[স্মরণ] আখতারুজ্জামান ইলিয়াস ও শওকত আলী দুই মনীষীর অন্তঃমিল

Print Friendly and PDF

আবদুস সাত্তার

গত নভেম্বর, ২০০৭ জেএসসি পরীক্ষা চলাকালীন প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে প্রসঙ্গত কথা বলছিলাম শওকত আলী ভাইয়ের সঙ্গে। তখন তিনি বলেছিলেন,
আমাদের দেশে এখন লেখাপড়া করার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে মোটা ও ভারী সার্টিফিকেট লাভ করা, যাকে জিপিএ ফাইভ বা গোল্ডেন এ প্লাস বলা হয়। এই বিদ্যা দিয়ে কী হবে? তারা করপোরেট হাউসের স্যুট-বুট-টাইপরা কেরানি হবে অথবা সরকারি অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারী হওয়া, তাদের অর্থবিত্ত-যশ-খ্যাতি দরকার অর্থাৎ স্বার্থবাদী চিন্তা, দেশ দশের কল্যাণে এই বিদ্যায় কাজ হবে না, বলতে পারো ৯৫ ভাগ এরাই। ৫ ভাগের বিদ্যা অর্জনের উদ্দেশ্য থাকে জ্ঞান অর্জন। শুধু এদের পুরো দোষ দিয়ে কী লাভ? এদের যারা শিক্ষা দেয়, ওই শিক্ষকরাও তেমন বিদ্বান লোক না। যিনি গণিতের শিক্ষক, তিনি গণিতের উপর কিছুটা দক্ষতা রাখেন, যতটুকু ক্লাস বা কোচিং চালানোর জন্যে দরকার একইভাবে ইংরেজি, বাংলা বা অন্য কোনো বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের একই অবস্থা। এমতাবস্থায় আমাদের দেশের পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে।
শওকত আলী ও আখতারুজ্জামান ইলিয়াস দুজনই ছিলেন জাতশিক্ষক। তাই শিক্ষা নিয়ে ত্রুটি-বিচ্যুতি অথবা বাণিজ্যকরণ তাঁরা মেনে নিতে পারেননি। শওকত আলী জগন্নাথ কলেজে যোগদান করেন ১৯৬২ সালে। দীর্ঘ ২৫ বছর জগন্নাথে শিক্ষকতা করার পর ১৯৮৭ সালে গেজেটিয়ার ঢাকা হেড অফিসে উপপরিচালক হিসেবে যোগদান করেন। পরে পরিচালক পদে পদোন্নতি পেয়ে ১৯৮৯ সালে সংগীত মহাবিদ্যালয়ে অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৯৩ সালে অবসরে যান।
আখতারুজ্জামান ইলিয়াস জগন্নাথ কলেজে প্রবেশ করেন ৮ আগস্ট ১৯৬৫ সালে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে, পরে স্থায়ী লেকচারার, সহকারী অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক রূপে ২১ বছর শিক্ষকতা করার পর ১৯৮৬ সালে সেপ্টেম্বর মাসে তিনি জগন্নাথ কলেজ থেকে বদলি হয়ে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের উপপরিচালক পদে যোগদান করেন। তিনি যোগদানের পর থেকে এ অফিসের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের দুর্নীতির বিষয়ে কঠোর হতে থাকেন। এই সময়ের বেশ কিছু মজার ঘটনার বিবরণ দিয়েছিল তার কলিগ মির্জা হারুণ-অর রশিদকে। যেমন- মফস্বল শহরগুলোতে ট্যুরে গেলে কয়েকদিন থাকতে হতো। সেখানে তার খাবারের জন্য পোলাও, বিরিয়ানি, বড় বড় কৈ মাছ, রুই মাছ ইত্যাদির ব্যবস্থা করা হলে স্থানীয় কর্মচারীরা দেখে তাদের এ অফিসার ভিন্ন জাতের, ভিন্ন মনোবৃত্তির। তিনি তার পিয়নকে দিয়ে নিজেই রান্নার ব্যবস্থা করেছেন আলুভর্তা আর ডিম