[বিশ্বকাপ] ফেভারিট যারা

Print Friendly and PDF

দরজায় কড়া নাড়ছে আরো একটি বিশ^কাপ ফুটবল। প্রথমবারের মতো খেলবে ৩২টি দল। প্রত্যেক দলে ২৩ জন ফুটবলার ধরে ৩২ দলে খেলবেন ৭৩৬ ফুটবলার।  রাজধানী মস্কোয় শুরু হয়ে শেষটাও হবে একই শহরে। কোন দল বিশ^কাপ জিতবে এই তর্ক এখন চলছে সমানতালে। ফুটবল বোদ্ধাদের বড় অংশের মত, নতুন কোনো দলের হাতে শিরোপা উঠার সম্ভাবনা নেই। যে দলগুলো এক কিংবা একাধিকবার শিরোপা জিতেছে তাদের হাতেই শোভা পেতে পারে রাশিয়ায় প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত আসরের। সে হিসেবে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন জার্মানি, রানার্সআপ আর্জেন্টিনা, সেমিফাইনালিস্ট ব্রাজিল, স্পেন, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, উরুগুয়ে, ইংল্যান্ড, ইউরোপ চ্যাম্পিয়ন পর্তুগাল থাকবে আলোচনায়। লিখেছেন মোয়াজ্জেম হোসেন রাসেল   

অলটাইম ফেভারিট জার্মানি
ব্রাজিল পাঁচবার বিশ^কাপের শিরোপা জিতলেও সফল দল হিসেবে সবার আগে আসবে জার্মানির নাম। ইউরোপের পাওয়ার হাউজ বলা হয় বর্তমান চ্যাম্পিয়ন দলটিকে। ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পাশাপাশি বর্তমান সময়ের পারফরম্যান্স নিশ্চিত করেই ফেভারিটের তকমাটা দিয়ে দেবে জার্মানিকে। এর বাইরে এবারের আসরটি ইউরোপের মাটিতে অনুষ্ঠিত হওয়ার কারণে আরো বেশি সম্ভাবনা রয়েছে কাপ জেতার। ২০১৪ সালে ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে চতুর্থবারের মতো শিরোপা জিতেছিল তারা। সম্প্রতি লন্ডনভিত্তিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের জরিপ অনুসারে, এবারও শিরোপা জিতবে জার্মানি। জরিপে অংশ নেয়া ১৪৫ জনের মধ্যে ৪৩ জন মত দিয়েছেন জার্মানির পক্ষে। ৩৭ জন মত দিয়েছেন ব্রাজিলের পক্ষে।
এখন  পর্যন্ত ৮ বার ফাইনালে খেলে ৪ বারই শিরোপা জিতেছে। সবচেয়ে বড় কথা চার বছর আগে স্বাগতিক ব্রাজিলকে সেমিফাইনালে ৭-১ গোলের বড় লজ্জাটা দিয়েছে এই জার্মানি।
২০১৪ বিশ্বকাপে জোয়াকিম লোয়ের ক্ষুরধার ফুটবল মস্তিষ্ক জার্মানিকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করে। এবারও সেই একই কোচের অধীনে মাঠে নামবে জার্মানরা। যা তাদের সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা হিসেবেই ধরা হচ্ছে।
যে পাঁচটি কারণে বিশ^কাপ জিততে পারে দলটি সেগুলো হলো, সর্বশেষ বিশ্বকাপের অভিজ্ঞতা, কোচ হিসেবে একজন জোয়াকিম লো, রয়েছে দারুণ কিছু খেলোয়াড়ের সমন্বয়ে দুর্দান্ত স্কোয়াড, পার মার্তেসেকার, ফিলিপ লাম, বাস্তিয়ান শোয়েনস্টাইগার, মিরোসøাভ ক্লোসাদের বিদায়ের পর নতুন প্রজন্মও দারুণ খেলছে, সর্বশেষ রয়েছে জার্মান স্নায়ু। অনেকটা জন্মগতভাবেই বেশ পোক্ত শক্তির তারা। এসব বিষয়ই এগিয়ে রাখবে জার্মানিকে।

নতুন এক ব্রাজিল
একমাত্র দল হিসেবে বিশ^কাপের সবগুলো আসরে অংশ নেয়ার বিরল রেকর্ড রয়েছে ব্রাজিলের। শুধু কি অংশগ্রহণ, শিরোপা জয়ে টেক্কা দিয়েছেন সব দলকে। সর্বোচ্চ পাঁচবার বিশ^কাপের ট্রফি উঁচিয়ে ধরার একমাত্র বিরল কৃতিত্ব রয়েছেন ফুটবল গ্রেট পেলে ও তার শিষ্যদের। টানা দুটি বিশ^কাপ জয়ের রেকর্ডও রয়েছে ব্রাজিলের। এছাড়া ল্যাটিন আমেরিকার একমাত্র দেশ হিসেবে ইউরোপ থেকে শিরোপা জয় করার রেকর্ডও এই দলটির।
বলা যায় কোচ তিতের ছোঁয়ায়ই ক্ল্যাসিক্যাল ফুটবলটা আবারও ফিরে এসেছে। এখন দলের সেরা তারকা ও প্রাণভোমরা নেইমারের পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠাটাই দলের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশার নাম।
ক্যাসেমিরো, মিরান্ডা, মাকুইনহোস, ফার্নাদিনহো, উইলিয়াম, কোতিনহা, জেসুস আর নেইমার মিলিয়ে দুর্দান্ত এক দল ব্রাজিলের। নিজেদের মাটিতে ২০১৪ বিশ^কাপের সেমিফাইনালে জার্মানির বিপক্ষে ৭-১ গোলের লজ্জা এখন অতীত হিসেবেই ধরা হচ্ছে।
যে ৫ কারণে বিশ্বকাপ জিততে পারে ব্রাজিল সেই হিসাবও করা হয়ে গেছে বিশ্লেষকদের। দারুণ কিছু খেলোয়াড়ের সমন্বয়ে দুর্দান্ত স্কোয়াড রয়েছে দলটির। এরপর খেলোয়াড়দের ফর্মের পাশাপাশি রয়েছে খেলার ধরন। স্কোয়াডের খেলোয়াড়দের খেলার অভিজ্ঞতার পাশাপাশি দলে রয়েছে একজন নেইমার। যে কিনা যে কোনো সময় বদলে দিতে পারে ম্যাচের গতিপথ।

মেসিতে শেষ সুযোগ আর্জেন্টিনার
একটা বিশ^কাপের জন্য কত বছরের অপেক্ষায় রয়েছে আর্জেন্টিনা। সারা দুনিয়াতে কোটি কোটি ভক্তদের অপেক্ষার পালা যেন শেষ হচ্ছে না। ২০১৪ সালে ছিল ২৮ বছরের অপেক্ষা। খুব কাছে গিয়েও তা ছোঁয়া হয়নি লিওনেল মেসির দলের।
 হতে পারে রাশিয়াই মেসির শেষ বিশ্বকাপ। তাই হয়তো মেসিও নিজেকে মনে করছেন এবার বিশ্বকাপ জেতা না হলে আর কোনোদিন জেতা হবে না।
যেসব কারণে আর্জেন্টিনা এবারের বিশ^কাপ জিততে পারে সেগুলো হলো, দলে লিওনেল মেসির মতো তারকা খেলোয়াড়ের উপস্থিতি, ফরোয়ার্ড লাইনে হিগুইয়ান, মেসি, দিবালা, আগুয়েরের উপস্থিতি।

রোনালদোতে স্বপ্নবিভোর পর্তুগাল
ইউরোপিয়ান ফুটবলে অনন্য এক নাম ক্রিশ্চিয়ানা রোনালদো। কী ক্লাব কী জাতীয় দল, সবখানেই দারুণ এক নাম এই রোনালদো। ২০১৬ ইউরোতে প্রথমবারের মতো পর্তুগালকে চ্যাম্পিয়ন করিয়ে নিজেকে আলাদা উচ্চতায় বসিয়ে দিয়েছেন রিয়াল মাদ্রিদের এই সুপারস্টার। তার খেলার ওপর ভর করে এগিয়ে যেতে চায় দলটি।
এই দলে খেলোয়াড়রা যেমন অভিজ্ঞ হয়েছেন, তেমনি অনুপ্রেরণা হিসেবে আছে দুই বছর আগের ইউরো জয়। এছাড়া দেশটির সাবেক খেলোয়াড় লুইস ফিগো বিশ^কাপের শিরোপাটা নাকি রোনালদোর হাতেই দেখতে পাচ্ছেন।

