[মুক্তগদ্য] তোমার কীর্তির চেয়ে তুমি যে মহৎ

Print Friendly and PDF

আমীরুল ইসলাম

কিরে হারামজাদা, কেমন আছিস?
সবতো লুটেপুটে খেয়ে ফেললি!
জ্বি গুরু। দোয়া করবেন।
তোরা তো সব রাজাকার হয়ে গেলিরে...
গুরু, কী যে কন?
দীর্ঘদেহী নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু চ্যানেল আইয়ের করিডর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আমাদের সঙ্গে দুষ্টামি করছেন। তার ডানদিকে আমি। বাঁ দিকে সহিদুল আলম সাচ্চু। আমাদের তিনি অসম্ভব ভালোবাসেন। আমরাও তাকে গুরু ডাকি। সম্মান করি।
বাচ্চু ভাই আমাদের কৈশোরে- যৌবনের আইকন। তাকে দূর থেকে দেখতাম। গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা তিনি। বীর মুক্তিযোদ্ধা। দীর্ঘদেহী। ক্ষীণ ছিপছিপে দেহ। মনে পড়ে, টেলিভিশনের করিডরে তাকে দেখেছি। আলী ইমাম ভাইয়ের স্কুল-সহপাঠী। আমরা আলী ইমাম ভাইয়ের সঙ্গে থাকি। বাচ্চু ভাই আলী ইমামকে দেখলেই হাসতে হাসতে বলেন, কিরে হেলাল, কোন কোন বই থেকে চোথা মেরে নতুন বই লিখলা?
আলী ইমামের মুখে সলজ্জ হাসি। বাচ্চু ভাই এমনই। খুব কৌতুকস্নিগ্ধ। ঠাট্টা রসিকতায় আড্ডায় সবকিছু মাতিয়ে রাখেন।
এই বাচ্চু ভাইকেই দেখেছি, মঞ্চে। ঢাকা থিয়েটারের নাটক হবে। বাচ্চু ভাই ভেতরে বাইরে সামনে ছোটাছুটি করছেন। সেলিম আল দীনের মঞ্চ সফল নাটকগুলোর বাচ্চু ভাই নির্দেশক। কেরামত মঙ্গল, কীর্তনখোলা, হাত হদাই- এসব নাটকের কথা খুব মনে পড়ে। আমরা তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। দল বেঁধে মঞ্চ নাটক দেখতে যাই। দূর থেকে দেখি, ঢাকা থিয়েটারের সুপার স্টারদের। রাইসুল ইসলাম আসাদ, জহিরউদ্দিন পিয়ার, হুমায়ুন ফরিদী, পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়, আফজাল হোসেন, শিমুল ইউসুফ, সুবর্ণা মুস্তাফা- এইসব উজ্জ্বল তারকার সমাবেশ। এদের দলনেতা নাসিরউদ্দিন ইউসুফ। বেইলি রোড ছাড়াও তাকে দেখেছি বইমেলায়। ৮৭ কিংবা ৮৮ সালে। লম্বা ছিপছিপে বাচ্চু ভাই দাঁড়িয়ে আছেন মেলা মাঠের মাঝখানে। তাকে ঘিরে আছে তার শিষ্যবাহিনী। টেলিভিশন উজ্জ্বল তারকারা। বাচ্চু ভাই এখন দুচারটে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বই লিখছেন। ‘টিটোর স্বাধীনতা’ বইটার কথা আমার খুব মনে আছে। মানিকগঞ্জের এক কিশোর মুক্তিযোদ্ধা টিটো। কীভাবে তার জীবন উৎসর্গ করল মুক্তিযুদ্ধে তারই বয়ান।
বইটা তখন খুব আলোচিত। আমরা দূর থেকে তাকে দেখি। বইটা নিয়ে তার সঙ্গে কথা হবে সেই সাহস হয় না। সামনে দাঁড়িয়ে থেকেছি। দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেছি। কিন্তু বাচ্চু ভাই ভ্রুক্ষেপহীন। সবার সঙ্গে সানন্দে আড্ডা মারছেন। সামান্য তরুণের দিকে নজর দেয়ার প্রশ্নই ওঠে না।
