‘প্রশ্ন ফাঁস’ সংবাদ মূল্যহীন সংবাদ -গোলাম মোর্তোজা

Print Friendly and PDF

কোনটা সংবাদ, কোনটা সংবাদ নয়? না, সাংবাদিকতার তাত্ত্বিক আলোচনায় যাব না। বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে সুনির্দিষ্ট উদাহরণ দিয়ে বলার চেষ্টা করব, ‘প্রশ্ন ফাঁস’ এখন সংবাদ নয়। মানে গণমাধ্যমের কাছে ‘প্রশ্ন ফাঁস’ বিষয়টির কোনো সংবাদ মূল্য নেই। সম্ভবত সাধারণ মানুষের কাছেও নেই। এখন সংবাদ মূল্য আছে বা অতি মূল্যবান সংবাদ হয়ে উঠতে পারে ‘প্রশ্ন ফাঁস হয়নি’ এমন একটি সংবাদ। এমন সংবাদের জন্যে বাংলাদেশের মানুষকে কতদিন বা কত বছর অপেক্ষা করতে হবে, তা পুরোপুরি অনিশ্চিত। আদৌ কোনো দিন এমন সংবাদ শিরোনাম হবে কিনা, তাও নিশ্চিত করে বলা যায় না।
জানি, প্রশ্ন ফাঁস বিষয়ে নতুন করে কিছু লেখার নেই। কোনো সংবাদই পাঠকের অজানা নয়। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ফাঁস বিষয়ক লেখার প্রতি পাঠকের আগ্রহ থাকার কথা নয়। আগ্রহ না থাকলেও নতুন- পুরনো মিলিয়ে প্রশ্ন ফাঁস এবং সাধারণ শিক্ষা নিয়ে আবারও দু’একটি কথা বলি।

১. ‘১৯৬১ সাল থেকে প্রশ্ন ফাঁস হয়’- শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ ছাড়া এই ইতিহাস আর কেউ জানেন না। শিক্ষামন্ত্রীর এই জানাটা খুব তাৎপর্যপূর্ণ। এই তথ্য আবিষ্কার করে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, প্রশ্ন ফাঁস আগেও হতো, এখনও হয়। হইচইয়ের কিছু নেই।
সাত-আট বছর আগে প্রশ্ন ফাঁস যখন শুরু হলো, তখন ধারণা করা হচ্ছিল ফাঁস প্রক্রিয়ার সঙ্গে কিছু লোকজন জড়িত। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে, নিশ্চয় প্রশ্ন ফাঁস ঠেকানো যাবে বা আর ফাঁস হবে না। শিক্ষার্থীদের কাছে বই পৌঁছে শিক্ষামন্ত্রী ‘সফল’ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন। ধারণা করা হয়েছিল তার ওপর আস্থা বা বিশ্বাস রাখা যায়। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ‘অসততার ডিপো’ জানা সত্ত্বেও গণমাধ্যম শিক্ষামন্ত্রীকে সৎ হিসেবে উপস্থাপন করেছিল। তার সবচেয়ে কাছের কর্মকর্তার অসততা সম্পর্কে জানা থাকা সত্ত্বেও, গণমাধ্যম তার এই পরিচিতি দিয়েছে। এক্ষেত্রে হয়তো তার অতীতের আদর্শিক রাজনৈতিক পরিচিতি ভূমিকা রেখেছে।
শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বুঝে গেলেন, গণমাধ্যমের সমর্থন তার পক্ষে রয়েছে। এই সুযোগটিকে একটু ভিন্নভাবে কাজে লাগালেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ।
‘প্রশ্ন ফাঁস’ বিষয়ক সকল সংবাদ ‘অস্বীকার’ করলেন শিক্ষামন্ত্রী। তিনি খুব দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে থাকলেন, প্রশ্ন ফাঁস হয়নি। প্রশ্ন ফাঁস বিষয়ক ‘গুজব’ ছড়ানো হচ্ছে।
প্রশ্ন ফাঁস চলতে থাকল। ‘ফাঁস হয়নি’র সঙ্গে তিনি যোগ করলেন ‘তদন্ত করে দেখা হবে’। প্রশ্ন ফাঁস হলো, শিক্ষার্থীদের হাতে এলো, সেই প্রশ্নে পরীক্ষা হলো। কোনো কোনো ক্ষেত্রে গণমাধ্যমে সেই প্রশ্ন প্রকাশিত হলো। কিন্তু শিক্ষামন্ত্রীর গঠন করা ‘তদন্ত কমিটি’ প্রশ্ন ফাঁসের প্রমাণ পেল না। একবার ছয়-সাতটি বিষয়ে প্রশ্ন ফাঁস হলো। তদন্ত করে প্রমাণ পেলেন সম্ভবত একটি বিষয়ের। এটা চার-পাঁচ বছর আগের কথা। তারপর প্রাথমিক থেকে এইচএসসি সব পরীক্ষার প্রায় সব বিষয়ের প্রশ্ন ফাঁস হলো নিয়ম করে। ‘গুজব’ ‘তদন্ত করব’ ‘বিজি প্রেসের কর্মচারীরা ফাঁস করে’, ‘শিক্ষকরা ফাঁস করে’- এমন অনেক কথা নিয়ম করে বলে চললেন শিক্ষামন্ত্রী। সঙ্গে কখনো কখনো যোগ দিলেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী।
এখন এসএসসি পরীক্ষা চলছে। প্রথম দুটি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে। এই ধারণা করাই যায় যে, আগামী পরীক্ষাগুলোর প্রশ্নও ফাঁস হবে।