ভাজা। কর্মচারীরা তো অবাক! কারণ, এর আগে যারাই এসেছেন কব্জির সমান কৈ মাছ, মাগুর মাছ, বড় রুই মাছ ইত্যাদির অর্ডার দিয়েছেন এবং পরবর্তী বেলার মেন্যু ঠিক করে দিতেন। ফিরে আসার দিন দেখেন তাঁর গাড়িতে মিষ্টির প্যাকেট। খোঁজ নিয়ে জানলেন স্থানীয় কর্মচারীরা তাকে ঢাকার বাসায় নিয়ে যাওয়ার জন্যে দিয়েছেন। তিনি গাড়ি থেকে নেমে দোকানে জিজ্ঞাসা করে দাম মিটিয়ে দিলেন। [স্মৃতি-বিস্মৃতির জগন্নাথ কলেজ, মির্জা হারুণ-অর-রশিদ]
এ দুজন কথাসাহিত্যিক ও মহান শিক্ষকের বয়ান থেকে আমরা শিক্ষার হালহকিকত সম্পর্কে জানতে পারি, কীভাবে শিক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস হচ্ছে তা জানতে পারি।
বাংলাসাহিত্যের এই দু’অসাধারণ কীর্তিমান কথাসাহিত্যিকের গল্প-উপন্যাস-শিল্পসাহিত্যের বিষয় ও কাহিনীতে বর্ণিত হয়েছে সমাজের নিম্ন আয়ভুক্ত প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবন ও জীবিকা, সংকট ও সংগ্রাম, সুখ-দুঃখ ও হাসিকান্না। যে মানুষের জন্য তাদের সাহিত্য রচনা তারা একটা অংশ নিরক্ষর। আর যে অংশটা লেখাপড়া জানে তাদের অবসর বা বিশ্রাম খুব কমই থাকে। অবসরের ফাঁকে তারা যতটুকু সময় পায়, তারা টিভি দেখতে বসে, টিভিতে তাদের কি দেখানো হচ্ছে ভারতীয় জি-বাংলা, জি সিনেমা বা স্টার জলসাতে পাখি; ‘কিরণমালা’, সাত ভাই চম্পা ইত্যাদি অথবা বাংলাদেশি চ্যানেলগুলোতে পরিবেশিত অনুষ্ঠানমালা, যাতে এসব কাহিনী বা ঘটনায় তাদের জীবন ও জীবিকার সঙ্গে কোনো সঙ্গতি নেই। তারা এসব নাটক-সিনেমা বা অনুষ্ঠানাদিতে কি দেখে? পোশাক-পরিচ্ছদ, গয়না ও সাজ-গোঁজ, নাচন-কুদনের ফলে পাখির পোশাকের জন্য বাংলাদেশি মেয়েরা আত্মহত্যা করে। শওকত আলী ও ইলিয়াস বা অন্য কোনো সৃজনশীল লেখকের নাটক নিয়ে কিংবা তাদের গল্প-উপন্যাস অবলম্বনে ২-৪টি সিনেমা নির্মিত হয়েছে। যেমন ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ ‘পদ্মা নদীর মাঝি’, ‘লাল সালু’ ও শওকত আলীর ‘উত্তরের খেপ’ এই পর্যন্তই। তাই শওকত আলী ও আখতারুজ্জামান ইলিয়াস যাদের জন্য লিখেছেন, তাদের কাছে অপরিচিত রয়ে গেছেন। অন্যদিকে মধ্যবিত্তদের বড় একটা অংশ ঘুষ-দুর্নীতি ও লুটপাট করে সম্পদ আহরণ করছে, তাদের আর্থিক জীবন যেমন দুর্বৃত্তায়নের কবলে, তাদের সংস্কৃতিও সেভাবেই গড়ে উঠেছে। তারা পাঁচতারকা হোটেলে গিয়ে হাজার হাজার টাকা খরচ করলেও পাঁচশ-এক হাজার টাকা খরচ করে বই কিনতে অপারগ। তাদের সাংস্কৃতিক মান এত নিম্নস্তরে নেমেছে যে, শওকত আলী ও আখতারুজ্জামান ইলিয়াস তাদের কাছে অপরিচিত বটে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বা নজরুলের কদরও তাদের কাছে নেই।
