ক্রিকেট বাণিজ্যিকীকরণের শিকার বাংলাদেশ!

Print Friendly and PDF

মোয়াজ্জেম হোসেন রাসেল

আবারও ক্রিকেটের বাণিজ্যিকীকরণের শিকার হয়েছে বাংলাদেশ। ফিউচার ট্যুর প্ল্যানে (এফটিপি) থাকার পরও বাংলাদেশকে আতিথ্য না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে অজি ক্রিকেট বোর্ড। বাংলাদেশের সঙ্গে সিরিজ আয়োজন লাভজনক নয়, এই ভাবনা থেকেই সিরিজ বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এখন ২০২০ টোয়েন্টি-২০ বিশ্বকাপের আগে বাংলাদেশকে নিয়ে একটি টোয়েন্টি-২০ সিরিজ খেলার প্রস্তাব করেছে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া (সিএ)। ক্রিকেটের তিন মোড়ল দেশ ভারত, ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়া নিজেদের লাভের বাইরে যে কিছুই করে না তার আরো একটি প্রমাণ পাওয়া গেল। অবস্থা এতটাই খারাপ যে, বাংলাদেশ ক্ষতিপূরণের দাবিও করছে না। আগে অনিশ্চয়তা থাকলেও এখন একেবারে বাতিলই করা হয়েছে এই সিরিজ। আগামী আগস্ট-সেপ্টেম্বরে দুটি টেস্ট ও তিনটি ওয়ানডে খেলতে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের অস্ট্রেলিয়া সফরের কথা ছিল। কিন্তু সেই সুযোগ আপাতত মিলছে না বাংলাদেশের। সফর বাতিল করে বিবৃতি দিয়ে অস্ট্রেলিয়া জানিয়েছে, আইসিসির ফিউচার ট্যুর প্রোগ্রামে এ বছরের আগস্টে বাংলাদেশের অস্ট্রেলিয়া সফরের জন্য যে সময়সূচি বরাদ্দ করা ছিল, সেটা বিসিবি ও ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার দ্বিপক্ষীয় সমঝোতার ভিত্তিতে তা স্থগিত করা হয়েছে। দুই দেশই একমত হয়েছে, সফরটা ২০২০ সালে টোয়েন্টি-২০ বিশ্বকাপের আগে হওয়াটাই ভালো। তবে এ প্রস্তাবে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) একমত হওয়ার কথা বলা হলেও বিসিবির প্রধান নির্বাহী নিজামউদ্দিন চৌধুরী সুজন বলেছেন, ‘সিরিজ বাতিল করে টোয়েন্টি-২০ বিশ্বকাপের আগে ত্রিদেশীয় সিরিজ আয়োজনের ব্যাপারে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার কাছ থেকে বিসিবি পায়নি।’ ঠিক কী কারণে সূচিতে এত বড় পরিবর্তন, তা ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া খোলাসা করে বলেনি। টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার পর ২০০৩ সালে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথমবারের মতো টেস্ট খেলতে যায় বাংলাদেশ। সেটাই অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের শেষ টেস্ট খেলা। এদিকে আর্থিক ক্ষতির অজুহাত দেখিয়ে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার বাংলাদেশের সঙ্গে সিরিজ বাতিলের বিষয়টিকে ভালো চোখে দেখেনি বিসিবি। এফটিপি প্রতিশ্রুতি থাকার পরও হুট  করে বাংলাদেশের সঙ্গে বোর্ডটির বারবার সিরিজ বাতিলের এমন মনোভাবকে দুঃখজনক বলে অভিহিত করেছেন বিসিবি সিইও নিজামউদ্দিন চৌধুরী সুজন। ১৫ বছর আগে এফটিপি অনুযায়ী দ্বিপক্ষীয় সিরিজের ফিরতি সিরিজ হতো এটি। মূলত আগস্ট-সেপ্টেম্বরে অস্ট্রেলিয়ায় ফুটবলের মৌসুম চলবে। আর অস্ট্রেলিয়ান সম্প্রচারকরা ফুটবল মৌসুমের মধ্যে এ সিরিজ সম্প্রচারে আগ্রহী নয়। তাই বিসিবি বরাবর সিএ’র পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই সিরিজ আর্থিকভাবে সুবিধাজনক নয়। কিন্তু ফুটবল মৌসুম তো আর এক মাস নির্ধারিত হয়নি। তাহলে জেনেশুনে কেন আগস্ট-সেপ্টেম্বরে সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল সেই প্রশ্ন থেকেই যায়। এর আগে ২০১৫ সালেও বাংলাদেশের সঙ্গে সিরিজ খেলা নিয়ে এমন টালবাহানা করেছিল অজি ক্রিকেট বোর্ড। দুই ম্যাচ সিরিজের টেস্ট খেলতে ওই বছরের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশে আসার কথা থাকলেও নিরাপত্তার অজুহাতে তা স্থগিত করে দেয়। দুই বছর পর  গেল বছরের আগস্ট-সেপ্টেম্বরে সেই  সিরিজ খেলতে বাংলাদেশে  আসে  স্টিভেন স্মিথ ও তার দল। এছাড়া কদিন আগে সিএ ১০০ কোটি অস্ট্রেলিয়ান ডলারের সম্প্রচার স্বত্বের চুক্তি করে ফক্স স্পোর্টস ও সেভেন নেটওয়ার্কসের সঙ্গে। বাংলাদেশের বিপক্ষে সিরিজ বাতিলের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়ে গেছে সেই চুক্তির আগেই। নতুন এই সম্প্রচার স্বত্বের চুক্তির সময় বাংলাদেশের বিপক্ষে সিরিজটি সম্প্রচারের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল কিনা, সেটি নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ২০০৩ সালের পর দুবার অস্ট্রেলিয়া বাংলাদেশ সফর করলেও বৈশ্বিক টুর্নামেন্টের বাইরে সেদেশে যাওয়া হয়নি টাইগারদের। ২০১৭ সালে সর্বশেষ বাংলাদেশে খেলতে আসে অস্ট্রেলিয়া। দুই টেস্ট ম্যাচের সে সিরিজ ড্র হয়েছিল ১-১ ব্যবধানে। তবে ওই সিরিজ নিয়েও বিসিবিকে পোড়াতে হয়েছে বেশ কাঠখড়। নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে দুবার পিছিয়ে দেওয়ার পর উচ্চ পর্যায়ের সরকারি আশ্বাসে সফরে এসেছিল স্টিভেন স্মিথরা। এই সফরটি বাতিল হওয়ার পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের টেস্ট খেলার সুযোগ আসতে পারে হয়তো কেবল আইসিসি টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ চালু হলেই। কারণ আবারও হয়তো এফটিপিতে সিরিজ রাখা হবে, কিন্তু অজিরা না চাইলে তো আর খেলা সম্ভব নয়।

