বেনাপোলে থামছে না শুল্ক ফাঁকি : শুরু হয়েছে বাঘ-সিংহ পাচার

Print Friendly and PDF

মহসিন মিলন, যশোর থেকে

অভিনব কায়দায় বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার শুল্ক ফাঁকির কারবার চলছেই। বেশ কিছুদিন কিছুটা নিয়ন্ত্রণে থাকলেও ইদানীং বন্দরে নতুন করে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট পুনরায় সক্রিয় হয়ে উঠেছে। এ ছাড়া মূল্যবান প্রাণিসম্পদ পাচারে বেনাপোল বন্দর ব্যবহার শুরু করেছে নতুন একটি চক্র। মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকায় এখনও ঠিক পরিষ্কার নয় যে, তারা কী কী পাচার করছে। তবে ধরা পড়ার সূত্রে চিতা বাঘ, সিংহের মতো প্রাণী পাচারের প্রমাণ মিলেছে। এসবের ফলে বেনাপোল স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ এখন চ্যালেঞ্জের মুখে। ঝুঁকিমুক্ত, নিরাপদ বন্দর নিশ্চিত করতে তারা কাজ করে যাচ্ছেন দাবি করলেও সমস্যার সমাধান মিলছে না।

শুল্ক ফাঁকি
৩০ নভেম্বর ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে অর্ধকোটি টাকার শুল্ক ফাঁকি  দিয়ে বন্দর থেকে ট্রাকভর্তি পণ্য পাচার করে ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার সময় বেনাপোলের আমড়াখালি এলাকা থেকে একটি ট্রাক আটক করে বিজিবি সদস্যরা। পরে  বিজিবি ও কাস্টমস কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে পণ্য চালানটি পরীক্ষা করে বেনাপোল শুল্ক গুদামে ট্রাকসহ পণ্য চালানটি  জমা দেয়া হয়। বেনাপোল কাস্টমস সূত্র জানায়, আটককৃত পণ্যের মূল্য ৬৪ লাখ টাকা। ট্রাকের চালক ও হেলপার পালিয়ে যাওয়ায় তাদের আটক করা সম্ভব হয়নি।
ঢাকা মেট্রো ট- ১৪-৫৯৪২ নাম্বার ট্রাকে করে ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে পণ্য চালানটি বন্দর  থেকে বের করা হয়। ট্রাকটি অন্য একটি গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রিজের চালানের ট্রাকের সাথে কাস্টমস ও বিজিবির  যৌথ তল্লাশি বাশকল পার করা হয়। আটককৃত ট্রাকে যৌথ ইনভেন্ট্রিতে ভারতীয় ৩৪ হাজার ৭২৫ পিস ইনফিউসন সেট ও ৬ লাখ ৪০ হাজার পিস  সিরিঞ্জ পাওয়া যায়। পণ্যর বর্তমান বাজার মূল্য ৬৪ লাখ টাকা বলে কাস্টমস জানায়। তবে এই দুটি পণ্য আমদানিতে আমদানি নীতিতে শর্ত রয়েছে।
আটককৃত ট্রাকের কোনো বৈধ কাগজপত্র নেই। জাল জালিয়াতির কাগজপত্র জব্দ করা হয়েছে। পণ্য চালানটির আমদানিকারক ও সিএন্ডএফ এজেন্টের নাম পাওয়া যায়নি। তবে আটককৃত পণ্য চালানটির বিষয়ে অনুসন্ধান চলছে। অপরাধীদের শনাক্ত করতে বেনাপোল কাস্টমস ও বিজিবি যৌথভাবে কাজ করছে বলে জানা গেছে।
বেনাপোল বন্দরের ডাইরেক্টর আমিনুল ইসলাম জানান, ট্রাক বোঝাই পণ্য চালানটি বেনাপোল বন্দর থেকে বের করা হয়েছে কিনা সে বিষয়ে তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। বন্দরের কারো সাথে এ ঘটনার সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

