বিশ্বজুড়ে সংকটে গণতন্ত্র -আনিস রায়হান

Print Friendly and PDF

বিশ্বজুড়ে চলমান গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মানের অবনতি ঘটছে বলে অভিযোগ আসছে। সম্প্রতি একটি জার্মান প্রতিষ্ঠানের গবেষণা চাউর হলেও এই অভিযোগ উঠছে গত কয়েক বছর ধরেই। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাচিত হওয়ার আগেই, কথিত জনপ্রিয় নেতা বারাক ওবামার আমলেই প্রতিবেদন প্রকাশ পেয়েছিল যে, যুক্তরাষ্ট্রে গণতন্ত্রের মান নিম্নমুখী।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বলতে মূলত মসৃণ সংসদীয় ব্যবস্থা, সুশাসন ও মতপ্রকাশের বর্ধিত সুযোগ-সুবিধাকে বোঝানো হয়। কিন্তু রাষ্ট্রের যেসব সংস্থা ও পদ্ধতির মাধ্যমে এ বিষয়গুলোর দেখভাল করা হয়, তার সঙ্গে যুক্ত লোকজন সমাজের সব অংশের চেতনা ও চাহিদার প্রতিফলন ঘটাতে পারে কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ফলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বলতে অভিধানে যেসব সংজ্ঞা দেখা যায়, বাস্তবে তার প্রয়োগ খুব কমই দেখা যায়। ইউরোপের দু’চারটি রাষ্ট্রে অভ্যন্তরীণ কিছু ক্ষেত্রে এরকম আভিধানিক গণতন্ত্রের চিহ্ন রয়েছে বটে, কিন্তু খোঁজ নিলে দেখা যায়, সেসব রাষ্ট্রও অস্ত্র উৎপাদন করে, বাইরে বিক্রি করে, ব্যবসার জন্য বিভিন্ন দেশে নানা পন্থা অনুসরণ করে এবং সেখানকার লোকদের স্বার্থহানির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। গণতন্ত্রের তাত্ত্বিক ভিত্তি নিয়ে এরকম অনেক বিতর্ক, অভিযোগ রয়েছে। সেসব পাশে সরিয়ে রেখেও বলা যায়, কথিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা যেভাবে চলে আসছিল, সেভাবে যেন আর চলতে পারছে না। এমন পরিস্থিতিতে উদ্বিগ্ন বিশ্বের গণতন্ত্রবাদীরা। তাদের অভিযোগ, দিন দিন গণতন্ত্রের মানের অবনতি ঘটছে।
বাংলাদেশকে স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রের তালিকায় রাখা বেরটুলসম্যান ফাউন্ডেশন-এর নাম যদিও এর আগে অনেকেই শোনেননি, কিন্তু ব্রিটিশ সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন দ্য ইকোনমিস্ট এ দেশের অনেকের কাছেই পরিচিত। বিগত এক যুগ ধরে তারা প্রতি বছর বৈশ্বিক গণতন্ত্রের মান পর্যালোচনা করে প্রকাশ করছে ডেমোক্রেসি ইনডেক্স। এ বছর সংবাদ মাধ্যমটির প্রণীত ২০১৭ সালের ইনডেক্স অনুযায়ী, ২০১৬ সাল থেকে ২০১৭ সালে বাংলাদেশের গণতন্ত্র পরিস্থিতির আট ধাপ অবনতি হয়েছে। বিশ্বকে সাতটি অঞ্চলে ভাগ করা এ রিপোর্টে এশিয়ার অবস্থান বিগত যে কোনো সময়ের চেয়ে খারাপ অবস্থানে রয়েছে। এখানকার গড় গণতন্ত্রের মান ৫.৬৩। আর সারা পৃথিবীতে গণতন্ত্রের গড় মান কমে ৫.৪৮ এ দাঁড়িয়েছে। ২০১৬ সালে এটি ৫.৫২ ছিল বলে জানিয়েছে দ্য ইকোনমিস্ট।
আরও অনেক সংস্থাই এরকম গবেষণা করে থাকে। কেউ দেয় প্রতি দুই বা তিন বছরে, কেউ বা পাঁচ বছর পর পরও বিশ্বে গণতন্ত্রের প্রবণতা নিয়ে গবেষণা প্রকাশ করে। তবে প্রতি বছর এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে ইকোনমিক ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ)। তাদের প্রতিবেদনগুলোও একই কথা বলছে। একটু পেছনে, ২০১৬ সালে তাদের প্রকাশিত গণতন্ত্রের সূচক আমলে নেওয়া যাক। এতে বলা হয়েছে, বিশ্বের মাত্র ৪ দশমিক ৫ শতাংশ জনগণ পূর্ণ গণতন্ত্রের মধ্যে বাস করে। অর্ধেকের বেশি জনগোষ্ঠী বাস করে পুরো অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থায়। আর বাকি অর্ধেক যেসব দেশে বাস করে, সেখানে গণতন্ত্র রয়েছে, তবে ত্রুটি-বিচ্যুতি ব্যাপক। ইআইইউ ২০০৬ সাল থেকে বিশ্বের গণতন্ত্রের মান ও অবস্থা ধরে প্রতি বছর সূচক প্রকাশ করছে। তাদের পর্যবেক্ষণ ও তথ্যাদি বলছে, গণতন্ত্রের অবস্থা ক্রমে খারাপের দিকেই যাচ্ছে।

২.
