সরকারের আত্মতুষ্টির বাজেট

Print Friendly and PDF

আনিস রায়হান

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ‘সমৃদ্ধ আগামীর পথযাত্রায় বাংলাদেশ’ এ সে­াগানকে সামনে রেখে ৭ জুন ২০১৮ বৃহস্পতিবার ২০১৮-১৯ অর্থবছরের জন্য ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকার বিশাল বাজেট জাতীয় সংসদে পেশ করেছেন। বিশ্লেষকরা বলেছেন, এটি ‘জনতুষ্টি’র বাজেট, এই বাজেটে নতুন কিছু নেই। কিন্তু বাস্তব বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, নতুন কিছু না থাকলেও বাজেটে জনগণের তুষ্টিকে কোথাও গুরুত্ব দেয়া হয়নি বরং শাসকদলের নিজেদের আকাক্সক্ষা ও সুযোগ-সুবিধাই এতে অগ্রাধিকার পেয়েছে। ফলে এটিকে দলতুষ্টির বা আত্মতুষ্টির বাজেট হিসেবে অভিহিত করা যেতে পারে।
বাজেট আলোচনা সবসময় একটা কাঠামোর মধ্যেই হয়ে থাকে। তা হয় বিদ্যমান ব্যবস্থার অনুকূলে, যা কিনা বরাবরই জনগণের স্বার্থ বিষয়ে উদাসীন। দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় তেলা মাথায় তেল দেয়ার প্রক্রিয়া নিয়ম করেই রীতি ও ঐতিহ্য বজায় রেখে চলে আসছে। নিম্ন ও সীমিত আয়ের জনগোষ্ঠীর স্বার্থ সরকারি পরিকল্পনায় প্রাধান্য পায় না। ফলে দিন দিন দেশে বৈষম্য বেড়েই চলেছে। এবারের বাজেটও এসবের কোনো ব্যত্যয় ঘটায়নি। আগের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে নিম্ন ও সীমিত আয়ের মানুষের ওপর চাপানো হয়েছে নতুন নতুন বোঝা, আর সুবিধা করে দেয়া হয়েছে উচ্চবিত্ত ও ক্ষমতাসীনদের।
এবারের বাজেটে কৃষি খাতে আগের তুলনায় বরাদ্দ আরও কমেছে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে কৃষি খাতে বরাদ্দ ছিল মোট বাজেটের ৬ দশমিক ৭ ভাগ, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৬ দশমিক ১ ভাগ আর আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত মূল বাজেটে এই হার দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৭ ভাগ। যা কৃষি খাতে বরাদ্দ হ্রাসের চিত্রই নির্দেশ করে। যদিও আর্থিক হিসাবে বাজেটের আকার বৃদ্ধির কারণে এটা আগের তুলনায় বেড়েছে, কিন্তু বাজেটের যে অংশ গতবার বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল, এবার তা বৃদ্ধির দাবি থাকলেও উল্টো তা কমানো হয়েছে। ভর্তুকির হিসেবেও বরাদ্দ কমেছে, চলতি অর্থ বছর কৃষি ভর্তুকিতে ৯ হাজার ২৯ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও প্রস্তাবিত নতুন বাজেটে তা কমে ৯ হাজার কোটি টাকায় নেমে এসেছে। চলতি অর্থবছরের প্রস্তাবের চেয়ে আগামী অর্থবছরের বাজেটের আকার বেড়েছে প্রায় ১৬ ভাগ। অথচ কৃষির বরাদ্দ কমেছে ০.৪১ ভাগ! প্রস্তাবিত এই বরাদ্দও যে শেষ পর্যন্ত কমে যাবে না, সেই নিশ্চয়তা দেয়া যাচ্ছে না। কারণ গতবারও সংশোধিত বাজেটে কৃষির বরাদ্দ কাটছাট হয়েছিল।
কৃষি খাতের সঙ্গে এখনও দেশের সবচেয়ে বেশিসংখ্যক মানুষ যুক্ত। কর্মসংস্থানের দিক থেকে বাংলাদেশ এখনও মূলত কৃষিভিত্তিক। দেশের নিম্ন আয়ের মানুষ বেশির ভাগই কৃষিতে শ্রম দিচ্ছে। স্বাভাবিক হিসাব হওয়ার কথা ছিল এই খাতের ব্যাপক উন্নয়ন ও এর সম্প্রসারণ। এর মাধ্যমেই সম্ভব ছিল দেশের বেশিরভাগ মানুষের অগ্রগতি নিশ্চিত করা। কৃষি সমৃদ্ধ হলেই দেশের মানুষ ও অর্থনীতি সমৃদ্ধ হতে পারত। কিন্তু এই খাতে সরকারের বরাদ্দর চিত্রই বলে দেয় যে, নিম্ন ও সীমিত আয়ের বিপুল মানুষের ভালো-মন্দের ভাবনা সরকারের প্রধান ভাবনা নয়।
