[মতামত] ভারতের বিদ্যমান ভাষিক-জাতি সমস্যা

Print Friendly and PDF

মযহারুল ইসলাম বাবলা

স্বাধীন ভারতের শাসকগোষ্ঠী রাষ্ট্র ক্ষমতাকে কেন্দ্রীভূত শাসনের আওতায় নিরঙ্কুশ ও নিরাপদ রাখার অভিপ্রায়ে ভারতীয় সকল নাগরিকের মস্তিষ্কে-মনোজগতে উদ্দেশ্যমূলক উপায়ে ঢুকিয়ে দিয়েছিল, অষষ ওহফরধহ ড়হব ঘধঃরড়হং। অর্থাৎ সব ভারতীয় এক জাতি। ভারতে জাতির সংখ্যা একটি নয়, একাধিক। বহু জাতিসত্তার দেশ ভারতের স্বীকৃত প্রাদেশিক ভাষার সংখ্যা ২২টি। প্রত্যেক জাতির ভাষা-সংস্কৃতি পৃথক তো বটেই এবং কোনোটির সঙ্গে কোনোটির মিল নেই। ভারতের সকল নাগরিক ‘ভারতীয় এক জাতিতত্ত্বের’ বৃত্তে আটকে রয়েছে। এমন কি প্রগতিশীল রাজনীতিকেরা পর্যন্ত সেই চতুরতার বৃত্ত অতিক্রম করতে পারেনি। গত জানুয়ারি ২০১৭ সালে অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর জাতীয়তাবাদ, সাম্প্রদায়িকতা এবং জনগণের মুক্তি আলোচিত বইটি কলকাতার বিশ্ববঙ্গীয় প্রকাশনা থেকে ভারতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছিল। কলকাতা বইমেলায় বইটির প্রকাশনা অনুষ্ঠানে যোগ দিতে স্যারের সফরসঙ্গী হিসেবে আমিও গিয়েছিলাম। তখন ভারতীয় একটি মার্কসবাদী দলের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আমাদের বৈঠক হয়েছিল। দলটির কেন্দ্রীয় অফিসে সেই বৈঠকের শুরুতে স্যার তাদের প্রশ্ন করেছিলেন, ‘বৃহৎ ভারতের জাতি সমস্যা সমাধানে আপনাদের ভাবনা কী?’ প্রশ্নের উত্তরে এক শীর্ষ নেতা অবলীলায় বলেন, ‘ভারতের জাতি সমস্যাকে আমরা সমস্যা বলেই মনে করি না। সকল ভারতীয়মাত্রই একজাতি।’ এই উত্তর জানার পর এ নিয়ে আর প্রশ্ন তোলা নিরর্থক ভেবে অন্য প্রসঙ্গে বিস্তৃত আলোচনা হয়েছিল। ভারতে জাতি সমস্যা যে রয়েছে সেটা অস্বীকার করা যাবে না। যদিও জাতিগত আন্দোলন-সংগ্রামকে ভারতের শাসকশ্রেণি ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ আখ্যা দিয়ে সুদীর্ঘকাল অবধি কঠোর হস্তে দমন-পীড়ন করে আসছে। ‘সব ভারতীয় এক জাতি’ এই তত্ত্ব কেন্দ্রীয় শাসকশ্রেণি অধিক চতুরতার সঙ্গে প্রচার-প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হয়েছে, এ বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। কিন্তু শতভাগ যে সফল হয়নি তারও দৃষ্টান্ত রয়েছে। ভাষার প্রশ্নে অতীতে সহিংস ঘটনা ঘটেছে। বর্তমানেও যে চাপা ক্ষোভ-বিক্ষোভ নেই সেটাও বলা যাবে না।
মাত্র ক’দিন পূর্বে বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়। তিনি ইন্দিরা গান্ধীর মন্ত্রিসভার অর্থমন্ত্রী ছিলেন। রাষ্ট্রপতি পদ গ্রহণের পূর্বে এক সাক্ষাৎকারে তিনি আক্ষেপে বলেছিলেন, ‘সকল যোগ্যতা থাকার পরেও কেবল বাংলাভাষী বিধায় আমি কংগ্রেস দলের ও সরকারের শীর্ষ পদে অধিষ্ঠিত হতে পারিনি। হিন্দি-ভাষীদের ন্যায় আমার হিন্দি উচ্চারণ নির্ভুল নয়, এই অযোগ্যতায়।’ কেবল এই বিবেচনায় তার কংগ্রেস দলের ও সরকারের শীর্ষ পদপ্রাপ্তি ঘটেনি। এই আক্ষেপ কি ভাষিক-জাতি সমস্যার দৃশ্যমান প্রমাণ নয়?
