পরাশক্তিগুলো কী চায় : কোন পথে দক্ষিণ এশিয়া! -আনিস রায়হান

Print Friendly and PDF

খুব দ্রুত বদলে যাচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি। এ অঞ্চল ঘিরে জোর গতিতে তৎপর রয়েছে পরাশক্তিগুলো। ভারত মহাসাগরকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে শুরু হয়েছে নানামুখী পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রতিযোগিতা। ফলে স্বাভাবিকভাবেই উত্তেজনা দানা বাঁধছে। শক্তিগুলো একে অপরের মুখোমুখি দাঁড়াচ্ছে। এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশগুলো সামরিকায়ন বৃদ্ধির পথে হাঁটছে।
ভারত মহাসাগর অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের একাধিপত্য এখন চ্যালেঞ্জের মুখে। ভেঙে পড়ছে তার নেতৃত্বাধীন একমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা। দক্ষিণ চীন সাগরের পর এখন ভারত মহাসাগর এলাকায় চীন তার প্রভাব বিস্তার করতে চায়, এ রকম ধারণা ছড়িয়ে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত এ অঞ্চলে চীনের অগ্রগতি রোধ করতে বদ্ধপরিকর। কিন্তু চীনা পরিকল্পনা মোকাবিলার উপযোগী কোনো অস্ত্র এখনও তারা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে পারছে না। মালদ্বীপে ভারতের প্রথম প্রচেষ্টাও মুখ থুবড়ে পড়তে বসেছে।
পরিস্থিতি নির্দেশ করছে, অচিরেই এ অঞ্চলে বিশ্ব রাজনীতির নানা উপাদান সক্রিয় হয়ে উঠবে। যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে নয়া পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। সেই পরিকল্পনা মোতাবেক এশিয়ায় ন্যাটোর মতো একটি ছায়া সংগঠন গড়ে তুলতে কাজ করছে তারা। এ অবস্থায় কোথায় আছে বাংলাদেশ? দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের জনগণেরই বা দম নেয়ার ফুরসত কতখানি? কত দ্রুত এগুচ্ছে পরাশক্তিগুলো? এই উত্তেজনার পরিণতি কী? এসব প্রশ্নের জবাব জরুরি।

মালদ্বীপে কী ঘটছে
ভারত ও মালদ্বীপের সম্পর্ক এবং এই সম্পর্ক নিয়ে মালদ্বীপের পক্ষ থেকে বৈষম্যের অভিযোগ নতুন কিছু নয়। শুধু মালদ্বীপ নয়, দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের প্রায় সব দেশেই ভারতবিরোধী মনোভাব চাঙা। ১৯৮১ সালে মালদ্বীপের সঙ্গে পক্ষপাতমূলক একটি বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করে ভারত। সেই চুক্তি অনুসারে, তারা মালদ্বীপের প্রয়োজনীয় সমস্ত পণ্য সরবরাহ করে। আর মালদ্বীপে উৎপাদিত পণ্য সহজে ভারতে রপ্তানি করতে পারে মালে। কিন্তু গত ডিসেম্বরে চীনের সঙ্গে করা মুক্তবাণিজ্য চুক্তির (এফটিএ) ফলে মালদ্বীপে বানের জলের মতো চীনা পণ্য ঢোকার সুযোগ পেতে যাচ্ছে। মালদ্বীপের লাভ হলো এ চুক্তির ফলে মাছ ছাড়াও তাদের আরও প্রায় ৪০০ পণ্য চীনে প্রবেশের ক্ষেত্রে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। আর সীমিত শুল্কে মালদ্বীপে শিল্পপণ্য রপ্তানি করতে পারবে চীন। অবশ্য মালদ্বীপের স্থানীয় পণ্যের বাজারেও চীনের পরোক্ষ বিনিয়োগ ঘটছে, ঘটবে। ফলে শুল্ক সুবিধা উভয় দিক থেকে চীনারাই ভোগ করবে এমন আশঙ্কা বাতিল করা যায় না। স্বাভাবিকভাবেই ভারত এতে চটেছে।
শুধু নতুন এফটিএ নয়, ২০১৩ সালে প্রেসিডেন্ট আবদুল্লা ইয়ামিন মালে বিমানবন্দর পরিচালনাকারী ভারতীয় কোম্পানি জিএমআরের চুক্তি বাতিল করেন। ইয়ামিন প্রশাসন আরও কিছু পদক্ষেপ নেয় ভারতকে উত্তেজিত করার মতো। যেমন, ভারতের রাডার স্থাপন প্রকল্পের ব্যাপারে গতি কমিয়ে দেয় মালে। দ্বিতীয়ত, দক্ষিণের দ্বীপগুলো থেকে ভারতের প্রতিষ্ঠান এবং উপস্থিতি কমিয়ে দিতে থাকে ইয়ামিন সরকার, যেখানে চীনের বড় অঙ্কের বিনিয়োগ রয়েছে। এগুলো হলো মালে-হুলহুল মৈত্রী সেতু, হুলহুমালে এবং লামু দ্বীপের সম্ভাব্য চীনা সামরিক ঘাঁটিকে ঘিরে রিয়েল স্টেট প্রকল্প।
