এবার জাফর ইকবাল! তারপর...? -গোলাম মোর্তোজা

Print Friendly and PDF

প্রতিক্রিয়াটা তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি হয়েছে, মানুষটির নাম অধ্যাপক মুহাম্মদ জাফর ইকবাল বলে। কিছু মানুষ হাহাকার করছেন। কিছু মানুষ ক্ষোভ-বিক্ষুব্ধ মনের প্রকাশ ঘটাচ্ছেন। আবার কিছু মানুষ উল্লসিত। উল্লসিত মানুষের একটা অংশ আবার কিছুটা আহতবোধ করছেন ‘হত্যা প্রচেষ্টা সফল’ হয়নি বলে। অবাক হওয়ার কিছু নেই। যে বাংলাদেশ আমরা নির্মাণ করেছি, এটা সেই বাংলাদেশের সম্পূর্ণ নয়, তবে একটা চিত্র। শুধু ড. জাফর ইকবালের ক্ষেত্রেই এমনটা ঘটছে, বিষয়টি মোটেই তেমন নয়। কবি শামসুর রাহমান, অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদ, অভিজিৎ, দীপনদের ক্ষেত্রেও এমনটা দৃশ্যমান হয়েছিল। আরও অনেকের ক্ষেত্রেই দৃশ্যমান হয়েছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একদল মানুষকে উল্লাস করতে দেখা যায়, হত্যাকা- ঘটানোর বা আক্রমণের পরে। সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেখা গেল অধ্যাপক মুহাম্মদ জাফর ইকবালের ক্ষেত্রে।
ড. জাফর ইকবাল আক্রান্ত হওয়ার পর, জঙ্গিবাদ-চাপাতি হত্যাকা-ের বিষয়গুলো আবার আলোচনায়। কিছুদিন এই আলোচনা চলবে। তারপর আবার থেমে যাবে। থামবে না তারা, যারা এই হত্যাকা- ঘটায়। আবেগি এই আলোচনার সময় কিছু কথা বলার চেষ্টা করব।

১. ড. মুহাম্মদ জাফর ইকবাল সহজ-সরল মানুষ। কথা বলেন এবং লেখেন অতি সহজ ভাষায়। ফলে ক্লাসে বা পাঠকের কাছে তিনি অত্যন্ত জনপ্রিয়। রাজনীতির মতো অতি জটিল বিষয়গুলো, অতি সরলভাবে বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেন। ইদানীং কোনো কোনো ক্ষেত্রে তার মতের সঙ্গে একমত হতে পারি না। দ্বিমত পোষণ করে লিখেছিও। সুস্থ এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী একজন মানুষ অধ্যাপক জাফর ইকবাল। তিনি ধর্মান্ধ-জঙ্গিবাদীদের টার্গেট বহু বছর ধরে। বেশ কয়েকবার তাকে মুরতাদ ঘোষণা করা হয়েছে। শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নামে হলের নামকরণকে কেন্দ্র করে জামায়াত-বিএনপির রোষানলে পড়েছিলেন তিনি।
উলামা লীগ, স্থানীয় আওয়ামী লীগ-যুবলীগ-ছাত্রলীগের রোষানলেও পড়েছেন তিনি। ভিসিবিরোধী আন্দোলনের সময় ড. মুহাম্মদ জাফর ইকবাল, ড. ইয়াসমিন হকসহ আরও কয়েকজন শিক্ষক ভিসিপন্থি ছাত্রলীগ দ্বারা লাঞ্ছিতও হয়েছেন।
জাফর ইকবালের শত্রু বহুবিধ। এখন অনেকে বিস্মিত হয়ে বলছেন ‘জাফর ইকবালের উপরও আক্রমণ হলো’! তাদের বিস্মিত হওয়া দেখে, বিস্মিত না হয়ে পারছি না। আক্রমণ তো জাফর ইকবালের উপরেই হবে। বহুবিধ শত্রু দ্বারা পরিবেষ্টিত জাফর ইকবাল কাদের দ্বারা আক্রান্ত হলেন, তার সঠিক অনুসন্ধান অতি জরুরি। প্রাথমিক অবস্থায় যা দেখা-জানা গেল, তা দেখে অনুমান করা যায়, তবে নিশ্চিত করে কিছু বলা যায় না। অনুমান করা যায় এই বিবেচনায় যে, পূর্বের হত্যা বা হত্যা প্রচেষ্টাগুলোর সঙ্গে বেশ মিল আছে, এই আক্রমণটির। সেদিক থেকে সাধারণ একজন সংবাদকর্মী হিসেবে ধারণা করতে পারি, আক্রমণটি ‘চাপাতি হত্যাবাজরাই’ করেছে। হুমায়ুন আজাদ, দীপন-অভিজিৎদের যারা হত্যা করেছিল, জাফর ইকবালকেও তারাই হত্যা করতে চেয়েছিল। আবারও বলি, এটা কোনো সিদ্ধান্ত নয়, ধারণামাত্র।

২. ড. মুহাম্মদ জাফর ইকবালের যে সাধারণ যাপিতজীবন, তার সঙ্গে একেবারেই বেমানান পুলিশ প্রহরায় চলাফেরা। রাষ্ট্র দিয়েছে, প্রয়োজনের তাগিদে নিরাপত্তার স্বার্থে পুলিশ পাহারা তাকে নিতে হয়েছে। তার সঙ্গে সবসময় একজন গানম্যান থাকেন। জালালাবাদ থানার আটজন পুলিশ সদস্য মুহাম্মদ জাফর ইকবালের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকেন। চারজন তার সঙ্গে এবং চারজন তার বাড়িতে অবস্থান করেন।
মুহাম্মদ জাফর ইকবাল আক্রান্ত হয়েছেন ৩ মার্চ বিকেল ৫.২০ মিনিটে। নিজের ক্যাম্পাসে। একটি বিভাগীয় পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে। মঞ্চে বসা কয়েকজনের সঙ্গে মুহাম্মদ জাফর ইকবাল। পেছনে দাঁড়ানো বেশ কয়েকজন। তাদের মধ্যে পত্রিকায় প্রকাশিত ছবিতে তিনজন পুলিশ সদস্যকে দেখা যাচ্ছে। দাঁড়ানো পুলিশ সদস্যের বাম পাশে দাঁড়িয়ে থাকা চার নম্বর ব্যক্তি আক্রমণকারী ফয়জুর, যিনি দাঁড়িয়ে আছেন মুহাম্মদ জাফর ইকবালের ঠিক পেছনে। জাফর ইকবালের ঘাড় ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা ফয়জুর চাকু দিয়ে আক্রমণ করেছে। এই আক্রমণকে ঘিরে কিছু প্রশ্ন-
ক. নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা চারজন পুলিশ সদস্য যে মঞ্চে ছিলেন, ছবি (তিনজনকে দেখা যাচ্ছে) তা প্রমাণ করছে। যার নিরাপত্তার জন্যে পুলিশ সদস্যরা নিয়োজিত, তার পেছনে না দাঁড়িয়ে, একটু দূরে চারজনের পরে দাঁড়িয়ে আছেন পুলিশ সদস্যরা। ছবিতে যে তিনজন পুলিশ সদস্যকে দেখা যাচ্ছে, তার মধ্যে দুজন মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত।
খ. হতে পারে, নিজেদের ক্যাম্পাস বলে পুলিশ হয়তো অতটা তৎপর ছিল না। অনুষ্ঠান তো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের। সেখানে বাইরের দর্শক থাকতেই পারেন। কিন্তু মঞ্চে কারা উঠবেন বা উঠছেন, তা দেখা অনুষ্ঠান আয়োজকদের দায়িত্ব। দায়িত্ব পুলিশেরও যার নিরাপত্তা দিচ্ছেন, তার আশেপাশে কে বা কারা আছেন তা খতিয়ে দেখার। নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত পুলিশ সদস্যরা তা যে করেননি, পরিষ্কারভাবে বোঝা যাচ্ছে।
গ. আক্রমণকারী ফয়জুর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নয়। তা আয়োজকদের এবং পুলিশ সদস্যদের বোঝা যাওয়াটা প্রত্যাশিত ছিল। ফয়জুরের বাহ্যিক বৈশিষ্ট দেখে পুলিশ সদস্যদের সন্দেহ হওয়াটাও ছিল খুব স্বাভাবিক বিষয়। অন্তত জাফর ইকবালের পেছনে যিনি দাঁড়ানো তিনি কে, তা জানার সাধারণ বিষয়টি কেন পুলিশের কোনো সদস্যের মনে আসল না, তা অবাক করা ব্যাপারই।
ঘ. পুরো ঘটনাটি বিশ্লেষণ করলে পুলিশ তথা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পেশাদারিত্বের বিষয়টি খুব বড়ভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
৩ মার্চ প্রথম আলোর অনলাইন সংস্করণের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘... আচমকা এক যুবক মঞ্চের পেছন থেকে এসে জাফর ইকবালের মাথায় ছুরিকাঘাত করেন। পুলিশ তার পাশেই ছিল, কিন্তু তারা এগিয়ে আসেনি।’
যার নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত- যিনি আক্রান্ত হলেন, পাশে থাকার পরও ত্বরিতগতিতে পুলিশ এগিয়ে এলো না বা আসতে পারল না। ছবি বলছে, পুলিশ সদস্যদের মনোযোগ তখন জাফর ইকবালের নিরাপত্তার দিকে ছিল না। ছিল নিজের স্মার্টফোনের দিকে।