বেরটুলসম্যান ফাউন্ডেশনের প্রতিবেদন এখানে সাড়া ফেলার কারণ তারা বাংলাদেশকে স্বৈরতান্ত্রিক দেশের কাতারে অন্তর্ভুক্ত করেছে। ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০১৭’র জানুয়ারি পর্যন্ত করা এই গবেষণায় বাংলাদেশ নিয়ে মন্তব্য করা হয়েছে যে, ‘নির্বাচনের মানে অবনতি ঘটায়, এক সময়ের পঞ্চম বৃহৎ গণতন্ত্রের এ দেশটি ফের স্বৈরতন্ত্র হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।’ গবেষণায় উঠে এসেছে, বিশ্বজুড়ে আনুমানিক ৩৩০ কোটি মানুষ স্বৈরতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থার অধীনে বাস করছে। ২০০৬ সালে জার্মানভিত্তিক এই গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি তাদের জরিপ শুরু করার পর থেকে এ সংখ্যা এবারই সবচেয়ে বেশি।
মসৃণ সংসদীয় ব্যবস্থা, সুশাসন ও মতপ্রকাশের অধিকারকে ভিত্তি ধরে বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে বিচার করলে কী মিলছে? দেশে গত নির্বাচনে অর্ধেকের বেশি আসনে ভোট হয়নি। যেখানে ভোট হয়েছে, সেটাও নামকাওয়াস্তে। এটা নির্দেশ করছে, এখানকার গণতান্ত্রিক কাঠামোর মূল উপাদান বিলুপ্তির পথে। এরকম পরিস্থিতিতে বিচার বিভাগ গণতান্ত্রিক কাঠামোকে রক্ষা করার কথা। কিন্তু এদেশে বিচার বিভাগে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের অভিযোগ প্রবল। সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা দায়িত্বে থাকাকালীন তাকে নিয়ে টেলিভিশনে কটুকাটব্য হয়েছে, সরকারি দলের নেতারা প্রকাশ্যে তার বিরুদ্ধে নানা ধরনের কথা বলছিলেন। একপর্যায়ে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগও তুলেছিল সরকার। তার দুর্নীতির নথিপত্রও নাকি দেখতে দেওয়া হয়েছিল তখনকার আপিল বিভাগের বিচারপতিদের। তারা এটি দেখে সিনহার সঙ্গে একত্রে বিচারকার্যে বসতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। এসব পত্রিকায়ও প্রকাশিত হয়েছিল।  সম্প্রতি দেশের খ্যাতনামা আইনজীবী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান প্রশ্ন তুলেছেন, ‘দেশের সবচেয়ে সিনিয়র বিচারপতিরা এবং সরকার যে দুর্নীতি সম্পর্কে জানে, তার তদন্ত কোথায়? কারা কারা ছিল এই দুর্নীতির সঙ্গে? এত বড় দুর্নীতির অভিযোগের বিচার না হলে কোথায় থাকে আইনের শাসন?’