২০১৭ সালে মালদ্বীপ যখন হঠাৎ ঘোষণা দিল তারা চীনা যুদ্ধজাহাজকে মালদ্বীপ সফরের অনুমতি দেবে, ভারত সে সময় মালের কাছে জরুরি বার্তা পাঠিয়ে জানায় যে, এই সিদ্ধান্ত ভারতের নিরাপত্তায় মারাত্মকভাবে বিঘœ ঘটাবে। ইয়ামিন জবাবে জানান যে, যুদ্ধজাহাজগুলো সৌজন্য সফরে আসছে এবং তিনি তাদেরকে প্রত্যাখ্যান করবেন না। এই ঘটনার পর প্রতিশোধ হিসেবে সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশিদকে ভারত সফরের অনুমতি দেয়া হয়। মালদ্বীপে যে সময় চীনা যুদ্ধজাহাজ সফর করে, ঠিক একই সময় আগস্টে নাশিদকে ভারত সফরের অনুমতি দেয়া হয়। আর এতেই চীনের দিকে পূর্ণ গতিতে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পান ইয়ামিন।
সম্প্রতি জানা যায় যে, গত বছর চীনের সঙ্গে এফটিএ সই করার কাছাকাছি সময়ে বেইজিং ও মালের মধ্যে  ‘প্রোটোকল অন এস্টাব্লিশমেন্ট অফ জয়েন্ট ওশান অবজারভেশন স্টেশন’ শীর্ষক এক চুক্তি সই হয়। চুক্তি অনুযায়ী মালদ্বীপে যৌথভাবে একটি ‘ভারত মহাসাগরীয় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র’ গড়ে তুলবে চীন। মালদ্বীপে যৌথভাবে একটি ‘ভারত মহাসারগীয় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র’ গড়ে তুলতে চীন যে প্রস্তাব দিয়েছে তা ভারতের জন্য নতুন নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। নয়াদিল্লি আশঙ্কা করছে এই পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের সামরিক ব্যবহারও থাকবে এবং সাবমেরিন ঘাঁটি হিসেবে এটি ব্যবহার করা হতে পারে।
দেশটির উত্তর পশ্চিমে ক্ষুদ্র দ্বীপ (এটল) মাকুনুধু অঞ্চলে এর অবস্থান। ভারত থেকে স্থানটির দূরত্ব বেশি নয়। আবার এর ঠিক পাশ দিয়েই বয়ে গেছে বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত শিপিং লাইন। তাছাড়া ওই সমুদ্রপথের ১.৫ ডিগ্রি চ্যানেলে অবাধ প্রবেশ ও তা ব্যবহারের সুযোগ পেতে চীন মালের সঙ্গে দেনদরবার চালাচ্ছে। এটা তার ভারত মহাসাগর কৌশলের খুবই গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বেইজিং গত বছর দক্ষিণ চীন সাগরে (এসসিএস) একই ধরনের অবজারভেটরি নির্মাণের ঘোষণা দেয়ায় অন্য পরাশক্তিগুলোর জন্য মালদ্বীপের প্রকল্পটি উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। স্বাভাবিকভাবেই কলকাঠি নাড়তে শুরু করে ভারত ও তার মিত্ররা।
৫ ফেব্রুয়ারি মালদ্বীপের রাজনীতি মোড় নিতে দেখা যায়। সুপ্রিম কোর্ট এক আদেশে বিরোধী নেতাদের মুক্তির আদেশ দেন। এই নেতারা বেরিয়ে এলে সংসদে বিরোধী দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা সৃষ্টি হয় এবং এর মধ্য দিয়ে ইয়ামিন সরকারের পতন নিশ্চিত হতে পারত। কিন্তু আদালতের রায়ের পর মালদ্বীপে ১৫ দিনের অন্তর্বর্তীকালীন জরুরি অবস্থা জারি করেন প্রেসিডেন্ট আব্দুল্লা ইয়ামিন। জরুরি আইন আরোপের আগে সাবেক প্রেসিডেন্ট আবদুল গাইয়ুম ও সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতিকে গ্রেপ্তার করে ইয়ামিনের পুলিশ। পুরো ব্যাপারটি ইয়ামিন সামাল দেন কার্যত সামরিক বাহিনীর সহায়তায়। আদালতের রায়ের পর সংসদ ঘেরাও করে প্রেসিডেন্টের পক্ষে অবস্থান নেয় সেনাবাহিনী। মালদ্বীপে জরুরি অবস্থা জারি এবং দ্বিতীয় দফায় এর মেয়াদ ৩০ দিন বাড়ানোর পর কঠোর প্রতিক্রিয়া জানিয়ে একাধিক বিবৃতি দিয়েছে ভারত।
সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশিদ আগে থেকেই দেশের বাইরে ছিলেন। বর্তমানে তিনি আছেন ভারতে। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তিনি দ্য হিন্দু পত্রিকাকে বলেছেন, ‘একটিও গুলি না ছুঁড়ে চীন এতটা জমি দখল করে নিয়েছে, যেটা ঔপনিবেশিক যুগে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিও করতে পারেনি। তারা বিদেশি বিনিয়োগকে তাদের অস্ত্র বানিয়ে তুলেছে।’
