'শিক্ষা নিয়ে সরকারের সুস্থ চিন্তা আর নেই'-অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

Print Friendly and PDF

অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ। লেখক, গবেষক, ঔপন্যাসিক। অধ্যাপনা করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে।
শিক্ষক আন্দোলন, প্রশ্নপত্র ফাঁস, কোচিং বাণিজ্য, দুর্নীতিসহ শিক্ষা খাতের নানা বিষয় নিয়ে সম্প্রতি মুখোমুখি হন সাপ্তাহিক-এর। শিক্ষা নিয়ে রাষ্ট্রের পশ্চাৎপদ চিন্তাই জাতিকে পেছনে ঠেলছে বলে মত দেন।
শিক্ষা ব্যবস্থার চলমান সংকটে উদ্বেগ জানিয়ে বলেন, শিক্ষার উন্নয়ন ঘটাতে হলে অবশ্যই বরাদ্দ বাড়াতে হবে। সংবিধানের আলোকে এবং শিক্ষানীতির সঠিক বাস্তবায়ন করতে না পারলে অন্ধকার আরও ঘনীভূত হবে বলে উল্লেখ করেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সায়েম সাবু

সাপ্তাহিক : বেতন বৈষম্য কমিয়ে আনতে শিক্ষকরা আন্দোলন করছেন। স্বাধীনতার অর্ধশত বছরেও এমন আন্দোলন! শিক্ষা নিয়ে আমাদের কোথায় যাওয়ার কথা ছিল, যেতে পারলাম কোথায়?
অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : আমাদের কোথায় যাওয়ার কথা ছিল, তার অনেক দিকনির্দেশনা তৈরি ছিল। সংবিধানে যে ধরনের শিক্ষার কথা বলা আছে, তা অত্যন্ত অগ্রসরমূলক চিন্তা বলে মনে করি।
সংবিধানে একমুখী এবং সার্বজনীন শিক্ষা ব্যবস্থার কথা আছে। সবার জন্য শিক্ষা অধিকার থাকবে, তা সংবিধান নিশ্চিত করেছে। ১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত কুদরাত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশনের প্রতিবেদনও একটি অগ্রগামী চিন্তা ছিল। কিন্তু সরকার পরিবর্তন হওয়ার পর সে প্রতিবেদনও বাতিল করল। ওই সময়ের সরকার নিজেদের চিন্তার প্রতিফলন ঘটিয়ে শিক্ষার বিষয়টি নিষ্পত্তি করতে থাকল।
ওই সময়েই সংবিধানের মৌলিক আদর্শগুলো বাধাগ্রস্ত হতে থাকল এবং একমুখী শিক্ষার পরিবর্তে চারমুখী শিক্ষার প্রবর্তন শুরু হলো।
আশির দশকে এ ধারা তীব্র হলো। এই সময়ে প্রতিষ্ঠা পেল ধনীর সন্তানরা ইংরেজি মাধ্যমে পড়বে। মধ্যম আয়ের পরিবারের সন্তানরা পড়বে সাধারণ শিক্ষায়। আর হতদরিদ্র পরিবারের সন্তানরা পড়বে মাদ্রাসায়। শিক্ষায় এই শ্রেণিগত বিভাজন সর্বনাশ ডেকে আনলো। অভিন্ন শিক্ষা ব্যবস্থা না থাকার কারণেই সমাজে বৈষম্য বাড়ছে এবং শিক্ষার মান কমছে।
সাপ্তাহিক : তার মানে শিক্ষার সংকটের জন্য রাষ্ট্রই প্রধানত দায়ী?
