[মুক্তিযুদ্ধ] সেইসব দিনগুলির কাহিনি

Print Friendly and PDF

মির মোনাজ হক

একাত্তরের ১০ এপ্রিল বাংলাদেশ সরকার গঠন হয় বঙ্গবন্ধুকে প্রেসিডেন্ট ও তাজউদ্দীন আহমেদকে প্রধানমন্ত্রী করে, আর ১৭ এপ্রিল সেই প্রথম বাংলাদেশ সরকার মুজিবনগরে শপথ গ্রহণ করে, একথা সকলেই জানেন। কিন্তু খুব কম মানুষই জানে যে, আমি ঠিক সেই ঐতিহাসিক দুটি দিনের মাঝে ১৩ এপ্রিল ভারতের পশ্চিম দিনাজপুরের রায়গঞ্জে প্রায় ১০০০ জন ছাত্র যুবকের সাথে ভারতীয় গেরিলা ট্রেনিংক্যাম্পে যোগ দেই। আজ সেই কাহিনি শোনাব, মুক্তিযুদ্ধের ৪৭ বছর পরে। এর আগে বলে নেই, সেই ২৬ মার্চ থেকেই বগুড়া শহরে আমরা ৩ সপ্তাহ ধরে কীভাবে অবরোধ তৈরি করি, ঢাকা থেকে ঢোকার পথ ধ্বংস করে, আর রংপুর থেকে ঢোকার পথের ব্রিজকে ডেমুলেট করে দিয়ে বগুড়া শহরটিকে মুক্ত রেখেছিলাম প্রায় তিন সপ্তাহ, শেয পর্যন্ত এপ্রিলের ৮ তারিখে আমাদের শহর ছেড়ে ভারতীয় বর্ডারে যাওয়ার পরামর্শ দিলেন সে সময়ের আঞ্চলিক কম্যান্ডের একজন লেফটেন্যান্ট ইদ্রিস, যিনি আমাকে কদিন আগেই প্রচুর ডিনামাইট (এক্সপ্লোসিভ) সরবরাহ করেছিলেন বগুড়া- রংপুর রোডের কাটাখালি ব্রিজটি ধ্বংস করাতে। সাথী যোদ্ধারা অনেকেই জিপগাড়িতে রওনা হলেন, আর আমাকে ছাড়লেন না বগুড়ার সদরের আওয়ামী লীগ নির্বাচিত এমএনএ ড: জাহেদুর রহমান। তিনি ছিলেন আমাদেরই প্রতিবেশী, আগেও তার বাসায় বহুবার গেছি, সে সুবাদেই আঙ্কেল বলেই ডাকতাম।
আঙ্কেল জাহেদুর রহমানের বেশ বড় পরিবার, ৯টি মেয়ে সন্তান। তার কোনো ছেলে ছিলো না, বড় মেয়েটি এলিজা, দারুণ সুন্দরী, আমাদের সাথেই কলেজে পড়ত, ক্লাসফ্রেন্ড, কাজেই তাদের সবাইকে সঙ্গে নিয়ে যেতে হবে। আয়োজন করা হলো দুটি গরুর গাড়ি, অবশ্যই ছই তোলা গরুর গাড়ি, যেন বাইরে থেকে কারো নজরে না পড়ে ভেতরে কে আছে। যথারীতি প্রচুর শুকনো খাবার, ফলমূল আর পানীয় বোঝাই করা হলো। রওনা দিলাম ভারতীয় বর্ডারের দিকে। আমার হাতে ‘থ্রি নট থ্রি’ রাইফেল, কিছু গোলাবারুদ, আর এক সহযোদ্ধাও ছিল আমার সঙ্গে, বলা যায় না তো পথে কী হয়, তবে আমদের  দুজনার এই সামান্য ‘প্রতিরক্ষার’ আয়োজন আর কিছু না করতে পারলেও জাহেদ আঙ্কেলের পরিবারের মনে কিছুটা সাহস জুটিয়েছিল বটে। শহর ছেড়ে কিছুদূর গ্রামের পথে হাঁটতেই পেছনে দেখলাম অনেক লোকজন আর গরুর গাড়ি আমাদের পথ অনুসরণ করে বর্ডারের দিকে হাঁটছে। প্রায় তিন দিন হাঁটা ও মাঝে মধ্যে বিরতিযুক্ত দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ১২ এপ্রিল বালুরঘাট পৌঁছায়ে শরণার্থী ক্যাম্পে পৌঁছেই খবর পেলাম নতুন বাংলাদেশ সরকার গঠন হয়েছে, ভারত সরকার মুক্তিফৌজ ট্রেনিং দেবার ব্যবস্থা করে ফেলেছে। আমাদের বলা হলো, যারা ১৮ বছরের উপরে বয়স তারা শরণার্থী ক্যাম্পে থাকতে পারবে না, আগামীকাল ভারতীয় আর্মি আসবে সবাই যেন প্রস্তুত থাকি যুদ্ধের ট্রেনিং এ যেতে হবে। ড: জাহেদুর রহমানের পরিবারের জন্য একটা বাসার ব্যবস্থা করা হলো, আর আমরা শত শত শরণার্থীর সাথে একটি রাত্র ক্যাম্পেই কাটালাম। পরদিন খুব সকালেই শুরু হয়ে গেলো আমাদের সুশৃঙ্খল সৈনিক জীবন, সকাল ৮টার মধ্যেই এসে গেলো জলপাই রঙের ভারতীয় সৈন্যবাহিনীর গোটা দশেক ট্রাক কনভয়।
