গোপালে অতিষ্ঠ বীরগঞ্জ ও কাহারোল আওয়ামী লীগ -সায়েম সাবু

Print Friendly and PDF

শত শত একর জমির মালিক এখন। দামি গাড়ি, বিলাসবহুল বাড়ি। অথচ ১১ বছর আগে সিএনজিতে চড়ে সংসদে যোগ দিতে এসেছিলেন দিনাজপুর-১ আসন থেকে নির্বাচিত স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য মনোরঞ্জন শীল গোপাল। জায়গা, জমি, মার্কেট অনেক কিছুরই মালিক হয়েছেন। আর এর সবটাই করেছেন আলোচিত এক এগারোর পরে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে দুইবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে। কিন্তু জাগপা থেকে যে দলে ভিরে গোপাল নিজের ভাগ্য গড়েছেন সেই আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাই এখন তার চক্ষুশূল। গোপালের জুলুম, পীড়ন, দুর্নীতি, জামায়াত-বিএনপিকে পৃষ্ঠপোষকতায় বীরগঞ্জ ও কাহারোলের আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন। উপজেলা দুটির আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে এমনটা জানা গেছে। তাদের অভিযোগ, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বাদ দিয়ে গোপাল বীরগঞ্জ ও কাহারোলে জাগপা লীগ তৈরি করেছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগকে নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন এমন অনেক নেতাকে এমপি গোপালের নানা জুলুম-নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে, সক্রিয় রাজনীতি থেকে দূরে সরে যেতে হয়েছে অনেককে। ৪ দলের আমলে যারা জেল-জুলুম সয়েছেন তারা প্রায় সবাই এখন কোনঠাসা।
বীরগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বীরগঞ্জ উপজেলা কৃষক লীগের সভাপতি শিবলী সাদিক সাপ্তাহিককে বলেন, ‘যে সরকার আসার জন্য আমরা আন্দোলন-সংগ্রাম করলাম, জেল-জুলুম-নির্যাতন সহ্য করলাম, সেই সরকারের এমপির কাছে যদি নির্যাতনের শিকার হই তাহলে সেই দুঃখ কোথায় রাখি?’
তিনি বলেন, ‘২০০৩ সালে ৪ দলীয় জোট সরকারের আমলে বীরগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব নিই। আন্দোলন সংগ্রাম করতে গিয়ে বহু মামলা, হামলার শিকার হয়েছি। এখন এমপি গোপালের সবচেয়ে অপছন্দের লোক হলো যারা দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগ করেছেন। উনি এমপির ক্ষমতা দেখানোর জন্য আমার নামে ৪টি মিথ্যা মামলা করিয়েছেন। এই সরকারের আমলে আমার নামে থানা পোড়ানোর মামলা দিয়েছেন।’
সংসদ সদস্য গোপালের আক্রোশের শিকার হয়েছেন বীরগঞ্জ পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি মোশাররফ হোসেন বাবুলও। তিনি বলেন, ‘এমপি গোপালের নির্দেশে আমাকে কাহারোল থানা পোড়ানোর মামলায় আসামি করা হয়। অথচ ওই মামলার এজাহারে আমার নাম ছিল না। এমপির নির্দেশে মামলাটির অভিযোগপত্রে আমার নাম দেয়া হয়।’
মোশাররফ হোসেন বাবুল বলেন, ‘প্রত্যেক নির্বাচনেই আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের বিরুদ্ধে কাজ করেন এমপি গোপাল। এবারের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে উপজেলার ১১টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার মাঝে মাত্র ৩টিতে নৌকা প্রতীকের প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন। বাকিগুলোতে এমপির কারসাজিতে নৌকার প্রার্থীরা পরাজিত হয়েছেন। আমি পৌর নির্বাচনে অল্প কিছু ভোটে জামায়াতের প্রার্থীর কাছে পরাজিত হয়েছি। জামায়াতের এই প্রার্থীর সঙ্গে মেয়রের ঘনিষ্ঠতা বীরগঞ্জে ওপেন সিক্রেট।’
তিনি আরও বলেন, ‘এমপির কারণে বীরগঞ্জ-কাহারোলে আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা অনেক কমে গেছে। উনি ওনার প্রতিনিধি ইয়াসিনের মাধ্যমে টিআর, খাবিখার চাল-গম বিক্রি করেন। প্রতিটি বিদ্যুৎ সংযোগের জন্য ৬-৭ হাজার টাকা নেন। ফলে এখানকার জনগণ এমপির ওপরে ভীষণ ক্ষুব্ধ।’
বীরগঞ্জ উপজেলা যুবলীগের সভাপতি নূরয়াস সাঈদ বলেন, ‘৬ নং নিজপাড়া ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আমি দল মনোনীত চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী ছিলাম। অথচ একটি অনানুষ্ঠানিক মিটিংয়ে আমি নিজ কানে শুনেছি এমপি আমার বিরুদ্ধে যিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন তাকে ভোট দিতে বলছেন। আমার প্রতিদ্বন্দ্বীকে ভোট দেয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেছিলেন, সব নৌকা কি এক নাকি?’
নূরয়াস সাঈদ আরও বলেন, ‘ভোটের আগে এমপির এক অনুষ্ঠানে কয়েকজন তাকে জিজ্ঞেস করেছিল, ভোট কাকে দেব? উত্তরে এমপি বলেছিলেন, আমার সঙ্গে যার ওঠাবসা আছে, খাতির আছে, আমার বাসায় যার যাওয়া আসা আছে তাদের ভোট দেবেন। এভাবে তিনি নৌকার বিরুদ্ধে কাজ করেছেন।’
জানতে চাইলে কাহারোল উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ওসমান গনি বলেন, ‘এমপি সাহেব আমাদের কোনো কাজেই ডাকেন না। কেন আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন না তা উনিই ভালো বলতে পারবেন।’
দিনাজপুর জেলা কৃষক লীগের সহ-সভাপতি ও কাহারোল উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য গপেশ চন্দ্র রায় বলেন, ‘এমপি নিজের লোকদের নিয়ে চলেন। দলের সঙ্গে ওনার কোনো যোগাযোগ নেই। কোনো কাজেও সমন্বয় নেই। এসব সমস্যায় জাতীয় দিবসগুলোতেও কাহারোলে আওয়ামী লীগের কোনো কর্মসূচি হাতে নেয়া হয় না।’
কাহারোল উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি আবদুল হাদিস বলেন, ‘তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এখন সবার মুখে মুখে। প্রথমবার আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচিত হয়েই নৌকা প্রতীকের সর্বনাশ করেছেন। ২০১৪ সালে ফের দল যখন মনোনয়ন দেয়, তখন আমরা অবাক হয়েছি। আবারও তাকে মনোনয়ন দিলে নৌকার কথা বলে মানুষের কাছে যেতে পারব না।’

টাকা দিলেই সব মেলে গোপালে

বীরগঞ্জ ও কাহারোল উপজেলায় টাকা ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠানেই মেলে না চাকরি, বদলি কিংবা পদোন্নতি। যোগ্যতা, আওয়ামী লীগের জন্য ত্যাগ এসবের মূল্য নেই গোপালের কাছে। কত টাকা ঘুষ দিতে পারবেন সেটাই সবচেয়ে বড় যোগ্যতা গোপালের কাছে।
বীরগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের ত্রাণ বিষয়ক সম্পাদক ঈশ্বর চন্দ্র রায়। তিনি বলেন, ‘আমরা কয়েক দশক ধরে আওয়ামী লীগ করি। বছর খানেক আগে বীরগঞ্জ ডিগ্রি কলেজে গণিতের শিক্ষক পদে নিজের ভাতিজার চাকরির জন্য এমপির কাছে গিয়েছিলাম। বুঝলাম টাকা ছাড়া কাজ হবে না। তখন জমি বন্ধক রেখে ৫ লাখ টাকা আমি নিজে এমপির হাতে দিয়ে আসি। কিন্তু আমার ভাতিজার চাকরি হয়নি। খোঁজ নিয়ে জানতে পারি, ১৬ লাখ টাকার বিনিময়ে অন্য এক প্রার্থীকে চাকরি দেয়া হয়েছে। পরবর্তীতে এমপি আমাকে ২ লাখ টাকা ফেরত দিয়েছেন। এখনও ৩ লাখ টাকা তার কাছে পাব। টাকা উদ্ধারে বেশি চাপও দিতে পারছি না। কারণ চাপ দিতে গেলেই বীরগঞ্জ থানায় পেন্ডিং বিভিন্ন মামলায় আসামি বানিয়ে দেবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘নিজপাড়া বাগডাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পিয়ন পদে ৫ লাখ টাকার বিনিময়ে চাকরি পেয়েছেন নিজপাড়া ইউনিয়ন ছাত্রদলের সভাপতি। টাকা ছাড়া আর কিছু দেখেন না এমপি। তিনি টাকা পেলে কে কোন দল করে তা আর বিচার করেন না। চাকরি পেতে চাইলে আপনি আওয়ামী লীগ করেন আর যাই করেন টাকা দিতেই হবে।’
বীরগঞ্জ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্যপরিষদ এবং পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি অরুন চন্দ্র দাস বলেন, ‘দলের পুরনোরা তার কাছে এখন অপাঙক্তেয়। অথচ আমরাই তার জন্য নাম প্রস্তাব করেছিলাম। এমপির বিরুদ্ধে অভিযোগ যে এখন মানুষের সামনে নৌকার কথা বলতে পারি না। তিনি সংখ্যালঘু হয়ে সংখ্যালঘুর জমিও দখল করছেন। মানুষ পরিবর্তন চায়। আবারও তাকে মনোনয়ন দেয়া হলে নৌকার ভরাডুবি নিশ্চিত। এমপি সাহেবের পলিসি হলো, টাকা ছাড়া কোনো কথা হবে না।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বীরগঞ্জ উপজেলা ছাত্রলীগের এক নেতা সাপ্তাহিককে বলেন, ‘বীরগঞ্জ উপজেলা ছাত্রলীগের একজন যুগ্ম আহ্বায়ককে বীরগঞ্জ ডিগ্রি কলেজে নিয়োগ পেতে ৭ লাখ টাকা ঘুষ দিতে হয়। নিয়োগের আগে এক পর্যায়ে ওই ছাত্রলীগ নেতা জানতে পারেন আরও বেশি টাকার বিনিময়ে অন্য এক প্রার্থীকে নিয়োগ দেয়ার কথা চলছে। তখন তিনি সংসদ সদস্য গোপালের বাসায় গিয়ে তার পায়ে ধরেন। সে সময়ে আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম। খুবই লজ্জার বিষয় হলো টাকা দেয়ার পরেও পায়ে ধরে চাকরি নিতে হয় ছাত্রলীগের ওই গুরুত্বপূর্ণ নেতাকে।’  
স্থানীয় আওয়ামী লীগের বহু নেতাকর্মী জানান, বীরগঞ্জ ও কাহারোলের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ ও পদোন্নতির জন্য সর্বোচ্চ ২৫-৩৫ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেনের রেকর্ডও আছে।
বীরগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের একজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘জামায়াত নেতা ও গোলাপগঞ্জ ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ খায়রুল ইসলাম কিছুদিন আগে ২৫ লাখ টাকা এমপিকে দিয়ে কলেজের অধ্যক্ষ পদে বসেন।’
স্থানীয় জয়নন্দ ডিগ্রি কলেজের একজন শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘কিছুদিন আগে কাহারোল থেকে ১৭ কিলোমিটার দূরে উপজেলার উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে অবস্থিত জয়নন্দ ডিগ্রি কলেজকে সরকারিকরণের জন্য ডিও দেন মনোরঞ্জন শীল গোপাল। কলেজ সরকারিকরণের নামে ওই কলেজের শিক্ষকদের কাছ থেকে প্রায় এক কোটি টাকা চাঁদা তোলা হয়। যার বড় অংশ এমপির পকেটে যায়। কলেজটি সরকারিকরণ হয়েও যায়। কিন্তু কাহারোল সদরে অবস্থিত কাহারোল ডিগ্রি কলেজকে সরকারিকরণের আন্দোলন শুরু হলে ওই কলেজকে সরকারিকরণের জন্যও একটি ডিও দেন। পরবর্তীতে জয়নন্দ কলেজকে বাদ দিয়ে কাহারোল কলেজকে সরকারিকরণ করা হয়। এখানেও মোটা অঙ্কের টাকার লেনদেন হয়।’  
জানা যায়, এমপি গোপাল কয়েক বছর আগে তার নির্বাচনী এলাকায় একযোগে ৬টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৮ জন শিক্ষক নিয়োগ দেন টাকার বিনিময়ে। বিধিবহির্ভূতভাবে এসব নিয়োগের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য দিনাজপুর জেলা প্রশাসকের কাছে বেশ কয়েকজন সাধারণ মানুষ আবেদন করেন। এ নিয়ে সেসময়ে জেলা প্রশাসকের নির্দেশে একটি তদন্ত কমিটিও গঠন হয়।     

