ভালোবাসা ছাড়া আর আছে কী? -রাজু আলীম

Print Friendly and PDF

লোকে বলে প্রেম আর আমি বলি জ্বালা। বাংলা গানের এমন অন্তরা আর সুর আমরা অহরহ শুনে থাকি। গানের মাধ্যমে প্রেমের এমন সব যন্ত্রণার পূর্বাভাস পাওয়া সত্ত্বেও মানুষ প্রেমে পড়ে। জীবনে কেউ কারও প্রেমে পড়েনি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া বিরল। তবে সবার জীবনেই যে বিয়ের আগে প্রেম বা ভালোবাসা আসবে অথবা এসেছে- এমনটি বলারও অবকাশ নেই। কারও জীবনে প্রেম একাধিকবার আসে আবার কারও জীবনে একবারও আসে না। কারও জীবনে হয়তো এসেছিল; কিন্তু তিনি বুঝতে পারেননি। কেউ হয়তো বুঝতে পেরেও তাতে সাড়া দেয়নি, আবার কেউ না বুঝেই প্রেমে হাবুডুবু খেয়েছে। কেউ বলেন, ভালোবাসতে গিয়ে জীবনে চরম খেসারত দিতে হয়েছে। আবার  কেউ বলেন, প্রেম কী জিনিস জীবনে অজানাই থেকে গেল।  প্রেমের এই যে চোরাবালি অস্তিত্ব রয়েছে সেটাকে সামনে রেখেই বাংলাভাষায় একটি বিখ্যাত প্রবাদ বাক্য হয়েছে- প্রেমেতে মজিলো মন কিবা হাঁড়ি কিবা ডোম। আবার প্রেমকে অতিশায়িত করে এক কণ্ঠযোদ্ধা আবদুল আলীম গেয়ে ওঠেন- প্রেমের মরা জলে ডোবে না। প্রেমের অবিনশ্বর রূপ প্রকাশ করতে গিয়ে শেষ বয়সে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সম্পূর্ণ প্রেমের এক উপন্যাস লেখেন। নাম দিয়েছেন শেষের কবিতা। উপন্যাসে অমিতকে  লেখা লাবণ্যর এক চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন- তবু সে তো স্বপ্ন নয়, সবচেয়ে সত্য মোর, সেই মৃত্যুঞ্জয়- সে আমার প্রেম। প্রেমের এমন অনেক গালগল্পই অধিকাংশ সময় ধরে হয়ে উঠেছে শিল্প-সাহিত্যের বিষয়বস্তু। প্রেমের স্বরূপ প্রেমেই। এর বিকল্প কিছু নেই। এটি স্বমহিমায় উদ্ভাসিত আবেগী ধারণা। যার অস্তিত্ব মানুষের কল্পনায়। বাংলা একাডেমি প্রণীত ব্যবহারিক বাংলা অভিধান অনুযায়ী যার অর্থ হচ্ছে প্রণয়, ভালোবাসা, প্রীতি, স্নেহ, অনুরাগ, অনুরক্ত হওয়া, ভক্তি করা ইত্যাদি। আর ভালোবাসা শব্দের অর্থ করা হয়েছে শ্রদ্ধাকরা, ভক্তি করা, পছন্দ করা, স্নেহ করা ইত্যাদি রূপে। অর্থের ভিন্নতা একটু থাকলেও প্রেম ও ভালোবাসা শব্দ দুটির অর্থ একটি অপরটির পরিপূরক। লোকে বলে প্রেম আর আমি বলি জ্বালা, এত কষ্ট কেন ভালোবাসায়। বাংলা গানের এমন অন্তরা হাজারবার কানে বাজলের জীবনে কারও প্রেমে পড়েননি কিংবা কাউকে ভালোবাসেননি- এমন মানুষ পাওয়া দুষ্কর। অভিধান গত অর্থ যাই হোক না কেন, মানব জীবনে শব্দ দুটির গুরুত্ব ও তাৎপর্য অপরিসীম।
মানুষের জীবনে বয়সের তারতম্য অনুযায়ী প্রেম বা ভালোবাসা শব্দ দুটি ভিন্নভাবে তার অর্থ  গ্রহণ করে।  সে জন্য একেক বয়সে একেকজনের কাছে ভালোবাসার অর্থ একেক রকম হয়ে থাকে। প্রেম বা ভালোবাসা মানব চিন্তাগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি বিচিন্তা। এটি একটি কল্পনাপ্রসূত মানব জীবনের বিভ্রান্তিকর অবচেতনা। বিবাহের পূর্বে মনুষ্য জীবনের অনৈতিক অবচেতনাগুলোর মধ্যে অন্যতম জনপ্রিয় এ অবচেতনাটি মানুষকে অসার ও অস্থির করে তোলে সবসময়। সে অস্থিরতা বিপরীত লিঙ্গের কাউকে কাছে পাবার অস্থিরতা। আবার কাছে কেন পাওয়া যাবে না! এই না পাবারও অস্থিরতা। এটি এমন একটি চেতনা যা মস্তিষ্ক থেকে উদ্ভূত হয়ে সেখানেই ঘুরপাক খেতে থাকে এবং কামকে অতিশায়িত করে কল্পনার জাল বুনতে থাকে সবসময়। এই চেতনা কখনো সখনো মাদকের নেশার থেকেও ভয়ঙ্কর নেশায় রূপান্তরিত হতে পারে। সমাজের সবচেয়ে জনকাক্সিক্ষত অনৈতিক এ নেশা আদিমকাল থেকে বংশপরম্পরায় চলে আসছে, যাকে বলা হয় প্রেম বা ভালোবাসা, যা বিশ্বসাহিত্যের অত্যন্ত পুষ্টিকর খোরাক। যে জিনিস আদিমকাল থেকে লোকমুখে প্রচলিত, যার ঐতিহাসিক কোনো ভিত্তি নেই, যা শুধুই কল্পনানির্ভর গালগল্প এবং যার লিখিত কোনো ঐতিহাসিক দলিল আশা করা যায় না, তাই পৌরাণিক। সে অর্থে প্রেমকে পৌরাণিক বলা যায়। কারণ প্রাগৈতিহাসিককাল থেকেই সব ধর্ম ও মতে এবং পৃথিবীর প্রধান চারটি আসমানী গ্রন্থসহ সব প্রাচীন ধর্মগ্রন্থে বিয়ের পূর্বে নারী-পুরুষের প্রেমের কোনো স্বীকৃতি নেই। এটি মানুষ রচিত নিয়মবহির্ভূত কাল্পনিক চেতনা। মানব মনের বিভ্রান্তিকর ও অস্থির এ  চেতনা সমন্বিতভাবে পুঞ্জীভূত হয়ে একসময় তা মাদকতা তৈরি করে এবং সমস্ত চেতনাকে মাদকের মতো করে সর্বদা আচ্ছন্ন রাখে। সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটির একদল বিজ্ঞানী গবেষণা করে দেখেছেন যে, প্রেম ও যৌনতার চিন্তাগুলো ঘনীভূত হয় মানুষের মস্তিষ্কে। মানুষ যতই এই বিষয় দুটিকে নিয়ে ভাবেন, ততই এ অনুভূটিটা শরীরে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। অর্থাৎ চিন্তা থেকেই এর জন্ম এবং চিন্তাতেই এর মৃত্যু। সম্ভবত  প্রেমই প্রাচীন অনুভূতিগুলোর মধ্যে এমন একটি অনুভূতি যা আজও সমাজে টিকে আছে বহাল তবিয়তে। পৌরাণিক গালগল্প গাথাগুলো এ  চেতনাকে বহন করে নিয়ে এসেছে যুগ যুগ ধরে।  সে কারণেই হয়তো গোটা পৃথিবীজুড়ে যত পৌরাণিক গল্পগাথা আছে তার সবই  প্রেম দিয়ে ভরা। যত সাহিত্য সৃষ্টি হয়েছে তার অধিকাংশ সাহিত্যকর্মের উপজীব্য বিষয় হচ্ছে প্রেম। আর সিনেমা থিয়েটারের কথা তো বলাই বাহুল্য। এই পুরাঘটিত পৌরাণিক বিষয়টি আজ আমাদের সমাজে এমনভাবে জেঁকে বসেছে, তা সর্বোপরি অপ্রতিরোধ্য হয়ে উত্তর উত্তর বীভৎস রূপে আরও বিস্তার লাভ করছে এবং প্রেমের কারণে হত্যার মতো একটি অন্যতম অপরাধও সংঘটিত হচ্ছে। পৃথিবীতে প্রেমঘটিত বহু হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে। তবে আগের যুগের হত্যাকাণ্ডগুলোর প্রেক্ষাপট ছিল এরকম, এখনকার হত্যাকাণ্ডের প্রেক্ষাপট তার থেকে আলাদা। বর্তমান সমাজে প্রেমঘটিত হত্যাকাণ্ডগুলো আধুনিক  প্রেমের মাত্রাসংবলিত নতুনভাবে বিন্যস্ত- যা  পৌরাণিক প্রেমের গণ্ডি থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন অবয়বের এবং ভিন্ন আঙ্গিকেরই বলা যায়। যে সব পৌরাণিক আখ্যানমূলক কাহিনীকাব্যের জুটি  প্রেমের নিদর্শন হিসেবে সাহিত্যে ও সমাজে প্রচলিত আছে- তার মধ্যে লাইলী মজনু, শিরি ফরহাদ, রোমিও জুলিয়েট, চণ্ডিদাস রজকিনী, রাধাকৃষ্ণ,  বেদের  মেয়ে জ্যোৎস্না, রহিম বাদশা রূপবান, বেহুলা লখিন্দর উল্লেখযোগ্য। এসব পৌরাণিক কাহিনীর  কোথাও এমন কোনো নিদর্শন নাই যে, প্রেমিক তার প্রেমিকাকে কিংবা  প্রেমিকা তার  প্রেমিককে কোনো কারণে কাছে না পাবার জন্য খুন করেছে। প্রেমিক-প্রেমিকা নিজেরা হয়তো অন্য  কোনো তৃতীয় পক্ষের দ্বারা অকথ্য নির্যাতন সহ্য করেছে তবু  প্রেমিককে কিংবা  প্রেমিকাকে বিন্দু পরিমাণ কষ্ট পেতে দেয়নি। যাবতীয় সব কষ্ট ও অপবাদ নিজে মাথা পেতে নিয়েছে। একজনের কষ্ট অন্যজন ভাগাভাগি করে নিয়েছে। একে অন্যের জন্য নিজের মূল্যবান জীবনটাকে উৎসর্গ করেছে অন্যদের কাছে অথবা গলায় ফাঁস দিয়ে কিংবা বিষপানে নিজেই আত্মহত্যা করেছে। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বিলাসী গল্পের বিলাসী ও দেবদাস উপন্যাসের প্রধান চরিত্র দেবদাস তারই দৃষ্টান্ত। কিন্তু বর্তমান যুবসমাজ সেই পৌরাণিক প্রেমের আদর্শে উজ্জীবিত না হয়ে নিজেকে প্রেমের কাছে সোপর্দ বা উৎসর্গ না করে- বাস্তবতাকে মেনে নিতে না পেরে প্রেমের আধুনিক সংস্করণ হিসেবে বেছে নিয়েছে একে অপরকে হত্যা করার মতো জঘন্যতম সিদ্ধান্ত। কেননা আধুনিক মানুষ অতি যুক্তিনির্ভর। যুক্তি দিয়ে জীবনকে পরিমাপ করতে চায়। আর সেই পরিমাপে সামান্যতম বিচ্যুতি ঘটলেই শুরু হয় মানসিক টানাপড়েন। মনস্তাত্ত্বিক এ যুদ্ধে জিততে চায় যুক্তিবাদী প্রতিটি মানুষ। ফলে বেছে নেয় প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার মতো যে কোনো কঠিন সিদ্ধান্ত। এ সিদ্ধান্ত বস্তুবাদী জীবনদর্শনের নব্য সংস্করণ বলেই মনস্তত্ত্ববিদদের ধারণা। বস্তুবাদী দর্শনে বিশ্বাসী প্রথাবিরোধী লেখক হুমায়ুন আজাদ প্রেমে বিশ্বাস করেন না। তিনি বিশ্বাস করেন কামে। তিনি বলেছেন, প্রেমে পড়া মানে জীবনের অধঃপতনের দিকে ধাবিত হওয়া। তিনি পড়া শব্দটাকে অধঃপতন অর্থে গ্রহণ করেছেন (নারী)। তিনি বলেন,  প্রেম ক্ষণস্থায়ী। প্রেম ছাড়াও জীবন চলে এবং ভালোভাবে চলে বরং প্রেমই সার্থক জীবন তৈরিতে বাধা সৃষ্টি করে। জীবনের ছন্দপতন ঘটিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। ড. সর্বোপল্লী রাধা বলেছেন, ‘জীবনের অন্তঃস্থলের আগুন থেকে প্রেমের শিখা জ্বলে, এই  প্রেমই সমস্ত সৃষ্টির মূল উৎস’। কবি আলাওল বলেছিলেন, ‘প্রেম রূপমূল, প্রেম বিরহের মূল; অমৃত জড়িয়া বিষ করিল আকুল’। কেউ বলেছেন, প্রেম জ্বলন্ত সিগারেটের মতো পুড়ে নিজেকে নিঃশেষ করে, নেশা লাগায় আবার ক্ষতিও করে। কেউ বলেছেন,  প্রেম মানে প্রতারণা, ধোঁকা আর যন্ত্রণা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন,  প্রেম ঐস্বর্গিক। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বলেছেন, প্রেম পবিত্র। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বলেছেন, প্রেমে ঝাঁপ দেয়া মানে আগুনে ঝাঁপ দেয়া। খুঁজে দেখলে প্রেম সম্পর্কে এ রকম হাজারো নেতিবাচক ও ইতিবাচক মন্তব্য পাওয়া যাবে বিশ্বসাহিত্যের পাতায়। এ সবই মানুষের ধারণাভিত্তিক অনুমানের কিংবা অভিজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ। এর সুফল থেকে কুফলই বেশি। এ থেকে বোঝা যায় প্রেম হচ্ছে, কল্পনানির্ভর অমীমাংসিত বিতর্কিত একটি বিষয়, মরীচিকা মাত্র। যার জন্ম হয়েছে মানুষের কল্পনাপ্রসূত অনৈতিক বিলাসিতা থেকে। কে বা কারা প্রথমে নিজেকে এই পাগলামিতে জড়িয়ে রেখে নিজেকে পাগল করেছিল, সেই থেকে এই যাত্রা শুরু হয়ে আজ অবধি চলছে। মানব চরিত্রের এই চেতনাকে সবচেয়ে বেশি লালিত-পালিত করেছেন কবি, সাহিত্যিক, নাট্যকার, সিনেমার পরিচালক এবং বর্তমানে সময়ের মিডিয়া জগৎ। তারা সবাই নিজেদের স্বার্থে এই আবেগটাকে জিইয়ে রেখেছে প্রবলভাবে। যার বেশিরভাগই কল্পনা ভিতের ওপর প্রতিষ্ঠিত। এ পর্যন্ত  প্রাপ্ত উপরে উল্লিখিত প্রেমের উপাখ্যানগুলোর মধ্যে কোনোটিরই ঐতিহাসিক কোনো সত্যতা নেই। এগুলো সবই জীবনানন্দ দাশ এর লেখা কবিতা ‘বনলতা সেন’ কিংবা লিওনার্দো দা ভিঞ্চির আঁকা ‘মোনালিসা’ চিত্রকর্মের মতো কাল্পনিক সৃষ্টি। এ জন্যই প্রেমকে পৌরাণিক বলা যায়। প্রেমের বিপরীত শব্দ হচ্ছে ঘৃণা, অবজ্ঞা, উপেক্ষা, তাচ্ছিল্য ও অসম্মান। এই শব্দগুলো যখন প্রেমের সম্পর্কের ভিতরে প্রবেশ করে তখনই প্রেম যন্ত্রণাদায়ক ও বিষময় হয়ে ওঠে। প্রেমে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকরা, প্রতারণা করা, ধোঁকা দেয়া এবং বিশ্বাসঘাতকতার মতো জঘন্যতম অপরাধের অনুপ্রবেশ ঘটলে কেবল মাত্র তখনই ঘৃণা, অবজ্ঞা অসম্মান দানা বাঁধতে থাকে উভয়ের মধ্যে এবং তা এক সময় বিস্ফোরণের রূপ ধারণ করতে পারে। কারণ প্রতারক বিশ্বাসঘাতককে কেউ সম্মান শ্রদ্ধা বা ভালোবাসতে পারে না। যেহেতু প্রেমের জন্মই হয়েছে নৈতিক স্খলন থেকে, সেজন্য  প্রেমপাগল চরিত্রের মধ্যে ধোঁকা ও প্রতারণা বাসা বাঁধতে পারে খুব সহজেই এবং হচ্ছেও তাই।  প্রেমের শুরুটা এক আনন্দঘন পরিবেশের মধ্য দিয়ে পরিচালিত হয়। ঘনিষ্ঠতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নানান রকম প্রতিশ্রুতি আর প্রতিজ্ঞাতে আবদ্ধ করতে থাকে পরস্পর পরস্পরকে। গাছকে সাক্ষী রেখে, আকাশ বাতাস, নদী নালা, সাগর পাহাড়কে সাক্ষী রেখে- হাতে হাত রেখে হাত ছুঁয়ে, মাথায় হাত রেখে মাথা ছুঁয়ে, চোখ ছুঁয়ে শপথ নিয়ে একে অপরের কাছে বিশ্বাস ও গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করতে চায়। এ আস্থা অর্জনে প্রায় সময়ই মিথ্যার আশ্রয়  নেয়া হয়। যারা প্রতারণা করে অন্যের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক তৈরি করতে পারে, তারা  যে কোনো জায়গায় বিশ্বাসঘাতকতা যে করবে না, তারই বা নিশ্চয়তা কি হতে পারে? সুতরাং প্রেমে বিশ্বাসী মানুষকে ধরে নেয়া যায় যে সে মরীচিকাকেই বেশি বিশ্বাস করতে পছন্দ করেন। প্রেমের ভাঙনটা শুরু হয় যে কোনো এক পক্ষের বিশ্বাসঘাতকতা দিয়ে। বিশ্বাস আর প্রতিশ্রুতির বাড়া ভাতে যখনই ছাই পড়ে তখনই মানবমনে আড়ি পেতে থাকা প্রতিহিংসা আর প্রতিশোধের আগুন সাপের মতো ফণা তুলে প্রতিপক্ষকে ছোবল মারতে কুণ্ঠাবোধ করে না। অনেক সময় একপক্ষ নিজেই প্রেমের এই কুৎসিত বিষবাষ্পে অতিষ্ঠ হয়ে আত্মহননের পথ বেছে নেয়। আর অপর পক্ষ নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে মজা অনুভব করার আপ্রাণ চেষ্টা করেন কখনো কখনো। মনে রাখা অত্যন্ত জরুরি, প্রতিশ্রুতি পূরণে উদাসীন হওয়া, বিশ্বাস ভঙ্গ করা, মিথ্যা আশ্বাস দেয়া, প্রতারণা করা, অতিরিক্ত প্রশংসা করা, বাড়িয়ে বলা ইত্যাদি এসব বিষয় মানব চরিত্রের অন্যতম ত্রুটি ও মন্দ বৈশিষ্ট্য। এসব মন্দ  বৈশিষ্ট্য ও ত্রুটিকে চরিত্রের সোপান ভেবে সততা, নিষ্ঠা, আন্তরিকতা আর ভালোবাসার কৃত্রিম মোড়কে নিজেকে আবৃত করে ফেলেছে আজকের যুবসমাজ। প্রতারণা আর চালাকির ফাঁদ পেতে নিজেকে সবচেয়ে বেশি বুদ্ধিমান ভাবতে বেশি পছন্দ করছে এইসব আধুনিক প্রজন্মের প্রেমিক-প্রেমিকারা। ফলে প্রতারণার জাল বিস্তার করে একাধিকজনের সঙ্গে গড়ে তুলছে প্রেমের মিথ্যা সম্পর্ক। আর প্রতারণা বুঝতে বা ধরতে পারলে ঘটছে নৃশংস হত্যাকাণ্ড, এসিড নিক্ষেপ, ধর্ষণ, অপহরণসহ নানান ধরনের অপরাধ। যারা প্রতিশোধপরায়ণ নন, তারা ভাগ্যকে মেনে নিয়ে প্রতারণার বিষে জর্জরিত হয়ে নির্জনে নিভৃতে চোখের জল ফেলছেন কিংবা উল্টো প্রতিশোধ নেয়ার জন্য নিজেকে শক্ত করে পুনরায় অনেকের সঙ্গে প্রেমের অভিনয় করে যাচ্ছেন। ফলে  প্রেমের অন্তরালে চলছে ধোঁকা আর প্রতারণার জমজমাট  প্রেমবাণিজ্য। এমন সব বীভৎস প্রেমের নৈরাজ্যকর সাংঘর্ষিক সংলাপনির্ভর চিত্রনাট্য এখন আর বাংলা সাহিত্যে অপ্রতুল নয়। এসব চিত্রনাট্য নাট্যাঙ্গনকে করে তুলেছে খানিকটা বৈচিত্র্যময়। এ কথা না বললেই নয় যে- আমাদের শিল্প, সাহিত্য ও বিনোদনের মাধ্যমগুলো প্রেমের রগরগা কাহিনী তৈরি করেছে প্রচুর পরিমাণে,  সে তুলনায় আদর্শ প্রেমিক-প্রেমিকা কিংবা উন্নত চারিত্রিক গুণাবলি সম্পন্ন মানুষ ও প্রেমিক কোনোটাই তৈরি করতে পারেনি মোটেও, যা একটি সমাজ বা দেশের কাছে মোটেই কাম্য নয়। চারিত্রিক স্খলন ও  নৈতিকতার অবক্ষয় ঘটলে মানুষ মানুষের কাছে মূল্যহীন হয়ে পড়ে এবং মানবিকতার পরিবর্তে ভোগ ও বিলাসিতা মানুষের জীবনের একমাত্র আরাধ্য বিষয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। সেজন্য বর্তমান সমাজে প্রেমের স্বরূপ পাল্টেছে। প্রেম আবির্ভূত হয়েছে নতুন আঙ্গিকে ভিন্ন অবয়বে। ফলে ভালোবাসার পরিবর্তে যৌনতাকে আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে সর্বাগ্রে। কিন্তু ভালোবাসা আর যৌনতা যে এক জিনিস নয়, তা বোঝার আবশ্যকতাও হারিয়ে ফেলছে আমাদের শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতি। ভালোবাসা চিরস্থায়ী আর যৌনতা ক্ষণস্থায়ী সাময়িক। ভালোবাসা যৌনতার চেয়েও অত্যন্ত সুখকর এবং পরিতৃপ্তির একটি বিষয়- এর কোনো সমাপ্তি বা শেষ নেই। সাহিত্যে এ দিকটিকে পরিশীলিত করার আবশ্যিকতাকে অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু বাংলা সাহিত্যে এর গুরুত্বটা নেহায়েত কমে এসেছে বলেই মনে হচ্ছে। প্রেমের নতুন অবয়ব হচ্ছে ত্রিমুখী পঞ্চমুখী প্রেম। এরূপ প্রেমকে প্রেমের আধুনিক সংস্করণ বলা চলে। যার পরিণতি খুন, জখম, গুম, অপহরণ, নির্যাতন ও এসিডে ঝলসে যাওয়া। এই বহুমুখী প্রেমের সঙ্গে স্বার্থ ও যৌনতা মাত্রাতিরিক্তভাবে জড়িত। এ দুটি বিষয় যখন চরিতার্থ করা যায় না, তখনই ঘটে বিপত্তি ও বিপর্যয়। আধুনিক বাংলা নাটকে এ রকম দৃশ্য এখন দুর্লভ নয়। টিভি নাটকের এসব দৃশ্যে দর্শক হতচকিত না হয়ে পারে না। প্রেম মানুষের জীবনে একবারই হওয়া উচিত। কিন্তু যারা প্রেমকে বারবার প্রত্যাশা করেন তারা আসলে প্রেমকে নয়, প্রেমরূপী প্রতারণার বেড়াজালে নিজেকে আবদ্ধ করে রাখতে পছন্দ করেন এবং প্রেমকে যৌনতা চরিতার্থের মোক্ষম হাতিয়ার মনে করেন। আর তখনই প্রেম খাঁটি না হয়ে ঘোলের স্বাদ নিয়ে দুটি জীবনেই নকল ভূমিকা রাখে এবং সেই সঙ্গে পূর্বের অভিজ্ঞতা তাকে জীবনব্যাপী তাড়া করে ফিরে। সুতরাং যে ভালোবাসার জন্য মানুষ নিজেই নিজেকে নিয়ন্ত্রণহীন করে তোলে সেই ভালোবাসা এক জীবনে বারবার কাউকে বাসা যায় না। কিন্তু বাংলা নাটকে এমন দৃশ্যের অবতারণার অভাব নেই। বলাবাহুল্য, ভালোবাসা ভালোবাসাই। ভালোবাসার মধ্যে সফলতা ব্যর্থতার কোনো সম্পর্ক নেই। যখন ভালোবাসার মধ্যে সফলতা ব্যর্থতার হিসাব-নিকাশ শুরু হয়, তখন ভালোবাসা তার মৌলিকত্ব হারিয়ে ফেলে। যখন ভালোবাসা একাধিক জায়গায় বাসা বাঁধতে থাকে, তখন ভালোবাসা তার আসল খোলস পাল্টিয়ে কৃত্রিম রূপ ধারণ করে। আর এভাবেই অভিনয়ের পর্বটা হয়ে ওঠে যন্ত্রণাময় ও বিষাক্ত। এই সুযোগে প্রেম বা ভালোবাসা চলে যায় আত্মগোপনে- তখন ভিতরে ভিতরে মানুষ হয়ে ওঠে হিংস্র পশু। আধুনিক বাংলা সাহিত্য, সাহিত্যের নামে এই পশুত্বকেও লালন করে হয়তো। কেননা, সাহিত্য সমাজ বিনির্মাণের শক্তিশালী হাতিয়ার। মুসলমানদের জীবনে বিয়ের পূর্বে প্রেম বা ভালোবাসা সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। বিশেষ করে যে ভালোবাসার সঙ্গে কাম বা যৌনতা সম্পৃক্ত। ইসলামী সংবিধান নারী-পুরুষের অবাধ চলাফেরাকে অনুমোদন দেয় না। বিয়ে করা যায় না এমন সম্পর্কের নারী-পুরুষ ছাড়া অন্য সবার সঙ্গে নিরাপদ দূরত্ব রেখে চলার নির্দেশ রয়েছে পবিত্র কোরআনে। অথচ আমাদের সমাজ এই নির্দেশের বিপরীত কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জোরালোভাবে অভিযুক্ত। কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক, সিনেমাসহ প্রত্যেকটি মাধ্যমে এই পৌরাণিক বিষয় ভালোবাসাকে আরও আকর্ষণীয় করে রগরগা করে উপস্থাপন করা হচ্ছে। মুসলমান নামধারী অনেক লেখক ই শিল্প ও সাহিত্যের নামে যুব সমাজকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন অবলীলায়। যার ফলে আমাদের যুবসমাজ  প্রেমকে ধ্যান জ্ঞান মনে করে প্রেমের আধুনিক সংস্করণে নেমে পড়েছে। কাজেই প্রেম নমস্য, না তপস্য, নাকি এর কোনোটাই নয় তাও শিল্প-সাহিত্যের আদলে আসল সত্যকে উন্মোচিত করতে পারলে সবচেয়ে ভালো হয় সমাজের জন্য। এখানে দুনিয়া কাঁপানো কিছু প্রেমিক জুটির অমর প্রেমকাহিনী আলোচনায় আনা যেতে পারে।  