এবারের বাজেটের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, অপ্রত্যক্ষ করের ওপর ভিত্তি করে কর কাঠামোটা সাজানো হয়েছে। এই অপ্রত্যক্ষ কর হলো ভ্যাট বা মূল্য সংযোজন কর। ভ্যাটের প্রভাব সকল মানুষের জন্য সমান। অর্থাৎ এটা ধনী ও গরিবের ওপর একই হারে চাপে। বাজেট এমন করের ওপর ভিত্তি করে দাঁড়ালে বোঝা যায় যে, সবাইকে লেনদেনে অতিরিক্ত হারে ভ্যাট দিতে হবে। আর নিম্ন ও সীমিত আয়ের মানুষের এটা নিঃসন্দেহে বেশি ভোগাবে। অথচ অর্থনীতির ভাষায় সুষম কর ব্যবস্থা হলো সেই কাঠামো, যেখানে রাজস্ব আয়ের শীর্ষে থাকে প্রত্যক্ষ কর তথা আয়কর বা ইনকাম ট্যাক্স। নিম্ন ও সীমিত আয়ের মানুষের এই করের সীমা থেকে অব্যাহতি দেয়া হয় এবং বেশি আয়ের মানুষের ওপর কর আরোপ করা হয়। এর সঙ্গে আরও থাকে উৎসে কর, যা কিনা শিল্প উৎপাদনের প্রাথমিক কাঠামোতেই শিল্প মালিকের কাছ থেকে আদায় করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশে এটা উল্টো, এখানে শীর্ষে রয়েছে মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট। দেশে কর্মসংস্থান না বাড়ায় একদিকে বাড়ছে বেকারত্ব, অন্যদিকে অনানুষ্ঠানিক খাতের ওপর অনেকে নির্ভরশীল। বিভিন্ন খাতে ভ্যাট বেড়ে যাওয়ার ফলে এ মানুষ সবচেয়ে বেশি চাপে পড়বে।
বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে সিপিডি’র সিনিয়র রিসার্চ ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলছেন, ‘মধ্যমেয়াদি অবকাঠামোর জন্য বিনিয়োগ বাড়লেও ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ কমেছে? মানুষের দারিদ্র্য বিমোচনের হার কমেছে। দেশে ভোগ আয় এবং সম্পদের বৈষম্য বেড়েছে। প্রবৃদ্ধির হার উঁচু বা নিচু হতে পারে। কিন্তু এর মধ্যে সামগ্রিক দারিদ্র্য বিমোচনের বিষয়টিকেও প্রাধান্য দিতে হবে। আমরা দেখেছি ৫ শতাংশ অতি দরিদ্র মানুষের আয় ৬০ শতাংশের ওপর কমেছে। আবার উচ্চবিত্ত শ্রেণির মধ্যে ৫৭ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষের আয় বেড়েছে। এই অর্থনীতিতে শ্রম এবং উদ্যোগের তুলনায় পুঁজি বিনিয়োগে আয়ের সুযোগ অনেক বেশি। এতে উন্নয়নের সুবিধা গরিব মানুষ পাচ্ছে না।’
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ বা সিপিডি যে এখানে খুব গণবান্ধব প্রতিষ্ঠান, এমন কিছু নয়। তারা প্রধানত পশ্চিমা অর্থনীতির আদলে বাংলাদেশে অর্থনৈতিক সংস্কার চায় এবং সে অনুযায়ী প্রচার চালায়। কিন্তু তারাও দেখতে পাচ্ছে যে, এই বাজেট দারিদ্র্য বিমোচনকে প্রাধান্য দিচ্ছে না বরং কঠিন করে তুলছে। বর্তমানে কর্মসংস্থানহীন যে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে, দারিদ্র্য পরিস্থিতির যে অবনতি ঘটছে, বৈষম্য যে বেড়েই চলেছে, আর এসবের ফলে মানুষের মধ্যেও যে হতাশা বাড়ছে- এসব সমস্যা থেকে বের হয়ে আসার কোনো নির্দেশনা এই বাজেটে নেই বরং বাজেট পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী দাবি করেছেন, ‘দেশে কোনো অভাব নেই’। এমনকি বাজেট নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্ন শুনে তিনি ক্ষুব্ধ হয়েছেন এবং সমালোচকদের নির্বোধ আখ্যা দিয়েছেন। এটাই সরকারের অবস্থান, অন্যান্য মন্ত্রী-এমপিদের বক্তব্য এরই প্রতিধ্বনি মাত্র। এর মধ্য দিয়ে স্পষ্ট যে, বাজেটে কেবল সরকারই তুষ্ট!

