জাপানে সরস্বতী পূজা পালিত

Print Friendly and PDF

জা পা ন

রাহমান মনি


ধর্মীয় রীতি ও ভাবগাম্বীর্য বজায় রেখে বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা ও নানা আয়োজনে উৎসবমুখর পরিবেশে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব শ্রীশ্রী সরস্বতী পূজা ২০১৮ পালিত হয়েছে জাপানে। সার্বজনীন পূজা কমিটি জাপান’র এবারের আয়োজনটি ছিল ২৩তম। ১৯৯৬ সালে স্বল্প পরিসরে শুরু করা হলেও ধীরে ধীরে এর পরিসরতা বাড়তে থাকে এবং বাংলাদেশি সংস্কৃতির রেওয়াজ অনুযায়ী সব ধর্মের লোকের অংশগ্রহণে তা প্রাণবন্ত ও উৎসবমুখর হয়ে ওঠে।
হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মতে মাঘ মাসের পঞ্চমী তিথিতে বিদ্যা ও জ্ঞানের দেবী সরস্বতী আসেন ধরণীতে। বিদ্যানুরাগী ও ভক্তরা দিনটি শুরু করেন দেবীর চরণে অঞ্জলি দিয়ে। সেই হিসেবে এ বছর ২২ জানুয়ারি বা এলাকা বিশেষ ২১ জানুয়ারি ছিল সরস্বতী বন্দনার দিন।
কিন্তু জাপানে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কোনো মন্দির না থাকায় এবং কর্মদিবসে প্রবাসীদের কর্মব্যস্ততার কারণে অংশগ্রহণের সুযোগ কম হওয়ার কারণে পরবর্তী রোববারকেই বেছে নিতে হয় পূজা পার্বণ পালন করার জন্য। যদিও সার্বজনীন পূজা কমিটি জাপান প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই জাপানে একটি মন্দির স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য কাজ করে যাচ্ছে। এই ব্যাপারে তারা অনেকটাই এগিয়েছেন। জাপান সরকারের প্রয়োজনীয় অনুমোদনের কাজ এবং স্থান নির্বাচনও প্রায় শেষ পর্যায়ে। বাকি কেবল কাজ শুরু করা এবং ভক্ত ও পূজারিদের কাছ থেকে অনুদান সংগ্রহ করা। ভক্ত এবং পূজারিরা মুক্তহস্তে দান করলেই তা দ্রুত বাস্তবে রূপ নেবে বলে পূজা কমিটি সূত্রে জানা যায়। অচিরেই জাপানে একটি স্থায়ী মন্দির নির্মাণ করা হবে বলে জানা যায়।
বিভিন্ন বাস্তবতার কারণে মাঘ মাসের পঞ্চমী তিথিতে সরস্বতী পূজার আয়োজনটি পরবর্তী রোববার অর্থাৎ ২৮ জানুয়ারি করতে হয়েছে। টোকিওর অদূরে সাইতামা প্রিফেকচারের ওয়ারাবি সিটির কিতামাচি কমিউনিটি সেন্টারের আয়োজন স্থলে নির্মিত অস্থায়ী পূজামণ্ডপে সকাল থেকেই ভক্ত এবং পূজারিদের পদচারণায় পূজামণ্ডপটি মুখরিত হয়ে ওঠে। ধীরে ধীরে বিভিন্ন প্রিফেকচার থেকে ভক্ত এবং পূজারিদের পাশাপাশি অন্য ধর্মাবলম্বীদের উপস্থিতি, সেই সঙ্গে ঢাকঢোল, কাসর, শঙ্খ ও উলুধ্বনিতে কিতামাচি কুমিন স্টোর বাংলাদেশের কালিবাড়ীর আদলে পূজামণ্ডপের রূপ নেয়। শিশু-কিশোরদের হৈ হুল্লোড় তা বহুলাংশে উৎসবমুখরতা বাড়িয়ে দেয়। এ এক অসাম্প্রদায়িক চেতনার মিলনতীর্থ।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মতে, দেবী সরস্বতী সত্য, ন্যায় ও জ্ঞানালোকের প্রতীক। বিদ্যা, বাণী ও সুরের অধিষ্ঠাত্রী। অজ্ঞতার অন্ধকার দূর করতে কল্যাণময়ী দেবীর চরণে ‘সরস্বতী মহাভাগ্যে বিদ্যে কমলালোচনে/বিশ্বরূপে বিশালাক্ষী বিদ্যংদেহী নমোহস্ততে’ এই মন্ত্র উচ্চারণ করে বিদ্যা ও জ্ঞান অর্জনের জন্য প্রণতি জানান তারা।
