[মতামত] উচ্চ প্রবৃদ্ধির বড় বাজেট

Print Friendly and PDF

রাজু আলীম

উন্নত ও উচ্চ প্রবৃদ্ধির দেশ গড়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করে আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট জাতীয় সংসদে উত্থাপন করেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের এই মেয়াদে শেষ এবং আগামী নির্বাচনের আগের বাজেট। সরকারের এক দশকের নানা উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ও বর্তমান  সরকারের হাতে নেয়া বিভিন্ন মেগা প্রকল্প  বাস্তবায়নে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে প্রস্তাবিত বাজেট। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী বাড়ানো, কর্পোরেট কর হ্রাস, স্থানীয় শিল্পে প্রণোদনা এবং ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে  সমৃদ্ধিশালী উন্নত দেশ হিসেবে গড়ার অঙ্গীকার রয়েছে এ বাজেটে। গরিব ও হত দরিদ্র ১১ লাখ মানুষকে সোশ্যাল সেফটি নেট এর আওতায় আনার উদ্যোগে পিছিয়ে পড়া জনসাধারণকে এগিয়ে নিতে বিশেষ সুবিধা থাকছে বাজেটে। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত জাতীয় সংসদে প্রস্তাবিত বাজেট পেশ করার  আগে তা মন্ত্রিপরিষদের এক সংক্ষিপ্ত বৈঠকে  অনুমোদন দেয়া হয়। বাজেটে বিরাট অঙ্কের বিনিয়োগ লক্ষ্য নিয়ে বিশাল ব্যয়ের টার্গেট করা হয়েছে যে কারণে বেড়েছে বাজেটের আকার। আর বাজেট বাস্তবায়নে গুরুত্ব দিয়ে জুলাই মাস শুরুর দিন থেকে টাকা ব্যবহারের সুবিধা পাওয়া যাবে বলে জানান অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেছেন, বাজেট বাস্তবায়ন নিয়ে আমাদের ভাবনা আছে। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছি। প্রস্তাবিত বাজেট বাস্তবায়ন হলে ৭ দশমিক ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হবে বলে প্রত্যাশা করা হয়েছে। বিগত সময়ের মতো প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রাখতে মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্যে শিক্ষা, স্বাস্থ্য খাতে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। আগামী বছরের জন্য বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে বরাদ্দ ধরা হয়েছে ১ লাখ ৭৩ হাজার কোটি টাকা। এর বাইরে স্বায়ত্তশাসিত সংস্থাগুলোর জন্য ৭ হাজার ৮৬৯ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। যা ধরলে এডিপির আকার বেড়ে ১ লাখ ৮০ হাজার ৮৬৯ কোটি টাকায় দাঁড়াবে। মোট ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রাক্কলন করে নতুন বাজেটে বাড়ানো হয়েছে রাজস্ব আদায়ের টার্গেট।
ব্যক্তি শ্রেণির আয়করের সর্বনিম্ন সীমা আড়াই লাখ টাকায় অপরিবর্তিত রেখে কমানো হয়েছে কর্পোরেট কর। তবে ভ্যাটের স্তর কমিয়ে আনায় যারা কম হারে ভ্যাট দিতেন, তাদের কিছুটা বাড়তি ভ্যাট দিতে হবে। পাশাপাশি আয় বাড়ানোর জন্য বেশকিছু খাতে সম্পূরক শুল্ক বাড়ানো হয়েছে। তবে রাজস্ব আদায় বাড়াতে কর হারে পরিবর্তন করা হলেও আদায়ের চ্যালেঞ্জ কিন্তু থাকছেই। নির্বাচনের বছর হওয়ায় এদিকে খুব বেশি চাপ দেয়া যাবে না আবার চলতি বছরে আয় মুনাফার ওপর কর ও মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট খাতে অর্জন আশানুরূপ ছিল না। ফলে বছরের শেষে লক্ষ্যমাত্রায় সংশোধনী আনা হয়। এ অবস্থায় আগামী বছর রাজস্ব আদায় বাড়ানো অনেকটা অনিশ্চয়তায় রয়ে যাচ্ছে। যদিও কর আদায়ে কঠোর পদক্ষেপের