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : রাষ্ট্র ক্রমাগতভাবে শিক্ষা খাতের বৈষম্যধারাকে পুষ্ট করেছে। শিক্ষার বৈষম্যকে প্রতিপালন করছে রাষ্ট্রে-ই।
ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীরা হয়তো ইংরেজি ভালো জানছে। কিন্তু বাংলাসহ অন্যান্য বিষয়ে খুবই দুর্বল। আমি দেখেছি, ইংরেজি মাধ্যমে যে ইতিহাস পড়ানো হয়, তা ভারতীয় ইতিহাস। সেখানে বাংলাদেশের কোনো স্থান নেই। বাংলাদেশ সৃষ্টির ইতিহাস যদি শিক্ষার্থীদের না পড়ানো হয়, তাহলে সে শিক্ষার্থীরা কীভাবে দেশপ্রেম শিখবে।
আবার বাংলা মাধ্যমও যে খুব ভালো হচ্ছে তা নয়। আমাদের সময় বাংলা এবং ইংরেজি দুটোই চমৎকারভাবে পড়ানো হতো। এখন বাংলা, ইংরেজি কোনোটিই ভালো না। মাদ্রাসায় আরবি ভালোভাবে শিখানো হয়। কিন্তু বাংলা, ইংরেজি ভালো শেখানো হয় না। আবার গণিতেও কাঁচা।
চার ধাপের যে শিক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে, তার মধ্যে ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীরাই বেশি সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে। বাংলাদেশে থেকে দেশের সেবা করার মনোবৃত্তি কিন্তু তাদের মধ্যে কম। ইংরেজি মাধ্যমে থেকে বের হয়ে বিদেশে চলে যাওয়ার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত হয়। পাবলিক এবং প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে বৈষম্য আছে। পলিটেকনিক এবং ডিপ্লোমা শিক্ষার্থীদের প্রতি অবজ্ঞা আছে। সবখানেই বিভাজন।
সাপ্তাহিক : এর জন্য শিক্ষানীতিকে কতটুকু দায়ী করবেন?
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : ২০১০ সালের শিক্ষানীতি অনেকটাই কুদরাদ-ই-খুদার শিক্ষার আলোকে হয়েছে বলে মনে করি। মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়নের কথা বলা আছে। গোটা শিক্ষা ব্যবস্থাকে এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে একটি ভালো শিক্ষানীতি বলেই আমি মনে করি।
কিন্তু প্রয়োগ তো দেখছি না। শিক্ষার প্রসার ঘটেছে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। নারী শিক্ষায় বড় অগ্রগতি হয়েছে এবং এটি আমাদের জন্য বিশাল অর্জন বলে মনে করি।
সমস্যা হচ্ছে, আমরা শিক্ষার মানের দিকে নজর দিইনি। আমরা শিক্ষার সৃজনশীলতাকে নির্বাসনে পাঠিয়েছি। মুখস্থনির্ভর সনদমুখী শিক্ষা ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হয়েছি। কোচিং বাণিজ্য মূলধারার শিক্ষার সমান্তরালে যাচ্ছে। শ্রেণি কক্ষকে পাশ কাটিয়ে কোচিংমুখী হচ্ছে শিক্ষা। বাণিজ্যিক ধারার শিক্ষাব্যবস্থা তৈরি হলে তখন নির্ভর করতে হয় পরীক্ষার ওপর। পরীক্ষা যদি পাবলিক হয় তাহলে পাসের জন্য আরও তাড়া থাকে।
২০১০ সালের শিক্ষানীতি তৈরি করলো সরকার, অথচ ওই শিক্ষানীতিকে পাশ কাটিয়েই পঞ্চম এবং অষ্টম শ্রেণির দুটি পাবলিক পরীক্ষা চালু করল। এতে করে কোচিং বাণিজ্য এখন গ্রাম পর্যায়ে চলে গেছে এবং প্রথম শ্রেণি, দ্বিতীয় শ্রেণির পরীক্ষার প্রশ্নপত্রও ফাঁস হয়ে যাচ্ছে।
শিক্ষা ব্যবস্থায় চরম দুর্নীতি ঢুকেছে, অনৈতিকতার ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। শিক্ষকরা আনন্দনির্ভর পাঠদানের চেয়ে মুখস্থনির্ভর শিক্ষা দান করছেন। এ কারণে সৃজনশীলতায় বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে।
শিক্ষার্থীরা আর নিজস্ব চিন্তার বিকাশ ঘটাতে পারছেন না। ক্রমাগতভাবে গণিতে খারাপ করা মানেই শিক্ষার্থীদের বুদ্ধির লোপ পাওয়া। অন্য বিষয় মুখস্থ করা গেলেও গণিত সেভাবে মুখস্থ করা যায় না।
বিশ্ব দরবারে চ্যালেঞ্জ দেয়ার মতো শিক্ষা হচ্ছে না, আঞ্চলিক চ্যালেঞ্জও নিতে পারছেন না। এমনকি দেশের বাজারেও চ্যালেঞ্জ নিতে পারছেন না। দেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির হার ৭ শতাংশের ঘরে। অথচ করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর সুপার ম্যানেজার দেশের বাইরে থেকে আসা। ভারত, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া বা শ্রীলঙ্কা থেকে আসা মেধাবীরা এসব জায়গায় দায়িত্ব পালন করছেন। ৫ লাখ ভারতীয় বৈধভাবে বাংলাদেশে কাজ করছেন।
যারা আসছেন তারা ব্যবস্থাপনায় দক্ষ, যোগাযোগে দক্ষ, আত্মবিশ্বাসী, যা আমাদের শিক্ষার্থীদের মাঝে কমে আসছে। শিক্ষার চলমান সংকটগুলোই এই নেতিবাচক পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
বিশ বছর আগেও প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে আমাদের কোনো মাথাব্যথা ছিল না। তখন কোচিং বাণিজ্য গ্রামে যায়নি। তখন শিক্ষার্থীদের মাঝে সৃজনশীলতা ছিল।
সাপ্তাহিক : মেধার নিম্নগামিতা তো উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও?