প্রাণী পাচার
এদিকে ১৩ নভেম্বর যশোর পুলিশ বিলাসবহুল প্রাডো গাড়ি থেকে দুইটি সিংহ ও ২টি ল্যাপার্ড শাবকসহ দুইজনকে আটক করে। আটক দুইজনের বিরুদ্ধে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও চোরাচালান দমন আইনে মামলা দেয়া হয়। উদ্ধার হওয়া শাবক চারটিসহ আটক দুইজনকে ওইদিন বিকেলে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা আদালতে হাজির করেন। বিচারকের আদেশে শাবক চারটিকে বন্যপ্রাণি ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের খুলনা বিভাগীয় কর্মকর্তার জিম্মায় দেয়ার আদেশ দেন।
পুলিশ বলছে, তদন্ত কাজ এগিয়ে চলছে। আটক দুই আসামি আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিও দিয়েছেন। এ ছাড়া রাজধানী ঢাকার উত্তরা থেকে আরও দুইজনকে আটক করা হয়েছে পাচারের সাথে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে। ২৫ নভেম্বর ঢাকার উত্তরা থেকে শাহবাজ ও ইয়াসিন নামে দুইজনকে আটক করা হয়েছে। পরের দিন তাদের আদালতে হাজির করা হয়। তবে তাদের কাছ থেকে তেমন কোনো তথ্য মেলেনি। আদালত তাদের জামিনে মুক্তি দিয়েছেন।
২০ নভেম্বর যশোরের অতিরিক্ত চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক মুহাম্মদ আকরাম হোসেন দুই আসামির জবানবন্দি গ্রহণ শেষে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। গাড়িচালক কামরুজ্জামান বাবু বগুড়ার আদমদিঘি উপজেলার বশিকড়া গ্রামের আহাদ আলীর ছেলে। বর্তমানে ঢাকার তুরাগ থানার ফুলবাড়ি টেকপাড়ার ১১ নম্বর সেক্টরের ১৯ নম্বর রোডে বসবাস করে।  আর রানা ভূঁইয়া (২৮) নরসিংদীর পলাশ উপজেলার বকুলনগর গ্রামের আব্দুল মান্নানের ছেলে। ভাড়া থাকেন ঢাকার উত্তরা থানার ৬ নম্বর সেক্টরের ১৩/ডি নম্বর রোডের দাদা গার্মেন্টস এর সামনের ৭ নম্বর বাসায়।
জবানবন্দিতে গাড়িচালক কামরুজ্জামান বাবু জানিয়েছেন, জনশক্তি রপ্তানিকারক খাজা মঈন উদ্দিনের এই বিলাসবহুল গাড়ি। তিনি ওমরা হজে যাওয়ায় তার স্ত্রীর সাথে কথা বলে ঢাকার একটি রেন্ট-এ কারের মাধ্যমে যশোরে যাওয়ার জন্য ২৭ হাজার টাকা ভাড়া চুক্তি হয় তার। ১৩ নভেম্বর সকালে রেন্ট-এ কারের তথ্য অনুযায়ী উত্তরার জসিম উদ্দিন রোডে গেলে দুইজন লোক তার গাড়িতে দুইটি বক্স উঠিয়ে দেয়। বক্সের ভিতর দুইটি সিংহ ও দুটি চিতাবাঘের বাচ্চা আছে বলে তারা জানিয়ে দেয়। এরপর তাদের মধ্যে থেকে রানা তার সাথে আসে। শাবক চারটি যশোরের শার্শার সমটা গ্রামের মুক্তির কাছে পৌঁছে দেয়ার কথা ছিল তাদের।
রানা ভূঁইয়া জানিয়েছেন, তিনি একটি ফলের দোকানে মাঝেমধ্যে কাজ করতেন। সেখানে আক্কাস আলী নামে একজনের সাথে তার পরিচয় হয়। তাকে তিনি কাজ দেয়ার কথা বলে ১২ নভেম্বর রাতে উত্তরার জসিম উদ্দিন রোডে যেতে বলেন। ভোরে জসিম উদ্দিন রোডে এসে দেখেন আক্কাস আলী দাঁড়িয়ে আছেন। এরমধ্যে কালো রঙের একটি গাড়ি এসে তাদের সামনে দাঁড়ায়। এ সময় আক্কাস আলী গাড়িতে দুটি বক্স উঠিয়ে দিয়ে যশোরের শার্শার সামটা গ্রামের মুক্তির কাছে পৌঁছে দিতে বলেন। এ কাজের জন্য আক্কাস আলী তাকে ১০ হাজার টাকা দিতে চেয়েছিলেন।’
ফলে তদন্ত কাজ এগিয়ে নিতে পাচারকারী চক্রের মূল হোতা  আক্কাস ও মুক্তিকে খুঁজছে পুলিশ। তাদের দুইজনকে আটক করতে পারলেই এই চক্রের মূলহোতা কে শনাক্ত করা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা যশোরের চাঁচড়া পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ সৈয়দ বায়েজিদ। পাচারকারী চক্রের সদস্যদের শিগগির শনাক্ত করা সম্ভব হবে বলে আশাবাদী ওই তদন্ত কর্মকর্তা।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সৈয়দ বায়েজিদ জানান, আটক কামরুজ্জামান বাবু ও রানা ভূঁইয়া ২০ নভেম্বর আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। শাবক চারটি ঢাকার উত্তরার জসিম উদ্দিন রোড থেকে যশোরের শার্শার সামটা গ্রামের বাসিন্দা মুক্তির কাছে পৌঁছে দেয়ার কথা ছিল। পাচারকারী চক্রের সদস্য ঢাকার আক্কাস আলী তাদের কাছে পশুর শাবকগুলো দিয়েছিল। এই আক্কাস আলী ও মুক্তিকে খুঁজছি। আক্কাস আলীর ঠিকানা ও মোবাইল নম্বর পাওয়া যায়নি। তার সন্ধানে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। অপরদিকে মুক্তির বাড়িতে একাধিকবার হানা দিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি। তাদের দুইজনকে আটক করতে পারলে পাচারকারী চক্রের মূল হোতাকে শনাক্ত করা সম্ভব হবে। তবে প্রাডো গাড়ির মালিক খাজা মঈনুদ্দিন পাচারের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা আছে কিনা সেটি এখনও নিশ্চিত নই। মালিকের অগোচরে ড্রাইভার ভাড়ায় এসেছিল বলে প্রাথমিকভাবে তথ্য পাওয়া গেছে।
 বেনাপোল বন্দরের সঙ্গে যুক্ত একটি সূত্র নামোল্লেখে রাজি না হলেও বলেছেন, বন্দরটি আধুনিকায়ন এবং এর নিরাপত্তা ও স্থানীয়ভাবে তদন্তের জন্য আধুনিক ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা দরকার। সরকারের উচিত জরুরি ভিত্তিতে বন্দর উন্নয়নের উদ্যোগ নেয়া। তাহলে এই শুল্ক ফাঁকি এবং প্রাণী পাচার আটকানো সম্ভব হবে। এই লক্ষ্যে অপরাধীদের শনাক্ত করতে বন্দর কর্তৃপক্ষের সক্ষমতা বাড়িয়ে তোলার ওপর সরকারকে এখন জোর দিতে হবে।

সাপ?তাহিক পতিবেদন

 মতামত সমূহ
পিছনে 
 আপনার মতামত লিখুন
English বাংলা
নাম:
ই-মেইল:
মন্তব্য :

Please enter the text shown in the image.