ঘোষণা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। কর আইনের বিভিন্ন বিধান পরিপালনের ব্যর্থতায় জরিমানা বাড়ানো হয়েছে যা সাধারণ করদাতাকে হয়রানির মুখে ফেলতে পারে। বহুল আলোচিত ভ্যাটের হার এবারে ৫টি স্তরে বাস্তবায়নের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। অগ্রিম ট্রেড ভ্যাট বা এটিভি ৪ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫ শতাংশ করায় আমদানিনির্ভর পণ্যের দাম বাড়বে। যেখানে খাদ্যপণ্য মূল্যস্ফীতিও ঊর্ধ্বমুখী, সেখানে আগামী বছর মূল্যস্ফীতির লাগাম টানা কঠিন হতে পারে।  ই-কমার্সে ভ্যাট আরোপ করায় এ খাত নিরুৎসাহিত হবে বলে অনেকেই মনে করছেন। সাধারণত ভ্যাট না দিয়ে কোনো পণ্য বিক্রি হয় না। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার এই সময়ে ই-কমার্স জনপ্রিয় হয় এবং তরুণরা এ ব্যবসায় ঝুঁকছে। এদিকে, কিছু খাতে প্রণোদনাও রয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে সেলুলার ফোন উৎপাদনে কাঁচামালের শুল্ক হ্রাস করা হয়েছে। দেশে তৈরি হয় না এমন সফটওয়্যার যেমন ডাটাবেজ, প্রোডাক্টিভিটি সফটওয়্যার আমদানিতে শুল্ক কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে।
বাইসাইকেল, লিফস্প্রিং, টায়ার টিউব উৎপাদন, মোটরসাইকেল উৎপাদনে সুবিধা দেয়া হয়েছে। শুল্ক হ্রাস করা হয়েছে হাইব্রিড গাড়ির। ঢাকার যানজট কমাতে বিনাশুল্কে স্কুল বাস আমদানির সুযোগ ঘোষণা করা হয়েছে। ওষুধ, চামড়া, টেক্সটাইল, লৌহ ও ইস্পাত, গুঁড়া দুধ, রেফ্রিজারেটর ও কম্প্রেসার, মুদ্রণ শিল্পসহ কয়েকটি খাতে সুবিধা দিয়ে রপ্তানি আয়ে উৎস কর বাড়িয়ে ১ শতাংশ করা হয়েছে। যা শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ ছিল। নিটওয়্যার ও ওভেন গার্মেন্টস খাতের রফতানি আয়ের ওপর প্রযোজ্য কর ১৫ শতাংশ প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হলে সেটা সাড়ে ১২ শতাংশ প্রযোজ্য হবে।  মোট ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রাক্কলন করা হয়েছে যা জিডিপির ১৮ দশমিক ৩ শতাংশ। এডিপি বরাদ্দ স্বায়ত্তশাসিত সংস্থাসহ ১ লাখ ৮০ হাজার ৮৬৯ কোটি টাকা। অনুন্নয়ন খাতে রাখা হয়েছে ২ লাখ ৯১ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা যা জিডিপির সাড়ে ১১ শতাংশ। এই ব্যয় নিশ্চিত করতে আয়ের টার্গেট করা হয়েছে ৩ লাখ ৩৯ হাজার ২৮০ কোটি টাকা। যা জিডিপির ১৩ দশমিক ৪ শতাংশ। এরমধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বা এনবিআরের মাধ্যমে কর রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ২ লাখ ৯৬ হাজার ২০১ কোটি টাকা। এনবিআরবহির্ভূত উৎস থেকে রাজস্ব পাওয়া যাবে ৯ হাজার ৭২৭ কোটি টাকা। অন্যদিকে, করবহির্ভূত খাত থেকে পাওয়া যাবে ৩৩ হাজার ৩৫২ কোটি টাকা। বাকিটা থাকবে ঘাটতি।
প্রস্তাবিত বাজেটে সামগ্রিক ঘাটতি দাঁড়াচ্ছে ১ লাখ ২৫ হাজার ২৯৩ কোটি টাকা। যা জিডিপির ৪ দশমিক ৯ শতাংশ। এই ঘাটতি পূরণে বৈদেশিক উৎস থেকে ঋণসহায়তা বাবদ প্রাপ্তি ধরা হয়েছে ৬০ হাজার ৫৮৫ কোটি টাকা। অভ্যন্তরীণ ঋণ ব্যাংকসহ প্রাপ্তির লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৭১ লাখ ২২৬ কোটি টাকা। অনুদান বাবদ প্রাক্কলন রয়েছে ৪ হাজার ৫১ কোটি টাকার।
আগামী অর্থবছরে আয়কর ও অন্যান্য খাত থেকে প্রত্যক্ষ কর বাবদ ১ লাখ ২ হাজার ২০১ কোটি টাকা এবং আমদানি ও রপ্তানি শুল্ক বাবদ ৩২ হাজার ৫৮৯ কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য স্থির করা হয়েছে। ভ্যাট খাতে ১ লাখ ১০ হাজার ৫৪৩ কোটি টাকা এবং সম্পূরক শুল্ক খাতে ৪৮ হাজার ৭৬৬ কোটি টাকা আয় হবে। আবগারি শুল্ক বাবদ ২ হাজার ৯১ কোটি এবং টার্নওভার ট্যাক্স খাত ১১ কোটি টাকা আয়ের প্রাক্কলন করা হয়েছে।
চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরের জন্য সংশোধিত বাজেটও জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হয়। ঘোষিত মোট ব্যয় ৪ লাখ ২৬৬ কোটি টাকা থেকে ২৮ হাজার ৭৭১ কোটি টাকা কমিয়ে ৩ লাখ ৭১ হাজার ৪৯৫ কোটি টাকা করা হয়েছে। এডিপির আকার ১ লাখ ৫৩ হাজার ৩৩১ কোটি টাকা থেকে কমিয়ে ১ লাখ ৪৮ হাজার ৩৮১ কোটি টাকা করা হয়েছে। রাজস্ব আয় ২ লাখ ৮৭ হাজার ৯৯০ কোটি টাকার বদলে ২ লাখ ৫৯ হাজার ৪৫৪ কোটি টাকা করা হয়েছে।
সংশোধিত বাজেটে ঘাটতি নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ১২ হাজার ৪১ কোটি টাকা যা মূল বাজেটে ছিল ১ লাখ ১২ হাজার ২৭৫ কোটি টাকা। ঘাটতির বিপরীতে বৈদেশিক উৎস হতে অর্থায়নের প্রাক্কলন ছিল ৫১ হাজার ৯২৪ কোটি টাকা যা সংশোধিত বাজেটে ৪৬ হাজার ২৪ কোটি টাকা করা হয়।
২০১৮-১৯ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ১০টি খাতকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এরমধ্যে শীর্ষে রয়েছে পরিবহন খাত। এ বছরের শেষ দিকে অনুষ্ঠিত হবে একাদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচন। নির্বাচনকে সামনে রেখেই পরিবহন খাতকে গুরুত্ব দিয়ে বাজেট তৈরি করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এ খাতে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ৪৫ হাজার ৪৪৯ কোটি ৮৭ লাখ টাকা, যা মোট এডিপির ২৬ দশমিক ২৭ শতাংশ। গত ১০ মে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের এনইসি সভায় আগামী অর্থবছরের জন্য ১৭টি খাতের মধ্যে সর্বোচ্চ বরাদ্দ পাওয়া ১০টি খাতের প্রথমটি হচ্ছে পরিবহন খাত। এ খাতে বরাদ্দ ৪৫ হাজার ৪৪৯ কোটি ৮৭ লাখ টাকা, যা মোট এডিপির ২৬ দশমিক ২৭ শতাংশ। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে বিদ্যুৎ খাতে। এর পরিমাণ ২২ হাজার ৯৩০ কোটি ২০ লাখ টাকা, যা মোট এডিপির ১৩ দশমিক ২৫ শতাংশ। তৃতীয় সর্বোচ্চ বরাদ্দ ভৌত-পরিকল্পনা পানি সরবরাহ ও গৃহায়ন খাত। এ খাতে বরাদ্দ পাওয়া গেছে ১৭ হাজার ৮৮৯ কোটি ৯৫ লাখ টাকা, যা মোট এডিপির ১০ দশমিক ৩৪ শতাংশ। এছাড়া, গ্রামীণ অর্থনীতিতে গতিশীলতা আনতে এবং অধিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে চতুর্থ সর্বোচ্চ বরাদ্দ রয়েছে পল্লী উন্নয়ন ও পল্লী প্রতিষ্ঠান খাতে ১৬ হাজার ৬৯০ কোটি ৩০ লাখ টাকা, যা ৯ দশমিক ৬৫ শতাংশ। শিক্ষার প্রসার ও গুণগতমান বৃদ্ধির লক্ষ্যে শিক্ষা ও ধর্ম খাতে পঞ্চম সর্বোচ্চ বরাদ্দ ১৬ হাজার ৬২০ কোটি ৩৩ লাখ  টাকা, যা মোট এডিবির ৯ দশমিক ৬১ শতাংশ। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণসহ তথ্যপ্রযুক্তির প্রসারে বিজ্ঞান, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতে বরাদ্দ ১৪ হাজার ২১০ কোটি ৭৩ লাখ টাকা, যা এডিবির ৮ দশমিক ২১ শতাংশ। স্বাস্থ্য সেবার মান উন্নয়নের লক্ষ্যে স্বাস্থ্য পুষ্টিজনসংখ্যা ও পরিবার কল্যাণ খাতে বরাদ্দ ১১ হাজার ৯০৫ কোটি টাকা, যা এডিপির ৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ। খাদ্যে স্বয়ম্ভরতা অর্জনের লক্ষ্যে কৃষি খাতে বরাদ্দ ৭ হাজার ৭৬ কোটি ২২ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে, যা ৪ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ। নদী ভাঙন রোধ ও নদী ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে পানিসম্পদ সেক্টরে বরাদ্দ ৪ হাজার ৫৯২ কোটি ৭৮ লাখ টাকা, যা এডিপির ২ দশমিক ৬৫ শতাংশ। মানবসম্পদ উন্নয়নসহ দক্ষতা বৃদ্ধিতে গতিশীলতা আনতে জনপ্রশাসন খাতে বরাদ্দ ৩ হাজার ৩৬১ কোটি টাকা, যা মোট এডিপির ১ দশমিক ৯৪ শতাংশ। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এম এ মান্নান জানান, জনগণের কল্যাণের কথা বিবেচনা করেই খাতভিত্তিক তালিকা করেছে সরকার। নির্বাচনের বছর বলে জনপ্রতিনিধিরা রাস্তাঘাট ও অবকাঠামো নির্মাণের দিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। তাই এ বছর পরিবহন খাতকে গুরুত্ব দিয়ে বাজেট তৈরি করা হয়েছে।
সংসদে প্রস্তাবিত বাজেট বিভিন্ন দিক নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই। এছাড়া বাজেটে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ দুই শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জিং হবে বলে মন্তব্য করেছে ঢাকা চেম্বার অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ- ডিসিসিআই। নির্বাচন সহায়ক বাজেট প্রস্তাব করা হলেও আয়, ব্যয় ও রাজস্ব কাঠামোয় পুরনো ধারাবাহিকতার পাশাপাশি কিছু নেতিবাচক দিক রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ, সিপিডি। প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে আলাদা সংবাদ সম্মেলনে এ প্রতিক্রিয়া জানানো হয়।
এফবিসিসিআই’র সভাপতি শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন বলেন, ‘এখানে কিছু বিষয় আছে, যেগুলো আমাদের ব্যবসায়িক পরিবেশকে অনুপ্রাণিত করবে। এখানে অনেক চ্যালেঞ্জে আছে যেগুলো বিজনেসকে আরো চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিবে। সে জন্য মিশ্র প্রতিক্রিয়া আমরা জানাচ্ছি।’
ডিসিসিআই এর সভাপতি আবুল কাশেম খান বলেন, ‘বেসরকারি ২ শতাংশের যে টার্গেট সরকার দিয়েছিল বৃদ্ধি করবে, আগামী এক বছরের মধ্যে সেটা আমাদের কাছে খুব চ্যালেঞ্জিং মনে হচ্ছে। কারণ ৩% যদি বৃদ্ধি করেন তাহলে ২৪ থেকে ২৫ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ দরকার হবে।’
সিপিডি’র ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘আবাসন কেনার ক্ষেত্রে একটা বড় চাপ সৃষ্টি করা হলো। আর যারা সচ্ছল মধ্যবিত্ত, উচ্চ মধ্যবিত্ত আছে তাদের জন্য আবার ফ্ল্যাট কেনার ক্ষেত্রে ছাড় দিলাম। এটা আমাদের কাছে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির ক্ষেত্রে, বাংলাদেশে বাসস্থান নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একধরনের বৈপরীত্য বলে মনে করি।’
এমন একটি বাজেটকে বাস্তবায়নের জন্য যে ধরনের কর্মপরিকল্পনা লাগে, বাড়তি কর আদায় করার জন্য, ব্যয়কে বৃদ্ধি করার জন্য, ঘাটতি পূরণের ক্ষেত্রে বিভিন্ন আর্থিক ব্যবস্থাপনা সংস্কারের ক্ষেত্রে কী ব্যবস্থা, কোনো ধরনের যদি নির্বাচনকে সামনে রেখে বিশেষ কী চিন্তা এ বিষয়গুলো ক্ষেত্রে আমরা বড় ধরনের অভাব দেখছি।’
