কৌশলগত লড়াই -আনিস রায়হান

Print Friendly and PDF

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে প্রধান দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে কৌশলগত লড়াই চলছে অনেকদিন ধরে। ২০১৪ সালের আলোচিত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর প্রথম এক বছর টানা মাঠে থাকার চেষ্টা করেছে বিএনপি। কিন্তু ২০১৫ সালে তীব্র আন্দোলন করেও সফলতার মুখ না দেখলে পরে বিএনপি তার অবস্থান পরিবর্তন করে। সেই থেকে মাঝের তিন বছর প্রধান দুই দল একে অপরের বিরুদ্ধে কৌশলগত লড়াই চালিয়ে গেছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে একে অপরের মুখোমুখি হয়নি।
আওয়ামী লীগ দাবি করেছে, বিএনপির আর কিছু করার শক্তি নেই। বিএনপি দাবি করেছে, তারা নির্বাচনমুখী ও গণতান্ত্রিক দল- তাই শান্তিপূর্ণভাবে সরকারকে মোকাবিলা করার পথ খুঁজছে। এসব দাবি ও বাস্তবতার মধ্যে অসঙ্গতি যাই থাকুক, দেশবাসী অন্তত কিছুদিন যেন হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছে। দুই দলের কোন্দলে যেভাবে জীবন-জীবিকা বিপন্ন হয়েছে, তাতে মানুষ আতঙ্কিত ও ক্ষুব্ধ। দুই দলের কর্মকাণ্ড নিয়ে জনগণের বিভিন্ন অংশ থেকে নানা অভিযোগ থাকলেও গত তিন বছর যে তারা মুখোমুখি অবস্থানে গিয়ে বড় ধরনের কোনো সংকট জন্ম দেয়নি, এতেই অনেকে খুশি। এটা নির্দেশ করে যে, শাসক শ্রেণীর দলগুলোর প্রতি জনগণের আস্থার বাস্তব অবস্থা কোন পর্যায়ে! মানুষের প্রত্যাশা যদিও খুবই সীমিত, তবু তার জোগানও মেলে না। বড় দুই দলের কৌশলী রাজনীতির ফলে মানুষ যে একটু আতঙ্কমুক্ত হয়েছিল, তাও যেন এখন শেষের পথে।
পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলার বিচারকাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। এ মামলায় খালেদা জিয়ার পুত্র ও বিএনপির দ্বিতীয় শীর্ষ নেতা তারেক রহমানও আসামি। দ্রুতই এগিয়ে আসছে এ মামলার রায়। একই আদালতে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট বিষয়ক দুর্নীতির আরেকটি মামলার বিচারকাজও দ্রুত এগোচ্ছে। এই মামলা দুটিকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ঘোলাটে হয়ে উঠছে। দুই দলের কৌশলগত ধৈর্যের পর্ব যেন শেষ হতে চলেছে। মাঠপর্যায়ে সংগঠন ও কর্মসূচি উভয় পক্ষের কাছেই আবার প্রধান হয়ে উঠছে। এই মুখোমুখি অবস্থান শেষ পর্যন্ত কোন দিকে যায়, তা নিয়ে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বাড়ছে। এটা আরও উদ্বেগ সৃষ্টি করছে, কারণ এখন পর্যন্ত যা কিছু ঘটছে, ইতিবাচক কোনো লক্ষণ তাতে দেখা যাচ্ছে না।

১.
নির্বাচন ঘিরে সরকারের পরিকল্পনা সম্পর্কে বিএনপির যে আশঙ্কা, তার সঙ্গে অন্যদের মতপার্থক্য কমই। বিএনপি বরাবরই দাবি করে আসছে, সরকার ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য গতবার নিজেদের অধীনে নির্বাচন করেছে, এবারও তারা সেটাই চাচ্ছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের রায়ে এ ব্যবস্থা আরও দুই মেয়াদে চালিয়ে নেয়ার ব্যাপারে আদালত যে পর্যবেক্ষণ দিয়েছিল, বিএনপি তার ওপরে ভর করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি করে আসছে। কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক প্রশ্নে আওয়ামী লীগের অনড় অবস্থানে শেষ পর্যন্ত তারা তত্ত্বাবধায়ক বাদ দিয়ে কখনও কখনও ‘জাতীয় সরকার’ বা ‘সহায়ক সরকার’-এর কথাও বলেছে। কিন্তু এই দাবি তারা কখনও ত্যাগ করেনি যে, দলীয় সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচন হবে না।  
বিএনপি নেতাদের দাবি, দেশের অন্য রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ ও জনগণ এই দাবিতে একমত হলেও আওয়ামী লীগ চাইছে বিগত ৫ জানুয়ারির মতোই আরেকটি নির্বাচন করতে। সরকার এখন পর্যন্ত এই দাবিকে ভুল প্রমাণের মতো কিছু করেনি। যদিও সরকার সুষ্ঠু নির্বাচন ও দেশকে এগিয়ে নেয়ার কথা বলছে, কিন্তু সেজন্য নির্বাচনী ব্যবস্থায় কোনো পরিবর্তন প্রয়োজন আছে বলে তারা মনে করে না। ফলে দুই দলের মধ্যে নির্বাচন প্রশ্নে কোনো মতৈক্য বা সমঝোতার সম্ভাবনা এখনও দেখা যাচ্ছে না। নির্বাচন যত এগুচ্ছে, রাজনৈতিক সংকট যত ঘনীভূত হচ্ছে, মাঠপর্যায়ে দুই পক্ষের কর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা তত বাড়ছে।

২.
বিএনপির কর্মীরা মনে করছে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে ক্ষমতার বাইরে থাকায় তাদের সামাজিক ও আর্থিক সক্ষমতা অনেকখানি তলানির দিকে। এ অবস্থায় যদি আসন্ন নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় না আসা যায়, যদি আওয়ামী লীগ আরও এক মেয়াদে ক্ষমতায় থাকতে পারে, তাহলে বিএনপির পক্ষে অস্তিত্ব বজায় রাখাই কঠিন হয়ে পড়বে। ফলে বিএনপির সমর্থক ও নেতা-কর্মীরা সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে। বিএনপির উচ্চপর্যায়েও এ নিয়ে কাজ চলছে। কেন্দ্র থেকে মাঠপর্যায় পর্যন্ত সকল স্তরে দলের ঐক্য আরও দৃঢ় করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের মধ্যেকার দূরত্ব কমাতে চেয়ারপার্সনের নির্দেশে বিবদমান নেতারা বৈঠকে বসছেন।
মাঠপর্যায়ের সাংগঠনিক কাঠামো পুনর্গঠনের জন্যও কাজ করছে বিএনপির নেতৃত্ব। প্রথম সারির নেতাদের নিষ্ক্রিয়তায় দলটির দ্বিতীয় সারির নেতারা ইতোমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় উঠে এসেছেন। ইদানীং ঢাকার রাজপথে বিভিন্ন কর্মসূচি সফল করার ক্ষেত্রে এই দ্বিতীয় সারির নেতাদেরই সামনে দেখা গেছে। ঢাকা মহানগর বিএনপির সভাপতি হাবিব-উন নবী খান সোহেল, মহানগর দক্ষিণের জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি শামসুল হুদা, সহ-সভাপতি নবী উল্লাহ নবী, কেন্দ্রীয় নেতা হাবিবুর রশীদ হাবিব, মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কাজী