[বই কথা] একটি জাহাজ নোঙর করেছিল-শেগুফতা শারমিন

Print Friendly and PDF

বইটা পড়া শেষ করে কিছুক্ষণ থমকে থাকতে হয়। কিছুক্ষণ আসলে নয়, আসলে ঘণ্টাখানেক মুখে কোনো কথা আসে না। বুকের ভেতর অকারণে মোচড় দিতে থাকে। মন চলে যায় দূরে বহু দূরে। এক সাদাকালো সময়ে।  কোলকাতা শহরের রাসবিহারী এভিনিউয়ের মোড়ে। আমি কি ঘরে এই অঘ্রানের সন্ধ্যায় শুক্ল পক্ষের আধা চাঁদের আঁধারিতে কোনো ট্রামের ছায়া দেখতে পাই? কানে কি ভেসে আসে টুংটাং ট্রামের ঘণ্টা? কারও খুব কাছের বন্ধু কি আমার কানের কাছে ফিসফিস করে বলে যায়, একটি জাহাজ ছেড়ে গেল? আমার নাকে কি এসে লাগে খোসা ছাড়ানো আধাখানা হিম কমলা লেবুর করুণ মাংসের ঘ্রাণ? আমি বুঝি না, কিচ্ছু বুঝি না। কোনো প্রশ্নের উত্তর পাই না। কেবল ভেসে যাই এক দ্বান্দ্বিক দোলাচলে।
যেই মানুষটাকে এতদিন জেনে এসেছি কবিতার গোপনে গোপনে। রূপকে, নিসর্গে। এদেশের নদীতে, পাখিতে, শীতের কুয়াশায়, পথের কাকের দলে, বেত ফলের ঝোপে, প্রিয় মানুষের চোখের তারায়।  সেই মানুষটাকে, রহস্য জড়ানো মানুষটাকে, ট্রামের ক্যাচারে বেঁধে হারিয়ে যাওয়া মানুষটাকে যেন নতুন করে আবিষ্কার করি, একজন কমলালেবু বইটা পড়তে গিয়ে। বলাবাহুল্য পড়তে শুরু করার পর থেকে মিলু নামের মানুষটাকে যাকে আমরা চিনি জীবনানন্দ দাশ নামে, তাকে মোটেই ভালোবাসতে পারছিলাম না। অন্য সব কিছু বাদ দেই, শুধু দুজন নারীর সঙ্গে তার যে সম্পর্ক বা সম্পৃক্ততা সেই আচরণের বিশ্লেষণে তাকে আমার ভালো লাগছিল না। প্রচণ্ড কষ্ট হচ্ছিল লাবণ্যর জন্য। লাবণ্য মানে মিসেস দাশ। যে কিনা শিক্ষিত মধ্যবিত্ত পরিবারের স্বাধীনচেতা মেয়ে। হোস্টেলে থেকে বড় হওয়া। নাটক করা, গান করা, রাজনীতি সচেতন স্বপ্নবাজ তরুণী। দিল্লির অধ্যাপককে বিয়ে করলেন, পড়াশোনায় উৎসাহ পাবেন বলে। অথচ কিনা বিয়ের পরের সপ্তাহ থেকে হয়ে গেলেন একজন বেকার কবির স্ত্রী। বিশাল যৌথ পরিবারের দায়িত্বশীল বধূ। যার স্বামীর মন পড়ে থাকে কবিতায়, আর ধাঁধায়। যে ধাঁধা  শোভনাকে ঘিরে।
উঠতি তারুণ্যে শোভনার প্রেমে পড়েন জীবনানন্দ। সে কি প্রেম? কনভেন্টে পড়া স্মার্ট মেয়ে শোভনার সঙ্গে সময় কাটাতো তার মিলুদা। পরিবেশের প্ররোচনা ছিল, শরীরের টান ছিল। তাই বলে কি সেটা প্রেম ছিল? সত্যি বলি জীবনানন্দের এই সম্পর্কটা নিয়ে এর আগে এতটা বিশদ জানতাম না। ধূসর পাণ্ডুলিপির উৎসর্গপত্রটুকু ছাড়া। একজন কমলালেবু পড়তে গিয়ে বারবার মনে হয়েছে, যে কবি এত তুমুল প্রেমের কবিতা লিখে গেলেন, তিনি নিজের জীবনে নির্ণয় করতে পারলেন না প্রেম এবং প্রেমহীনতা। শাহাদুজ্জামানের বইয়ের পাতায় পাতায় যে বিবরণ, তা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, মিলুদার প্রতি শোভনা বা বেবীর ছিল ক্ষণিকের অন্তরঙ্গতা। এটা প্রেম নয়, ভালোবাসা নয়। প্রেম বা ভালোবাসার জায়গায় যাওয়ার মতোও নয়। কারণ শোভনা স্মার্ট, হিসেবি এবং বুদ্ধিমতি। তার শেষ জীবনের বর্ণনা অবধি যতটুকু বোঝা যায়, তথাকথিত সফল সুখী জীবনের ছকে হেঁটে গেছেন তিনি। সেখানে অসুন্দর, বেকার, বোকাসোকা, গ্রাম্য, মুখচোরা, দায়িত্বজ্ঞানহীন মিলুদার জীবনের সঙ্গে জড়ানোর কোনোরকম কোনো কারণ তার ছিল না।  