কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় : নকল ধরাও অপরাধ -আনিস রায়হান

Print Friendly and PDF

নকল ধরার দায়ে শাস্তি ভোগ করছেন অধ্যাপক
সকল ক্লাস-পরীক্ষা থেকে অব্যাহতি, বেতনও কমেছে
নেপথ্যে জড়িত ভিসি, ডিন, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকসহ ৯ শিক্ষক
নকলের পক্ষে ভিসিসহ শিক্ষকদের ওকালতির অডিও
নকলবাজ শিক্ষার্থীদের পাস করিয়ে দিয়ে ফলপ্রকাশ

নকল এক ভয়াবহ ব্যাধি। এর ফলে সমাজ ভরে ওঠে হাতুড়ে শিক্ষিত লোকে। এরা জানার ভান করে এবং সৃষ্টি করে বিপত্তি, বিপর্যয়। আগে স্কুল-কলেজ পর্যায়ে নকল বেশি হতো। কিন্তু প্রশ্নফাঁসের বদৌলতে এখন আর তার প্রয়োজন পড়ছে না। তাই ইদানীং উচ্চশিক্ষা ঘিরে নকলের কথা বেশি শোনা যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে স্বনামধন্য বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের থিসিসে নকলের কথা প্রায়ই খবরে আসছে। এই নকলবাজরা আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকও হচ্ছে। এই যখন হাল, এর মধ্যে একজন শিক্ষক নকলের বিরুদ্ধে দাঁড়ালে তাকে কী পরিস্থিতিতে পড়তে হতে পারে?
ময়মনসিংহে অবস্থিত বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) একজন অধ্যাপক শিক্ষার্থীদের থিসিসে নকল ধরায় বিপদে পড়েছেন। পুরো বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নকলবাজ শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছে। নকলের সুস্পষ্ট প্রমাণাদি থাকলেও কোনো নকল হয়নি, এমনটা দাবি করে ওই শিক্ষার্থীদের পাস করিয়ে দিতে চাপ দেয়া হয় শিক্ষককে। অস্বীকার করলে তাকে বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়। তার অব্যাহতির সুযোগে নকলবাজ শিক্ষার্থীদের পাসের ফলও প্রকাশ করেছে বিভাগ। হুমকি-ধমকি, অপমান, গালিগালাজ, মারধর করতে উদ্ধত হওয়া, লোকজন নিয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন- কয়েকজন শিক্ষকের নেতৃত্বেই এসব ঘটেছে।
হতভাগ্য শিক্ষকের নাম ড. মো. আনোয়ার হোসেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্ম স্ট্রাকচার অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক তিনি। ১৭ নভেম্বর ২০১৫ তে দায়িত্ব পান বিভাগীয় প্রধানের। মাত্র সাড়ে চার মাসের মাথায় তাকে অব্যাহতি দেয় প্রশাসন। তখন তিনি দুটি ক্লাস নিতেন। কিছুদিনের ভেতর বিভাগ থেকে চিঠি পান যে, তার ক্লাস অন্যকে দিয়ে দেয়া হয়েছে। এরপর একের পর এক সেমিস্টার গেছে, কিন্তু তাকে আর কোনো ক্লাস দেয়া হয়নি। সর্বশেষ ২০১৭ সালের স্নাতক প্রথম বর্ষের ভর্তি পরীক্ষায় হলপ্রধানের পদ থেকেও তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। আর এসবের শুরু পাঁচ শিক্ষার্থীর মাস্টার্সের গবেষণা প্রবন্ধে তথ্য চুরি ধরার পর থেকে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ফার্ম স্ট্রাকচার অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের পাঁচ শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে অন্যের ডাটা ও তথ্য চুরি করে মাস্টার্সের গবেষণা প্রবন্ধ সম্পন্ন করার বিষয়টি ধরে ফেলেন থিসিস পরীক্ষা কমিটির প্রধান ও বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. আনোয়ার। থিসিস মূল্যায়ন করতে গিয়ে তিনি দেখতে পান, দেশের বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদন ও আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রবন্ধ থেকে হুবহু ডাটা ও তথ্য চুরি করেছেন ২০০৯-১০ শিক্ষাবর্ষের ওই পাঁচ শিক্ষার্থী। এর মধ্যে রাজিয়া সুলতানা তার থিসিসের ১২টি স্থানে, মাহমুদুল হাসান ১৬টি, নাজমিন আরা ২৪টি, আলমগীর হোসেন ১৭টি ও সৌরভ ইসলাম ১৯টি স্থানে অন্যের ডাটা ও তথ্য হুবহু যুক্ত করে জমা দেন বিভাগে।