আবুল বাশারসহ একগুচ্ছ নেতাকর্মী ঢাকাভিত্তিক সাংগঠনিক সামর্থ্য বিকশিত করার জন্য কাজ করছে। এদের উদ্যোগে ইতোমধ্যে ঢাকা মহানগর উত্তরে দক্ষিণখান, উত্তরখান, পল্লবী, তুরাগ ও রামপুরা থানা এলাকায় বিএনপির কর্মকাণ্ডে গতি এসেছে। ঢাকা মহানগর দক্ষিণে কামরাঙ্গীরচর, কেরানীগঞ্জ, পুরান ঢাকা, যাত্রাবাড়ী ও পল্টন থানার বিএনপি প্রভাবিত ভোটব্যাংক এলাকাগুলোয় কার্যক্রমে গতি আনতে দলের নীতিনির্ধারকরা মনোযোগী হয়েছেন। খালেদার মামলাকে কেন্দ্র করে এসব এলাকার নেতা-কর্মীরা সরব, সক্রিয় ভূমিকা নিতে পেরেছে। দলের অঙ্গ সংগঠনগুলোকেও সক্রিয় করার চেষ্টা চলছে। সম্প্রতি ছাত্রদলকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মিছিল করতে দেখা গেছে।
বিএনপির এই ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা আওয়ামী লীগ সহজে হতে দেবে না। ফলে পুলিশের ব্যবহার হচ্ছে- ৩০ জানুয়ারি থেকে ৫ দিনের মধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছেন বিএনপির প্রায় ৫০০ নেতাকর্মী। পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকায় আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা বিএনপি কর্মীদের রুখে দাঁড়াচ্ছেন। দলটির অন্যতম মুখপাত্র ড. হাছান মাহমুদ প্রকাশ্যেই নেতা-কর্মীদের এই ভূমিকা নিতে আহ্বান জানিয়েছেন। সম্প্রতি খালেদা জিয়ার মামলার রায়কে কেন্দ্র করে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে এক বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘৭, ৮ ও ৯ ফেব্রুয়াারি আমরা রাজপথে থাকব। যদি আবারও শ্রমজীবী মানুষের ওপর পেট্রলবোমা নিক্ষেপ করা হয়, হামলা করা হয়, সেই হামলা প্রতিহত শুধু নয়, হামলাকারীদের ধরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে তুলে দিতে হবে।’ দলের অন্য নেতাদের প্রতিক্রিয়াও একই রকম।

৩.
বিএনপির প্রথম সারির নেতাদের নিষ্ক্রিয়তা ও তাদের নিয়ে যে আস্থাহীনতা, এটা এখনও দলটির জন্য বড় আশঙ্কার জায়গা। দলের সিনিয়র নেতাদের বড় একটি অংশ নিষ্ক্রিয়। কারও কারও সঙ্গে সরকারের যোগাযোগ আছে বলেও আশঙ্কা করা হয়। সরকার বিএনপিকে ভেঙে ফেলবে এবং দলের একটি অংশকে নির্বাচনে নিয়ে নিজেদের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করবে বলে মনে করেন বিএনপি নেতারা। ফলে এ ধরনের একটি দলের অভ্যন্তরে সিনিয়র নেতাদের মধ্যে যে কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষা করা হয় তা এখন খুব দুর্বল। সবাই একে অপরকে সন্দেহ করছে। এমনকি কর্মসূচির আগে নেতাদের গ্রেপ্তার হওয়া নিয়েও দলের মধ্যে এমন মত আছে যে, কোনো কোনো নেতা পুলিশকে হাত করে নিজেরাই জেলে ঢোকেন, যাতে নিরাপদে থাকা যায়।
এই পরিস্থিতি বিএনপির জন্য অশনি সংকেত। ফলে প্রতিপক্ষের পরিকল্পনা ভণ্ডুল করতে দলটি নানামুখী উদ্যোগ নিচ্ছে। বিএনপির গঠনতন্ত্রের ৭ নম্বর ধারার ‘ঘ’তে বলা ছিল, ‘সমাজে দুর্নীতিপরায়ণ বা কুখ্যাত বলে পরিচিত ব্যক্তি’ বিএনপির কোনো পর্যায়ের কমিটির সদস্য কিংবা জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের প্রার্থীপদের অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন। এই ধারাটি ফেলে দিয়ে নির্বাচন কমিশনে সংশোধিত গঠনতন্ত্র জমা দিয়েছে বিএনপি। দলের উচ্চপর্যায়ের নেতারা গণমাধ্যমে জানিয়েছেন যে, তাদের কাছে তথ্য আছে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপিকে ভাঙতে সরকারের একটি মহল থেকে চেষ্টা-তৎপরতা চালানো হবে। এই আশঙ্কার কারণে গঠনতন্ত্রের ৭ ধারাটি তুলে দেয়া হয়েছে।