বাংলা গানের কিংবদন্তি শিল্পী মান্না দে। যিনি মাত্র ক’বছর পূর্বে প্রয়াত হয়েছেন। বাংলা গানের খ্যাতিমানদের অনেকের ন্যায় তিনিও সর্বভারতীয় খ্যাতি, প্রচার-প্রতিষ্ঠার অভিপ্রায়ে শুরুতেই তার কাকা-গুরু কৃষ্ণচন্দ্র দে’র সঙ্গে মুম্বাই পাড়ি দিয়েছিলেন। আঞ্চলিক (বাংলা ভাষার) গান পরিহার করে হিন্দি গানের জগতে প্রবেশ করেন। গেয়েছেন, সুর করেছেন অনেক হিন্দি গান। খ্যাতি পেয়েছিলেন বটে। তবে পরিণত বয়সে তাকেও আক্ষেপে বলতে হয়েছে, ‘একমাত্র বাঙালি বলেই আমার হিন্দি উচ্চারণ মোহাম্মদ রফি, মুকেশদের ন্যায় নির্ভুল হতে পারেনি।’ শেষে শ্লেষে বলেছেন, ‘হিন্দি গানের ভুবনে আই ওয়াজ অ্যান আউট সাইডার।’ হিন্দি ভাষাকে চাপিয়ে এক জাতির বাতাবরণে ভারতের জাতি সমস্যাকে উপেক্ষা বা এড়িয়ে যাওয়া যে অসম্ভব এ সব অজস্র ঘটনা তারই প্রমাণ বহন করে।
অখ- ভারতবর্ষ দ্বিখ-িত হয়েছিল দ্বিজাতিতত্ত্বের কষাঘাতে। জাতি বিভক্তির কথা প্রচার ও প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল বটে, কিন্তু সেটা মোটেও জাতিতত্ত্ব ছিল না। ছিল সম্প্রদায়গত। সম্প্রদায়কেই জাতির মোড়ক দেয়া হয়েছিল, ধারণা করা যায় জাতি সমস্যাকে আড়াল করার কৌশলতায়। ভারতবর্ষে হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায়ের পাশাপাশি খ্রিস্টান, বৌদ্ধ, শিখ, জৈন, পার্সিসহ অনেকগুলো সম্প্রদায় ছিল। তবে দুই প্রধান সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মাবলম্বীদের দ্বন্দ্বেই দ্বিজাতিতত্ত্বের আবির্ভাব ও বিকাশ ঘটেছিল। মুসলিম জাতি (সম্প্রদায়) পৃথক পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠন করেছিল এক জাতির (সম্প্রদায়ের) বাতাবরণে। অপরদিকে ভারতও একজাতির রাষ্ট্ররূপে নিজেদের জাহির করছে ঐ দ্বিজাতিতত্ত্বের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি প্রদানে। আমরা দ্বিজাতিতত্ত্বকে প্রত্যাখ্যান করেই বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলাম সত্য; কিন্তু ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে বিচ্যুত করতে পারিনি। আমাদের শাসকশ্রেণি পাকিস্তান এবং ভারতের আদলে ধর্মকে রাষ্ট্রের সঙ্গে সংযুক্ত করেছে নিজেদের কায়েমি স্বার্থে। বাংলাদেশ রাষ্ট্র বাঙালি জাতীয়তার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হলেও, বাংলাদেশ জাতিরাষ্ট্র নয়। কেননা সংখ্যাধিক্য বাঙালি জাতিসত্তার পাশাপাশি দেশজুড়ে বিভিন্ন জাতিসত্তার অস্তিত্ব