আমরা বরাবর বাচ্চু ভাইয়ের খুব ভক্ত। লুৎফর রহমান রিটন কিংবা শহিদুল আলম সাচ্চু ছিলো তার ঘনিষ্ঠ। বাচ্চু ভাই ওদের সঙ্গে খুব সহজে মেলামেশা করেন। আমি তার ভক্ত। কিন্তু তার ঘনিষ্ঠ হতে পারি না। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের বাচ্চু ভাই। মুক্তিযোদ্ধা বাচ্চু ভাই। নাট্যজন বাচ্চু ভাই। একদিন বাচ্চু ভাইয়ের কাছাকাছি পৌঁছে গেলাম। চ্যানেল আইতে কর্মসূত্রে বাচ্চু ভাইয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা হলো। ফরিদুর রেজা সাগরকে বাচ্চু ভাই আপন ছোটভাই জ্ঞান করেন। বাচ্চু ভাইয়ের সহধর্মিণী শিমুল ইউসুফ। সাগর ভাইয়ের ছোটবেলার বন্ধু। সেই অর্থে খুব ছোটবেলা থেকে সাগর ভাইয়ের সঙ্গে বাচ্চু ভাইয়ের আন্তরিক হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক।
বাচ্চু ভাই সমগ্র জীবনটা মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক কর্মে উৎসর্গ করেছেন। একাত্তরের গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরদিনই ভগ্ন, বোমার আঘাতে ক্ষতবিক্ষত শহীদ মিনারের পাদদেশে রাইফেল হাতে বাচ্চু ভাই দাঁড়িয়ে আছেন। এটা এক ঐতিহাসিক স্থিরচিত্র।
কনভয়ে রাইফেল হাতে বাচ্চু ভাই। ঢাকায় প্রবেশরত বাচ্চু ভাই। যুদ্ধরত বাচ্চু ভাই। এ রকম নানা স্থিরচিত্র। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক দলিল। বাচ্চু ভাই টেলিভিশনে মুক্তিযুদ্ধের নাটক প্রযোজনা করেছেন। একাত্তরের যীশু তার নির্মিত প্রথম মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র। পরে ‘গেরিলা’ নির্মাণ করেন। ‘গেরিলা’ তো আমাদের মুক্তিযুদ্ধের শ্রেষ্ঠতম চলচ্চিত্র-নির্মাণ।
বাচ্চু ভাই সামান্য যা বই লিখেছেন সব কয়টা মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক। বাচ্চু ভাই চ্যানেল আইতে দীর্ঘদিন ধরে ‘মুক্তিযুদ্ধ প্রতিদিন’। অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেছেন।
মুক্তিযোদ্ধাদের সাক্ষাৎকারভিত্তিক অনুষ্ঠান। এই অনুষ্ঠানটি প্রতিদিন প্রচার হয়েছে। প্রায় ১৫০০ পর্ব। চার বছর ধরে প্রতিদিন। মুক্তিযুদ্ধের প্রতি গভীর প্রেম শ্রদ্ধা ভালোবাসা না থাকলে প্রতিদিনের অনুষ্ঠান তৈরি করা সম্ভব নয়। সারাদেশ ঘুরে বিস্মৃতপ্রায় মুক্তিযোদ্ধাদের তিনি তুলে ধরেছেন।
মুক্তিযুদ্ধের প্রতি বাচ্চু ভাইয়ের গভীর প্রেম। মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপারে তিনি নিরাপস। অসাম্প্রদায়িক চেতনায় তিনি উজ্জ্বল। সুন্দর। সমৃদ্ধিশালী বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেন। বাচ্চু ভাই একজন পূর্ণ সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। পুরো জীবনটা উৎসর্গ করেছেন সংস্কৃতি চর্চায়। এখনও ষাটোর্ধ্ব অশক্ত শরীরে বাচ্চু ভাই ছুটে বেড়ান দেশ দেশান্তরে। প্রতি মাসেই ঢাকার বাইরে যান তিন চার বার।
