[স্মরণ] ব্রিটিশবিরোধী দুই অগ্নিশিখা

Print Friendly and PDF

মীম মিজান

বীরাঙ্গনা বেগম হজরত মহল
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে বেগম হজরত মহলের কথা ইতিহাসে গৌরবের সঙ্গে লেখা রয়েছে। এ নারী যোদ্ধা সাহসিকতার সঙ্গে মুখোমুখি অস্ত্র নিয়ে লড়াই করেছেন ব্রিটিশ শাসকদের সঙ্গে। তৎকালীন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে তিনি অস্ত্র তুলে নিয়েছিলেন। যুদ্ধের ময়দানে তিনি ছিলেন একজন অকুতোভয় সৈনিক। তার প্রকৃত নাম ছিল মোহাম্মদী খানম। তিনি ফৈজাবাদে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম ছিল আম্বর যিনি গোলাম হোসাইন আলী খানের দাস ছিলেন। এক সময় পিতা তাকে ওয়াজিদ আলী শাহের অন্দর মহলে বিক্রি করে দেন। তার সৌন্দর্য ও গুণ দেখে মুগ্ধ হয়ে নবাব তাকে ‘মাহাক পরী’ বা সৌন্দর্যের পরী বলে অভিহিত করেন। নবাব তাকে উপপতœী হিসেবে গ্রহণ করে নাম দেন হজরত বেগম মহল। তার কোলে একটি পুত্র সন্তান জন্ম নেয় যার নাম বিরজিস ক্বদর। আওধের শেষ নবাব ওয়াজিদ আলী শাহের নবম পতœী ছিলেন তিনি। আসুন জেনে নেই আওধ সম্পর্কে, আওধের নবাবরা পারস্যের নিশাপুরের রাজবংশের সাথে সম্পর্কিত ছিলেন। ১৭২৪ সালে নবাব সাদাত আলি খান আওধ রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। ফৈজাবাদ ছিল আওধের রাজধানী। আওধের শাসকদের নবাব বলা হতো। নেপালিরা অযোদ্ধাকে বলে আওধ। ব্রিটিশদের সময়ে মূলত নেপাল এবং ভারতের উত্তরপ্রদেশের কিছু অংশ মিলে ছিল অযোদ্ধা বা আওধ।
১৮৫৭ সালের ২৯ মার্চ ব্যারাকপুরে যে সিপাহি বিদ্রোহ হয়েছিল মঙ্গল পান্ডের নেতৃত্বে তার এক বছর পূর্বেই ফেব্রুয়ারি ১১, ১৮৫৬তে ডালহৌসি অরাজকতার দোহাই দিয়ে আওধ সম্পূর্ণরূপে অধিকার করে নেয় আর কলকাতার মেটিয়াবুরুজে ওয়াজিদ আলী শাহকে অন্তরীণ করে রাখে।
জুন ১৯৫৮ সালে বেগম হজরত মহল লক্ষেèৗ বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেন। তিনি ৭ মার্চ ঘোষণা করেন একটিও ইংরেজ সৈন্যকে জীবিত ফেরত যেতে দেয়া হবে না। লক্ষেèৗয়ের সিপাহি ও অযোধ্যার কৃষক ও জমিদারদের সহায়তায় তিনি ব্রিটিশদের লক্ষেèৗ থেকে বিতাড়িত করতে সক্ষম হন। এ সময় তাকে সহযোগিতা করেন রাজা জয়লাল সিংহ যিনি আজমগড়ের নিজাম ছিলেন। এছাড়াও ঝাসির রানী লক্ষèী বাইয়ের বাল্য বন্ধু মারাঠার সৈনিক নানা সাহেবও তাকে সহযোগিতা করেছিলেন। রেসিডেন্সি আক্রমণের সময় স্যার হেনরি লরেন্স নিহত হন। পরবর্তীকালে জেনারেল আউট্রাম ও হ্যাভলক বলপূর্বক রেসিডেন্সিতে প্রবেশ করলে বন্দী হন। পরে অবশ্য তাদের ছেড়ে দেয়া হয়েছিল। লক্ষেèৗ বিজয় করে ১০ মাস তিনি রাজত্ব করেন। এরপর তিনি তার পুত্র বিরজিস কাদিরকে মাত্র ১২ বছর বয়সে অযোধ্যা বা আওধের নবাব ঘোষণা করেন।
তিনি যুদ্ধ করতে করতে নেপালে চলে যান। ইংরেজরা আবার লক্ষেèৗ দখল করে। তিনি নেপালেই আশ্রয় নেন। ১৮৭৯ সালের ৭ এপ্রিল কাঠমান্ডুতে তার মৃত্যু হয়। তার শেষ ইচ্ছামতো তাকে তার তৈরি ইমামবারাতে দাফন করা হয়।