৩ ফেব্রুয়ারি বিএনপির বর্তমান জাতীয় কার্যনির্বাহী কমিটির প্রথম সভায় দেয়া বক্তৃতায় খালেদা জিয়াও একই ইঙ্গিত করেছেন। দল ভাঙার চেষ্টা হলে কোনো ক্ষমা হবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, ‘যারা সকল আন্দোলন-সংগ্রামে ছিল, যারা কাজ করেছে, যারা দলের সঙ্গে বেইমানি করেনি, দলে তাদের ভালো ভালো জায়গায় অবস্থান দেওয়া হবে। ভবিষ্যতে যদি সুষ্ঠু নির্বাচন হয়, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হয়, তাহলে বিএনপি ক্ষমতায় গেলে অবশ্যই তারা মূল্যায়ন পাবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘কিন্তু যারা বেইমানি করবে, এক পা এদিকে, আরেক পা ওদিকে রাখবে, তাদের কোনো মূল্যায়নের জায়গা নেই।’ আগে ক্ষমা করার উদাহরণ টেনে খালেদা জিয়া বলেন, ‘তারপরও আমরা কিন্তু ক্ষমা করেছি। ক্ষমা একবার হয়, বারবার হয় না।’
বিএনপির জন্য এই পরিস্থিতি আশঙ্কার, কারণ দলনেত্রী না থাকলে নীতিনির্ধারণী ফোরামই সব সিদ্ধান্ত নেবে। কিন্তু বর্তমানে সক্রিয় তরুণ নেতৃত্ব এখনও এতদূর আসতে পারেনি। ফলে খালেদার অনুপস্থিতিতে দল চালাবেন পুরনোরাই। তারা যদি আগের মতোই অদূরদর্শী কাজ কারবার করেন, আর বিকল্প নেতৃত্ব তারেক রহমান যদি সে সময় সঠিক সিদ্ধান্ত না নিতে পারেন, যদি তরুণ নেতৃত্বের যোগ্যতাকে কাজে লাগানো না যায়, তাহলে বিএনপি আরও বড় বিপদে পড়বে। দলটির নেতারা মনে করছেন, ভেতরের এই বিপদ আওয়ামী লীগকে মোকাবিলার চেয়েও বেশি কঠিন। দলের নির্বাহী কমিটির সভায় তৃণমূল নেতাদের বক্তব্যেও দেখা গেছে এই আশঙ্কাই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।

৪.
দৈনিক প্রথম আলো ২১ জানুয়ারি ২০১৮ তে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ‘সরকারসংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, মামলা দুটির রায় সামনে রেখে সরকার নতুন আইন করার চিন্তাও করছে। যাতে কারও বিচারিক আদালতে সাজা হলে পরবর্তী পাঁচ বছর নির্বাচনের জন্য তিনি অযোগ্য হন। এ লক্ষ্যে আইনের একটি খসড়া তৈরির কাজ চলছে। অবশ্য এই চিন্তা এখনো চূড়ান্ত নয়। এটা নির্ভর করবে সামনের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের ওপর।’ বিএনপির নীতিনির্ধারকরাও এমনটাই মনে করছেন। তাদের মতে, জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট ও জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলা দুটি হলো সরকারের ‘নির্বাচনী ঘুঁটি’। খালেদা জিয়াকে নির্বাচনে অযোগ্য করে নির্বাচনে যাওয়ার পরিকল্পনা সরকারের। এই পরিস্থিতিতে দলের একটি পক্ষ নিয়মতান্ত্রিক কর্মসূচি চালিয়ে নির্বাচন পর্যন্ত যেতে চায়। তবে আরেকটি পক্ষ দলীয় প্রধানের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক রায় হলে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখানোর পক্ষে। তারা খালেদা জিয়াকে বাইরে রেখে বিএনপির নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিরোধী। এই প্রশ্নটি এখনও সমাধান হয়নি।
বাংলাদেশের রাজনীতির যা ধারা, তাতে বিএনপি কর্মীরা মনে করে আওয়ামী লীগ দলীয় প্রধানের জেদের জেরেই খালেদার বিরুদ্ধে এই বিচার। ইতিহাস বলে, এই অবস্থায় বিএনপি বসে থাকবে না, তারাও পাল্টা জেদ ধরবে। বিএনপি খালেদাকে ছাড়া নির্বাচনে যেতে চাইবে না। বিএনপি কর্মীরা তারেককে নির্বাচনে পাচ্ছে না, এ অবস্থায় খালেদাকেও তারা হারাতে চাইবে না। এটা ঘটলে দলে জিয়া পরিবারের নিয়ন্ত্রণও খর্ব হওয়ার আশঙ্কা আছে। জেদাজেদির এই রাজনীতি নিঃসন্দেহে পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলবে।
তবে বিএনপি এই অবস্থার সুযোগ নিতে চায়। খালেদা জিয়ার প্রতি দেশের মানুষের সমবেদনাকে তারা কাজে লাগাতে আগ্রহী। দলটির নেতারা তাই এসব বিষয়কে সামনে এনে কর্মীদের উজ্জীবিত করছেন এবং দেশবাসীর সমর্থন আদায়ের চেষ্টা চালাচ্ছেন। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ সম্প্রতি বলেছেন, ‘আমরা আগে বলেছি, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড থাকতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর প্রচারাভিযান লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের নমুনা নয়। এখন দেখা যাচ্ছে প্রধানমন্ত্রী আনুষ্ঠানিক সিলেটে ভোট চাইছেন, আর আমাদের আদালতের বারান্দায় ঘুরতে হবে।’

৫.
বিএনপি ঝুঁকি কমাতে চায়, কিন্তু ভরসা করার মতো কাউকে পাচ্ছে না। দলটির অন্যতম পরামর্শদাতা গণস্বাস্থ্যের প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি জাফরুল্লাহ চৌধুরী সম্প্রতি এক বক্তৃতায় মওলানা ভাসানীর মতো সম্মিলিত বিরোধী দল বা যুক্তফ্রন্ট গঠন করতে খালেদা জিয়াকে পরামর্শ দিয়েছেন। এজন্য বড় দলের অহমিকা ত্যাগ করে ছোট দলগুলোকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি। এর কিছুদিন বাদে জাতীয় নির্বাহী কমিটির সভায় দেয়া বক্তৃতায় খালেদার কণ্ঠেও একই ধ্বনি শোনা গেছে। তিনি বলেন, ‘গুম, খুনের বিরুদ্ধে দেশের জনগণ জেগে উঠবে, ২০ দল জেগে উঠবে। সকল রাজনৈতিক দলকে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার আহ্বান জানাই। আজ দেশের এই অবস্থায় জাতীয় ঐক্য অনেক বেশি প্রয়োজন। আমরা কে কী পেলাম, সেটা বড় কথা নয়। আমাদের পাওয়া ওটাই হবে, যদি জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলে দেশটাকে রক্ষা করতে পারি, তবে সেটাই হবে সবচেয়ে বড় পাওয়া।’
জাতীয় ঐক্য বা বৃহত্তর জোটের আকাক্সক্ষা থাকলেও তা বাস্তবায়নের সুযোগ কম। বিকল্প শক্তি হিসেবে অভিহিত ছোট দলগুলোকে নিয়েও বিএনপি নেতৃত্বের আগ্রহ কম। এসব দলের নেতারা যতখানি হেভিওয়েট, তাদের সমর্থন-সামর্থ্য সেই তুলনায় নিতান্তই নগণ্য। দলের অভ্যন্তরে আগ্রহ আছে হেফাজতকে পাশে পাওয়ার। কিন্তু সরকারের সঙ্গে তাদের সংযোগ নিয়েও দুশ্চিন্তা আছে বিএনপির। ফলে জোটের ডাক দিলেও তেমন কোনো উদ্যোগ বিএনপি নিচ্ছে না। এমনকি সুশীল সমাজের সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক এখন খুব ভালো যাচ্ছে না জানলেও, তাদের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের কথা ভাবলেও এখনও তাতে খুব একটা সুবিধা করে ওঠা যায়নি। একই অবস্থা বামপন্থিদের ক্ষেত্রেও। এরা বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ হতে চায় না, আবার তেমন পথে হাঁটলে বিএনপির ঝুঁকিও আছে। এতে জামায়াতের সমর্থন নিয়ে যেমন ঝামেলা হবে, তেমনি বিএনপির অভ্যন্তরীণ সমর্থকরাও অনেকে গোস্বা হবে।
অবশ্য নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রভাবশালী কয়েকটি দেশের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করছে বিএনপি। দলটির অধিকাংশ নেতা মনে করেন, বিগত নির্বাচনের মতো আরও একটি নির্বাচন সরকার করতে পারবে না। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় নিশ্চয়ই হস্তক্ষেপ করবে। এজন্য খালেদার মামলাসহ বিভিন্ন বিষয় প্রভাবশালী দেশগুলোর কূটনীতিকদের জানানো হচ্ছে। ৩০ জানুয়ারি বিএনপি কার্যালয়ে এমনই এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। ওই বৈঠকে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলাটি ‘সাজানো’ ও ‘বানোয়াট’ বলে কূটনীতিকদের কাছে তুলে ধরা হয়। এছাড়া জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত করার বাধা, বর্তমান সংসদ ভেঙে দিতে সরকারের অনীহা, সবার জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি না করা, নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপি কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা-হামলা বেড়ে যাওয়ার বিষয়গুলোও কূটনীতিকদের সামনে তুলে ধরে দলটি। বৈঠকে ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, চীন, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, জার্মানি, ইতালি, স্পেন, মরক্কো, ডেনমার্ক, নেদারল্যান্ডস, কুয়েত, সৌদি আরব এবং ভ্যাটিক্যান সিটির কূটনীতিকরা উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এবং যুক্তরাষ্ট্রের দাতা সংস্থা ইউএসএআইডির প্রতিনিধিরা বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।

৬.
আওয়ামী লীগ যদিও প্রায় এক দশক ধরে ক্ষমতায় তাদের কর্মীরা তবু স্বস্তিতে নেই। বিএনপি নির্বাচনে জিতলে, সরকার গঠন করলে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের নজিরবিহীন দুর্ভোগ পোহাতে হবে বলে তারা মনে করেন। দুই দলের মধ্যে প্রতিহিংসার রাজনীতি এই এক দশকে যে পরিমাণ তীব্র হয়েছে, তার ফলাফল ভোগ করতে হবে প্রধানত লীগের কর্মীদেরই। খালেদাকে বাড়িছাড়া করা, তার পুত্র কোকোর মৃত্যু, তারেক রহমানকে দেশের বাইরে থাকতে বাধ্য করাসহ বিএনপি নেতাদের গুম-খুনের পাল্টা প্রতিক্রিয়ার ভয় আওয়ামী লীগ সমর্থকদের মধ্যে রয়েছে। ফলে বিএনপির ক্ষমতায়ন যাতে না ঘটে, সেজন্য যেকোনো কিছু করতে দলটির নেতা-কর্মীরা একমত।