সংস্কৃতি বিষয়ক কোনো কার্যক্রমকে তিনি উপেক্ষা করতে পারেন না।
শরীর ভালো না থাকলেও সভা সমিতিতে নিয়মিত উপস্থিত হন। বিশিষ্টজনদের কেউ মৃত্যুবরণ করলে তার মরদেহ শহীদ মিনারে এনে সম্মান জানানোর রেওয়াজও বাচ্চু ভাইরা সূচনা করেছেন।
বাংলাদেশের নাট্যচর্চার ইতিহাসেও বাচ্চু ভাই এক স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব। কল্যাণ মিত্র ঘরানার কাহিনী প্রধান নাটকের যুগ থেকে সেলিম আল দীন আধুনিক রীতির বিমূর্ত ধারার নাটক রচনা শুরু করেন। সেই সব অতি আধুনিক নাটকগুলো মঞ্চে নির্দেশনা দেন গুরু নাসিরউদ্দিন ইউসুফ। সেলিম আল দীনের নাট্যরীতি ও মঞ্চ প্রয়োগ নিয়ে বাচ্চু ভাই নিরন্তর গবেষণা করেছেন। তাদের দুইজনের মণিকাঞ্চন যোগেই আধুনিক বাংলা নাটক শীর্ষে আরোহণ করে। নাট্য নির্দেশনা নিয়ে বাচ্চু ভাইয়ের অবদানের এখনও কোনো মূল্যায়ন হয়নি। আমাদের জন্য এটা খুব লজ্জাজনক ব্যাপার! বাচ্চু ভাই পাদপ্রদীপের আড়ালে কাজ করতে ভালোবাসেন। আত্মপ্রচারের আলোয় নিজেকে মেলে ধরেন না। নিভৃতে কাজটাই তার কাছে বড়। কাজ করে গেছেন একাগ্র চিত্তে।
বাচ্চু ভাইয়ের বাংলা গদ্যভঙ্গ অসাধারণ। তৎসম শব্দবহুল কবিতা আক্রান্ত গদ্যের তিনি মাস্টার। যখন বাচ্চু ভাই শংসাবচন লিখেন কারো সম্পর্কে তখন আমরা বিস্মিত হই। সামান্য কয়েকটা কবিতার মতো বাক্যবন্ধে সেই ব্যক্তিত্বের পুরো ছবিটাই এঁকে ফেলেন। বাচ্চু ভাই কখনো নাটক লিখেননি। আমার ধারণা, যদি লিখতেন সেরা নাটক লিখতেন। বাচ্চু ভাই যদি কবিতা লিখতেন তবে সেরা কবি হতেন। বাচ্চু ভাই যদি নিয়মিত বক্তৃতা দিতেন তবে সেরা বক্তা হতেন। বাচ্চু ভাই যদি অভিনয় করতেন তবে আমার ধারণা তিনি সেরা অভিনেতা হতেন। এক আশ্চর্য প্রতিভাবান ব্যক্তি তিনি।
বাচ্চু ভাইয়ের সহধর্মিণী মঞ্চকুসুম শিমুল ইউসুফ। যেমন মধুক্ষরা কণ্ঠস্বর তার, যেমন অভিনয় প্রতিভা তার- শিমুল ইউসুফও এক অবিশ্বাস্য ব্যক্তিত্ব। আশ্চর্য প্রতিভা। তাদের একমাত্র কন্যা এশা ইউসুফ। চলচ্চিত্র উৎসাহী নির্দেশক। বাচ্চু ভাইয়ের চলচ্চিত্রের প্রধান সহকারী। বাচ্চু ভাইয়ের প্রধান বন্ধু এশা ইউসুফ। অসম্ভব ভালো বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক পিতা-কন্যার।
বাচ্চু ভাইয়ের অনেক গুণাবলি। টেলিভিশনের গৌরবময় যুগে ছিলেন টেলিভিশনের খ্যাতিমান প্রযোজক। ভাঙনের শব্দ শুনি’র মতো নাটক প্রযোজনা করেছেন।
বিপুল কর্মময় জীবন। বাচ্চু ভাইয়ের কর্মময় জীবনের দিকে তাকালে বিস্মিত হতে হয়। তোমার কীর্তির চেয়ে তুমি যে মহৎ এ কথাটাই বলার ইচ্ছা হয় বাচ্চু ভাইকে।

সাপ?তাহিক পতিবেদন

 মতামত সমূহ
পিছনে 
 আপনার মতামত লিখুন
English বাংলা
নাম:
ই-মেইল:
মন্তব্য :

Please enter the text shown in the image.