সুশাসন প্রতিষ্ঠা না হওয়ায় প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন এ দেশে গণতন্ত্রের চর্চায় যে ঘাটতি সৃষ্টি করেছিল, তা দূর হয়নি বরং আইনি কাঠামোর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে সরকার তোষণের। ফলে বিরোধীরা আদালতে গেলেই দায়ী হচ্ছে। সরকারি দলের বা সরকারপক্ষের কেউ খুন হলে বা আক্রান্ত হলে সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা গণগ্রেপ্তার হচ্ছে। আর বিরোধী দলের কেউ খুন হলে পুলিশ বছরের পর বছর আসামি খুঁজেই পাচ্ছে না। আইনবিদ আসিফ নজরুলের অভিযোগ, ‘শুধু পুলিশ না, গোয়েন্দা, দুদক, এনবিআর বা অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিস- আইনের প্রয়োগে তাদের আগ্রহও পরিবর্তন হয় দল ও পক্ষভেদে। অনেক সময় বিচার বিভাগে দেখা যায় সরকারের হস্তক্ষেপের আলামত। এগুলো আইনের শাসন নয়।’
বাকি থাকে মতপ্রকাশের অধিকার। সংসদ ও আদালতের অনিয়ম নিয়ে গণমানুষ ও গণমাধ্যম কথা বলতে পারছে কিনা, এটা হলো গণতন্ত্রের শেষ বিবেচ্য। কিন্তু বাংলাদেশে বরাবরই সরকার নানা আইনি রক্ষাকবচ দিয়ে এসব বিষয় মোকাবিলা করে থাকে। জনগণ রাস্তায় নামলে বা ক্ষোভ প্রকাশ করলে বিশেষ ক্ষমতা আইনে তা দমন করা হয়। গণমাধ্যমকে চাপে রাখার জন্যও আদালতকে ব্যবহার করা হয়। সম্প্রতি সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অধিকারবিষয়ক কমিটির সভায় ওই কমিটির সভাপতি পর্তুগালের মারিয়া ভার্জিনিয়া ব্রাস গোমেজ নিবর্তনমূলক বিশেষ ক্ষমতা আইন প্রয়োগের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
বিষয়টি সম্পর্কে বাংলাদেশ সরকারের অবস্থান জানতে চাইলে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিশেষ ক্ষমতা আইনটি এখন আর ব্যবহার করা হয় না এবং ব্যবহারের কোনো পরিকল্পনাও সরকারের নেই। কিন্তু পরে মিসেস গোমেজ ২০১৬ সালে আশুলিয়ায় পোশাক শ্রমিকদের বিক্ষোভ দমনে এই আইন ব্যবহারের সুনির্দিষ্ট তথ্য দিলে প্রতিমন্ত্রী তা স্বীকার করে নেন। মতপ্রকাশের সুযোগ সংকুচিত হওয়ার বিষয়ে কমিটির সভাপতি গোমেজ নির্দিষ্টভাবে এনজিওগুলোর কাজের পরিধি সংকোচনের ব্যাখ্যাও জানতে চান। কমিটির সদস্যরা আদিবাসীদের অধিকার, নারী-পুরুষের সমতা, নাগরিক সমাজের মতপ্রকাশের অধিকার সংকোচন, আইসিটি ও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বিষয়ে তাদের অস্বস্তি ও অভিযোগগুলো তুলে ধরেন।
সরকার মতপ্রকাশের অধিকার নিয়ন্ত্রণের সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। পত্রিকা ও টিভির সংখ্যা উপস্থাপন করে তারা প্রায়শই মতপ্রকাশের স্বাধীনতার হিসাব দেয়। কিন্তু দেশের প্রতিটি মানুষ জানেন, জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনের রাস্তাটি ছাড়া আসলে আর কোথাও সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলা বা সমাবেশ করা অসম্ভব প্রায়। গণমাধ্যমকর্মীরাও দফায় দফায় আইসিটি আইনে জেলে যাচ্ছেন, দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। সাংবাদিক নেতা, অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট ও আইনজীবীরা বলছেন, রাষ্ট্রীয় যেকোনো অনিয়ম তুলে ধরার দায়ে একজন এই আইনের বলি হতে পারেন। আইনটির ৩২ ধারা ব্যবহার করে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ আনার সুযোগ রয়েছে। যা কিনা সাংবাদিকদের কাজের পরিসরকে সংকুচিত করে তুলছে এবং মতপ্রকাশে প্রতিবন্ধকতা আরোপ করছে।
ফলে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের মান কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে, সেই ভাবনার চেয়ে এটি আদৌ এদেশে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে কিনা, কখনও ছিল কিনা সেটাই বরং ভাবনার বিষয়।

৩.