বিদ্রোহী মঙ্গল পান্ডে
ইতিহাসের সিপাহি বিদ্রোহ একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এ বিদ্রোহ পরবর্তীতে ভারতকে স্বাধীনতার দিকে ধাবিত করেছিল।
উপনিবেশবাদী ব্রিটিশদের অত্যাচার-নির্যাতনের বিরুদ্ধে ভারত উপমহাদেশে সর্বপ্রথম প্রতিবাদে গর্জে উঠেছিলেন মঙ্গল পান্ডে। তিনি ভারতীয়দের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রথম মুক্তিযোদ্ধা ও বীর শহীদ।
মঙ্গল পান্ডের জন্ম ১৮২৭ সালের ১৯ জুলাই। উত্তরপ্রদেশের বালিয়া জেলায় নাগওয়া গ্রামে। অনেকের মতে তার জন্ম হয়েছিল ফৈজাবাদ জেলার সুরহুর গ্রামের একটি ব্রাহ্মণ পরিবারে। দিবাকর পান্ডের ঘরে। পড়াশোনার হাতেখড়ি পরিবারে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পড়াশোনা শেষ করে মাত্র ২২ বছর বয়সে ১৮৪৯ সালে তিনি ব্রিটিশ ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানিতে সিপাহি পদে চাকরি নেন। এখানে চাকরি করতে এসে তিনি অনেক রকম বৈষম্য আর অন্যায় দেখতে পান, যা মঙ্গল পান্ডেকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। ভারতীয় সিপাহিরা যখন কর্মরত থাকতেন, তখন কোনো ইংরেজ সিপাহি বা অফিসার দেখলেই অস্ত্র উত্তোলন করে সম্মান দেখানোর রীতি ছিল। কিন্তু ভারতীয় সিপাহি বা অফিসারকে ইংরেজ সিপাহিরা সম্মান দেখাত না বরং বিমাতাসুলভ আচরণ করত। ভারতীয় সিপাহিরা যদি কোনো স্থানে কোনো কারণে মারা যেতেন, তাহলে ওই পরিবারের কোনো খোঁজ-খবর ইংরেজ বাহাদুররা নিত না। অবশেষে ওই পরিবারটি নিঃস্ব হয়ে যেত। আর ইংরেজ সিপাহিদের ক্ষেত্রে ছিল অফুরন্ত সুযোগ-সুবিধা।
১৮৫৩ সালে তৈরি করা হয়েছিল ৫৫৭ ক্যালিবার এনফিল্ড (পি/৫৩) রাইফেল। এই রাইফেল ভারতীয় সিপাহিদের হাতে তুলে দেয় ব্রিটিশ সরকার। রাইফেলগুলোর কার্তুজ গরু ও শূকরের চর্বি দিয়ে তৈরি হতো। সৈন্যরা তাদের রাইফেলের কার্তুজ লোড করার সময় তা দাঁত দিয়ে খুলে লাগাতে হতো। গরু ও শূকরের চর্বি মুখে দেয়া হিন্দু-মুসলিম সৈন্যদের জন্য অধার্মিক ও গর্হিত কাজ। ১৮৫৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে সিপাহিরা (ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে ভারতীয় সৈন্য) নতুন কার্তুজ ব্যবহার করতে অস্বীকার করেছিল। নতুন কার্তুজ প্রতিস্থাপন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ব্রিটিশ। কিন্তু সিপাহিদের কাছে এই প্রতিশ্রুতির কোনো মানে দাঁড়াল না।
এ আগ্নেয় অস্ত্র তুলে দেয়ার জন্য ব্রিটিশ শোসকগোষ্ঠীকে চরম মূল্য দিতে হয়েছিল। সম্মুখীন হতে হয়েছিল সিপাহি বিপ্লবের। আর এই বিপ্লবের শুরুটা করেছিল মঙ্গল পা-ে।