বিপরীতে চীনা বার্তা সংস্থা সিনহুয়া তাদের এক বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে এটা স্মরণ করিয়ে দিতে ভোলেনি যে, প্রেসিডেন্ট ইয়ামিন কিন্তু চীনকে মালদ্বীপে আনেননি, এই কৃতিত্ব প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশিদের। ভারতের আপত্তি সত্ত্বেও ২০১১ সালে চীনকে মালেতে দূতাবাস চালুর অনুমতি দেন নাশিদ এবং মালদ্বীপে চীনের অর্থনৈতিক উপস্থিতির দুয়ার উন্মুক্ত করে দেন। নাশিদের বর্তমান চীনবিরোধী অবস্থানের নেপথ্যে নিশ্চয়ই বড় কোনো ‘অফার’ আছে বলে মনে করে সিনহুয়া। এতে যে মালদ্বীপের ক্ষমতার কলকাঠি নাড়াচাড়া নিয়ে ভারতের ভূমিকাকে ইঙ্গিত করা হয়েছে সেটা স্পষ্ট।
ইয়ামিন প্রশাসনের সূত্র ধরে সম্প্রতি চীনা বার্তা সংস্থাগুলো জানিয়েছে যে, মালের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করার জন্য যে তিন বিচারপতি আদেশ দিয়েছিলেন, তাদের একজনের কাছে ২ লাখ ২০ হাজার ডলার বেহিসাবি অর্থ রয়েছে। দ্বিতীয় একজন বিচারপতির কাছে একটি প্রাইভেট ফার্ম থেকে ২.৪ মিলিয়ন ডলার হস্তান্তর করা হয়েছে। ইয়ামিন সরকার মনে করে মালদ্বীপের ক্ষমতার পালাবদল চেষ্টার পেছনে স্পষ্টতই ‘বিদেশি হাত’ রয়েছে। এর তদন্তে সহায়তার জন্য বেশ কিছু বিদেশি সরকারের দ্বারস্থ হয়েছে তারা। শ্রীলংকা, মালয়েশিয়া, নেদারল্যান্ডস এবং ব্রিটেনের সঙ্গে ভারতও রয়েছে সন্দেহের তালিকায়। এসব দেশে গত এক বছরে সফর করেছেন কেলেঙ্কারিতে জড়িত ওই বিচারপতিরা।
সাবেক ভারতীয় কূটনীতিক এমকে ভাদ্রকুমার সম্প্রতি এক কলামে লিখেছেন, ‘প্রিয় দেশে গণতন্ত্রকে এগিয়ে নেয়ার জন্য মালেতে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের কর্মকাণ্ডের রহস্য আরও ঘনীভূত হচ্ছে। দেখা যাচ্ছে, গণতন্ত্র খুব একটা সস্তায় আসে না। আমরা জানি না মালদ্বীপে গণতন্ত্রকে এগিয়ে নিতে কে এত অর্থ খরচ করছে। অন্তত এখনও আমরা জানি না। কিন্তু মালদ্বীপ এত ছোট একটা দেশ যে এখানে কোনো রহস্যই বেশি দিন গোপন থাকে না।’
ঘটনা যাই ঘটুক, এটা পরিষ্কার যে, মালেতে ভারতের পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়েছে। ১৯৮৮ সালে যেভাবে ভারতীয় বাহিনী দেশটিতে সামরিক অভিযান চালিয়েছিল, এবারও তেমন পদক্ষেপ নিতে আহ্বান জানিয়েছিলেন ভারতের মিত্র মোহাম্মদ নাশিদ। কিন্তু চীন তার ১১টি যুদ্ধজাহাজের এক বহর পাঠিয়েছে পূর্ব ভারত মহাসাগরে। ফলে ভারতের প্রকাশ্য তৎপরতা এখনও আলোচনা-বিবৃতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে উত্তেজনা
ভারত-চীন দ্বন্দ্ব এখন দক্ষিণ এশিয়ার সব প্রান্তেই প্রকাশ্য। যদিও ভারতের তুলনায় চীনের অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি অনেকগুণ বেশি, তবু সমানে সমানে পাল্লা দেয়ার নীতিতেই এগিয়ে চলেছে নয়াদিল্লি। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, অল্পদিনের ব্যবধানেই পুরো দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতকে পেছনে ফেলে এগিয়ে গেছে চীন। এই মুহূর্তে পাকিস্তান, মিয়ানমার, নেপাল, মালদ্বীপ ও শ্রীলঙ্কায় ভারতের চেয়ে চীনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবই বেশি সক্রিয়। ভারতের অপেক্ষাকৃত ঘনিষ্ঠ মিত্র বাংলাদেশ ও ভুটানেও চীন তার প্রভাব বিস্তারে সক্রিয় রয়েছে।
