ইরান ইস্যু ট্রাম্প-ইউরোপ দ্বন্দ্ব -আনিস রায়হান

Print Friendly and PDF

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কারো কথায়ই কর্ণপাত করলেন না। ইরানকে ঠেকানোর কথা বলে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন খেলায় নেমে গেলেন তিনি। ইরানের সঙ্গে হওয়া ছয় জাতির পরমাণু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বের করে আনার ঘোষণা দেয়ার পাশাপাশি দেশটির ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করেছেন ট্রাম্প। চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্র বেরিয়ে যাওয়ার অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই সিরিয়ায় ইরানি স্থাপনাগুলোতে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। এভাবে শুরু হয়ে গেছে ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন কৌশল প্রয়োগ।
অথচ চুক্তিটি যাতে বাতিল না করা হয়, ট্রাম্পকে সে কথা বোঝাতে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ও জার্মানির চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেল পর্যন্ত ওয়াশিংটন ছুটে যান। তাদের কথায় কর্ণপাত করেননি ট্রাম্প। কিন্তু কেন এতদিনের মিত্রদের অবজ্ঞা করল যুক্তরাষ্ট্র? ট্রাম্প-ইউরোপ দ্বন্দ্বের মূলসূত্র কোথায়? কেন যুক্তরাষ্ট্রের এই বিধ্বংসী মনোভাব? ইরানকে ঘিরে তাদের পরিকল্পনা কী? সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে বাধা কোথায়? শেষ অবধি কী ঘটতে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যে? এসব প্রশ্নের জবাব পেতে হলে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যসহ গোটা বিশ্বের রাজনীতি ও অর্থনীতির গভীরে যেতে হবে।

১.
ইরান চুক্তি বাতিল করাটা ছিল ডোনাল্ড ট্রাম্পের অন্যতম এক নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি। নির্বাচনী প্রচারের সময় ট্রাম্প ইরান চুক্তিকে সর্বকালের সবচেয়ে নিকৃষ্ট চুক্তি হিসেবে তুলে ধরে সেটি বাতিল করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। সম্প্রতি দেশের অভ্যন্তরে তার বিরুদ্ধে নানা ধরনের অভিযোগ এমন সীমায় পৌঁছেছে যে, আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান দলের ধসের আশঙ্কা করছেন অনেকে। এই পরিস্থিতিতে ইরান ইস্যুকে সামনে এনে সুবিধাজনক অবস্থান সৃষ্টির চেষ্টা করছেন ট্রাম্প।
শুধু প্রতিশ্রুতি পালন নয়, ওবামা আমলে করা এই চুক্তির প্রতি ট্রাম্প প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ভয়াবহ ঘৃণাও কাজ করে। হোয়াইট হাউসের প্রাক্তন জাতীয় নিরাপত্তা সহকারী সেবাস্টিয়ানের এক মন্তব্য থেকে তার আভাস পাওয়া যায়। চুক্তিটি বাতিলের আগমুহূর্তে ফক্স নিউজ চ্যানেলকে তিনি বলেন, ইরান চুক্তির মাথায় গুলি করা উচিত। এটা আমেরিকার জন্য খারাপ, বিশ্বের জন্য খারাপ, আমাদের বন্ধুদের জন্য খারাপ। ট্রাম্প তার প্রশাসনের কেউ কেউ ইরান চুক্তি বাতিলের পক্ষে নন, এমন মনোভাব জানার পর ট্রাম্প সেখানে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছেন। জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পদ থেকে এইচ আর ম্যাকমাস্টার ও রেক্স টিলারসনকে সরিয়ে দিয়ে যথাক্রমে জন বোল্টন ও মাইক পম্পেওকে এই দুই পদে বসান ট্রাম্প। ম্যাকমাস্টার ও টিলারসন ইরান চুক্তি মেনে চলার পক্ষে ছিলেন। বোল্টন ও পম্পেও এই চুক্তির ঘোর বিরোধী হিসেবে পরিচিত।
জয়েন্ট কম্প্রিহেনসিভ প্ল্যান অফ অ্যাকশন (জেসিপিওএ) নামের এই সমঝোতা ‘ইরান ডিল’ নামেও পরিচিত। ২০১৫ সালে ছয়টি দেশ ইরানের সঙ্গে চুক্তিটি করে। দেশগুলো হলো যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, রাশিয়া ও চীন। সমঝোতা অনুযায়ী প্রতি ছয় মাস পরপর চুক্তিটি নবায়ন হয়। এই মে মাসে আবারও সেটি নবায়নের কথা ছিল। কিন্তু ট্রাম্প চুক্তি নবায়নে সম্মতি দেবেন না, এমন কথা কয়েক সপ্তাহ আগ থেকেই শোনা যাচ্ছিল।