রয়েছে। সে সকল জাতিসত্তাসমূহকে সমঅধিকার-সমমর্যাদা প্রদান করা রাষ্ট্রের অপরিহার্য কর্তব্য। রাষ্ট্রীয় ভাবে সেটা করা না গেলে জাতি প্রশ্নে পাকিস্তানিদের স্বৈরতান্ত্রিকতার সঙ্গে আমাদের কোনো পার্থক্য থাকবে না। এমন কি ভারতের তথাকথিত ‘সব ভারতীয় এক জাতি’র তক্মাধারী ভারতীয় শাসকশ্রেণির দৃষ্টিভঙ্গির থেকেও নিজেদের স্বাতন্ত্র্যরূপে প্রমাণ দিতে পারবো না।
বহুজাতির ভারতে বিভিন্ন জাতিসত্তার মানুষের নিজ নিজ ভাষা এবং ভাষাভিত্তিক অঞ্চলের দাবিতে অতীতে এবং বর্তমানেও আন্দোলন-সংগ্রাম জারি রয়েছে। হিন্দি ভাষাকে কেন্দ্রের একমাত্র সরকারি ভাষা ঘোষণার পরক্ষণে তামিলনাড়–তে ব্যাপক প্রতিবাদ-বিক্ষোভের ঘটনা ঘটে। হিন্দির পরিবর্তে পূর্ববৎ ইংরেজি ভাষাকে যোগাযোগের সরকারি ভাষায় অধিষ্ঠিত করার দাবিতে তীব্র আন্দোলনে আত্মদহন এবং সরকারি সম্পত্তির ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে বিক্ষুব্ধ তামিলভাষীরা।
বিহার ও উত্তরপ্রদেশে উর্দু ভাষাকে সরকারি হিন্দি ভাষার সমমর্যাদা দেবার ঘোষণার পরক্ষণে সরকারি এই ঘোষণার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ সংঘটিত হয়। দুঃখজনক হলেও এই আন্দোলন দ্রুতই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় পরিণত হয়। হিন্দু-মুসলিম দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে সহিংস দাঙ্গায় প্রচুর হতাহতের ঘটনা ঘটে।
ভারতের স্বাধীনতার পূর্বে কংগ্রেস দাবি করেছিলভাষারভিত্তিতে রাজ্যসমূহের পুনর্গঠন। অথচ ক্ষমতা হস্তান্তরে ক্ষমতা প্রাপ্তির পর পূর্বেকার দাবি থেকে সরে আসে কংগ্রেস। ১৯৫২ সালে এর প্রতিবাদে পট্টি শ্রীরামলুর অনশনে আত্মত্যাগ করে কেন্দ্রীয় সরকারকে বাধ্য করে পৃথক অন্ধ্রপ্রদেশ সৃষ্টিতে। মহারাষ্ট্র প্রদেশের ক্ষেত্রে একই নীতি অনুসরণ না করায় সংযুক্ত মহারাষ্ট্রে জাতিগত সংঘর্ষ-সংঘাতের সূত্রপাত হয়। ভাষাভিত্তিক প্রদেশসমূহের সীমানা নির্ধারণেমারাঠী-কানাড়া, বিহার-পশ্চিমবাংলা, অসম-নাগাল্যান্ড, পাঞ্জাব-হরিয়ানা প্রভৃতি রাজ্যে ভাষিক-জাতি সংঘাতের নৃশংস ঘটনা ঘটে। এছাড়া প্রদেশসমূহের সংখ্যালঘু জাতিসত্তার মানুষের নিজ নিজ মাতৃভাষায় শিক্ষার সুযোগ বঞ্চিত করার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধেও জাতিগত সংঘাতের সৃষ্টি হয়। যেমন আসামের বাংলাভাষী, কর্ণাটকের বেলগাঁও-কারওয়ার ইত্যাদিতে মারাঠী ভাষা, বিহার ও ওড়িষ্যায় বাংলাভাষীদের ওপর জাতিগত সংঘাত আজও থেমে নেই। ভাষা নিয়ে বিরোধ-বিবাদের প্রকরণগুলো ভিন্ন ভিন্ন হলেও, পরস্পর কিন্তু অঙ্গাঙ্গিভাবেই সম্পৃক্ত।