২. প্রশ্ন ফাঁস হয়, না ইচ্ছে করে ফাঁস করে দেয়া হয়? ‘ইচ্ছে’ কারা করে? সরাসরি এই প্রশ্নের উত্তর দেয়া কঠিন না হলেও স্পর্শকাতর। একটি সুনির্দিষ্ট উদাহরণসহ বোঝার চেষ্টা করে দেখি।
উদাহরণটি দেয়ার জন্যে শিক্ষা ও শিশু রক্ষা আন্দোলনের আহ্বায়ক রাখাল রাহার সহায়তা নেব। তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দিন তারিখ উল্লেখ করে ২০১৭ সালের এইচএসসির গণিত পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস এবং পরবর্তী নাটকীয় কর্মকাণ্ড লিপিবদ্ধ করেছেন। এই তথ্য পাঠকেরও অজানা নয়। আবারও মনে করিয়ে দেয়ার জন্যে হুবহু তুলে দিলাম।

সাধারণ গণিত, এসএসসি,  ২০১৭
ক. প্রশ্ন ফাঁসের রিপোর্ট প্রকাশ : ১১ ফেব্রুয়ারি (রাতে)
খ. পরীক্ষা গ্রহণ : ১২ ফেব্রুয়ারি (সকালে)
গ. ফাঁস হওয়া প্রশ্নের সঙ্গে হুবহু মিলে যাওয়ার রিপোর্ট প্রকাশ : ১২ ফেব্রুয়ারি (দুপুরে)
ঘ. বোর্ডে গণিত খাতা প্রেরণ : ১২ ফেব্রুয়ারি (বিকেলে)
ঙ. শিক্ষামন্ত্রীর ঘোষণা-১ (গণিত পরীক্ষা বিষয়ে) :  ১৩ ফেব্রুয়ারি, সচিবালয়ে :
অভিযোগ প্রমাণিত হলে পরীক্ষা আবারও নেয়া হতে পারে। একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।
চ. শিক্ষামন্ত্রীর ঘোষণা-২ (গণিত পরীক্ষা বিষয়ে) : ১৪ ফেব্রুয়ারি, সিলেট ওসমানী বিমানবন্দরে: এখনই পরীক্ষা বাতিল হচ্ছে না। যাচাই-বাছাই করা হবে। তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
ছ. বোর্ড কর্তৃক পরীক্ষক অনুযায়ী গণিত খাতা বণ্টনের প্রস্তুতি : ১৩-২০ ফেব্রুয়ারি
জ. বোর্ড থেকে পরীক্ষকদের ৫০০ করে গণিত খাতা গ্রহণ : ২০-২২ ফেব্রুয়ারি
ঝ. হেড এক্সামিনারের কাছে ১ম কিস্তির ৩০০ খাতা জমাদান : ২৭ ফেব্রুয়ারি
ঞ. হেড এক্সামিনারের কাছে ২য় কিস্তির ২০০ খাতা জমাদান : ২ মার্চ
ত. হেড এক্সামিনার কর্তৃক ২০০০ খাতা নিরীক্ষণ করে ওএমআর শিট বোর্ডে জমাদান : ৮-১০ মার্চ
থ. বোর্ড কর্তৃক ফলাফল তৈরির প্রক্রিয়া : এপ্রিল ২০১৭
দ. রেজাল্ট প্রকাশ : ৪ মে ২০১৭
শিক্ষামন্ত্রীর কথিত তদন্তের কী হয়েছিল? এই সরকার ও শাসকশ্রেণী পরিকল্পিতভাবে আমাদের সন্তানের শিক্ষাকে ধ্বংস করছে।

এই একটি মাত্র ঘটনা বিবেচনায় নিয়ে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো অযৌক্তিক নয় যে, শিক্ষামন্ত্রী বা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জানা মতেই প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটছে। ইচ্ছে করলে শিক্ষামন্ত্রী বা শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রশ্ন ফাঁস ঠেকাতে পারে কিনা, সেটা নিয়ে আলোচনা করা যায়। এটা নিয়ে আলোচনা করার কোনো অবকাশ নেই যে, শিক্ষামন্ত্রী এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় চায় না প্রশ্ন ফাঁস বন্ধ হোক। যদি চাইতেন প্রশ্ন ফাঁস বন্ধ হোক, তবে অন্তত ২০১৭ সালের গণিত পরীক্ষা বিষয়ে তদন্ত করতেন, পরীক্ষা বাতিল করতেন। তা না করে প্রমাণ করেছেন যে, প্রশ্ন ফাঁস বন্ধ করার কোনো ইচ্ছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বা সরকারের নেই।
প্রশ্ন ফাঁসের বিরুদ্ধে কিছু কথা বলেন, মূলত নিজের সৎ ইমেজ ধরে রাখার জন্যে এবং গণমাধ্যম ও দেশের মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্যে।