যুক্তরাষ্ট্রকে এই চুক্তিতে ধরে রাখতে চেষ্টা চালিয়েছে ফ্রান্স, জার্মানি ও যুক্তরাজ্য। জাতিসংঘ ও চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী অন্যান্য দেশ এই চুক্তি বাতিলের বিরোধিতা করে বারবার বলেছে, ইরান চুক্তির শর্ত অক্ষরে অক্ষরে পালন করে চলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা দপ্তরগুলোও এই মূল্যায়নের সঙ্গে একমত। মাইক পম্পেও, যিনি বর্তমানে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন, সিআইএর প্রধান হিসেবে মার্কিন কংগ্রেসের সামনে এক শুনানিতে স্বীকার করেন, ইরান চুক্তির কোনো শর্ত লঙ্ঘন করেনি। চুক্তিটি যাতে বাতিল না করা হয়, ট্রাম্পকে সে কথা বোঝাতে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ও জার্মানির চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেল পর্যন্ত ওয়াশিংটন ছুটে যান। কিন্তু তাদের কথায় কর্ণপাত করেননি ট্রাম্প। এরপর যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বরিস জনসন যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে ট্রাম্পের দেখা না পেলেও ভাইস প্রেসিডেন্টের সঙ্গে দেখা করে ট্রাম্প প্রশাসনকে এ চুক্তিতে থেকে যাওয়ার পক্ষে আহ্বান জানান। কিন্তু ট্রাম্প তার কথাও শুনলেন না। তিনি শুনলেন ইসরায়েল ও সৌদি আরবের কথা।
ইউরোপের দেশগুলোতে যখন ট্রাম্পের নেতৃত্ব নিয়ে নানামুখী সমালোচনা হয়েছে, সেসব দেশে যখন ট্রাম্পের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ হয়েছে, তখন এই দুটি দেশ তার প্রতি সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে বিনিয়োগ ও সহায়তার ক্ষেত্রে দেশ দুটি কোথাও কোনো কার্পণ্য করেনি। ফলে ডোনাল্ড ট্রাম্প, যিনি আমেরিকা ফাস্ট বলতে পছন্দ করেন এবং কূটনীতিতে যার তেমন কোনো আস্থা নেই, তার কাছে ইউরোপের দেশগুলোকে খুব বেশি প্রয়োজনীয় বলে মনে হয়নি।

২.
পশ্চিমা নীতি-নির্ধারকরা মনে করছেন, ট্রাম্প বরাবরই ইউরোপকে তার দেশের অর্থ ব্যয়ের কারণ মনে করেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব-প্রতিপত্তির পেছনে এসব দেশের সহায়ক ভূমিকাকে তিনি গুরুত্ব দেন না। তিনি মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র না থাকলে এসব দেশের নিরাপত্তা ভেঙে পড়ত। অথচ এই ব্যয়টা শুধু তার দেশকেই বইতে হয়। ট্রাম্পের এমন মত যে অমূলক নয়, পরিসংখ্যান সেই চিত্রই তুলে ধরে। গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ব্যয় ছিল ৬১ হাজার কোটি মার্কিন ডলার। ফ্রান্স এ খাতে ব্যয় করেছে মাত্র ৫ হাজার ৭৮০ কোটি মার্কিন ডলার। যুক্তরাজ্য করেছে আরও কম, মাত্র ৪ হাজার ৭৭২ কোটি মার্কিন ডলার। সেই তুলনায় সৌদির ব্যয় অনেক বেশি। গত বছর দেশটি অস্ত্র কিনতে ব্যয় করেছে ৬ হাজার ৯৪০ কোটি মার্কিন ডলার। ইউরোপের দেশগুলোর সামরিক ব্যয় নিজেদের অস্ত্র নির্মাণে, আর সৌদির ব্যয়টা হয় যুক্তরাষ্ট্র থেকে অস্ত্র ক্রয়ে। এই হিসাবটাকেই আমলে নিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।
তাছাড়া গত ১৮ এপ্রিল ২০১৮ ইরান ঘোষণা দেয়, এখন থেকে তারা বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ ডলারের পরিবর্তে ইউরোতে গড়ে তুলবে। ২০১৫ সাল থেকে নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার পর তেল বিক্রির ক্ষেত্রেও ডলারের পরিবর্তে বিকল্প মুদ্রাকে সমর্থন করছে ইরান। বিশ্বের পঞ্চম প্রধান তেল উত্তোলনকারী দেশ হিসেবে ইরান যখন বিশ্বের এক নম্বর তেল আমদানিকারক দেশ চীনের সঙ্গে ডলারের বিপরীতে চীনা মুদ্রা ইউয়ান বা অন্য দেশগুলোর সঙ্গে ইউরো লেনদেন করে, সেটা যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির ওপর বিরাট চাপ সৃষ্টি করে। এমনকি এক নম্বর তেল উত্তোলনকারী দেশ রাশিয়া ও শীর্ষ দশে থাকা ভেনেজুয়েলাও একই পথ অনুসরণ করছে। বিপরীতে কেবল সৌদি আরবই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এমন চুক্তিতে আবদ্ধ যে, তারা তেলের তাবৎ লেনদেন ডলারে করতে বাধ্য। ফলে ডলার এখন ইউয়ান ও ইউরোর চ্যালেঞ্জের মুখে।
ডলারের এই বিপদের দিনে ইউরোপ কোনো সহযোগিতার হাত বাড়ায়নি। বরং যুক্তরাষ্ট্র যে ডলারের বিপরীতে স্বর্ণ জমা রাখে না, যা ব্যাংকিং-এর প্রধান শর্ত, ১৯৭১ সালে প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের করা এক আইনের বলে দেশটি যে যখন তখন যত খুশি ডলার ছাপাতে পারে, এটা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য ভারসাম্যপূর্ণ নয় বলে মনে করে ইউরোপের অনেক দেশ। ফলে তারা ইউরোপের মধ্যে ইউরোর যে বাজার গড়ে তুলেছে, সেটাই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে লেনদেনের মুদ্রায় পরিণত করতে চাইছে। এরকম পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি স্বাভাবিকভাবেই ইউরোপকে বাদ দিয়ে সৌদি ও ইসরায়েলের সঙ্গে পথ চলার নীতি গ্রহণ করেছে।
ট্রাম্পের ইরান চুক্তি বাতিলে ইউরোপের সব চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পেছনে অর্থনীতির এসব হিসাবই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

৩.