যেমন রাজিয়া সুলতানার থিসিসটির দিকে নজর দেয়া যায়। এর ভেতরের তথ্যের সঙ্গে শিরোনামের কোনো মিল নেই। কারণ শিরোনামটি নকল করা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস দওয়েল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত ‘অলটারনেটিভস টু সলভেন্ট বেজড পেইন্টস : সাবস্টিটিউশন কেস স্টাডি’ টেকনিকাল রিপোর্ট নং ৪ (১৯৯৩) থেকে। এর রেজাল্ট অ্যান্ড ডিসকাশন অংশ নকল করা হয়েছে ইএসডিগ এবং আইপেন থেকে প্রকাশিত ‘ন্যাশনাল রিপোর্ট অন লিড ইন এনামেল হাউসহোল্ড পেইন্টস ইন বাংলাদেশ-২০১৫’ শীর্ষক প্রতিবেদন থেকে। মেথডোলজিতে যা করার কথা বলা হয়েছে, রেজাল্ট অ্যান্ড ডিসকাশন অংশে তার কিছুই নেই। সূচিতে উল্লেখ আছে প্রশ্নোত্তরভিত্তিক সাক্ষাৎকারের কথা। কিন্তু থিসিসের গর্ভে তার কিছুই নেই।
গবেষণাকে কত নিচে নামানো যায়, থিসিসটি তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। থিসিসের হার্ট বলে পরিচিত রেজাল্ট অ্যান্ড ডিসকাশন অংশটি দেখলে বাকরুদ্ধ না হয়ে পারা যায় না। সর্বমোট ৫৩ পাতার এই থিসিসে রেজাল্ট অ্যান্ড ডিসকাশন অংশে আছে ৫ পাতা। এই ৫ পাতার মধ্যে সাড়ে তিন পাতা অর্ধেক করে ছবি ও টেবিল দিয়ে ভরা। এর পুরোটাই আবার পূর্বোল্লিখিত আইপেন ও ইএসডিওর প্রতিবেদন থেকে নকল করা। বাকি দেড় পাতায় রেজাল্ট অ্যান্ড ডিসকাশন আছে। এর মধ্যে লেখা মাত্র ২৯টি লাইন, যাতে শব্দ আছে ২৬৫টি। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এই শিক্ষার্থীকে শুধু পাসই করায়নি, অন্য পরীক্ষার্থীদের চেয়ে তাকে মার্কস বেশি দেয়া হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের থিসিসে ডাটা চুরির বিষয়ে ইতিপূর্বে একটি অনলাইন মাধ্যমকে বিভাগের অধ্যাপক আলী আশরাফ বলেন, ‘আমাদের চোখে ডাটা চুরির কোনও কিছু ধরা পড়েনি। তবে থিসিসের মান খুবই খারাপ ছিল। এটা ঠিক। এর মধ্যে রাজিয়া সুলতানার থিসিসের মান ছিল সবচেয়ে খারাপ।’ অথচ ৪ এপ্রিল ফল প্রকাশের পর দেখা গেছে, থিসিস নকল করা শিক্ষার্থীদের মধ্যে রাজিয়া সুলতানাকে দেওয়া হয়েছে সবচেয়ে বেশি নম্বর! তিনি সিজিপিএ-৩.৬০ পেয়েছেন। এছাড়া, মাহমুদুল হাসানকে ৩.২০, নাজমিন আরাকে ৩.৪৪ ও আলমগীর হোসেনকে দেওয়া হয় ৩.২৫। অন্য শিক্ষার্থী সৌরভ ইসলামের ফল জানানো হয়নি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে তার আর্থিক দেনা-পাওনা বাকি আছে বলে।
৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ এসব থিসিসের ওপর পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। প্রধান পরীক্ষক তাতে নম্বর বসিয়ে বিভাগে পাঠানোর পর সেগুলো নিরীক্ষা করেন অধ্যাপক আনোয়ারসহ বিভাগের গবেষণা প্রবন্ধের ডিফেন্স কমিটির বাকি তিন শিক্ষক। তিন পরীক্ষক অধ্যাপক আলী আশরাফ, অধ্যাপক নুরুল হক ও অধ্যাপক সিদ্দিকুর রহমান প্রবন্ধগুলো নিরীক্ষণ করে নম্বর বসালেও কমিটির প্রধান আনোয়ার হোসেন তাতে রাজি হন না। ওই পাঁচ শিক্ষার্থীর প্রবন্ধে কোনো নম্বর না দিয়ে তাদের অকৃতকার্য দেখিয়ে ফল প্রস্তুত করেন অধ্যাপক আনোয়ার। নিয়ম অনুযায়ী নম্বরপত্রে স্বাক্ষর করার কথা ছিল বাকি তিন শিক্ষকের। কিন্তু ওই শিক্ষার্থীদের পাস করিয়ে দিতে অধ্যাপক আনোয়ারকে চাপ দেন তারা তিনজন।
