[মতামত] ভারতের জাতীয় ভাষার ইতিবৃত্ত

Print Friendly and PDF

মযহারুল ইসলাম বাবলা

ব্রিটিশ শাসনের পূর্বে ভারতবর্ষ কখনো এককেন্দ্রিক শাসনাধীনে কিংবা একক রাষ্ট্র ছিল না। ছিল না একটি দেশ এবং এক জাতির অস্তিত্বও। মৌর্য, গুপ্ত, সুলতানী, মোগল শাসনের যুগেও ভারতবর্ষ একীভূত কোনো রাষ্ট্র ছিল না। অজস্র খ- খ- রাজ্যে বিভক্ত ছিল। রাজ্যগুলো সম্রাটদের আনুগত্য স্বীকারে প্রদান করত ধার্যকৃত রাজস্ব-কর। নিজ নিজ রাজ্যের শাসন ক্ষমতা রক্ষায় এর বিকল্প উপায় ছিল না। সম্রাটের আনুগত্য অস্বীকারের পরিণতিতে ঘটতো সম্রাটদের আগ্রাসন, বেপরোয়া লুণ্ঠন, রাজ্য দখল। বিজয়ী সম্রাটকে অত্যধিক ভেট-মুচলেকা দিয়ে রাজ্যশাসনের ক্ষমতা ফিরে পেতো পরাজিত রাজ্য শাসকরা। অনেক রাজ্য সম্রাটের আনুগত্য অস্বীকার করে টিকে থাকারও নজির ছিল। দূরবর্তী রাজ্যগুলোর ক্ষেত্রেই সেটা সম্ভব হতো। আনুগত্যের ভিত্তিমূলে ছিল সম্রাটদের আর্থিক কর প্রদান। অতীত শাসকরা কেন্দ্রীভূত শাসনের অধীনে ভারতবর্ষকে একীভূত রাষ্ট্রে পরিণত করতে পারেনি। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধজয়ের পর একে একে দখলে নেয় গোটা ভারতবর্ষ। যুদ্ধ-বিগ্রহ, শঠতা-কৌশলতা, স্থানীয়দের বিশ্বাসভঙ্গের সুযোগে ভারতবর্ষকে এক রাষ্ট্রাধীনে অন্তর্ভুক্ত করে। প্রত্যক্ষ ব্রিটিশ শাসনাধীনের বাইরে করদরাজ্য ছিল কয়েক শত। সে সকল করদরাজ্যগুলো স্থানীয় শাসকদের শাসনাধীনে ছিল। কেন্দ্রীয় শাসক ব্রিটিশদের বার্ষিক কর প্রদানের ভিত্তিতে স্থানীয় রাজ্যের শাসকরা ছিল চরমভাবে ব্রিটিশের অনুগত-তাঁবেদার। এক রাষ্ট্রাধীন ভারতে অজস্র রাজ্যের ভাষা-সংস্কৃতিগত পার্থক্য ছিল বহু-বিভাজিত। প্রত্যেকটি জাতিসত্তার ভাষা-সংস্কৃতি ছিল পৃথক এবং স্বতন্ত্র। কোনোটির সঙ্গে কোনোটির মিল ছিল না।
ভারতের মানুষের মাতৃভাষা কয়েক শত। এসআইএল ইন্টারন্যাশনাল পরিসংখ্যান অনুযায়ী ৪১৫টি। এই ৪১৫টি ভাষার উপভাষার সংখ্যা ১৫৭৬টি (১৯৯১ সালের আদমশুমারি অনুসারে)। ২০০১ সালের আদমশুমারি অনুসারে ২৯টি কথ্য ভাষায় ১০ লক্ষ মানুষ কথা বলে। ১২২টি কথ্য ভাষা ১০ হাজার মানুষের মুখের ভাষা। এছাড়াও অজস্র উপভাষা রয়েছে, যেগুলোর লিপি নেই। সে সকল ভাষার অস্তিত্ব টিকে আছে মানুষের মুখে মুখে। বর্তমান ভারতের রাজ্যগুলোর ভাষা ভিন্ন ভিন্ন। একই রাজ্যের একাধিক ভাষা যেমন রয়েছে। তেমনি একই ভাষা অপরাপর রাজ্যেও প্রচলিত আছে। ভারতের প্রাদেশিক সরকারি স্বীকৃত ভাষাঅসমীয়া, বাংলা, বোড়ো, ডোগরি, গুজরাটি, হিন্দি, কন্নড়, কাশ্মীরী, কোঙ্কনী, মৈথলী, মালয়ালম, মৈত্রৈ (মণিপুরী), মারাঠি, নেপালি, ওড়িয়া, পাঞ্জাবি, সংস্কৃত, সাঁওতাল, তামিল, তেলেগু, উর্দু, মিজো, কোকোবরক। ইংরেজি ভাষাও অনেক প্রদেশের সরকারি ভাষার স্বীকৃতিপ্রাপ্ত, যেমন অরুণাচল প্রদেশ, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড, সিকিম, আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ, চণ্ডীগড়। ভারতের প্রাদেশিক ভাষাসমূহের তালিকাই প্রমাণ করে অপরাপর প্রাদেশিক ভাষার ন্যায় হিন্দিও প্রাদেশিক ভাষা। অনেক প্রদেশের সহকারী সরকারি ভাষা হিন্দি, উর্দু, ইংরেজি, বাংলা, মারাঠি, পাঞ্জাবি, যেমন-খাসি, গারো, ভুটিয়া, গুরং, লেপচা, লিম্বু, মাঙার, মুখিয়া, নেওরি, রাজ, শেরপা, তমাং ইত্যাদি সিকিম প্রদেশের সহকারী সরকারি ভাষা।
প্রশ্ন থাকে বহু ভাষাভাষীর দেশ ভারতে প্রাদেশিক হিন্দি ভাষা কেন রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা লাভ করেছে! এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে পেছনে ফিরে যেতে হবে। ব্রিটিশ শাসনাধীনে ভারতীয় পুঁজিপতি শ্রেণি এক রাষ্ট্রের সুবিধায় ভারতে বাণিজ্যিক আধিপত্য বিস্তার-প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিল। ব্রিটিশদের মুৎসুদ্দি রূপে নিজেদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সুযোগও হাতাতে পেরেছিল। তাদের মনস্কামনা পূরণে অন্তরায় ছিল ভাষার বিভক্তি। ব্রিটিশ ভারতেই ভারতীয় বুর্জোয়ারা স্বীয় স্বার্থে এককেন্দ্রিক শাসনের পাশাপাশি এক ভাষা ও এক জাতির আওয়াজ তুলেছিল। জাতি হিসেবে ভারতীয় এবং ভাষা হিসেবে বেছে নিয়েছিল তারা হিন্দি ভাষা-দেবনাগরী লিপি। নিজেদের কায়েমী স্বার্থে হিন্দি ভাষাকে ভারতের সমগ্র জাতিসত্তার উপর চাপিয়ে দেবার ফন্দি এঁটেছিল; অপরাপর ভাষা-সংস্কৃতি, স্বজাত্যবোধকে বিলীন করে দেবার মতলবে। ব্রিটিশ ভারতে এককেন্দ্রিক রাষ্ট্রের সুবিধাভোগ সম্ভব হলেও, তাদের পক্ষে হিন্দি ভাষাকে সর্বভারতীয় ভাষায় পরিণত করা সম্ভব হয়নি।
১৯১৫ সালে ভারতে ফিরে এসে গান্ধী সারা ভারতজুড়ে ভ্রমণ করেন। তখনই তিনি দেখতে পান ভারতীয় মাড়োয়ারি পুঁজিপতিরা গো-রক্ষা এবং হিন্দি ভাষা প্রচলনে নানাবিধ পন্থায় মদদ জুগিয়ে যাচ্ছে। গান্ধী সহসাই পুঁজিপতিদের পক্ষে সেই প্রচারাভিযানে যুক্ত হয়ে যান। অর্থাৎ গো-রক্ষা আন্দোলনের পাশাপাশি হিন্দি ভাষাকে সমগ্র জাতিসত্তার উপর চাপিয়ে দেবার বুর্জোয়া শ্রেণির আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। এই তৎপরতার মধ্য দিয়েই ভারতে গান্ধীর রাজনৈতিক জীবনের সূত্রপাত। ১৯১৬ সালে