ইলিয়াস ভাইয়ের প্রথম উপন্যাস ‘চিলেকোঠার সেপাই’ ধারাবাহিকভাবে সাপ্তাহিক রোববারে ১৯৮৩ জানুয়ারিতে শেষ হলেও তা গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় ১৯৮৬’র অক্টোবরে। এরপর এই উপন্যাস যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত করে। তার দ্বিতীয় এবং শেষ উপন্যাস ‘খোয়াবনামা’ প্রকাশিত হয় ১৯৯৬-এর ফেব্রুয়ারিতে। এই উপন্যাসের জন্য তিনি ওই বছরই আনন্দ পুরস্কার লাভ করেন। আখতারুজ্জামান দুই বাংলার লেখক পাঠক সুধীমহলে সমমর্যাদা লাভ করেন। তার গ্রন্থের ভূমিকা লিখতে গিয়ে প্রখ্যাত লেখিকা মহাশ্বেতা দেবী লিখেন কী পশ্চিমবাংলা কী বাংলাদেশ সব মেলালে আখতারুজ্জামান শ্রেষ্ঠ উপন্যাস লেখক। তার চিলেকোঠার সেপাই উপন্যাসের সংলাপে ও বাক্যবয়ানে কাম্য ভাষার অনন্য বর্ণনারীতি সকল পাঠককে মুগ্ধ করেছে।
আখতারুজ্জামান ইলিয়াস ১৯৪৩ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি গাইবান্ধা জেলার গোটিয়ায় মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তার পৈতৃক নিবাস বগুড়া শহরের নিকটবর্তী চেলোপাড়ায়। তার পিতা বদিউজ্জামান মুহম্মদ ইলিয়াস পূর্ববঙ্গ প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য (১৯৪৭-১৯৫৩) ছিলেন। তিনি বগুড়া জেলা থেকে ম্যাট্রিক (১৯৫৮), ঢাকা কলেজ থেকে আইএ (১৯৬০), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ অনার্স ১৯৬৩ ও এমএ ১৯৬৪ পাস করেন। তিনি হাড়ে ক্যান্সার রোগে আক্রান্ত হয়ে ১৯৯৭ সালের ৪ জানুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুতে দুই বাংলার জ্ঞানী-গুণী, লেখক-শিল্পী, পাঠক, সুধীজন সর্বোপরি সর্বস্তরের মানুষের মাঝে শোকের ছায়া নেমে আসে।
বাংলাসাহিত্যের অন্যান্য প্রতিভাধর কথাসাহিত্যিক শওকত আলীর প্রত্যেকটি উপন্যাস ও গল্প পাঠক মহলে যথেষ্ট সমাদৃত হলেও তার ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’ বাংলা সাহিত্যে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছে। ইতিহাসনির্ভর এই উপন্যাসটি বিষয় বৈচিত্র্যে ও কাহিনী বর্ণনায় লেখকের নিজস্ব রীতির পরিচয় বহন করেছে।
শওকত আলীর সঙ্গে আখতারুজ্জামানের বহু জায়গায় মিল রয়েছে, জন্ম, মৃত্যু, চাকরি ও আদর্শগতভাবে। শওকত আলীও ১২ ফেব্রুয়ারি ১৯৩৬ সালে পশ্চিমবঙ্গের রায়গঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৫১ সালে ম্যাট্রিক ফার্স্ট ডিভিশনে রায়গঞ্জের করনেশন হাইস্কুল থেকে পাস করেন। ১৯৫৩ সালে দিনাজপুরে সুরেন্দ্রনাথ কলেজ থেকে আইএ এবং ১৯৫৫ সালে বিএ পাস করেন। শওকত আলী ১৯৬৮ সালে বাংলা একাডেমি, ১৯৭৭ সালে হুমায়ুন কবির স্মৃতি পুরষ্কার, ১৯৯০ সালে একুশে পদক, ২০১৪, সালে হুমায়ুন আজাদ পুরস্কারসহ বহু পুরস্কার লাভ করেন।
মহান এই কথাশিল্পী গত ২৫ জানুয়ারি ২০১৮ এ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার বয়স হয়েছিল ৮২ বছর। তার স্ত্রী শওকত আরা ১৯৯৬ সালে ক্যান্সার রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি তিন পুত্র সন্তানের জনক।

সাপ?তাহিক পতিবেদন

 মতামত সমূহ
পিছনে 
 আপনার মতামত লিখুন
English বাংলা
নাম:
ই-মেইল:
মন্তব্য :

Please enter the text shown in the image.