[স্মরণ] শেকড় সন্ধানী এক মানসের তিরোধান

Print Friendly and PDF

মীম মিজান

কোনো জাতি উন্নাসিক হতে বাধ্য। যদি সে জাতির ইতিহাস, ঐতিহ্য তথা শেকড় অনাদর, অবজ্ঞা ও সংরক্ষণহীনতার পাথারে ভাসে। তবে সেই জাতিও হতে পারে শিল্প-সাহিত্য ও ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ। এর জন্য প্রয়োজন জাতির শেকড়কে সন্ধান করে প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা। আর আমরা বাঙালি জাতি যে ঋদ্ধ হয়েছি, হচ্ছি, হব তার মূলে যে মহাজনেরা অহর্নিশি কাজ করেছেন তাদের মধ্যে অন্যতম মানবহিতৈষী মানস সদ্য প্রয়াত মুস্তাফা নূরউল ইসলাম। তিনি একাধারে একজন শেকড় সন্ধানী গবেষক, সম্পাদক, ভাষা সৈনিক, অনুবাদক, সংকলক, প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট, শিক্ষাবিদ, সমাজ বিশ্লেষক ও সাংস্কৃতিক কর্মী।
নূরউল ইসলামের জন্ম ১৯২৭ সালের ১ মে, বগুড়ার মহাস্থানগড় সংলগ্ন চিঙ্গাশপুর গ্রামে। তার বাবার নাম সা’দত আলি আখন্দ, তিনি স্বনামখ্যাত লেখক ছিলেন। তার মায়ের নাম রাবেয়া খাতুন। তিনি ছিলেন মা-বাবার জ্যেষ্ঠ সন্তান।
পাঁচ বছর বয়সে ১৯৩২-৩৩ সালে কলকাতায় কবি কাজী নজরুল ইসলামের হাতে তার লেখাপড়ায় হাতেখড়ি। পুলিশ কর্মকর্তা বাবার কর্মস্থল পরিবর্তনের কারণে ঘন ঘন স্কুল বদলাতে হয় তার। শৈশব থেকেই সাহিত্য-সাংস্কৃতিক কর্মকা-ের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল তার।
কলকাতার সুরেন্দ্রনাথ কলেজে গ্রাজুয়েশনের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ পাস করেন মুস্তাফা নূরউল ইসলাম। পরে লন্ডন ইউনিভার্সিটির প্রাচ্যভাষা ও সংস্কৃতি কেন্দ্র  ‘সোয়াস’ থেকে পিএইচডি ডিগ্রি নেন তিনি।
ছাত্রজীবনেই দিনাজপুর-রংপুর অঞ্চলের তেভাগা আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েছিলেন মুস্তাফা নূরউল ইসলাম। বাহান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ বাঙালির প্রায় প্রতিটি আন্দোলনে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। ১৯৭১ সালে লন্ডনে পিএইচডি করার সময় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তিনি।
মুস্তাফা নূরউল ইসলামের কর্মজীবনের শুরু সাংবাদিকতা দিয়ে, দৈনিক আজাদ পত্রিকায় প্রতিবেদক হিসেবে। এরপর ১৯৫১ সালে তিনি সহকারী সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন দৈনিক সংবাদে। দুই বছর পর চলে যান শিক্ষকতায় করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ে।
করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের যাত্রা শুরু হয়েছিল অধ্যাপক মুস্তাফা নূরউল ইসলামের হাতে। স্বাধীনতার আগে কয়েক বছর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন অধ্যাপক নূরউল ইসলাম। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিয়ে বাংলা বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন তিনি। তিনি লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়েও খ-কালীন শিক্ষক হিসেবে শিক্ষকতা করেছিলেন।
১৯৭৪ সালে শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক পদে যোগ দেন মুস্তাফা নূরউল ইসলাম। ১৯৭৫ সালে হন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক। তবে সামরিক সরকারের সঙ্গে মতভিন্নতার কারণে বাংলা একাডেমির চাকরি ছেড়ে জাহাঙ্গীরনগরে ফিরে যান। ১৯৯২ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি থেকে অবসর নেয়ার আগে-পরে জাতীয় জাদুঘর পরিচালনা পর্ষদের তিন মেয়াদের চেয়ারম্যান, নজরুল ইনস্টিটিউটের ট্রাস্টি বোর্ডের তিন মেয়াদের সদস্যসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন তিনি।
টেলিভিশনে উপস্থাপনার জন্যও অনেকের পরিচিত মুখ ছিলেন মুস্তাফা নূরউল ইসলাম। বিটিভিতে ‘মুক্তধারা’ অনুষ্ঠানটি একাধারে ১৫ বছর উপস্থাপনা করেন তিনি। ২০১১ সালে তিনি দেশের একবিংশতম জাতীয় অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন। মুস্তাফা নূরউল ইসলামের দুই ছেলে ও দুই মেয়ে রয়েছে। তার মেয়ে আতিয়া ইয়াসমিন ও নন্দিতা ইয়াসমিন এবং ছোট ছেলে রাজন দেশের বাইরে আছেন।
৩০টির বেশি প্রবন্ধ সংকলন ও গবেষণা গ্রন্থ রয়েছে অধ্যাপক মুস্তাফা নূরউল ইসলামের। তার সৃজনশীল মননের সেই গ্রন্থগুলোর মধ্যে নজরুল ইসলাম (১৯৬৯);
ইবহমধষবব গঁংষরস চঁনষরপ ঙঢ়রহরড়হ (১৯৭৩);
সাময়িকপত্রে জীবন ও জনমত (১৯৭৭);
সমকালে নজরুল ইসলাম (১৯৮৩); আমাদের মাতৃভাষা চেতনা ও ভাষা আন্দোলন (১৯৮৪);
বাংলাদেশ : বাঙালী আত্মপরিচয়ের সন্ধানে (১৯৯০);
আবহমান বাংলা (১৯৯৩);
আমাদের বাঙালিত্বের চেতনার উদ্বোধন ও বিকাশ (১৯৯৪);
সময়ের মুখ তাহাদের কথা (১৯৯৭);
বাঙালির আত্মপরিচয় (২০০১); শিখা সমগ্র (২০০৩); নির্বাচিত প্রবন্ধ (২০০৪); নিবেদন ইতি পূর্বখ- (২০০৫); উত্তরখ- (২০০৭) ইত্যাদি অন্যতম।
জাতিকে শ্লাঘাময় এক সম্মানদানের জন্য দেশ-বিদেশের অনেক শিল্প-সাহিত্যানুরাগী অধ্যাপক নূরউল ইসলামকে অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত করেছিলেন। সেই সম্মাননা ও পুরস্কারগুলোর মধ্যে নিম্নোক্তগুলো অন্যতম। জাতীয় একুশের পদক (১৯৮১);
বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮২);
ইতিহাস পরিষদ পুরস্কার (১৯৭৯);
বাংলাদেশ লেখিকা সংঘ পুরস্কার (১৯৮৩) ইত্যাদি পুরস্কার।
তিনি প্রকৃতই একজন শেকড় সন্ধানী মানস ছিলেন। উপর্যুক্ত রচনাবলি পাঠে আমরা তার শেকড়ের সন্ধানকে সম্যকভাবে জ্ঞাত হই। এ ছাড়াও তার কতিপয় শেকড় সন্ধানী প্রবন্ধ-নিবন্ধ হচ্ছে:
১. নববর্ষ উদযাপনের বানডাকা আয়োজন;
২. নজরুল আপনকালে, নজরুল কালান্তরে;
৩. শাশ্বত তিনি, অমর তিনি (বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে)।
‘সেরা সুন্দরম্’ নামের প্রবন্ধ সংকলনটিও তার শেকড় সন্ধানী মননের পরিচয়কে স্ফটিক জলের মতোই তুলে ধরে। অধ্যাপক মুস্তাফা নূরউল ইসলাম সম্পাদিত শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি-ঐতিহ্য বিষয়ক ত্রৈমাসিক পত্রিকা ‘সুন্দরম্’ প্রায় দেড় দশক ধরে নিয়মিত প্রকাশিত হয়েছে। পত্রিকাটি ছিল প্রবন্ধ-আলোচনানির্ভর। দেড় দশকে প্রায় হাজারখানেকের কাছাকাছি লেখা ওই পত্রিকাটিতে প্রকাশিত হয়েছিল। প্রকাশিত প্রবন্ধসমূহে দেশকালের প্রেক্ষিতে বিচিত্র ও তাবৎ অনুসন্ধিৎসার ওপর আলোকপাতের প্রয়াস দেখা গেছে। ফলে সমকালের মানসভুবন এই পত্রিকায় চমৎকারভাবে বিধৃত। পত্রিকায় প্রকাশিত প্রভূতসংখ্যক লেখা থেকে প্রাসঙ্গিক বিষয়ভিত্তিক বাছাই করে নেয়া ষোলটি নিবন্ধের সংকলন গ্রন্থ ‘সেরা সুন্দরম্’। এই সংকলনের বলয়-আধারে রয়েছে ভূখ- বাংলাদেশ; জন-জাতি বাঙালি থেকে মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ; এবং রয়েছে নানা শাখায় শিল্পিত সৃজনের স্বর্ণফসল-পরিচিতি।
নূরউল ইসলামের ‘সমকালে নজরুল ইসলাম’ একটি অনন্য গবেষণাগ্রন্থ। ‘সমকালে নজরুল ইসলাম’ নজরুল-গবেষণায় এক বিখ্যাত ও সমাদৃত বই। এর পরিকল্পনায় ছিল একটি মহান উদ্দেশ্য। সে উদ্দেশ্য হচ্ছে সমকালীন প্রেক্ষাপটে নজরুল ইসলামকে আবিষ্কার। সন্দেহ নেই, এটি একটি ডকুমেন্টেশন। বাঙালি মুসলিম সমাজের আত্মপরিচয়ের এক বিরাট অধ্যায় রচনা করেছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। এ কথা আজ বাঙালি জাতির এক সাধারণ স্বীকৃত তথ্য। একদিন এই সংবাদ ছিল অজানা-অস্বীকৃত। বলা চলে, সেই অজানা নজরুল ইসলামের কর্মজীবনের প্রামাণ্যচিত্র এটি। সমকালের দৃষ্টিতে তার বিচিত্র কর্মকা-ের মূল্যায়ন, বাঙালি মুসলিম সমাজে তার গৃহীত-অগৃহীত হওয়ার খতিয়ান, সাহিত্য-সংস্কৃতিতে তার স্বীকৃতি-অস্বীকৃতির দ্বন্দ্ব, প্রগতি-অপ্রগতিশীল সমাজের দোলাচল- এমন বহুতর বিষয়ের বিপুল সমাবেশে সজ্জিত সমকালে নজরুল ইসলাম। নজরুল-চর্চায়, তাই আজও, এটি একটি অমলিন ভাষ্যের দলিল। নজরুল-জীবনকে বুঝতে আরও দীর্ঘকাল আমাদের পথ দেখাবে এ শেকড়ের খোঁজ গ্রন্থ।
তার শেকড় সন্ধানের আরও একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হচ্ছে ‘অমর একুশে প্রবন্ধ’ সংকলনটি। “মুস্তাফা নূরউল ইসলাম, সেলিনা হোসেন, নূরুল ইসলাম ও মোবারক হোসেনের সম্পাদনায় ২০০০ সালে বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত অমর একুশে প্রবন্ধ গ্রন্থটিও স্মরণীয়। এটি একুশের প্রবন্ধের একটি প্রতিনিধিত্বশীল সংকলন। এতে