রোমিও অ্যান্ড জুলিয়েট
নিঃসন্দেহে রোমিও এবং জুলিয়েটের প্রেমের আখ্যান দুনিয়ার অন্যতম বিখ্যাত প্রেমকাহিনী। যেন ভালোবাসার অপর নাম রোমিও জুলিয়েট। বিশ্ব বিখ্যাত ইংরেজ লেখক উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের কালজয়ী ট্র্যাজেডি হলো রোমিও জুলিয়েট। সারা বিশ্বে যুগ যুগ ধরে পাঠকের হৃদয় ছুঁয়ে গেছে এ বিয়োগান্ত প্রেমকাহিনী। রোমিও আর জুলিয়েটের পরিবারের মধ্যে শত্রুতার সম্পর্ক ছিল। দুটি ভিন্ন পরিবারের পূর্ববর্তী রেষারেষি, বংশীয় অহঙ্কার ভেদ করে দুজন তরুণ-তরুণীর প্রথম দর্শনে প্রেমে পড়ে যায়। পরবর্তীতে পরিবারের শত বাধা উপেক্ষা করে নানা নাটকীয়তার মাঝে তারা বিয়ে করে। সবশেষে, দুই পরিবারের শত্রুতার জেরে এবং ভুল বোঝাবুঝিজনিত কারণে বিষপানে আত্মহত্যা করে এই প্রেমিকযুগল। তাই পৃথিবীতে যখনই প্রেমের জন্য ত্যাগ-তিতিক্ষার কথা বলা হয়, সবার আগেই উঠে আসে এই তরুণ যুগলের নাম! তরুণ এ যুগলের ভালোবাসার জন্য মৃত্যুবরণ আজও পৃথিবীর মানুষকে একই আবেগে নাড়া দেয়।

