[সাফল্য] উদ্ভাবিত নতুন আবাদে সফল শতচাষি

Print Friendly and PDF

সৈয়দ রুমী

জিন পিরামিডিং মাধ্যমে উদ্ভাবিত আমন মৌসুমে চাষাবাদের উপযোগী নতুন একাটি জাত বিনাধান-১৭। পাবনা জেলার বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট সংশ্লিষ্টরা নতুন উদ্ভাবিত এ জাত পরীক্ষামূলক আবাদ করে পাবনার শত চাষি বাম্পার ফলনের পাশাপাশি আর্থিক সচ্ছলতার মুখ দেখতে পেয়ে যেন সুদিন ফিরে পেয়েছে।
বিনা-১৭ জাত ধানের উদ্ভাবক পাবনা ঈশ্বরদীর পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের ড. সিদ্দিকুর রহমান জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বৈরী আবহাওয়ার কারণে কৃষকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সে জন্য স্বল্প জীবনকালের ধান কৃষকদের মাঠে দিয়ে অন্য ফসল আবাদে তারা যাতে সময় পায় সে ব্যবস্থা মাথায় রেখে এ জাতটি প্রস্তুত করা  হয়েছে।
এ জাতটির বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে প্রধান গবেষক ড. মির্জা মোফাজ্জল ইসলাম, বলেন, এটি উচ্চ ফলনশীল, স্বল্প মেয়াদি, খরা সহিষ্ণু (৩০% পানি কম প্রয়োজন), সার কম লাগে (প্রচলিত জাতের তুলনায় ২০-৩০% কম লাগে), আলোক অসংবেদনশীল ও উন্নত গুণাগুণসম্পন্ন রোপা আমন জাত। গাছ খাট ও শক্ত বলে  হেলে পড়ে না । পূর্ণ বয়স্ক গাছের উচ্চতা ৯৬-৯৮  সেঃমিঃ। পাতা গাঢ় সবুজ ও খাড়া। এটি আগাম পাকে, ব্রি ধান-৩৯ অপেক্ষা প্রায় এক সপ্তাহ আগে ধান কাটা যায় এবং ব্রি ধান-৩৯ অপেক্ষা প্রায় ২০%  বেশি ফলন  দেয়। জীবন কাল ১১২-১১৮ দিন। ।
বিশেষ গুণ
আগাম পাকে বিধায় কাটার পর সহজেই আলু, গম বা রবিশস্য চাষ করা যায়। এটির ধান উজ্জ্বল রংয়ের। ধান ও চাল লম্বা এবং চিকন, খেতে সুস্বাদু। ফলে বাজার মূল্য  বেশি ও রপ্তানির উপযোগী। যথোপযুক্ত পরিচর্যার হেক্টর প্রতি ৬.৮-৭.৫ টন (একরে ৬৮-৭৫) ফলন দেয়। চাউলে এ্যামাইলোজের পরিমাণ ২৪.৬%। রান্নার পর ভাত ঝরঝরে হয় এবং দীর্ঘক্ষণ রাখলে নষ্ট হয় না। জাতটি বিভিন্ন  রোগ যথা- পাতা পোড়া, খোল পচা ও কাণ্ড পচা ইত্যাদি রোগ তুলনামূলক ভাবে  বেশি প্রতিরোধ করতে পারে। এছাড়া এই জাতটির প্রায় সব ধরনের পোকার আক্রমণ, বিশেষ করে বাদামি গাছ ফড়িং, গলমাছি ও পামরী পোকার আক্রমণ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেক বেশি। এটির জীবনকাল কম বিধায় নাবিতেও রোপণের উপযোগী। বিনাধান-১৭ আমন মৌসুমের জন্য আনুমোদিত হলেও জাতটি প্রায় সারা বছরই চাষ করা যায় অর্থাৎ আউশ ও  বোরো  মৌসুমে চাষ করা যায়।
সংশ্লিষ্টরা জানান, বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগিতায় কৃষকদের মাঝে বিনা-১৭’র সাড়া জাগানোর জন্যে তারা পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার অরণকোলা গ্রামে বিনাধান-১৭ এর কর্তন ও কৃষক সমাবেশের উদ্যোগ নেয়। পরবর্তীতে এক প্রদর্শনীতে বিনা-১৭’র চাষিরা অংশ নেয়। তাদের মধ্যে বিনাধান-১৭ জাতের প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণকারী চাষি আব্দুস সাত্তর জানান, স্বল্পমেয়াদি এ ধান আবাদ করে লাভবান হয়েছেন তিনি এবং তার মতো শত কৃষক। তিনি সার, সেচ ও পোকার আক্রমণ কম থাকায় সাশ্রয় খরচে বিঘাপ্রতি ফলনও পেয়েছেন কুড়িমণ। খরচ বাদে বিঘায় প্রায় চৌদ্দ হাজার টাকা তিন মাসে লাভ করবেন তিনি। ধান কাটার পর মসুর বোনার পরিকল্পনা রয়েছে তার।