অর্থনীতি বিশ্লেষক মামুন রশীদ বলেন, ‘নির্বাচনের বছর হওয়ায় এবারের বাজেটে স্বভাবতই কিছু সীমাবদ্ধতা থাকবে। তার পরও আমরা ইতিবাচক অনেক দিক দেখতে পাচ্ছি। বাজেটে আধুনিকতা, সুন্দর ব্যবস্থাপনা ও সমন্বয়ের ছাপ স্পষ্ট। বিশেষ করে নতুন ভ্যাট আইন কার্যকর না হলেও এনবিআর অনলাইন ও অন্যান্য চেষ্টার মাধ্যমে রাজস্ব আদায়ের সম্ভাবনা দেখাচ্ছে। আমরা দেখতে পাচ্ছি এবারও রাজস্বের বড় উৎস ভ্যাট। এ ছাড়া নন রেসিডেন্ট  কোম্পানিগুলো ট্যাক্সের আওতায় আসছে এটি একটি ভালো দিক। যেমন ফেসবুক, গুগলসহ এ জাতীয় কোম্পানিগুলো করের আওতায় আসছে। উবার, পাঠাওর মতো রাইড শেয়ার  কোম্পানিগুলোও করের আওতায় আসছে। তাদের চালকদের টিন নম্বর সংগ্রহ করতে হবে। আরেকটি ইতিবাচক দিক হচ্ছে বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো বড় প্রকল্পে বিনিয়োগ করলে তাদের বারবার কর দিতে হবে না। এতে এ প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগ বাড়বে ও দেশে কর্মসংস্থান হবে। তবে যে বিষয়টি আমাদের পীড়া দিয়েছে তা হচ্ছে করপোরেট কর কমানোর কথা ছিল, তা কমানো হয়নি। এখানে সুবিধা দেয়া হয়েছে ব্যাংক ও আর্থিক খাতকে। সরকার তাদের দেখাশোনা করতে গিয়ে নানাভাবে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সার্বিকভাবে করপোরেট কর না কমিয়ে শুধু ব্যাংক ও আর্থিক খাতের কর কমানো নৈতিকভাবে সমর্থনযোগ্য নয়।’
তৈরি পোশাক খাতে অর্থমন্ত্রীর প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মধ্যে একটি ব্যবধান রয়েছে বলে মনে করেন তৈরি পোশাক খাতের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমএই সভাপতি মো. সিদ্দিকুর রহমান। তিনি বলেন, এর ফলে আমাদের মনে হয়েছে কোথাও কোনো ভুলভ্রান্তি হয়েছে। আমাদের আশা আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে এসব সমাধান করা হবে। তিনি বলেন, ‘করপোরেট কর এবং গ্রিন ট্যাক্স বাড়ানো হয়েছে। অথচ অর্থমন্ত্রী তার বক্তব্যে বলেন, কর্মসংস্থানে পোশাক খাতের অবদানের কথা বিবেচনায় নিয়ে এ খাতের বিশেষ সুবিধা দেয়া হয়েছে। প্রকৃত অর্থে ওই সব সুবিধা আরও বাড়ানো হয়েছে। এর আগের তৈরি পোশাক খাতে উৎপাদন ও রপ্তানিতে নিয়োজিত করদাতাদের করহার ছিল ১২ শতাংশ। এটা বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ এবং পাবলিক লিমিটেড কোম্পানির ক্ষেত্রে ১২ থেকে ১২.৫ শতাংশ এবং গ্রিন সনদ আছে এমন সবুজ কারখানাকে ১০ থেকে ১২ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।’
চট্টগ্রাম চেম্বার অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মাহবুবুল আলম  বলেন- ‘জনপ্রশাসনের পরে শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে, যা দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নে কাক্সিক্ষত অগ্রগতি অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। গৃহনির্মাণে ঋণ প্রদানসহ সামাজিক সুরক্ষা খাতের আওতা সম্প্রসারণ করা হয়েছে। নারী উদ্যোক্তা তহবিল ও নারী উন্নয়নে বিশেষ তহবিলের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা  অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি অর্জনে সহায়ক হবে। সঞ্চয়পত্র ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে বন্ড মার্কেট উন্নয়নে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ, রাজস্ব আদায়, ভ্যাট ব্যবস্থাপনা, আয়কর আইনসহ বিভিন্ন রেগুলেটরি রিফর্ম এসব খাতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনতে পারে। ব্যাংকিং ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে করপোরেট করহার আড়াই শতাংশ হ্রাস করা হয়েছে, যা ইতিবাচক। দেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তৈরি পোশাক উৎপাদনে ও রপ্তানিতে নিয়োজিত করদাতার করহার ১৫ শতাংশ, পাবলিক লিমিটেড কোম্পানির ক্ষেত্রে সাড়ে ১২ শতাংশ এবং সবুজ কারখানার ক্ষেত্রে ১২ শতাংশ এ খাতের উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে