[শ্রদ্ধাঞ্জলি] ‘নাই’ মানা যায় না... -গোলাম মোর্তোজা

Print Friendly and PDF

লেখাটি যখন লিখেছিলাম, তিনি তখন লন্ডনের হাসপাতালে নিবিড় পর্যবেক্ষণে ছিলেন। অচেতন অবস্থায় ছিলেন। ওষুধ দেওয়া হয়েছিল। ওষুধে সাড়া দেবেন, আশা আর প্রত্যাশা নিয়ে অপেক্ষা করা ছাড়া আর কিছু করার ছিল না। এর বাইরে আর কিছু আবিষ্কার হয়নি। পৃথিবীর সেরা একটি হাসপাতালে সেরা চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে প্রযুক্তিগত সুবিধা নিয়ে শুয়ে ছিলেন তিনি।
বলছি আনিসুল হকের কথা। ঢাকার মেয়র আনিসুল হক। আপনি যে মানুষটিকে চেনেন, কিছুটা জানেন বহু বছর ধরে। তিনি অল্প কয়েকটা দিন আমাদের চোখের সামনে নেই। মানুষ তো খুব অদ্ভুত প্রাণী। চোখের সামনে না থাকলে, মনে করিয়ে না দিলে সাধারণত কাউকে মনে করেন না।
যখন আনিসুল হককে নিয়ে লিখছি, যখন পড়ছেন- তিনি এসবের কিছুই জানেন না। সময়টা ছিল আশা করার, প্রার্থনা করার। আপনাদের প্রার্থনা আর আশার জোরে, ডাক্তারদের সেবায় নিশ্চয় সাড়া দেবেন আনিসুল হক, সেই আশা নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন পরিবারের সদস্যরা। ফিরে আসবেন আনিসুল হক এই আশায় পরিবারের সদস্যরা, প্রার্থনা এবং দোয়া চেয়েছিলেন জনমানুষের থেকে। মানুষ দোয়া করেছিলেনও। কিন্তু সবকিছুকে উপেক্ষা করে, সব মায়া ত্যাগ করে, সবকিছু ছেড়ে চলে গেলেন আনিসুল হক- না ফেরার দেশে।
কথা হচ্ছিল ডা. আবদুন নূর তুষারের সঙ্গে। তার পরিচয় আলাদা করে দেওয়ার নেই। প্রশ্ন না করতেই কথা বললেন, অনেক কথা বললেন। কেন বললেন, বহু বছর ধরে আনিসুল হককে খুব কাছ থেকে দেখা ডা. আবদুন নূর তুষারের গলা ভারী হয়ে আসছিল। কত কথা, কত স্মৃতি। টেলিফোনের এপাশ থেকে নিশ্চিত বোঝা না গেলেও, সম্ভবত চোখের পানি ধরে রাখতে পারছিলেন না।
তাকে পরিবারের পক্ষ থেকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল আনিসুল হকের অবস্থা জানানোর। সম্ভবত জীবনের সবচেয়ে কঠিন দায়িত্বটি ডা. তুষার পেয়েছিলেন। গণমাধ্যমের একটা অংশ কোনো কিছু না জেনে ভুল তথ্য প্রকাশ করেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কিছু অমানুষ কুৎসিত অপপ্রচার চালিয়েছে। তিনি কিছুটা বিরক্ত। অনেক কথা বললেন, সম্ভবত বলে হালকা হতে চাইলেন। হালকা হতে পেরেছিলেন বলে মনে হয় না।
মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর আনিসুল হক সম্পর্কে সাধারণ জনমানুষের কিছু ধারণা তৈরি হয়েছে বলে মনে হয়। তার চরিত্রের কিছু বিষয় সামনে এসেছে, কিছু বিষয় চাপা পড়ে গেছে। আনিসুল হক সম্পর্কে দু’একটা কথা বলি।