যে শোভনার জন্য বই উৎসর্গ সে কখনো জীবনানন্দের কবিতাও পড়ে দেখেনি।
হায় জীবনানন্দ! হায় বোকা প্রেমিক!! একটা ভুল প্রেমকে প্রেম ভেবে সারাটা জীবন খরচ করে গেলেন! নিজের জীবন গেল তো গেল, মাঝখান দিয়ে লাবণ্যের জীবনটা হয়ে গেল দুর্বিষহ। এই জায়গাতে এসে অসহ্য লাগে। ভালো লাগা, ভালোবাসা কমে আসে মানুষটার প্রতি। রাগ হয় প্রচণ্ড রাগ। উল্টো দিকে মায়া লাগে লাবণ্য নামের চির অসুখী মানুষটার জন্য। ইতিহাস যাকে ভুল ভাবে উপস্থাপন করেছে। জীবন এবং জীবনের এপার ওপার কারও কাছে কোনোখানে কোনো দিনও কোনো কিছুই পেল না মানুষটা।
 শোভনার জন্য যে বেদনা, যে হাহাকার তার ছবি দেখতে পাই জীবনানন্দের কবিতার পংতিতে পংতিতে। হয়তো এই হাহাকারের জন্যই বাংলা সাহিত্য পেল এক মহান কবি। অথচ এই হাহাকারের জন্য চরম ব্যর্থ একটা জীবন কাটিয়ে গেল লাবণ্য দাশ। কার দাম বেশি? একটা গোটা জীবনের না কি সাহিত্যের?
আরেক জায়গায় এসে মনে হয়েছে, কবি জীবনানন্দ সিদ্ধান্ত নিতে দুর্বল। যখন লাবণ্যর সঙ্গে বিয়ের কথা চলছে। তখন তিনি দোটানায় আছেন শোভনা আর লাবণ্যের ভেতর। সেই দোটানার সমাধান পেতে তিনি হাজির হন দিল্লির ব্রোথেলে! কি চমৎকার উছিলা!
মোটের উপর, অন্য আর কিছু নয়, শুধু এই দুই নারীকে কেন্দ্র করে তার যে জীবনবোধ, আমার ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গিতে যে ভুল জীবনবোধ, শুধু সেটুকুর জন্যই পছন্দের কবি থেকে অপছন্দের মানুষের তালিকায় প্রায় পৌঁছে যেতে থাকেন পাতার পর পাতায়।
অতঃপর দীর্ঘ শীতের রাত্রির পর যেমন ভোর আসে, তেমনি করেই পড়তে পড়তে পৌঁছে যাই শেষে। বইয়ের পাতায় আসে ২২ অক্টোবর ১৯৫৪। শম্ভুনাথ হাসপাতালের নোংরা ইমার্জেন্সির বিছানায় শুয়ে দেহ থেকে বার হয়ে যান কবি। প্রার্থনার মাদুরে বসে কবিবন্ধু সঞ্জয় লিখে ফেলেন, ‘একটি জাহাজ ছেড়ে গেল...’
থমকে গিয়ে নিঃশব্দ হয়ে যাই। মনে হয়, ‘একটি জাহাজ একদা এই বাংলায় নোঙর করেছিল...’
‘স্বপ্ন নয়, শান্তি নয়, ভালোবাসা নয়
হৃদয়ের মাঝে এক বোধ জন্ম লয়
আমি তারে পারি না এড়াতে।’
বুঝে যাই, যত রাগ হোক, দুঃখ হোক, ভুল ভাবনা হোক, অভিমান অনুযোগ তৈরি হোক। এত বছর ধরে যেখানে রেখেছি তারে, সেখানে তাকে এড়ানো যাবে না। তিনি থাকবেন, আমি ভালোবাসি বা না বাসি।

সাপ?তাহিক পতিবেদন

 মতামত সমূহ
পিছনে 
 আপনার মতামত লিখুন
English বাংলা
নাম:
ই-মেইল:
মন্তব্য :

Please enter the text shown in the image.