ত্যাগী নয়, দলছুটদের ওপরই ভরসা গোপালের
আওয়ামী লীগের পুরনো নেতাকর্মীদের সঙ্গে বৈরী সম্পর্ক থাকায় সংসদ সদস্য মনোরঞ্জন শীল গোপালের ভরসা অন্য দল থেকে আসা নেতাকর্মীদের ওপরে। গোপালের হাত ধরে বীরগঞ্জ ও কাহারোল উপজেলা আওয়ামী লীগে জাগপা, জাতীয় পার্টি, বিএনপি, জামায়াত, এলডিপি থেকে আসা বহু নেতাকর্মী গুরুত্বপূর্ণ পদ পেয়েছেন।
বীরগঞ্জ উপজেলা এলডিপির আহ্বায়ক ছিলেন আবুল খায়ের। তিনি এখন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক। মীর কাশেম লালু ছিলেন জাগপার নেতা, তিনি এখন উপজেলা আওয়াম লীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক। জাগপা নেতা কামরুল ইসলাম জুয়েল এখন উপজেলা কমিটির স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক। বিএনপি, এলডিপি ঘুরে আওয়ামী লীগে আসা গোপাল দেব শর্মাকে উপজেলার সাংগঠনিক সম্পাদক করা হয়। গোপাল যখন যেই দলে গোবিন্দ চন্দ্রও ছিলেন তার সহযোগী। গোবিন্দকেও উপজেলার সহ-সভাপতি করেন গোপাল। তবে গোপাল ও গোবিন্দ স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর বিরুদ্ধে নির্বাচন করায় তাদেরকে সাংগঠনিক পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। বিএনপি নেতা মোজাহারুল ইসলামকে উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি করেন এমপি গোপাল। কিছুদিন আগে তিনি মারা গেছেন। গোপালের প্রভাবে জাতীয় পার্টি থেকে আসা মনোয়ার হোসেন এখন উপজেলা আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ।  
কাহারোল উপজেলা আওয়ামী লীগেও দলছুট নেতাদের পুনর্বাসন করেছেন গোপাল। জাগপা ও জাতীয় পার্টি থেকে আসা কামাল হোসেন এখন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক, আবুল কালাম আজাদ উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য ও কৃষক লীগের সাধারণ সম্পাদক। এছাড়া নাসিরুল হককে উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি করেছিলেন, কিন্তু স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করায় তাকে সাংগঠনিক পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
স্থানীয় আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা সাপ্তাহিককে জানান, দিনাজপুর শহরে এমপি গোপালের পেশিশক্তি প্রদর্শনের মূল ভরসা লাপ্পু নামের একজন সন্ত্রাসী। লাপ্পু দিনাজপুরের প্রভাবশালী যুবদল নেতা।
বীরগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি জাকারিয়া জাকা বলেন, ‘এমপি সাহেব আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন করেন না। উনি জাগপা, জামায়াত, বিএনপির নেতাকর্মীদের নিয়ে চলেন। এমনকি বীরগঞ্জে সরকারি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের নেতাদের অঘোষিতভাবে নিষিদ্ধ করে রেখেছেন। সরকারি অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের নেতারা দাওয়াত পান না, কিন্তু বিএনপি জামায়াতের নেতাকর্মীদের ঠিকই উপস্থিত থাকতে দেখা যায়।’
কাহারোল উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হাফিজুল ইসলাম বলেন, ‘এমপি সাহেব সংগঠনের সঙ্গে তেমন কোনো যোগাযোগ রাখেন না। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা তার কাছে মূল্যায়ন পান না। তিনি বিভিন্ন দলছুট লোকদের নিয়ে একটি বলয় তৈরি করেছেন। তাদের নিয়েই চলেন।’
কাহারোল উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এ কে এম ফারুক বলেন, ‘এমপি ও সংগঠনের বিষয়ে আমাদের সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে কথা বলেন। ওনার কথাই আমার কথা।’
সাবেক সংসদ সদস্য ও কাহারোল উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি মালেক সরকার বলেন, ‘গোপাল বীরগঞ্জ কাহারোলে জাগপা লীগ বানিয়েছেন। দলছুট লোকেরাই এখন তার ভরসা। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা কেউ তার সঙ্গে নেই।’
 