০১.
অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের অত্যন্ত স্নেহ ভালোবাসার মানুষ আনিসুল হক-রুবানা হক। আনিসুল হকের প্রতিটি টেলিভিশন অনুষ্ঠানের নেপথ্যে সরাসরি কাজ করা প্রধান ব্যক্তি ডা. আবদুন নূর তুষার। তার নেপথ্যের বুদ্ধি পরামর্শ, পরিমার্জন-পরিবর্ধনের কারিগর অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সম্পৃক্ততার সুবাদে টেলিভিশনের পর্দার বাইরের আনিসুল হককে চিনি, কিছুটা জানি বহু বছর ধরে। এক জীবনে নিজের চেষ্টায় বড় হয়ে ওঠা মানুষ আনিসুল হক-রুবানা হক।
আনিসুল হকের গতি অত্যন্ত ক্ষিপ্র। সেই ১৯৯২-৯৩ সালে দেখেছি যে গতি- ক্ষিপ্রতা, ২০১৭ সালেও ঠিক একই গতি- ক্ষিপ্রতা দেখেছি। বাংলা মটরের সেই পুরনো লাল ইটের বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে মাঝেমধ্যে আনিসুল হক আসতেন সাদা রঙের একটি টয়োটা গাড়ি নিয়ে। গাড়ি সম্পর্কে তখন কিছুই জানি না। আলোচনা শুনেছি, গাড়িটির দাম ১৩ লাখ টাকা, মানে অনেক টাকা!
গাড়ি থেকে নেমে কখনও তাকে আস্তে হাঁটতে দেখিনি। ‘স্যার কোথায়’- বলে দ্রুতগতিতে এগিয়ে যেতেন। এখনও তার গতি একটুও কমেনি, কোনো কোনো সময় মনে হয় বেড়েছে। অথচ আমার দেখার মাঝে পেরিয়ে গেছে প্রায় ২৫ বছর। আনিসুল হকের বয়স ৬৫ বছর। শারীরিক সামর্থ্য এবং মানসিকতায় পরিপূর্ণ যুবক থেকেই বিদায় নিলেন।

০২.
টেলিভিশনের উপস্থাপক আনিসুল হককে যারা দেখেছেন-শুনেছেন, মেয়র আনিসুল হককেও তারা দেখছেন-শুনেছেন। উপস্থাপক আনিসুল হকের কথার চেয়ে মেয়র আনিসুল হকের কথায় দৃঢ়তা বহুগুণ বেশি। যা অনেকের কাছে ‘দাম্ভিক’ শোনায়। আমি যতটুকু জানি, মানুষ আনিসুল হক ‘দাম্ভিক’ নন, অত্যন্ত দৃঢ়। জোর দিয়ে বিশ্বাস থেকে কথা বলেন, কাজ করেন, কাজ করতে চান। ‘না’ শুনতে চান না।
‘সময় ক্ষেপণ’ পছন্দ করেন না। ‘কেন হবে না’- যে কাজ অন্যের করার কথা, তা নিজে করে ফেলেন। অনেক ক্ষেত্রে কাজটি করাতে বাধ্য করেন। সৎ মানুষের যে ‘দৃঢ়তা’ তা আনিসুল হকের চরিত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল। সিটি করপোরেশন একটি দুর্নীতির ডিপো, কমবেশি সবাই তো তা জানি। মেয়র হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে ‘দুর্নীতি মুক্ত সিটি করপোরেশন’ করার নীতি নিয়েছিলেন।
পুরোটা পারেননি, অনেকটা পেরেছিলেন। মানুষের থেকে নেওয়া ঘুষ, ফেরত দিতে বাধ্য করেছেন সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তাদের। নিজে অবৈধ অর্থ আয় করবেন না, করতে দেবেন না, নীতি নিয়ে কাজ শুরু করেছিলেন আনিসুল হক। এতে তার ওপর খুশি না থাকা মানুষের সংখ্যা ছিল অনেক।

০৩.
মেয়র আনিসুল হকের গতির সঙ্গে সিটি করপোরেশনের সরকারি কর্মকর্তারা পেরে ওঠতেন না। যেমন একটি কাজ আনিসুল হক করতে চাইছেন দু’ঘণ্টার মধ্যে, কর্মকর্তারা বলছেন ৭ দিন সময় লাগবে। কেন সময় লাগবে?
সচিবের কাছে ফাইল গেছে। স্বাক্ষর হয়ে আসতে সময় লাগবে।
সচিবকে সরাসরি ফোন করলেন আনিসুল হক। দু’ঘণ্টার মধ্যে স্বাক্ষর হয়ে ফাইল চলে এলো। সরকারি কর্মকর্তারা অভ্যস্ত নন এই গতির সঙ্গে। গতিহীন অসৎ কর্মকর্তাদের তিনি দ্রুত কাজ করতে বাধ্য করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। পুরোটা যে পেরেছিলেন তা নয়। তবে গতি বৃদ্ধি অনেকটা দৃশ্যমান হয়েছিল। কাজের গতি যেমন বেড়েছিল, ঘুষের পরিমাণও তেমন কমেছিল।

