আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন

Print Friendly and PDF

জা পা ন

রাহমান মনি

যথাযোগ্য মর্যাদা ভালোবাসা আর শ্রদ্ধায় মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ২০১৮ পালন উপলক্ষে জাপান প্রবাসীরা এক আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক সন্ধ্যার আয়োজন করে।
জাপান প্রবাসীদের প্রিয় সাংস্কৃতিক সংগঠন উত্তরণ বাংলাদেশ কালচারাল গ্রুপ কর্তৃক আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে রাষ্ট্রদূত রাবাব ফাতিমার প্রতিনিধিত্ব করেন বাংলাদেশ দূতাবাসের কাউন্সেলর (শ্রম) মো. জাকির হোসেন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন এশিয়ান পিপলস ফ্রেন্ডশিপ সোসাইটির (এপিএফএস) প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি বর্তমান উপদেষ্টা কাৎসুও ইয়শিনারি।
এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন দূতাবাসের দ্বিতীয় সচিব মো. আঞ্চলিক সংগঠন সমূহের নেতৃবৃন্দ, গণ্যমান ব্যক্তিবর্গ, সংস্কৃতিমনা প্রবাসী ও জাপানি সুহৃদগণ এবং প্রবাসী মিডিয়া কর্মীবৃন্দ।
শুরুতেই ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি আমি কি ভুলিতে পারি’ পরিবেশনার মাধ্যমে সারিবদ্ধভাবে সকলেই টোকিওর ইতাবাশি সিটি, আয়ামা কাইকান ও অস্থায়ীভাবে নির্মিত শহীদ মিনার ও ফুলেল শ্রদ্ধা জানান। উপস্থিত জাপানি বন্ধুরাও এ সময় নীরবে ফুলেল শ্রদ্ধা জানায়।
একুশে ফেব্রুয়ারি রোববার (জাপানে একুশে ফেব্রুয়ারি বুধবার কর্ম দিবস হওয়ায় একুশের আয়োজন কেবলমাত্র প্রভাতফেরি আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখে পরবর্তী রোববার অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে হয়) আয়োজিত অনুষ্ঠানে দিবসটির তাৎপর্যে বক্তব্য রাখেন, জাপান আওয়ামী লীগের সভাপতি সালেহ মো. আরিফ, ড. তোফাজ্জল হোসেন, উত্তরণের পক্ষ থেকে এনদো চিযুরো, এপিএফএস সভানেত্রী ইয়োশিদা, বিশেষ অতিথি কাৎসুও ইয়োশিনারি এবং প্রধান অতিথি মো. জাকির হোসেন, প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের প্রশাসন অফিসার ইয়ুজি আনদো।
বক্তারা বলেন, মাতৃভাষা হচ্ছে শ্রেষ্ঠ ভাষা। এই ভাষাতে কথা বলে মনের ভাব প্রকাশে যে তৃপ্তি পাওয়া যায় তা অন্য ভাষাতে সম্ভব নয়। বর্তমান বিশ্বে প্রায় ছয় হাজারের মতো ভাষা রয়েছে। অনেক ভাষাই বিলুপ্ত হয়ে গেছে, আবার অনেক ভাষাই বিলুপ্তির পথে। প্রতি ২ সপ্তাহে একটি ভাষা বিলুপ্ত হচ্ছে। এভাবে চলমান থাকলে পৃথিবীতে মাত্র হাতেগোনা কয়েকটি ভাষাই কেবল টিকে থাকবে।
বাংলা ভাষায় কথা বলার অধিকার রাষ্ট্রীয়ভাবে কেড়ে নেয়া হচ্ছিল, উর্দুকেই যখন পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা দেয়া হয়েছিল তখন ছাত্র-জনতা মেনে নেয়নি। প্রতিবাদে ফেটে পড়েছিল। যার ফলশ্রুতি ৫২’র ভাষা আন্দোলন এবং সালাম, রফিক, সফিক, বরকত, জব্বারদের বুকের তাজা রক্তের বিনিময় মাতৃভাষায় কথা বলার বাঙালিদের অর্জন। আর সালাম, রফিকদের চেষ্টায় ১৯১৯ সালের ১৭ নভেম্বর জাতিসংঘের ইউনেস্কো কর্তৃক আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি আদায়। তাই একুশে ফেব্রুয়ারি একদিকে যেমন আমাদের গভীর শোকের তেমনি অপরদিকে আনন্দেরও। এই একুশের হাত ধরেই মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা।