কেন এমনটা ঘটল? এই প্রশ্নের উত্তর কী পাওয়া যাবে? পুলিশ কর্তৃপক্ষ কি অনুসন্ধান করে দেখাবেন? জানাবেন দেশের মানুষকে, কেন পুলিশ সেদিন নিরাপত্তা দিতে পারলেন না মুহম্মাদ জাফর ইকবালকে। যদিও জানি, এই প্রশ্নটিই অবান্তর। ৪ মার্চ দুপুরেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন, ‘নিরাপত্তায় কোনো ত্রুটি ছিল না।’
অধ্যাপক ইয়াসমিন হকও বলেছেন, ‘পুলিশের কিছু করার ছিল না।’ তা সত্ত্বেও এটাই সত্য যে, পুলিশের নিরাপত্তা বিষয়ে দায়িত্বশীল হওয়ার যথেষ্ট সুযোগ ছিল।
ঙ. পুলিশের পেশাদারিত্ব নিয়ে আরেকটি প্রশ্ন। ‘... পুলিশই ওই হামলাকারী যুবককে ধরে প্রক্টোরিয়াল বডির হাতে দেয়’। প্রথম আলোকে একথা বলেছেন, সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার জোতির্ময় সরকার।
ঘটনা যা জানা গেছে, আক্রমণের পরই উপস্থিত শিক্ষার্থীরা আক্রমণকারী ফয়জুরকে ধোলাই দিয়েছে। বোঝা যায়, তারপর পুলিশ ফয়জুরকে শিক্ষার্থীদের থেকে উদ্ধার করেছে। ততক্ষণে ফয়জুর জ্ঞান হারিয়েছে বা হারানোর মতো অবস্থায় পৌঁছেছে। এরকম একজন আক্রমণকারীকে পুলিশ ‘প্রক্টোরিয়াল বডি’র হাতে দিল কেন? পুলিশ কেন তাকে নিজেদের হেফাজতে নিল না? শিক্ষার্থীরা তাকে আবারও মারতে পারে, সেই সম্ভাবনা ছিল। গণধোলাইয়ে আহত হয়ে ফয়জুর মারাও যেতে পারত। তদন্তের স্বার্থে ফয়জুরকে বাঁচিয়ে রাখা কতটা জরুরি, তা পুলিশের চেয়ে ভালো আর কারও জানা থাকার কথা নয়।
আহত আধমরা আক্রমণকারী ফয়জুরকে ক্যাম্পাসের শিক্ষা ভবনের একটি রুমে কমপক্ষে রাত ৯টা পর্যন্ত ফেলে রাখা হয়েছিল। ৫.২০ থেকে রাত ৯টা, প্রায় ৪ ঘণ্টা। সোয়া সাতটার দিকে প্রথম সেখানে একজন ডাক্তার গেছেন।
শিক্ষার্থীরা উত্তেজিত ছিল, পুলিশ হেফাজতে নিয়ে তাকে ক্যাম্পস থেকে বের করে আনা হয়তো সহজ ছিল না? কিন্তু তাকে পুলিশ পাহারাতেই দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা তো করা যেত। তা না করে জালালাবাদ থানার ওসি শফিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে বললেন, ‘... হামলাকারী মরার মতো পড়ে আছে। কোনো কথারই জবাব দিচ্ছে না।’
হতে পারে ‘মরার মতো পড়ে থাকা’ ছিল আক্রমণকারীর কৌশল, অথবা সত্যি সত্যি ‘মরার মতো’ অবস্থায়ই সে ছিল। ‘মরার মতো পড়ে আছে’, ‘কোনো কথার জবাব দিচ্ছে না’- ওসির এটা বলা কি জরুরি ছিল। পুলিশ জানতে চাইবে, আর আক্রমণকারী সব বলে দেবে, ওসি কি এমনটাই প্রত্যাশা করছিলেন? এ কেমন পেশাদারি আচরণ?
চ. প্রথমত : যার নিরাপত্তা তিনি কোথায় বসবেন, পুলিশ কোথায় দাঁড়াবেন বা অবস্থান নেবেন, তা ঠিক ছিল না।
দ্বিতীয়ত : যার নিরাপত্তা দিতে হবে তার আশপাশে কে বা কারা থাকছেন, সেদিকে পুলিশ নজর দেয়নি।
তৃতীয়ত : পুলিশ আক্রমণকারীকে হেফাজতে না নিয়ে প্রক্টোরিয়াল বডি’র হাতে তুলে দিয়েছে। যা পুলিশের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না।
চতুর্থ : দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় মোবাইলে ব্যস্ত থাকা আর যাই হোক পেশাদারি আচরণ নয়। এটা শুধু এই দুজনের ক্ষেত্রে নয়। সামগ্রিকভাবে পুলিশ বাহিনীর পেশাদারিত্বের প্রমাণই বহন করছেন এই দুইজন।