জামায়াতের পৃষ্ঠপোষক গোপাল
সংসদ সদস্য গোপালের সহযোগিতায় টাকার বিনিময়ে বীরগঞ্জ ও কাহারোলের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে জামায়াত ও বিএনপির বহু নেতাকর্মী চাকরি পেয়েছেন। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বীরগঞ্জ উপজেলা শিবিরের সাবেক সভাপতি খোদা বক্স শীতলাই আলিম মাদ্রাসার প্রভাষক হয়েছেন। বীরগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মনোয়ার সিদ্দিক বীরগঞ্জ ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক হয়েছেন। একই কলেজের প্রভাষক হয়েছেন স্থানীয় জামায়াত নেতা আবু সাঈদ। ওই কলেজেই প্রভাষক হয়েছেন যুবদল নেতা বুলবুল আহমেদ। বুলবুলের শ্বশুর পাবনা জেলা জামায়াতের গুরুত্বপূর্ণ নেতা।
কাহারোল খামারদিঘা কলেজে প্রভাষক হয়েছেন স্থানীয় জামায়াত নেতা সিরাজুল ইসলাম। পূর্ব মল্লিকপুর কলেজের প্রভাষক হয়েছেন কাহারোলের ৪নং ইউনিয়ন যুবদলের সহ-সভাপতি মহসীন আলী। কাহারোল ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক হয়েছেন কাহারোল উপজেলা ছাত্রদলের সহ-সম্পাদক ফিরোজ কিবরিয়া।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বীরগঞ্জ পৌরসভার মেয়র জামায়াত নেতা মাওলানা হানিফের সঙ্গে গোপালের ব্যাপক ঘনিষ্ঠতা রয়েছে। হানিফের মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পেছনেও গোপালের ভূমিকা রয়েছে বলে জানান বীরগঞ্জ পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও পৌরসভার মেয়র প্রার্থী মোশাররফ হোসেন বাবলু।
তিনি সাপ্তাহিককে বলেন, ‘পৌরসভা নির্বাচনের কিছুদিন আগেও গভীর রাতে নিজের চেম্বারে বসে হানিফকে নিয়ে চা খেয়েছেন এমপি গোপাল। এরপর ভোটে দেখা গেল আমি মাত্র পাঁচশত ভোটে পরাজিত হলাম। এমপি জামায়াতের সঙ্গে যোগসাজশ করে আমাকে পরাজিত করেন। এর আগের নির্বাচনেও এমপির চক্রান্তে ২৬৬ ভোটে পরাজিত করা হয়। এখন এমপির লোকেরা পৌরসভার সব ঠিকাদারি করছে। জামায়াতের মেয়রের সঙ্গে এমপির যোগসাজশের বড় প্রমাণ হলো নাশকতার অনেক মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকলেও একদিনের জন্যও গ্রেপ্তার হতে হয়নি হানিফকে।’