বাংলাদেশের সরকার পরিচালকদের অবশ্য এ নিয়ে খুব বেশি নৈতিক চাপে থাকার কথা নয়। কারণ গবেষণা অনুযায়ী, বিশ্বজুড়েই গণতন্ত্র ও সুশাসনের মান বিগত এক যুগের মধ্যে এখন সর্বনিম্ন। এমন অবনতির সিংহভাগ হচ্ছে উন্মুক্ত সমাজগুলোতেই, যেখানে গণতন্ত্র শক্তিশালী বলে বিবেচনা করা হয়। এসব দেশের সরকারগুলো ক্রমশই স্বেচ্ছাচারী শাসন চালাচ্ছে।
বেরটুলসম্যান ফাউন্ডেশন বলছে, ২০১৬ সালে তাদের সর্বশেষ প্রতিবেদনের পর গণতন্ত্রকরণে সবচেয়ে বেশি পশ্চাদ্ধাবন করেছে তুরস্ক। ২০১৬ সালে দেশটিতে ব্যর্থ গণঅভ্যুত্থান চেষ্টার পর প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগানের দমনমূলক পদক্ষেপের মধ্যে ছিল ‘মতপ্রকাশ, গণমাধ্যম ও সভা-সমাবেশ করার স্বাধীনতায় মারাত্মক কড়াকড়ি।’ ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ‘স্বৈরতান্ত্রিক দেশের সংখ্যা সামান্য বৃদ্ধি পাওয়াটা অত বেশি উদ্বেগজনক নয়। বড় সমস্যাটা হলো নাগরিক অধিকার সংকচিত হচ্ছে, ক্রমবর্ধমান সংখ্যায় গণতান্ত্রিক দেশগুলোতেও আইনের শাসন খর্ব হচ্ছে। একসময়ের গণতন্ত্রের বাতিঘরগুলোও সবচেয়ে অবনতি হওয়া দেশের তালিকায় যেমন- ব্রাজিল, পোল্যান্ড ও তুরস্ক।’ পোল্যান্ডকে নিয়ে মন্তব্য করা হয়, ‘ধীরে ধীরে তারা নিচের দিকে যাচ্ছে।’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্ব এখন ক্রমাগত রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্বীকরণের ক্ষেত্রে দ্রুত অবনতি প্রত্যক্ষ করছে। ক্রমেই আরো বেশিসংখ্যক দেশে, সরকারি নেতারা ইচ্ছাকৃতভাবে ক্ষমতার ভারসাম্য খর্ব করছে। এর মাধ্যমে ওই নেতারা কেবল নিজেদের ক্ষমতাই ধরে রাখছে না বরং বিভিন্ন পক্ষের অবৈধ পৃষ্ঠপোষকতা নিচ্ছে এবং ব্যক্তিগত সুবিধার জন্য রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবহারের সুযোগ নিশ্চিত করছে।
লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের অধ্যাপক কিউ জিন সম্প্রতি এক লেখায় মন্তব্য করেছেন, ‘আগের দিনের মতো আদর্শিক রীতিনীতি আঁকড়ে ধরে রাখার প্রবণতার বদলে নেতাদের কাছ থেকে বুদ্ধিদীপ্ত, দায়িত্বশীল ও যুগোপযোগী পরিবর্তন আশা করা যেতেই পারে।’ এরকম ধারণা এখন বিশ্বজুড়ে আধিপত্য করছে। কিউ জিন তার গোটা প্রবন্ধে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের আজীবন ক্ষমতায় থাকার সাংবিধানিক সম্মতির পক্ষে সাফাই গেয়েছেন। তথ্য হাজির করে তিনি বলেছেন, আন্তর্জাতিক প্রায় সব জরিপেই দেখা গেছে দেশে-বিদেশে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মের চেয়ে সি চিন পিংয়ের জনসমর্থন অনেক বেশি। তার মতে, আজকের বিশ্বে গণতন্ত্র নতুন রূপ ধারণ করেছে।
এই অধ্যাপক একা নন, তার মতো আরও অনেকেই মনে করেন, রাশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও চীনের মতো দেশগুলোর গণতান্ত্রিক পরিস্থিতি নিয়ে বেশি মাতামাতি হয় ও হচ্ছে। কিন্তু আসল সমস্যা পশ্চিমে, সবচেয়ে পরিপক্ব গণতন্ত্রের কেন্দ্রে। আমেরিকা ও ইউরোপে গণতন্ত্রের রূপান্তর ঘটছে। নাগরিক অধিকার ছেঁটে ফেলবেন এমন জনতুষ্টিবাদী নেতারা নির্বাচনে জিতে চলেছেন। উন্নত দেশগুলোতে কয়েক প্রজন্ম ধরে যে মূল্যবোধ গড়ে উঠেছিল, তা ধসে পড়তে শুরু করেছে। ব্রিটেনে ব্রেক্সিট হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্প জিতেছেন। এই জনতুষ্টিবাদী উত্থানের প্রতিক্রিয়া কমই।

৪.
