[মুক্তগদ্য] সাংঘর্ষিক তত্ত্ব

Print Friendly and PDF

হিমাংশু দেব বর্মণ

নানা জাতি, নানা ধর্ম, বর্ণ ও সম্প্রদায়ের বসতি আমাদের এই বাংলাদেশে। একটি চকচকে ব্যানারও রয়েছে আমাদের। আর তাতে চটকদার কিছু আশার বাণীও লিখে রাখা আছে। বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সাম্যবাদের কথা। যেখানে কোনোরকম বৈষম্যের ঠাঁই নেই। যেখানে এসব মহান উদ্দেশ্য সামনে রেখে দেশ পরিচালিত হয় সেখানে ধর্ম, বর্ণ ও সাম্প্রদায়িক পরিচয়টা শুধু ব্যক্তিক। সাফ কথায় বলা যায় এটা কথার কথা মাত্র। আমাদের দেশে বসবাসরত সব মানুষের সামষ্টিক পরিচয় হলো বাঙালি। এটা কারো ওপর চাপিয়ে দেয়া কোনো বিষয় নয়। আপন আপন তাগিদেই আমরা সবাই আমাদের পরিচয় বাঙালি বলেই জানব আর জানাব। এটা আমাদের মৌলিক দায়িত্ব।
বিগত প্রায় দুই দশক ধরে জাতির এই মৌলিক দায়িত্বকেই চাপিয়ে দেয়া দায়িত্বে রূপান্তরের চেষ্টা চলছে। তা হলো আমাদের দেশে আদিবাসী ও উপজাতি তত্ত্ব। আমাদের দেশে মোট পঁয়তাল্লিশটি নৃ-গোষ্ঠী বসবাস করে। পাহাড় ও সমতলে দেশের প্রায় সব কয়টি জেলাতেই এই জনগোষ্ঠীগুলো কম-বেশি বসবাস করে আসছে সেই প্রাচীনকাল থেকেই। এই সব জনগোষ্ঠীর মানুষ তাদের ব্যক্তিক পরিচয় আদিবাসী হিসেবে তুলে ধরতে চায়। আর এ প্রসঙ্গে তারা আদিবাসী পরিচয়ের সাংবিধানিক স্বীকৃতি চায়। কিন্তু সরকারিভাবে তাদের এ দাবিকে কেবল অগ্রাহ্যই করা হয়নি, এটাকে অনৈতিক বলে এর বিপরীতে ঘোষণা দেয়া হয়েছে ‘আদিবাসী পরিচয় দিলে দ-নীয় অপরাধ’।
এখানে প্রশ্ন এসে যায়। আদিবাসী পরিচয় দিলে তারা জাতীয় পরিচয় দিতে বাঙালিই তো লিখবে। যা তারা আগের মতোই এখনো লেখে। আর উপজাতি পরিচয় দিলে তাদের কোনো জাতীয় পরিচয় দরকার পড়বে কি? কারণ তারা তো কোনো জাতি নয়, উপজাতি। এ-বিষয়টা পুঙ্খানুপুঙ্খ ভেবে দেখাটা আজ খুব জরুরি। তাহলে দুটি বিষয় নিয়ে একটু কপচাকপচি হোক কিছুটা সময়।
আদিবাসী বলতে কী বোঝায়? যে-সব জনগোষ্ঠীর বসবাস, জীবিকা নির্বাহ বা জীবন প্রণালিতে সেই আদিম সংস্কৃতির প্রভাব আজও বিদ্যমান। আধুনিকতার ছোঁয়া থেকে দূরে তাদের অবস্থান। সেই সব জনগোষ্ঠীকে আদিবাসী বলা হয়। আমাদের দেশের নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীগুলোর জীবন ও সংস্কৃতি তেমনই। এই হিসাবমতে আমরা তাদের অবশ্যই আদিবাসী হিসেবে পরিচয় দিতে পারি।
এবার আসা যাক উপজাতি প্রসঙ্গে। উপজাতি বলতে আমরা কী বুঝি? ক্ষুদ্র বা ছোট জাতিকে উপজাতি বলে। এখানে কথা হলো, যে জনগোষ্ঠীর একটি নির্দিষ্ট ভাষা, সংস্কৃতি থাকে, সেই জনগোষ্ঠীই জাতি হিসেবে পরিচিতি পাওয়ার অধিকার রাখে। তখন তাদের আর ছোট বলার কোনো সুযোগ থাকতে পারে না। আর এখানে উপজাতি বলতে বোঝানো হয়, অন্য কোনো জাতির অধীনে থাকা একটি ছোট জাতি। তাই তাদের পরিচয় উপজাতি।
