে। শিল্পী ইউসুফ হাসানের কাছে গ্রাফিক ডিজাইনের হাতে খড়ি। আফজাল হোসেন, কাজী হাসান হাবিব, মাসুম হেলাল, আইনুল হক মুন্না, খালিদ হাসান, সৈয়দ ইকবাল প্রমুখ তখন সম্ভাবনাময় শিল্পী হিসেবে বইয়ের প্রচ্ছদ ও অলঙ্করণের কাজ করছেন। সর্বগণ্য কাইয়ুম চৌধুরী, হাশেম খান, রফিকুন নবী, সমরজিৎ রায় চৌধুরী, গোপেশ মালাকার, প্রাণেশ মণ্ডল, বীরেন সোম, কালাম মাহমুদ প্রমুখ বাংলাদেশের প্রকাশনাকে দাঁড় করিয়েছেন। এই মহান শিল্পীদের পথ ধরেই ধ্রুবর আগমন। ধ্রুব পূর্বসূরিদের ব্যাপারে খুব ভালো পড়াশোনা করেছে। বাংলা গ্রন্থচিত্রণের আদি পর্ব থেকে আধুনিক পর্ব পর্যন্ত সম্যক ধারণা রাখে।
ধ্রুব একজন অসাধারণ পাঠক। বাংলা বইয়ের মাতাল পাঠক সে। যে কোনো ধরনের বইই সে গভীর মনোযোগের সঙ্গে পাঠ করে। এমন বুভুক্ষু পাঠক আমাদের সময়কালে আর কাউকে দেখিনি। পদ্মা নদীর মাঝি কিংবা মাসুদ রানার ধ্বংস পাহাড় সে একই মনোযোগ দিয়ে পড়ে। তাই বাংলা বই সম্পর্কে ধ্রুবর অপরিসীম ধারণা। ধ্রুব তাই সহজেই প্রচ্ছদ শিল্পী হিসেবে অপরিমেয় যশ ও প্রতিষ্ঠা পেয়েছে অল্প বয়সেই। প্রচ্ছদ শিল্পী হিসেবে ধ্রুব কিংবদন্তিতুল্য। এসব বিষয় নিয়ে আলোচনার বিস্তর পরিসর প্রয়োজন। বাংলা গ্রন্থচিত্রণের ইতিহাসে ধ্রুবর অবদান সম্পর্কে অনেক গবেষণা হতে পারে। অনেক ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের প্রয়োজন। সে আলোচনা অন্যত্র করা যাবে।
ধ্রুব সারাজীবন স্পঞ্জের স্যান্ডেল, জিনসের প্যান্ট, পাতলা টি-শার্ট পরে। শীতকালে একটা সামান্য চাদর পরিধেয় বস্ত্র।
ভালোমন্দ খেতে খুব পছন্দ করে ধ্রুব। শুঁটকি মাছের নানা পদ তার পছন্দের তালিকায়। সুনামগঞ্জের হাওড় এলাকায় জন্ম বলেই মাছ ধ্রুব’র প্রিয় খাদ্য তালিকায়। রুই মাছের বড় টুকরা ভাজা, চিতল মাছের কোপ্তা, করলা ভাজি, ঘন ডাল, ভুনা গরুর মাংস, আমের আচার, লইট্টা শুঁটকি- এসবই ধ্রুবর প্রিয় খাদ্য।
পানীয় খুব প্রিয়। হুইস্কি কিংবা ভদকা পরিমিত পান। সেই ছোটবেলা থেকেই ধ্রুব পানাসক্ত। কত সন্ধ্যা কিংবা কত দুপুর-বিকেল আমরা মাতাল হাওয়ায় গান গেয়েছি। স্বপ্নকে ঝুলিয়ে দিয়েছি জানালায়। শিল্প সাহিত্যকে হুইস্কি গ্লাসের পাশে বসিয়ে উদ্ধার করেছি জগৎ সংসার। ধ্রুব- এসবই এখন স্মৃতি হয়ে গেছে। শাহনেওয়াজ হল, এলিফ্যান্ট রোডের চারতলার চিলেকোঠা, পল্টনের তিন তলা- স্মৃতির পাহাড় জমে আছে।
ধ্রুব প্রচুর বই কেনে। পড়ে। ভালো বই হলে আমাকে উপহার দিয়ে দেয়। সংগ্রহ করার মতো বই হলে সুনামগঞ্জ পৈতৃক ভিটায়।