০৪.
এই লেখায় যা বলছি, এমন নয় যে আনিসুল হক সম্পর্কে সব সময় এমন লিখেছি বা বলেছি। তার কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ ব্যবসা নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছি। ফোন করেছেন, সমালোচনার জবাবে হাসিমুখে প্রশংসা করে তার যুক্তি দিয়েছেন। যুক্তি মানতে পারিনি। কিন্তু হুমকি বা দাম্ভিকতা দেখাননি কখনও।
মেয়র নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছি, সমালোচনা করেছি। হাসিমুখে তিনি তার কথা বলেছেন ‘দৃঢ়তা’র সঙ্গে, দাম্ভিকভাবে নয়। বিজিএমইএ’র নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তৈরি পোশাককর্মীদের বেতন ইস্যুতে সমালোচনা করেছি। সমালোচনা করেছি হাতিরঝিলের মাঝে বিজিএমইএ ভবন নির্মাণ নিয়ে। আনিসুল হক এখন আমাদের মাঝে নেই। সেই আনিসুল হককে দেবতা হিসেবে দেখছি না। দেখছি ভালো- মন্দ মেলানো একজন মানুষ হিসেবেই। অনেকেই অহেতুক সমালোচনা করছেন। এক্ষেত্রে শুধু একটি কথাই বলব, নিজের যোগ্যতায় বিত্তবান হওয়া অপরাধ নয়। আনিসুল হক এই সমাজের অনেকের চেয়ে উচ্চ মূল্যবোধ সম্পন্ন মানুষ ছিলেন, দেবতা নয়।

০৫.
মেয়র আনিসুল হককে নিয়ে মানুষের অনেক অভিযোগ ছিল। যানজট-জলজটে মানুষের জীবন অস্থির। অভিযোগ আনিসুল হকের বিরুদ্ধে। মহামারি আকার ধারণ করল চিকনগুনিয়া, অভিযোগ আনিসুল হকের বিরুদ্ধে। কেন তিনি মশারি টাঙানো নিয়ে এভাবে কথা বললেন, অভিযোগের সঙ্গে চলল বিষোদগার। কুৎসিত বিষোদগার। রাজনীতিবিদরা মানুষের এই অভিযোগ, বিষোদগার শুনে অভ্যস্ত।
আনিসুল হক সফল ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ নন। মেয়র হয়ে রাজনীতিবিদ হয়েছিলেন। পেশা ব্যবসা। মানুষের এই কুৎসিত বিষোদগার শুনতে তিনি অভ্যস্ত ছিলেন না। মানুষের এই বিষোদগার ধারণ করতে তার খুব কষ্ট হয়েছিল। তার ভাবনাটা ছিল এমন, ‘আমি তো সততার সঙ্গে আন্তরিকভাবে সর্বোচ্চ সামর্থ্য দিয়ে চেষ্টা করছি। মানুষ তা বুঝবেন না, এভাবে বিষোদগার করবেন!’
এই ভাবনাটা কখনও প্রকাশ করেননি। তবে কাছের দু’একজন তা জানতেন। চিকিৎসা বিজ্ঞান কী বলে জানি না, মানুষের এই বিষোদগারের প্রভাব তার অসুস্থতার পেছনে ভূমিকা রেখেছে কি না!