কংগ্রেসের অধিবেশনে ‘সর্বভারতীয় একভাষা ও একলিপি সম্মেলন’ গান্ধীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয়। ১৯১৯ সালে হিন্দি ভাষা প্রচারে হিন্দি সাহিত্য সম্মেলনের উপ-কমিটির সভাপতি হয়েছিলেন গান্ধী । ভারতীয় মাড়োয়ারি পুঁজিপতিদের অর্থের জোগানে এই প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছিল। সিন্ধু ন্যাশনাল কলেজে ১৯২০ সালের জুলাইতে গান্ধী বলেছিলেন, ‘হিন্দিই হবে সমগ্র ভারতের ভাষা এবং সেইজন্য হিন্দি শেখা অন্য সমস্ত প্রদেশের কর্তব্য।’ গান্ধী প্রকাশ্যে বলে বেড়াতেন, ‘অহিন্দিভাষীদের হিন্দি শেখা হচ্ছে ধর্ম।’ ভারতীয়দের ধর্মীয় অনুভূতিতে হিন্দি ভাষা বিস্তারে ধর্মকে পর্যন্ত ব্যবহার করতে চেয়েছেন। হিন্দি ভাষাকে ধর্মীয় পর্যায়ভুক্ত করতেও দ্বিধা করেননি গান্ধী। গান্ধী লিখেছিলেন, ‘এলাহাবাদের হিন্দি সাহিত্য সম্মেলনের উদ্যোগে গত ১৮ মাসব্যাপী মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সিতে হিন্দিভাষার প্রচার খুব জোরালোভাবেই চলছে।’ হিন্দি ভাষাকে সমগ্র জাতিসত্তার উপর চাপিয়ে দেয়ার মাড়োয়ারি পুঁজিপতিদের অর্থানুকূল্যের বিষয়টিও স্বীকার করে গান্ধী বলেছিলেন, ‘হিন্দি প্রচারের কাজ ভারতের এই রাজতুল্য বণিকশ্রেণির বিশেষত্ব।’
১৯২১ সালে এক চিঠিতে গান্ধী মাড়োয়ারি পুঁজিপতিদের উদ্দেশে লিখেছিলেন, ‘ভারতবর্ষে ফিরে আসার পর থেকেই আমি আপনাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ থেকে ঘনিষ্ঠতর হচ্ছি। আমার কাজে আপনারা প্রশ্রয় দিয়েছেন, এবং আমাকে প্রচুর সাহায্য করেছেন। হিন্দি প্রচারের আন্দোলনকে আপনারা কার্যকরীভাবে সমর্থন দিয়েছেন।’ গান্ধীর হিন্দি ভাষা প্রচারাভিযানে মাড়োয়ারিদের পাশাপাশি গুজরাটি, পার্শি বণিকশ্রেণিও আর্থিক সহায়তা প্রদানে পিছিয়ে ছিল না। বাংলা ও আসাম প্রদেশে হিন্দি প্রচারাভিযানে ১৯২৮ সালে হিন্দুত্ববাদী বুর্জোয়া ধনশ্যামদাস বিড়লাকে কোষাধ্যক্ষ নির্বাচিত করে কলকাতায় হিন্দি প্রচারের এক সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৩৫ সালে হিন্দি ভাষাকে জাতীয় ভাষায় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে রাজেন্দ্র প্রসাদকে সভাপতি করে হিন্দি সাহিত্য সম্মেলনে ‘রাষ্ট্রভাষা প্রচার সমিতি’ গঠিত হয়। পরবর্তীতে স্বয়ং রাজেন্দ্র প্রসাদ লিখেছিলেন, ‘এর নীতি স্বয়ং গান্ধীজি নির্ধারণ করেছিলেন এবং আমাদের শিল্পপতি বন্ধুরা অর্থের জোগান দিতেন।’