১৯৪৭-এর ১৫ আগস্টে স্বাধীনতা লাভের দিনে মারাঠী অঞ্চল ত্রিধা-বিভক্ত ছিল। বৃহদাংশ বোম্বাই প্রেসিডেন্সিতে, নাগপুরসহ বিদর্ভ (বর্তমান বিদর) অঞ্চল কেন্দ্রীয় প্রদেশে এবং মারাঠাওয়াড়ার বড় অংশ নিজামের হায়দ্রাবাদ রাজ্যের সীমায় অন্তর্ভুক্ত ছিল। ব্রিটিশদের করদরাজ্য হায়দ্রাবাদের শাসনকর্তা নিজাম স্বাধীন ভারতের সঙ্গে যুক্ত হবার আহ্বান প্রত্যাখ্যান করলে কেন্দ্রের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল সেনা অভিযানে হায়দ্রাবাদ দখল করে ভারতের সঙ্গে হায়দ্রাবাদকে যুক্ত করেন। হায়দ্রাবাদের ভারতভুক্তির পর হায়দ্রাবাদের মারাঠীভাষী অঞ্চল বোম্বাই প্রেসিডেন্সিতে যুক্ত হয়। কিন্তু বিদর্ভের সমস্যার সমাধান না করায় সংযুক্ত মহারাষ্ট্রের দাবিতে আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে। শঙ্কররাও দেও-এর নেতৃত্বে সংযুক্ত মহারাষ্ট্র পরিষদ গঠিত হয়। পরিষদের দাবি এবং দার কমিশনের সুপারিশ অগ্রাহ্য করে কেন্দ্রীয় সরকার বল্লভভাই প্যাটেল, পট্টভি সীতারামাইয়া ও জয়রামদাস দৌলতরামের উচ্চস্তরের কমিটির সুপারিশ ছিল‘ভাষার ভিত্তিতে বর্তমানে প্রদেশ গঠনের প্রয়োজন নেই।’ পাশাপাশি বোম্বাই শহর যেন কোনো অবস্থাতে সংযুক্ত মহারাষ্ট্রে অন্তর্ভুক্ত না হতে পারে কেন্দ্রীয় সরকার সেই লক্ষ্যে কঠোর কৌশল গ্রহণ করে। অন্য অনেক ক্ষেত্রে ভাষাভিত্তিক প্রদেশ পুনর্গঠনে নতি স্বীকার করলেও, পট্টি শ্রীরামলুর আত্মদানের ফলে অন্ধ্র তামিলনাড়– থেকে পৃথক প্রদেশ গঠনের সিদ্ধান্ত কেন্দ্র নিতে বাধ্য হয়েছিল। অথচ মহারাষ্ট্রের ক্ষেত্রে সেই নীতি কেন্দ্র গ্রহণ করেনি। বোম্বাইর গুজরাটি পুঁজিপতি শ্রেণির স্বার্থে কেন্দ্রীয় সরকার বিদর (অতীত বিদর্ভ) ব্যতীত মারাঠী ও গুজরাটি দ্বিভাষী মহারাষ্ট্র নীতিতে অটল থেকে বোম্বাই নগরী ও উপ-নগরীকে মহারাষ্ট্র থেকে পৃথক করে রাখে।
কেন্দ্রীয় সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সংযুক্ত মহারাষ্ট্র আন্দোলন ক্রমেই জঙ্গিরূপ ধারণ করে। ১৯৫৬ সালে ১৬ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু সরকারিভাবে ‘ত্রিরাজ্য পরিকল্পনা’ অর্থাৎ বোম্বাই শহর ও উপ-নগরীকে পৃথক এক রাজ্য এবং মহারাষ্ট্র ও গুজরাটকে পৃথক দুই রাজ্যের স্বীকৃতির ঘোষণার পরক্ষণে মহারাষ্ট্রবাসী তীব্র প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে আসে। ট্রামে, বাসে, রাষ্ট্রীয় সম্পত্তিতে অগ্নিসংযোগসহ ব্যাপক সম্পদের ক্ষতিসাধন করে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে এক ছাত্র নিহত ও চারজন গুরুতর আহত হয়। অগণিত ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগে ভস্মীভূত হয়। নেহরুর ‘ত্রিরাজ্য পরিকল্পনায়’ স্থানীয় ভোটারদের সমর্থন হারানোর আশঙ্কায় কংগ্রেসের মন্ত্রী-সাংসদরা পদত্যাগ করেন। তবে কংগ্রেসের হাইকমান্ড পদত্যাগকারীদের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেনি। কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী চিন্তামন দেশমুখ পর্যন্ত পদত্যাগ করেন। তার পদত্যাগপত্র পাঁচ মাস পরে গৃহীত হয়। কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ মহারাষ্ট্রের আন্দোলন থেকে সম্পর্কচ্ছেদ করার জন্য দলীয় নেতা-কর্মীদের প্রতি কঠোর নির্দেশ জারি করলেও, সে নির্দেশ নেতা-কর্মীরা প্রত্যাখ্যান করে। চলমান বোম্বাইর এই সহিংস আন্দোলন দমনে পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারায় ৯৫ জন আন্দোলনকারী। অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতিতে সংযুক্ত মহারাষ্ট্র সমিতির স্থাপনা পুনায় গড়ে ওঠে এবং সংগঠনের সম্পাদক হন এস এম যোশী। আন্দোলন ক্রমেই বিস্তৃত হয়ে পড়ে। সরকারি-বেসরকারি সম্পত্তির ব্যাপক ক্ষতি হয়। কয়েক হাজার আন্দোলনকারীকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এই আন্দোলন ভাষিক-জাতিগত দাঙ্গায় পরিণত হয়। মারাঠী-গুজরাটিভাষী দুই জাতির মানুষের মধ্যকার সংঘর্ষ-দাঙ্গা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। লোকসভায় দ্বিভাষী রাজ্য প্রতিষ্ঠার আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। মারাঠীভাষী বেলগাঁও, কারওয়ার, বিদর অঞ্চল কর্ণাটক রাজ্যের অন্তর্গত হবার কারণে মারাঠীভাষীদের অসন্তোষের পরিসমাপ্তি আর ঘটলো না। দ্বিভাষী রাজ্যের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গুজরাটেও জন-বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে, বিক্ষোভ দমনে পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারায় ১৫ জন এবং আহত হয় ১৬৭ জন ।