বঙ্গবন্ধু কলেজ গোপালের নামে নামকরণ
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ৭-৮ বছর আগে বীরগঞ্জ উপজেলার পলাশবাড়ি ইউনিয়নের মোদাতি বাজারের পাশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে একটি কলেজ প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত হয়। পরবর্তীতে মনোরঞ্জন শীল গোপাল কলেজটি নিজের নামে নামকরণ করেন।
জানতে চাইলে পলাশবাড়ি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি মানিক বলেন, ‘২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পরে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা পলাশবাড়িতে একটি কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। এ বিষয়ে এমপি সাহেবের উপস্থিতিতে একটি বৈঠক হয়। সে বৈঠকে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি, কলেজের উদ্যোক্তাসহ এলাকার বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে প্রস্তাবিত কলেজটির নাম বঙ্গবন্ধুর নামে করার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু কিছুদিন পরে হঠাৎ দেখা যায় কলেজটির নামকরণ হয়েছে এম এস গোপাল মডেল কলেজ।’
বীরগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি জাকারিয়া জাকা বলেন, ‘আমরাও শুনেছিলাম পলাশবাড়িতে বঙ্গবন্ধুর নামে একটি কলেজ হয়েছে। পরে দেখা গেল সেটি বঙ্গবন্ধু নয় এমপি তার নিজের নামে করেছেন।’
কলেজের নাম পরিবর্তন প্রসঙ্গে জানতে চাইলে এম এস গোপাল কলেজের শিক্ষক জাহেদুল রহিম সাপ্তাহিককে বলেন, ‘আমাদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কলেজটির নাম বঙ্গবন্ধু কলেজই করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু বঙ্গবন্ধু ট্রাস্টের কাছে আবেদন করার পর তারা জানায়, আমাদের আগে আরও অনেকগুলো কলেজের নামকরণের আবেদন তাদের কাছে জমা রয়েছে। ফলে অনুমতি পেতে অনেক সময় লাগবে। ট্রাস্ট থেকে আমাদেরকে কোনো মুক্তিযোদ্ধা বা স্থানীয় সংসদ সদস্যের নামে নামকরণের পরামর্শ দেয়া হয়। পরে উদ্যোক্তারা সবাই মিলে বৈঠক করে কলেজের নাম সংসদ সদস্য গোপালের নামে রাখা হয়।’

কয়েক বছরে গড়েছেন অঢেল সম্পদ
গত ৮ বছরে অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছেন মনোরঞ্জন শীল গোপাল। সংসদ সদস্য হওয়ার আগে ছোটখাটো ঠিকাদারির কাজ করে সংসার চালাতেন। কিন্তু এখন তার জীবনযাপনের সর্বক্ষেত্রে বিলাসিতার ছোঁয়া।
জানা যায়, ২০০৫ সালে বীরগঞ্জ-কাহারোলের সংসদ সদস্য আব্দুল্লাহ আল বাকী মারা গেলে সেখানে উপনির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হন মনোরঞ্জন শীল গোপাল। সে সময়ে প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগ নির্বাচন বর্জন করে। এতেই ভাগ্য খুলে যায় গোপালের। তিনি এর আগে একবার জাগপা ও একবার জাতীয় পার্টি থেকে নির্বাচন করে বিপুল ভোটে পরাজিত হলেও সেবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরে ২০০৮ সালে ৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়ে নির্বাচিত হন। এরপরে ২০১৪ সালেও তিনি আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়ে এমপি নির্বাচিত হন। আওয়ামী লীগের এমপি হওয়ার পর থেকেই প্রভাব-প্রতিপত্তি, অর্থ-বিত্তে ফুলে ফেঁপে উঠতে থাকেন মনোরঞ্জন শীল গোপাল।
জানতে চাইলে দিনাজপুর জেলা কৃষক লীগের সহ-সভাপতি গপেশ চন্দ্র রায় বলেন, ‘গত কয়েক বছরে ওনার অর্থনৈতিক অবস্থার ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। তিনি স্থাবর-অস্থাবর বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন।’
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কাহারোলের জয়নন্দে একটি বিশাল পুকুরের মালিক গোপাল। তিনি কাহারোলের ডাবর ইউনিয়নের বিভিন্ন মৌজায় নামে-বেনামে কয়েকশ বিঘা জমি কিনেছেন। কোটি টাকায় দিনাজপুর শহরের বাহাদুর বাজার এলাকায় উত্তরা মার্কেট কিনেছেন। কাহারোল ও বীরগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন মৌজায় নিজে ও স্ত্রীর নামে বহু জমি কিনেছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা।
মনোরঞ্জন শীল গোপালের অর্থবিত্তের প্রসঙ্গে সাবেক সংসদ সদস্য, দিনাজপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মালেক সরকার বলেন, ‘৪৫ বছর ধরে রাজনীতি করছি। এমন দুর্নীতিবাজ সাংসদ দেখিনি। তিনি পরিকল্পিতভাবে এখানে হিন্দু-মুসলিম বিভাজন সৃষ্টি করে চলছেন। এখন হিন্দুরাও তার সঙ্গে নেই। তার দুর্নীতির কথা আমরাও নেত্রীর কাছে পাঠিয়েছি। তার অপকর্মের জন্য মানুষের কাছে দলের কথা বলতে পারছি না। এক হাইস্কুলে এক শিক্ষক নিয়োগের জন্য ১৪ লাখ টাকা নিয়েছেন সাংসদ গোপাল। ওই শিক্ষককে নিয়োগ দিতে প্রধান শিক্ষক অপারগতা প্রকাশ করলে, তাকে পুলিশ দিয়ে আটক করে থানায় আনা হয়। পরে থানায় বসে জোর করে নিয়োগপত্রে সাক্ষর করিয়েছেন গোপাল। এমন অসংখ্য অভিযোগ তার বিরুদ্ধে। একটি স্কুলের পিয়ন পদে চাকরি দিতেও উনি এখন কমপক্ষে ১০ লাখ টাকা নেন। বিভিন্ন স্কুল-কলেজে জামায়াতের নেতাকর্মীদের ৩৫ লাখ টাকা পর্যন্ত নিয়ে চাকরি দিয়েছেন। শুধু চাকরি বাণিজ্য করেই উনি কমপক্ষে শতকোটি টাকা কামিয়েছেন।’
কাহারোল উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি আরও বলেন, ‘দিনাজপুরে রামসাগরের দক্ষিণ পাশে গোপালের পৈতৃক এলাকায় ১০০ বিঘার মতো জমি কিনেছেন। জয়নন্দেও ১০০ বিঘার মতো জমি কিনেছেন। এছাড়া তার শ্বশুড়বাড়ি এলাকাতেও অনেক জমি কিনেছেন।’  