হিন্দি ভাষা ও দেবনাগরী লিপি সমগ্র ভারতীয়দের উপর চাপানোর এই উদ্যোগে উত্তর প্রদেশের মুসলিম সম্প্রদায় আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। উর্দুভাষী মুসলমানদের মধ্যে এ নিয়ে আতঙ্ক ও ভীতির সঞ্চারে তারা উপলব্ধি করে হিন্দির দৌরাত্ম্যে তাদের উর্দু ভাষা-সংস্কৃতির বিলোপ ঘটবে। ১৯৩৭ সালের অক্টোবরে লক্ষেèৗতে মুসলিম লীগ অধিবেশনে সমস্ত মুসলিম সম্প্রদায়ের সমর্থন আদায়ে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ভারতের জাতীয় ভাষা হিসেবে হিন্দি ভাষাকে চাপিয়ে দেবার তীব্র নিন্দা জানায়।
১৯২৭ সালের জুলাইতে গান্ধী লিখেছিলেন, ‘সব ভারতীয় ভাষার একটি লিপি হওয়া উচিত এবং কেবল দেবনাগরীই হতে পারে সেই লিপি।’ গান্ধী বলেছেন, ‘হিন্দু-মুসলিম উন্মত্ততার জন্য সম্পূর্ণ সংস্কারের পক্ষে বাধা আছে। তবে এর পূর্বে হিন্দু ভারতকে বুঝতে হবে যে, যেসব ভাষা সংস্কৃত থেকে উদ্ভূত এবং দ্রাবিড় গোষ্ঠীভুক্ত তাদের লিপিগুলো, যেমন বাংলা, গুরুমুখী, সিন্ধি, ওড়িয়া, গুজরাটি, তেলেগু, তামিল, কন্নড়, মালয়ালম ইত্যাদি ভাষার লিপিকে বর্জন করে সে স্থলে থাকবে শুধুই দেবনাগরী লিপি। এর ফলে হিন্দু ভারত সংহত ও বলিষ্ঠ হবে।’ গান্ধী নিজেই স্বীকার করেছেন পাঞ্জাবে হিন্দু-মুসলমান এবং অন্য সকলেই উর্দু জানে (উর্দু ভাষার লিপি ফার্সি)। ধর্মের ভিত্তিতে ভাষার সংগ্রাম শুরু করেছিলেন গান্ধী। পাঞ্জাবি হিন্দুরা দেবনাগরী লিপি গ্রহণ করবে এবং মুসলিমরা ফার্সি লিপি। একইভাবে বাঙালি হিন্দুর লিপি হবে দেবনাগরী এবং বাঙালি মুসলমানের লিপি হবে বাংলা অথবা ফার্সি। সাম্প্রদায়িক বিভাজনের বিরোধকে ভাষা ও লিপির ভেতরে টেনে আনেন স্বয়ং গান্ধী। ব্রিটিশদের বিভক্তিকরণের চক্রান্তের নীতি অনুসরণ কি ভাষার প্রশ্নে গান্ধী করেননি? হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায়ের বিভক্তি ব্রিটিশরা করেছিল তাদের শোষণ প্রক্রিয়া এবং দখলদারিত্ব স্থায়ী করার লক্ষ্যে। গান্ধীও হিন্দি ভাষা ও দেবনাগরী লিপির পক্ষে সম্প্রদায়গত বিভাজনের নীতি অনুসরণ করে সেই বিভাজনকেই সামনে নিয়ে এসেছিলেন।
হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায়ের সাম্প্রদায়িক বিভাজন-বিভক্তি ব্রিটিশদের সৃষ্ট। সাম্প্রদায়িক বিভাজন নতুন মাত্রা পেয়েছিল গান্ধীর হিন্দি ভাষা ও দেবনাগরী লিপির জাতীয় ভাষা ও লিপির আন্দোলন অভিযানে। এতে দ্রুতই মুসলিম সম্প্রদায় ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। মুসলমানদের বিরোধিতার মুখে গান্ধী-নেহেরুরা মত পরিবর্তন করলেও; উর্দুভাষী মুসলিম সম্প্রদায় হিন্দি-উর্দু ভাষা বিতর্কে সরব হয়ে