২.
অর্থমন্ত্রীর সে­াগান যদিও ‘সমৃদ্ধ আগামীর পথযাত্রায় বাংলাদেশ’, কিন্তু এই সমৃদ্ধির মধ্যে যে মধ্যবিত্তরা নেই, এটা পরিষ্কার। ঘোষিত বাজেট যে মধ্যবিত্তদের ওপর করের তীব্র কশাঘাত বাড়িয়ে দেবে এবং তাদের দৈনন্দিন জীবনের সুখ-সাধ-আহ্লাদকে চরমভাবে বিপন্ন করবে, ইতোমধ্যে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় তা নিয়ে নানামুখী আলাপ-আলোচনা শুরু হয়েছে। নিম্নবিত্তরা বাজেটের ফলে যেসব চাপে পড়তে যাচ্ছেন, মধ্যবিত্তদের ওপর দিয়ে সেই চাপ তো যাবেই, সঙ্গে যুক্ত হবে আরও বেশি কিছু।
মধ্যবিত্তরা স্বপ্ন, মীনা বাজারের মতো যেসব সুপার শপে যান, সেগুলোতে ভ্যাটের পরিমাণ আগের তুলনায় বেড়েছে, ফলে শান্তিতে কেনাকাটার জন্য আরও বেশি ব্যয় করতে হবে। কর বসেছে পোশাকেও। দেশি ব্র্যান্ডের শার্ট, প্যান্ট, পাঞ্জাবি, সালোয়ার-কামিজ কিনতে এখন থেকে বাড়তি টাকা গুনতে হবে। আগে ভ্যাট ছিল ৪ শতাংশ, এখন হয়েছে ৫ শতাংশ। খরচের কথা চিন্তা করে দেশি ব্র্যান্ডের পোশাক বাদ দিলেও রক্ষা নেই। বড় দোকান থেকে জামাকাপড় কিনলেও ৫ শতাংশ ভ্যাট দিতে হবে, যা আগে ছিল না।
এসবের সঙ্গে তাল মিলিয়ে যদি আয় কিছুটা বাড়েও, তাতেও স্বস্তির সুযোগ নেই। করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো হয়নি, এটা আগের মতোই আড়াই লাখ টাকা রাখা হয়েছে। এতে করে যাদের আয় গতবার বার্ষিক আড়াই লাখ টাকার কাছাকাছি ছিল এবং কর জালের বাইরে ছিলেন, এ বছর বেতন বা আয় বাড়লে তাদের কর গুনতে হবে। আগে এটা ফাঁকি দেয়ার সুযোগ কিছু থাকলেও এখন তা থামাতে আরও কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। চাকরিজীবীদের কর রিটার্ন দেয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কোনো কর্মকর্তা সঠিকভাবে রিটার্ন দিয়েছেন কি না, তা নিশ্চিত করতে হবে নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানকেই। প্রতিবছরের এপ্রিল মাসের মধ্যে ওই প্রতিষ্ঠানের কতজন রিটার্ন দিয়েছেন, তা না জানালে ওই প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয় নিরীক্ষা করা হবে। মধ্যবিত্তদের ওপর এভাবে করের চাপ বাড়ানো হয়েছে।
সরকারের সঞ্চয়পত্র মধ্যবিত্তদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ অবলম্বন। দুঃসময়ের জন্য প্রায় সব মধ্যবিত্ত পরিবারের কর্তারা সঞ্চয় করেন। ভরসা হিসেবে সঞ্চয়পত্র কিনে রাখেন, এর সুদ তাদের কিছুটা সহযোগিতা দেয়। কিন্তু অর্থমন্ত্রী বাজেটে ঘোষণা দিয়েছেন, শীঘ্রই সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমবে। আবার সঞ্চয়পত্র কেনার সুযোগও কমানো হয়েছে। আগামী বাজেটে সঞ্চয়পত্র বিক্রি হবে ২৬ হাজার ১৯৬ কোটি টাকার, যা চলতি অর্থবছরের চেয়ে ৪০ শতাংশ কম। চলতি অর্থবছরে ৪৪ হাজার কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা আছে। এত অল্প সঞ্চয়পত্র ছাড়া হলে মধ্যবিত্তরা তার নাগাল পাবেন না বরং সঞ্চয় অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট লোকজন ও কালো কারবারিরা এগুলো হাতিয়ে নেবে। এটা মধ্যবিত্তের ওপর আরেকটি আঘাত।