সেই হিসেবে এই উপজাতি তত্ত্বকে বাঙালি বুড়ো আঙুল দেখিয়েছে সেই ’বায়ান্ন সালে। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বাঙালির ভাষা, সংস্কৃতি কেড়ে নিয়ে বাঙালি জাতিকে পাক জাতির অধীন একটি উপজাতি করে রাখতে চেয়েছিল। বীরের জাত বাঙালি সেদিন তাদের সেই নীল নকশাকে তছনছ করে দিয়ে বাঙালি জাতিত্বকে ছিনিয়ে এনেছিল। তা আজও ধরে রেখেছে সগৌরবে। বিশে^র বুকে আজ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে বাঙালির সেই অর্জন। যা আজ ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃত।
তাহলে এই যে নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীগুলোকে উপজাতি করে রাখা বা তাদের ওপর উপজাতিত্ব চাপিয়ে দেয়া। এটা কি সেই পাক শাসকের স্বৈরাচারীর কথা মনে করিয়ে দেয় না?
সংকট আরো আছে। সরকারি ঘোষণায় আছে, ‘এক দেশ, এক জাতি’। এ প্রসঙ্গে যে কথা আসে। তা হলো, এই নৃ-গোষ্ঠীরা তাদের ব্যক্তিক পরিচয় আদিবাসী হিসেবে তুলে ধরলেও জাতীয় পরিচয়ে তারা বাঙালি লিখতে পারছে। বাঙালি পরিচয় দেয়ার সুযোগ থাকছে তাদের হাতে। কিন্তু যখন তারা উপজাতি বলে পরিচয় দিবে। তখন তাদের জাতীয় পরিচয় দেয়ার কোনো সুযোগ থাকবে না। প্রয়োজনও পড়বে না। যেহেতু, তারা পূর্ণাঙ্গ কোনো জাতি নয়। বাঙালি জাতির অধীন কোনো উপজাতি। এটা হবে সম্পূর্ণভাবে অযৌক্তিক। দেখেই মনে খটকা লাগবে এখানে কিছু লুকানো চুকানোর বিষয় আছে।
তাছাড়া ‘এক দেশ, এক জাতি’ ঘোষণা গণতন্ত্রের পরিপন্থী। আবার নেতার কৃতিত্বও মøান হয়ে যায়। বিভিন্ন জাতির সমন্বিত নেতৃত্বই বলিষ্ঠ ও যোগ্য নেতৃত্ব। আমরা বিভিন্ন সময়ে কারণে অকারণে উদাহরণ হিসেবে পাশর্^বর্তী রাষ্ট্র ভারতের কর্মকা-গুলোকে উপস্থাপন করি। কিন্তু তাদের থেকে এতটুকু শিক্ষা নিতে চাই না। ভারতের প্রতিটি প্রদেশে এক একটি ভিন্ন ভিন্ন জাতির বসবাস। ভিন্ন ভিন্ন জাতির অভিন্ন দেশ, অভিন্ন মত, অভিন্ন নেতা, অভিন্ন জাতি। সেই দেশই আবার গণতন্ত্রের বেলায় আমাদের কাছেই উদাহরণ হয়ে আছে। মানি আর না মানি, অন্তত সত্যকে স্বীকার না করলে মিথ্যেবাদী হয়Ñ এজন্য হলেও বলতে হয় কথাটা। ভারত আমাদের চেয়ে অনেকাংশেই সফল গণতান্ত্রিকতার প্রশ্নে। তাহলে কোন কৃতিত্ব অর্জনের জন্য এমন সব সাংঘর্ষিক তত্ত্বের উপস্থাপন করা হয়। এটা সাধারণ মানুষের বোধগম্যের বাইরে।