সংখ্যালঘুদেরও আতঙ্ক
বীরগঞ্জ-কাহারোলে প্রায় এক লাখ সংখ্যালঘু ভোটার রয়েছে। কিন্তু সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায় থেকে আসা গোপালের প্রতি চরম ক্ষুব্ধ তার নিজ সম্প্রদায়ের লোকেরাও। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নেতারা জানান, গোপালের আমলেই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর সবচেয়ে বেশি জুলুম-নির্যাতন হচ্ছে।
বীরগঞ্জ উপজেলা হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ঐক্যপরিষদ এবং বীরগঞ্জ উপজেলা পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি অরুন চন্দ্র দাস স্থানীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের স্বার্থ রক্ষায় দীর্ঘদিন ধরেই ভূমিকা রাখছেন। তিনি বলেন, ‘এমপি গোপালের কাছে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষেরা নিরাপদ নয়। ১৯৭৫ পরবর্তী যে অবস্থা ছিল এখন তারচেয়েও খারাপ অবস্থায় আছি আমরা। ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের আগে পরে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বহু মানুষ জামায়াত-বিএনপির হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এসব ঘটনাগুলোর একটির বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা গ্রহণে ভূমিকা রাখেননি এমপি। শুনেছি উল্টো তিনি এসব ঘটনা নিয়ে বাণিজ্য করেছেন। নাশকতার জন্য যেসব জামায়াত-বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল তাদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে মামলা থেকে নাম কেটে দেয়ার ব্যবস্থা করেছেন এমপি।’
স্বাধীনতার আগে ছাত্রলীগে যোগদানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যুক্ত হওয়া অরুন চন্দ্র আরও বলেন, ‘বীরগঞ্জ পৌর এলাকার ৪নং ওয়ার্ডে কান্তজীর মন্দিরের ৪০-৫০ শতাংশ জমি দখল করে মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেছেন স্থানীয় জামায়াতের কয়েকজন নেতাকর্মী। এমপির কাছে এর প্রতিকার চাইতে গেলে উনি বললেন, সুবিধাজনক সময় এলে দেখব। কিন্তু তার সে সুবিধাজনক সময় আর আসেনি। কারণ বীরগঞ্জের জামায়াতের নেতাকর্মীদের সঙ্গে এখন তার দহরম-মহরম সম্পর্ক।’
তিনি বলেন, ‘৫ জানুয়ারি নির্বাচনে যারা আমাদের এলাকায় তা-ব চালিয়েছে তাদের অনেকেই এখন আওয়ামী লীগ হয়ে গেছে। তারা এখন বিভিন্নভাবে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর জুলুম করছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায় আতঙ্কে আছে। গোপাল যদি আগামীতে আবারও এমপি হয় তবে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অনেকেই দেশ ছাড়বে বলে আমাকে জানিয়েছেন।’
একই ধরনের মত জানান সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নেতা ও বীরগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের ত্রাণ বিষয়ক সম্পাদক ঈশ্বর চন্দ্র রায়। তিনি বলেন, ‘গোপালের আমলে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় সবচেয়ে বেশি নির্যাতিত। আগামীতে গোপাল যদি আবারও আওয়ামী লীগের প্রার্থী হয় তবে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অর্ধেক ভোটার ভোটকেন্দ্রে যাবে না। আর সে যদি আমার এমপি হয় তবে সংখ্যালঘুদের দেশান্তরিত হওয়ার স্রোত শুরু হবে।’
জানা যায়, বিভিন্ন সময়ে সংসদ সদস্যের ঘনিষ্ঠ লোকেরা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জায়গা-জমি দখল করে নিয়েছে। এসব ঘটনায় এমপির কাছে অভিযোগ জানিয়েও কোন প্রতিকার পাওয়া যায় না। কিছুদিন আগে বীরগঞ্জের পলাশবাড়ি ইউনিয়নে যতীশ চন্দ্র দাসের রাইস মিল দখল করে নেন এমপির মদদপুষ্ট আজিজুল। এ ঘটনায় হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্যপরিষদের নেতারা এমপির কাছে প্রতিকার চান। কিন্তু তিনি কোনো ব্যবস্থাই নেননি।