আওয়ামী লীগ নেতারা যদিও দলের ঐক্য নিয়ে ব্যাপক আশাবাদী, কিন্তু সরকারের গত মেয়াদের শেষ দিকের ঘটনাবলি ভিন্ন ইঙ্গিত দেয়। ক্ষমতার শেষ দিকে আওয়ামী লীগে আতঙ্ক বেড়ে গিয়েছিল, বেড়েছিল অভ্যন্তরীণ কোন্দল। দলের অভ্যন্তরের অনেক চাপা দ্বন্দ্ব তখন প্রকাশ্যে আসতে দেখা গেছে। দল আগামীতে নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় আসতে পারবে কিনা সেই নিশ্চয়তা পাওয়া যাচ্ছিল না, তাই অনেকেই বসে গেছেন হিসাবনিকাশ গুটিয়ে ফেলতে। অবৈধ ব্যবসা-বাণিজ্য, টেন্ডারবাজি, মাদক ও অস্ত্র সরবরাহকেন্দ্রিক হিসেব-নিকাশ সমাধা করতে গিয়ে মুখোমুখি সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছে বিভিন্ন গ্রুপ। অনেকে আর যে কয়দিন আছে তার মধ্যেই আরও আয় বাড়িয়ে নিতে চালিয়েছে জোর তৎপরতা। নির্বাচন উপলক্ষে নতুন পুরনো প্রার্থীদের মধ্যেকার দ্বন্দ্ব-গ্রুপিং বাড়ার ফলেও পরিস্থিতি খারাপ হয়েছে। সে সময় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে টাকা ও অস্ত্র দখল নিয়েও প্রতিযোগিতা বেড়েছে দলের ছত্রছায়ায় থাকা ক্যাডার শ্রেণীর মধ্যে। সরকারদলীয় সন্ত্রাসীদের ক্ষেত্রে পুলিশ অসহায় হওয়ায় তখন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ব্যাপক অবনমন ঘটেছিল। এছাড়া আওয়ামী লীগ নেতাদের একটি অংশ এ সময় দেশের বাইরে পাড়ি জমিয়েছিল। বিএনপির আন্দোলনের সময়েও অনেকে দেশে ফেরেনি।
এবারও অবস্থা ব্যতিক্রম নয়। অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে অস্থিরতা চলছে আওয়ামী লীগে। কেন্দ্র থেকে তৃণমূলÑ সর্বত্রই তখন দ্বন্দ্ব প্রকাশ্য হয়ে পড়ছে। তবে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বছর বলে কারও বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিচ্ছে না দল। ভর্ৎসনা, অসন্তোষ প্রকাশ আর উপদেশ দেওয়ার মাধ্যমে আপস-মীমাংসা করে দেওয়া হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে কেন্দ্রীয় উপ-কমিটির সহ-সম্পাদক নিয়োগ, নারায়ণগঞ্জ সিটির মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী ও সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের সমর্থকদের মধ্যে সংঘাত, ঢাকার দুই মহানগর কমিটি নিয়ে দ্বন্দ্ব-সংঘাত দল সামাল দিতে পারেনি। বঞ্চিতদের ক্ষোভের মুখে সহ-সম্পাদক নিয়োগ স্থগিত করা হয়েছে। সব কিছুতেই দলনেত্রী শেখ হাসিনাকে হস্তক্ষেপ করতে হচ্ছে, এটা দল হিসেবে আওয়ামী লীগের জন্য ভালো কোনো ব্যাপার নয়। সার্বিক পরিস্থিতি ও পূর্ব অভিজ্ঞতা নির্দেশ করছে যে, অচিরেই মাঠপর্যায়ে সহিংসতা বাড়বে।

পরিস্থিতি যেভাবে ধাবিত হচ্ছে, তাতে দেশবাসীর কাছে এটা স্পষ্ট যে, দুই দলের ঘুম ভাঙছে। অনুশীলনের দিন শেষ, এগিয়ে আসছে মূল খেলা। ফলে মাঠপর্যায়ে সহিংস রাজনীতির বিস্তার দেখতে খুব বেশি অপেক্ষা করা লাগবে না। লগি-বৈঠা নিয়ে রাজপথ দখল বা ৫ জানুয়ারির নির্বাচন ঘিরে বিএনপির আন্দোলনে যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল, তা যেন আবারও ফিরে আসতে চলেছে। সবদিকে উন্নতি ও অগ্রগতির গল্প শোনা গেলেও এখানে দেখা যাচ্ছে, দেশ সেই এক যুগ আগের অবস্থায়ই আছে।

সাপ?তাহিক পতিবেদন

প্রচ্ছদ কাহিনী/প্রতিবেদন
  • ধানম-িতে উদ্বোধন হলো ‘তাগা ম্যান’
  •  মতামত সমূহ
    পিছনে 
     আপনার মতামত লিখুন
    English বাংলা
    নাম:
    ই-মেইল:
    মন্তব্য :

    Please enter the text shown in the image.