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার ইংরেজি বিভাগে যারা ভর্তি হয়, আমি প্রায় পনেরো বছর থেকে তাদের একটি পরীক্ষা নেই এবং সেটা শুরুতেই। দশটি বাংলা বাক্য এবং দশটি ইংরেজি বাক্য লিখতে দিই। গভীরভাবে লক্ষ্য করছি, এই পরীক্ষায় দিনে দিনে খারাপ করছে শিক্ষার্থীরা। কোনো কালেই দশটি বাক্য কেউ শুদ্ধ লিখতে পারেনি। আগে হয়তো ছয় কি সাতটি ইংরেজি বাক্য শুদ্ধ লিখত। এখন দুটি কি তিনটি বাক্যও শুদ্ধ লিখতে পারে না। বাংলা আগে হয়তো কারও কারও আটটি কি সাতটি বাক্য শুদ্ধ হতো। এখন তিনটি, চারটিও শুদ্ধ হয় না। তার মানে মাতৃভাষাতেও অদক্ষ বা ভালোভাবে শিখতে পারছে না। অথচ তারা জিপিএ-৫ পেয়েছে, ভর্তি পরীক্ষায় অনেক নম্বর পেয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের শিক্ষকরাও একই কথা বলেন।
মেধার দিকে না তাকিয়ে রাষ্ট্র শিক্ষার্থীদের সনদ দেয়ার ব্যবস্থা করছে। সনদ মিলছে পঞ্চম শ্রেণিতেও। এই সনদ দিয়ে কী হবে! এর চেয়ে সৃজনশীলতায় কিছুটা জ্ঞান দিতে পারলে শিক্ষার্থীদের কাজে আসত।
সাপ্তাহিক : এই পরিস্থিতির মূলে কোন বিষয়কে গুরুত্ব দেবেন?  
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : শিক্ষা খাত নিয়ে গতানুগতিক চিন্তা থেকে আমরা বেরুতে পারিনি। শিক্ষকরা মোটামুটি হতদরিদ্র হবেন, এমন চিন্তা সমাজ এখন ধারণ করে।
প্রাইমারি স্কুলের একজন সহকারী শিক্ষক শহীদ মিনারে অনশন করতে আসেন। ভাবুন, তাদের চাকরি জীবনের অর্জন নিয়ে। অবসরে যাওয়ার আগেও তারা সহকারী শিক্ষক হিসেবেই থেকে যান। কোনো পদোন্নতির সুযোগ নেই। এটি কল্পনা করা যায়! সহকারী সচিব থেকে সচিব হওয়ার সুযোগ না থাকত তাহলে কি পরিস্থিতি দাঁড়াতো একবার কল্পনা করতে পারেন? অথবা ক্যাপ্টেন থেকে কেউ যদি আর উপরে উঠতে না পারতো, তাহলে সেটা সেনাবাহিনীর সদস্যরা মানতো?