আরও অপকর্ম
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মনোরঞ্জন শীল গোপাল সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে বীরগঞ্জ ও কাহারোল উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় জুয়ার ব্যাপক বিস্তার ঘটে। বর্তমানে দুই উপজেলায় ছোটবড় মিলিয়ে শতাধিক স্পটে জুয়ার আসর বসে। গত কয়েক বছরে জুয়ার আসর বন্ধে দুই উপজেলাতেই বহু প্রতিবাদী কর্মসূচি পালন করেছেন এলাকাবাসীরা। এমনকি জুয়ার আসর বসা না বসা নিয়ে উচ্চ আদালতে পাল্টাপাল্টি একাধিক রিটের ঘটনাও আছে। জুয়ার আসর বসানোর পক্ষে পেছনে থেকে কলকাঠি নাড়েন এমপি গোপাল।
জানা যায়, বীরগঞ্জে নিজ পুত্রের নামে দীপ্ত জীবন ফাউন্ডেশন নামে একটি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু করেছেন গোপাল। যে জমিতে হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠা করেছেন সেটিও কৌশলে নিজের কব্জায় নিয়েছেন গোপাল। তিনি জমির মালিকানা নিয়ে দুইপক্ষের দ্বন্দ্ব মিটিয়ে দেয়ার নামে কৌশলে সেখানে নিজের ছেলের নামে হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন।
বীরগঞ্জ পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি মোশাররফ হোসেন বাবুল বলেন, ‘দীপ্ত জীবন ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠার নামে ব্যাপক চাঁদাবাজি করছেন গোপাল। তার ফাউন্ডেশনে চাঁদা না দিলে কারও কোনো কাজ বা বিল পাস হবে না। টিআর, খাবিখা কিংবা কোনো প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ যাই হোক না কেন দীপ্ত জীবন ফাউন্ডেশনে চাঁদা দিতেই হবে।’
বীরগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি জাকারিয়া জাকা বলেন, ‘দীপ্ত জীবন ফাউন্ডেশনে চাঁদা না দিলে কাজ হয় না এটা বীরগঞ্জে সবাই জানে।’
জানা যায়, ২০১১ সালের মে মাসের প্রথম সপ্তাহে বীরগঞ্জ থানা ঘেরাও করে বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্যকে গণপিটুনি দেয় এলাকাবাসী। তারা থানাতেও অগ্নিসংযোগ করে। তাদের অভিযোগ ছিল, সংসদ সদস্য গোপালের আস্থাভাজন একটি পক্ষ থানার সঙ্গে আঁতাত করে থানার বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য ডাকাতিতে জড়িয়ে পড়েছেন। গোপালের প্রশ্রয়েই থানার পুলিশেরা সাধারণ মানুষের ওপর নানা জুলুম ও তাদের হয়রানি করছে।
জানা যায়, কয়েক বছর আগে উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের আহ্বায়ক দীপঙ্কর রাহার নেতৃত্বে এমপি গোপালের ঘনিষ্ঠ একটি সন্ত্রাসী গ্রুপ চাঁদা না পেয়ে বীরগঞ্জ পৌর এলাকার সুজালপুর কলেজ এলাকায় যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী আক্তারুজ্জামান চৌধুরীর বাড়ি নির্মাণের কাজ বন্ধ করে দেয়। পরে ওই ঘটনায় আক্তারুজ্জামান থানায় মামলা করতে ব্যর্থ হয়ে আদালতে গিয়ে মামলা করেন।


‘প্রমাণ মিললে এমপি পদ থেকে পদত্যাগ করব’

