[সাফল্য] রন্ধনবিদ কাজী নাহিদ সুলতানা : এগিয়ে চলার গল্প

Print Friendly and PDF

সুইটি আক্তার

সম্ভাবনার স্বপ্ন দেখেন সবাই। কিন্তু সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেয়া খুব একটা সহজ কাজ নয়। একমাত্র পরিশ্রম, মেধা আর প্রচেষ্টাই পারে একজন মানুষকে তার স্বপ্নের চেয়েও বড় কিছু করতে। সেই স্বপ্ন ছোঁয়ার একজন নারী কাজী নাহিদ সুলতানা। ১৯৮৪ সালে ২৮ নভেম্বর ময়মনসিংহ জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। বাবা কাজী মিজানুর রহমান। পেশায় একজন সৈনিক। দুই ভাই এবং এক বোনের মধ্যে কাজী নাহিদ সুলতানা মেঝো। ২০১২ সালে বাড্ডা মহানগর কলেজ থেকে লেখাপড়ার পার্ট শেষ করেন। এরই মাঝে ২০০০ সালে কাজী জাহাঙ্গীর হোসেনের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তিনি পেশায় একজন সফল ব্যবসায়ী। কাজী নাহিদ সুলতানা বলেন, ‘আমরা সবসময় শুনে এসেছি একজন পুরুষের সফলতার পেছনে নারীর যথেষ্ট অবদান অবদান থাকে। কিন্তু আমার সফলতার পেছনে সবচেয়ে বেশি অবদান হচ্ছে আমার স্বামীর। তার অনুপ্রেরণা না পেলে আজ আমি আমার স্বপ্নের এই জায়গায় আসতে পারতাম না। ছোটবেলা থেকেই রান্না নিয়ে ছিল আমার নানান স্বপ্ন। মার কাছে রান্নার হাতেখড়ি হলেও আমি আমার শাশুড়ি মায়ের কাছ থেকে শিখেছি বাহারি সব রান্না। রান্নার সব খুঁটিনাটি কৌশল শিখিয়েছেন তিনি। আজ আমি বাহারি যেসব রান্না করছি তার পেছনে আমার শাশুড়ি মার সবচেয়ে বড় অবদান রয়েছে। রান্না শেখার পাশাপাশি নিজেকে নানানভাবে মেলে ধরতে চেয়েছি। তাছাড়া রান্না প্রশিক্ষণের পাশাপাশি নানা রকম হাতের কাজের প্রশিক্ষণ নিয়েছি যা কি না আমাকে করেছে আরও সমৃদ্ধ। ২০১৩ সালে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন থেকে রান্না প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছিলাম। এরপর হোটেল সিক্স সিজেন-এ ৬ মাস ইন্টারনি করেছি। ২০১৪ সালে আমার রান্নার রেসিপি প্রথম প্রকাশ পায় চ্যানেল আই ‘সাপ্তাহিক’ ম্যাগানিজ পত্রিকায়। আমার এগিয়ে যাওয়ার প্রথম ধাপ ছিল এটাই। ২০১৫ সালে প্রথম বাংলাদেশ মনিটর আয়োজিত সেরা রন্ধনশিল্পী প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেছিলাম। তখন অনেক রন্ধনশিল্পীর মধ্যে বাছাই করার পর চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে চতুর্থ স্থান লাভ করি। ভেবেছিলাম প্রথম স্থান দখল করবো। কিন্তু স্বপ্ন তখন বাস্তবে রূপ নেয়নি। একটা সময় মন খারাপ হয়ে যায়। মনে হচ্ছিল এগিয়ে যাওয়ার পথটা অনেক কঠিন। তখন আমার স্বামী কাজী জাহাঙ্গীর হোসেন এবং আমার শাশুড়িমার অনুপ্রেরণায় আমি পুনরায় সেরা রন্ধনশিল্পী প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করি। ২০১৬ সালেও আমি আবারও চতুর্থ স্থান অর্জন করেছিলাম এবং সিদ্দিকা কবীর ট্রফি পেয়েছিলাম। ২০১৫ সাল থেকে আমাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ২০১৬ সালে কুকিং ফাউন্ডেশন পিঠা চ্যাম্পিয়ন হিসেবে খেতাব অর্জন করি। আমার তৈরি করা রেসিপি বিভিন্ন পত্রিকা এবং ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়। আমার নিয়মিত রেসিপি সাপ্তাহিক, স্পুন, আমাদের সময়, সাতকাহন, আনন্দভুবন ইত্যাদি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।’