০৬.
তেজগাঁও থেকে ট্রাকস্ট্যান্ড, গাবতলী-মহাখালী রাস্তা থেকে বাস সরিয়েছেন। গুলশান-বনানী-বারিধারা চকচকে ঝকঝকে করেছেন। যানজট-জলজটের উন্নতি ঘটাতে পারেননি। ঢাকা শহরের রাস্তাঘাটের অবস্থা অত্যন্ত খারাপ। ফুটপাত রোড ডিভাইডার ভাঙাগড়ার কাজ চলেছে। সব কিছু নিয়েই আলোচনা-সমালোচনা। গুলশান-বনানী চকচকে, ধানমন্ডি বা মোহাম্মদপুর কেন নয়- সমালোচনার জবাবে সময় চেয়েছিলেন। একে একে সব করবেন বলেছিলেন। কিন্তু মানুষ সময় দিতে রাজি ছিল না।
যানজট মুক্ত করার ক্ষেত্রে তার কিছু করার ছিল না। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি দেওয়ায় চেষ্টা করছিলেন। পারছিলেন না, পারার কথাও নয়। এত কুতুবের শহরে জলজট দূর করা মেয়রের সাধ্যের বাইরে। মানুষ তা মানতে নারাজ। সব দায় মেয়রের, সকল বিষোদগার মেয়রের বিরুদ্ধে। হয়তো মানুষের প্রত্যাশা তৈরির পেছনের দায় অনেকটা আনিসুল হকেরই ছিল।
মেয়র নির্বাচিত হওয়ার আগে মেয়রের ক্ষমতা সম্পর্কে তার ধারণা পরিষ্কার ছিল না। এত কম ক্ষমতা নিয়ে নৈরাজ্যকর ঢাকা নগরের মেয়রকে কাজ করতে হয়, তা ব্যবসায়ী আনিসুল হকের পক্ষে হয়ত জানা সম্ভব ছিল না। ভেবেছিলেন আন্তরিকতা, সততা নিয়ে সবকিছু তিনি করে ফেলতে পারবেন। তিনি যাতে না পারেন, তার পেছনে যে এত মানুষ সক্রিয় থাকবেন, তা তিনি বুঝতে পারেননি।
আনিসুল হক অনেক কিছু করতে পারেননি তা যেমন সত্য, অনেক কিছু করতে পেরেছিলেনও। যা অতীতের অন্য কোনো মেয়র পারেননি। এমন কর্ম উদ্যোগী, সৎ কোনো মানুষ তো ইতিপূর্বে ঢাকা নগরের মেয়র হিসেবে আসেননি।
অসৎভাবে আয় না করে সততার সঙ্গে আন্তরিকতার সঙ্গে মেয়র কাজ করেছিলেন, আনিসুল হকের সবচেয়ে বড় সমালোচককেও বলতে হবে, এমনটা এর আগে কখনও তারা দেখেননি। মানুষের আচরণ কথায় এর প্রকাশ না দেখে ভেতরে ভেতরে দগ্ধ হয়েছেন আনিসুল হক। আবেগী আনিসুল হক ক্ষোভ-রাগ ভেতরে ধারণ করেছেন। নীরবে সব কিছু সহ্য করেছেন, এই সফল ব্যবসায়ীর চরিত্রের সঙ্গে যা বেমানান।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের স্বনামধন্য ব্যবসায়ী আনিসুল হক, মেয়র নির্বাচিত হয়ে প্রচণ্ড মানসিক চাপে আক্রান্ত হয়েছিলেন। অসুস্থতার বিষয়টি বুঝতে পেরেছেন। সিএমএইচ, বাংলাদেশের প্রখ্যাত সব ডাক্তার থেকে সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে ছুটে গেছেন। কেউ কিছু শনাক্ত করতে পারেননি। কাজ করে গেছেন।
এত জটিল প্রায় বিরল রোগ ‘সেরিব্রাল ভাস্কুলাইটিস’ ধারণ করছেন, তা বুঝতে পারেননি। রোগটি শনাক্ত হয়েছিল লন্ডনের হাসপাতালে। যে হাসপাতালে তার জীবনের শেষ সময়টা কাটল।

০৭.
কিছু কথা বললাম, অনেক কথা বলা হলো না। কত মানুষকে কতভাবে সে সহায়তা করেছেন তার যে সামান্য কিছু জানি, তাও অসামান্য। কোনো দিন নিজে ছিটেফোঁটাও বলেননি। আনিসুল হক, প্রিয় আনিস ভাই আপনার সম্পর্কে আরও অনেক কিছু আরও অনেকে বলছেন, অনেকে বলবেন। আপনার মুখ থেকে অজানা অনেক কিছু শোনার আশা নিয়ে লন্ডনের পথ চেয়ে থেকেছে মানুষ। তারা ছুটে গেলেন আপনার বাড়িতে, আর্মি স্টেডিয়ামে। আপনি কি তা জানলেন, বুঝলেন? কত মানুষ আপনার জন্যে স্বজন হারানোর বেদনা অনুভব করলেন!
আপনি সাড়া দিলেন না। সেই গতি নিয়ে, ক্ষিপ্রতা নিয়ে ফিরে এলেন না। ডাক্তারের সেবার সঙ্গে মানুষের দোয়া... । মানুষ প্রার্থনা করছিলেন, অপেক্ষা করছিলেন, আপনি এভাবে দেশে ফিরবেন- সেই জন্যে নয়। এই ফেরা মানে যে একেবারে চলে যাওয়া, শুধু আপনার পরিবার নয়- কেউই তা মানতে পারছেন না।

সাপ?তাহিক পতিবেদন

 মতামত সমূহ
পিছনে 
 আপনার মতামত লিখুন
English বাংলা
নাম:
ই-মেইল:
মন্তব্য :

Please enter the text shown in the image.