ওদিকে গুজরাটেও মহাগুজরাট সমিতি গঠিত হয়। দ্বিভাষী দুই প্রদেশের আন্দোলনকারীদের মধ্যে যোগাযোগ-সংহতি স্থাপিত হয়। গুজরাটের আন্দোলনে মারাঠী এবং বোম্বাইতে মহারাষ্ট্রের আন্দোলনকারীরা ঐক্যবদ্ধভাবে ব্যাপক আন্দোলন গড়ে তোলে। গুজরাট ও মহারাষ্ট্র দুই ভাষিক অঞ্চলে পুলিশ ৪৫ হাজার আন্দোলনকারীকে গ্রেফতার করে। সম্মিলিত এই আন্দোলন দমনে পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারায় ১২৫ জন। এই উত্তাল পরিস্থিতিতে বিধানসভার ৩২ জন সদস্য পদত্যাগ করেন। এই আন্দোলনের প্রভাব পড়ে ১৯৫৭ সালের সাধারণ নির্বাচনে। মহারাষ্ট্রে কংগ্রেস ২৩১টি আসন লাভ করে সরকার গঠন করলেও; নির্বাচনী রাজনীতিতে অনভিজ্ঞ সংযুক্ত মহারাষ্ট্র সমিতি পায় ১৬১টি আসন। মহারাষ্ট্রের পশ্চিমাংশ মারাঠী সংস্কৃতির পাঠস্থান। লোকসভার নির্বাচনে ২২টি আসনের মধ্যে সংযুক্ত মহারাষ্ট্র সমিতি জয়ী হয় ২০টি আসনে। গুজরাটে মহাগুজরাট সমিতি কেন্দ্রীয় শাসক কংগ্রেস দলের প্রবল প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠে। দুই ভাষিক রাজ্যে ভাষাভিত্তিক রাজ্য প্রতিষ্ঠায় তারা ঐক্যবদ্ধভাবে নানা কর্মকা- শুরু করে। এরই মধ্যে বোম্বাই করপোরেশন নির্বাচনে সংযুক্ত মহারাষ্ট্র সমিতি ৭৭টি আসনের মধ্যে ৭১টি আসনে জয়ী হয়। অবশেষে কেন্দ্রীয় সরকার ১ মে ১৯৬০ সালে গুজরাট ও মহারাষ্ট্রকে পৃথক দুই প্রদেশের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি প্রদান করে।
সংযুক্ত মহারাষ্ট্রের সমস্যা নিরসনে কেন্দ্র নির্লিপ্ত আজও। মারাঠীভাষী অঞ্চল বেলগাঁও কর্ণাটক রাজ্যের সীমানাভুক্ত থাকায় মহারাষ্ট্র একীকরণ সমিতি তাদের আন্দোলন অব্যাহত রাখে। নানা সহিংস আন্দোলনের পরও কেন্দ্রীয় সরকার বিষয়টির নিষ্পত্তি করেনি। প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী জনমতের ভিত্তিতে সমস্যা সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিলেও, সমাধান করেননি। ১৯৮১ সালে কর্ণাটক ও মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রীদের বৈঠক, আলাপ-আলোচনায়ও মীমাংসা সম্ভব হয়নি। কর্ণাটক সরকার বেলগাঁও অঞ্চলের মারাঠী ভাষার ক্ষেত্র সঙ্কোচনের নীতি গ্রহণে সমস্যাকে আরো জটিল করে তুলেছে। বেলগাঁওসহ কর্ণাটক রাজ্যের মারাঠীভাষীদের ভাষার অধিকার হরণ ও সঙ্কুচিত করার কারণে ভাষিক-জাতিগত সংঘাত আজও রয়ে গেছে। যে কোনো মুহূর্তে সেটা যে ব্যাপক সংঘাতের দিকে অগ্রসর হবে না, সেটাও কিন্তু  জোর দিয়ে বলা যাবে না।
নির্বাহী সম্পাদক, নতুন দিগন্ত

সাপ?তাহিক পতিবেদন

প্রতিবেদন
  • ধানম-িতে উদ্বোধন হলো ‘তাগা ম্যান’
  •  মতামত সমূহ
    পিছনে 
     আপনার মতামত লিখুন
    English বাংলা
    নাম:
    ই-মেইল:
    মন্তব্য :

    Please enter the text shown in the image.