যারা মানুষ গড়ার কারিগর, সারা জীবন তাদের একই জায়গায় দাঁড় করিয়ে রাখলেন। প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকরা যে বেতন পান, তার চেয়ে সরকারি অফিসের একজন ড্রাইভারের বেতন বেশি।
জীবনে কিছুটা স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য আজ শিক্ষকরা এমপিওভুক্তি চাইছেন, আমরণ অনশন করছেন। তারা বাঁচতে চায়, এটিই তাদের অপরাধ। রাষ্ট্র তাদের অনশনে ঠেলে দিয়েছে। এমপিওভুক্ত করতে ২ হাজার কোটি টাকা লাগবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অথচ সোনালী ব্যাংকের উধাও হয়ে যাওয়া ৪ হাজার কোটি টাকাকে অর্থমন্ত্রী টাকাই মনে করলেন না। ২ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে এমপিওভুক্ত করার জন্য ২২ বার শিক্ষকদের আশ্বাস দেয়া হলো।
শিক্ষকদের এমন একটি আন্দোলনই কি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার গলদ তুলে ধরে না? আমরা যে শিক্ষা ব্যবস্থাকে একেবারে অপাঙ্ক্তেয় করে রেখেছি, তার প্রমাণ মিলছে সম্প্রতি শিক্ষকদের আন্দোলন। ভালো শিক্ষক ছাড়া কোনোদিন ভালো শিক্ষার্থী তৈরি হবে না।
আমরা বারবার বলে আসছি, শিক্ষকদের নিয়ে আলাদা কমিশন গঠন করুন। যোগদানের সময় জুনিয়র সহকারী শিক্ষক পদ থাকতে পারে। এরপর সহকারী, সিনিয়র সহকারী, সহকারী প্রধান, প্রধান শিক্ষক পদে ধাপে ধাপে প্রমোশন হতে পারে। এভাবে কাজের স্বীকৃতি পেলে তৃপ্তি মিলবেই। অথচ যোগদানে, যা অবসরে যাওয়ার আগেও তা।
সাপ্তাহিক : শিক্ষা খাতের বরাদ্দ নিয়ে বলছিলেন?
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : আমরা বলে আসছি, শিক্ষায় বরাদ্দ বাড়ান। মোট বাজেটের ৬ শতাংশের ওপরে শিক্ষায় বরাদ্দ রাখুন। কিউবায় বাজেটের  ৯ শতাংশ রাখা হচ্ছে শিক্ষায়। ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া শ্রীলঙ্কা শিক্ষায় বরাদ্দ বেশি রাখছে। এমনকি নেপালও আমাদের থেকে বেশি বরাদ্দ রাখছে। অথচ শিক্ষা খাতের ২ শতাংশের ঘরে আমরা আটকা।
শিক্ষা খাতে যদি বরাদ্দ দুই বা তিনগুণ বাড়ানো যায়, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থীরাও গ্রামে গিয়ে স্কুলে পড়াবে।
সাপ্তাহিক : এর জন্য রাষ্ট্রীয় নীতিকাঠামো দরকার?
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : হ্যাঁ, এখন শিক্ষার সমস্যা নিয়ে মোটা দাগে কথা বললে প্রথমেই নীতিকাঠামো নিয়ে আলোচনা করতে হয়। শিক্ষা নিয়ে একটি নীতিকাঠামো আছে, কিন্তু এর কোনো প্রয়োগ নেই। কম্পাসহীন একটি জাহাজের মতো আমাদের শিক্ষা। কোনো দিকনির্দেশনা নেই। দিকনির্দেশনা থাকলে এভাবে আন্দোলন করতে হতো না শিক্ষকদের। দিকনির্দেশনা থাকলে শিক্ষকদের বেতনকাঠামো-পরীক্ষা পদ্ধতির সব কিছুরই একটি কাঠামো থাকতো এবং তার প্রয়োগ হতো।
দ্বিতীয়ত, শিক্ষার যে বরাদ্দ তা খুবই অপ্রতুল। এই বিনিয়োগ থেকে বড় কিছু পাওয়া যাবে না। তৃতীয়ত, অসংখ্য পাবলিক পরীক্ষা চালু করা হলো। কী কারণে এসব পরীক্ষা শুরু হলো তার কোনো মানে খুঁজে পাই না। রমরমা কোচিং বাণিজ্য করার স্বার্থেই পঞ্চম এবং অষ্টম শ্রেণির পরীক্ষা পাবলিক করা হলো।
সাপ্তাহিক : দুর্নীতির খাদে শিক্ষা। ঘুষ নিয়ে সম্প্রতি শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যও অবাক করেছে সবাইকে।  