আনেকেই পরিবারের সাথে লম্বা পথ পাড়ি দিয়ে এই শরণার্থী ক্যাম্পে এসেছে সপ্তাহ খানেক আগেই (আমরা একদিন আগে) সবাই আত্মীয় স্বজনদের কাছ থেকে অশ্রু সজল নয়নে বিদায় নিলো, আমার কোনো আত্মীয় স্বজন ছিলো না সেখানে, প্রতিবেশী আঙ্কেল ড: জাহেদুর রহমানের পরিবারের কাছ থেকে বিদায় নিয়েছি গত রাতেই। ক্লাসমেট এলিজা, গত তিনদিন লম্বা হাঁটা পথ পাড়ি দিতে অনেক গল্পেই কাটিয়েছি, যার বেশির ভাগ ছিল যুদ্ধের বীরত্বগাঁথা কাহিনি। সকালে যখন জলপাই রঙের ট্রাকে উঠি তখন একবার আমিও কিছুটা ইমোশনাল হয়ে পড়েছিলাম, জানি না আর কোনদিন এই পরিচিত মানুষগুলোর সাথে আবার দেখা হবে কি না।
বালুরঘাট থেকে রায়গঞ্জ ১০০ কিলো মিটারের একটু বেশি পথ, দুপুরের দিকে পৌঁছুলাম রায়গঞ্জ এর এক বিশাল জঙ্গল এলাকায়, যখন কনভয় থামিয়ে আমাদের ট্রাক থেকে নামতে বলা হলো, অনেকেই ভয় পেয়ে গেলো, এই ভেবে যে এই গহিন জঙ্গলে ট্রেনিং এবং বসবাস করতে হবে? সবকিছু মিলিটারি কায়দায় শুরু হলো। প্রথমেই লাইন করে দাঁড়া করানো হলো, এক একটি লাইনে ১০ জন করে দাঁড়ানো ছেলেদের একটা করে বড় তাঁবু দেওয়া হলো সেগুলো কীভাবে খাটাতে হবে একজন ভারতীয় ট্রেনিং ইন্সট্রাকটর দেখিয়ে দিলেন, এবং আমাদের এক এক জায়গায় তাঁবু খাটাতে বলা হলো, এই নিয়েই ব্যস্ত থাকলাম পুরোটা সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত, এর মাঝেই দুপুরের খাবার পরিবেশন শুরু হয়েছে, ঠিক  মিলিটারি কায়দায়। যা বলছিলাম প্রায় ১০০০ ছেলে, তাদের জন্যে সমস্ত আয়োজন আগে থেকেই প্রোগ্রাম মাফিক তৈরি। কোয়াটার মাস্টার এর দায়িত্ব এতগুলো মানুষের তিন বেলা খাবার জোগান, মেন্টেন্ডেন্স মাস্টার এর দায়িত্ব তাঁবুর প্লান করা, সকলের জন্য কম্বল, বালিশ, স্নানাগার তৈরি, টয়লেটের ব্যবস্থা ইত্যাদি। তারপর ট্রেনিং কর্মসূচি। প্রথম এই বিশাল অর্গানাইজেশনাল আয়োজন ২/৩ ঘণ্টার মধ্যেই যখন আমরা সকলেই শেষ করলাম তখন এলেন ক্যাম্পের অধিনায়ক মেজর চক্রবর্তী ও ক্যাপ্টেন ডোগরা। আমাদের কাজ দেখে আশ্বস্ত করলেন এবং প্রশংসাও করলেন ক্যাপ্টেন ডোগরা যে আমরা পারব, অতি তাড়াতাড়ি ট্রেনিং শেষ করে, শত্রুর মোকাবিলা করতে।
ট্রেইনিং ক্যাম্পের সেদিনের প্রথম দিনের অভিজ্ঞতা আমাকে ও সাথি যোদ্ধাদের মনবলকে এতোটাই দৃঢ় করেছিলো যে আমরা পুরো তিন মাসের গেরিলা ট্রেনিং কীভাবে পেরিয়ে গেলো তা বুঝতেই পারিনি। আজ দীর্ঘ ৪৭ বছর পরে আমার এই স্মৃতিচারণ এক নস্টালজিয়াই বটে, জানি না, আঙ্কেল জাহেদুর রহমান বেঁচে আছেন কিনা, তার বড় মেয়ে এলিজা, আমাদেরই ক্লাসমেট ছিল, সে এখন কী করছে? আমার এই লেখাটি যদি বগুড়ার কেউ পড়েন আর ড: জাহেদুর রহমানের পরিবারের খবর জানেন ও চেনেন, তাহলে তাদেরকে আমার প্রাণঢালা শুভেচ্ছা জানাবেন।
haque@berlin.com

সাপ?তাহিক পতিবেদন

বিশ্লেষন
  • ধানম-িতে উদ্বোধন হলো ‘তাগা ম্যান’
  •  মতামত সমূহ
    পিছনে 
     আপনার মতামত লিখুন
    English বাংলা
    নাম:
    ই-মেইল:
    মন্তব্য :

    Please enter the text shown in the image.