এই দিন শিশুদের শিক্ষাজীবনের প্রথম হাতেখড়ির কাজটিও তারা দেবী সরস্বতীর পাদদেশে বসে পুরোহিতের কাছ থেকেই করিয়ে নেন। এ বছর পাঁচজন শিশু পুরোহিত জ্যোতি অল্কেশ এর কাছ থেকে হাতেখড়ি নিয়ে তাদের শিক্ষাজীবন শুরু করে। এই পাঁচজন শিশু হলো সম্প্রীতি ঘোষ, শ্রেয়া দাস, মৃন্ময়ী পাল, শ্রেয়া পাল এবং ঈশ্বরীযান শ্রিয়াস বিশ্বাস। এ সময় মায়েরা উপস্থিত ছিলেন। কারণ মায়েরাই শিশুদের প্রকৃত শিক্ষক।
সরস্বতী পূজা ২০১৮ সার্বজনীন পূজা কমিটির আহ্বানে প্রধান অতিথি হিসেবে রাষ্ট্রদূত রাবাব ফাতিমার অংশ নেয়ার কথা থাকলেও বিশেষ প্রয়োজনে তিনি উপস্থিত না হতে পারায় ফুলেল শুভেচ্ছাসহ তার দূত হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কমার্স কাউন্সিলর মো. হাসান আরিফ। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রামকৃষ্ণ মিশন জাপান-এর মহারাজ স্বামী মেধসানন্দ। এছাড়াও দূতালয় প্রধান ও প্রথম সচিব মোহাম্মদ জোবায়েদ হোসেন, বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও আঞ্চলিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ, সর্বস্তরের প্রবাসী এবং জাপানি নাগরিকসহ অন্য দেশের নাগরিকরাও উপস্থিত থেকে সরস্বতী পূজা আয়োজন উপভোগ করেন।
মিজ তনুশ্রী গোলদার বিশ্বাসের সার্বিক পরিচালনায় অনুষ্ঠানমালার মধ্যে ছিল পূজা বিষয়ক ধর্মীয় আলোচনা, শিশু-কিশোরদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, অতিথিদের সংগীতানুষ্ঠান, ভক্তিমূলক সংগীতানুষ্ঠান, সন্ধ্যা আরতী ও মিষ্টিমুখ।
পূজা বিষয়ক আলোচনা অনুষ্ঠানে স্বাগতিক ও শুভেচ্ছা রাখেন সার্বজনীন পূজা কমিটি জাপান’র সভাপতি শ্রী সুনীল রায়। এছাড়াও বক্তব্য রাখেন সাধারণ সম্পাদক রতন বর্মন, উপদেষ্টা শ্রী সুখেন ব্রহ্ম, বিশেষ অতিথি স্বামী মেধসানন্দ, কমার্স কাউন্সিলর মো. হাসান আরিফ এবং সাংগঠনিক সম্পাদক অনতুন সাহা।