বিপুল বিনিয়োগ, বন্দর, করিডর পেরিয়ে চীন-পাকিস্তান সম্পর্ক তো নতুন উচ্চতায় উঠেছে। ডলারের পরিবর্তে চীনের সঙ্গে লেনদেনে ইউয়ান ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে পাকিস্তান। এ জন্য পাকিস্তানে খোলা হয়েছে চীনা ব্যাংকের শাখা। ফলত ট্রাম্পের টার্গেটে পরিণত হয়েছে ইসলামাবাদ। আফগান ফ্রন্টে পাকিস্তানকে ঝামেলায় ফেলতে সেখানে ভারতের প্রভাব বৃদ্ধির চেষ্টা করছে আমেরিকা। ট্রাম্প সেখানে সেনাসংখ্যা ও যুদ্ধের তীব্রতা বাড়িয়েছেন। আফগান কর্তৃপক্ষ দিনে দিনে যেন পাকবিরোধী হয়ে উঠছে। পাকিস্তানের শাসকরা অবশ্য এখনই খাদে পড়ছে না। তার সবচেয়ে বিশ্বস্ত মিত্র চীন ইতোমধ্যে আফগানিস্তানে প্রবেশ করেছে এবং দেশটিকে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডরে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছে। চীন সম্প্রতি আফগানিস্তানের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতার সম্পর্কও স্থাপন করেছে। রাশিয়াও এগিয়ে আসছে আফগান ফ্রন্টে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধবিগ্রহ থেকে পলাতক জঙ্গিরা আফগানিস্তানে ঢুকছে মর্মে অভিযোগ করে তারা সেখানে হস্তক্ষেপের সুযোগ চায়। সাবেক সোভিয়েতভুক্ত এলাকা হিসেবে আফগানিস্তানে বন্ধু খুঁজে নিতে পুতিনের তেমন কষ্ট হওয়ার কথা নয়। আফগান ফ্রন্টে যুক্তরাষ্ট্রকে বেকায়দায় ফেলা এবং মধ্যপাচ্যে নিজেদের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনা নিয়ে এগুচ্ছে চীন ও রাশিয়া। পরিস্থিতি নির্দেশ করছে দক্ষিণ এশিয়া ক্রমশ পরাশক্তিগুলোর শক্তি প্রদর্শনের মঞ্চ হয়ে উঠছে।
এই দ্বন্দ্বে ট্রাম্প প্রশাসনও যে ওবামা প্রশাসনের মতো করেই ভারতকে সামনে ঠেলে দিয়ে স্বার্থোদ্ধার করতে চায়, এটা পরিষ্কার। সেটাই আমরা দেখতে পাচ্ছি। মার্কিন-চীন নয়, দ্বৈরথে মুখোমুখি দেখা যাচ্ছে চীন-ভারতকে। যুদ্ধের আশঙ্কা মাথায় নিয়েই তারা ভুটানের দোকলাম মালভূমিতে মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছিল গত বছর। সেখান থেকে সেনা প্রত্যাহার করার অল্প কিছুদিন পরই ভারত জানুয়ারিতে আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক মিসাইল উৎক্ষেপণ করেছে। বলা হচ্ছে যে, এই অস্ত্র ৫০০০ কিলোমিটার দূরত্বে আঘাত হানতে পারবে এবং এটা যে চীনের উত্তরাঞ্চল পর্যন্ত পৌঁছতে পারবে, সেটা প্রকাশে কোনো রাখঢাক রাখেনি ভারত। এর এক মাস পরেই পূর্ব ভারতের উড়িষ্যায় পারমাণবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম পৃথ্বি-২ মিসাইল পরীক্ষা করা হয়।
চীনও অত্যাধুনিক স্টিলথ জঙ্গিবিমান মোতায়েন করেছে ভারত সীমান্তের কাছেই। নেপালে তারা ভারতবিরোধী রাজনৈতিক ব্লক গড়ে তুলতে ভূমিকা রেখেছে। ভারতের হস্তক্ষেপে উৎখাত হওয়ার অভিযোগ তোলা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খাদক প্রসাদ অলী এবার ভোটে জিতে ক্ষমতায় এসেছেন। শ্রীলঙ্কায় ভারত কর্তৃক উৎখাত হওয়ার অভিযোগ তোলা সাবেক প্রেসিডেন্ট রাজাপাকসে বিপুল ভোটে স্থানীয় নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় আসার প্রান্তে রয়েছেন। বর্তমান প্রেসিডেন্ট সিরিসেনার সরকারও চীনের দিকে হেলে পড়তে বাধ্য হয়েছে। ঋণের মাধ্যমে চীনকে তারা বন্দর দিয়েছে। ঋণ শোধের সম্ভাবনা কমই, সুতরাং চীন সেখানে স্থায়ী আসনই পেতে যাচ্ছে। এছাড়া ভারতকে চাপে রাখা বা বেকায়দায় ফেলার জন্যে চীনের রয়েছে পাকিস্তান ও মিয়ানমারের মতো কৌশলগত ঘুঁটি। ভারতের হাতে চীনকে চাপে ফেলার মতো তেমন কোনো অস্ত্র নেই।
কিন্তু ভারত সরকারের চেষ্টা-পদক্ষেপ বলছে, তারা বসে থাকবে না। যুক্তরাষ্ট্রও যেহেতু ইতোমধ্যে সক্রিয় হয়েছে, ফলে তাদের বসে থাকার তেমন কোনো কারণও নেই। মার্কিন নীতির অনুপস্থিতির সুযোগে চীন এই অঞ্চলে তার প্রভাব যতটা বিস্তার করেছে, এখন ভারত ও মার্কিনকে জোটবদ্ধ হয়ে তা বিনষ্ট করতে হবে। ফলে মার্কিন তার ঘনিষ্ঠ মিত্রদের এই অঞ্চলে ডেকে পাঠাচ্ছে। যা কিনা পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করবে।