অর্থনীতির সঙ্গে রাজনীতিও যুক্ত। যুক্তরাষ্ট্র রাজনৈতিক দিক থেকেও গোটা বিশ্ব থেকে বিরাট চাপ অনুভব করছে। বিশেষত মধ্যপ্রাচ্যের সিরিয়ায় তারা যেন এক কথায় পরাস্ত হয়েছে। রাশিয়াকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দিয়ে কিছুটা দাবিয়ে রাখা গেলেও পরমাণু চুক্তির কারণে ইরানের ওপর বাড়তি নিষেধাজ্ঞা আরোপের পথ বন্ধ ছিল। এই সুযোগে ইরান ক্রমশ মধ্যপ্রাচ্যে তার শক্তি বিস্তৃত করছে, গড়ে তুলছে অস্ত্রভাণ্ডার। আর তাতে করে সৌদি ও ইসরায়েলও সেখানে চাপের মধ্যে পড়ে গেছে। ফলে নিজের ভাবমূর্তি উদ্ধার এবং মিত্রদের স্বার্থ রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রকে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন কিছু করতেই হতো। রাশিয়ার মতো দানবকে টার্গেট করা সেখানে কোনো কাজের কথা নয়, বরং ইরানই সহজ টার্গেট। ডোনাল্ড ট্রাম্প এই সম্ভাবনা কাজে লাগানোর সুযোগ হাতছাড়া করবেন কেন!
ট্রাম্প প্রশাসন তাই অভিযোগ আনতে শুরু করল। প্রথম অভিযোগ, পরমাণু চুক্তি সত্ত্বেও ইরান আন্তর্জাতিক তদন্ত দলকে ফাঁকি দিয়ে গোপনে পরমাণু অস্ত্র উন্নয়ন কর্মসূচি চালু রেখেছে। যদিও এই অভিযোগের সপক্ষে কোনো অকাট্য প্রমাণ পেশ করা হয়নি। দ্বিতীয়ত. চুক্তির মেয়াদ শেষ হলে ইরান আবার আগের পথে ফিরে যেতে পারে, এটা ঠেকানোর কোনো শর্ত না থাকার বিষয়ে ওয়াশিংটনের আপত্তি রয়েছে। তৃতীয়ত. কোনো রাখঢাক না করে ইরান দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে। চতুর্থত. ইরাক, সিরিয়া, লেবানন, ইয়েমেনের মতো দেশে নানাভাবে প্রভাব বিস্তার করে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বিপন্ন করছে ইরান।
ট্রাম্প পরমাণু সমঝোতায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের তৎপরতার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু ইরান সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করল। ইউরোপীয় সহযোগীরা শেষোক্ত দুই যুক্তি মেনে নিলেও পরমাণু চুক্তির সাফল্য থেকে সরে আসতে অস্বীকৃতি জানাল। তারা বরং বাড়তি পদক্ষেপের মাধ্যমে ইরানের প্রভাব-প্রতিপত্তি খর্ব করার প্রচেষ্টা চালিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের দুশ্চিন্তা দূর করার আশ্বাস দিল। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প শেষ পর্যন্ত পরমাণু সমঝোতা থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেয়াটাই সমীচীন মনে করলেন। কারণ মধ্যপ্রাচ্যে তার দেশ ও মিত্রদের রাজনৈতিক প্রভাব অক্ষুণœ রাখতে এর বিকল্প ছিল না।
যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা চায়, ইরানের যেন সামান্যতম প্রতিরোধ শক্তিও না থাকে। তারা চায় জার্মানি, জাপান ও ইতালির সঙ্গে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তরকালে হওয়া চুক্তির মতো কিছু একটা। সেই চুক্তির অর্থ হলো, ইরান সামরিকভাবে তার দেশের শক্তিবৃদ্ধি করতে পারবে না। তার সামরিক বাহিনী হবে খুবই ক্ষুদ্রাকৃতির এবং সকল দেশের বাণিজ্যিক প্রবেশাধিকার থাকতে হবে। এমনকি সেসব দেশের মধ্যে পরাশক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি করারও সুযোগ দিতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্রে ইরানবিরোধী প্রায় অধিকাংশই। এর বিপরীতে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলকে আরও সুযোগ করে দেয়ার পক্ষে ট্রাম্প। এ প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী মহলে কোনো বিরোধ নেই। ধারাবাহিকভাবে মার্কিন সরকারগুলো একই কাজ করে আসছে। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন স্বার্থের পাহারাদার হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে ভূমিকা রাখছে ইসরায়েল। তাছাড়া ইহুদি ধনীদের একটি অংশের হাতে পৃথিবীর মোট বাজার অর্থনীতির প্রায় ২০ শতাংশ রয়েছে। তাদের সমর্থনেই ইসরায়েল রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন হয়েছে। তাদের প্রভাবেই ইসরায়েলের হাতে থাকা সম্ভাব্য পরমাণু বোমা নিয়ে ইউরোপ-আমেরিকা কোনো উচ্চবাচ্য করে না। এই ধনী মহল ও গোটা ইসরায়েল এখন মার্কিন অর্থনীতিরই অংশ। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির এই পরম বন্ধুদের ট্রাম্প পুরস্কার দিতে চান। সে জন্য জেরুজালেমের ওপর ইসরায়েলের দাবিকে তিনি স্বীকৃতি দিতে চলেছেন। মধ্যপ্রাচ্যের ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জনগণের কাছে উদ্বেগের ব্যাপার হলেও ইসরায়েল প্রশ্নে ট্রাম্পের এই মনোভঙ্গি মার্কিন ক্ষমতা কাঠামোর কোনো স্তরেই বিরোধিতার সম্মুখীন হচ্ছে না।