রামকৃষ্ণ মিশন জাপান’র মহারাজ স্বামী মেধসানন্দ তার  বক্তব্যে বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের জনক খোদ আমেরিকার বিজ্ঞান গবেষণাগার নাসার কর্মীদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ১০ মিনিটের বেশি সময় না দেয়ার কথা বলা হয়। অথচ আমাদের সমাজে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যয় করা হয়ে থাকে। এটা এক ধরনের আসক্তি। শিশুরাও জড়িয়ে পড়ছে। শিশুদের এই ধরনের আসক্তি থেকে দূরে রাখতে এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ভালো দিকগুলো থেকে শিশুদের শিক্ষা দেয়ার জন্য তিনি অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, সরস্বতী বন্দনা যেন বছরে মাত্র একদিনের জন্য না হয়ে প্রতিটি মুহূর্তে যেন সরস্বতীকে স্মরণ করা হয় এবং অন্তর থেকে ভক্তি করে তার আদর্শ মেনে চলা হয়। মানুষের জিহ্বা হচ্ছে সরস্বতী। এই জিহ্বাকে অসংযত রাখা মানেই বিদ্যাদেবী সরস্বতীকে অসম্মান করা। মানুষ হিসেবে আমরা তা পারি না।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে মো. হাসান আরিফ বলেন, সরস্বতী পূজা আসলেই শিক্ষাজীবনের কথা মনে  পড়ে যায়। বিশেষ করে জগন্নাথ হলে জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনের কথা। আমরা সবাই আনন্দে মেতে উঠতাম এই পূজাতে। জাপানে ২৩ বছর যাবৎ সরস্বতী পূজার আয়োজন জাপানে বাঙালিদের সংস্কৃতিকে তুলে ধরছেন এটা অনেক বড় একটা উদ্যোগ। আপনাদের এই অবদানকে আমি শ্রদ্ধা জানাই। সেই সঙ্গে আপনাদের বিভিন্ন অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের অবকাঠামোসহ আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে কাজে লাগিয়ে দেশের উন্নয়নে শরিক হবার অনুরোধ জানাই। আপনাদের সেই অভিজ্ঞতা ও সুযোগ রয়েছে। কারণ, আপনারা জাপানে দীর্ঘদিন যাবৎ বসবাস করছেন। আপনাদের অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার সীমাহীন। আপনারা জাপানি সমাজের সঙ্গে মিশে থাকেন।
শিশু-কিশোরদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে একঝাঁক শিশু-কিশোর অংশ নিয়ে ধর্মীয় শ্লোক, নাচ, গান, পিয়ানো বাজানো এবং আবৃত্তি করে থাকে।
সংগীতানুষ্ঠানে বাংলাদেশি শিল্পীদের পাশাপাশি জাপানি শিল্পী শান্তি ইযুমিকা স্বরচিত এবং সুর করা গান পরিবেশন করেন। এ সময় বিশ্বজিত দত্ত বাপ্পা তাকে যন্ত্রে সহযোগিতা করেন।
খন্দকার ফজলুল হক রতনের পরিচালনা ও নির্দেশনায় উত্তরণ বাংলাদেশ কালচারাল গ্রুপ ভক্তিমূলক সংগীতানুষ্ঠান পরিবেশন করে। দর্শকশ্রোতা উত্তরণের গানের সঙ্গে একাকার হয়ে যায়, উত্তরণও প্রাণ খুলে গান গায় এদিন।
সব শেষে ধুপ, শঙ্খ, প্রদীপের শোভায় সন্ধ্যা আরতি, ফল ও মিষ্টি বিতরণ এবং নেচে গেয়ে দেবী সরস্বতীকে প্রতীকী বিসর্জনের মাধ্যমে সার্বজনীন পূজা কমিটি জাপান’র ২৩তম আয়োজনের সমাপ্তি টানা হয়।

সাপ?তাহিক পতিবেদন

 মতামত সমূহ
পিছনে 
 আপনার মতামত লিখুন
English বাংলা
নাম:
ই-মেইল:
মন্তব্য :

Please enter the text shown in the image.