প্যারিস এবং হেলেন
গ্রিক পুরাণের ফ্যাক্ট এবং ফিকশনের অপূর্ব এক সংমিশ্রণ হলো- গ্রিক লেখক কালজয়ী হোমারের জগৎ বিখ্যাত এপিক ইলিয়াড। নামকরা সেই যুদ্ধের নাম হলো,  ট্রজন ওয়্যার।  যে যুদ্ধে ধ্বংস হয়েছিল পুরো একটা শহর- ট্রয়! ইতিহাসে যা হেলেন অব ট্রয় নামে বিখ্যাত। দেবরাজ জিউস এবং স্পার্টার রাজা টিন্ডারিউসের পতœী লিডারের মিলনের ফলে শ্রেষ্ঠ সুন্দরী হেলেনের জন্ম হয়। বিশ্বসাহিত্যে হেলেন সেরা সুন্দরীর আসনে অধিষ্ঠিত। স্পার্টার রাজা মেনিলাসের সঙ্গে  হেলেনের বিয়ে হয়। ট্রয়ের ছোট রাজকুমার প্যারিস হেলেনের প্রেমে পাগল হয়ে অপহরণ করে তার রাজ্যে নিয়ে এসেছিলেন। হেলেনকে উদ্ধারে মেনিলাসের ভাই অ্যাগামেমননের নেতৃত্বে বিরাট গ্রিক সেনাদল ট্রয়ের অভিমুখে যাত্রা করে। দীর্ঘ ১২ বছর ধরে চলে এই ঐতিহাসিক যুদ্ধ। যুদ্ধের এক পর্যায়ে গ্রিক সৈন্যরা ট্রয় রাজ্যে আগুন ধরিয়ে দেয়। মুহূর্তের মধ্যে দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকে ট্রয় নগর। আগুনে পুড়ে হাজার হাজার  সৈন্য আর নিরীহ নাগরিক মারা যায়। গ্রিক বীর একিলিসও হেলেনের অন্যতম পাণি প্রার্থী ছিলেন। তাই একিলিস ছুটে যায় হেলেনকে বাঁচানোর আশায়- কিন্তু প্যারিস তীরবিদ্ধ করে মেরে ফেলে একিলিসকে। পালিয়ে যায় হেলেন, জয়লাভ করে গ্রিকরা। কিন্তু যে হেলেনের জন্য এত কিছু তাকে মেনেলাউস কাছে পেয়ে ছিল কিনা তা পৃথিবীর ইতিহাসে আর নেই।

সেলিম ও আনারকলি
মুঘল সম্রাট আকবরের পুত্র সেলিম প্রেমে পড়েন রাজ্যের নর্তকী অনিন্দ্যসুন্দরী আনারকলির। আনারকলির সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে প্রথম দর্শনেই তার প্রেমে পড়েন সম্রাটপুত্র সেলিম। সম্রাট আকবর এই সম্পর্ক কখনোই মেনে নেননি। সম্রাট আনারকলিকে সেলিমের চোখে খারাপ প্রমাণ করতে নানা ধরনের চক্রান্ত করেন। পিতার এ কৌশলের কথা জানামাত্র সেলিম নিজ পিতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। কিন্তু শক্তিশালী আকবর বাহিনীর কাছে সেলিম খুব সহজেই পরাজিত হয়। নিজ সন্তানের মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করেন আকবর। তখন প্রিয়তম সেলিমের জীবন বাঁচাতে আনারকলি নিজের জীবনের বিনিময়ে সেলিমের জীবন ভিক্ষা চান। তখন সম্রাট সেলিমের চোখের সামনে প্রিয়তমা আনারকলিকে জ্যান্ত কবর দেন!