গণতন্ত্রের মূল উপাদান ভোটের কার্যকারিতা অবশ্য আগাগোড়াই কমবেশি প্রশ্নবিদ্ধ। ইদানীং যেন এই সমস্যা প্রকট হয়ে উঠেছে, বেশি বেশি চোখে পড়ছে। যেমন, জার্মানির রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে সদ্য চতুর্থবারের মতো দায়িত্ব পালন শুরু করেছেন অ্যাঞ্জেলা মর্কেল। নতুন মেয়াদ শুরু করায় ইউরোপীয় নেতারা তার সমালোচনা করেননি বরং সবাই তাকে স্বাগত জানিয়েছেন। কারণ তিনি ভোটে জিতে চতুর্থবার ক্ষমতায় আসছেন। কিন্তু ভোটে জিতলেও পুতিনকে স্বাগত জানানো হচ্ছে না। তিনিও চতুর্থ দফায় প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পেলেন। পশ্চিমা গণতন্ত্রবাদীরা জার্মানিকে উন্নত গণতন্ত্র বলে আখ্যা দিলেও রাশিয়াকে একনায়কতান্ত্রিক মনে করে।
দুই দেশের নির্বাচনের কিছু তথ্যের দিকে তাকানো যাক। জার্মানিতে ভোট দিয়েছেন ৭৬.২ শতাংশ ভোটার। এতে অ্যাঞ্জেলা মর্কেল পেয়েছেন মাত্র ৩২.৯ শতাংশ ভোট। এর আগেরবার তার ভোট ছিল ৪১.৫ শতাংশ। দেখা যাচ্ছে, জনসমর্থন হ্রাস পেতে শুরু করেছে, তবু জোট করে রক্ষা পেলেন মর্কেল। অর্থাৎ জনগণের ভোটের জোরে নয়, ক্ষমতায় তিনি আছেন মূলত কৌশলের জোরে। আর রাশিয়ায় ২০১২ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পুতিন মোট ভোটের ৬৪ শতাংশ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। এবার তার ভোট সংখ্যা আরও বেড়েছে, ১২ শতাংশ ভোট বেশি পেয়েছেন তিনি। সেখানে ভোট দিয়েছেন ৬৭.৫ শতাংশ ভোটার। এটা বিগত নির্বাচনের চেয়ে ২.২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি। অর্থাৎ রুশীরা আগের চেয়ে বেশি সংখ্যায় ভোট দিতে গিয়েছেন। পুতিনের নির্বাচনী প্রচারণার মুখপাত্র আন্দ্রে কনদ্রাশভ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি আগেরবারের চেয়ে বৃদ্ধি পাওয়ার জন্য যুক্তরাজ্যকে ধন্যবাদ দিয়েছেন। কারণ রাশিয়ায় নির্বাচনের আগমুহূর্তে দ্বৈত গোয়েন্দা স্ক্রিপাল ও তার মেয়েকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ তুলে ২৩ জন রুশ কূটনীতিককে বহিষ্কার করে যুক্তরাজ্য। এই পদক্ষেপ সরাসরি প্রভাব ফেলে ভোটার উপস্থিতিতে। এটা খুব পরিষ্কারভাবে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, পুতিনের পক্ষে ম্যান্ডেট মর্কেলের চেয়ে শক্তিশালী এবং বেশি সক্রিয়।
ম্যান্ডেট তথা জনগণের রায় গণতন্ত্রের খুবই মৌলিক একটি বিষয়। বিরোধীরা জনগণের ম্যান্ডেটকে শ্রদ্ধা করার কথা বলেন। ফ্রান্সে সম্প্রতি দেখা যাচ্ছে, নতুন দল গঠন করে ক্ষমতায় আসা প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নে বিরোধী দলের সহযোগিতা চেয়েছেন এবং পেয়েছেন। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার কার্যক্রমের অংশ হিসেবে তার সরকার দেশটির সংসদের আসন সংখ্যা প্রায় এক তৃতীয়াংশ কমিয়ে আনার একটি পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। বিরোধী দল এতে সমর্থন দিয়েছে। সরকারি ব্যয় হ্রাসে তার গৃহীত আরও অনেক পদক্ষেপই বাস্তবায়নের পথে। যার মধ্যে রয়েছে রাষ্ট্রীয় রেলওয়ের সংস্কার। প্রতিষ্ঠানটির কর্মীরা এতদিন স্বয়ংক্রিয় বেতন বৃদ্ধি, আগেভাগে অবসরে যাওয়াসহ বছরে ২৮ দিনের সবেতন ছুটির সুযোগ পেতেন। স্থায়ী চাকরিরতদের বরখাস্তের নিয়ম ছিল না; কর্মীদের নিকটাত্মীয়দের জন্য বিনা ভাড়ায় রেল ভ্রমণের সুযোগ ছিল। ম্যাক্রোঁর সংস্কার প্রস্তাবে শ্রমিকদের এসব সুযোগ-সুবিধা কমবে। রেল খাতকে ঢেলে