বিসিবি নীরব যে কারণে
এফটিপিতে থাকার পরও ক্রিকেটের মোড়ল দেশগুলো ছোট দেশগুলোকে কোনো মূল্যায়ন করেনি। সে কারণে বাংলাদেশকে টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার পর ভারত সফরের জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে ১৪ বছর। বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ সংস্থা ফিফার মতো এতটা কঠোর আর স্বাধীন নয় আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি)। আর এফটিপি থাকলেও অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর মধ্যে কোনো প্রকার চুক্তি না থাকার কারণে মাঝেমধ্যেই বাস্তবায়ন হতে পেরুতে হয় নানা ঝক্কি ঝামেলা। মূলত কোনো চুক্তি না থাকার কারণেই বিসিবি এখন নীরব হয়ে রয়েছে। কার্যত ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার সিরিজ বাতিলের সিদ্ধান্তকে মেনে নিচ্ছে বিসিবি। বাংলাদেশকে নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার এমন উন্নাসিকতা নতুন কিছু নয়। এখন পর্যন্ত টেস্ট সিরিজে অংশ নিতে বাংলাদেশ সফরে অস্ট্রেলিয়া এসেছে দুবার। সবশেষ ২০১৭ সালে। আর বাংলাদেশ টেস্ট সিরিজ অস্ট্রেলিয়া সফরে গিয়েছিল একবারই। সেটাও ১৫ বছর আগে ২০০৩ সালে। গত দেড় দশকে আর একবারও বাংলাদেশকে সফরে আমন্ত্রণ জানায়নি তারা। এ যাত্রায়ও বাংলাদেশের নির্ধারিত সফর বাতিল করল অস্ট্রেলিয়া। সিরিজ বাতিল ঘোষণার একদিন পর এক প্রতিক্রিয়ায় বিসিবির প্রধান নির্বাহী নিজামউদ্দিন সুজন বলেন, ‘সিরিজ বাতিল হওয়াটা হতাশাজনক ছাড়া আর কী হতে পারে। ফিউচার ট্যুর প্রোগ্রাম (এফটিপি) কমিটমেন্ট সদস্য দেশগুলো মিলেই করে। আমাদের দেশে কখন কোন সিরিজটা মাঠে গড়ানো সম্ভব হবে সেটাও আমরাই নির্ধারণ করি। অন্য দেশেরও একই দায়িত্ব। আমাদের ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া জানিয়েছে, যে সময় নির্ধারিত ছিল এ সিরিজের জন্য, সে সময় তাদের বেশকিছু জায়গায় ক্রিকেট খেলা সম্ভব না। যেসব জায়গায় খেলা সম্ভব সেগুলো খুব খরুচে হয়ে যায়। এটার ভিত্তিতে আমরা প্রস্তাব করেছিলাম সফর ছোট করে আনা যায় কিনা’।