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : শিক্ষা মন্ত্রণালয় দুর্নীতির আখড়া এটি এখন প্রমাণিত। রোজ খবরে বের হচ্ছে দুর্নীতির কথা। আমি টিআইবি’র ট্রাস্টি বোর্ডে আছি। দেখছি, শিক্ষা অধিদপ্তরে ১৭ ধরনের দুর্নীতি হয়। দুর্নীতি আছে বলেই শিক্ষা পরিষ্কার নয়। যে জাতির শিক্ষা পরিষ্কার নয়, সে জাতির কোনো কিছুই পরিষ্কার নয়।
রাষ্ট্র, সমাজ শিক্ষকদের এমন অবহেলার দৃষ্টিতে দেখছে, তাতে যেন শিক্ষকরা চোখে কাঁটা হয়ে গেছেন। যাদের হাত ধরে জাতি অগ্রসর হবে তাদেরই অপমান করা হচ্ছে।
কিছুদিন আগে বেতন কাঠামোর পরিবর্তন করতে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের অপমান করা হলো। সরকারি কর্মকর্তাদের খুশি রাখতে গিয়েই শিক্ষকদের প্রতি এই অবহেলা বলে আমি মনে করি। ওই কাঠামোতে আমার দুটি গ্রেট কমিয়ে দেয়া হলো।
তবে তাতে আমার কোনো দুঃখ নেই। আমাদের দিন কোনোমতে যাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা হচ্ছেন চতুর্থ ধাপের। প্রাথমিক শিক্ষকরা হচ্ছেন প্রথম ধাপের এবং সেখানেই বেশি পরিমাণে বিনিয়োগ করা দরকার। কিন্তু তা হচ্ছে না।
সার্বিকভাবে শিক্ষকদের প্রতি রাষ্ট্রের উদাসীনতা প্রমাণিত হচ্ছে। এটিই হচ্ছে আমাদের সবচেয়ে নেতিবাচক চিন্তা। শিক্ষকদের যদি সঠিক মূল্যায়ন না করা হয়, তাহলে জাতি অগ্রগামী হতে পারে না।
বছরে ৫০ হাজার কোটি টাকা কোচিং বাণিজ্য হচ্ছে। এর সঙ্গে শিক্ষকরাও জড়িয়ে পড়ছেন বাধ্য হয়ে। দুর্নীতি বাড়ছে এ খাতে। ফাঁস হওয়া প্রশ্নে শিক্ষার্থীরা পাস করছে। এতে করে ওই শিক্ষার্থীর যাত্রা শুরুই হচ্ছে দুর্নীতির মধ্য দিয়ে।
সাপ্তাহিক : এরপরেও তো এগিয়ে যাচ্ছে?
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : প্রদর্শনীর মাধ্যমে শিক্ষার মূল্যায়ন করা হচ্ছে। পাসের হার বাড়ানো হচ্ছে। হাজার হাজার শিক্ষার্থী জিপিএ ৫ পাচ্ছে। কিন্তু মানের দিকে নজর নেই। শিক্ষা নিয়ে সরকারের সুস্থ চিন্তা আর নেই। কোনো গঠনমূলক চিন্তা নেই। কোনো একটি বিষয়ে দাবি উঠলে তা পাশ কাটিয়ে যাওয়ার জন্য জোড়াতালির ব্যবস্থা নেয়া হয়।
গ্রামে একজন শিক্ষককে ‘ও মাস্টার’ বলে ডাকা হয়। অনেকটাই অবজ্ঞার সুরে। শিক্ষকদের প্রতি এই অবজ্ঞা তৈরি হচ্ছে সরকারগুলোর পরম্পরায়। এখানে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াত, জাতীয় পার্টি সবই এক। মূলত আশির দশক থেকেই শিক্ষকদের প্রতি অবহেলা চরম হতে থাকে। এর আগে শিক্ষকদের অবস্থা এত খারাপ ছিল না।
আমি প্রধানমন্ত্রীকে সাধুবাদ জানাই যে, তিনি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে তৃতীয় শ্রেণি থেকে দ্বিতীয় শ্রেণি দিয়েছেন। এরপরেও প্রশ্ন থেকে যায়। আমি যদি প্রধান শিক্ষককে প্রথম শ্রেণির মর্যাদা দিতে দ্বিধাবোধ করি, তাহলে শিক্ষার কি মর্যাদা দেব? উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কক্ষের বাইরে বারান্দায় শিক্ষকরা বসে থাকেন আর ভেতরে রাজনীতিক ব্যক্তিদের নিয়ে শিক্ষা কর্মকর্তা মিটিং করেন।
শিক্ষার হার বাড়ছে, নারী শিক্ষার উন্নয়ন ঘটছে, কারিগরি শিক্ষার পরিধি বাড়ল, বছরের শুরুতে নতুন বই দেয়া হচ্ছে। এগুলো অবশ্যই আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য একটি ইতিবাচক দিক বলে মনে করি। কিন্তু নেতিবাচক কর্মকা-ের কারণে ইতিবাচক উন্নয়নগুলো চাপা পড়ে যাচ্ছে।
সাপ্তাহিক : তাহলে আমরা যাচ্ছি কোথায়? শিক্ষা ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ কী?