ধ্রুবর মা বই পড়তে ভালোবাসতেন। প্রতি দুপুরে তিনি গল্পের বই পড়তেন। সে অভ্যাস ধ্রুবরও আছে। বাবা ছিলেন স্বল্পভাষী, উপদ্রবহীন আত্মমগ্ন এক ব্যক্তি। ধ্রুবর মধ্যে তার পিতার ছায়া লক্ষণযোগ্য। আমার সৌভাগ্য যে ধ্রুবর বাবার সঙ্গে আমার একবার দেখা হয়েছিল। ধ্রুবরই প্রতিমূর্তি হয়ে বসেছিলেন।
ধ্রুব রুশ অনুবাদ বইয়েরও খুব ভালো সংগ্রাহক। সেসব বই খুব পড়তো ধ্রুব। উভচর মানুষ, বাবা যখন ছোট্ট, মালাকাইটের ঝাঁপি, রূপের ডালিখেলা, গল্প আর ছবি- যেন ধ্রুবর মুখস্থ।
মাসুদ রানার স্রষ্টা কাজী আনোয়ার হোসেন ধ্রুবর স্বপ্নের নায়ক। সেবা প্রকাশনীর বই ও রহস্য পত্রিকা ধ্রুব গোগ্রাসে গিলত। ধ্রুব ঢাকায় এসে কাজীদার সঙ্গেই প্রথম দেখা করতে গিয়েছিল। সেবা প্রকাশনীতে ধ্রুব দীর্ঘদিন কাজ করেছে, ইলাস্ট্রেশন ও শিল্পের কাজ।
লুৎফর রহমান রিটন সম্পাদিত ছোটদের কাগজ, মোখতার আহমদ সম্পাদিত কিশোর জগৎ কিংবা বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ‘আসন্ন’- পত্রিকায় ধ্রুব ডিজাইন করত। নিজের পত্রিকা মনে করে কাজ করত। দৈনিক বাংলার কিশোরদের পাতায় (চার রঙা দুই পাতা প্রথম) অসাধারণ কাজ করত ধ্রুব- তা লিখে বোঝানো যাবে না।
বাংলাদেশের সমস্ত বড় প্রকাশনী ধ্রুবর তুলির স্পর্শ ছাড়া অচল। বড় লোকেরাও অপেক্ষা করেন- ধ্রুব ব্র্যান্ডের প্রচ্ছদ পেলে তার বইও সম্মানিত হবে। ধ্রুব অনেক বিখ্যাত মানুষের ভালোবাসায় ঋদ্ধ এক ব্যক্তি।
সৈয়দ শামসুল হক, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, হুমায়ূন আহমেদ, ইমদাদুল হক মিলন, নির্মলেন্দু গুণ, সেলিনা হোসেন, এদের পূর্ণ ভালোবাসায় ধ্রুব আচ্ছন্ন থাকে।
ধ্রুব সত্যজিৎ রায়ের খুব ভক্ত। তার পথের পাঁচালী ও হীরক রাজার দেশ প্রিয় চলচ্চিত্র। রায়ের প্রচ্ছদ ও গ্রন্থচিত্রণ ধ্রুবকে এখনও বিস্মিত করে। এক ধরনের ঘোরলাগা আচ্ছন্নতায় রায়ের সঙ্গেই কেটে গেল একটি জীবন। সত্যজিৎ রায়ের ছোটগল্প ধ্রুবর খুব প্রিয়। প্রথম যেবার ধ্রুব আমাদের সঙ্গে কলকাতায় যায় তখন বারবার সে চারমিনার সিগারেট খাওয়ার জন্য উন্মাদ হয়ে উঠেছিল। পার্কস্ট্রিটে প্রতি সন্ধ্যায় আমি ও ধ্রুব বসতাম আর আকণ্ঠ মদ্যপান করতাম। চারমিনার সিগারেট খাওয়ার কারণ কী? কারণ সত্যজিৎ রায়ের গোয়েন্দা চরিত্র ফেলুদা চারমিনার সিগারেট খায়। তাই ফেলুদা যে সিগারেট খায় সেই সিগারেট তাকে খেতেই হবে। সত্যজিৎ রায় বিষয়ক যে কোনো প্রকাশনা ধ্রুব এষ এখনও অতি যতেœর সঙ্গে সংগ্রহ করে থাকে।