সাফল্যের আশায় স্পেন
দায়িত্ব নিয়ে গত দুই বছরে স্পেন দলকে গুছিয়ে নিয়েছেন জুলেন লোগেতেগি। অভিজ্ঞতার সঙ্গে তারুণ্যের মিশেলে ভারসাম্যপূর্ণ স্কোয়াড গড়ে তুলেছেন তিনি। যেখানে যেমন আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা, সার্জিও রামোস, জেরার্ড পিকেদের মতো অভিজ্ঞরা আছেন, তেমনি আছেন ইসকো, মার্কোস আসেনসিওদের মতো উঠতি তারকারা। রাশিয়ার আসর শেষেই আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানাবেন ইনিয়েস্তা। ইতোমধ্যে আশৈশবের ক্লাব বার্সেলোনা অধ্যায়ের ইতি টেনে দিয়েছেন এই মিডফিল্ডার। পিকেও জানিয়েছেন, ২০১৮ বিশ্বকাপের পর আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর নেবেন তিনি। সে হিসেবে সোনালি প্রজন্মের একটা অংশের বিদায় নেয়ার আগে বিশ^কাপটাও জিততে চায় তারা।
এখন যেসব কারণে বিশ্বকাপ জিততে পারে স্পেন তা হলো দ্বিতীয় সোনালি প্রজন্মের পর দলে রয়েছেন একজন আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা। অসাধারণ মিডফিল্ডার রচেন আছেন দলটিতে। চাপ সামলানোর যে অভিজ্ঞতা রয়েছে দলটির সেটি হতে পারে অনুপ্রেরণা। সর্বশেষ ইউরোপের মাটিতে বিশ^কাপ বলে একটু বেশি আশা করছেন স্প্যানিশরা।

সুযোগ দেখছে ফ্রান্স
ইউরোপিয়ান ফুটবলে এখন সবচেয়ে বেশি তারকা ফুটবলার সরবরাহ করছে সম্ভবত ফ্রান্স। যে কারণে বলা হয়ে থাকে, ফ্রান্স দলে বেঞ্চে যারা বসে থাকেন, তাদের একাদশও অন্য অনেক দেশের সেরা একাদশের চেয়ে ভালো। ফরাসি দলে খেলোয়াড়দের তালিকায় চোখ রাখলে এই কথাটাই ফুটে ওঠে। কিন্তু এত ভালো স্কোয়াড নিয়েও সাফল্য নেই। মাঝের দুই বিশ্বকাপে দুর্দান্ত দল নিয়ে গিয়েও কোয়ার্টার ফাইনালের বেশি যেতে পারেনি ফরাসিরা। তাদের ব্যর্থতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হতে পারে ২০১৬ সালের ইউরো। ঘরের মাঠে তারকাসমৃদ্ধ স্কোয়াড নিয়েও ফাইনালে হেরে যায় পর্তুগালের বিপক্ষে। রাশিয়া বিশ্বকাপ তাই দলটির নতুন করে প্রমাণ দেওয়ার মঞ্চ। এবারও দলে আছে একঝাঁক তারকা খেলোয়াড়। ফুটবল বিশ্লেষকদের বিচারে ফরাসিদের ভালো সম্ভাবনা আছে বিশ্বকাপ জেতার। যদিও গত দুই বিশ্বকাপের হিসাব অন্য ইঙ্গিতও দিয়ে রাখছে। কিন্তু খেলাটি ইউরোপে অনুষ্ঠিত হওয়ায় সম্ভাবনার দৌড়ে যে খুব বেশি পিছিয়ে থাকবে না তারা সেটি বলাই যায়।

