রাজনীতির সর্পপূজা

Print Friendly and PDF

হিমাংশু দেব বর্মণ

রক্ষণশীল হিন্দু সমাজে একটি প্রথা খুব শক্তভাবে প্রচলিত আছে সেই আর্যযুগ থেকে। আর তা হলো, তাদের বিশ্বাস প্রত্যেক পরিবারের গৃহ-ঘরে এক জোড়া করে সাপ থাকে। এই সর্পযুগল কাউকে দংশন করে না। বরং এরা গৃহস্থের কল্যাণবাহক। এই কারণে এই সাপগুলোকে কেউ আঘাত করে না। ফুল, বেলপাতা, দুধ-কলা, বিভিন্ন অর্ঘ্য দ্বারা নৈবেদ্য সাজিয়ে সাপের পূজা করে। আর পূজাটা শুধু ঘরের সাপকে নয়, বন-বাদাড়, জল-জঙ্গল সর্বত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা গোটা সর্প জাতিকেই দেয়া হয়।
গৃহ-ঘরের এই জোড়া সাপকে বলা হয় বাস্তুসাপ। এই বাস্তুসাপগুলো আবার বহু পুণ্যের অধিকারী ব্যক্তি ছাড়া অন্য কেউ দেখতে পায় না। অল্প পুণ্যাধিকারী বা পাপে পূর্ণ মানুষের কাছে এরা একেবারেই অদৃশ্য সত্ত্বা। বিষয়টা সম্পূর্ণ কাল্পনিক বলে মনে হয়। কিন্তু এই বাস্তুসাপ যখন কালসাপ হয়ে যায়, তখন তার ছোবল থেকে বাঁচতে দক্ষ সাপুড়ে ডেকে সাপগুলোকে ঘর থেকে বের করে দিতে হয়। নইলে নিজেদেরই ঘর ছেড়ে পালাতে হয়। দৃশ্যটা কেমন হয় ভেবে দেখুন তো একবার সবাই মিলে। সুখেশান্তিতে আরাম-আয়েশে বসবাস করব বলে দুধ-কলা দিয়ে সাপ পুষে রাখলাম, তার জন্য হলাম ভিটেছাড়া। বাড়িটাই হয়ে গেল পোড়োভিটা।
ঠিক এরকম একটা ভয়াবহ কা- ঘটার আশঙ্কা বিরাজ করছে বাংলাদেশের রাজনীতিতে। এদেশের শাসক-বিরোধী উভয় দলই এই হিন্দুয়ানি ধাঁচে সাপ পোষা রীতিতে বিশ্বাসী আগাগোড়াই। কিন্তু দুঃখজনকভাবে স্বীকার করতে হচ্ছে যে হিন্দু সমাজ যেমন পূজা করেও সাপের ছোবল থেকে বাঁচতে পারে না, তেমন রাজনীতিতে পুষে রাখা সাপগুলোও এখন আর তারা দুধ-কলায় তুষ্ট থাকতে পারছে না। এখন তাদের বসবাসের জন্য পুরো ভিটেবাড়িটাই চাই। এ-কারণে তারা ছোবল অব্যাহত রেখে এগিয়ে যাচ্ছে গৃহকর্তার দিকে।
বিএনপির শাসনামলে আমরা দেখলাম, খোদ প্রধানমন্ত্রী মিডিয়ার সৃষ্টি বলে সিদ্দিকুল ওরফে বাংলা ভাইয়ের মতো কুখ্যাত সন্ত্রাসীকে লোকচক্ষুর আড়ালে রাখার অপচেষ্টা করলেন। সন্ত্রাসীর গুলিতে নিহত শিশুর পিতাকে ‘আল্লাহ্র মাল আল্লাহ্ নিয়ে গেছেন’ বলে সান্ত¡না দিলেন তৎকালীন স্বরাষ্ট্র-প্রতিমন্ত্রী। যে-বন্দর এলাকায় দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া একটি বিড়ালও ঢুকতে পারে না। সেখানে ঢুকে গেল দুর্বৃত্তদের দশ ট্রাক অস্ত্রের চালান। এসব উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটার পরে সরকার অবশ্য বুঝতে পারলেন যে, পরিণাম ভালোর দিকে যাচ্ছে না। গণমানুষের ক্ষোভ, প্রশাসনিক কর্মকর্তা খুন, জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ল এসব ঘটনা। শুরু হয়ে গেল বহির্বিশ্বের চাপ। সরকার হতচকিত হয়ে বাংলা ভাইকে গ্রেফতার করে কোনো তথ্য উদ্ঘাটন ছাড়াই তড়িঘড়ি করে ফাঁসি দিয়ে দিলেন। বাংলা ভাই নেই, কিন্তু তার তা-বলীলা এখনও বর্তমান।
