‘ব্যাংকগুলো কতিপয় ব্যক্তির কাছে জিম্মি’-ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ

Print Friendly and PDF

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে অব্যবস্থাপনার অভিযোগ নতুন কিছু নয়। এই খাত থেকে কীভাবে অর্থ লুট হয়েছে, হচ্ছে, তার খবর সাধারণ মানুষও এখন জানেন। কিন্তু এই খাতের পেছন দিকে এমন কিছু ঘটনা ঘটে, যা ছোট-বড় দুর্নীতিবাজদের জন্মের কারণ ও লালনক্ষেত্রও বটে। আর তা হচ্ছে বড় ঋণখেলাপিদের নিয়ে সরকারের নীতিহীনতা।
বরাবরই দুর্নীতিবাজ জন্মের কারখানা হচ্ছে ঋণ লোপাট ব্যবস্থা। প্রধানত রাজনৈতিক আনুকূল্যের কারণেই এ ধরনের খেলাপিদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ে ব্যর্থ হয় ব্যাংকগুলো। যখন কেউ ঋণখেলাপি হয়ে যায়, তখন সরকার সেই খেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহনের দিকে না গিয়ে তাদের তফসিলি সুবিধা দিয়ে পুরস্কৃত করে। তফসিলি সুবিধার অর্থ হলো, খেলাপি ঋণকে চলতি ঋণে রূপান্তর করে পুনরায় তা পরিশোধের শিডিউল ও কিস্তির হার নতুন করে নির্ধারণ করা। এটা করা হলে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী আর ‘খেলাপি’ থাকেন না। যেখানে কিনা খেলাপি ঘোষিত হলে কেউ আর নতুন করে ঋণ নিতে পারে না, সেখানে তফসিলি সুবিধা পেয়ে সেই ব্যবসায়ী আবারও ঋণ নেয়ার সুবিধা পান।
সরকার শুধু যে তফসিলি সুবিধা দেয় তা নয় বরং যারা নানা সংকটের কারণে তফসিলি সুবিধা নিতে পারে না, তাদের জন্য দেয়া হয় পুনঃতফসিলিকরণের সুবিধা। তফসিলিকরণ, পুনঃতফসিলিকরণ, ঋণ পুনর্গঠন এরকম নানা নামে সময় পার করার পর এক সময় এসব ঋণকে ‘মন্দ ঋণ’ বলে ‘অবলোপন’ তালিকায় ঢুকিয়ে দেয়া হয়। অবলোপনকৃত ঋণ বলতে যদিও সাধারণ অর্থে ঋণ মাফ বলে বুঝানো হয়, কিন্তু বাস্তবে ‘অবলোপন’ (রাইট অফ) মানে তা নয়। এর অর্থ হচ্ছে, ব্যাংকের অনাদায়কৃত ঋণের বোঝা কম দেখাতে এ ধরনের ঋণকে অন্য একটি খাতায় তুলে রাখা। কিন্তু গত এক যুগে ঠিক কার কত টাকার ঋণ অবলোপিত হয়েছে, তার হিসাব পাওয়া যায় না। বাংলাদেশে ২০০২ সালে এই ঋণ অবলোপন পদ্ধতি চালু হয়েছিল।
ব্যাংকিং খাতে ঋণ নিয়ে এই তুঘলুকি কারবার অনেক দিন ধরেই চলছে। সরকার গেছে, সরকার এসেছে। কিন্তু প্রকৃত অপরাধীদের বিরুদ্ধে কেউ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়নি। যদিও তথ্য-উপাত্ত বলছে, বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার গোড়া থেকে এখন অবধি বড় ঋণখেলাপিরা অধিকাংশ প্রায় একই লোকজন। ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে এক সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত বলেন, ‘১৯৮২ সালে মাত্র চারটি বড় ঋণ খেলাপি গ্রুপ ছিল। সেগুলো হচ্ছে, ইসলাম ব্রাদার্স, বেক্সিমকো, বেঙ্গল ও প্যাসিফিক।’ একই সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তাদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ‘দেশে ৫০০ কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণ রয়েছে বর্তমানে এমন গ্রুপের সংখ্যা প্রায় ৫০টি। এর মধ্যে শীর্ষে আছে বেক্সিমকো, ইসলাম ব্রাদার্স, ওরিয়ন, মোস্তফা, নুরজাহান, প্রভৃতি।’