পাঁচ দশকের প্রবন্ধ সংকলিত হয়েছে। অন্তর্ভুক্ত প্রবন্ধগুলোর মধ্যে রয়েছে : মুহম্মদ শহীদুল্লাহর ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’, কাজী মোতাহার হোসেনের ‘একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে কয়েকটি বিক্ষিপ্ত চিন্তা’, জীবনানন্দ দাশের ‘বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ভবিষ্যৎ’, মুহাম্মদ কুদরত-এ-খুদার ‘ওদের স্মরণে’, আবুল ফজলের ‘একুশ মানে মাথা নত না করা’, সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’, আবুল হাশিমের ‘ভাষা-আন্দোলনের স্মৃতি বিজড়িত দিনগুলি’, মুহম্মদ এনামুল হকের ‘পূর্ব-পাকিস্তানের রাষ্ট্র-ভাষার পরিপ্রেক্ষিতে উর্দু ও বাংলা’, সত্যেন সেনের ‘ধন্য একুশে ফেব্রুয়ারি’, আবু জাফর শামসুদ্দীনের ‘একুশে ফেব্রুয়ারি : পুনর্মূল্যায়ন’, অজিত কুমার গুহের ‘ভাষা-আন্দোলনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস’, আবদুল হকের ‘ভাষা-আন্দোলনের পটভূমি,’ মুহম্মদ আবদুল হাইয়ের ‘আমাদের ভাষা ও সাহিত্য’, আহমদ শরীফের ‘ভাষা প্রসঙ্গে বিতর্কের অন্তরালে’, মুনীর চৌধুরীর ‘মাতৃভাষা’, শহীদুল্লা কায়সারের ‘একুশের পর’, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীর ‘ভাষা ও সংস্কৃতি’, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীর ‘ভাষা প্রসঙ্গে ভিন্ন ভাবনা’, আহমদ রফিকের ‘স্মৃতি একুশ : বর্তমানের আলোয়’, বদরুদ্দীন উমরের ‘জাতীয় গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও একুশে ফেব্রুয়ারি’, আলাউদ্দিন আল আজাদের ‘ভাষা আন্দোলন অর্ধশতাব্দী পরেও’, রফিকুল ইসলামের ‘শহীদ মিনারের ইতিহাস’, আনিসুজ্জামানের ‘একুশে ফেব্রুয়ারী ও আমাদের সাংস্কৃতিক চেতনা’, হাসান আজিজুল হকের ‘একুশের আন্দোলন’, আবুল কাসেম ফজলুল হকের ‘একুশে ফেব্রুয়ারি আন্দোলনের মর্মকথা’, সেলিনা হোসেনের ‘সংস্কৃতি ও অমর একুশে’ ইত্যাদি।”
(একুশের সাহিত্য, মাহবুবুল হক, কালি ও কলম।)
নূরউল ইসলাম একজন কর্মনিষ্ঠ শিক্ষাবিদ ছিলেন। গত ৬ মে মাধ্যমিক ফলাফল প্রকাশের পর তিনি অসুস্থ সত্ত্বেও লিখেছিলেন ‘শিক্ষার মানোন্নয়নই হোক মূল লক্ষ্য’ শিরোনামের একটি মতামত কলাম। যা দৈনিক সমকালে প্রকাশ পেয়েছে। সুতরাং অনুমেয় তিনি কত কর্তব্যনিষ্ঠ ও সৃজনী ছিলেন।
গত ৯ মে তিনি আমাদের ছেড়ে চিররীতির প্রয়াণকে বরণ করেছেন। তিনি এ জীবনে যে রকম সম্মানের পাত্র ছিলেন ওই জীবনে হোন সম্মানের পাত্র!
লেখক : এম ফিল গবেষক, ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
meemmizanru@gmail.com

সাপ?তাহিক পতিবেদন

 মতামত সমূহ
পিছনে 
 আপনার মতামত লিখুন
English বাংলা
নাম:
ই-মেইল:
মন্তব্য :

Please enter the text shown in the image.