অধ্যাপক আনোয়ারকে সহজে মানাতে না পেরে শেষ পর্যন্ত এই শিক্ষকরা হীন-কুরুচিপূর্ণ পথে তাকে মোকাবিলার চেষ্টা চালান। অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমি রাজি না হওয়ায় এই শিক্ষকরা আমাকে গালিগালাজ ও লাঞ্ছিত করেন। তারা যদিও সিনিয়র ও প্রবীণ শিক্ষক, কিন্তু দেখলাম তাদের চিন্তা-চেতনা খুবই নিচু। বিভাগে দেখা হলে তারা আমার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করতেন, এরপর হাসতে হাসতে বলতেন, তুমি এসবের কিচ্ছু প্রমাণ করতে পারবে না। আমরা সবাই মিলে সাক্ষ্য দেব যে, কেউ কিছু বলেনি, তখন তুমি কীভাবে প্রমাণ করবে? এরপর থেকে আমি এদের সম্মুখীন হতে হবে মনে করলে মোবাইলের রেকর্ডার চালু রাখতাম। তার আমাকে গালি দিয়েছে, জুতা হাতে তেড়ে এসেছে, চেয়ার ছুড়ে মেরেছে, কী করেনি! ডিন নিজে লোকজন নিয়ে রাস্তায় ঘেরাও করে আমাকে ভয়-ভীতি প্রদর্শন করেছে। তার বিরুদ্ধে আমি থানায় জিডি পর্যন্ত করেছি।’
কেন এত ক্ষোভ? এমন প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন জানান, ‘বিভাগের কিছু পুরনো প্র্যাকটিস নিয়ে আমি কথা তুলেছিলাম। যেমন জুনিয়র কোনো শিক্ষক বিভাগীয় প্রধান হলে তাকে সব কাজ নিজের করতে হয়। অথচ এরকম কাজগুলো সিনিয়ররা কখনই করেন না। এরকম আরও কিছু ব্যাপার ছিল। তাছাড়া শিক্ষার্থী রাজিয়া সুলতানার সুপারভাইজার শিক্ষক জায়েদা মঈন ও বাকি চার শিক্ষার্থীর কো-সুপারভাইজর ছিলেন থিসিস ডিফেন্স কমিটির বাকি শিক্ষকরা। গবেষণা প্রবন্ধে নকলের মতো একটি বড় অন্যায়কে প্রশ্রয় দিয়ে ফেলেছেন তারা। অপরাধ প্রমাণিত হলে ফেঁসে যাবেন, এই ভয়ে তারা যেভাবেই হোক ওই শিক্ষার্থীদের পাস করাতে চেয়েছেন। নকলবাজ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগসাজশও বাতিল করে দেয়া যায় না।’
মূল অভিযুক্ত শিক্ষক তৎকালীন ডিন অধ্যাপক আ. রশীদ। অনুসন্ধানে জানা যায়, ব্যক্তিগত বিরোধ থেকেই তিনি অধ্যাপক আনোয়ারের পেছনে লাগেন। সূত্র জানায়, অধ্যাপক আনোয়ারের সঙ্গে নিজের এক আত্মীয়ার বিয়ে দিতে চেয়েছিলন অধ্যাপক রশীদ। কিন্তু আনোয়ার তাতে রাজি না হলে তিনি ক্ষুব্ধ হন। পরবর্তীতে আনোয়ার যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ পেতে চেষ্টা করেন, অধ্যাপক রশীদ তখন তাকে যেন না নেয়া হয়, সেজন্য কলকাঠি নাড়েন। কিন্তু তিনি ঠেকাতে পারেন না। বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিয়ে পরে আনোয়ার চলে যান পিএইচডি করতে। এরপর যখন তিনি বিভাগের চেয়ারম্যান হন, ঠিক তখন প্রকৌশল অনুষদের ডিন হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন অধ্যাপক রশীদ। আনোয়ারের বিরুদ্ধে তার ক্ষোভ বাস্তবায়নের পথ খুঁজে পান এবং আনোয়ারের অব্যাহতির পর নিজেই বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এসব বিষয়ে অধ্যাপক আ. রশীদকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে বলেন, ‘আমি তো আর ওই বিভাগে নেই। তাছাড়া ফোনে আমি এ বিষয়ে কোনো কথা বলব না।