সাজানোর জন্য সরকার এ পরিকল্পনার কথা বললেও শ্রমিকদের অভিযোগ, আইন সংস্কারের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় খাতগুলোকে বেসরকারিকরণের পথে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। ফ্রান্সে ও ইউরোপের আরও কিছু দেশে যখন এসব সংস্কারের বিপক্ষে কথা হচ্ছে, তখন ম্যান্ডেটকে শ্রদ্ধা জানানোর দাবি তুলেছেন ম্যাক্রোঁপন্থিরা। তাদের যুক্তি, এসব প্রতিশ্রুতির প্রেক্ষিতেই তিনি ভোট পেয়েছেন, সুতরাং এগুলো বাস্তবায়নে তাকে বাধা দেওয়াটা গণতন্ত্রকেই নস্যাৎ করে দেওয়া, ম্যান্ডেটকে অকার্যকর করে ভোটাধিকারকে সারশূন্য বিষয়ে পরিণত করা।
কিন্তু এই একই যুক্তি এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে ট্রাম্পের ক্ষেত্রে, এড়িয়ে যাচ্ছেন ইউরোপের এই গণতন্ত্রবাদীরাই। ট্রাম্প বাণিজ্যচুক্তি, জলবায়ু চুক্তি ও ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি বাতিলসহ মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল তোলা এবং আরও অনেক বিতর্কিত ও প্রতিক্রিয়াশীল প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ভোটের আগে। এসব চিন্তা কারও কাছে গ্রহণযোগ্য হোক বা না হোক, ট্রাম্প তো এসব প্রতিশ্রুতি দিয়েই ম্যান্ডেট পেয়েছেন। কিন্তু তার ম্যান্ডেট কার্যকর করতে দিচ্ছে না মার্কিন ব্যবস্থা এবং এর বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত গলা ফাটাচ্ছেন ইউরোপীয় নেতারা। যা কিনা ম্যান্ডেট সম্পর্কে তাদের সুবিধাবাদী অবস্থানকেই প্রকাশ করছে।
স্পেন থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পক্ষে বার্সেলোনার জনগণের ম্যান্ডেট পেয়েছে কার্লোস পুজেমনের দল। কিন্তু স্পেন সরকার শক্তিপ্রয়োগ করে কাতালানদের স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা দমন করছে, সেখানেও সরকারের সঙ্গী হয়েছেন আদালত। জার্মানি যদিও সারা বিশ্বের মানুষকে গণতন্ত্রের নামে ইদানীং অনেক নসিহতই দিচ্ছে, কিন্তু দেখা গেল ইউরোপীয় ইউনিয়নে স্পেনের অবদান আরও বেশি করে নিশ্চিত করতে, এক কথায় স্পেন সরকারকে হাতে রাখতে ও তুষ্ট করতে তারা গ্রেপ্তার করল পুজেমনকে। বলা হলো স্পেনের আদালত দুর্নীতির অভিযোগে তার বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারি করায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। অর্থাৎ কাতালানদের ম্যান্ডেটকে শ্রদ্ধা করার প্রয়োজন তারা করল না, ওই ইস্যুতেই যে সব হচ্ছে সেটাও আড়াল করল।
ম্যান্ডেট শুধু ট্রাম্পের ক্ষেত্রেই উদারনৈতিকদের ঝামেলায় ফেলেনি। ম্যান্ডেট পেয়েছেন পাশের দেশের উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদী নেতা নরেন্দ্র মোদিও। একদিকে তার সরকার গোরক্ষা আইন করে, আবার সেই আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করতে দলীয় কট্টর হিন্দুদের লেলিয়ে দিচ্ছে মুসলিম ও দলিতদের ওপর। অন্যদিকে ওই একই সরকার হরিণ হত্যায় দোষী সাব্যস্ত চিত্রনায়ক সালমান খানের দণ্ড দেওয়া বিচারকদের বদলি করছে, এটাও সেই আইনি বিধি মেনেই। একইভাবে ম্যান্ডেটের জোরে রোহিঙ্গাদের ওপর চড়াও হলেন মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চি। আবার ইসরায়েলের শাসকরা ফিলিস্তিনে বছরের পর বছর গণহত্যা চালিয়ে যাচ্ছে ম্যান্ডেটের জোর দেখিয়েই।
তাহলে কী করবে মানুষ ম্যান্ডেটের প্রশ্নে! এটা কি গলার মালা না কাঁটা? গণতন্ত্রবাদীরা এর উত্তর দিতে পারছেন না।

৫.