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : এভাবে চললে আমরা নিজস্ব গতিতে বেশি দূরে যেতে পারব না। ভারত থেকে সুপার ম্যানেজাররা এসে আমাদের প্রতিষ্ঠান চালাচ্ছেন। আবার আমাদের দেশের রোগীরা ভারতে যাচ্ছেন সেবা নিতে। তার মানে আমাদের ডাক্তারদের প্রতি ভরসা কমে যাচ্ছে দিনে দিনে।
প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে টিকে থাকার জন্য আমাদের যে দক্ষতা দরকার তা কমে যাচ্ছে। ভাষাগত জ্ঞান আমাদের দুর্বল হয়ে পড়ছে। এমনকি মাতৃভাষাও এখন ভালো করে শিখতে পারছে না, বলতে পারছে  না। ভাষা প্রয়োগে ছন্নছাড়া ভাব। এমন একটি বিক্ষিপ্ত ভাষাজ্ঞান দিয়ে আমরা কতদূর যাবো?
প্রযুক্তিতে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু এগিয়ে দিচ্ছেন কারা? ভারতীয়রা আমাদের প্রযুক্তিতে জ্ঞান দিচ্ছে। ভাষার অদক্ষতার কারণে আমরা প্রযুক্তিতে নিজেদের যোগ্যতা তুলে ধরতে পারছি না।
বাজার নির্ভর বিশ্ব, বিশ্ব অর্থনীতি। কিন্তু সে বাজারে আমাদের অবস্থান নাজুক। আমাদের বাজার দখল করছে ভারত, শ্রীলঙ্কার মতো দেশগুলো। শিক্ষায় চরম অব্যবস্থাপনার কারণেই এমন হচ্ছে।
নৈতিক শিক্ষা, নান্দনিক শিক্ষা, সামাজিক শিক্ষা, সাংস্কৃতিক শিক্ষা থেকেও আমরা অনেক দূরে অবস্থান করছি। বয়স্কদের সম্মান করা, দুস্থদের অবহেলা না করার নৈতিক শিক্ষা। কিন্তু এখন আর সম্মান মেলে না। মাদ্রাসায় নৈতিক শিক্ষা শেখানো হয়। অথচ মাদ্রাসা থেকে বেরিয়েও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে।
সাংস্কৃতিক শিক্ষার অনুপস্থিত থাকার কারণে শিক্ষার্থীরা নেশাগ্রস্ত হচ্ছে, চরমপন্থায় অবলম্বন করছে। বিশ্ব যোগাযোগ ব্যবস্থায় প্রবেশ করে আমরা সমস্যা তৈরি করেছি। কিন্তু সম্ভাবনা দেখতে পাইনি। এ কারণে ফেসবুক, ইন্টারনেটের অপব্যবহার হয়।
সাপ্তাহিক : এই পরিস্থিতির মাঝেও মেধার সঞ্চার হচ্ছে। এটি তো আশা জাগায়?