মহাবিদ্রোহ ১৮৫৭ কে ভারতের প্রথম স্বাধীনতা আন্দোলন রূপে গণ্য করা হয়। ইংরেজ ঐতিহাসিকরা একে সিপাহি বিদ্রোহ বলেছেন।
উঠ! ভারতবাসী জাগো! হিসেব নিকেশের দিন এলো। একশ বছরের নির্যাতনে জর্জরিত মুমূর্ষু মা মুক্তির বেদনায় কাঁদছে। দিনটি ছিল ২৯ মার্চ, ১৮৫৭। রোববার অপরাহ্ন। ব্যারাকপুরের প্যারেড ময়দানে অসময়ে মানুষের ভিড় বাড়ছে। ৩৪ নং ইনফ্যানট্টির সিপাহিরা আজ দলে দলে জটলা বাঁধছে। চাপা গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে চার দিকে। সিপাহিদের মধ্যে কেউ এসেছে খালি হাতে, কেউ এসেছে বন্দুক নিয়ে। সৈনিকদের ভিড় ক্রমেই বাড়ছে। আজ রচিত হবে এক মহান ইতিহাস। মঙ্গল পান্ডে সব সৈনিককে প্যারেড গ্রাউন্ডে ডাকেন ও সেখান থেকে সিপাহি বিদ্রোহের ডাক দেন। তার উচ্চ পদাধিকারী তাকে আক্রমণ করলে তিনি তলোয়ার দিয়ে ধড় থেকে মুন্ডু আলাদা করে দেন।
লাইন থেকে পঞ্চাশ কিংবা ষাট হাত দূরে মঙ্গল পান্ডে। বন্দুক কাঁধে নিয়ে টহল দিচ্ছেন। সবাই তার দিকে তাকিয়ে কানাকানি। লোকটা কি পাগল হলো! কিসের জন্যে তার পাগলামি?
কী অদ্ভুত এই উন্মাদনা! কী এর নাম! মূর্খ সিপাহি কি তা কি জানে! এর নাম দেশপ্রেম। মাতৃভূমি রক্ষার উন্মাদনা। পান্ডেকে শায়েস্তা করার জন্য লেফটেন্যান্ট আসল। কিন্তু পান্ডে স্থির ও অবিচল। বন্দুকের নল লেফটেন্যান্টের দিকে সোজা তাক করে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে পান্ডে। লেফটেন্যান্টের ঘোড়াটি সরাসরি পান্ডের গায়ের ওপর চড়িয়ে দিল। সঙ্গে সঙ্গে পান্ডে গুলি চালাল। ঘোড়াটি মাঠে লুটিয়ে পড়ল। লেফটেন্যান্ট পান্ডেকে লক্ষ্য করে গুলি চালাল। কিন্তু ওই গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হলো। পান্ডে একটু এগিয়ে গিয়ে তলোয়ার দিয়ে লেফটেন্যান্ট বগকে সলিল সমাধি ঘটল। লেফটেন্যান্টের পরে এসেছিল সার্জেন্ট। সার্জেন্ট পান্ডের তলোয়ারের কাছে ধরাশায়ী হলো। তার পর আসল পল্টু। সে ইংরেজদের দালাল। মঙ্গল পান্ডেকে পিছন থেকে দু’হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে। পল্টুও রক্ষা পেল না পান্ডের ধারালো তরবারির কাছে। নিজেকে মুক্ত করল পান্ডে। সবাই উত্তেজিত। সিপাহিদের মধ্যে উল্লাস ধ্বনি। শেষ বিকেলে বিদ্রোহের সংবাদ পেয়ে সেনাপতি হিয়ার্সে চলে আসল সেনা ক্যাম্পে। ততক্ষণে মঙ্গল পান্ডে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। তারপরও তিনি ব্রিটিশদের হাতে মরবেন না বলে মনে মনে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। হঠাৎ পান্ডের পিস্তল গর্জে ওঠে। অভিমানী সৈনিক! আত্মহত্যা করার চেষ্টা করে। নিজের মাথায় ঠেকিয়ে দেয় পিস্তল। গুলি ফসকে গেল। ধোঁয়া, বারুদ ও অগ্নিশিখার মধ্যে আহত রক্তাক্ত দেহ লুটিয়ে পড়লো। ধরে ফেলল পান্ডেকে। তাকে চিকিৎসা করল ব্রিটিশ। উদ্দেশ্য সুস্থ করে নির্মম শাস্তি দেয়া।