বক্তারা আরও বলেন, ১৯১০ সালে জাপানেও কোরিয়ানদের মাতৃভাষায় কথা বলার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল। এমন কি কোরিয়ান নাম রাখার ওপরও নিষেধাজ্ঞা এসেছিল যদিও কোনোটাই টিকেনি। আসলে মাতৃভাষা এমনই একটি ভাষা, যা জোর করে দমিয়ে রাখা যায় না। যদি না নিজেরা নিজেদের ভাষার ওপর সম্মান না দেখায়। বর্তমান বিশ্বে নিজেদের অজান্তেই অনেকে মিশেল ভাষা ব্যবহার করে।
তারা আরও বলেন, নিজ মাতৃভাষার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে অন্যের মাতৃভাষার প্রতিও সম্মান জানাতে হবে। তাহলেই কেবল রফিক, সফিক, সালাম, বরকত, জব্বারদের আত্মার প্রতি সম্মান জানানো হবে।
তারা বলেন, বাংলাদেশে সর্বস্তরের বাংলা ভাষা চালু করা এখন সময়ের দাবি। কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে কেবল ফেব্রুয়ারি মাস এলেই এক শ্রেণির বুদ্ধিজীবী বাংলা ভাষার প্রতি দরদ দেখায়, টকশো, মিডিয়ায় সোচ্চার হয়, ফেব্রুয়ারি চলে গেলে তারা আবার তা ভুলে যায়। এই জন্য ফেব্রুয়ারি মাসের নাম দিয়েছে ভাষার মাস। তাই ফেব্রুয়ারি শেষ মানে, ভাষা নিয়ে আর বাড়াবাড়ির দরকার নেই।
বাংলাদেশের বিচারকার্যের রায় আজও বাংলায় লিখা হয় না। মাত্র দুজন বিচারপতি তাদের দেয়া রায় বাংলায় লিখে থাকেন। জার্মান, জাপান যদি সবকিছুই নিজস্ব ভাষায় করতে পারে তবে, আমরা কেন নয়।
আলোচনা সভায় জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানিয়ে তারা বলেন, বর্তমানে জাতিসংঘে ৬টি ভাষাকে দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে স্থান দেয়া হয়েছে। বাংলাভাষী বর্তমানে বিশ্বে প্রায় ৩০ কোটি রয়েছে, তাই বাংলা ভাষাকেও জাতিপুঞ্জের দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে অন্তর্ভুক্তির আহ্বান জানাই।
অনুষ্ঠানের ২য় পর্ব ছিল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের নেতৃত্ব দেন উত্তরণের প্রাক্তন লিডার যেরম গোমেজ এবং উত্তরণের মধ্যমণি সর্বজন প্রিয় ফজলুল হক রতন। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানটি সাজানো হয় দেশাত্মবোধক গান দিয়ে। গান ছাড়াও কবিতা আবৃত্তি করেন এম এ শাহীন। এছাড়াও প্রবাসীদের মধ্য থেকে কবিতা আবৃত্তি করেন জুয়েল আহসান কামরুল, কমল বড়–য়া এবং তাজরির আহমেদ।
উল্লেখ্য, জাপানে মহান শহীদ দিবস প্রথম পালন শুরু করে উত্তরণ বাংলাদেশ কালচারাল গ্রুপ। এরপর জাপান থেকে প্রকাশিত দ্বিমাসিক পত্রিকা ‘পরবাস’ একনাগাড়ে বেশ কয়েক বছর তা পালন করে। ২০১০ সালের পর তা আর নিয়মিতভাবে পালিত হয়নি প্রবাসীদের দ্বারা কোনো আয়োজনে।
২০০৫ সালে ইকেবুকুরো নিশিগুচি কোয়েন-এ স্থায়ী শহীদ মিনার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করার পর থেকে একুশের প্রভাতফেরি বাংলাদেশ দূতাবাস এবং তোশিমা সিটি যৌথভাবে নেতৃত্ব দিয়ে আসছে। সেই থেকে আজও কনকনে শীতকে উপেক্ষা করে প্রবাসীরা প্রভাতফেরিতে অংশ নিয়ে থাকে।
rahmanmoni@gmail.com

সাপ?তাহিক পতিবেদন

প্রবাসে
 মতামত সমূহ
পিছনে 
 আপনার মতামত লিখুন
English বাংলা
নাম:
ই-মেইল:
মন্তব্য :

Please enter the text shown in the image.