এসব হিসাব দেখিয়ে দিচ্ছে যে, বড় ঋণখেলাপিরা দেশ গঠনের গোড়া থেকেই রাষ্ট্রীয় সুবিধা পেয়ে আসছে। অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মইনুল ইসলামের দেয়া তথ্য থেকে পাই, ১৯৯৮ সালে বিআইবিএম আয়োজিত প্রথম নুরুল মতিন স্মারক বক্তব্যে তদানীন্তন মহামান্য রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ প্রতিটি ব্যাংকের শীর্ষ ১০ ঋণখেলাপিকে দ্রুত বিচারের আওতায় আনার জন্য ঋণখেলাপি ট্রাইব্যুনাল গঠনের আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু সরকার তাতে কর্ণপাত করেনি। ১৯৯৯ সালে আবার একই প্রস্তাব করেছিলেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান। কিন্তু সরকার সাড়া দেয়নি।
ব্যাংকিং খাত নিয়ে এরকম যত তথ্য আমরা পাই, সবই একটি পথ নির্দেশ করে। আর তা হলো- এই খাতটি কতিপয় ব্যক্তির হাতে একেবারে জিম্মি হয়ে আছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদও সাপ্তাহিক-কে দেয়া এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে একই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন। র্বতমানে তিনি অধ্যাপনা করছেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে। ব্যাংক ব্যবস্থার নৈরাজ্য ঠেকাতে হলে রাজনীতিকীকরণ বন্ধ করতে হবে বলে মত দেন। তাঁর মতে, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণেই ব্যাংকে সুশাসন প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে না। এ থেকে কিভাবে বেরিয়ে আসা যায়, ব্যাংক খাত উন্নয়নে ও এই খাতে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠায় বিশিষ্ট এই অর্থনীতিবিদ দিয়েছেন নানা পরামর্শ, রেখেছেন মূল্যবান মতামত। কিন্তু সরকার কি কিছু শুনতে চায়? এই প্রশ্নর উত্তর সরকারের সামনের দিকের পদক্ষেপগুলো থেকেই পাওয়া যাবে।  সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সায়েম সাবু

সাপ্তাহিক : অস্থির ব্যাংকিং খাত। অনিয়ম, দুর্নীতি সরকারি এবং বেসরকারি উভয় ব্যাংকেই। কিভাবে দেখছেন এই পরিস্থিতি?
ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ :  নানা কারণেই ব্যাংকিং সেক্টর দীর্ঘদিন ধরেই গভীর সমস্যায় জর্জরিত হয়ে আছে। সুশাসনের অভাবেই ব্যাংক সেক্টরে নৈরাজ্য।
অভ্যন্তরীণভাবে ব্যাংকিং সেক্টরে সুশাসন বলতে কিছু নেই। দ্বিতীয় সমস্যা হচ্ছে ব্যাংকিং সেক্টরের জন্য যেসব নীতিমালা ও আইন-কানুন আছে, কোম্পানি আইন আছে, আন্তর্জাতিক নর্মস আছে, সেগুলো সঠিকভাবে পরিপালন করা হচ্ছে না।
সাপ্তাহিক : তাহলে কি আইনের কোনো জটিলতা আছে?  
ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ : ব্যাংকিং সেক্টরে যেসব নীতিমালা ও আইন আছে, তা আন্তর্জাতিক মানের বলে আমি মনে করি। কিন্তু এগুলো সঠিকভাবে পরিপালন এবং বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না। এর ফলে নানারকম সমস্যা দেখা দিচ্ছে। পরিচালনা বোর্ড থেকে শুরু করে ম্যানেজমেন্ট এবং নিচের দিকে কর্মকর্তা পর্যায়ে কোথাও সুশাসন অনুসৃত হচ্ছে না। সর্বত্রই মারাত্মক ত্রুটি পরিলক্ষিত হচ্ছে। সবমিলিয়ে ব্যাংকিং সেক্টর এখন মোটেও ভালো অবস্থায় নেই।
সাপ্তাহিক : সরকারি এবং বেসরকারি ব্যাংকের মধ্যে তুলনা করে কি বলবেন?  
ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ : রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোয় সমস্যা সবচেয়ে প্রকট। পরিচালনা বোর্ড ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনার জন্য নির্দেশনা দেবে। তারা নীতিগত বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানাবে। আর ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের কাজ হবে সে নীতিমালা বাস্তবায়ন করা। পরিচালনা বোর্ড এবং ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের কার্যপরিধি আইন দ্বারা নির্ধারিত রয়েছে। কিন্তু প্রায়ই শোনা যায় বা অভিযোগ পাওয়া যায়, পরিচালনা বোর্ড ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের কাজে হস্তক্ষেপ করে।
সাপ্তাহিক : পরিচালনা বোর্ডের হস্তক্ষেপ তো থাকবেই?
ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ : হস্তক্ষেপ হতে হয় বিধি সংরক্ষণের জন্য। কিন্তু এখন ব্যাংকের পরিচালনা বোর্ড নীতিগত সিদ্ধান্ত প্রদানের ক্ষেত্রে যত না আগ্রহী, তার চেয়ে ব্যাংকের দৈনন্দিন কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ করতেই যেন বেশি উৎসাহী। ফলে ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের পক্ষে স্বাধীনভাবে তাদের সৃজনশীলতাকে ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না। তারা পরিচালনা বোর্ডের দ্বারা প্রায়ই নির্দেশিত হয়ে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। এটা কোনোভাবেই ব্যাংকিং সেক্টরের জন্য মঙ্গলজনক নয়। অবশ্য ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট যে সবসময় দক্ষ হয়, তা নয়। অনেক সময় ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের অদক্ষতা এবং ত্রুটির কারণেও সমস্যার সৃষ্টি হয়। এসব কারণে ব্যাংকিং সেক্টরে দুর্নীতি দেখা দিচ্ছে এবং জবাবদিহিতার ঘাটতি পরিলক্ষিত হচ্ছে।
সাপ্তাহিক : সমস্যাগুলো যদি নির্ধারণ করতেন?
ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ :  পরিচালনা বোর্ড ও ম্যানেজমেন্টের মধ্যে পরস্পর দোষারোপ করার প্রবণতা দেখা যায়। ফলে জবাবদিহিতার বিষয়টি গৌণ হয়ে পড়ে। ব্যাংকিং সেক্টরে মনিটরিং এবং সুপারভিশনও খুব দুর্বল। যারা পরিচালনা বোর্ডে পরিচালক বা চেয়ারম্যান হয়ে আসেন, তাদের নিজস্ব ইন্টারেস্ট থাকে। তাদের নিজস্ব ব্যবসা-বাণিজ্য থাকে।
আত্মীয়স্বজনের ব্যবসা-বাণিজ্যে সুবিধা প্রদানের জন্য ব্যাংক ম্যানেজমেন্টকে চাপ দিয়ে থাকেন। নিজস্ব লোকদের ঋণ প্রদান বা চাকরি প্রদানের জন্য তারা ম্যানেজমেন্টের ওপর প্রভাব বিস্তার করে থাকেন। এটা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। আগে ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় এমনটি ছিল না। ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে যারা নিয়োগ লাভ করেন, তাদের নিযুক্তি অনেকটাই নির্ভর করে পরিচালনা বোর্ডের ওপর। কাজেই তারা ইচ্ছা করলেই পরিচালনা বোর্ডের সদস্য বা চেয়ারম্যানের পরামর্শ বা নির্দেশনা উপেক্ষা করতে পারেন না। একজন ব্যবস্থাপনা পরিচালক ব্যাংকে থাকবেন কিনা, তা অনেকটাই নির্ভর করে পরিচালনা বোর্ডের সদস্যদের সন্তুষ্ট করার ওপর। ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দক্ষতা এবং পারফরম্যান্সের ওপর তার টিকে থাকা-না থাকা তেমন একটা নির্ভর করে না। ব্যাংকের পরিচালনা বোর্ডকে সন্তুষ্ট করতে পারলে তার পক্ষে এমডি হিসেবে টিকে থাকায় কোনো সমস্যা হয় না। এজন্য দেখবেন কোনো কোনো ব্যাংকের এমডিদের বেতন-ভাতা অত্যন্ত উচ্চ। এদের বেতন-ভাতা অনেক বেশি হওয়ার কারণ হচ্ছে তারা পরিচালকদের কথাবার্তা শোনেন; তাদের নির্দেশনা মোতাবেক কাজ করেন। এতে ব্যাংকের স্বার্থ রক্ষা হলো কিনা, সেটা তাদের বিবেচ্য বিষয় নয়। পরিচালনা বোর্ড তাদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি আরোপ করতে চায়। পরিচালনা বোর্ডে অনেকেই থাকেন, যারা সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। তারা তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে চান। একজন পরিচালক বা চেয়ারম্যানের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থাকতেই পারে; কিন্তু তা যদি ব্যাংকের কাজে ব্যবহার করতে চান তাহলেই সমস্যা দেখা দেয়। ব্যবস্থাপনার মধ্যেও আবার অনেক লোক আছেন, যারা দক্ষ নন বা নানা ধরনের অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক যদি অদক্ষ বা দুর্বল হন, তাহলে তার প্রভাব সর্বত্রই পড়ে। এতে নিচের দিকের কর্মীরা নানা দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন। দুর্নীতি-অনিয়ম উপর থেকে নিচের দিকে ধাবিত হয়। কাজেই টপ ম্যানেজমেন্ট যদি কঠোরভাবে সুশাসন নিশ্চিত করেন, তাহলে তার প্রভাব নিচের দিকে পড়বেই। কিন্তু আমাদের এখানে টপ ম্যানেজমেন্টের মধ্যেও সমস্যা রয়ে গেছে। সবমিলিয়ে ব্যাংকিং সেক্টরে এখন সুশাসনের অভাব, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা জেঁকে বসেছে।
সাপ্তাহিক : দিনে দিনে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়ছে। ব্যাংক আইনও খেলাপিদের পক্ষে বলে মনে করা হয়। আপনি কী মনে করেন?
ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ : বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো ক্ষুদ্র বা মাঝারি ঋণ গ্রহণকারী, আমানতকারীদের প্রতি তেমন কোনো আগ্রহ প্রদর্শন করে না বা এদের প্রতি ব্যাংকের কোনো সুদৃষ্টি নেই। কারণ এরা সংগঠিতভাবে ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর কোনো প্রভাব বিস্তার করতে পারে না। কিন্তু যারা বড় অঙ্কের ঋণ গ্রহণ করেন, তারা বেশ সংগঠিত এবং তারা ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট এবং পরিচালনা বোর্ডের ওপর ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করতে পারেন। সামান্য কিছু ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর কাছে বড় আকারের ঋণ দেয়ার ধারণাটিই ছিল ভুল। কারণ এতে ব্যাংকগুলো কতিপয় ব্যক্তির কাছে  জিম্মি হয়ে পড়েছে। তারা যদি ঋণের টাকা ফেরত দিতে না চায়, তাহলে ব্যাংক তাদের ঋণের কিস্তি পরিশোধে বাধ্য করতে পারে না। তখন ব্যাংক ঋণ হিসাব পুনঃতফসিলীকরণ করে। তারা ভাবে, কিছু টাকা তো আদায় হলো। কিন্তু চাপ দিয়ে তো কোনো টাকাই আদায় করা যাবে না। তারা যদি ইচ্ছা করে ব্যাংকের টাকা ফেরত না দেয়, তাহলে ব্যাংক কিছুই করতে পারে না।
সাপ্তাহিক : এক্ষেত্রে ব্যাংক আইন কী বলে?
ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ : আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারে ব্যাংক। কিন্তু সে পথ অত্যন্ত জটিল এবং বিস্তর সময়ের প্রয়োজন হয়। এছাড়া তারা ঋণ গ্রহণের সময় যে জামানত প্রদান করেন, তা প্রায়ই ঋণ কভার করে না। ফলে প্রকল্প সম্পদ বিক্রি করেও টাকা আদায় করা যায় না। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক্ষেত্রে শক্ত অবস্থান নেয়া দরকার। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক যে কোনো কারণেই হোক, এক্ষেত্রে শক্ত অবস্থান গ্রহণ করতে পারছে না। যারা প্রকৃত কারণে ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে পারছে না, তাদের জন্য হয়তো কিছু সুবিধা প্রদান করা যেতে পারে। কিন্তু যারা সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ঋণের কিস্তি পরিশোধ করেন না, তাদের কোনোভাবেই ছাড় দেয়া উচিত নয়। আমি যখন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ছিলাম, তখন প্রচলিত আইন কঠোরভাবে পরিপালনের জন্য বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছে এ ধরনের একটি বার্তা চলে গিয়েছিল যে, নীতি বাস্তবায়নের ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংক খুবই কঠোর। সে সময় অনেক ব্যাংককে আইন অমান্য করার কারণে শাস্তি প্রদান করা হয়েছিল। বেশ কয়েকজন এমডিকে সরিয়ে দেয়া হয়েছিল। অনেককে জরিমানা করা হয়েছিল। ব্রাঞ্চ বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য চাপ দেয়া হয়েছিল।
সাপ্তাহিক : কিন্তু অনেকেই তো ব্যাংকের লেনদেনে নিয়মিত। তাদের জন্য ব্যাংকগুলো কোনো প্রণোদনার ব্যবস্থা রাখে না।
ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ :  এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। আমি মনে করি, ব্যাংকিং সেক্টরে এটি বড় ধরনের একটি অসংগতি। যারা নিয়মিত ঋণের কিস্তি পরিশোধ করছেন, যাদের ঋণ পরিশোধের অতীত রেকর্ড ভালো, তাদের কোনো ধরনের আর্থিক সুবিধা দেয়া হচ্ছে না। হয়তো কোনো কারণে তাদের ব্যবসা-বাণিজ্যে কোনো সমস্যা হলো। দেশে বা বাইরের কোনো কারণে তারা ঋণের কিস্তি ঠিকমতো পরিশোধ করতে পারছে না; কিন্তু তাদের অতীত ঋণ পরিশোধ কার্যক্রম ভালো, তাদের অবশ্যই কিছু সুবিধা দেয়া উচিত। তাদের ক্ষেত্রে ঋণ হিসাব পুনঃতফসিলীকরণ করা যেতে পারে, প্রয়োজনে তাদের ওডি বাড়িয়ে দেয়া যেতে পারে, প্রয়োজনে তাদের ক্ষেত্রে সুদের হার কিছুটা হ্রাস করা যেতে পারে, এলসি মার্জিন কিছুটা কম নেয়া যেতে পারে, যাতে তারা বাইরে থেকে মেশিনারি আমদানি করে তাদের ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান আবার ভালোভাবে পরিচালনা করতে পারে; এমনকি নতুন ঋণদানের ক্ষেত্রে তাদের জামানতের শর্ত কিছুটা শিথিল করা যেতে পারে। কিন্তু আশ্চর্যজনক ব্যাপার হচ্ছে, ব্যাংকাররা এ ধরনের কাজ মোটেও করেন না। ভাবতে অবাক লাগে, দেশের উদ্যোক্তাদের মধ্যে যারা ভালো এবং নিয়মিত ঋণ পরিশোধ করেন, যারা জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রেখে চলেছেন, তাদের কোনো বিশেষ ধরনের আর্থিক প্রণোদনা দেয়া হচ্ছে না। প্রত্যেকটি ব্যাংকেরই এ বিষয়টি দেখা দরকার। এমনকি কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা জারি করতে পারে।
সাপ্তাহিক : আপনার সময়ে  এ ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল কিনা?
ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ :  আমার সময়ে এ ইস্যুগুলো ততটা ব্যাপকভাবে আসেনি। সে সময় কিছু শিল্প প্রতিষ্ঠান নানা কারণেই বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। এদের অনেকগুলোর পরিচালনায় যুক্ত ব্যক্তিরা বিদেশে থাকতেন। তারা ঠিকমতো প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতে পারছিলেন না। এসব শিল্প প্রতিষ্ঠান রক্ষায় তখন বেশকিছু উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। প্রথমে ব্যাংকগুলো এগিয়ে আসে। ব্যাংকগুলোর সে উদ্যোগে বাংলাদেশ ব্যাংক সহায়তা করে। পরে এসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশই টিকে যায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকৃত উদ্যোক্তা যারা সমস্যাক্রান্ত, তাদের রক্ষা করার জন্য এগিয়ে আসা উচিত বলে আমি মনে করি। বাংলাদেশ ব্যাংক শুধু রুটিনওয়ার্ক করবে, এটা ঠিক নয়। তাদের প্রতিনিয়তই উদ্ভাবনীমূলক কাজ করতে হবে। অতীতে এ ব্যাপারে বেশকিছু ভালো কাজ হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ইচ্ছে করলে তা দেখে উদ্যোগ নিতে পারে।
সাপ্তাহিক : বিনিয়োগ বাড়ছে না। হতাশ সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তারা। নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য কী করণীয় বলে মনে করেন?
ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ : যারা সম্ভাবনাময় নতুন উদ্যোক্তা, বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সামর্থ্য এবং প্রকল্পের সম্ভাবনার বিষয়টি বিবেচনা করে ব্যাংকগুলোর উচিত হবে এদের তুলনামূলক সহজ শর্তে ঋণ দেয়া। তারা যাতে পুঁজি সংকটে পতিত না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। তাদের জামানতদানের সামর্থ্য, স্থায়ী সম্পদ আছে কিনাÑ এসব বিষয় ততটা গুরুত্ব দেয়া উচিত হবে না। আমরা অভিজ্ঞতায় দেখেছি, জামানত নিলেও কোনো লাভ হয় না। উদ্যোক্তার প্রচুর সম্পদ থাকলেও কোনো লাভ হয় না।
সাপ্তাহিক : জামানত জটিলতায় অনেকেই ব্যাংকমুখী হতে পারেন না। এটি কীভাবে দেখেন?  
ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ : উদ্যোক্তার ব্যবসায়িক রেকর্ড ও ব্যবসায়ের সম্ভাবনা যদি ভালো হয়, তাহলে তাকে ঋণ দিতে অসুবিধা কোথায়? একজন ঋণ আবেদনকারীর অভিজ্ঞতা, সামাজিক ও পারিবারিক অবস্থান, ব্যবসায়িক রেকর্ড ইত্যাদি বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।
জামানত নেয়া যেতে পারে, তবে সেটাকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া ঠিক হবে না। কারণ একজন উদ্যোক্তা যদি সৎ এবং বিশ্বস্ত না হন, তাহলে তার কাছ থেকে জামানত নিয়েও ঋণ আদায়ের নিশ্চয়তা পাওয়া যাবে না। আর একটি বিষয় অবশ্যই গুরুত্ব দিতে হবে, তা হলো আবেদনকারী যদি সম্ভাবনাময় এবং প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় সামর্থ্যবান হন, তাহলে তাকে যথাসম্ভব স্বল্পতম সময়ের মধ্যে ঋণ মঞ্জুর এবং বিতরণ করতে হবে। কারণ চাহিদামতো স্বল্প সময়ে ঋণ প্রদান করা না হলে সে ঋণের উপযোগিতা অনেকাংশেই কমে যায়। ফলে তারা ঋণ সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারেন না। এতে তারা ঋণ গ্রহণের সুফল থেকে বঞ্চিত হন। এটা যাতে কোনোভাবেই না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
সাপ্তাহিক : জামানত মূল্যায়নের পদ্ধতি নিয়ে সমালোচনা আছে। আপনার মত জানতে চাই?
 ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ :  সম্পত্তি মূল্যায়নের একেক সময় একেকটা করা হয়। অনেক সময় সম্পদের অতিমূল্যায়ন করা হয়। ব্যাংক কর্মকর্তার যদি ভালো লাগে, তাহলে সম্পদের ওভার ভ্যালুয়েশন করতে পারেন। আবার খারাপ লাগলে আন্ডার ভ্যালুয়েশন করা হয়ে থাকে। ঢাকা শহর এবং অন্যান্য এলাকায় অঞ্চলভেদে জমির মূল্য সরকারিভাবে নির্ধারিত থাকে। জমির মূল্যায়ন করার সময় বাজারমূল্য ভালোভাবে যাচাই-বাছাই করতে হবে। ব্যাংক কর্মকর্তাদের এক্ষেত্রে অধিকতর দায়িত্বশীল হতে হবে। ব্যাংক কর্মকর্তা যদি দায়িত্বশীল হন, তাহলে তার পক্ষে জমির সঠিক মূল্যায়ন করা খুব একটা কঠিন নয়। মূল্যায়নের ক্ষেত্রে হেরফের হলেও সামান্যই হবে; বিরাট গ্যাপ হবে না।
সাপ্তাহিক : বাংলাদেশ ব্যাংক এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের যৌথ নিয়ন্ত্রণে দ্বৈত শাসন সৃষ্টি হয়েছে বলে ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে অভিযোগ উঠেছে। এর প্রভাব কী পড়তে পারে?
ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ : এটি ব্যাংকিং সেক্টরের জন্য অশুভ বার্তা বলে মনে করি। ব্যাংকিং সেক্টরের সার্বিক দায়িত্ব থাকবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর। তারাই ভালো বুঝবে ব্যাংকিং সেক্টরের জন্য কী পদক্ষেপ নিতে হবে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকের ওপর ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ফলে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকা অনেকটাই গৌণ হয়ে গেছে। এটা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। আমি মনে করি, অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ একেবারে না থাকাই ভালো। মাঝে একবার এটা করা হয়েছিল; কিন্তু পরে আবার ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ চালু করা হয়েছে। আমি যখন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ছিলাম, তখন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ ছিল না। ফলে সে সময় জটিলতা অনেক কম ছিল। সেন্ট্রাল ব্যাংকেরও এক্ষেত্রে দায়িত্ব রয়েছে। তাদের যে আইনি অধিকার আছে, তা যথাযথভাবে প্রয়োগ করতে হবে।
সাপ্তাহিক : প্রবৃদ্ধি নিয়ে উচ্ছ্বসিত সরকার। কিন্তু আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো সংশয় প্রকাশ করেছে, সরকারের ঘোষিত প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে। আপনার বিশ্লেষণ কী?
ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ : চলতি অর্থবছরে ৭ দশমিক ৪ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হবে বলে সরকার ঘোষণা করেছে। যেসব সূচকের ভিত্তিতে প্রবৃদ্ধি নির্ভর করে, তা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় সরকার নির্ধারিত ৭ দশমিক ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করা সত্যি কঠিন হবে। কৃষি খাতের  প্রবৃদ্ধি স্থবির হয়ে পড়ছে। উৎপাদন খাতের অবস্থা কিছুটা ভালো হলেও তা নিয়ে খুব আশাবাদী হওয়ার সুযোগ নেই। প্রবাসীদের পাঠানোর রেমিট্যান্সের মাত্রা অনেক কমে গেছে।  রেমিট্যান্স-প্রবাহ বাড়বে বলেও আশা করার বিশেষ কোনো কারণ নেই।
সাপ্তাহিক  : তাহলে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা  কী হতে পারে?
ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ : দেখুন, পণ্য সেবা রপ্তানি কমে গেছে। রপ্তানি না বাড়লেও আমদানি ব্যয় বেড়ে গেছে। আগামীতে গ্যাস, বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি পাবে। কাজেই এসব ফ্যাক্টর বিবেচনায় বলা যেতে পারে, এ বছর ৭ দশমিক ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করা সত্যি খুব কঠিন হবে। আমি অনেক আগেই বলেছি, চলতি অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার কোনোভাবে ৭ শতাংশ বা তার কাছাকাছি পৌঁছতে পারে। আমি মনে করি, প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৬ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে ৭ শতাংশ। এর বেশি হওয়ার কোনো সম্ভাবনা আমি অন্তত দেখছি না। এর মধ্যে ৬ দশমিক ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধিই সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য প্রাক্কলন।

সাপ?তাহিক পতিবেদন

 মতামত সমূহ
পিছনে 
 আপনার মতামত লিখুন
English বাংলা
নাম:
ই-মেইল:
মন্তব্য :

Please enter the text shown in the image.