শাহজাহান ও মমতাজ
১৬১২ খ্রিস্টাব্দে আরজুমান বানু নামক এক বালিকার সঙ্গে ১৫ বছরের শাহজাহানের বিয়ে হয়। পরে কিনা যিনি মুঘল সাম্রাজ্য পরিচালনা করেন। সম্রাট শাহজাহান তার ১৪ সন্তানের জননী এবং প্রিয়তম স্ত্রীর নাম পরিবর্তন করে রাখেন মমতাজ মহল। ১৬২৯ খ্রিস্টাব্দে মমতাজের মৃত্যুর পর- স্ত্রীর স্মৃতির উদ্দেশ্যে একটি স্থাপত্য নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন। যাতে প্রায় ২০ হাজার শ্রমিক কাজ করেছিল- প্রায় ১ হাজার হাতি ব্যবহার করা হয়েছিল এবং সেই স্থাপতের নির্মাণ কাজ শেষ হতে প্রায় ২০ বছর সময় লেগেছিল। তাজমহলের নির্মাণ কাজ শেষ হতে না হতেই শাহজাহান তার পুত্র আওরঙ্গজেব দ্বারা ক্ষমতাচ্যুত ও আগ্রার কেল্লায় গৃহবন্দী হন। শেষ বয়সে সাম্রাজ্য হারিয়ে বন্দী জীবন কাটিয়ে ছিলেন। তাই সেই অনিন্দ্যসুন্দর কালো মার্বেল পাথরের সৌন্দর্য তিনি সম্পূর্ণ দেখে যেতে পারেননি। যমুনার তীরে যেখানে তাজমহল গড়ে উঠেছিল- শেষ জীবনে শাহজাহান ওখানে একাকী সময় পার করেছেন। মৃত্যুর পর তাকে সেখানে সমাহিত করা হয়। তার ভালোবাসার নিদর্শনে তিনি রেখে যান- পৃথিবীর সপ্তাশ্চর্যের মাঝে একটি তাজমহল!

মার্ক এন্টোনি অ্যান্ড ক্লিওপেট্রা
ক্লিওপেট্রা এবং মার্ক অ্যান্টোনির সত্য প্রেমের কাহিনী পৃথিবীজুড়েই আলোচিত। এ দুই বিখ্যাত ঐতিহাসিক চরিত্র নিয়ে নাটক লিখেছেন শেক্সপিয়ার। নাটকটি এখনও পৃথিবীর সবখানেই সমাদৃত। অনিন্দ্যসুন্দরী মিসরীয় রানী ক্লিওপেট্রা আর তার প্রধান সেনাপতি এন্টোনি প্রথম দর্শনেই পরস্পরের প্রেমে পড়ে যান। এই দুই ক্ষমতাধর মানুষের প্রেমের বন্ধনে মিসর পৃথিবীর অন্যতম প্রভাবশালী রাষ্ট্রে পরিণত হয়। কিন্তু রোমান শাসকদের মাথাব্যথা হয়ে দাঁড়ায় এই প্রেম। কারণ এ  প্রেমই মিসরকে শক্তিশালী করে তুলেছিল। রাজকীয় ঘাত-প্রতিঘাত, জয়পরাজয় উপেক্ষা করে তারা বিয়ে করেন। ধারণা করা হয়, রোমানদের সঙ্গে যুদ্ধরত অবস্থায় এন্টোনির মনোবল ভাঙার জন্য, তাকে যুদ্ধের ময়দানে মিথ্যে সংবাদ শুনিয়েছিলেন যে, শত্রুরা ক্লিওপেট্রাকে হত্যা করেছে। ক্লিওপেট্রার মৃত্যুর বেদনা সইতে না পেরে অ্যান্টোনি নিজ তলোয়ার দিয়ে আত্মহত্যা করেন। অন্যদিকে এন্টোনির মৃত্যু সংবাদ শুনে রানী ক্লিওপেট্রাও নিজ ছুরিকাঘাতে আত্মহত্যা করেন। শেক্সপিয়ার তাদের জন্য বলেছিলেন, গ্রেট লাভ ডিমান্ডস গ্রেট স্যাকরিফাইস।
ভালোবাসার প্রকৃত অর্থ যাই হোক, কথাটা বোধ হয় ছিল ভালো ভাষা। আধুনিক সভ্যতা ও শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে এ সামান্য পরিবর্তন হয়েছে। ইতিহাসের থেকে দেখতে গেলে আমরা পাই- আদিম অধিবাসী বা অনার্যদের কাহিনী। সেই অনার্যরা যে সভ্য আর্যে পরিগণিত হয়েছিল, তার মূলেই ছিল- ভাষা। অনার্যরা ছিল অসভ্য, তাদের আচার ব্যবহার এবং ভাষাও ছিল তদ্রƒপ। সভ্য আর্যদের ভালো ভাষাই অনার্যদের কোমল প্রাণে ভালো লেগেছিল। তারা আর্যদের কাছ থেকে যা শিক্ষা পেয়েছিল তা ভালো ভাষা এবং  সেই ভাষাই ধীরে ধীরে দুটি সম্পূর্ণ অপরিচিত অন্তরকে ভালোবাসার সূত্রে আবদ্ধ করেছিল। এই ভালো ভাষার ওপরই দুনিয়ার সমুদয় কাজ চলে আসছে। পরম শত্রুও এই ভাষার দ্বারা বশীভূত হতে বাধ্য হয়। মানুষ তার ভাষার মধ্য দিয়েই সমাজে পরিচিত হয়। ভালো ভাষা যেমনি মানব মনকে সহজেই আকৃষ্ট করতে পারে, মন্দ ভাষা তেমনি আবার নিকৃষ্টতর করে তোলে। অতএব ভালো ভাষা ছাড়া ভালোবাসা জন্মিতে পারে না। কথায় বলে ভালো লাগা থেকেই ভালোবাসার উৎপত্তি। আবার এটাও সত্যি যে, মুখে বললেই ভালোবাসা হয় না। এর জন্য প্রয়োজন মনের গভীর অনুভূতি। তবে সেই অনুভূতি কেমন? কীভাবে হয় তার শুরু? আর উৎপত্তিস্থল? সেটাই বা কোথায়? ভালোবাসা শুধু দুটি মনের বন্ধনই নয়। এর ফলে দুটি মনেরই পরিবর্তন ঘটে। আর এই পরিবর্তনের আছে যৌক্তিক বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা। যখন কারও অন্য কাউকে ভালোলাগে তখন মস্তিষ্কে রাসায়নিক পদার্থের নিঃসরণ হয়। ফলে ব্যক্তির মনে সৃষ্টি হয় সুখানুভূতির। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, একজন ব্যক্তি অন্য কারও প্রতি আকৃষ্ট হওয়ার ক্ষেত্রে মস্তিষ্ক মোট ৪ মিনিট ৯০ সেকেন্ড সময় নেয়। গবেষকরা এটাও দেখেছেন, মানুষের মস্তিষ্ক প্রেমে পড়ার ক্ষেত্রে ব্যক্তির কিছু বিষয় বিবেচনা করে। তার মধ্যে ৫৫ শতাংশ হলো তার অঙ্গভঙ্গি বা বাহ্যিক রূপ, ৩৮ শতাংশ কণ্ঠস্বর ও কথা বলার ভঙ্গি এবং মাত্র ৭ শতাংশ তাদের মূল বক্তব্য শোনে। প্রেমের তিনটি স্তর যুক্তরাষ্ট্রের রটার্স বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হেলেন ফিসার জানান, প্রেমের তিনটি স্তর রয়েছে। এই তিনটি স্তরের প্রতিটি স্তরই ভিন্ন ভিন্ন হরমোন ও রাসায়নিক পদার্থ দ্বারা পরিচালিত হয়। স্তরগুলো হলো- ভালোবাসার ইচ্ছে, আকর্ষণ ও সংযুক্তি।  ভালোবাসার ইচ্ছে এটি প্রেমের প্রথম স্তর। যখন কাউকে ভালোলাগে তখন তাকে ভালোবাসার ইচ্ছে থেকে ছেলেদের ক্ষেত্রে টেসট্রোন ও মেয়েদের ক্ষেত্রে ইস্ট্রোজেন হরমোন নিঃসৃত হয়। আকর্ষণ কাউকে দীর্ঘদিন ধরে ভালোলাগার ফলে তার প্রতি এক ধরনের আকর্ষণ বোধ সৃষ্টি হয়। বিজ্ঞানীদের মতে এই স্তরের সঙ্গে তিনটি নিউরোট্রান্সমিটার জড়িত। এড্রিনালিন, ডোপামিন ও সেরোটোনিন। নিউরোট্রান্সমিটার হলো এক ধরনের এন্ডোজেন রাসায়নিক যা এক স্নায়ুকোষ থেকে অপর স্নায়ুকোষে সংকেত দেয়।