সমস্যাটা তাহলে কোথায়? দুনিয়াজুড়ে গণতন্ত্রের এই ধারাবাহিক পতন কেন? তিনটি বিষয় এখানে প্রধান ভূমিকা পালন করছে। মূল হলো অর্থনীতি। বিশ্বজুড়ে নয়া উদারবাদী অর্থনীতির প্রভাবে বৈষম্য ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলেছে। দেশে দেশে মানুষের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা, অনিরাপত্তা বেড়ে গেছে। হানাহানি, খুনোখুনি, হামলা ও যুদ্ধের আশঙ্কা এখন সর্বত্র। এটা এতদিন ধরে চলে আসা উদারনৈতিকদের ক্ষমতাকাঠামোকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। বিশ্বায়নমুখী অর্থনীতিতে কতিপয় মালিকের ক্রমবর্ধমান মুনাফা, আর সাধারণের শ্রমঘণ্টা ও করের বোঝা বেড়ে চলাটা মানুষের মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার ঘটিয়েছে। এই ক্ষোভই প্রতিফলিত হচ্ছে ওয়ালস্ট্রিট বিরোধী আন্দোলনে উই আর নাইনটি নাইন পার্সেন্ট আন্দোলনে। এভাবে অর্থনীতিই দরজা খুলে দিচ্ছে পরিবর্তনের। আর্থিক পরিস্থিতি মানুষের মধ্যে এই উপলব্ধি সৃষ্টি করছে যে, গণতান্ত্রিক কাঠামো তাদের রক্ষা করছে না, তারা বঞ্চিত হচ্ছেন। এই কাঠামোতে ক্ষমতাধররা, ধনীরাই বেশি সুবিধা ভোগ করছে। আইন-আদালত অধিকাংশ ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীনদেরই সেবা করছে। এগুলো ক্ষোভের জন্ম দিচ্ছে।
দ্বিতীয় ফ্যাক্টরটি হলো বিশ্বের সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও পরিবেশগত পরিস্থিতি। গণতন্ত্র তথা আদালত ও সংসদের ক্ষমতাবলেই দেখা যাচ্ছে একেকটি দেশ ভয়ঙ্কর সব মারণাস্ত্র আবিষ্কার করে চলেছে। গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোই বিশ্বজুড়ে ধর্মীয় সন্ত্রাস তথা আইএস, আল কায়েদা বা জঙ্গি সংগঠনগুলো ছড়িয়ে দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশে দেশে তারা যুদ্ধ রপ্তানি করে কোটি কোটি মানুষকে উদ্বাস্তুতে পরিণত করেছে। শুধু তাই নয়, বিজ্ঞানের বিকাশের নামে তারা ক্রমাগত বিকাশ ঘটিয়ে চলেছে এমন সব প্রযুক্তির, যা পরিবেশকে করছে বিপন্ন, মানুষকে করে দিচ্ছে কর্মহীন।
সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোকে শুরুতে মতপ্রকাশের হাতিয়ার হিসেবে প্রচার করা হলেও ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে, এগুলো মানুষের বিকাশকে রুদ্ধ করছে। মানুষের গোপন তথ্য তুলে দিচ্ছে ব্যবসায়ী বা মতলববাজদের হাতে। বড় ক্ষমতাধররা এগুলো ব্যবহার করে মানুষকে সহজেই বিভ্রান্ত করে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করছে। এসব মাধ্যম ব্যবহার করে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে সাম্প্রদায়িকতা এবং ভোগবাদী, কর্মবিমুখ মনোভাব।
মানুষের দেহ, চিন্তা, মনন, ভাষা আর সংস্কৃতি- সবই হয়ে গেছে পণ্য কিংবা শিকার হচ্ছে আগ্রাসনের। উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলো, গণতান্ত্রিক বিধি মেনেই এসব অপকর্ম করছে, করতে দিচ্ছে। দুর্বল গণতন্ত্র বা অগণতন্ত্র এসবের সঙ্গী হচ্ছে, কিংবা তাদের মোসাহেবি করছে। এগুলো গণতন্ত্রের দুর্বলতাকেই সামনে নিয়ে আসছে এবং এসব প্রবণতা জনগণকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটানোর দিকে চালিত করছে।
