কৌশলগত লড়াই -আনিস রায়হান

Print Friendly and PDF

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে প্রধান দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে কৌশলগত লড়াই চলছে অনেকদিন ধরে। ২০১৪ সালের আলোচিত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর প্রথম এক বছর টানা মাঠে থাকার চেষ্টা করেছে বিএনপি। কিন্তু ২০১৫ সালে তীব্র আন্দোলন করেও সফলতার মুখ না দেখলে পরে বিএনপি তার অবস্থান পরিবর্তন করে। সেই থেকে মাঝের তিন বছর প্রধান দুই দল একে অপরের বিরুদ্ধে কৌশলগত লড়াই চালিয়ে গেছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে একে অপরের মুখোমুখি হয়নি।
আওয়ামী লীগ দাবি করেছে, বিএনপির আর কিছু করার শক্তি নেই। বিএনপি দাবি করেছে, তারা নির্বাচনমুখী ও গণতান্ত্রিক দল- তাই শান্তিপূর্ণভাবে সরকারকে মোকাবিলা করার পথ খুঁজছে। এসব দাবি ও বাস্তবতার মধ্যে অসঙ্গতি যাই থাকুক, দেশবাসী অন্তত কিছুদিন যেন হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছে। দুই দলের কোন্দলে যেভাবে জীবন-জীবিকা বিপন্ন হয়েছে, তাতে মানুষ আতঙ্কিত ও ক্ষুব্ধ। দুই দলের কর্মকাণ্ড নিয়ে জনগণের বিভিন্ন অংশ থেকে নানা অভিযোগ থাকলেও গত তিন বছর যে তারা মুখোমুখি অবস্থানে গিয়ে বড় ধরনের কোনো সংকট জন্ম দেয়নি, এতেই অনেকে খুশি। এটা নির্দেশ করে যে, শাসক শ্রেণীর দলগুলোর প্রতি জনগণের আস্থার বাস্তব অবস্থা কোন পর্যায়ে! মানুষের প্রত্যাশা যদিও খুবই সীমিত, তবু তার জোগানও মেলে না। বড় দুই দলের কৌশলী রাজনীতির ফলে মানুষ যে একটু আতঙ্কমুক্ত হয়েছিল, তাও যেন এখন শেষের পথে।
পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলার বিচারকাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। এ মামলায় খালেদা জিয়ার পুত্র ও বিএনপির দ্বিতীয় শীর্ষ নেতা তারেক রহমানও আসামি। দ্রুতই এগিয়ে আসছে এ মামলার রায়। একই আদালতে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট বিষয়ক দুর্নীতির আরেকটি মামলার বিচারকাজও দ্রুত এগোচ্ছে। এই মামলা দুটিকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ঘোলাটে হয়ে উঠছে। দুই দলের কৌশলগত ধৈর্যের পর্ব যেন শেষ হতে চলেছে। মাঠপর্যায়ে সংগঠন ও কর্মসূচি উভয় পক্ষের কাছেই আবার প্রধান হয়ে উঠছে। এই মুখোমুখি অবস্থান শেষ পর্যন্ত কোন দিকে যায়, তা নিয়ে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বাড়ছে। এটা আরও উদ্বেগ সৃষ্টি করছে, কারণ এখন পর্যন্ত যা কিছু ঘটছে, ইতিবাচক কোনো লক্ষণ তাতে দেখা যাচ্ছে না।

১.
নির্বাচন ঘিরে সরকারের পরিকল্পনা সম্পর্কে বিএনপির যে আশঙ্কা, তার সঙ্গে অন্যদের মতপার্থক্য কমই। বিএনপি বরাবরই দাবি করে আসছে, সরকার ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য গতবার নিজেদের অধীনে নির্বাচন করেছে, এবারও তারা সেটাই চাচ্ছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের রায়ে এ ব্যবস্থা আরও দুই মেয়াদে চালিয়ে নেয়ার ব্যাপারে আদালত যে পর্যবেক্ষণ দিয়েছিল, বিএনপি তার ওপরে ভর করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি করে আসছে। কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক প্রশ্নে আওয়ামী লীগের অনড় অবস্থানে শেষ পর্যন্ত তারা তত্ত্বাবধায়ক বাদ দিয়ে কখনও কখনও ‘জাতীয় সরকার’ বা ‘সহায়ক সরকার’-এর কথাও বলেছে। কিন্তু এই দাবি তারা কখনও ত্যাগ করেনি যে, দলীয় সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচন হবে না।  
বিএনপি নেতাদের দাবি, দেশের অন্য রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ ও জনগণ এই দাবিতে একমত হলেও আওয়ামী লীগ চাইছে বিগত ৫ জানুয়ারির মতোই আরেকটি নির্বাচন করতে। সরকার এখন পর্যন্ত এই দাবিকে ভুল প্রমাণের মতো কিছু করেনি। যদিও সরকার সুষ্ঠু নির্বাচন ও দেশকে এগিয়ে নেয়ার কথা বলছে, কিন্তু সেজন্য নির্বাচনী ব্যবস্থায় কোনো পরিবর্তন প্রয়োজন আছে বলে তারা মনে করে না। ফলে দুই দলের মধ্যে নির্বাচন প্রশ্নে কোনো মতৈক্য বা সমঝোতার সম্ভাবনা এখনও দেখা যাচ্ছে না। নির্বাচন যত এগুচ্ছে, রাজনৈতিক সংকট যত ঘনীভূত হচ্ছে, মাঠপর্যায়ে দুই পক্ষের কর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা তত বাড়ছে।

২.
বিএনপির কর্মীরা মনে করছে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে ক্ষমতার বাইরে থাকায় তাদের সামাজিক ও আর্থিক সক্ষমতা অনেকখানি তলানির দিকে। এ অবস্থায় যদি আসন্ন নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় না আসা যায়, যদি আওয়ামী লীগ আরও এক মেয়াদে ক্ষমতায় থাকতে পারে, তাহলে বিএনপির পক্ষে অস্তিত্ব বজায় রাখাই কঠিন হয়ে পড়বে। ফলে বিএনপির সমর্থক ও নেতা-কর্মীরা সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে। বিএনপির উচ্চপর্যায়েও এ নিয়ে কাজ চলছে। কেন্দ্র থেকে মাঠপর্যায় পর্যন্ত সকল স্তরে দলের ঐক্য আরও দৃঢ় করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের মধ্যেকার দূরত্ব কমাতে চেয়ারপার্সনের নির্দেশে বিবদমান নেতারা বৈঠকে বসছেন।
মাঠপর্যায়ের সাংগঠনিক কাঠামো পুনর্গঠনের জন্যও কাজ করছে বিএনপির নেতৃত্ব। প্রথম সারির নেতাদের নিষ্ক্রিয়তায় দলটির দ্বিতীয় সারির নেতারা ইতোমধ্যে গু