‌'আমরা সকল ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করতে প্রস্তুত'-খালিদ মাহমুদ চৌধুরী এমপি

Print Friendly and PDF

খালিদ মাহমুদ চৌধুরী এমপি। সাংগঠনিক সম্পাদক, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী ফোরামেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।
কোটাবিরোধী আন্দোলন এবং ছাত্রলীগের অবস্থান নিয়ে সম্প্রতি মুখোমুখি হন সাপ্তাহিক-এর। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কোটা ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে চলমান রাজনীতি, নির্বাচন প্রসঙ্গেও মতামত ব্যক্ত করেন। বলেন, মানুষ এখন উন্নয়নের রাজনীতিতে বিশ্বাসী, আর সরকার উন্নয়নের মহাসড়কেই হাঁটছে।
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সায়েম সাবু

সাপ্তাহিক : কোটাবিরোধী আন্দোলনে মাঠে শিক্ষার্থীরা। শুরুতে ছাত্রলীগও এই আন্দোলনের পক্ষ-বিপক্ষে ছিল। কী বলবেন, এই কোটাবিরোধী আন্দোলন নিয়ে?
খালিদ মাহমুদ চৌধুরী এমপি : এই আন্দোলনের পক্ষে-বিপক্ষে যারা অবস্থান নিচ্ছে, তারা কি কেউ বলছেন, এটি ছাত্রলীগের আন্দোলন? যারা পক্ষ-বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন, তারা কি মোহাম্মদপুর বা মিরপুর শাখা ছাত্রলীগের নেতাকর্মী? তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী। তাদের ছাত্রলীগ বানানো হচ্ছে কেন?
প্রশ্ন হচ্ছে, একজন ছাত্রের ছাত্রলীগ ছাড়া আর কোনো পরিচয় নেই? তারা শিক্ষার্থী হিসেবেই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছেন। কোটা নিয়ে একটি গণআন্দোলন হলো। সেই বিশাল আন্দোলনে ছাত্রলীগও ছিল। অন্যেরাও ছিল। অনুভূতিগুলো মিলে গেলেই একটি আন্দোলন বড় আকার ধারণ করে।
সাপ্তাহিক : কিন্তু ছাত্রলীগ তো সে আন্দোলনের মৌলিক অবস্থান থেকে সরে আসলো?
খালিদ মাহমুদ চৌধুরী : দেখুন, প্রধানমন্ত্রী সংসদে দাঁড়িয়ে বললেন, সবাই যখন কোটা চাইছেন না, তাহলে কোটা পদ্ধতিই বাতিল করা হবে।
কিন্তু সংবিধানের মূল স্পিরিট সামনে রেখেই তো সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কোটা সংবিধানে সংরক্ষণ করা  হয়েছে মানুষে মানুষে সমতা আনার জন্য।
১৯৭১  সালে যারা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন, তারা সাধারণ পরিবারের সদস্য ছিল। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের একেবারেই মূল্যায়ন করা হয়নি বা স্বীকৃতি দেয়া হয়নি বরং যারা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছেন, তাদেরই স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। স্বাধীনতাবিরোধীরা সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তারা শিক্ষার সুযোগ-সুবিধা পেয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সন্তানেরা নানাভাবেই বঞ্চিত হয়েছে। সমাজ বা রাষ্ট্র থেকে সুবিধা দেয়া হয়নি তখন মুক্তিযুদ্ধের সন্তানদের।
গণমাধ্যমেই প্রকাশ পাচ্ছে, মুক্তিযোদ্ধারা মানবেতর জীবনযাপন করছেন। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি রাষ্ট্রীয় যে দায়, তার স্বীকৃতি দিতেই বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা বলেছিলেন, মুক্তিযোদ্ধার সন্তান এবং তাদের পরবর্তী প্রজন্মকেও কোটার আওতায় এনে বিশেষ সুযোগ দেয়া হবে। মুক্তিযোদ্ধারা সমাজের অগ্রভাগে থাকার কথা ছিল। অথচ তারাই সবার পেছনে। প্রধানমন্ত্রী মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান দিতেই কোটার ওপর গুরুত্বারোপ করেছিলেন।
সাপ্তাহিক : কিন্তু কোটার চাপে সাধারণরা তো হিমশিম?   
খালিদ মাহমুদ চৌধুরী : উত্তরবঙ্গের এখনও অনেক জেলা আছে, যেখানকার কৃষক সাধারণ গোছের মানুষ অর্থনৈতিক বৈষ্যমের শিকার। সেসব পরিবারের সন্তানরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বছরের পর বছর ধরে।
এই অবহেলা, বৈষম্য নিয়ে তো গণমাধ্যম নিয়মিত সংবাদ প্রকাশ করে আসছে। এই পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠীকে তুলে আনার দায়িত্ব রাষ্ট্রের, সরকারের। এ কারণেই জেলা কোটা রাখা হয়েছে। একইভাবে উপজাতি, প্রতিবন্ধী, নারী কোটার ব্যবস্থা রাখা হয়।
কিন্তু সেই নারীরাই দেখলাম, বিশ্ববিদ্যালয়ে হলের তিন স্তরের নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেঙে বাইরে বেরিয়ে এলো কোটার বিরুদ্ধে। কোনো নারী সংগঠনই নারী কোটার পক্ষে বললেন না। অথচ সংসদেও নারীদের জন্য কোটা রয়েছে। ঢাকায় এত জেলা সমিতি, অথচ কেউ জেলা কোটার জন্য কথা বললেন না।
প্রধানমন্ত্রী দেখলেন, কেউ যখন কোটার পক্ষে কথা বললেন না, তখন তিনি সংসদে কোটা পদ্ধতি বাতিলের ঘোষণা দিলেন। সংসদে যখন প্রধানমন্ত্রী কোনো ঘোষণা দেন, তখন সেটা নির্দেশ হয়ে যায়। সেই নির্দেশের বাস্তবায়ন কীভাবে হবে, তা নিয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব কাজ করছেন।
সাপ্তাহিক : প্রধানমন্ত্রী ঘোষণার প্রজ্ঞাপন চাইছেন শিক্ষার্থীরা। তার নির্দেশ বাস্তবায়নে সময়ক্ষেপণ হচ্ছে কিনা?
খালিদ মাহমুদ চৌধুরী :  সরকারের আরও জরুরি কাজ আছে। বাজেট গেলো। কোটা পদ্ধতিই তো সরকারের কাছে এখন প্রধান ইস্যু না। অনেক বড় বড় বিষয় নিয়ে সচিবদের ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ বাস্তবায়ন করতে সাত সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়েছে। কোন পদ্ধতিতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ বাস্তবায়ন করা যায়, তার জন্য সময় লাগবে। এটি তো একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া।
এখন সবাই যদি ইমরান এইচ সরকার হতে চায়, তাহলে তো মুশকিল।
সাপ্তাহিক : ইমরান এইচ সরকারের দাবির সঙ্গে তো আপনাদেরও সংহতি ছিল?
খালিদ মাহমুদ চৌধুরী : কাদের মোল্লার ফাঁসি চেয়ে ইমরান এইচ সরকার মাঠে নামলেন। ফাঁসি হলো। এখন সে সব বিষয় নিয়েই আন্দোলন করতে চায়। কোথাও বাঁধ ভেঙে পানি ঢুকলে তা নিয়েও ইমরান কথা বলেন। কৃষক বা শ্রমিকদের মজুরি দিতে হবে, সেটা নিয়েও কথা বলেন।
সবাই যদি রাজনীতিবিদ বা নেতা হতে চান, তাহলে তো হবে না।
সাপ্তাহিক :  রাজনীতি সচেতন হওয়া তো দোষের না?
খালিদ মাহমুদ চৌধুরী : মানুষ এখন সচেতন বলেই ভুল পথে আন্দোলন করে লাভ হয় না। বিএনপি ২০১৪ সালে আন্দোলন করেছিল বটে, তাতে সচেতন মানুষ সাড়া দেয়নি।
সাপ্তাহিক : তার মানে ইমরান এইচ সরকারের যে ইস্যু সরকারের পক্ষে যায়, সেখানে আপনাদের সমর্থন, আর বিপক্ষে গেলেই...
খালিদ মাহমুদ চৌধুরী : এটিই ভুল ধারণা। সরকারের পক্ষে যায়নি। দেশের পক্ষে গিয়েছে। কাদের মোল্লার ফাঁসি কি দেশের মানুষ চায়নি?
সাপ্তাহিক : সাঁওতাল পল্লী পোড়ানো বা হিন্দুপাড়ায় আগুন লাগানোর বিরুদ্ধেও কথা বলছেন ইমরান এইচ সরকাররা?  
খালিদ মাহমুদ চৌধুরী : আমরাও গিয়েছি সাঁওতাল পল্লীতে। যে কোনো অন্যায়ের প্রতিবাদে আমরাও কথা বলছি, ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়ে আসছি।
কিন্তু যারা এই সব ঘটনায় মায়াকান্না করছেন, তারা কিন্তু দশমিক ১ ভাগ ভোটও পায়নি। তারা জনগণের পক্ষে কথা বলছেন। অথচ জনগণের কোনো সমর্থন নেই তাদের প্রতি। রাস্তায় দাঁড়িয়ে কথা বলছেন, অথচ সামনে কোনো দর্শক নেই।
সাপ্তাহিক : কথা বলা তো মৌলিক অধিকার। জনগণের সমর্থন না থাকলে কি কথা বলা যাবে না?
খালিদ মাহমুদ চৌধুরী : কথা বললে সমস্যা নেই। কথা বলার অধিকার কেউ হরণ করেনি। কিন্তু বাসে ঢিল কেন? পুলিশের ওপর হামলা কেন? কথা বলতে গিয়ে রাস্তা অবরোধ করছেন কেন?
সাপ্তাহিক :  প্রধানমন্ত্রীর কোটা বাতিলের ঘোষণা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ছিল কীনা?
খালিদ মাহমুদ চৌধুরী  : ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ না। আন্দোলনের বিপরীতে দাঁড়িয়ে কোটা ব্যবস্থার পক্ষে কেউ অবস্থান নেয়নি বলেই প্রধানমন্ত্রী একেবারে বাতিলের ঘোষণা দিয়েছেন। আর প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষণা বাস্তবায়ন করা যাবে কি যাবে না, তা দেখার দায়িত্ব সচিবালয়ের। দায়িত্বপ্রাপ্ত সচিবগণ বিষয়টি দেখছেন।
সাপ্তাহিক : সাধারণদের অভিযোগ সরকার প্রজ্ঞাপন জারি করতে সরকার বিলম্ব করছে উদ্দেশ্যমূলকভাবে?
খালিদ মাহমুদ চৌধুরী : চাইলেই এমন একটি বিষয়ে রাতারাতি সিদ্ধান্ত নেয়া যায় না। সংবিধান বলছে, পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর সমতা বিধানের জন্য করণীয় কী সেটাও তো দেখতে হবে। বিশেষজ্ঞ, আইনজ্ঞের সঙ্গে কথা বলতে হবে। সকলের পরামর্শ নিয়েই এমন একটি বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
সাপ্তাহিক : কোটা পদ্ধতি নিয়ে আপনার নিজের পর্যবেক্ষণ কী?  
খালিদ মাহমুদ চৌধুরী : আমি মনে করি, কোটা বাতিল করার মতো পর্যায় বাংলাদেশে এখনও তৈরি হয়নি। আমার রংপুর, দিনাজপুরের মানুষ এখনও অনেক পিছিয়ে আছে।
রংপুরের মানুষ আজ থেকে ১০ বছর আগে অনাহারে দিন কাটাতো। চাকরির ক্ষেত্রে এখনও মানুষ বৈষম্যের শিকার। এক সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রংপুর অঞ্চলের ছাত্ররা আগে দেখতে যাইতো ডাইনিংয়ে আগে কারা খাচ্ছেন। খাবার সময়ে উত্তরবঙ্গের ছাত্রদের উঠিয়ে দেয়া হয়েছে। এখনও মঙ্গা আর মফিজ বলে আমাদের পরিচয় মেলে। আমরা তো মূল ভূখ-ের সঙ্গে যুক্তই হলাম ২০ বছর আগে।
একাডেমিক পড়ালেখা করলেই সমাজের সকল বাস্তবতা উপলব্ধি করা যায় না। মাঠের খবর নিয়ে কথা বলতে হয়। বয়:সন্ধিকালীন নারীদের কি সচেতনতা, তা তো আমাদের নারীরা জানতই না। বিশেষ সুবিধায় নারীদের সামনে আনার পরেই তারা এখন সচেতন হচ্ছেন। শহরে এসে বাবু সেজে কথা বললে হবে না।
সব ইস্যুতে সরকারকে ঘায়েল করার যে প্রক্রিয়া, তা একটি সমাজের জন্য ভালো কিছু বয়ে আনে না। সঠিক পথে রাজনীতি করতে গিয়ে ব্যর্থ বলেই এখন সব কিছুতে রাজনীতি খোঁজার চেষ্টা করছে বিরোধীপক্ষ।
সাপ্তাহিক : রাজনীতি তো আপনারাও খোঁজার চেষ্টা করছেন?
খালিদ মাহমুদ চৌধুরী : না। আমরা রাজনীতি খোঁজার চেষ্টা করিনি। এটি ভুল ধারণা। আমরা মূলত সমাধান করতে চাইছি।
মানুষের কল্যাণে শেখ হাসিনার সরকার নিরন্তর চেষ্টা করে যাচ্ছে। আমরাই শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি বাস্তবায়ন করছি। যারা আজ চাকরির বিষয় নিয়ে কথা বলছেন, তারা কৃষক বা শ্রমিক শ্রেণির অধিকার নিয়ে কী করেছেন?
সাপ্তাহিক : এই পরিস্থিতির শেষ কোথায়?
খালিদ মাহমুদ চৌধুরী : কিছুই হবে না। সময়ের ব্যাপার। সব ঠিক হয়ে যাবে। আগামী জাতীয় নির্বাচনের পর সব ঠিক হবে।
সাপ্তাহিক : ভরসা পাচ্ছেন কিসে? আন্দোলন তো চলমান?
খালিদ মাহমুদ চৌধুরী : আন্দোলনের কোনো যৌক্তিকতা নেই। এমন আন্দেলন করার মানে হচ্ছে দুরভিসন্ধি।
যে আন্দোলনের কোনো সৎ উদ্দেশ্য থাকে না, তা কখনও সফল হবে না। সফল হবেও না।
সাপ্তাহিক : কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের দায়িত্বে ছিলেন। কোটাবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেয়া শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগ হামলা করল। কী বলবেন?
খালিদ মাহমুদ চৌধুরী : ছাত্রলীগ কোথাও মারমুখী অবস্থান নেয়নি। সব জায়গায় ছাত্ররা মারমুখী অবস্থানে আছে। মনে রাখতে হবে, ছাত্রলীগ হওয়ার আগে তার পরিচয় হচ্ছে সে একজন ছাত্র। কোটার পক্ষ-বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে শিক্ষার্থীরা। ছাত্রলীগের কোনো অবস্থান নেই। ষড়যন্ত্র চলছে এই আন্দোলনে।
সাপ্তাহিক : যেমন?
খালিদ মাহমুদ চৌধুরী : স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াত-শিবির এখন পর্যুদস্ত অবস্থায়। জয় বাংলা সেøাগান দিয়ে অনেক কিছুই ঘটতে পারে।
আমরা সকল ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করতে প্রস্তুত। জাতিসংঘের মহাসচিব এবং বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে মাঝে রেখে যখন ছবি তোলেন, তখন এর চেয়ে আর বড় অর্জন আর কী হতে পারে। পৃথিবীতে এমন ছবি কি আর আছে?
সাপ্তাহিক : জাতিসংঘের মহাসচিব, বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট কিন্তু বাংলাদেশের নির্বাচন, গণতন্ত্র নিয়েও কথা তুলছেন?
খালিদ মাহমুদ চৌধুরী : আমরা কোথায় আছি, সেটাই বড় বিষয়। তারা কী বলল, তা নিয়ে আমাদের ভাবনা নেই। জটিল বিষয় আমরা বুঝি না। প্রধানমন্ত্রীকে মাঝখানে রেখে ছবি তুলেছেন, এটিই সরল কথা, আর আমরা তো সরল মানুষ।
সাপ্তাহিক : খালেদা জিয়া প্রসঙ্গে লবিং করতে ভারতে আসছেন ব্রিটিশ আইনজীবী। বিএনপির প্রতিনিধি দলও ভারত সফরে গেল। ভারতকে গুরুত্ব দিচ্ছেন আপনারাও। রাজনীতির নতুন মোড় কিনা?
খালিদ মাহমুদ চৌধুরী : কে কোথায় আসলো বা গেল, তা নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই আমাদের। আমরা মূল ম্যাসেজ নেব পাবলিকের কাছ থেকে। আমাদের সম্পর্ক জনগণের সঙ্গে। দিল্লি বা ওয়াশিংটন সে সম্পর্কে কোনো গুরুত্ব পাওয়ার কথা নয়।
সাপ্তাহিক : কিন্তু দিল্লিকে তো বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন আপনারা?
খালিদ মাহমুদ চৌধুরী : ভারত আমাদের প্রতিবেশী দেশ। মহান মুক্তিযুদ্ধে দিল্লি আমাদের পাশে ছিল। আমরা সব সময় ভারতের সে অবদানকে কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করে আসছি। তার মানে এই না যে, আমরা ভারতের কাছে ঝুলে থাকি।
বঙ্গবন্ধু একটি স্বাধীন, সার্বভৌম দেশ দিয়েছেন। এই দেশ স্বাধীন হয়েছে কারও তাঁবেদারি করার জন্য নয়। যারা স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিলেন, তারাই বিভিন্ন দেশের তাবেদারি করে আসছে। আমরা স্বাধীনতায় বিশ্বাসী।
সাপ্তাহিক : বিদেশিদের তৎপরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে ফের এবং সেটা নির্বাচনকে কেন্দ্র করেই?
খালিদ মাহমুদ চৌধুরী : বিদেশিদের কোনো তৎপরতা বাংলাদেশে কোনোদিন বাস্তবায়ন হয়নি, ভবিষ্যতে হবেও না। কিছু ঘটনা ঘটছে, এটি সাময়িক। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর অনেক কিছুই ঘটেছে। কিন্তু কোনোটি টেকসই হয়নি। বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিচার করেছি। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করেছি।
সংবিধানের বাইপাস করার জন্য বহু কিছু করা হয়েছে। সফল হয়নি। সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা ফিরে এসেছে। বাংলাদেশের মানুষ এখন সচেতন। শিক্ষা, অর্থনীতির পরিধি বাড়ছে দিন দিন। মানুষের মৌলিক সমস্যার সমাধান হচ্ছে।
সাপ্তাহিক : কিন্তু অভিযোগ এখন দেশে ‘নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র’ চলছে...
খালিদ মাহমুদ চৌধুরী : বিশেষ বিবেচনায় আপনি বলতেই পারেন, ‘দেশে এখন নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র চলছে।’ জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ নিয়ন্ত্রণ হয়েছে বলেই অনেকে তা নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র বলছে।
মূলধারার রাজনীতিতে আমরা যেহেতু যুদ্ধাপরাধীদের সুযোগ দিচ্ছি না, সেই প্রশ্নে আপনি নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র বলতেই পারেন। জঙ্গিবাদ দিয়ে তো আপনি গণতন্ত্রের কথা বলতে পারেন না।
সাপ্তাহিক : মূলধারার রাজনীতিও সীমার মধ্যে আটকা বলে অভিযোগ...
খালিদ মাহমুদ চৌধুরী :  এটি বিশ্বাস করি না। এগুলো অপপ্রচার। বিএনপি সংসদের বাইরে আওয়ামী লীগের কারণে না। বিএনপির কারণেই বিএনপির সর্বনাশ।
সাপ্তাহিক : বিএনপি নেত্রীকে ‘বালুর ট্রাকে আটকে’  নির্বাচন করলেন আপনারা। গণতন্ত্রের দ্বার তো বন্ধ হলো তখন থেকেই?   
খালিদ মাহমুদ চৌধুরী : দেখুন, আমেরিকার নির্বাচনের শুনানি এখনও হচ্ছে। ডোনাল ট্রাম্প পুতিনের কৌশলে ক্ষমতায় এসেছেন, নাকি জনগণের ভোটে ক্ষমতায় এসেছেন, এখনও কিন্তু তার তদন্ত হচ্ছে। ভেনিজুয়েলায় নির্বাচনের পর ১৫টি দেশ তাদের মিশন প্রত্যাহার করে নিয়েছে। তাই বলে কি সে দেশে সরকার চলছে না।
সাপ্তাহিক :  কিন্তু এমন শাসন কি প্রত্যাশিত?
খালিদ মাহমুদ চৌধুরী : বিএনপি কোন কথা বলতে পারছে না? তারা বলুক যে, আমাদের এই কথা বলার অধিকার দেয়া হচ্ছে না। তারা তো সবাই বলছে।
সাপ্তাহিক : চার দেওয়ালের মধ্যে বলছে। অভিযোগ, রাজনৈতিক দলকে মাঠে নামতে দিচ্ছেন না।
খালিদ মাহমুদ চৌধুরী : অভিযোগ থাকবেই । গণমাধ্যম যেখানে স্বাধীন সেখানে কে কী বলল, তা আমলে নেয়ার সুযোগ নেই। বিএনপির অভিযোগ পাগলের প্রলাপ। গণমাধ্যম যদি অভিযোগ করত তাহলে আমলে নেয়ার বিষয় থাকে।
খালেদা জিয়া দুর্নীতির মামলায় সাজা পেলেন। অথচ তারা বলছে, খালেদা জিয়া নির্দোষ। তারা বলছেন, রাজনীতির কারণেই খালেদা জিয়া জেলে। তাহলে খালেদা জিয়ার জামিনের জন্য আদালতের বারান্দায় ঘুরছেন কেন আইনজীবীরা? পল্টনের অফিসে থেকেই রাজনীতি করুক।
সাপ্তাহিক : অভিযোগ উঠছে, গণমাধ্যমকেও নিয়ন্ত্রণ করছে সরকার ?
খালিদ মাহমুদ চৌধুরী : বিএনপি বা অন্য কেউ এই অভিযোগ করার অধিকার রাখে না। এই অভিযোগ গণমাধ্যমকেই করতে হবে। বিএনপি তো গণমাধ্যমের মুখপাত্র না।
সাপ্তাহিক : সামনের নির্বাচন নিয়ে কী বলবেন?
খালিদ মাহমুদ চৌধুরী : অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে একটি নির্বাচন হবে। এটিই সাংবিধানিক নিয়ম। বিএনপি তাতে আসবে কি আসবে না, তা তাদের ব্যাপার। জনগণের ভোটে যারা ক্ষমতায় আসবে, তারাই সরকার গঠন করবেন। এখানে ডান-বাম, আলো-অন্ধকারের কিছু নেই। খুব সরল বিষয়। যারা জটিল করে দেখছে,  তারা বর্ণচোরা।
সাপ্তাহিক : সম্প্রতি খুলনা-গাজীপুরের নির্বাচন নিয়ে মার্কিন রাষ্ট্রদূত বিরূপ মন্তব্য করেছেন। তার এই মন্তব্য কীভাবে দেখছেন?