৩. প্রধানমন্ত্রী আক্রমণকারীদের খুঁজে বের করে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিয়েছেন। সাগর-রুনি, দীপন-অভিজিৎদের ক্ষেত্রেও এমন নির্দেশ এসেছিল। ‘নির্দেশ বাবু’র কি অবস্থা, তা তো কারও অজানা নয়।
তদন্তের আগেই প্রধানমন্ত্রী এও বলেছেন, ‘হামলাকারী কারা হামলার ধরন থেকেই স্পষ্ট’।
পুলিশি তদন্তের আগেই সাম্প্রতিক অতিকথক ওবায়দুল কাদের ৪ মার্চ বলে দিয়েছেন, ‘হামলাকারীর স্বীকারোক্তি শুনে আমরা বিস্মিত হয়েছি...। এই হামলা চক্রান্ত, এটা সত্য। চক্রান্ত তাদের, যাদের বিএনপি পৃষ্ঠপোষকতা দেয়।’
একের পর এক ব্লগারদের যখন হত্যা করা হচ্ছিল, সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কর্তারা তখন ‘যা ইচ্ছে তাই লেখা ঠিক নয়’ ‘সতর্কভাবে লেখা উচিত’- ইত্যাদি উপদেশমূলক বক্তব্য রাখছিলেন। হত্যা করা হচ্ছিল নাস্তিক উপাধি দিয়ে। সরকার ছিল দোটানায়। হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে নাস্তিকদের পক্ষ নেয়া হয়, সরকারের এমন পরিচিতি তৈরি হয়ে যায় কিনা, ভয়ে ছিল সরকার। এখনও সেই ভয়েই আছে। ফলে হত্যাকা-গুলোর তদন্ত হয়নি। সরকারের অবস্থানের পরিবর্তন হয়েছে, এমনটা ভাবার কারণ নেই। কিন্তু ধর্ম অবমাননা করে জাফর ইকবাল তো তেমন কিছু জীবনে কখনো কোনোদিন লেখেননি।
ঘটনার একদিন পরেই, কোনো তদন্ত ছাড়া ওবায়দুল কাদের বিএনপিকে অভিযুক্ত করে দিয়েছেন। আক্রমণকারী ফয়জুরের মামা-চাচাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। মামার রাজনৈতিক পরিচয় তিনি কৃষক লীগ নেতা। মামার পরিচয় উল্লেখ করে বিএনপির বক্তব্যও দেশের মানুষ জানছেন। মামার পরিচয় কৃষক লীগ না হয়ে  কৃষক দল হলে, ওবায়দুল কাদেরদের বক্তব্য আরও অনেক জোরালো হতো। ফয়জুরের মামা কৃষক লীগ নেতা, সে কারণে এই আক্রমণের সঙ্গে কৃষক লীগের বা মামার সম্পৃক্ততা আবিষ্কার করা ঠিক নয়, তদন্ত ছাড়া তো নয়ই। একইভাবে বিএনপিকে সম্পৃক্ত করাও ঠিক নয়, তদন্ত ছাড়া। এ কথা আওয়ামী লীগেরই বেশি মনে রাখা দরকার ছিল। কিন্তু দায় দায়িত্বহীনভাবে গত কয়েক দিন অতীতের নানা কাহিনি সামনে আনছেন আওয়ামী লীগ-বিএনপি নেতারা।
এক্ষেত্রে সরকারে থাকা দল হিসেবে আওয়ামী লীগের দায়-দায়িত্ব অনেক বেশি ছিল। সব সময়ের মতো এবারও তারা তা স্মরণে রাখেনি।
অতীত নিয়ে কথা বলা বা মনে রাখা এবং মনে না রাখা, পুরোটাই সুবিধাবাদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। আমরা কিছু মনে রাখি, কিছু ভুলে যাই বা মনে রাখি না বা রাখতে চাই না। বিএনপি-জামায়াত পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে বাংলা ভাইদের গড়ে তোলার সময়কালটা মনে রাখতে চায় না। আওয়ামী লীগও কিছু ঘটনা ডিলিট করে দিয়ে পেছনটা দেখতে চায়। হেফাজত ব্লগারদের তালিকা করে সরকারকে দিল। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হেফাজতের সঙ্গে বসে সেই তালিকা যাচাই-বাছাই, পরিমার্জন করল। সেই তালিকা অনুযায়ী ব্লগার হত্যাকা- চলতে থাকল। এসব বিষয় আওয়ামী লীগ মনে রাখতে চায় না। ভুলে যেতে চায়। বহু ঘটনার এই দেশে, মানুষও তা মনে রাখতে পারে না বা চায় না।
শামসুর রাহমান, হুমায়ুন আজাদ, দীপন, অভিজিৎদের মতো মুহাম্মদ জাফর ইকবাল হত্যা প্রচেষ্টাও ভুলে যাবে মানুষ, সরকার ভুলবে সবার আগে।