বাতিল ত্রিদেশীয় সিরিজও
সিরিজ নিয়ে এখন কিছুটা হলেও খারাপ সময়ের মধ্যদিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের ক্রিকেট। একের পর এক দুঃসংবাদ শুনতে হচ্ছে সংশ্লিষ্টদের। চলতি মাসেই আগস্ট-সেপ্টেম্বরে অস্ট্রেলিয়া সফর করার কথা ছিল বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের। কিন্তু বাণিজ্যিক কারণ দেখিয়ে সফর বাতিল করে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া। এই হতাশা না কাটতেই শুনতে হলো আরও একটি দুঃসংবাদ। পাকিস্তান ও ওয়েস্ট ইন্ডিজকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে ত্রিদেশীয় সিরিজ খেলার কথা ছিল বাংলাদেশের। সেটাও বাতিল হয়ে গেছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী ব্যস্ত সূচির কারণে পাকিস্তানের প্রস্তাবিত এই ত্রিদেশীয় টোয়েন্টি-২০ সিরিজে অংশ নিতে পারছে না ওয়েস্ট ইন্ডিজ। পাকিস্তান দলেরও রয়েছে ব্যস্ত সূচি। পাকিস্তান দল বর্তমানে রয়েছে ইংল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড ও স্কটল্যান্ড সফরে। এ সফরে শুরু হওয়া আয়ারল্যান্ডের অভিষেক টেস্টে প্রতিপক্ষ সরফরাজ আহমেদের দল। এরপর ইংল্যান্ডে দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজ খেলবে তারা। ইংল্যান্ড সিরিজের পর দুই ম্যাচের টোয়েন্টি-২০ সিরিজ খেলতে স্কটল্যান্ড সফর করবে পাকিস্তান। যা শেষ হবে ১৩ জুন। যুক্তরাজ্যের পর জিম্বাবুয়ে সফর রয়েছে উপমহাদেশের দলটির। আফ্রিকার দেশটিতে অস্ট্রেলিয়াকে নিয়ে একটি ত্রিদেশীয় সিরিজের সূচিও রয়েছে পাকিস্তানের। ১-৮ জুলাই চলবে এ সিরিজ। এসব মিলিয়ে এখন বলাই যায় ক্রিকেটে ভালো সময় যাচ্ছে না বাংলাদেশের।
mhrashel00@gmail.com

সাপ?তাহিক পতিবেদন

খেলা
  • ধানম-িতে উদ্বোধন হলো ‘তাগা ম্যান’
  •  মতামত সমূহ
    পিছনে 
     আপনার মতামত লিখুন
    English বাংলা
    নাম:
    ই-মেইল:
    মন্তব্য :

    Please enter the text shown in the image.