৩. শিক্ষা মন্ত্রণালয় বা সরকার কেন প্রশ্ন ফাঁস করবে, এতে সরকারের কী লাভ? প্রশ্ন ফাঁস হলে তো সরকারের বদনাম হয়, সরকার কেন চাইবে না বন্ধ হোক?
সরল এবং নিরীহ এই প্রশ্নগুলো অনেকেই সামনে আনবেন।
নুরুল ইসলাম নাহিদ যখন কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক তখন দৃশ্যমান হয়েছিল, তার কাছে ‘কোয়ালিটি’র চেয়ে ‘কোয়ানটিটি’র গুরুত্ব বেশি। কমিউনিস্ট পার্টি সদস্য সংগ্রহ করার ক্ষেত্রে সবসময় ‘কোয়ালিটি’ গুরুত্ব দিত। নুরুল ইসলাম নাহিদ সাধারণ সম্পাদক হওয়ার পর তিনি শুধু ‘সংখ্যা’ বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দেন, ‘মান’ দেখার দিকে তার কোনো মনোযোগ ছিল না।
শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে সরকারকে এটা বোঝাতে সক্ষম হন অথবা সরকারের সিদ্ধান্তও এমনই ছিল যে, পাসের হার বৃদ্ধি করতে হবে। শিক্ষার হার বাড়াতে হবে, মান গুরুত্বপূর্ণ নয়। শিক্ষকদের বাধ্য করে সেই কাজটি করাতে সক্ষমও হয়েছেন। তারপর বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা হয়েছে। তিনি অনবরত অস্বীকার করেছেন, দমে যাননি বা তার নীতি থেকে সরে আসেননি।
পাসের হার বা শিক্ষার হার বাড়ানোর জন্যে, প্রশ্ন ফাঁসের মতো আরেকটি জানালা হয়তো জেনে-বুঝেই উন্মুক্ত করেছেন। তা না হলে, দৃশ্যমান প্রমাণিত সত্য, অস্বীকার করবেন কেন?

৪. ২০১০ সালে প্রণীত শিক্ষানীতি সব মহলের প্রশংসা পেয়েছিল। ড. জাফর ইকবালসহ আরও কিছু শিক্ষাবিদের পরামর্শে ‘মুখস্থ পদ্ধতি’ পরিত্যাগ করে ‘সৃজনশীল’ পদ্ধতিতে প্রবেশ করানো হয়েছে। সাধারণভাবে ‘সৃজনশীল’ পদ্ধতি খুবই আকর্ষণীয়। কিন্তু বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার একটা ভয়ঙ্কর সর্বনাশ এই ‘সৃজনশীল’ পদ্ধতিতে যাওয়ার কারণেও ঘটে গেছে।
মুখস্থ পদ্ধতির পরিবর্তে সৃজনশীল পদ্ধতিতে যেতে চাইলে চ্যালেঞ্জগুলো কী- তা গবেষণা করা হয়নি। কোনো গবেষণা ছাড়া প্রচলিত একটি পদ্ধতি বাদ দিয়ে, নতুন একটি পদ্ধতিতে চলে যাওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের শিক্ষক, অভিভাবক এবং শিক্ষার্থী কেউ যে সৃজনশীল পদ্ধতির জন্যে প্রস্তুত নন, তা জানা যেত গবেষণা করা হলে। শিক্ষকদের যে ‘সৃজনশীল’ পদ্ধতিতে পাঠদানের দক্ষতা-সক্ষমতা নেই, তাও জানা যেত গবেষণা করা হলে। কোনো গবেষণা ছাড়া বহু বছরের প্রচলিত একটি পদ্ধতির পরিবর্তে আরেকটি নতুন পদ্ধতি চালু করার আগে অতি জরুরি বা অপরিহার্য ছিল, যাচাই করে নেয়া যে কী কী ‘প্রতিবন্ধকতা’য় পড়তে হতে পারে। শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কেউ প্রস্তুত ছিল না ‘সৃজনশীল’ পদ্ধতিতে পাঠদানের বিষয়ে।
শিক্ষা ব্যবস্থা আগেও অগোছালো ছিল, ‘সৃজনশীল’ পদ্ধতি তা পুরোপুরি হযবরল করে দিয়েছে।

৫. প্রস্তুতিহীন সৃজনশীল পদ্ধতি, নির্দেশনা দিয়ে পাস করানো এবং প্রশ্ন ফাঁস, ত্রি-চক্রে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের শিক্ষা বলতে আর কিছু অবশিষ্ট নেই। বলতেই পারেন, হতাশার কথা বলছি। সাধারণ মানুষের শিক্ষার ক্ষেত্রে জোর করে ‘উন্নয়ন’ দেখতে পারেন- তবে তা সত্য নয়।

সাপ?তাহিক পতিবেদন

 মতামত সমূহ
পিছনে 
 আপনার মতামত লিখুন
English বাংলা
নাম:
ই-মেইল:
মন্তব্য :

Please enter the text shown in the image.