ওঠে এবং ভাষা নিয়ে সাম্প্রদায়িক বিরোধেরও সূচনা ঘটে। ১৯৩৭ সালের জুলাইতে কংগ্রেস সভাপতি নেহেরু বলেন, ‘অবশ্যই হিন্দি অথবা হিন্দুস্থানি হচ্ছে জাতীয় ভাষা এবং হওয়া উচিতও। লিপি সম্পর্কে সম্পূর্ণ পরিষ্কার করা দরকার যে, হিন্দি ও উর্দু দুই লিপিই সহাবস্থান করা উচিত।... এই বিতর্ক বন্ধ করার জন্য ভালো হবে যদি আমরা কথ্য ভাষাকে হিন্দুস্থানি এবং লিপিকে হিন্দি অথবা উর্দু আখ্যা দিই। ইউরোপের প্রসিদ্ধ গ্রন্থগুলোর হিন্দিতে অনুবাদ হওয়া একান্ত দরকার।’ নেহেরুর বক্তব্যটির সারকথা হচ্ছে লিখিত ভাষা হিন্দিই হবে ভারতের জাতীয় ভাষা। সেটা দেবনাগরী কিংবা উর্দু দুই লিপিতেই লিখিত হতে পারে। ‘ভাষাপ্রশ্ন’ গ্রন্থে নেহেরু লিখেছিলেন, ‘একমাত্র হিন্দুস্থানীই সমগ্র ভারতের ভাষা হতে পারে।’ লিপির ক্ষেত্রে দেবনাগরী এবং উর্দু লিপির কথাও মুসলিম সম্প্রদায়ের ক্ষোভ প্রশমনে বলতে বাধ্য হয়েছিলেন।
গান্ধী মুসলমানদের বিরোধিতার মুখে হিন্দুস্থানির অনুরাগী হয়ে-সেই লক্ষ্যে ১৯৪২ সালে ‘হিন্দুস্থানি প্রচার সভা’ সংগঠন গড়ে তোলেন। উত্তর ভারতে কথ্যভাষা রূপে হিন্দুস্থানি ভাষা ছিল বটে। তবে সেটি হিন্দি ও উর্দুর সংমিশ্রণে। লিপি না থাকায় লিখিত ভাষারূপে হিন্দুস্থানি ভাষার কোনো অস্তিত্ব ছিল না। ১৯৪৬ সালে নির্বাচনের পূর্বে ভারতের সংবিধান সভায় গান্ধী প্রস্তাব করেছিলেন, তাঁরাই সংবিধান সভার সদস্য হতে পারবেন যাঁরা হিন্দি ভাষার সঙ্গে পরিচিত। গান্ধী আরো দাবি করেন ভারতের সংবিধান হিন্দুস্থানি ভাষায় লিখিত হতে হবে। মৃত্যুর পূর্বে গান্ধী বলেছিলেন, ‘তাঁর যদি ক্ষমতা থাকতো তবে তিনি তাদেরই কংগ্রেসের সদস্য করতেন যারা হিন্দুস্থানি ভাষা জানেন।’ ১৯৪৭ সালে গান্ধী হিন্দুস্থানি ভাষাকে সমগ্র এশিয়ার ভাষায় পরিণত করার দিবা-স্বপ্নও দেখেছিলেন। মুসলিম বিরোধিতায় গান্ধী-নেহেরুরা ভারতের জাতীয় ভাষা হিন্দির পরিবর্তে হিন্দুস্থানি কথ্য ভাষার প্রচারণা ছিল প্রতারণার কৌশল। উদ্দেশ্য ছিল দেবনাগরী লিপির বাতাবরণে হিন্দি ভাষাকেই সমগ্র জাতিসত্তার স্কন্ধে চাপানোর। বাস্তবতা হচ্ছে হিন্দুস্থানি ভাষা প্রকৃতই কথ্য ভাষা। সে ভাষার ছিল না লিপি, ছিল না সাহিত্য। সেটি কেবলই আঞ্চলিক কথ্যভাষা মাত্র। হিন্দুস্থানি ভাষার দাবিটি ছিল হিন্দি ভাষা প্রতিষ্ঠায় কৌশলগত অভিপ্রায় মাত্র।
১৯৪৭ সালে সংবিধানের খসড়া প্রণয়নে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হবার পূর্বে উদ্দেশ্যমূলকভাবে ভারতের রাষ্ট্রভাষা প্রসঙ্গে কোনো ধারা রাখা হয়নি, হিন্দি ভাষা উত্থাপনে বিতর্ক-বিভক্তির আশঙ্কায়। সংবিধান প্রণয়ন কমিটির চেয়ারম্যান বি.আর. আম্বেদকর বলেছিলেন, ‘কংগ্রেস হিন্দি ভাষার ধারা নিয়ে যতটা বিতর্ক করেছেন, অন্য কোনো ধারা নিয়ে অতটা বিতর্ক করেনি।’ সংবিধান সভার কংগ্রেসের সদস্যদের মনোনীত করেছিলেন জওহরলাল নেহেরু এবং সর্দার বল্লভ ভাই প্যাটেল। জাতীয় ভাষা নির্ধারণের ভোটাভুটিতে হিন্দির পক্ষে ৭৮টি এবং হিন্দির বিপক্ষে ৭৮টি ভোট পড়ে। সমাধানের লক্ষ্যে পুনরায় ভোটাভুটিতে হিন্দির পক্ষে ৭৮টি এবং হিন্দির বিপক্ষে ৭৭টি। মাত্র এক ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়ে হিন্দি ভাষা জাতীয় ভাষায় পরিণত হয়। দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষায় এবং দলীয় নির্দেশানুযায়ী সংবিধান সভায় হিন্দি-অহিন্দি কংগ্রেস সদস্যরা নির্বিচারে হিন্দির পক্ষেই ভোট প্রদান করেছিল। স্বাধীন ভারতের রাষ্ট্রপতির সচিব সি.এস. ভেঙ্কটাচার লিখেছেন, ‘হিন্দি ভাষার প্রশ্নে চরমপন্থার অশুভ তাৎপর্য মুসলিম সম্প্রদায়কে যথার্থই আতঙ্কিতই করেছিল। মুসলমানরা উপলব্ধি করেছিল তাদের ভবিষ্যৎ বিপন্ন। এই বিশ্বাস দ্রুত মুসলমান সম্প্রদায়ের মনের ওপর অবাঞ্ছিত হস্তক্ষেপেই পাকিস্তান সৃষ্টিতে এটি অন্যতম মুখ্য কারণ হয়েছিল।’
সর্বভারতীয় জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠার অভিপ্রায়ে হিন্দি ভাষা বহু-ভাষাভাষী ভারতীয় জনগণের ওপর নির্লজ্জ শঠতায় চাপানো হয়েছিল। ভারতের বুর্জোয়াশ্রেণি এবং শাসকশ্রেণি একাকার হয়ে গিয়েছিল এককেন্দ্রিক রাষ্ট্র ও হিন্দি ভাষা প্রতিষ্ঠায়। কেন্দ্রীয় শাসকগোষ্ঠী ভারতের বিভিন্ন জাতিসত্তার মানুষের জাতীয়তার উন্মেষ কঠোর হস্তে শাসন, শোষণ, দমন, পীড়নে চরমভাবে সিদ্ধহস্ত। সংবিধান অনুযায়ী বহুজাতি-ভাষাভাষীর কারাগারে পরিণত ভারত। শুরুতে ভারতীয় সংবিধানে ‘ভারত যুক্তরাষ্ট্র’ (ঋবফধৎধঃরড়হ ড়ভ ওহফরধ) প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হয়েছিল কিন্তু শাসক দল কংগ্রেস তাতে বাধা প্রদান করে। কংগ্রেস সংবিধানভুক্ত করে ‘ভারত রাষ্ট্রসংঘ’ (টহরড়হ ড়ভ ঝঃধঃবং)। ফেডারেলের আওতায় সমস্ত প্রদেশ স্বেচ্ছায় কেন্দ্রীয় শাসনের অধীনস্ত হয়ে পড়ে। রাজ্যের শাসন সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সকল বিষয়াদি কেন্দ্রের শাসনাধীনে চলে যাবার ফলে রাজ্য সরকারগুলোর ক্ষমতা স্থায়ীভাবে সংকুচিত এবং সীমিত হয়ে যায়। রাজ্যগুলোর সমস্ত শাসনতান্ত্রিক ক্ষমতা সংবিধানে খর্ব করা হয়। রাজ্যপাল নিয়োগে জনগণ দ্বারা নির্বাচিত রাজ্যপালের দাবি ওঠে। সে দাবি নেহেরু প্রত্যাখ্যান করেন। রাজ্যপালের নিয়োগের অধিকার কেন্দ্রীয় সরকারের অধীন করা হয়। রাজ্যপালের নিয়োগ-জবাবদিহিতা কেবলই কেন্দ্রের অধীন। প্রতিটি প্রদেশে রাজ্যপাল নিয়োগ করে কেন্দ্রীয় সরকার। অনির্বাচিত রাজ্যপাল যে-কোনো কারণে-অকারণে নির্বাচিত রাজ্য সরকারকে বরখাস্ত করে রাষ্ট্রপতির শাসন জারি করতে পারেন। রাজ্যপালের এই অধিকার সাংবিধানিক। আইনসভা, মন্ত্রিসভা বাতিলের অধিকার সংবিধান দিয়েছে রাজ্যপালকে। রাজ্যপাল কেন্দ্রীয় সরকারের কাছেই দায়বদ্ধ। রাজ্য সরকারের আতঙ্ক স্বরূপ এই রাজ্যপাল। শাসন বিভাগ, বিচার বিভাগ, পুলিশের উচ্চতর বিভাগসহ সামরিক, আধা-সামরিক বাহিনী এবং গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাসমূহ কেন্দ্রীয় সরকারের অধীন। নির্বাচিত রাজ্য সরকারগুলোর ক্ষমতা সংকীর্ণ-নিষ্প্রভ।
ভাষার দ্বন্দ্বে হিন্দু-মুসলিম দুই সম্প্রদায়ের বিভক্তি সাম্প্রদায়িক বিভক্তিরই আরেক অনুষঙ্গ। অপরিণামদর্শী দেশভাগ, রক্তাক্ত দাঙ্গা, উচ্ছেদ, বিচ্ছেদ, উৎপাটনের ট্র্যাজেডি আজও উপমহাদেশের সর্বাধিক মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি। ভারত-পাকিস্তান দুই দেশে হিন্দি-উর্দু জাতীয় ভাষা হয়েছে। পাকিস্তান রাষ্ট্রাধীন পূর্ব বাংলায় উর্দু ভাষা চাপানো সম্ভব হয়নি। ত্যাগ-আত্মত্যাগে মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রের অন্যতম রাষ্ট্রভাষার মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব হয়েছিল। অথচ বৃহৎ ভারতে বিভিন্ন জাতিসত্তার ভাষাকে কোণঠাসা করে হিন্দির একক দৌরাত্ম্যের অধীন করা হয়েছে। ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদী উন্মেষকে নিষ্ঠুর হস্তে দমন-পীড়নে স্তব্ধ করা হয়েছে, বারংবার-বহুবার। জাতিসত্তার আন্দোলনকে আখ্যা দেয়া হয় বিচ্ছিন্নতাবাদী অভিধায়। স্বীকার করতে হবে দক্ষিণ ভারত ব্যতীত সমগ্র ভারত হিন্দির আগ্রাসনের কবলে। এমন কি আমাদের দেশেও হিন্দি সাংস্কৃতিক আগ্রাসন প্রবলভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। নিজ নিজ ভাষা-সংস্কৃতি এতে চরম সংকটের কবলে। বিশিষ্ট লেখক-সাংবাদিক ফ্র্যাঙ্ক মোরেস বলেছিলেন, ‘ভারতবর্ষের ঐক্য যদি কৃত্রিম ছিল তো ভারতবর্ষের দেশভাগও তাই। ভারতবর্ষকে যদি বিভক্তই হতে হয়, তবে জনতত্ত্বগত এবং সাংস্কৃতিক সংহতি ও ভাষার ভিত্তিতে যুক্তিসম্মতভাবে ভাগ হওয়া উচিত ছিল।’
আয়তনে অখ-িত ভারতবর্ষ ইউরোপের সমতুল্য। ইউরোপের রাষ্ট্রগুলো ল্যাটিন ভাষা পরিত্যাগ করে নিজ ভাষা ও জাতীয়তার ভিত্তিতে পৃথক-পৃথক রাষ্ট্রের মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। পুরো ইউরোপে ইংরেজিভাষী রাষ্ট্র মাত্র ইংল্যান্ড। যুক্তরাজ্যেও একমাত্র ইংল্যান্ডের ভাষাই ইংরেজি। যুক্তরাজ্যভুক্ত আয়্যারল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, ওয়েলস-এর ভাষা ইংরেজি নয়। তাদের প্রত্যেকের পৃথক ভাষা। ভারতবর্ষও ভাষার ভিত্তিতে ইউরোপের আদলে গঠিত হতে পারতো। যেটি ব্রিটিশ শাসকরা এবং ভারতের পুঁজিপতি ও ক্ষমতালোভী রাজনীতিকরা ধর্মের বিভাজনে ভারতবর্ষকে দ্বিখ-িত করে সকল উজ্জ্বল সম্ভাবনাকে ম্লান করে দিয়েছে। স্বাধীন ভারত, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ তিন পৃথক রাষ্ট্রের শাসকগোষ্ঠী জনগণের ওপর অভিন্ন পন্থায় শোষণ, নিপীড়ন, বঞ্চনা অব্যাহত রেখে শ্রেণি শোষণকেই স্থায়ী করে তুলেছে। ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রাম, পাকিস্তান আন্দোলন, রক্তাক্ত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-দেশভাগ, আমাদের ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, সকল ক্ষেত্রেই সমষ্টিগত জনগণ সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছে। কিন্তু জনগণের মুক্তি অর্জিত হয়নি, জনগণের মুক্তি সংগ্রাম উপমহাদেশের খ-িত তিন রাষ্ট্রেই চলছে এবং চলবেই জনগণের মুক্তি অর্জন না হওয়া অবধি।
নির্বাহী সম্পাদক, নতুন দিগন্ত

সাপ?তাহিক পতিবেদন

প্রতিবেদন
  • ফরিদপুরে এসএমই ব্যাংকিং বিষয়ে আর্থিক সচেতনতামূলক কর্মশালা
  •  মতামত সমূহ
    Author : nike free trainer 3.0 mens white blue
    cheap where can i buy pandora bracelets fromdiscount new disney pandora parks exclusive ariels signature color bead charmcheap pandora charms route 66pandora charms qualicum beach nike free trainer 3.0 mens white blue http://www.studioonspring.com/zapatosoutlet_en/nike-free-trainer-3.0-mens-white-blue
    Author : the north face resolve jacket hyvent black label
    nike flyknit racer oreo 38ugg boots 5685 vt navyugg boots 1984 issues redditugg classic mini leather burnt olive wash the north face resolve jacket hyvent black label http://www.palmspringssalsa.com/northfaceclearance_en/the-north-face-resolve-jacket-hyvent-black-label
    পিছনে 
     আপনার মতামত লিখুন
    English বাংলা
    নাম:
    ই-মেইল:
    মন্তব্য :

    Please enter the text shown in the image.