ভারত মহাসাগরে স্নায়ুযুদ্ধ
পরাশক্তিগুলো এখন ভারত মহাসাগরে তাদের শক্তিবৃদ্ধি ঘটাচ্ছে। বিদেশি তেলের ওপর নির্ভরশীলতা এবং এই অঞ্চলের অন্যান্য বিষয়ের প্রতি আগ্রহের কারণে ভারত মহাসাগরে দীর্ঘ মেয়াদি ভিত্তিতে চীনের নজর দেয়াটা একপ্রকার নিশ্চিতই ছিল। চীনা সেনাবাহিনীর মুখপত্র পিএলএ ডেইলির সাম্প্রতিক এক সম্পাদকীয়তে বলা হয়, ‘যে সমুদ্রসীমায় চীনের নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী আগে কখনো যায়নি, সেখানে গিয়ে চীনের মহড়ার আয়োজন করা উচিত।’ পিএলএ নৌবাহিনী সাধারণত পীতসাগর এবং পূর্ব চীন সাগরে মহড়ার আয়োজন করে থাকে। কিন্তু এখন বিশ্বের অন্যান্য জায়গাতেও চীনা যুদ্ধজাহাজের উপস্থিতি প্রত্যাশা করছে তারা।
শুধু প্রত্যাশা নয়, চীন এখন তার আর্থিক শক্তিকে কাজে লাগাতে শুরু করেছে। ভারত মহাসাগরের উপকূলীয় এলাকাগুলোতে নৌ ও সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ শুরু করেছে তারা। জিবুতিতে গত বছর সেনাঘাঁটি উদ্বোধন করা হয়েছে। পাকিস্তানের গোয়াদরে বা এর কাছাকাছি কোনো এলাকায় তারা নয়া সেনাঘাঁটি স্থাপন করতে যাচ্ছে। মালদ্বীপের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে ‘ভারত মহাসারগীয় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র’ স্থাপনের। সে দেশে চীন আরও একটি সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের পরিকল্পনা করছে বলেও অভিযোগ আছে। পূর্ব আফ্রিকা ও মধ্য/পূর্ব ভারত মহাসাগরেও তারা ঘাঁটি স্থাপন করতে পারে।
এর জবাবে ভারত মালাক্কা প্রণালির কাছে নিজেদের আন্দামান ও নিকোবর আইল্যান্ডে ঘাঁটি গাড়ছে, শ্যাসেলস ও মরিশাসের মতো দ্বীপেও ছুটে গেছে তারা। ভারত ও ফ্রান্সের মধ্যে সাম্প্রতিক কৌশলগত চুক্তির ফলে ভারতের স্থাপনা ব্যবহার করে ফরাসিরাও জিবুতি ও রিইউনিয়নের মতো স্থানে ভারত মহাসাগরীয় উপস্থিতি নিশ্চিত করতে পারে। ভারত ও ওমানের সর্বশেষ চুক্তি অনুযায়ী লজিস্টিকস ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ওমানের দোকম বন্দরে ভিড়তে পারবে ভারতীয় নৌবাহিনীর জাহাজ। ভারতের কৌশলগত তেল মজুদের জন্য দোকমে স্থাপনাও গড়া হতে পারে।
এই দুই শক্তির পাশাপাশি ভারত মহাসাগরে বেশ কয়েকটি নতুন ‘অ-ঐতিহ্যবাহী’ খেলোয়াড়ও সক্রিয় হয়েছে। একদিকে আছে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও তুরস্ক, অন্যদিকে আছে ইরান। ভারত মহাসাগরের উপকূলীয় আফ্রিকা অঞ্চলে এসব দেশ নানা ধরনের সামরিক প্রকল্প ও দুরভিসন্ধি নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। এমনকি বাংলাদেশ ও মালদ্বীপের দিকে নজর দিয়েছে সৌদি আরব। এই উভয় দেশই সৌদি আরবের সামরিক জোটে যোগ দিয়েছে। বাংলাদেশ ও মালদ্বীপে সৌদি আরবের প্রভাব বৃদ্ধি ভারতের জন্য ভিন্ন উদ্বেগের কারণ হয়েছে। তুর্কি নৌবাহিনীও ভারত মহাসাগরে ফিরছে। তারা তাদের আঞ্চলিক উপস্থিতি ইতোমধ্যেই তাৎপর্যপূর্ণভাবে বাড়িয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক আধিপত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান হলো ভারত মহাসাগর। এখানে তাদের দুটি নৌবহর ও বেশ কিছু সামরিক ঘাঁটি আছে। কিন্তু এজন্য তাদের বিপুল ব্যয় করতে হয়। দেশটির বর্তমান প্রশাসন বিনা মূল্যে এক পয়সাও খরচের পক্ষপাতি নয়। শুধু বৈশ্বিক কর্তৃত্বের নিশ্চয়তা নয়, যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান সরকার যে কোনো কার্যক্রমেই লাভ দেখতে চাইছে। ফলে ভারত মহাসাগরের এই সামরিকায়ন তাদের