খালেদ চৌধুরী, পূর্ণেন্দু পত্রী, সমীর সরকার, সুধীর মৈত্র- ওপার বাংলার এই মহান গ্রাফিক ডিজাইনারদের ধ্রুব খুব গুণমুগ্ধ। গত ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ বছর ধরে এদের কাজ দেখে যাচ্ছে সে।
ধ্রুব’র চেতনার মধ্যে একজন শক্তিমান চিত্রশিল্পী বাস করে। সালভাদর দালি, রেনে ম্যাগ্রিথ, পাবলো পিকাসো তার প্রিয় চিত্রশিল্পী। ধ্রুবর চেতনার মধ্যে পরাবাস্তবতা ও জাদু বাস্তবতা খেলা করে। তাই ধ্রুব খুব অনায়াসেই গ্রন্থ প্রচ্ছদে পরাবাস্তব পৃথিবীকে তুলে আনতে পারে। তাই তার আঁকা প্রচ্ছদের বৈচিত্র্য কখনো শেষ হয় না। বছরে গড়ে পাঁচ হাজার প্রচ্ছদ আঁকলেও তার কোনো পুনর্মুদ্রণ নেই। কারণ ধ্রুবর কল্পনার পৃথিবীতে অসীম আইডিয়া নেচে বেড়াচ্ছে। পেইন্টিংয়ের ইতিহাস যার মস্তিষ্কে খেলা করে তার আইডিয়া কোনোদিন ফুরাবে না।
ধ্রুব বুক কাভার ও ইলাস্ট্রেশনকে চিত্রশিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছে। যেন এক একটি আর্ট ওয়ার্ক। ডিজাইনের খপ্পর থেকে বের করে পূর্ণাঙ্গ পেইন্টিংয়ের মর্যাদা পাবে ধ্রুবর অসংখ্য প্রচ্ছদ।
ধ্রুব’র শিল্পীসত্তা অতি একক। ইদানীং সে পেইন্টিংয়ে মনোনিবেশ করেছে। আমরা অতি শীঘ্রই ধ্রুবর একক চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করতে যাচ্ছি। অয়েল, অ্যাক্রিলিক, কলম-পেন্সিল, কাগজ, কোলাজ- নানা মাধ্যমে করা কাজ সেই প্রদর্শনীতে থাকবে।
ইদানীং আমার ভেতরে এক ধরনের অপরাধবোধ কাজ করে। ধ্রুবকে কাভার ডিজাইনের জন্য আমিই প্ররোচিত করি। বইপত্র পত্রিকা দেখিয়ে, প্রকাশকদের কাছে গিয়ে ধ্রুবকে প্রচ্ছদের বিপুল পৃথিবীতে ঠেলে দেই। ধ্রুব সৌভাগ্যবান শিল্পী। এক যুগসন্ধিক্ষণে তার আবির্ভাব। প্রযুক্তির বিকাশ মুদ্রণ শিল্পকে বহুমাত্রিকতায় নিয়ে যায়। বাংলাদেশে বই প্রকাশের বিপুল ব্যাপক প্রকাশনা গড়ে ওঠার পেছনেও ধ্রুব এষের আবির্ভাব একটা বড় ঘটনা। কিন্তু ধ্রুব যদি প্রচ্ছদ না এঁকে ছবি আঁকতো তবে কী হতো? আমার ধারণা ধ্রুব পৃথিবীর চিত্রকলা-সমাজে বড় আসন পেত। প্রকাশনা শিল্পের সেবা করতে গিয়ে স্বেচ্ছাশ্রমিক হয়ে ধ্রুবকে জীবন ধারণ করতে হলো। এজন্য কিঞ্চিৎ দায়ী হয়তো আমিও।
ধ্রুব ছোটবেলা থেকে লেখালেখি করে। বিশেষ করে ছড়া কবিতা এবং ছোটদের গল্প লেখায় তার মুনশিয়ানা খুব। অসম্ভব সৃজনশীল মানুষ সে। নতুন কিছু লিখতে চায়। বলতে চায়। ভাবতে চায়। তাই ধ্রুবর লিখাও হয়ে ওঠে ধ্রুবর মতো নিজস্ব। তার উপন্যাস তো অস্বাভাবিক রকমের আলাদা। নিজের  লেখা নিয়েও ধ্রুবর উচ্ছ্বাস কম। কারণ সে ধ্রুপদী চরিত্র। জানে, তার গন্তব্য কোথায়? ধ্রুব নিজে জানে, কোন লেখা ভালো! কোন লেখা টিকে যেতে পারে। কোন লেখায় সারবস্তু আছে। তাই নিজের ব্যাপারে ধ্রুব খুব সচেতন ও উদাসীন।