এড্রিনালিন
প্রেমে পড়ার প্রাথমিক পর্যায়ে এড্রিনালিন গ্রন্থি ও কর্টিসলে রক্ত সঞ্চালন বাড়ে। ফলে প্রিয় মানুষটিকে দেখলে বা তার সঙ্গে কথা বলার সময় ঘাম ঝরে, হৃৎপিণ্ডের গতি বেড়ে যায় ও গলা শুকিয়ে আসে।

ডোপামিন
হেলেন ফিসার সদ্য প্রেমে পড়া ছেলেমেয়েদের মস্তিষ্ক পরীক্ষা করে দেখেছেন যে ভালোবাসার উত্তেজনার ফলে তাদের মধ্যে উচ্চমানের ডোপামিন নিঃসরণ হয়েছে। এই রাসায়নিক পদার্থটি ব্যক্তির মধ্যে পাওয়ার আকাক্সক্ষা তৈরি করে। এক ফোঁটা কোকেন মস্তিষ্কে যে পরিমাণ উত্তেজনা সৃষ্টি করে ডোপামিনও এর ব্যতিক্রম নয়। ফিসার জানান, ডোপামিনের নিঃসরণ বেশি হলে শক্তি বাড়ে, ঘুম ও খাওয়ার চাহিদা কমে যায় ও মনোযোগ বাড়ে।

সেরোটোনিন
সর্বশেষ ও গুরুত্বপূর্ণ এই হরমোনটিই নির্ধারণ করে  যে কেন ও কখন আপনি  প্রেমে পড়বেন!

ভালোবাসা কি ভাবনার পরিবর্তন ঘটায়?
ইতালির পিজাতে একটি গবেষণায় দেখা গেছে- প্রথম  প্রেম সত্যিই ব্যক্তির ভাবনার পরিবর্তন ঘটায়। পিজা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডোনাটেলা মারাজ্জিতি বিশজন সদ্য প্রেমে পড়া যুগলের ওপর একটি গবেষণা চালান। এই গবেষণায় তিনি যাদের সম্পর্কের বয়স ছয় মাসেরও কম তাদের আহ্বান জানান। গবেষণায় তিনি দেখতে চেয়েছেন যে সারাক্ষণ ভালোবাসার মানুষটির কথা ভাবার ফলে মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা কেমন হতে পারে। গবেষণায় মারাজ্জিতি ছেলেমেয়েদের রক্ত পরীক্ষা করে দেখেছেন সদ্য প্রেমে পড়া তরুণ-তরুণীদের ও নেশাগ্রস্ত ব্যক্তির রক্তের সেরোটোনিনের পরিমাণ একই মাত্রায় রয়েছে।

ভালোবাসা অন্ধ হয়
এলেন বারসাইড দীর্ঘদিন ধরেই ভালোবাসা নিয়ে গবেষণা করেছেন। তার মতে প্রত্যেকেই প্রেমের ক্ষেত্রে আদর্শ মেনে চলে। তিনি জানান, নতুন যুগলরা স্বাভাবিকভাবে তাদের সম্পর্ককে অন্য যে কোনো সম্পর্কের তুলনায় আলাদা ও গুরুত্বপূর্ণ ভাবে। এই দৃষ্টিভঙ্গিই তাদের ভালোবাসাকে পরিণতি দিতে সাহায্য করে।

সংযুক্তি
এটি ভালোবাসার শেষ স্তর। দীর্ঘকাল একসঙ্গে থাকার পর দুজনই দুজনের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে। এ সময়টাতেই মূলত তারা ঘর বাঁধে। বিজ্ঞানীদের মতে এই অনুভূতি দুটি হরমোনের কারণে হয়। অক্সিটোসিন ও ভ্যাসোপ্রেসিন। তাহলে ব্যাপারটা কী দাঁড়াচ্ছে? ভালোবাসাও এক ধরনের বিজ্ঞান!
ভালোবাসা কথাটা ছেলে-বুড়ো সব বয়সী লোকের মুখেই শোনা যায়। ভালোবাসা বলতে সবাই কী বোঝেন তা তারাই জানেন। আজ প্রায় ৪০ বছরের অভিজ্ঞতায়ও আমি এর প্রকৃত অর্থ বুঝতে পারিনি। চেষ্টা যথেষ্টই নিয়েছি কিন্তু সাফল্যের শেষ মঞ্জিলে পৌঁছতে পারিনি। না পারার কারণও যথেষ্টই রয়ে গেছে। প্রথমত, ভালোবাসা শিক্ষার কোনো রকম আদেশ বা উপদেশ এ পর্যন্ত আমি কোনো গুরুজনের কাছ থেকে পাইনি। স্কুল থেকে শুরু করে আজ অবধি নাটক নভেল ইত্যাদি অনেক বই দেখেছি- কোথাও ভালোবাসা শিক্ষার কোনো ইঙ্গিত নেই। শুধু এইটুকুই জানতে পেরেছি যে ভালোবাসা আমাদের দেশজাত কোনো বস্তু নহে- পক্ষান্তরে এটা কোনো দূর দেশ থেকেও আমদানি করা হয় না। ভালোবাসা মনজ বস্তু বিশেষ, এটা মানুষের মনে আপনা থেকেই সময় বিশেষে জানেন এবং আপনা থেকেই সময়ের বিপর্যয়ে মনে মনেই লোপ পায়। তাই এর পুরনো বীজ আর খুঁজে পাওয়া যায় না। তা ছাড়া মনও এক রকম ক্ষেত্র নহে যে, প্রত্যেক মনে একই রকম ভালোবাসা জন্মিবে। রুচি এবং অবস্থাভেদে এর বিকাশ এবং বিলোপ হয়। ভালোবাসা নিয়ে বহু মানবী খেলা করে গেছেন, কিন্তু শেষে শুধু নিজের মাটির দেহ মাটিতেই মিশিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন। সাফল্যের শেষ মঞ্চে বিজয়ের পূর্ণ টীকা খুব কম লোকের ভাগ্যই জুটেছে। পূর্বকালের ভাস্কো দা গামা, ম্যাগলিন, কলম্বাস প্রভৃতি দেশ আবিষ্কারকগণ পৃথিবীর ইতিহাসে আজও সমভাবে উদিত আছেন। বর্তমান যুগেও বিজ্ঞান বলে অনেক কিছুই আবিষ্কার করা হয়েছে এবং হচ্ছে। কিন্তু ভালোবাসা কোত্থেকে উৎপত্তি হয়েছে, কেনই বা পূর্ণাঙ্গ না পেতেই আবার ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়, কোথায় যায়, আবার কেন অন্য মনে জন্মায়, তা আজ অবধি কোনো মহারথীই আবিষ্কার করতে সমর্থ হননি। পৌরাণিক যুগের বহু নামজাদা বৈদেশিক বণিকদের নামও আমরা জানি। প্রাণান্ত চেষ্টা করেও তারা মণিমুক্তা ইত্যাদি আহরণ করেছিলেন। কিন্তু সেই ইতিহাসই সাক্ষ্য দিচ্ছে যে, সিন্দবাদের মতো নির্ভীক এবং ধৈর্যশীল বণিকও আমাদের এ ভালোবাসারত লাভে সমর্থ হননি।  সেকালে আমাদের দামেস্কাধিপতি নবীন মহারাজ এজিদও কোটি কোটি লোককে কোরবানি করে, ধনাগার নিঃশেষ করে, এমনকি রাজধানীর বিনিময়েও তার ভালোবাসার পুতলা মাটির মানুষ জয়নাবের ভালোবাসা পাননি। এতে বুঝা যায় ভালোবাসা কৃষিপণ্য, বাণিজ্য বা বিজ্ঞান বলে লাভ করা যায় না। এটা মানুষের মনে জন্মে এবং লোপ পায়। পার্থিব সম্পদ, ধন ঐশ্বর্যের বলে বা বাহুবলে ভালোবাসা লাভ করা যায় না। যে ভালোবাসার মীমাংসা উপরিউল্লিখিত মহোদয়গণ করতে চাননি তা নিয়ে আমার মতো মানুষের মাথা ঘামানোর দরকার পড়ে না। কিন্তু আজকাল রাস্তাঘাটে, বাজারে এমনকি অফিসে পর্যন্ত এই ভালোবাসা নিয়ে কানাকানি হানাহানি চলছে। তাছাড়া সিনেমা থিয়েটার, নাটকে যা দেখানো হয় তার প্রায় প্রত্যেকটিতেই এই জাদুময়ী ভালোবাসার পরশ কাঠির ছোঁয়াচ পাওয়া যায়। সেখানে যত লোক জমা হয়, তার বোধকরি শতকরা ষাট ভাগ লোকও ভ এবং ব এই দুটি অক্ষরের বিশেষ পার্থক্য জ্ঞান রাখে না। বাঙালির ছেলে বাংলা কথার প্রকৃত অর্থ বুঝতে তেমন চেষ্টা পায়নি যেহেতু পাকিস্তান পাবার পর হতেই এর নামও হয়েছে মহব্বত। ভালোবাসা বিদেশ থেকে আমদানি হয়নি বা এদেশের মাটিতেও জন্মেনি। এটা মানুষের মনে জন্মে এবং এই মনকে এক ভালোবাসা ছাড়া জয় করতে পারে এমন কোনো শক্তিই নেই। যাপিত জীবনের একটি পর্যায়ে অনেকের কাছেই ধরা দেয় প্রেমের বারতা। তবে মানব ইতিহাসে প্রেমের এমন কিছু নিদর্শন রয়েছে যেগুলো আটপৌরে জীবনের গণ্ডিকে ছাড়িয়ে মানুষের মুখে মুখে ফেরে প্রেমের অমর গাথা হয়ে। ইতিহাস আর বহু মিথের জন্ম দেয়া এমনই কিছু অমর প্রেম।