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সব কর্মকা-ই আপামর জনতার কাছে থাকেতে হয় পরিচ্ছন্ন ও বোধগম্যের আওতাবদ্ধ। কোনো বিষয় বোঝা না বোঝার মতো হলেই তা হয়ে যায় চাপিয়ে দেয়া। আর তা হয়ে ওঠে স্বৈরাচারের শামিল। আসলে এখনই আমাদের উচিত, এই সাংঘর্ষিক বিষয়সমূহ আরেকবার ঘেঁটিয়ে দেখে গণতান্ত্রিক বৈশিষ্ট্যকে সমুন্নত রেখে দেশের সর্বস্তরের মানুষকে তাদের স্ব-স্ব পরিচয়ে তুলে ধরায় সহমর্মিতা প্রকাশে সমর্থন করা।
কী আছে এই দুটি সাংঘর্ষিক তত্ত্বের ভেতরে! হয়তো কিছুই না। হয়তো বা অনেক কিছুই। আসলে সবাই চায় তার শেকড় আঁকড়ে ধরে রাখতে। তার বংশীয় গৌরব, ঐতিহ্য এতটুকু ম্লান হোক, হারিয়ে বা বিলীন হয়ে যাক এসব কারোরই কাম্য নয়। বাংলাদেশে বসবাসরত মোট পঁয়তাল্লিশটি নৃ-গোষ্ঠীর মধ্যে অধিকাংশেরই ভাষার সঙ্গে সঙ্গে তাদের নির্দিষ্ট বর্ণমালাও ছিল। যা এখন কিছু একেবারেই বিলুপ্ত হয়ে গেছে। কিছু কিছু এখনো আছে। এভাবে বরং আমাদের করণীয় হওয়া উচিত যা, তা হলো আমাদের সমন্বিত বা জাতীয় প্রচেষ্টায় বিলুপ্ত হওয়া বর্ণমালাগুলো পুনরুদ্ধার করে স্ব-স্ব জনগোষ্ঠীর মানুষকে তাদের নিজস্ব বর্ণমালার সঙ্গে পরিচয় করতে সহায়তা করা। যাতে তারা তাদের শেকড়টাকে মজবুতভাবে আঁকড়ে ধরে রাথতে পারে।
আমরা তাদের ভাষা, সংস্কৃতি একেবারে ভুলে যেতে বাধ্য করতে পারি না। কারণ এটা গণতন্ত্রে পরিপন্থী। যেমন আমরা তাদের চেহারাটাও বদলে দিতে পারি না। তারা পাহাড়, সমতল যেখানেই বসত করুক চেহারায় তো বাঙালি থেকে আলাদা। মুখের বাণীতেই তো আমরা তাদের বাঙালি বলে চালিয়ে দিতে পারব না। তাছাড়া নৃ-গোষ্ঠীরা তাদের ভাষাকে ধরে রাখার জন্য জোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এজন্য আমাদের উচিত তাদের পাশে দাঁড়ানো। আদিবাসী সংস্কৃতি শিক্ষার যে স্কুলগুলো এখনো কোনোরকম চলছে সেগুলোকে উন্নয়নমুখী করে তুলতে সহায়তা করা অত্যন্ত জরুরি। বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া বর্ণমালাগুলো উদ্ধারের জন্য ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা জোরদার করতে হবে।
এ-ব্যাপারে আমরা ভারতের মিজোরাম, আসাম, ত্রিপুরাসহ যেসব জায়গায় তাদের আদি আবাসস্থল ও সাংস্কৃতিক স্থাপনাগুলো ছিল, সেসব জায়গায় বিশেষ বিশেষ সংরক্ষণাগারে অনুসন্ধান চালিয়ে আমরা তাদের হারিয়ে যাওয়া বর্ণমালা, ভাষা, সংস্কৃতির পুনরুদ্ধারে সচেষ্ট হতে পারি। আর এজন্য সেখানকার স্থানীয় ও প্রয়োজনে জাতীয়ভাবে প্রশাসনিক সহায়তাও নিতে পারি। এ প্রচেষ্টায় অবশ্যই তারা আন্তরিকভাবে সহযোগিতা করবেন। তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