জন্য খুবই জরুরি, এমনকি হয়তো যুদ্ধও। যুক্তরাষ্ট্র অবশ্য সেজন্য সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট এবং ভারত, অস্ট্রেলিয়া ও জাপানের জোটকেই সামনে রাখতে আগ্রহী। এতে তাদের ক্ষতির আশঙ্কা যেমন কমে, তেমনি উঠতি শক্তিগুলোর অভ্যন্তরীণ এই দ্বন্দ্ব বড় শক্তি আমেরিকাকে নিরাপদও রাখে। গেল নভেম্বরে ভিয়েতনামে অনুষ্ঠিত এশিয়া-প্যাসিফিক ইকোনমিক কোঅপারেশন সামিটের ফাঁকে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার কূটনৈতিক কর্মকর্তারা আলাপ-আলোচনা করেন। এই চার দেশ ‘এশীয় ন্যাটো’ গঠন করতে যাচ্ছে বলে অভিযোগ তুলেছে চীনা গণমাধ্যমগুলো। এসব ঘটনা থেকে পরিষ্কার যে, নিকট ভবিষ্যতে ভারত মহাসাগরে উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পাবে।

নেপথ্যে চীন-যুক্তরাষ্ট্রের নয়া নীতি
আজকের এই অবস্থা একদিনে সৃষ্টি হয়নি। চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের গৃহীত নীতির ফলাফল হিসেবেই এই পরিস্থিতি উদ্ভূত হয়েছে। চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ পলিসি যদিও অর্থনৈতিক পরিকল্পনা হিসেবে অভিহিত হচ্ছে, কিন্তু কার্যত এই প্রকল্পে এত বেশি বিনিয়োগের পরিকল্পনা করা হয়েছে যে, এর সঙ্গে রাজনীতি ও সামরিক শক্তি চলে আসতে বাধ্য। এত বিপুল বিনিয়োগ করলে অবশ্যই বন্ধু ও অনুগত দাস সৃষ্টি হবে, তেমনি এই সম্পদের নিরাপত্তার প্রশ্নে সামরিক বাহিনীকেও যুক্ত হতে হবে। ফলে চীনা প্রেসিডেন্টের পরিকল্পনা আসলে সুপার পাওয়ার হওয়া। ফলে এই প্রকল্প যেসব অঞ্চলে বিস্তৃত হচ্ছে, সেসব এলাকায় চীনা প্রভাব বেড়েই চলেছে। পাশাপাশি চীনবিরোধীরা এসে সেখানে জুটছে, তারা সেখান থেকে সুবিধা নিতে চাইছে। এভাবে দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলে উত্তেজনা বৃদ্ধিতে নেপথ্য ভূমিকা পালন করছে চীনা নীতি।
যুুক্তরাষ্ট্রের ওবামা প্রশাসনের মেয়াদের শেষ দিকে প্রতিরক্ষা নীতির কেন্দ্র চলে আসে ‘এশিয়া পিভট পলিসি’। যার আওতাভুক্ত ছিল ভিয়েতনাম, চীন, জাপান, কোরিয়া, ইন্দোনেশিয়া, অস্ট্রেলিয়াসহ পূর্ব এশিয়ার প্রায় ২৩টি দেশ। আনিুষ্ঠানিকভাবে ইটকে ডাকা হতো ‘এশিয়া প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি’ নামে। এই পরিকল্পনার লক্ষ্য ছিল দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবকে নস্যাৎ করা এবং পূর্ব এশীয় অঞ্চলের দেশগুলোর সামরিকায়ন বৃদ্ধির মাধ্যমে সেখানে অস্ত্রবাণিজ্য সম্প্রসারিত করা। এই পরিকল্পনা এগিয়ে নিতে ওবামা প্রশাসন চীনের বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান নেয় এবং ভারত, ভিয়েতনাম ও অস্ট্রেলিয়াকে সামনে ঠেলে দেয়। এর ফলে দক্ষিণ চীন সাগরে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেতে থাকে। ওবামাকে চীনে অভ্যর্থনা না দিয়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে অপমানও করা হয়।
কিন্তু চীন, কোরিয়া, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনামসহ বিশ্বের প্রধান উৎপাদক রাষ্ট্রগুলো এ অঞ্চল ও তার আশেপাশে অবস্থিত হওয়ায় এখানে যে কোনো উত্তেজনা সৃষ্টি হলে বিশ্ববাণিজ্যে তার প্রভাব পড়ে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রও এর বাইরে থাকে না। তাছাড়া এ অঞ্চলে কোনো যুদ্ধ বাধলে ইউরোপ ও আমেরিকায় পণ্যের মূল্য দ্বিগুণ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করেন বাণিজ্য বিশ্লেষকরা। ফলে ট্রাম্প প্রশাসন ক্ষমতাগ্রহণের পর পরিস্থিতি পাল্টাতে শুরু করে। পূর্ব এশীয় অঞ্চলে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক শক্তিগুলোর উপস্থিতিকে বিশেষভাবে বিবেচনায় নেয় নতুন মার্কিন সরকার। ট্রাম্প প্রশাসন এশিয়া প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি থেকে বেরিয়ে আসায় বিপাকে পড়ে ভারত। তারা যেন কিছুটা হতোদ্যম হয়ে পড়ে। চীন এই সময়ে দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চালায়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র খুব দীর্ঘ সময় সিদ্ধান্তহীন থাকেনি। অল্পদিনের ব্যবধানেই তারা এগিয়ে এসেছে নয়া পরিকল্পনা নিয়ে।