ধ্রুবর ভেতরে কর্পোরেট দাসত্ব নেই। খুব সাধারণভাবে অসাধারণ জীবনযাপন। ভ্রুক্ষেপহীন, পরোয়ানাহীন চরিত্র। যা তার পছন্দ সেখানে সে নাক গলাবে না। যাকে তার অপছন্দ তার সঙ্গে কথা বলবে কপাল ও ভ্রু কুঁচকে। টাকা আয়ের জন্য নিজেকে কখনো বিক্রি করেনি। আত্মবিক্রয় করার চেয়ে না খেয়ে মরে যাওয়া ভালো- এই বিশ্বাসে বিশ্বাসী ধ্রুব এষ। একজীবনে যথেষ্ট টাকা আয় করেছে। কিন্তু সঞ্চয় বা সম্পদ বলতে কিছু নেই। টাকা থাকলে দুই হাতে উড়ায়। মানুষের উপকার করে। ধ্রুবকে কেন্দ্র করে অনেকে বেঁচে থাকে। তরুণ সাহায্য প্রার্থীরা তার কাছে বিমুখ হয় না। মানবিক গুণাবলি অনেক। সংসারে একা সন্ন্যাসী সে।
এবার ধ্রুবকে জড়িয়ে নিজের একটু-আধটু আত্মপ্রচার করি, যা আমি খুব অপছন্দ করি। তবু প্রসঙ্গক্রমে বলতে হচ্ছে।
ধ্রুব নিজের লেখা প্রায় ২০টার অধিক বই উৎসর্গ করেছে আমাকে। প্রতি বছরই এক বা দুইটা উৎসর্গ। হাসতে হাসতে বলে, কারে করুম! খুইজাঁ পাই না। কে বুঝবে আমার লেখা? তাই আপনি ছাড়া আমার উৎসর্গ করার কেউ নেই।
আমিও বিশেষ ধরনের অনেক বই ধ্রুবকে উৎসর্গ করেছি। উৎসর্গ পত্রে প্রায়ই লিখে থাকি- তুমি ছাড়া কে বুঝবে আমার এই নিরীক্ষা!
আমার অনেক বই লিখা হয়েছে ধ্রুবর প্রত্যক্ষ অনুপ্রেরণায়। অনেক বই মুদ্রিত হয়েছে ধ্রুবর তত্ত্বাবধানে। আমার সমুদ্রিত অনেক বই ধ্রুব তৈরি করে দিয়েছে। এদিক থেকে আমি সৌভাগ্যবান। পিকটোরিয়াল বই, পিকচার বুক- সবই তো ধ্রুবর জন্য লেখা হয়েছে। প্রকাশিত হয়েছে। অবশ্যই স্বীকার করতে হবে, আমার শিশুসাহিত্য চর্চার অন্যতম প্রেরণা ধ্রুব এষ।
অধিকাংশ লেখার প্রথম পাঠক সে। ধ্রুবর আগ্রহ না থাকলে কোথায় ছিটকে গিয়ে হয়তো আবোল-তাবোল লিখতাম।
এজন্য ধ্রুবর প্রতি অসীম কৃতজ্ঞতা।
আরেকটি ব্যাপার- আমি রান্না করতে খুব ভালোবাসি। হারানো দিনের রান্না, সোনালি যুগের রান্না, মায়ের হাতের রান্না, আধুনিক রান্না- সবকিছু নিয়েই পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। আমার রান্নার প্রধান উৎসাহদাতা ও সবচেয়ে বড় ভক্ত শিল্পী ধ্রুব এষ। কথাচ্ছলে ধ্রুব সবাইকে বলে থাকে, মানুষের জীবনে মায়ের হাতের রান্না সবচেয়ে প্রিয়। কিন্তু আমার সবচেয়ে প্রিয় আমীরুল ভাইয়ের রান্না। ধ্রুবর প্রিয় বলে এখন আমি নানা পদের শুঁটকি রান্নার ওস্তাদ। ধ্রুব এষ আমার হাতের অখাদ্য রান্না খেয়েও পরম তৃপ্তি নিয়ে জানায়, অসাধারণ আমীরুল ভাই। কোনো তুলনা নাই!