ট্রাম্পের প্রতিদ্বন্দ্বী ডেমোক্র্যাট শিবিরও ইরান সম্পর্কে এ অবধি কড়া প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে আসছে। ২০০৮ সালে বার্তা সংস্থা এবিসিকে দেয়া সাক্ষাৎকারে হিলারির কথাগুলো ভুলতে পারেন না ইরানিরা। ওই সাক্ষাৎকারে হিলারি বলেছিলেন, ‘আমি ইরানিদের এটা বলতে চাই, আমি প্রেসিডেন্ট হলে ইরানে আক্রমণ চালাবো। আমরা তাদের ধ্বংস করে দেয়ার সক্ষমতা রাখি।’ হিলারির এই ধ্বনিই প্রতিধ্বনিত হয়েছে বিদায়ী ওবামা প্রশাসনের সর্বশেষ পদক্ষেপে। যা পাস হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার এক সপ্তাহ পরই মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদ কর্তৃক। ইরান নিষেধাজ্ঞা আইন (আইএসএ) তখন আরও ১০ বছরের জন্য পুনঃঅনুমোদন পেয়েছে। বিলটি সিনেটে পাস হয়েছে এবং এটি আইনে পরিণত হতে কেউ বাধা দেয়নি। উল্লেখ্য, ডেমোক্র্যাট শিবির ইরানের সঙ্গে পরমাণু সমঝোতা চুক্তিতে নেতৃত্ব দিলেও ডেমোক্র্যাট নেতৃত্বের উল্লেখযোগ্য একটা অংশ এর বিরোধিতা করেছে। রিপাবলিকানরাও এর বিরোধী ছিল। ফলে ট্রাম্পের ইরানবিরোধী যে কোনো পদক্ষেপই নির্বিঘœ।

৪.
অবশ্য ইসরায়েল বা সৌদির প্রয়োজন ছাড়াও ইরান অনেক আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান টার্গেটগুলোর একটি। কারণ বিশ্বজুড়ে প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট নানা দুর্যোগ মোকাবিলা করেও ইরান আজ অবধি ধরে রাখতে পেরেছে তার আড়াই হাজার বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি। ইরানের হাতে রয়েছে পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম গ্যাস রিজার্ভ ও চতুর্থ বৃহত্তম প্রাকৃতিক তেলভাণ্ডার। মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্য এশিয়ার ঠিক কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করে ইরান। বিশ্ববাণিজ্যের বিরাট একটি অংশ ইরান প্রভাবিত অঞ্চল দিয়ে হয়ে থাকে। বাণিজ্যিক পথ ও গ্যাস পাইপলাইনের জন্য দক্ষিণ এশিয়াতেও ইরান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পুরনো পারস্য সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী ইরান জ্বালানি সম্পদ ও কৌশলগত অবস্থানের কারণে বর্তমান বিশ্বেও অন্যতম এক শক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচিত। ১৯৭৯ সালে এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত রেজা শাহ পাহলভীকে হটিয়ে ইরানের ক্ষমতায় আসে ইসলামপন্থি বিপ্লবীরা। এরপর থেকে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা আজ অবধি বজায় আছে। নানা আগ্রাসনের মুখে টিকে থেকে এবং নিজেদের বিকাশ নিশ্চিত করে ইরান ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের নিপীড়িত বিভিন্ন জাতি ও সাম্রাজ্যবাদ আক্রান্ত দেশের আস্থা কুড়িয়েছে।
ইরানের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে হরমুজ প্রণালির বড় একটি অংশ। এটা হলো ওমান ও ইরানের মাঝখানে অবস্থিত এক ফালি সরু জলপথ। এর সবচেয়ে সরু অংশের দৈর্ঘ্য ২১ মাইল এবং প্রস্থ দুই মাইল। সমুদ্রপথে বিশ্বের তেল বাণিজ্যের ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ হয় হরমুজ প্রণালি দিয়ে। বিশ্বজুড়ে তেল উৎপাদন স্বাভাবিক থাকলে এই প্রণালি দিয়ে দিনে প্রায় দেড় কোটি ব্যারেল তেল পরিবাহিত হয়। এছাড়া প্রতিদিন প্রায় ২০ লাখ ব্যারেলের মতো তেলজাতদ্রব্য রপ্তানি হয় এ পথ দিয়ে। এর সঙ্গে আছে তরলীকৃত গ্যাসও। এশিয়ার বড় অর্থনৈতিক শক্তিগুলো হরমুজ প্রণালির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। চীন, জাপান, কোরিয়া ও ভারতের মতো দেশগুলোর আমদানিকৃত তেলের বড় অংশটা আসে হরমুজ প্রণালি হয়ে।