কাজী নাহিদ সুলতানা আরও বলেন, বিভিন্ন রিয়েলিটি শোতে অংশগ্রহণ করেছি। এতে করে আমার অর্জনের জায়গাটা আরও প্রসারিত হয়েছে। বিভিন্ন ইভেন্ট-এ জয়েন করে রান্নার প্রশিক্ষণ দিয়েছি। ২০১৭ সালে ইগলু ও আকিজ এবং ওয়ালপুরের সঙ্গে বিভিন্ন ইভেন্টে গিয়ে জেলায় জেলায় ডেজার্ট তৈরির প্রশিক্ষণ দিয়েছি। বর্তমানে আমি উইমেন কুলিনারী অ্যাসোসিয়েশন অফ বাংলাদেশ এর সঙ্গে যুক্ত আছি। তাছাড়া ২০১৩ সালে মিরপুর ইব্রাহিমপুরে একটি কুকিং স্কুল প্রতিষ্ঠা করি। আমি মনে করি, নারীরা ঘরে বসে না থেকে সংসার সামলানোর পাশাপাশি বাহারি রান্না ও হাতে কাজ শিখতে পারে। এতে করে নারীদের আগ্রহ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে প্রমাণ করার সুবিধা পাবে। আমার কুকিং স্কুলে ২০-২২টি কোর্স আছে যেখানে সপ্তাহব্যাপী টিচিং দেয়া হয়। প্রায় ৮০ জন মহিলাকে আমরা ট্রেনিং দিয়ে থাকি। আমার কুকিং স্কুলটা হচ্ছে আমার একটি স্বপ্ন। আর এই স্বপ্নের নাম হলো ‘সাতরং কুকিং অ্যান্ড হ্যান্ডি ক্রাফট’।
তিনি আরও বলেন, আমি ২০১৭ সালে পুনরায় একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের আয়োজনে অনুষ্ঠিত সেরা রন্ধনশিল্পী প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করি। আমার বিশ্বাস ছিল আমি কিছু একটা করে নিজেকে প্রমাণ এবং প্রতিষ্ঠা করতে পারবো। তাই ঢাকা বিভাগ থেকে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করি। আমার ভেতরে একটি প্রত্যয় ছিল এবার আমি সেরা রন্ধনশিল্পীর খেতাব অর্জন করব। তাই অনেক যাচাই-বাছাই পর্ব শেষ করে সেরা পাঁচ জনের মধ্যে নিজেকে টিকিয়ে রেখেছিলাম। আমাকে আমার পরিবার থেকে অনুপ্রেরণা দেয়া হয়। পরিবারের সকলের স্বপ্ন পূরণ আমাকে করতে হবে। ২০১৭ সাল ৮ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয় সেরা রন্ধনশিল্পীর গ্রান্ড ফিনালে। পাঁচ তারা হোটেল সোনারগাঁওয়ে এটি আয়োজন করা হয়। মঞ্চে যখন সেরা পাঁচ জন উপস্থিত আর এই পাঁচজনের মাঝে আমি ছিলাম। তখন আমি ভেতর থেকে অনেক নার্ভাস ছিলাম। আসলে ওই সময়ের অনুভূতিটা প্রকাশ করার মতো না। একে একে করে যখন প্রথম রানার্স আপ এবং দ্বিতীয় রানার্স আপ নাম ঘোষিত হয় তখন ভেতর থেকে শুধু আল্লাহকে স্মরণ করেছি। সবশেষে যখন সেরা রন্ধনশিল্পী হিসেবে আমার নামটি ঘোষণা করল। অবশেষে আমি আমার স্বপ্নের চূড়ায় পৌঁছে গিয়েছি। সেরা রন্ধনশিল্পীর খেতাব অর্জন করেছি। আমার এই সেরা খেতাব অর্জনের পেছনে আমার পরিবারের অবদান ছিল সবচেয়ে বেশি। আমি যতটা না আশা করেছিলাম তার চেয়েও বেশি আমার পরিবার আমার পাশে থেকেছে। তাদের অনুপ্রেরণার জন্যেই আজ আমি সেরা রন্ধনশিল্পী হতে পেরেছি।
কাজী নাহিদ সুলতানা বলেন, আল্লাহর অশেষ মেহেরবানীতে আমি আমার স্বপ্নগুলো পূরণ করার চেষ্টা করছি। আমার আর একটা স্বপ্ন একটি রেস্টুরেন্ট এবং আমার কুকিং স্কুলটি বড় পরিসরে প্রতিষ্ঠা করা। সবার কাছ থেকে দোয়া কামনা করছি। একজন নারীর সফলতার পেছনে তার পরিবারের অবদান থাকে অনেক বেশি, যা কি না ওই নারীকে তার স্বপ্নের চূড়ায় পৌঁছাতে সাহায্য করে।

সাপ?তাহিক পতিবেদন

দেশজুড়ে
 মতামত সমূহ
পিছনে 
 আপনার মতামত লিখুন
English বাংলা
নাম:
ই-মেইল:
মন্তব্য :

Please enter the text shown in the image.