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি পরিসংখ্যান বিভাগের প্রবীণ অধ্যাপক পরেশচন্দ্র মোদক বলেন, ‘অধ্যাপক আনোয়ারের প্রতি চূড়ান্ত অন্যায় হয়েছে। অধ্যাপক রশীদ লোকজন নিয়ে তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার চেষ্টাও করেছিল। উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিভাবক হলেও অধ্যাপক আনোয়ারকে তিনি নিরাপত্তা দেননি। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণায় নকল অনেক ঘটছে। এটা এমনকি একাডেমিক কাউন্সিলেও আলোচনা হয়েছে। এরকম একটা অবস্থায় অধ্যাপক আনোয়ার নকল ধরে ফেলল। সে আমার ছাত্র, নিজের কাজে খুবই মনোযোগী। তখন তাকে বাহবা দেয়ার কথা ছিল। তা না করে উল্টো বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ অনেকেই তার বিরুদ্ধে চড়াও হয়েছিল। উপাচার্য আমার বন্ধু মানুষ। তিনি আমাকে অনুরোধ করেছেন আনোয়ারকে সমর্থন না করতে। আমি তাকে স্পষ্ট করে বলে দিয়েছি, আমি সত্যের পক্ষে দাঁড়িয়েছি। তোমরা যারা মিথ্যাচার করেছো, আনোয়ারের আইনজীবীকে হাত করে মামলা জিততে চেয়েছো, একদিন তোমাদের এসব কার্যকলাপ প্রকাশ্য হবে। এগুলোর জন্য জবাবদিহি করতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘যে অধ্যাপকরা আনোয়ারের বিরুদ্ধে নেমেছিল তারা সুপারভাইজর হিসেবে ওই থিসিসগুলোতে স্বাক্ষর করেছিল। নকল হয়েছে ধরা পড়লে তাদের অযোগ্যতা ও অবহেলা ধরা পড়ে যায়। সেটা চাপা দিতে তারা আরও নোংরা কাজকর্মে নামে। আনোয়ারকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছিল ৩ এপ্রিল। সে দায়িত্ব হস্তান্তরের আগেই ৪ এপ্রিল ডিন আ. রশীদ নকল থিসিসকারী শিক্ষার্থীদের পাসের ফল প্রকাশ করে। অধ্যাপক আনোয়ারকে বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়া আর এই ফল প্রকাশ, দুটোই অবৈধ হয়েছে। কোনো কারণ দর্শানো ছাড়াই আনোয়ারকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছিল। আর থিসিস মূল্যায়ন কমিটির একজন যেখানে নকলের অভিযোগ তুলেছেন, সেখানে তদন্ত ব্যতিরেকে ফল প্রকাশের কোনো সুযোগই নেই। আনোয়ারকে নিয়ে এখনও যা ঘটছে, এটা দেখিয়ে দেয় যে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা কত খারাপ সময় পার করছে।’
কোনো চাপেই যখন অধ্যাপক আনোয়ারকে বাগে আনা যাচ্ছিল না, তখন ফলপ্রকাশ আটকে যায়। ফলপ্রকাশে বিলম্ব হওয়ায় বিভাগের কাছে জবাব চান পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ড. রকিবুল ইসলাম খান। তখন ড. আনোয়ারসহ কমিটির চার শিক্ষক পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের অফিসে যান। সবার সামনে ফল উন্মুক্ত করার পর সেখানেও রাজিয়া সুলতানাসহ বাকি চার শিক্ষার্থীর থিসিস নকলের বিষয়টি উল্লেখ করেন অধ্যাপক আনোয়ার। সেখানেও ফল সংশোধন করে নতুন টেবুলেশন শিট তৈরি করে তাতে স্বাক্ষরের জন্য চার ঘণ্টা আটকে রেখে হেনস্তা করা হয় তাকে। ফল পরিবর্তনের জন্য পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ড. রকিবুল ইসলাম খানও চাপ দিয়েছেন বলে অভিযোগ করেন অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে ২৩ মার্চ ওই পাঁচ শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশসহ শিক্ষকদের অশালীন আচরণের ব্যাপারে অভিযোগ জানান অধ্যাপক আনোয়ার। কিন্তু বিষয়টি আমলে নেওয়া হয়নি। উল্টো এর ১০ দিন পর ৩ এপ্রিল রেজিস্ট্রার সাইফুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক আদেশে ড. আনোয়ারকে বিভাগীয় প্রধানের পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। তার স্থানে দায়িত্ব পান কৃষি প্রকৌশল ও কারিগরি অনুষদের ডিন। দায়িত্ব নিয়েই ডিন প্রথমে বিতর্কিত কাজটি সম্পন্ন করেন- পরদিন ৪ এপ্রিল নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত বিভাগীয় প্রধান ও ডিনের স্বাক্ষর দিয়ে ওই পরীক্ষার্থীদের ফল প্রকাশ করে বিভাগ। কিন্তু প্রথমে তৈরি করা মূল ফলের টেবুলেশন শিট এখন পর্যন্ত নিজের কাছেই আছে বলে জানান অধ্যাপক আনোয়ার। তিনি বলেন, ‘প্রশাসনের দায়িত্ব ছিল আমার তোলা অভিযোগ তদন্ত করা, তা না করে তারা কীভাবে আমাকে কোনো কারণ না জানিয়ে পদ থেকে অব্যাহতি দেয়? এটা নিয়মবহির্ভূতভাবে ঘটেছিল। তাছাড়া যে ডিনের বিরুদ্ধে আমি অভিযোগ এনেছি, জিডি করেছি, তাকেই দায়িত্ব দেয়াটা কিসের ইঙ্গিত বহন করে? তার যা কাজ সেটাই তিনি করেছেন, দায়িত্ব নিতে না নিতেই নকলবাজদের পাস করিয়ে ফলপ্রকাশ করেছেন। এটা ঘটতে দিয়ে ভিসিসহ পুরো প্রশাসনই নকলের পক্ষে দাঁড়িয়েছে।’
জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেটের ৩০৮তম অধিবেশনে সিন্ডিকেটের একজন সদস্য এমন মত রাখেন যে, ক) অধ্যাপক আনোয়ার হোসেনকে কারণ দর্শানো ব্যতীত পদ থেকে অব্যাহতি দেয়াটা বিধিসম্মত হয়নি। কিন্তু অধিবেশনের যে ধারাভাষ্য রেকর্ড করা হয় তাতে তার এই মত প্রতিফলিত হয়নি। পরবর্তীতে তিনি রেজিস্ট্রার বরাবর চিঠি দিয়ে এই বিচ্যুতির তথ্য অবগত করেন। এভাবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে কোনো সমাধান না পেয়ে, তাদের পাল্টা পদক্ষেপে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে শেষ অবধি অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন আদালতে যান। বিভাগীয় প্রধানের পদ থেকে অব্যাহতির আদেশের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ এনে ময়মনসিংহের নিম্ন আদালতে ৫ এপ্রিল, ২০১৬ একটি মামলা করেন তিনি। আদালত অব্যাহতির ওপর স্থগিতাদেশ ও ১০ দিনের মধ্যে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় দায়রা জজ আদালতে আপিল করে। সেই আপিলে আগের দেয়া স্থগিতাদেশ তুলে নেয়া হয়। এরপর অধ্যাপক আনোয়ার সেখান থেকে মামলা তুলে নিয়ে ১২ এপ্রিল, ২০১৭ হাইকোর্টে একটি রিট (নং ৫৪৫০/১৭) করেন। অব্যাহতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না- জানতে চেয়ে রুল জারি করেন হাইকোর্ট। সেইসঙ্গে অভিযুক্ত পাঁচ শিক্ষার্থীর ফল প্রকাশকে কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না তাও জানতে চাওয়া হয় রুলে। এতে তিন সপ্তাহের মধ্যে বাকৃবির উপাচার্য, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক, রেজিস্ট্রারসহ সংশ্লিষ্ট ৯ জনকে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে। অধ্যাপক আনোয়ার জানান, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের অসহযোগিতায় রুলের নিষ্পত্তি হচ্ছে না।’
এ বিষয়ে জানতে বাকৃবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আলী আকবরের মোবাইল ফোনে বেশ কয়েক দিন ধরে চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। কথা বলতে চেয়ে মেসেজ পাঠালেও উত্তর দেননি তিনি। তার ব্যক্তিগত সহকারীর দায়িত্বরত সহকারী রেজিস্ট্রার হারুনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি উপাচার্যের সঙ্গে কথা বলে জানাবেন বললেও আর যোগাযোগ করেননি। এমনকি পরবর্তীতে কয়েকবার ফোন দেয়া হলেও তিনি তা রিসিভ করেননি।
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার মো. সাইফুল ইসলামকে নকল থিসিসের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘নকল তদন্তের বিষয়ে আমরা একটি কমিটি গঠন করেছিলাম, কিন্তু তারা এখনও প্রতিবেদন দেয়নি।’ মামলার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা তো আদালতে গিয়েছিলাম, আদালত আমাদের পক্ষে রায় দিয়েছিলেন, এরপর তিনি হাইকোর্টে গেলেন। এখন আইনি প্রক্রিয়ায় সব এগোচ্ছে।’ তিনি দাবি করেন, ‘অধ্যাপক আনোয়ারের বিরুদ্ধে গৃহীত পদক্ষেপগুলো বিধিসম্মতভাবেই করা হয়েছে।’ অধ্যাপক আনোয়ারকে ক্লাস-পরীক্ষা থেকে বাদ দেয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তিনিই আসেন না, তাকে আমরা কারণ দর্শানোর নোটিশও দিয়েছি এজন্য।’
তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক মনোরঞ্জন দাশের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমরা তো রিপোর্ট দিয়েছি। একটু আলাদা হয়েছে এটা। তিনি আমাদের তদন্তে সহযোগিতা করেননি। আমরা সেই তথ্য দিয়েই রিপোর্ট জমা দিয়েছি।’
অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমি আদালতে গেলে অব্যাহতির আদেশের ওপর স্থগিতাদেশ দেয় আদালত। এরপর তারা নিম্ন আদালতকে না জানিয়ে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনে দায়রা জজ আদালতে। সেখান থেকে স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করে আমাকে জবাব দিতে বলা হয়। স্থানীয় অবস্থা বিচার করে আমি উচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হওয়ার সিদ্ধান্ত নেই। আর তদন্তে সহযোগিতা না করার কোনো কারণ নেই, কিন্তু সেটা যে পদ্ধতিতে হওয়ার কথা, তদন্তকারীরা সেই পথে হাঁটেননি। ফলে আমি নতুন কোনো ঝামেলায় পড়তে চাইনি।’

কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে এরকম অনেক ঘটনাই ঘটে চলেছে। এর ছোট্ট একটি দিক মাত্র এখানে তুলে ধরা হলো। শুধু কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় নয়, দেশের স্বনামধন্য সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েরই একই চিত্র। শিক্ষক আছে, দলীয়করণ আছে, ক্ষমতার চর্চা আছে, নকল আছে, প্রশ্নফাঁস আছে। শুধু যেটা নেই, তা হলো শিক্ষা। বাংলাদেশে এখন শিক্ষা খাতে ইতিবাচক ঘটনা খুবই কম। সরকারের উচিত শিক্ষাকে রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া। সেজন্য উচ্চ শিক্ষালয়ের এসব ঘটনা খুবই গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা উচিত। অন্যায়কারীরা ঘুরে বেড়ালে অন্যায় বাড়বে। তাই প্রথম জরুরি কাজটি হলো শিক্ষার বেহাল দশার জন্য দায়িদের শাস্তির মুখোমুখি করা।

সাপ?তাহিক পতিবেদন

প্রচ্ছদ কাহিনী/প্রতিবেদন
 মতামত সমূহ
পিছনে 
 আপনার মতামত লিখুন
English বাংলা
নাম:
ই-মেইল:
মন্তব্য :

Please enter the text shown in the image.