১৯৮৮ সালে হরমুজের নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দেড় মাসব্যাপী এক যুদ্ধ হয়। তখন হরমুজে অবস্থিত মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ভিনসেন্স থেকে গুলি করে ইরানের একটি যাত্রীবাহী বিমান ভূপাতিত করা হয়। এতে বিমানের ২৯০ জন যাত্রীর সবাই নিহত হয়। এর প্রেক্ষিতে বিশ্বজুড়ে নিন্দার ঝড় উঠলে যুক্তরাষ্ট্র সে যাত্রায় হরমুজ থেকে পশ্চাদপসরণ করে। ২০০৮ সালেও হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান কথার যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। সে সময় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ জাহাজগুলো মুখোমুখি অবস্থান নেয়। ২০১০ সালের নভেম্বর মাসে হরমুজ প্রণালিতে প্রথমবারের মতো জঙ্গিদের হামলার শিকার হয় জাপানের একটি তেলবাহী জাহাজ। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, হরমুজের এক-চতুর্থাংশও যদি ইরান বন্ধ করে দেয় তাহলে পৃথিবীব্যাপী তেলের দাম এক লাফে ব্যারেলপ্রতি ৫০ থেকে ১০০ ডলার পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। ধারণা করা হয়ে থাকে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়া মানেই বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়া। কেননা এক ধাক্কায় তেলের দাম যদি আকাশছোঁয়া হয়ে যায় তাহলে তা গোটা বিশ্ব অর্থনীতিকে ধসিয়ে দেবে।
হরমুজের গুরুত্ব নস্যাৎ করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র তার মধ্যপ্রাচ্যের মিত্রদের সঙ্গে নিয়ে এ পর্যন্ত নানাবিধ উদ্যোগ নিয়েছে। ইরাক ১৯৮০ সালে ইরাক-সৌদি আরব পাইপলাইন নির্মাণ করে। এছাড়া কাসপিয়ান সাগরের তলদেশ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র নির্মাণ করছে তুর্কমেনিস্তানের পাইপলাইন, যা ইরানকে এড়িয়ে সংযুক্ত হবে তুরস্ক পর্যন্ত। কিন্তু এই প্রক্রিয়া ততটা স্বস্তিদায়ক নয়। কারণ হরমুজের বিকল্প পাইপলাইন বেছে নেয়ার অর্থ হচ্ছে বিশ্বব্যাপী প্রতি ব্যারেল তেলে ১০০ ডলার পর্যন্ত বেশি গোনা। তাই নানা প্রয়োজনেই ইরানে নিয়ন্ত্রণ আরোপের দিকে যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টি নিবদ্ধ।

৫.
কিন্তু পরমাণু চুক্তি বাতিল করে ইরানকে কতটুকু ঠেকানো যাবে? যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার মধ্যে থেকেই তো ইরান দীর্ঘকাল ধরে নিজেকে টিকিয়ে রেখেছে। এই চুক্তি বাতিলের পর ট্রাম্প প্রশাসন কী করবে? তারা কি সরাসরি ইরানে কোনো যুদ্ধে জড়াবে? বিশ্বজুড়ে সামরিক বিশ্লেষকরা সে রকম কোনো লক্ষণ দেখছেন না। তারা বলছেন, দেশের অভ্যন্তরে যুদ্ধবিরোধী অবস্থান থাকায় এবং রাশিয়ার প্রত্যক্ষ উপস্থিতির কারণে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন ধরনের যুদ্ধের সূচনা ঘটাতে চাইছে ট্রাম্প সরকার। যুক্তরাষ্ট্র এতদিন যেসব কৌশলে দেশে দেশে যুদ্ধ চালিয়ে এসেছে, এই যুদ্ধ হবে তার থেকে বেশ খানিকটা আলাদা। সরাসরি যুদ্ধ না করে ইরানের ক্ষমতাকাঠামো পাল্টে ফেলার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে দেশটি। এজন্য দেশটিতে গৃহযুদ্ধের আগুন জ্বালানোতেই বেশি আগ্রহ যুক্তরাষ্ট্রের। মধ্যপ্রাচ্যের অধিকাংশ স্বৈরতান্ত্রিক দেশেই যুক্তরাষ্ট্রের এই অস্ত্রটি কাজ করেছে। ইরানের পরিস্থিতি একটু ভিন্ন, সেখানে নিয়মিত নির্বাচন হয়। ফলে সেখানে নানামুখী কৌশল নেয়া হচ্ছে।
তিন কৌশল সামনে রেখে কাজ করছে মার্কিন প্রশাসন। প্রথমত, নিচু মাত্রার যুদ্ধ। সিরিয়া থেকে মার্কিন সেনাদের ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি থাকলেও ট্রাম্প শেষ পর্যন্ত সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দেন। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা বলছেন, সিরিয়ায় ইরানের প্রভাব বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে সৈন্য মোতায়েন রাখার পক্ষে মত দেন ট্রাম্প। এই সৈন্যরা এখন কুর্দি বাহিনীকে সহায়তা করছে। তারা সিরীয় সরকার ও সিরিয়ায় ইরানের সমর্থিত বাহিনীর বিরুদ্ধে নিচু মাত্রার যুদ্ধ চালিয়ে যাবে। তাদের সমর্থিত বাহিনীগুলো বড় বিপদে পড়লে সরাসরি হস্তক্ষেপ করবে। তা না হলে তাদের প্রশিক্ষণ, পরামর্শ ও সমর্থন দিয়ে ইরানকে ব্যস্ত রাখবে।
দ্বিতীয় কৌশল হলো, প্রতিবেশীদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক দ্বন্দ্ব জিইয়ে রাখা। ইসরায়েল, সৌদি আরব, আরব আমিরাত তো রয়েছেই। তাদের সঙ্গে ইরানকে অঘোষিত এক যুদ্ধে নামানোর পরিকল্পনা রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। এই পরিকল্পনার প্রয়োগ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। ৮ মে ট্রাম্পের চুক্তি বাতিলের ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সিরিয়ায় রকেট হামলা চালায় ইসরায়েল। সিরিয়ার কিসবেহ সামরিক ঘাঁটিতে চালানো ওই হামলায় আট ইরানি সামরিক সদস্যসহ ১৫ জন নিহত হয় বলে জানিয়েছে সিরিয়ান অবজারভেটরি ফর হিউম্যান রাইটস। এ হামলার দায় স্বীকার বা অস্বীকার কোনটিই করেনি ইসরায়েল।
এর জবাবে ইসরায়েল অধিকৃত গোলান মালভূমিতে হামলা চালায় সিরিয়ায় থাকা ইরানি বাহিনী। ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী মুখপাত্র জানিয়েছেন, ইরানের কুদস বাহিনী গোলান মালভূমিতে ইসরায়েলি অবস্থানগুলো লক্ষ্য করে প্রায় ২০টি রকেট ছুড়েছে। কুদস বাহিনী ইরানের বিপ্লবী রক্ষীদলের একটি বিদেশি শাখা। ইসরায়েলি মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট কর্নেল জোনাথন কোনরিকাস জানিয়েছেন, ইরানি বাহিনীর ছোড়া রকেটগুলোর মধ্যে কয়েকটিকে ধ্বংস করেছে ইসরায়েল, বাকিগুলো আঘাত করলেও ইসরায়েলি অবস্থানের সীমিত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এবং হতাহতের কোনো খবর পাওয়া যায়নি।
বিপরীতে সিরিয়ায় ২০১১ সালে গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে সবচেয়ে ব্যাপক হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। সিরিয়ার রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা জানিয়েছে, বহু ইসরায়েলি রকেট রাডার স্টেশন, সিরিয়ার এয়ার ডিফেন্সের অবস্থানে এবং অস্ত্র গুদামে আঘাত হেনেছে। সীমান্তবর্তী বাথ শহরেও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়েছে। এরপর পর আরও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে বলে জানিয়েছে রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা এসএএনএ। রাজধানী দামেস্ক, হোমস ও সুইদায় ইসরায়েলি ক্ষেপণাস্ত্র গুলি করে ধ্বংস করা হয়েছে বলেও জানিয়েছে বার্তা সংস্থাটি।
যুক্তরাষ্ট্রের এই পরিকল্পনায় শুধু ইসরায়েল নয়, আছে সৌদি ও আরব আমিরাতের মতো দেশগুলোও। ইরানের সঙ্গে এদের বিরোধকে নতুন মাত্রায় নিয়ে যাওয়া এবং মাঝেমধ্যেই তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব জারি রাখা হবে। এমনকি এদের দিয়ে ইরানের পরমাণু স্থাপনায়ও হামলা হতে পারে। তাছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন গোষ্ঠী ও পক্ষকে সহায়তা দিয়ে থাকে যুক্তরাষ্ট্র। এদের ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হবে। রয়েছে কুর্দিরাও। ইরান কুর্দি রাষ্ট্রের বিপক্ষে। ফলে কুর্দি ফ্রন্টে দীর্ঘ যুদ্ধ চালিয়ে নেয়াটা অসম্ভব কিছু নয়। এছাড়া ইরানের অভ্যন্তরে যে অল্পসংখ্যক সুন্নি মুসলিমরা রয়েছেন, তাদের ব্যবহার করা।
তৃতীয় কৌশল হলো, অর্থনৈতিক অবরোধ ও অভ্যন্তরীণ আত্মঘাতী তৎপরতায় ইরানকে ব্যস্ত রাখা। অর্থনৈতিক অবরোধ আগে থেকেই ছিল। নতুন করে আবার দেয়া হয়েছে। এর ফলে ইরানের প্রেসিডেন্ট রূহানীসহ উদারপন্থিরা বেশ বেকায়দায় পড়ে গেছেন। পশ্চিমের সঙ্গে কোন সম্পর্ক নয়, ইসরায়েলের সঙ্গে মরণঘাতী যুদ্ধের সমর্থকদের শক্তিবৃদ্ধি ঘটছে। এভাবে আরও অবরোধ আরোপ করা গেলে ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করা সহজ হবে। বেকারত্ব বৃদ্ধি ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে স্বাভাবিকভাবেই জনসাধারণের অসন্তোষ বাড়বে। এভাবে ইরানকে অস্থিতিশীল করতে চাইছে যুক্তরাষ্ট্র।
তাছাড়া অর্থনৈতিক চাপ ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের ফলে ইরানের বহিঃব্যাপ্তিও কমে আসবে। লেবানন, ইয়েমেন, কাতার, ইরাক, সিরিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্যের যেসব অঞ্চলে ইরান প্রভাব বিস্তার করেছে, সেসব এলাকায় তাদের শক্তি ও সহায়তা কমে যাবে। যুক্তরাষ্ট্র চাইছে, এসব পদ্ধতি ও হাতিয়ার প্রয়োগের মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে তার পুনরুত্থান নিশ্চিত করতে।

৬.
কিন্তু পৃথিবীর যুদ্ধগুলোর ইতিহাস বলে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বড় শক্তিগুলো পরাজিত হয়। যুক্তরাষ্ট্র যদিও নানামুখী কৌশল নিয়ে এগোচ্ছে, কিন্তু তাকে প্রতিরোধও মোকাবিলা করতে হবে তীব্র। পরমাণু চুক্তি বাতিলের প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্র তার ইউরোপীয় মিত্রদের পাশে পায়নি। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের এতদিনের মিত্র ইউরোপের দেশগুলো যদি নিষ্ক্রিয় থাকে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে সেখানে ইচ্ছামতো খেলাধুলা করা কতটা সম্ভব হবে তা প্রশ্নসাপেক্ষ। যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে একের পর এক একলা চলার পদক্ষেপ নিচ্ছে, তাতে করে ইউরোপ ও তাদের মধ্যে বিরোধের সম্ভাবনা একেবারে বাতিল করে দেয়া যায় না। যদিও অদূর ভবিষ্যতে তার সম্ভাবনা ক্ষীণ, কিন্তু ধীরে ধীরে সেই দিগন্ত উন্মোচিত হচ্ছে।
রাশিয়া, চীন, পাকিস্তান, ইরানের ঐক্য যদি আরও ঘনীভূত হয়, যুক্তরাষ্ট্রের যে কোনো পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সেক্ষেত্রে হুমকির মুখে পড়বে। রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে ইরানের বহুমুখী বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছে। উভয় দেশই মার্কিন প্রভাবকে অগ্রাহ্য করে, ইরানে তারা তাদের স্বার্থ পাহারা দিতে আগ্রহী হওয়ার কথা। তাছাড়া রুশ অস্ত্রবহরের বিরাট অংশ যে কাস্পিয়ান সাগরে মোতায়েন, তার এক প্রান্তে রাশিয়া আর অন্যপ্রান্তে ইরান। ফলে ইরান সবসময়ই রুশ সামরিক বহরের আওতায় থাকবে। ইরানে সরাসরি হামলাও কঠিন হয়ে পড়বে। কারণ রাশিয়া ও ইরানের মধ্যে ঘাঁটি নির্ণয়ের চুক্তি আছে। যার আওতায় ইরানি ঘাঁটি ব্যবহার করতে পারে রাশিয়ার যুদ্ধবিমান। রাশিয়া ও ইরানের অর্থনৈতিক সহযোগিতা বেশ প্রাচীন।
চীন-ইরান বাণিজ্যিক সম্পর্কও কম কিছু নয়। বর্তমানে ইরানের বিদ্যুৎ ও অবকাঠামো খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ রয়েছে চীনের। ইরানের গ্যাসক্ষেত্র ও সাউথ পার্স ওয়েল কোম্পানিতে চায়না ন্যাশনাল পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের ৩০ শতাংশের বেশি শেয়ার রয়েছে। দেশটির সরকার-নিয়ন্ত্রিত সিআইটিআইসি গ্রুপ দেশটিকে এক হাজার কোটি মার্কিন ডলারের বেশি ঋণ দিয়েছে। এ ছাড়া চায়না ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক আরও দেড় হাজার কোটি মার্কিন ডলার দেয়ার কথা বিবেচনা করছে।
বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে ইরানকে তাদের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ প্রকল্পের বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে চীনের ব্যবসা ও প্রভাব বিস্তারের জন্য ইরান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। চীনের উদ্যোগে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ বা বিআরআইকে বলা হচ্ছে এশীয় বিশ্বায়নের কর্মসূচি। সবচেয়ে বেশি দেশ, বিপুল বিনিয়োগ এবং বিশ্বের সর্বাধিক জনসংখ্যাকে জড়িত করার এ পরিকল্পনা নিয়ে এটিই একুশ শতাব্দীর বৃহত্তম উন্নয়ন প্রকল্প। এই প্রকল্পে চীন সবসময়ই ইরানকে অংশীদার দেখতে চায়।
তাছাড়া ইরানের সঙ্গে ব্যবসা সম্পর্কে যুক্ত এমনকি ন্যাটো মিত্র তুরস্কও। সম্প্রতি ইরান ও রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য সহযোগিতার নতুন চুক্তি স্বাক্ষর করেছে দেশটি। ইরানের সঙ্গে ইউরোপীয়দেরও শক্তিশালী বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে। এই বাজার হারাতে চাইবে না ইউরোপ। ২০১৭ সালে ইউরোপ ইরানের সঙ্গে ২০ বিলিয়ন ইউরোর বাণিজ্য করেছে। প্রবৃদ্ধির হার ছিল ২৭ শতাংশ। তবে ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা অগ্রাহ্য করে ইউরোপীয় দেশগুলো ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক অব্যাহত রাখার চেষ্টা করলে ঝামেলায় পড়বে। ইউরোপীয় কোম্পানিগুলো যদিও মার্কিন রাজস্ব বিভাগের নিয়ন্ত্রণাধীন নয়, কিন্তু মার্কিন নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করলে তাদের পক্ষে সেই দেশের ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে ডলারভিত্তিক আর্থিক লেনদেন টিকিয়ে রাখা অসম্ভব হবে। ফরাসি তেল কোম্পানি টোটাল ইরানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি যে বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল, সেটিও বাতিলের সম্ভাবনা রয়েছে।