সাপ্তাহিক : নিয়োগসহ নানা দুর্নীতির অভিযোগ আপনার বিরুদ্ধে। অভিযোগ করছেন দলের লোকেরাও।
মনোরঞ্জন শীল গোপাল : চাকরির ক্ষেত্রে অর্থ লেনদেনের বিষয়টি মিথ্যা। আর ঈশ্বর চন্দ্রের কাছ থেকে কোনো টাকা আমি নিই নাই। প্রমাণ মিললে এমপি পদ থেকে পদত্যাগ করব।
সাপ্তাহিক : টাকার বিনিময়ে বিএনপি-জামায়াতের লোকদের চাকরিতে সুপারিশ করছেন, এমন অভিযোগ অনেকের?
মনোরঞ্জন শীল গোপাল : বীরগঞ্জ কলেজে বিএনপি নেতা মনোয়ারের চাকরি হয়েছে। সে পরীক্ষায় ২৫ নম্বরের মধ্যে ২৩ নম্বর পেয়েছে। অন্যরা ১২ এর নিচে পেয়েছে। তাই মনোয়ারের চাকরি হয়েছে। আমরা যে সব জায়গায় আওয়ামীকরণ করি নাই এটা তার প্রমাণ। আর মনোয়ারকে নিয়োগ দিতে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি জাকারিয়া জাকা অধ্যক্ষকে সুপারিশ করেছিলেন। শিবির নেতা খোদা বক্স শীতলাই আলিম মাদ্রাসায় শিক্ষক হয়েছেন। সেখানকার অধ্যক্ষ আমাকে জানিয়েছেন, খোদা বক্স যে বিষয়ের শিক্ষক হয়েছেন ওই বিষয়ে শিক্ষক পাওয়া যাচ্ছিল না। ৩ বার বিজ্ঞপ্তি দিয়েও ওই পদে খোদা বক্স ছাড়া আর কেউ আবেদন করেননি।
সাপ্তাহিক : নিজ দলের নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা করছেন নিয়ন্ত্রণ প্রশ্নে।
মনোরঞ্জন শীল গোপাল : শিবলী সাদিককে আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। আমার কাছে এসে সে কৃষক লীগ করার আবদার জানিয়েছিল। আমি তাতে সায় দিয়েছিলাম। এখন যদি সে আমার বিরুদ্ধে বলে তবে কি করার আছে? থানা পোড়ানোর মামলায় পুলিশ ভিডিও দেখে আসামি করেছেন। এখানে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
সাপ্তাহিক : জামায়াত নেতার সঙ্গে আপনার সখ্যতা সবার মুখে মুখে...
মনোরঞ্জন শীল গোপাল : আমার চেম্বারে সে এসেছিল, আমি সৌজন্যবশত তাকে চা খাইয়েছি। এখানে অন্য কোনো বিষয় নেই।
সাপ্তাহিক : প্রস্তাবিত বঙ্গবন্ধু কলেজের নাম আপনার নামে করেছেন বলে অনেকে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন?
মনোরঞ্জন শীল গোপাল : কলেজটির নাম বঙ্গবন্ধুর নামে রাখার প্রস্তাব আমিই দিয়েছিলাম। কিন্তু বঙ্গবন্ধু ট্রাস্ট ও শিক্ষাবোর্ড থেকে অনুমতি না পাওয়ায় তা করা যায়নি।
সাপ্তাহি ক : অন্যের জমি দখল করে ছেলের নামে ‘দীপ্ত জীবন ফাউন্ডেশন হাসপাতাল’ গড়েছেন?
মনোরঞ্জন শীল গোপাল : জমিটির মালিকানা নিয়ে ঝামেলা ছিল। দুইজন এর মালিকানা দাবি করছিলেন। তারা দুই পক্ষই আমার কাছে আসে। আমি তখন এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে বৈঠক করি। বৈঠকে জমিটিতে একটি দাতব্য হাসপাতাল স্থাপনের পরামর্শ দিই। তখন মালিকানা দাবি করা একজন জমিটি দান করতে রাজি হন। বৈঠকে দীপ্ত দৃষ্টি নামে একটি চক্ষু হাসপাতাল স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। তবে মালিকানার অন্য দাবিদার জমিটি দান করতে রাজি হননি। তার অংশ কিনে নিই। তখন এলাকার অনেকেই চক্ষু হাসপাতাল না করে একটি জেনারেল হাসপাতাল করার পরামর্শ দেন। এলাকাবাসীর পরামর্শেই সেখানে চক্ষু হাসপাতালের পরিবর্তে দীপ্ত জীবন জেনারেল হাসাপাতাল স্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়। সে অনুযায়ী সেখানে এখন প্রতি শনিবারে বহির্বিভাগে দাতব্য চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছি। একটি পবিত্র উদ্দেশ্য থেকেই হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠা করেছি।
সাপ্তাহিক : সংখ্যালঘুরও জমি দখলের ব্যাপারে আপনার বক্তব্য কী?
মনোরঞ্জন শীল গোপাল : আমার সময়ে কান্তজীর মন্দিরের কোনো জমি দখল হয়নি। ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের সময়ে যাদের ওপর হামলা হয়েছিল, আমি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তাদের পাশে দাঁড়িয়েছি।
সাপ্তাহিক : অন্য দল থেকে আসা নেতাদের গুরুত্ব দিচ্ছেন?
মনোরঞ্জন শীল গোপাল : এদের অনেকেই এক সময় আওয়ামী লীগ করত। পরে অন্য দলে গিয়েছিল। কিন্তু তারা সকলেই খুবই জনপ্রিয় জনপ্রতিনিধি। এদের অনেকেই বিভিন্ন ইউনিয়নে কয়েকবার করে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন। তাই কমিটি করার সময়ে দলের স্বার্থেই তাদের তো একটা মূল্যায়ন করতেই হয়।
সাপ্তাহিক : স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নৌকার বিপক্ষে কাজ করার অভিযোগ উঠেছে?
মনোরঞ্জন শীল গোপাল : অনেক সময় দেখা যায় জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য নয় এমন প্রার্থী দলীয় মনোনয়ন পেয়ে যান। সেসব ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীকে বিজয়ী করা খুবই কঠিন হয়ে যায়। বীরগঞ্জ উপজেলায় বিভিন্ন ইউনিয়নে দলীয় প্রার্থী মনোনয়নে খানিকটা ভুল ছিল। এ কারণে সেখানে নৌকা নিয়েও অনেক প্রার্থী জয়লাভ করতে পারেননি। কিন্তু কাহারোলে সে ধরনের ভুল না হওয়ায় এখানে নৌকার বেশির ভাগ প্রার্থী জয়লাভ করেছে।
সাপ্তাহিক : বীরগঞ্জ ও কাহারোল উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতাদের অনেকেই আপনার বিরোধিতা করছেন।
মনোরঞ্জন শীল গোপাল : উপজেলা সদরেই শুধু আমার কিছু বিরোধিতাকারী রয়েছে। কিন্তু ইউনিয়ন পর্যায়ে যান, সেখানে সবাই আমার সমর্থক। শুধু উপজেলা দিয়ে তো আর গ্রহণযোগ্যতা বিবেচনা করলে হবে না।

সাপ?তাহিক পতিবেদন

প্রচ্ছদ কাহিনী/প্রতিবেদন
 মতামত সমূহ
পিছনে 
 আপনার মতামত লিখুন
English বাংলা
নাম:
ই-মেইল:
মন্তব্য :

Please enter the text shown in the image.