পৌরাণিক ভালোবাসা
ভালোবাসাবাসির যে চিরায়ত ঘটনা তা কিন্তু চলে আসছে সুপ্রাচীনকাল থেকেই। এমন কি মানব ইতিহাস ছেড়ে কল্পকাহিনী আর পৌরাণিক জগতেও ভালোবাসার অবস্থান দীর্ঘদিন থেকেই। গ্রিক পুরাণের মত অনুযায়ী স্বর্গীয় দেবতা কিউপিডের তীরের আঘাতেই মানব হৃদয়ে জন্ম নেয় প্রেমের অনুভূতি। নিষ্পাপ মুখশ্রী আর সোনালি চুলের এই দেবতা তার স্বর্গীয় ধনুক থেকে তীর বর্ষণ করে দুটি হৃদয়ের দেয়াল ভেঙে দেয়। ফলে তারা চলে আসে পরস্পরের কাছাকাছি। ভালোবাসার দেবতা হিসেবে কিউপিডের যে স্বতন্ত্র অবস্থান সেটা প্রেমের প্রতি স্বর্গের এক অনন্য স্বীকৃতি বলেও মনে করেন অনেক প্রেমিক-প্রেমিকা। যদিও ভালোবাসার দেবতা কিউপিডের নিজের জন্মইতিহাসটি নিয়েই গ্রিক ও রোমান পুরাণে রয়েছে নানা বিতর্ক। কারও কারও মতে কিউপিড এর জন্ম হলো মারকারি আর ভেনাসের ঔরসে। এ ছাড়া কারও মতে মূলত মার্স ও ভেনাসের স্বর্গীয় কোলেই প্রথম হেসে ওঠে কিউপিড। মজার বিষয় হলো, ভালোবাসার দেবতা হিসেবে কিউপিডের স্বীকৃতির পেছনেও রয়েছে মজার একটি ঘটনা। ভেনাসের পক্ষ থেকে কিউপিডকে এক সময় মর্ত্যলোকে পাঠানো হয়েছিল রূপ নিয়ে গর্ব করা মেয়েদের শায়েস্তা করবার জন্য। কিন্তু মর্ত্যলোকের এক নারীর সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে কিউপিড নিজেই উল্টো তার  প্রেমে পড়ে যান। অন্যকে ঘায়েল করবার পরিবর্তে তীর ওঠান নিজের শরীরের দিকেই। কিউপিডের এই পদক্ষেপে ক্ষুব্ধ হয়ে ভেনাস তাকে নানা কূটকৈৗশলের মাধ্যমে শাস্তি দেবার চেষ্টা করেন। তবে এতে দমে না দিয়ে জের ভালোবাসা দিয়েই এক সময় সবকিছু জয় করে নেয় কিউপিড। আর এ কারণেই শত প্রতিবন্ধকতার মাঝে ভালোবাসার বন্ধনে অবিচল থাকার প্রতীক হয়ে ওঠে কিউপিড।

রাধাকৃষ্ণ
যুগে যুগে অমর প্রেম নিয়ে যত গল্পগাথা রচিত হয়েছে তার মধ্যে রাধাকৃষ্ণকে নিয়ে রচিত হয়েছে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক পদাবলি কীর্তন, পালাগান আর লোকসংগীত। বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থে কৃষ্ণকে মূলত পাওয়া যায় পরোপকারী, ধার্মিক ও প্রেমিক এই তিন রূপে। এর মধ্যে কৃষ্ণের প্রেমিক রূপের পরিচয় পাওয়া যায় তার বৃন্দাবন লীলায়। হিন্দুশাস্ত্র মতে বিষ্ণু অবতাররূপী দ্বাপরযুগে পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করেন কৃষ্ণ। অন্যদিকে রাধা ছিলেন বৃষভানুর কন্যা। যৌবনে আয়ান ঘোষের সঙ্গে বিয়ে হয় রাধার। কিন্তু রাধার জীবনের একটি বড় সময়ই কাটে কৃষ্ণের বিরহ আর প্রেমে। কৃষ্ণের প্রতি রাধার যে প্রেম সেখানে এক হয়ে মিশেছে পরমাত্মা আর জীবাত্মা। আর পরমাত্মার সঙ্গে এই প্রেমের সম্পর্ক তথা কৃষ্ণলীলার কারণেই এক গোয়ালার কন্যা রাধা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছেন ইতিহাসে।

লাইলী-মজনু
নানা সময়ে মানুষের মুখে মুখে ফিরেছে যে ভালোবাসার গল্পগুলো তার মধ্যে লাইলী-মজনুর অমর  প্রেমগাথা আলোচিত হয়েছে সবচেয়ে বেশি। যদিও কালজয়ী এই প্রেমের কাহিনীর সত্যাসত্য নিরূপণ করা এখন অনেকটাই কষ্টসাধ্য। সময়ের বিবর্তনে নানা জাতি আর নানা দেশের মানুষের মুখে মুখে লাইলী-মজনুর গল্প বিবর্তিত হয়েছে নানাভাবে। যদিও অধিকাংশ কাহিনীতেই নায়ক মজনু আবির্ভূত হয়েছেন একজন রাজপুত্র ও কবি হিসেবে। অন্যদিকে লাইলীর পরিচয় হিসেবে বেদুইন সর্দারের মেয়ের পরিচয়টিই সবচেয়ে বেশি এসেছে। ইতিহাসবিদদের একটি অংশ মনে করেন মজনু নামের আড়ালে হারিয়ে যাওয়া প্রেমিক পুরুষটি প্রকৃতপক্ষে প্রাচীন আরবের বিখ্যাত কবি কয়েস বিন আমর। এদের ধারণা অনুযায়ী আরবিতে মজুনু বা মাজনুন শব্দটির অর্থ  প্রেমে উন্মাদ বলেই কয়েস এর নাম কালক্রমে মজনু হিসেবে পরিচিতি পায়। কয়েস ওরফে মজনু ছিল আল বাহরামের সুলতান আমর বিন আবদুল্লাহর পুত্র। সুলতান রাজ্যচ্যুত হওয়ার পর কয়েসকে সঙ্গে নিয়েই আশ্রয় নেন একটি সরাইখানায়। আর সে সময়ই কয়েস প্রেমে পড়েন হিজ্জা সর্দার আল মাহদীর কন্যা লায়লা ওরফে লাইলীর। কয়েসের সব কবিতাই ছিল এই লায়লাকে নিয়ে। লায়লা আর কয়েসের এই প্রেমের মাঝে বাধা হয়ে দাঁড়ায় বুরিদানের বাদশা নওফেল। অসামান্য রূপসী লায়লাকে একবার দেখেই তার প্রেমে পড়ে যায় নওফেল। লায়লাকে পাওয়ার জন্য নানান কৌশলও করতে থাকে সে। তবে পশুপ্রেমিক লায়লার পোষা হরিণ জিন্দান শিকারি নওফেলের তীরবিদ্ধ হয়ে মারা গেলে প্রেমের পরিবর্তে লায়লার অভিশাপই জোটে নওফেলের ভাগ্যে। জিন্দানের শোকে মুহ্যমান লায়লা কামনা করে নওফেলের অপমৃত্যু। এরই মাঝে শাহজাদা কয়েস আর রূপবতী লায়লার বিয়ের সব আয়োজন সম্পন্ন হয়। তবে এরই মাঝে একটি ভিন্ন ঘটনা লাইলী-মজনুর প্রেমকে ঠেলে দেয় বিরহের প্রান্তরে। বিয়ের আসরে লায়লার পোষা কুকুর ওজজাকে দেখে ব্যাকুল কয়েস বলে ওঠে ‘এই মুখে তুই লায়লার পায়ে চুমু খেয়েছিস!’ আর এরপরই প্রেমের অতিশয্যে ওজজার মুখে চুমু খেয়ে বসে কয়েস। কয়েসের এই কাণ্ড দেখে উপস্থিত সবাই তাকে পাগল ভাবতে থাকে। বেঁকে বসেন স্বয়ং বাদশাহও। বিয়ের আসর থেকে অপমানিত হয়ে কয়েস নিরুদ্দেশ হয় মরুভূমির পথে। অন্যদিকে কোনো উপায়ান্তর না দেখে লায়লার পিতা সওদাগর আল মাহদি কুচক্রী নওফেলের সঙ্গেই লায়লার বিয়ের উদ্যোগ নেন। তবে ফুলশয্যার রাতে অবিশ্বাস্যভাবে ফলে যায় লায়লার দেয়া অভিশাপ। নিজের হাতে পান করা শরবতের বিষক্রিয়ায় মারা যায় নওফেল। আর পোষা কুকুর ওজজাকে নিয়ে রাতের অন্ধকারে পালিয়ে যায় লায়লা। প্রিয়তম কয়েসের খোঁজে মরুভূমির মরীচিকার মাঝে ঘুরতে থাকে লায়লা। কিন্তু সেই রাতের সাইমুম মরু ঝড়ে রচিত হয় লাইলী-মজনুর প্রেমের সমাধি। পরদিন পথচলতি কাফেলা বালির স্তূপের নিচে আবিষ্কার করে লায়লা, কয়েস আর কুকুর ওজজার মরদেহ।