ইউরোপের বর্তমান অঘোষিত নেতা জার্মানি অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের হম্বিতম্বির বিকল্প অন্বেষণ করছে। দ্রুতই তারা ইরানের সঙ্গে বৈঠকে বসবে, পথ খুঁজে বের করতে। জার্মান অর্থমন্ত্রী ওলাফ ক্লোলজ বলেছেন, ইরানের পরমাণু সমঝোতা থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বের হয়ে যাওয়ার ফলে সৃষ্ট নেতিবাচক প্রভাব থেকে ইউরোপের কোম্পানিগুলোকে রক্ষার জন্য তার দেশ সম্ভাব্য সব কিছু করবে। তার দেশের ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ ইতোমধ্যে ট্রাম্পের ঘোষণায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। জার্মান কোম্পানিগুলোর ক্ষতি প্রতিরোধ করার দায়িত্ব যে সরকারের, সেটা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন ব্যবসায়ী নেতা ফল্কর।
ভারত যদিও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার, তা সত্ত্বেও ইরানে তাদের বিরাট স্বার্থ রয়েছে। ইরানের জ্বালানির অন্যতম ক্রেতা তারা। তাছাড়া পাকিস্তানের গোয়াদর বন্দর, যেখানে চীন অঘোষিত ঘাঁটি গড়ছে, তার মাত্র ৮ মাইলের মধ্যে অবস্থিত ইরানের চাবাহার বন্দর। ভারত তার কৌশলগত পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ওই বন্দর উন্নয়নের কাজে অংশীদার হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই দিল্লি চাইবে না পাকিস্তানের ওপর নজর রাখার এই সুযোগ হারাতে। ইরানের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নেই আগ্রহী ভারত। অপরদিকে পাকিস্তান যদিও সৌদির নেতৃত্বাধীন ইসলামিক বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত, কিন্তু ইরান ও তার মিত্রদের সঙ্গে তাদের শক্ত সম্পর্ক রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে দূরে সরে সম্প্রতি রাশিয়ার দিকেও ভিড়ছে দেশটি। ফলে ইরানবিরোধী কর্মকাণ্ডে পাকিস্তানকে পক্ষে পাওয়ার সম্ভাবনা সীমিত।
যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা যত পরিপক্বই হোক, এতগুলো বৃহৎ শক্তিকে অতিক্রম করে ইরানে তাদের সাফল্য পাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ।

যুক্তরাষ্ট্রের শাসকরা আগের পথেই আছে। সামাজ্যবাদী আকাক্সক্ষা নিয়ে তারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ওপর চেপে বসছে। মুনাফা ও আধিপত্যের লোভে আজ একজোট বেঁধেছে ইহুদিবাদী নেতানিয়াহু, খ্রীষ্টবাদী ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসলামি ওয়াহাবীবাদী মোহাম্মদ বিন সালমান। লোভের ধর্ম তাদের একমঞ্চে নিয়ে এসেছে। যদিও এই ব্যক্তিরা কেবলই ব্যক্তি নয়, তারা নিজ নিজ অঞ্চলের একচেটিয়া পুঁজিপতিদেরই প্রতিনিধি। এদের প্রয়োজনেই যুদ্ধ বাঁধছে, মানুষ উদ্বাস্তু হচ্ছে, প্রাণ দিচ্ছে। তবে কোনো শাসকই চিরকাল টিকে থাকেনি। ইতিহাসও কাউকে ক্ষমা করেনি। ইরানকে ঘিরে সমস্ত সাম্রাজ্যবাদী পরিকল্পনার বিপরীতে জেগে উঠতে পারেন জনগণ। যুক্তরাষ্ট্রের নয়া পরিকল্পনার বিপরীতে বড় বাধা হয়ে উঠতে পারে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের জনগণ। এসব অঞ্চলের মানুষ নানাভাবে যুদ্ধের ঘা বহন করছেন। নিজ দেশেই ডোনাল্ড ট্রাম্প হতে পারেন বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এমনকি এই সূত্রে ইরানের চলমান দমনমূলক শাসন কাঠামোর বিপরীতেও ঘটতে পারে গণউত্থান।
সম্ভাবনার বীজও দেখা যাচ্ছে। বদলে যেতে পারে গোটা বিশ্বটাই। ট্রাম্প-ইউরোপ দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর বিভাজন অতি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। অর্থনিতির গতিপ্রকৃতি নির্দেশ করছে, তারা আর নিজেদের নৈরাজ্য ঢেকে রাখতে পারছে না। দ্বন্দ্ব-সংঘাতের মধ্য দিয়েই পৃথিবী এতকাল সামনে এগিয়ে গেছে। এবার নিশ্চয়ই মানুষেরই জয় হবে।

সাপ?তাহিক পতিবেদন

প্রচ্ছদ কাহিনী/প্রতিবেদন
  • টি-২০ ক্রিকেট টুর্নামেন্ট আয়োজন করেছে ব্র্যাক ব্যাংক
  •  মতামত সমূহ
    পিছনে 
     আপনার মতামত লিখুন
    English বাংলা
    নাম:
    ই-মেইল:
    মন্তব্য :

    Please enter the text shown in the image.