ট্রাম্প প্রশাসন সম্প্রতি নতুন ‘মুক্ত ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক (এফওআইপি) কৌশল’ ঘোষণা করেছে। ফলে মার্কিন বাহিনীর মনোযোগ এখন দক্ষিণ চীন সাগর থেকে সরে ভারত মহাসাগরে চলে এসেছে। এই পরিকল্পনারও কেন্দ্রে থাকছে চীনকে মোকাবিলা করা। যুক্তরাষ্ট্র চাইছে, ভারত মহাসাগরে চীনের উত্থান ঠেকাতে, ইরান থেকে পাইপ লাইনে তেল এনে মিয়ানমারে থাকা পাইপলাইনের সঙ্গে তা সংযুক্ত করার চীনা চেষ্টা প্রতিরোধ করতে, আফগানিস্তানে চীনের উপস্থিতি মোকাবিলা এবং মধ্য এশিয়া তথা কাজাখ অঞ্চল থেকে পাইপলাইনে তেল সরবরাহের লাইন গড়ে তোলার চীনা লক্ষ্যকে নস্যাৎ করে দিতে। মার্কিনের এই লক্ষ্য ঘোষিত হতে না হতেই এই অঞ্চলে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করেছে। দ্রুতই সক্রিয় ভূমিকায় নেমেছে ভারত।

বাংলাদেশ কোথায়
দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ কৌশলগত দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ হলেও অন্য সব দিক থেকেই ক্ষুদ্র এক রাষ্ট্র। এ অঞ্চলে পরাশক্তিগুলোর এমন প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের অস্তিত্ব ও বিকাশের জন্য উদ্বেগজনক। বাংলাদেশের রাজনীতি ও অর্থনীতিতে তা ইতোমধ্যেই প্রভাব ফেলেছে। বাংলাদেশ সরকার যদিও ভারতের দিকে হেলে থেকে কৌশলে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখার নীতিতে এগুতে চাইছে, কিন্তু সম্প্রতি ভারতের সেনাপ্রধান বিপিন রাওয়াতের মন্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, ভারত এটা পছন্দ করছে না। বাংলাদেশ থেকে অবশ্য আশ্বস্ত করা হয়েছে যে, চীনের সঙ্গে সম্পর্কে ভারতের দুশ্চিন্তার মতো কিছু নেই। কিন্তু ভারত যে তাতে আশ্বস্ত হতে পারেনি, তারই প্রমাণ মিলল।
ভারতে বর্তমানে উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠন বিজেপি ক্ষমতায়। সেখানে তারা নানামুখী মুসলিমবিরোধী পদক্ষেপ নিচ্ছে। গরুর মাংস খাওয়ায় মানুষ সেখানে নিহত হচ্ছে। কাশ্মীরে মুসলিমদের ওপর নিপীড়ন, রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারতের অবস্থানও বাংলাদেশে অজানা নয়। আসামের প্রায় ৩০ লাখ মুসলিমকে ‘বাংলাদেশি’ আখ্যা দিয়ে তাদের ফেরত পাঠানোর দাবিতে আন্দোলনে আছে বিজেপি। সীমান্তে বাংলাদেশি হত্যা এখনও বন্ধ হয়নি। বাংলাদেশে এই বোধই বেশি শক্তিশালী যে, হাসিনা সরকার ভারতকে শুধু দিয়েই গেছে, তাদের কাছ থেকে কিছু পায়নি।
দুই দেশের আনুষ্ঠানিক বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের মধ্যেই যেহেতু এসব ঘটতে পারছে, সেহেতু, এই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ভিত্তি যে আসলে কতখানি নড়বড়ে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এটা চীন বা ভারতের অজানা নয়। ফলে ভারত চায় শক্তি প্রয়োগ করে এবং অনুগতদের দিয়ে নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত রাখতে। চীনও নানা কৌশলে এগিয়ে চলেছে। তারা আর্থিক শৃঙ্খলে বাঁধার কৌশলেই এতদিন এগিয়েছে। অচিরেই এ অঞ্চলের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও তারা রাজনীতির মাঠে কলকাঠি নাড়া শুরু করবে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই মুহূর্তের সামরিক পরিকল্পনার কেন্দ্র তিনটি। উত্তর কোরিয়া, ইরান ও আফগানিস্তান। এখন তারা আছে আফগানিস্তানে, এরপর তাদের লক্ষ্যবস্তু হিসেবে এক নম্বরে আসতে পারে ইরান। আফগান যুদ্ধের রণনীতির অংশ হিসেবে তারা এমন কিছু প্রস্তুতি গ্রহণ করছে, যা ইরানবিরোধী অক্ষকে সম্পূর্ণ করে তুলবে। ইরানকে মোকাবিলার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের মূল পরিকল্পনা হলো, মার্কিন সেনা বৃদ্ধি না করে এ অঞ্চলের স্থানীয় সেনাদের ব্যবহার করা। সৌদি নেতৃত্বাধীন ইসলামী সেনাবাহিনী গড়া হয়েছে সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই। এই বাহিনীতে পাকিস্তান এখনও পরিপূর্ণভাবে যুক্ত হয়নি। এর একটি কারণ হলো, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের কিছু দর কষাকষি বাকি আছে। আবার ইরানবিরোধী জোট নিয়ে পাকিস্তানের দ্বিধাও আছে।
বাংলাদেশ এই জোটে যেতে রাজি! কিন্তু পাকিস্তান, সৌদির সঙ্গে যখন এই বাহিনীতে মিসর ও তুরস্কের বাহিনী যোগ হবে, তখন বাংলাদেশের ভারত প্রভাবিত সরকারকে সঙ্গে নিয়ে এসব দেশ যুদ্ধে যেতে সাহস করবে না। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন পরিকল্পনা চূড়ান্ত রূপ ধারণ করলে, ইরানবিরোধী অক্ষ পরিপূর্ণরূপে গড়ে উঠলে পরাশক্তিগুলো, বিশেষত যুক্তরাষ্ট্র চাইবে বাংলাদেশে ক্ষমতার মঞ্চে পরিবর্তন আনতে। চীনও যে সে সময় সুবিধা হাসিলের চেষ্টা চালাবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
বাংলাদেশের রাজনীতিকরা এখনও এসব বিষয় আমলে নিচ্ছেন না। কিন্তু পুরো দেশের ঘুঁটি হতে আর খুব বেশি দেরি নেই। যেভাবে দ্রুত দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের গতি-প্রকৃতি পরিবর্তিত হচ্ছে, তাতে বৈদেশিক নিপীড়ন বৃদ্ধি ও স্থানীয় শাসক শ্রেণির মুৎসুদ্দি চরিত্র আরও প্রকাশ্য হয়ে উঠতে পারে। তাতে করে এতদিনে অর্থনীতির যে ভিত্তি অর্জিত হয়েছে, তা ধ্বংস হওয়ার আশঙ্কা প্রবল। দেশপ্রেমিকদের দরকার এগুলো এখনই আমলে নেয়া ।

বিশ্বের রূপান্তর
চতুর্দিকে দ্বন্দ্ব-হিংসা ও কট্টরপন্থার এই বাড়-বাড়ন্তের মধ্য দিয়েই এগিয়ে চলেছে বিশ্ব। এই কিছুদিন আগেও পৃথিবী ছিল একমেরুকেন্দ্রিক। এখন গড়ে উঠছে বহু মেরু। ছয় দশক আগে যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে তার আগ্রাসী শক্তি প্রদর্শন করেছে, চীন বা কারও পক্ষেই আর তেমনটা করা সম্ভব হচ্ছে না। বিশ্বজুড়ে মানুষের মধ্যে যুদ্ধবিরোধিতা আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় প্রবল। জ্ঞান-বিজ্ঞান, যোগাযোগ ও প্রযুক্তির মতো পরিবর্তন আসছে মানুষের চিন্তায়ও। চলমান অশান্তি, ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অনিশ্চয়তা মানবজাতির সামনে নানা প্রশ্ন হাজির করেছে। ফলে নতুন পথিবী গড়ার আন্দোলন এই ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকেই সূচিত হতে পারে।
দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের জনগণ দীর্ঘকাল ধরে স্থানীয় শাসকশ্রেণি ও সাম্রাজ্যবাদী নিপীড়নের মধ্যে আছেন। যে কোনো ঘটনায় এখানকার জনগণ বিক্ষোভে ফেটে পড়তে পারেন। পরাশক্তিগুলোর দ্বন্দ্ব অনেকেই পর্যবেক্ষণ করছেন। এসব রাষ্ট্রের ও স্থানীয় শাসকদের অপকর্ম ও চক্রান্ত অধিকাংশ মানুষের কাছেই প্রকাশ্য। ফলে পুরনো ও উঠতি সব পরাশক্তিকেই জনগণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে এবং আগের চেয়েও কঠিন লড়াই বাধবে, ইতিহাসের জ্ঞান এটাই নির্দেশ করে।

সাপ?তাহিক পতিবেদন

এই সময়/রাজনীতি
 মতামত সমূহ
পিছনে 
 আপনার মতামত লিখুন
English বাংলা
নাম:
ই-মেইল:
মন্তব্য :

Please enter the text shown in the image.