কিন্তু গণআন্দোলনের যখন টুঁটি চেপে ধরা হচ্ছে, যখন এস্টাবলিশমেন্টসহ এমনকি অধিকাংশ বুদ্ধিজীবীরাও চাইছেন জনগণের যেকোনো উত্থান ঠেকাতে, তখন সক্রিয় হচ্ছে তৃতীয় ফ্যাক্টরটি। এটি হলো ভোটবাক্স। জনগণ যখন সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না, তখন তারা ভোটের সুযোগকে কাজে লাগাচ্ছে- ছুড়ে ফেলছে প্রচলিত রাজনীতিবিদ ও প্রতিষ্ঠিত নেতাদের। মিশরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দেখা গেল ভোটে না দাঁড়ানো লোককে ভোট দিচ্ছে ভোটাররা। ফুটবলার মো সালাহকে ভোট দিয়ে ব্যালট নষ্ট করেছেন ২০ লাখেরও বেশি ভোটার। এভাবে মানুষ ভোট ব্যবস্থাকে অকার্যকর করে তুলছে। কোথাও কোথাও ভোটের মাধ্যমেই তারা নির্বাচিত করছেন রাজনীতির বাইরের প্রতিনিধি। কিন্তু ভোট এমনই এক ব্যবস্থা যে, সেখানে এস্টাবলিশমেন্টের বাইরে থেকে কেউ আসতে পারে না। ফলে ভোটের প্রক্রিয়ায় তারা বিকল্প হিসেবে পাচ্ছেন কেবল কট্টরপন্থিদের। কারণ উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোর রাজনীতি হলো উদারনৈতিক ও কট্টরপন্থিদের মিলনমেলা। সারমর্মে তাদের মধ্যে তেমন পার্থক্য নেই, উভয় পক্ষই একচেটিয়া পুঁজিপতিশ্রেণীর প্রতিনিধি। কিন্তু কট্টরদের গলা চড়া, তারা মানুষ শুনে খুশি হয় এমন সব কথা বলে থাকেন- জাতীয় শ্রেষ্ঠত্ব, ধর্মীয় আধিপত্যের কথা বলেন। এতে মানুষ সাময়িকভাবে তাদের দিকে হেলে পড়ে। ইউরোপ, আমেরিকাসহ সারা বিশ্বে এখনই এটাই দেখা যাচ্ছে।
তাছাড়া ভোট দিয়ে যে চূড়ান্ত সমাধান আসে না, এটা জাতিসংঘের সর্বোচ্চ কেন্দ্র ‘স্থায়ী নিরাপত্তা পরিষদে’র দিকে তাকালেই টের পাওয়া যায়, সেখানে ভোট নেই। যারা নিজেদের সর্বোচ্চ কেন্দ্রে ভোট করতে পারেন না, তারা কীভাবে প্রত্যাশা করেন ভোটের মাধ্যমে জগতের বা কোনো দেশের সমস্যা সমাধান হবে?

৬.
গণতন্ত্র কোনো স্থির ধারণা নয়, হতে পারে না। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার চেহারা যেমন ছিল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সেটা তেমন থাকেনি। সেই চেহারাটাও আবার আরও পাল্টে গেল আশির দশক ঘুরতে না ঘুরতেই। নব্বইয়ের দশকে দেখা গেল, বিশ্বায়ন শুধু বড় অর্থনৈতিক শক্তিগুলোর দুনিয়াজোড়া অবাধ প্রসারেই সাহায্য করল না, তাদের বিনিয়োগের নিরাপত্তার নামে বিশ্বজুড়ে দৃশ্যমান ও অদৃশ্য হস্তক্ষেপকেও তীব্র গতিতে এগিয়ে নিল।
এভাবে গণতান্ত্রিক নিয়মবিধি অনুসরণ করেই গণতান্ত্রিকরা পৃথিবীটাকে অগ্নিকুণ্ড বানিয়ে ফেলার পথে এগিয়ে চলেছে। এই পরিস্থিতির সমাধান চলমান বিশ্ব ব্যবস্থার মধ্যে দেখা যাচ্ছে না। তবে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতিভূ রাষ্ট্রগুলো নিশ্চয়ই একটি পুনর্গঠনের দিকে যেতে চাইবে। কিন্তু তাদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বগুলো এত বেশি তীব্র হয়ে উঠেছে যে, সেই সম্ভাবনা দিন দিন দূরে সরে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের নেতা বব অ্যাভাকিয়ান এ নিয়ে নতুন একটি প্রশ্ন হাজির করেছেন। তিনি বলছেন, ‘আমরা কি গণতন্ত্রের চেয়ে উন্নত কিছুর কথা চিন্তা করতে পারি না?’ দেখা যাক, মানবজাতির এবং সেই সঙ্গে পৃথিবীর ভবিষ্যৎ কোন দিকে গড়ায়!

সাপ?তাহিক পতিবেদন

 মতামত সমূহ
পিছনে 
 আপনার মতামত লিখুন
English বাংলা
নাম:
ই-মেইল:
মন্তব্য :

Please enter the text shown in the image.