আরও একটা ভয়াবহ ঘটনা ছিল ১৭ আগস্ট সিরিজ বোমা হামলা। দেশের তেষট্টিটি জেলায় একই সময়ে বোমা ফাটল। একটি জেলা বাদে (মুন্সীগঞ্জ)। কিন্তু সেখানেও বোমা পাতানো ছিল। এখন মূল কথা হলো জেলা শহরের যে-সকল গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে বোমা পাতানো হয়েছিল ওই পয়েন্টগুলোতে চব্বিশ ঘণ্টা পাহারা দেয়ার জন্য তৎকালীন সময়েই সারাদেশে আড়াই লক্ষ্য লোক নিয়োজিত ছিল (বর্তমানে তার সংখ্যা আরও বৃদ্ধি করা হয়েছে)। সেই আড়াই লক্ষ লোকের পাঁচ লক্ষ চোখের দুটো চোখেও পড়েনি বোমা পাতানোর সময়? তাহলে তারা তখন কোথায় ছিল? আরও রহস্যের ব্যাপার হলো, সরকারি আইন ওই প্রহরীদের কাছে জানতে চাইলেন না, কেন তাদের চোখে পড়েনি। তারা কোথায় বা ছিল! এটা সরকারের উদাসীনতা ও সন্ত্রাসী কর্মকা-ে তার সমর্থন জ্ঞাপন করে।
আওয়ামী লীগ শাসনামলে দেখা গেল একাধিক খুনি আসামিদের ফাঁসির রায় হওয়া সত্ত্বেও রাষ্ট্রপতি কর্তৃক সাধারণ ক্ষমা দেয়া হলো। আইন, আদালত ওই কঠিন শাস্তি দিলেন, আবার মুক্তির পথও তাদের দেখানো হলো। একের পর এক মুক্তমনা ব্লগার, লেখক, প্রকাশক খুন হতে থাকলেন। তার কোনো ক্লু খুঁজে পান না গোয়েন্দা বিভাগ। পুলিশের হাত থেকে ছিনতাই হয়ে যায় জঙ্গি আসামি। বছরখানেক আগে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হলেন জঙ্গি আসামি শরিফুল ওরফে শাকিব। তিনি নাকি লেখক ব্লগার অভিজিৎ হত্যার আসামি। এর আগে শোনা গেছে কে বা কারা অভিজিৎকে খুন করল, তার কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। খুশি হবো না বিস্মিত হবো, তা নিজেই বুঝতে পারি না। তারপরও মাদারীপুরের অধ্যাপক রিপন হত্যা চেষ্টার আসামি গোলাম ফাইজুল্লাহ ফাহিম রিমান্ডে থাকা অবস্থায় বন্দুকযুদ্ধে নিহত হলেন। সমস্ত ঘটনাই না বোঝার মতো।
সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন, হত্যা, বাড়িঘর দখল, মন্দির-মূর্তি ভাঙা, পোড়ানো, চলছে তো চলছেই। এসব তা-বলীলার অবসান তো হলোই না, বরং আরও বেড়েই চলেছে। হত্যার হুমকি অব্যাহত রয়েছে। প্রশাসন কী ভূমিকায় আছে তা মানুষের দৃষ্টিগোচর নয়। অন্য যে কোনো দলের ধারণা অকাট্য সত্যি যে, সংখ্যালঘুরা আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্য কোনো দল সমর্থন করে না। এবং তারা ঠিক সেভাবেই সংখ্যালঘুদের সঙ্গে বিমাতাসুলভ আচরণই করে। কিন্তু আজ আওয়ামী লীগ শাসনামলেও যদি তাদের বাড়িঘর তথা দেশ ত্যাগ করতে হয়, তাহলে এ লজ্জা কার?
হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সচিব অ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্ত ভারত প্রতিনিধিদের কাছে সহযোগিতা চেয়েছেন বলে যে গুজব শোনা যাচ্ছিল, এ মন্তব্যটা শুনতেও লজ্জা লাগে। কী পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে মানুষ দেশের বাইরের সহযোফগতা চাইতে পারে। তা তারা নিজেরাই অনুধাবন করছেন। কিন্তু একবার ভেবে দেখার মতো কেউ কি নেই? কেন এমন হতে পারে? খুঁজে দেখার কি কেউ নেই, এহেন অ-কাম, কু-কামগুলো কে বা কারা করছেন?
আসুন হৃদয়বান যারা আছেন, সবাই মিলে একটু ভেবে দেখি কোথায় থাকতে পারে এই সাপগুলো! এগুলো চোখে পড়ার মতো কোনো পুণ্যবান ব্যক্তি কি এই বাঙালিগৃহে নেই? সবাই কি পাপে পূর্ণ? তাহলে কী হবে বাঙালিভিটায় বসবাস করা সাধারণ জনগণের?
মূলত হিন্দু সমাজের এই বাস্তুসাপ বিষয়টি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ও অন্ধবিশ্বাস। যেহেতু সাপকে পূজা করেও হিন্দুরা সাপের হাতে মৃত্যুবরণ করে হরহামেশাই। কিন্তু রাষ্ট্রপরিচালনা কোনো কাল্পনিক শক্তি বা অন্ধ বিশ্বাসের ওপর চলতে পারে না। এটা হতে হয় বাস্তবনির্ভর। এখানে হিন্দু সমাজ তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসের ওপর যা করছে, তাতে বাধা দেয়ার কোনো ইচ্ছে আমার নেই। কিন্তু এ দেশের রাজনীতিটাকে এই মুহূর্তে অবশ্যই এই সর্প পূজার রীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এটাও আবার জটিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাপ নিয়ে খেলতে খেলতে সাপুড়ের দাঁতেও বিষ টোপর জন্মে গেছে। আগে সাপুড়ের দাঁতকে বিষমুক্ত করতে হবে। পুলিশ-প্রশাসনকে পূতপবিত্র হতে হবে। আর স্বঘোষিত পুণ্যবান ব্যক্তি বা গৃহকর্তা যারা আছেন, তারা এখনই দৃশ্যমান হয়ে উঠুন। তাহলে সব সমস্যার সমাধান হবে। নইলে যেটা হতে যাচ্ছে, তা হলো জঙ্গি ইস্যু। রীতিমতো সাম্রাজ্যবাদের পাতানো ফাঁদ। এভাবে চলতে থাকলে এ বিষয়টা চকচকে হয়ে উঠবে। যদিও ইতোমধ্যে বেশ কিছু জঙ্গিবিরোধী অভিযানে যথেষ্ট সফলতা দেখা গেছে। তবুও নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না যে তারা ভয়ে নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছে। বরং তারা তাদের মতো করে প্রস্তুতি অব্যাহত রেখেছে কিনা। না জানি ভবিষ্যতে তাদের সংঘটিত কী বীভৎস রূপই না দেখতে হয়! তখন তা দেশের জন্য মোটেই ভালো কিছু আশা করার অবশিষ্ট আর থাকবে না। অতএব এখনই সময়।
লেখক : কলামিস্ট

সাপ?তাহিক পতিবেদন

এই সময়/রাজনীতি
 মতামত সমূহ
পিছনে 
 আপনার মতামত লিখুন
English বাংলা
নাম:
ই-মেইল:
মন্তব্য :

Please enter the text shown in the image.