মধ্যবিত্তের গাড়ি নেই। যানজটে নাকাল অবস্থায় গণপরিবহন পাওয়া এবং তাতে চড়ে সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছানো দিন দিন অসম্ভব হয়ে পড়ছে। এই অবস্থায় গাঁট থেকে বাড়তি টাকা বের করে, নিজের অন্য কিছু খরচ কমিয়ে যাতায়াতের দুর্ভোগ লাঘবের চেষ্টা করছিলেন রাইড শেয়ারিং উবার, পাঠাওয়ের মতো গাড়ি ও মোটরসাইকেল ব্যবহার করে। সেখানে দুই ভাগে ব্যয় বাড়বে। একদিকে ওইসব প্রতিষ্ঠানের ওপর সরকার যে উৎসে কর বসিয়েছে, তার দায় নিতে হবে, অন্যদিকে যাতায়াতের ব্যয়ের ওপর দিতে হবে ৫ শতাংশ ভ্যাট। এভাবে যাতায়াতের ব্যয় তার আরও বাড়বে।
প্রস্তাবিত বাজেটে বলা হয়েছে, সিটি করপোরেশন এলাকার কারও যদি আট হাজার বর্গফুট বা এর বেশি আয়তনের গৃহসম্পত্তি থাকে, তাহলে ওই বাড়িওয়ালাকে আগের তুলনায় বেশি আয়কর দিতে হবে। বাসা ভাড়া বাড়িয়েই যে বাড়িওয়ালা সেই খরচ সামলাবেন, এটা বলে দেয়ার অপেক্ষা রাখে না। ঢাকায় এ ধরনের বাড়িতে বাসা বা ফ্ল্যাট ভাড়া করে থাকেন মধ্যবিত্তরাই। ফলে সরকারের এই বাড়তি আয়ের চাপটা যাবে তাদের ওপর দিয়েই।
বাড়ি-গাড়ির স্বপ্ন সব মধ্যবিত্তেরই থাকে। কিন্তু এই বাজেটের পর ছোট ফ্ল্যাট কিনতে গেলে খরচ বাড়বে। ১১০০ বর্গফুটের কম আয়তনের ফ্ল্যাটে ভ্যাট দেড় থেকে দুই শতাংশ করা হয়েছে। এতে ৫০ লাখ টাকার ফ্ল্যাটে অন্তত ২৫ হাজার টাকা বাড়তি গুনতে হবে। আবার নতুন গাড়ি কেনার সামর্থ্য নেই, রিকন্ডিশন্ড গাড়িতেই ভরসা মধ্যবিত্তের। সেখানেও দুঃসংবাদ। রিকন্ডিশন্ড গাড়ির অবচয়ন সুবিধা কমিয়ে দেয়ায় তার দামও বাড়বে।
চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বাজেট ঘাটতির পরিমাণ ছিল ১ লাখ ১২ হাজার ২৭৬ কোটি টাকা। সে হিসাবে আগামী বাজেটে ঘাটতি বেশি ১৩ হাজার ১৮ কোটি টাকা। বাজেট ঘাটতির বাইরে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা বিদেশি অনুদান পাবেন বলে ধরে নিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। কিন্তু অর্থ মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান বলছে, অনুদান পাওয়ার আশা কোনো সময়ই পুরোপুরি পূরণ হয় না। ফলে অনুদানের ওই অর্থ পাওয়া না  গেলে শেষ পর্যন্ত বাজেট ঘাটতি দাঁড়াবে ১ লাখ ১২ হাজার ২৭৬ কোটি টাকায়। এই ঘাটতি পূরণ করার সুযোগ খুব একটা নেই। ফলে গতবারের মতো এবারও বাজেট সংশোধিত হয়ে ছোট আকার ধারণ করবে। এর ফলে যে উন্নয়নের ঘোষণা এসেছিল, যার সুবাদে মধ্যবিত্তসহ সাধারণ মানুষ কিছুটা স্বাচ্ছন্দ্য পেতে পারত, তাও কাটা পড়বে। বাজেট হবে কেবলই উচ্চবিত্ত ও ক্ষমতাসীনদের সুবিধার উপায়, আর বাদ বাকিদের তার দায় মেটাতে হবে।

৩.
চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে ১৫ হাজার কোটি টাকার বাড়তি বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে, যার মধ্যে বিদ্যুৎ খাত এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের জন্য ৪৫ শতাংশ আর বাকি ৫৫ শতাংশ অন্য ২২ মন্ত্রণালয় এবং বিভাগের জন্য। এই পরিমাণ অনির্দিষ্ট ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বলা হয়েছে, বাজেটে ২২ হাজার কোটি টাকা পুঁজি হিসেবে রাখা হয়েছে, কিন্তু এই পুঁজি কোথায় বিনিয়োগ করা হবে সেটা পরিষ্কার করা হয়নি। বিপুল পরিমাণ এই অর্থ কোথায় বিনিয়োগ করা হবে তা জনগণ জানে না।
কৃষিতে যদিও বরাদ্দ সংকুচিত, কিন্তু স্কুল ও মাদ্রাসার ভবন উন্নয়নের জন্য দুটি প্রকল্পের অধীনে প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা অর্থাৎ বাজেটের প্রায় চার শতাংশ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এই কার্যক্রম চলবে এমপিদের তত্ত্বাবধানে। এটা স্পষ্ট যে, দলের এমপিদের স্থানীয় পর্যায়ে সুবিধা দিতে এই বিপুল পরিমাণ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। নির্বাচনকে মাথায় রেখে দলের লোকজনকে তুষ্ট করতেই এ উদ্যোগ।
ব্যাংক খাতের জন্য করপোরেট কর ২ শতাংশ হারে কমানো হয়েছে। এটা নিঃশর্ত উপহার হিসেবে ব্যাংক মালিকদের দেয়া হয়েছে। এর সঙ্গে কোনো শর্ত জুড়ে দেয়া হয়নি। অথচ শর্ত দেয়া গেলে এর মাধ্যমে খেলাপি ঋণের জন্য সঞ্চিতি বাড়ানো যেত। যাতে ব্যাংকগুলো শক্তিশালী হতো। সুদহার কমানোরও উদ্যোগ নেয়া যেত। কিন্তু এখন মুনাফার এই অর্থ লভ্যাংশ হিসেবে ব্যাংক মালিক ও পরিচালকদের পকেটে চলে যাবে। এ খাত থেকে সরকারের রাজস্ব আয় কমবে এবং এতে এই খাতেরও কোনো উন্নতি হবে না।
সরকার ব্যাংকের সুদহার কমানোর কোনো উদ্যোগ নেয়নি। খারাপ ঋণের হার ক্রমান্বয়ে বাড়ছে, ঋণখেলাপি এবং এ ধরনের ঋণ নিয়ন্ত্রণেও বাজেটে কোনো ঘোষণা আসেনি। ব্যাংকগুলোতে যে অনিয়ম, লুটপাট চলছে তা সমাধানেও কোনো পদক্ষেপ ঘোষিত হয়নি। ব্যাংক মালিকরা যদিও নানা অভিযোগে অভিযুক্ত, তবু দেখা যাচ্ছে, তারা যা চাচ্ছেন, সেটাই পেয়ে যাচ্ছেন। এমনকি ব্যাংক খাত নিয়ন্ত্রণে কমিশন গঠনও যে এই সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়, সেটাও অর্থমন্ত্রী জানিয়ে দিয়েছেন। এটা সরকারের অবস্থানকে পরিষ্কার করে।
সরকার যে কেবল ধনীদের এবং নিজ দলের স্বার্থটাই দেখছে, বাজেট বিশ্লেষণ করলে সেই তথ্যই মেলে। বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনেও সাংবাদিকরা এসব প্রশ্নই তুলেছেন এবং অর্থমন্ত্রী তাদের নির্বোধ বলে গালাগাল করেছেন। সংবাদ সংস্থার সূত্রে জানা যায়, অর্থমন্ত্রী ওই সংবাদ সম্মেলনের শুরুতেই কয়েকটি প্রশ্ন নিয়ে একসঙ্গে উত্তর দিচ্ছিলেন। উত্তেজিত হওয়ার আগে তিনজন সাংবাদিকের কাছ থেকে প্রশ্ন নেন তিনি।
প্রথম সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, এবারের বাজেটের প্রস্তাবিত করকাঠামোতে ধনীদের বেশি সুবিধা এবং মধ্যবিত্ত ও গরিবদের ওপর বেশি করের বোঝা চাপিয়ে দিয়েছেন। আপনি কি বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন? নাকি আপনার কার্যক্রম বৈষম্যকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে কি না?
দ্বিতীয় সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, ব্যাংক ঋণের সুদের হার কমানোর জন্য সিআরআর কমানো, সরকারি আমানতের ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেসরকারি ব্যাংকে রাখার নীতিমালা করা এবং সর্বশেষ ব্যাংকের করপোরেট কর হার আড়াই শতাংশ কমানোর প্রস্তাব করার পরও ব্যাংকগুলো কি ঋণের সুদের হার কমিয়েছে?
ছোট ফ্ল্যাটের ওপর কর বাড়ানোর কথা উল্লেখ করে তৃতীয় সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, অনেকেই বলছেন, এটা গরিব মারার বাজেট। আসলেই এটা গরিব মারার বাজেট কি না?
তিন সাংবাদিকের কাছে প্রশ্নগুলো দুইবার শোনেন অর্থমন্ত্রী। এরপরই উত্তেজিত ভঙ্গিতে তিনি বলেন,  ‘আমি অত্যন্ত দুঃখিত যে, আপনারা এমন সব প্রশ্ন করছেন আমার পক্ষে এগুলো সম্বন্ধে বলতেও লজ্জাবোধ করে।’ বাংলাদেশ এখন কী অবস্থায় আছে আপনারা জানেন? এদেশে দারিদ্র্য বাড়ছে? দারিদ্র্য কি বাড়ছে?’- সাংবাদিকদের উদ্দ্যেশে প্রশ্ন ছোড়েন তিনি। তখন কয়েকজন সাংবাদিক উত্তর দেন, ‘না’।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘এদেশে দারিদ্র্য বাড়ছে না। যে বলে বাড়ছে, সে স্রেফ মিথ্যা বলছে। অবশ্যই মিথ্যা বলছে।’ এ সময় কয়েকজন সাংবাদিক চিৎকার করে বলতে থাকেন, ‘দারিদ্র্য কমছে, তবে বৈষম্য বাড়ছে।’ অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘বৈষম্য বাড়ে নাই। বাড়ছে, কিন্তু কয়জনের জন্য বাড়ছে দেখেন।’
সাংবাদিকদের প্রশ্ন এবং বাজেটের ওপর আমাদের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ একই সমান্তরালে দাঁড়ায়। আমরা দেখছি বাজেটে গরিব ও মধ্যবিত্তের ওপর চাপ বাড়ছে। এর সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে বড় ধনী ও ক্ষমতাসীনরা। সরকার এটাকে যতই চড়া গলায় অস্বীকার করুক, বাজেট বরাদ্দের হিসাবগুলোই বলে দেবে, এটা কেবল সরকারকে তুষ্ট করার মতো একটি বাজেট, জনগণের তুষ্ট হওয়ার মতো কিছু এখানে নেই।

সাপ?তাহিক পতিবেদন

বিশ্লেষন
  • ফরিদপুরে এসএমই ব্যাংকিং বিষয়ে আর্থিক সচেতনতামূলক কর্মশালা
  •  মতামত সমূহ
    পিছনে 
     আপনার মতামত লিখুন
    English বাংলা
    নাম:
    ই-মেইল:
    মন্তব্য :

    Please enter the text shown in the image.