সুযোগ রয়েছে বেলজিয়ামের
এবারের বিশ^কাপে ডার্কহর্স বলা হচ্ছে ইউরোপের বেলজিয়ামকে । সবাইকে তাক লাগিয়ে দেয়ার সব রসদই নাকি জমা রেখেছে তারা। অনেকটাই ফেভারিটদের হারিয়ে বিশ^কাপ জিততে চায় বেলজিয়াম। এবার বিশ^কাপ জেতার মতো অসাধারণ একটি দল নিয়ে তৈরি হয়েছে ভিনসেন্ট কোম্পানির দলটি। তাদের দারুণ খেলা দুইজন গোলরক্ষক রয়েছেন লিভারপুল ও চেলসিতে। কোম্পানি ও ভারমালিন ও ম্যানিয়রের মতো ডিফেন্ডার রয়েছেন দলটিতে। ব্রুনে, হ্যাজার্ড, লুকাকু, ফেলাইনিরা ইংলিশ লিগ মাতিয়ে বেড়াচ্ছেন। দলটির ৬/৭ জন খেলোয়াড় বিশে^র সেরা সেরা দলে খেলে থাকেন। এই দলটিকে নিয়ে তাই বাজি ধরার মতো মানুষের অভাব হবে না।
 
ভালো করার প্রত্যয়ে উরুগুয়ে
লুইস সুয়ারেজ এবং এডিনসন কাভানির মতো বিশ্ব সেরা স্ট্রাইকাররা আছেন দলে। দক্ষিণ আমেরিকার বাছাইপর্বে শুধু ব্রাজিল ছিল পারফরম্যান্সের দিক থেকে উরুগুয়ের চেয়ে এগিয়ে। দলে থাকা বেশকিছু বিশ্বমানের তারকা নিয়ে এবারের বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ অবস্থানটি অর্জন করতে চায় উরুগুয়ে।
এই নিয়ে তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপগামী উরুগুয়ের কোচের দায়িত্ব পালন করছেন অস্কার তাবারেজ। সব মিলিয়ে চারটি বিশ্বকাপ দলের কোচের দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। গ্রুপ পর্বে প্রথম স্থান অর্জনের জন্য যতটুকু দরকার এর বেশি যোগ্যতা রয়েছে উরুগুয়ের। গ্রুপভুক্ত সৌদি আরব ও মিসরের তুলনায় তারা অনেক বেশি এগিয়ে। স্বাগতিক দর্শকদের স্রোতের বিপরীতে গিয়ে তারা বড়জোর ড্র করতে পারে রাশিয়ার সঙ্গে। চারটি দলের মধ্যে বিশ্বকাপের ঐতিহ্যে এগিয়ে আছে লাতিন আমেরিকার দল উরুগুয়ে। এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপের ১২টি আসরে অংশ নিয়েছে দেশটি।

থ্রি লায়ন্স ইংল্যান্ড আলোচনায়
১৯৬৬ সালে একবারই বিশ^কাপের শিরোপা জেতা সম্ভব হয়েছিল ইংল্যান্ডের। এরপর থেকেই শুধুই অন্যদের ট্রফি উঁচিয়ে ধরা দেখেছে থ্রি লায়ন্সরা। রাশিয়ায় তারা সত্যিকারার্থেই আন্ডারডগ। ঐতিহাসিকভাবেই দলটি সহজেই টুর্নামেন্টে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছে এবং অনুশীলন ম্যাচে তারা জার্মানি, ব্রাজিল, হল্যান্ড ও ইতালির বিপক্ষে জয় পেয়েছে। তবে প্রত্যাশার ভারটা এবার কিছু কম থাকায় ভালো করতে পারে ইংল্যান্ড। গ্রুপ পর্বে এবার লড়তে হবে বেলজিয়াম, তিউনিশিয়া ও প্রথমবার খেলা পানামার বিপক্ষে। শেষ ষোলতে জায়গা করে নেয়াটা খুব বেশি কঠিন হবে না দলটির। তবে নকআউট পর্বে কেমন খেলতে পারে সেটির ওপরই নির্ভর করছে দলটির সাফল্য। সেটি হলে অন্ততঃপক্ষে আন্ডারডগ তকমাটা মুছতে পারবে শরীর থেকে।
mhrashel00@gmail.com

সাপ?তাহিক পতিবেদন

খেলা
  • ধানম-িতে উদ্বোধন হলো ‘তাগা ম্যান’
  •  মতামত সমূহ
    পিছনে 
     আপনার মতামত লিখুন
    English বাংলা
    নাম:
    ই-মেইল:
    মন্তব্য :

    Please enter the text shown in the image.