শিরি-ফরহাদ
লাইলী-মজনুর অমর প্রেমগাথার মতো শিরি ফরহাদের প্রেমের কথাও যুগে যুগে ফিরেছে বহু মানুষের মুখে। তবে নানা বিবর্তনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে প্রাচীন এই ইরানি লোকগাথাটিকেও। এর মধ্যে সবচেয়ে সমর্থনযোগ্য যে সূত্রগুলো পাওয়া যায় তাতে শিরিনকে দেখানো হয়েছে রানী বা রাজকন্যা হিসেবে। তবে নায়ক ফরহাদের পরিচয় দিতে যেয়ে কেউ তাকে উল্লেখ করেছেন বাঁধ নির্মাতা হিসেবে, আবার কেউবা তাকে আখ্যায়িত করেছেন স্থপতি বা ভাস্কর হিসেবে। এক্ষেত্রে যেসব ইতিহাসবিদ ফরহাদকে বাঁধ নির্মাতা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন তাদের যুক্তি হলো ফরহাদ শব্দটি হলো ‘বৃত্ত’ বা বাঁধের কাছাকাছি। এই ধারায় বিশ্বাসীদের বর্ণিত কাহিনীতে দেখা যায় নায়িকা শিরি এক সময় ফরহাদকে বলেছিল যে, ‘তুমি যদি ওই নদীতে বাঁধ  তৈরি করতে পারো তাহলেই আমাকে পাবে।’ ফরহাদ শিরিকে পাবার জন্য এই অসম্ভবকে সম্ভব করার আশায় কাজে নামে। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে বাঁধ ভেঙে জলের তোড়ে মারা যায় ফরহাদ। আর তার দুঃখে শিরিও পানিতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করে। অন্যদিকে আরেকটি নির্ভরযোগ্য কাহিনীতে ফরহাদকে দেখানো হয়েছে হতভাগা এক ভাস্কর হিসেবে। ফরহাদের বিশ্বাস এবং গর্ব ছিল যে তার বানানো মূর্তির চেয়ে সুন্দর দুনিয়ার আর কিছুই হতে পারে না। কিন্তু হঠাৎ করে কোহে আরমান রাজ্যের রাজকন্যা শিরির হাতে আঁকা একটি ছবি দেখে সেই অহঙ্কার চূর্ণ হয়ে যায় ফরহাদের। শিরির রূপে পাগল প্রায় ফরহাদ তখন একের পর এক শিরির মূর্তি গড়তে শুরু করেন। একদিন উন্মাদ প্রায় ফরহাদের সঙ্গে সামনাসামনি দেখাও হয়ে যায় শিরির। কিন্তু রাজ্য আর ক্ষমতার কথা চিন্তা করে ফরহাদকে ফিরিয়ে দেয় শিরি। তবে শিরির এই প্রত্যাখ্যান যেন ফরহাদের মনে নতুন করে জ্বালিয়ে দেয় প্রেমের আগুন। বেসাতুন পর্বতকে শিরির স্মৃতি ভাস্কর হিসেবে গড়ে তুলতে কঠোর পরিশ্রম শুরু করে সে। ফরহাদের এই ঘটনা শুনে শিরিও স্থির থাকতে পারে না। সিংহাসন তুচ্ছ করে সে ছুটে যায় বেসাতুন পর্বতে ফরহাদের কাছে। পরবর্তীতে এক ভূমিকম্পে দুজনই একসঙ্গে প্রাণ হারায়।

ইউসুফ জুলেখা
ভাগ্যের পথ পরিক্রমায় একসময় দাস হিসেবে আজহার নামের এক শস্য ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রি হয়ে যান বালক ইউসুফ। আর এই আজহারের সঙ্গে ঘটনাক্রমে রাজপ্রাসাদে গিয়েই তার পরোপকার বৃত্তির গুণে চোখে পড়ে যান শস্য অধিকর্তা আজিজের। এদিকে স্বামীর মুখেই জুলেখা প্রথম শোনেন ইউসুফের কথা। পরে ইউসুফের রূপে মুগ্ধ হয়ে তাকে নিজেদের বাগানের মালি হিসেবেও নিয়োগ দেন জুলেখা। দিনে দিনে ক্রমেই ইউসুফের প্রতি আসক্তি বাড়তে থাকে সুন্দরী জুলেখার। কিন্তু ইউসুফ এই প্রেমকে অন্যায় জেনে প্রত্যাখ্যান করেন। আর প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হবার এই অপমান সইতে না পেরে জুলেখা সম্ভ্রমহানির অভিযোগ আনেন ইউসুফের বিরুদ্ধে। তার অভিযোগ অনুযায়ী বন্দী করা হয় ইউসুফকে। এদিকে বন্দী থাকা অবস্থাতেই স্বপ্নের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দিয়ে ফারাও রাজের বিশ্বস্ততা অর্জন করেন ইউসুফ। একসময় ভুল বুঝতে পেরে জুলেখাকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দিতেও উদ্যত হন বাদশা। তবে ইউসুফের অনুরোধে তাকে প্রাণে না মেরে নির্বাসনে পাঠানো হয়। আর ইউসুফকে নিযুক্ত করা হয় শস্য অধিকর্তা। এরই মাঝে কেটে যায় আরও কিছুদিন। ঘটনাক্রমে ইউসুফ আবারও দেখা পান জুলেখার। কিন্তু এবার জুলেখাই ফিরিয়ে দেন ইউসুফকে। সময় চান আরও ১৪ বছর। তবে ১৪ বছর পর আর দেখা হয়নি ইউসুফ জুলেখার।
ভালোবাসা পৌরাণিক জাগতিক দৈহিক শৈল্পিক যে নামেই অভিহিত করা হোক না কেন তা যে এক মহাশক্তি তা বারবার প্রমাণিত হয়েছে ইতিহাস থেকে আজ পর্যন্ত। পৃথিবীর আজ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত সত্যি শব্দের নাম ভালোবাসা। এর কোনো জাতপাত শ্রেণী বৈষম্য নেই। যে কেউ যে কারও প্রেমে পড়তে পারে যে কোনো সময়। ওয়ান মে ফল ইন লাভ উইথ এনিবডি। ভালোবাসাকে মাহাত্ম্য দেয়ার জন্যে তার আগে যোগ করা হয় ডিভাইন শব্দটি। যার অর্থ স্বর্গীয় ভালোবাসা। ভালোবাসা তাই এক অনির্বচনীয় অনুভূতির নাম। দিন শেষে পৃথিবীতে টিকে থাকে শুধুই ভালোবাসা- বাকি সব কিছু মিথ্যে অসার। তাই সহজেই বলা যায়- ভালোবাসা ছাড়া আর আছে কী?

সাপ?তাহিক পতিবেদন

 মতামত সমূহ
পিছনে 
 আপনার মতামত লিখুন
English বাংলা
নাম:
ই-মেইল:
মন্তব্য :

Please enter the text shown in the image.