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : আমি এখনও মনে করি, দেশে অনেক মেধাবী আছে। কিন্তু এই মেধাবীদের ভবিষ্যৎ যে খুব উজ্জ্বল তা বলা যাবে না।
শিক্ষার উন্নয়নের জন্য রাষ্ট্রের যে সংকল্প থাকা দরকার, তা নেই। শিক্ষানীতির বাস্তবায়ন অথবা সংবিধানে যে তাগিদ দেয়া আছে, তা নিয়েও রাষ্ট্রের উদাসীনতা আছে। নইলে প্রতিরক্ষা বা অন্যান্য খাত থেকে বাজেটে কমিয়ে এনে শিক্ষায় গুরুত্ব দেয়া উচিত ছিল।
সাপ্তাহিক : এক্ষেত্রে আপনার কী পরামর্শ?
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : প্রথম শ্রেণি থেকে সৃজনশীল শিক্ষার প্রবর্তন করতে হবে। অনাবশ্যক পাবলিক পরীক্ষাগুলো বাতিল করতে হবে। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত সকল পরীক্ষা বাতিল করা দরকার। শ্রেণিভিত্তিক মূল্যায়ন করা যেতে পারে। সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে সরকারি করা সময়ের দাবি। বেসরকারি শিক্ষা হতে পারে, তবে সেটা সরকারের দেয়া কাঠামোর ভিত্তিতে।
একমুখী শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। মাদ্রাসা শিক্ষা থাকলেও তার উন্নয়ন ঘটাতে হবে। পশ্চিমবঙ্গে অনেক মাদ্রাসা আছে। সেখানকার ছাত্ররা ভারতের আইসিটিতেও পরীক্ষা দিয়ে ভালো রেজাল্ট করছেন। পশ্চাৎপদ কোনো চিন্তা থাকবে না। মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের বড় অবহেলা করি। অথচ তারাও আমাদের সম্পদ। বড় কষ্ট হয় মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের দুরবস্থা দেখে।
শিক্ষকতা পেশায় মেধাবীদের আনতে হবে এবং সেটিই হচ্ছে এখন একমাত্র উপায় পরবর্তী ধাপে উত্তরণের জন্য। বাজেট বাড়লে, শিক্ষকতায় মেধাবীরা আসলে আমরা শিক্ষা অর্জনে ভারতকেও পেছনে ফেলতে পারব।
সাপ্তাহিক : হতাশার কথা শোনালেও শিক্ষা আশাবাদী?
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : আমাদের দেশে ইংরেজি মাধ্যমে যারা পড়াচ্ছেন, তারা কিন্তু এ দেশেরই। তারা বাইরের শিক্ষার সঙ্গে চ্যালেঞ্জ করছেন। বেতন বেশি পাচ্ছেন বলে আনন্দের সঙ্গে পড়াচ্ছেন। বেতন বাড়িয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী যদি গ্রামের স্কুলে নিয়োগ দেয়া যায়, তাহলে ওই গ্রামের অনেক আলোকিত শিক্ষার্থী বের হবে। রাষ্ট্রীয় সংকল্প থাকলেই সব সম্ভব।
সমাজ তো শিক্ষা নিয়ে আগ্রহী। বিনিয়োগও করতে চায়। রাষ্ট্রের ওপরেই কিন্তু অভিভাবকরা শুধু নির্ভরশীল নয়। শুধু সমন্বয় এবং সদিচ্ছার দরকার।
ডিজিটালাইজেশন করে শিক্ষার্থী এবং শিক্ষকদের সেবা দিতে হবে। ভারত পারলে, শ্রীলঙ্কা পারলে আমরা পারব না কেন? নারীদের শিক্ষকতা পেশায় আরও উৎসাহিত করতে হবে, সুযোগ দিতে হবে। নারীরা শিক্ষার্থীদের সন্তানতুল্য মনে করছেন।
আর সবার আগে শিক্ষাকে পণ্য ভাবা বন্ধ করতে হবে এবং শিক্ষা নিয়ে বাণিজ্যিক যে চিন্তা তা দ্রুত ত্যাগ করতে হবে। এটি করতে পারলেই আমাদের মুক্তি বলে মনে করি।   

সাপ?তাহিক পতিবেদন

 মতামত সমূহ
পিছনে 
 আপনার মতামত লিখুন
English বাংলা
নাম:
ই-মেইল:
মন্তব্য :

Please enter the text shown in the image.