ধ্রুবর আঁকা অনেক ড্রইং, ডিজাইন, পেইন্টিং আমি খুব যতœ করে সংগ্রহ করি। ধ্রুবর সঙ্গে দেখা হলেই আমার একটাই চাওয়া- ঐ মিয়া, সিগানেচার কইরা ছবিটা দাও।
আমীরুল ভাই, আজ ভালো কিছু নাই। ধ্রুবর কাতর অনুনয়। খারাপ ছবিটাই দাও। আইজকা নিতেই হইবো। বহুদিন ধইরা ছবি-মবি দাও না। জলদি সই করো।
ইচ্ছার বিরুদ্ধে হলেও দু’একটা ড্রইং ধ্রুব সই করে দিয়ে দেয়। আমিও সেসব অতি যতেœ সংগ্রহ করি।
ধ্রুব তো সন্ন্যাসী টাইপ মানুষ। উদ্ভ্রান্ত বাউল। জাগতিক কোনো মোহ তাকে আক্রান্ত করে না। মোহহীন মানুষের দেখা পাওয়া যায় না। ধ্রুব সেই বিরল ব্যক্তি।
আমি আর ধ্রুব বিখ্যাত চলচ্চিত্রকার বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের খুব খুব খুব ভক্ত। চলচ্চিত্রকে তিনি শিল্পের শীর্ষ আসনে নিয়ে গেছেন। বিমূর্ততা, সম্প্রসারিত বাস্তবতা, পরাবাস্তবতা, জাদু বাস্তবতাÑ এসব মিশিয়ে তার চলচ্চিত্র বিস্মিত করে আমাদের। ঘটনাক্রমে বুদ্ধদেবদার সঙ্গে আমাদের হৃদ্যতা গড়ে ওঠে। দাদা অসাধারণ মানুষ। বারবার বলেছেন, আমীরুল তুমি অন্যরকম মানুষ। শুধু তোমার নিজস্বতা যেন কোনোদিন হারিয়ে না যায়।
গত জানুয়ারিতে কলকাতা বইমেলায় বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের সাম্প্রতিক কবিতার বই প্রকাশ পেয়েছে। তিনি চলচ্চিত্রের কবি। আবার সাহিত্যেরও খ্যাতনামা কবি।
বইয়ের নাম ভূতেরা কোথায় থাকে? আশ্চর্য সুন্দর বই! বিশ্ববিখ্যাত এই চলচ্চিত্রকার বইটি উৎসর্গ করেছেন আমাকে ও ধ্রুব এষকে।
সাম্প্রতিককালে এটা আমাদের বিপুল ও ব্যাপক আনন্দ দিয়েছে। নিজেদের জীবনকে এই উৎসর্গ প্রাপ্তির পর ধন্য মনে হয়েছে। উৎসর্গ দেখে ধ্রুবর চোখে অশ্রু। কারণ দাদার কিছু কিছু সিনেমা ধ্রুব ৫০-৬০ বার দেখেছে। বিশেষ করে কালপুরুষ, উত্তরা, লাল দরজা, জানালা, চরাচর।
বইটা হাতে নিয়ে আমরা স্তম্ভিত ছিলাম অনেকদিন। ধ্রুব একদিন বলল, বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের উৎসর্গপত্রটি আপনার-আমার বন্ধুত্ব ও সম্পর্কটাকে চিরকালীন বানিয়ে দিল।
আর আত্মপ্রচার নয়। এবার থামি।

সাপ?তাহিক পতিবেদন

 মতামত সমূহ
পিছনে 
 আপনার মতামত লিখুন
English বাংলা
নাম:
ই-মেইল:
মন্তব্য :

Please enter the text shown in the image.