গত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশকে শান্তিচুক্তির মাধ্যমে নৃ-গোষ্ঠীদের যেভাবে আশ^স্ত করা হয়েছিল। অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে আজো চোখ পেতে দেখতে হয় তাদের আহাজারি। শুনতে হয় তাদের সেই সব দাবি আদায়ের সেøাগান। মাঝে মাঝেই শোনা যায় আদিবসী জনগণের শর্তবঞ্চিত দাবি-দাওয়ার কথা। আর নেতাদের প্রতিবাদী হুঙ্কার। আজ পর্যন্ত সেসব তাদের দাবি দাবিতেই সীমাবদ্ধ আছে। আর এই দাবি আদায়ের কোনো সম্ভাবনা না দেখে আদিবাসীদের কর্ণধার জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লারমার ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে একদল আদিবাসী জনসংহতি সমিতি থেকে বেরিয়ে এগিয়ে ভিন্ন সংগঠন তৈরি করেছে ইউপিডিএফ নামে। তারা শান্তিচক্তির আগে জনসংহতি সমিতি যে সশস্ত্র আন্দোলনে বিশ^াস করত, সেই নীতি নিয়েই চলছে। মাঝে মাঝেই পাহাড়ি এলাকা অশান্ত হয়ে উঠছে। তারা নিজেরাই খুনোখুনি করছে। যার শেষ পরিণতি শক্তিমান চাকমা। এতে তারা নিজেদের মধ্যে ছত্রভঙ্গ থাকার কারণে তাদের মৌলিক দাবি আদায়ের পথ ক্রমেই অদৃশ্য হচ্ছে। তাদের সব সম্ভাবনা শেষের দিকেই ধাবমান হতে দেখা যাচ্ছে।
আজ যেখানে তাদের ভাষা সংস্কৃতি পুনরুদ্ধার করে ব্যক্তি ও জাতীয় জীবনে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার প্রশ্ন খব জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেখানে তাদের নিজেদের মধ্যে এই বিভেদ। এটা কখনোই কেবল তাদের না, বাঙালি জাতির জন্য ভালো কোনো বার্তা বহন করে না। কথার পাশ কাটিয়ে কথা বলা যায় না। তাই প্রসঙ্গত আমাদের দেশের সমভূমিতে বসবাসরত আদিবাসীরা যে সুবিধাজনক অবস্থানে আছে তা কিন্তু না। সেখানে চলছে হামলা, উচ্ছেদ, নির্যাতন। বাঙালি সংখ্যালঘুদের সেই একই অবস্থা।
এখানে কথা হচ্ছিল আদিবাসীদের পরিচিতি প্রসঙ্গে। আসলে কী হবে তাদের পরিচয়? আসলে সবাই চায় তাদের শেকড় ধরে রাখতে। তারা তাদের শেকড় ধরে রাখুক। তাদের ভাষা, সংস্কৃতি নিয়ে তারা তাদের স্বীয় পরিচয় নিয়ে থাকুক। ব্যক্তি পরিচিতি আদিবাসী থাকলে তারা জাতীয় পরিচিতিতে বাঙালি বলে চলতে পারবে। কিন্তু উপজাতি লিখলে তার আর জাতীয় পরিচয় দেয়ার কোনো সুযোগ থাকে না। এ বিষয়টি ভেবে দেখা আজ খুব জরুরি। আর তা অবশ্যই ভাবতে হবে আমাদের। যেহেতু আমরা আমাদের সব অর্জন শক্ত করে ধরে রাখতে চাই এবং আরো অর্জন করতে চাই।
** এই লেখার মতামত ও সকল দায় লেখকের নিজস্ব।
hd.bormon@gmail.com

সাপ?তাহিক পতিবেদন

সাহিত্য সংস্কৃতি
  • ধানম-িতে উদ্বোধন হলো ‘তাগা ম্যান’
  •  মতামত সমূহ
    Author : esenyurt escort
    http://www.nwxescorts.com/ ডুডসচজপট মজটদজদজত
    পিছনে 
     আপনার মতামত লিখুন
    English বাংলা
    নাম:
    ই-মেইল:
    মন্তব্য :

    Please enter the text shown in the image.