আঞ্চলিক উপযোগিতা : লবণাক্ত এলাকা ছাড়া দেশের প্রায় সকল রোপা আমন অঞ্চল বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের পাবনা, রাজশাহী, রংপুর, দিনাজপুরসহ বগুড়া, ঢাকা, কুমিল্লা, যশোর, কুষ্টিয়া, ময়মনসিংহ ও পার্বত্য অঞ্চলে জাতটির অধিক ফলন পাওয়া যায়।
চাষ উপযোগী জমি : বেলে দো-আঁশ এবং এটেল দো-আঁশ জমি বিনাধান-১৭ চাষের জন্য উপযোগী। বেশি নিচু জমি (যেখানে দীর্ঘদিন পানি জমে থাকে) ব্যতীত প্রায় সব ধরনের জমিতে চাষবাদ করা যায়।
চাষাবাদ পদ্ধতি : জাতটির চাষাবাদ পদ্ধতি অন্যান্য উফশী  রোপা আমন জাতের মতোই। তবে এর জীবনকাল কম বিধায় ভালো ফলন  পেতে হলে চারার বয়স ও পরিচর্যার ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।
বীজতলা তৈরি : পাঁচ শতাংশ (২০০ বর্গ মিটার পরিমাণ বীজতলায় ১০  কেজি বীজ  ফেলা যায়। জুন মাসের  শেষ সপ্তাহ হতে জুলাইয়ের দ্বিতীয় সপ্তাহ (আষাঢ়ের ২য় সপ্তাহ হতে  শেষ সপ্তাহ) পর্যন্ত বীজতলা  তৈরি করে ২০-২৫ দিনের চারা রোপণ করলে ভালো ফসল পাওয়া যায়। তবে জুলাইয়ের  শেষ (শ্রাবণের দ্বিতীয়) সপ্তাহ পর্যন্ত বীজতলা করা যায়।
পরিচর্যা : এই জাতের ধানের পরিচর্যা অন্যান্য উফশী জাতের মতোই। হবে এর জীবনকাল কম বিধায় চারা  রোপণের পর আগাছা  দেখা দিলে দ্রুত নিড়ানি যন্ত্র বা হাতের সাহায্যে আগাছা পরিষ্কার ও মাটি নরম করতে হবে। বর্ষা  মৌসুমের  শেষে ফসল পাকার কিছু দিন পূর্বে পানির অভাব  দেখা দিলে  সেচের প্রয়োজন হতে পারে তবে ধান পাকার ১০-১২ দিন আগে জমির পানি শুকিয়ে  ফেলা ভালো।
রোগ ও পোকামাকড় দমন : রোগবালাই ও কীটপতঙ্গের আক্রমণ দেখা দিলে নিকটস্থ কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তার উপদেশ মোতাবেক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। পোকামাকড়ের আক্রমণ  দেখা দিলে প্রচলিত তরল বা আনাদার কীটনাশক ব্যবহার করা যেতে পারে। এ ছাড়া  খোলা ঝলসানো, ব্যাক্টেরিয়াল লিফব্লাইট বা পাতা ঝলসানো ও অন্যান্য রোগ দেখা দিলে উপযুক্ত ছত্রাকনাশক প্রয়োগ করতে হবে। খোল ঝলসানো, কাণ্ড পঁচা রোগ  দেখা দিলে বেনলেট, হোমাই,  বেভিষ্টিন বা টপসিন মিথাইল মাত্রা অনুযায়ী প্রয়োগ করা  যেতে পারে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, পাবনার উপ-পরিচালক বিভূতি ভূষণ সরকার বলেন, বিনা-৭ জাতের ধানটি কৃষকের মাঝে ভালো সাড়া জাগিয়েছিল কিন্তু এ ধানের ভাত দ্রুত পচে যাবার কারণে সরু চাল সমৃদ্ধ বিনা ধান-১৭ উদ্ভাবন করা হয়েছে। যা জলবায়ুর সাথে পাল্লা দিতে এবং চাষিদের মুখের হাসি ধরে রাখতে সক্ষম।

সাপ?তাহিক পতিবেদন

 মতামত সমূহ
পিছনে 
 আপনার মতামত লিখুন
English বাংলা
নাম:
ই-মেইল:
মন্তব্য :

Please enter the text shown in the image.