৪. আবার মাদ্রাসা শিক্ষা নিয়ে কিছুদিন আলোচনা হবে। কথা ছিল মাদ্রাসা শিক্ষা আধুনিকীকরণের। রাজনৈতিক সুবিধা বিবেচনায় তা না করে, পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাকে সাম্প্রদায়িকতার রূপ দেয়া হয়েছে। ফেসবুকে যারা হত্যাকা-ের পক্ষে উল্লাস প্রকাশ করে, তাদের সন্ধান করা হয় না। সন্ধান যে করা যায়, পুলিশ যে খুঁজে বের করতে পারে, প্রধানমন্ত্রীকে কটূক্তির ক্ষেত্রে তা বারবার প্রমাণিত হয়েছে।
সকল অন্যায়-অনিয়ম সরকার ভুলিয়ে দিতে চায়, সাধারণ মানুষ ভুলে যায় বা ভুলতে বাধ্য হয়। মনে রেখে সরকারকে চাপে রাখা প্রয়োজন ছিল শিক্ষক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের। তারাও পদ-পদবির কাছে, সবকিছু বিসর্জন দিয়েছে, ভুলে গেছে। এখন তারা নিজেরাও আক্রান্ত হচ্ছেন। সরকারের এখন বাহ্যিক আচরণ যেমনই হোক না কেন, ভেতরের আচরণ একই রকম থাকবে। অন্য সময় যেমন ছিল। রাজনৈতিক সুবিধা নেয়াটাই মূল লক্ষ্য। এখানে দীপন-অভিজিতের জীবন গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয় নয়। জাফর ইকবালও এখানে দীপন-অভিজিতের চেয়ে আলাদা কিছু নন। শুনতে খারাপ শোনালেও, ঘটনাক্রম বিশ্লেষণ করে দেখেন, এটাই সবচেয়ে বড় সত্য।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ, হেলিকপ্টার, উন্নত চিকিৎসা, তদারকি করা- এসবই ক্ষতের উপর মলম লাগানো তরিকা। ক্ষত যাতে না হয়, সেই ব্যবস্থা নেয়া নয়।
আর একটি কথা। যারা পুলিশ বা ব্যক্তিগত নিরাপত্তা রক্ষী নিয়ে ঘুরে বেড়ান, তাদের উদ্দেশে। ‘নিরাপত্তা’ একটি সামগ্রিক বিষয়। বিচ্ছিন্নভাবে নিজে ‘নিরাপদ’ থাকা যায় না। রাষ্ট্র চাইলেও বিশেষ বিবেচনায় একজনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না। জাফর ইকবালের ক্ষেত্রে তা আর একবার প্রমাণ হলো।

সাপ?তাহিক পতিবেদন

 মতামত সমূহ
পিছনে 
 আপনার মতামত লিখুন
English বাংলা
নাম:
ই-মেইল:
মন্তব্য :

Please enter the text shown in the image.