৬ এপ্রিল সেপাই মঙ্গল পান্ডের বিচার। বিচারের নামে প্রহসন মাত্র। দ-াদেশ : ফাঁসি। মঙ্গল পান্ডে তখনো অসুস্থ। হাসপাতালে শুয়ে আছে। ক্ষত স্থানগুলো ফুলে ওঠেছে। বাঁচার আশা নেই বললেই চলে। ৮ এপ্রিল সকাল বেলা। অসুস্থ মুমূর্ষু সৈনিক মঙ্গল পান্ডেকে ব্যারাকপুরে সব সৈনিকের সামনে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলিয়ে দ-াদেশ কার্যকর করে ইংরেজ। ওই দিন ঈশ্বর পান্ডেকেও ফাঁসি দেয়া হয়েছিল। কারণ তিনি মঙ্গল পান্ডেকে গ্রেফতার করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। সামরিক আদালতের রায়ে ১৮ এপ্রিল মৃত্যুদ- কার্যকরের নির্দেশ দেয়া থাকলেও নির্ধারিত সময়ের ১০ দিন আগে তাকে হত্যা করা হয়। প্রকৃতপক্ষে এ বিদ্রোহ সুশৃঙ্খল যেমন ছিল না তেমনি ছিল না সুসংগঠিতও, কেন্দ্রীয় যোগ্য নেতৃত্বের অভাবে এ বিদ্রোহ সফল হতে পারেনি। এ ঘটনা সারা ভারতবর্ষের সিপাহিদের মধ্যে প্রবল সাড়া জাগিয়েছিল। সিপাহি মঙ্গল পা-ের আত্মদানে উজ্জীবিত ভারতীয় সিপাহিরা সংঘবদ্ধভাবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সেনানিবাসে ব্যারাকে আক্রমণকারীর ভূমিকায় সশস্ত্র বিদ্রোহ সংঘটিত করেছিল। মীরাট, দিল্লি, এলাহাবাদ, অযোধ্যা, লক্ষেèৗ, কানপুর, ঝাঁসী, বারানসী, পাঙ্গনা, কেবলী ইত্যাদি স্থানে সিপাহি বিদ্রোহ দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছিল। এমনকি এটা দেশজুড়ে চরম উত্তেজনা সৃষ্টি করেছিল। চট্টগ্রাম ও ঢাকার প্রতিরোধ এবং সিলেট, যশোর, রংপুর, পাবনা ও দিনাজপুরের খণ্ডযুদ্ধগুলো তার প্রমাণ বহন করে। আজ ৮ এপ্রিল ’১৮ মঙ্গল পান্ডের দেশ মাতৃকার জন্য জীবন উৎসর্গের ১৬১ বছরপূর্তি। এই দিনে আমরা এই প্রত্যয় গ্রহণ করি, ‘দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য স্বীয় ক্ষুদ্র জীবন উৎসর্গ করি’। তাহলে মঙ্গল পান্ডের ন্যায় হব আমরা চিরঞ্জীব। এই দিনে তাকে স্মরণ করি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে।
meemmizanru@gmail.com

সাপ?তাহিক পতিবেদন

এই সময়/রাজনীতি
 মতামত সমূহ
পিছনে 
 আপনার মতামত লিখুন
English বাংলা
নাম:
ই-মেইল:
মন্তব্য :

Please enter the text shown in the image.