খালিদ মাহমুদ চৌধুরী : মার্কিন রাষ্ট্রদূত, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে অনেক কিছুই বলেছেন। ধোপে টেকেনি। আমাদের দেশের মঙ্গল আমাদের জনগণই নিশ্চিত করে বলতে পারেন। এটি একান্তই আমাদের বিষয়। মার্কিন রাষ্ট্রদূত বা ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন সে ক্ষমতা রাখে না।
আন্তর্জাতিক নীতি অনুসরণ করে যতটুকু সম্পর্ক রাখতে হয়, আমরা তাদের সঙ্গে ততটুকুই রাখব।
সাপ্তাহিক : তৃতীয় শক্তি বা জোট নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। এই আলোচনা কতটুকু গুরুত্ব দিচ্ছেন?
খালিদ মাহমুদ চৌধুরী : তৃতীয় শক্তির কথা বলে আলোচনা হালকা করার কোনো দরকার নেই। এটি মানুষ বিশ্বাস করে না।
অনেক বড় নেতা নামে আছেন, মাঠে নেই। জনগণ এদের কখনই গ্রহণ করেনি। যাদের গ্রহণ করে না মানুষ, তাদের নিয়ে কোনো শঙ্কা বা আলোচনার প্রয়োজন পড়ে না।
সাপ্তাহিক : মাঠে একটি শক্তিশালী বিরোধী দল তো প্রত্যাশা থাকে?
খালিদ মাহমুদ চৌধুরী : দেশ তো নতুন করে স্বাধীন করতে হচ্ছে না। মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যই রাজনীতি। কোনো সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থানের প্রয়োজন পড়ছে না। তাহলে সংসদের মধ্যে গণঅভ্যুত্থানের প্রয়োজন পড়ছে কেন?
সাপ্তাহিক : কিন্তু গৃহপালিত মার্কা বিরোধী দল তো আসলে গণতন্ত্রের সহায়ক হতে পারে না, যা বর্তমান সংসদে রয়েছে।  
খালিদ মাহমুদ চৌধুরী : ফাইল বা চেয়ার ছুড়ে মারলেই বিরোধী দলের দায়িত্ব পালন হয় না। সংসদে দাঁড়িয়ে বিরোধীদলীয় সাংসদ ‘চুপ বেয়াদব’ বললেই সঠিক দায়িত্ব পালন করা হয় না। বিরোধী দলের দায়িত্ব হচ্ছে গঠনমূলক দায়িত্ব পালন করা।
সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি আছে। সেই বিধি অনুসারেই চলতে হয়। আমরা কি সভ্য হতে চাই না? পশ্চিমা গণতন্ত্র অনুসরণ করবেন আবার পশ্চাৎপদ ধারায় চলবেন, তা হতে পারে না।
সাপ্তাহিক : তার মানে বর্তমান সংসদ সভ্যতায় ফেরাচ্ছে?
খালিদ মাহমুদ চৌধুরী : বিএনপির কাছে আপনি সভ্য কিছু আশা করতে পারেন না। কারণ তারা তো রাজনীতির মূল স্প্রিটে নাই। তারা তো গোলাম আযম, নিজামীর ধারায় আছেন।
আপনি সত্যিকার সমালোচনার প্রশ্নে দেখলে বুঝতে পারবেন, দশম সংসদ হচ্ছে সবচেয়ে অর্থবহ পার্লামেন্ট। বিরোধী দল গণতন্ত্র, সমাজ, উন্নয়ন প্রশ্নে গঠনমূলক সমালোচনা করে সরকারকে সহায়তা করছে। একদিন সংসদ নিয়ে গবেষণা হলে সবই বেরিয়ে আসবে।
বিএনপি সংসদে জনমতের প্রস্তাব দিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়েছে। এখন সেটা হচ্ছে না। বিএনপি  একটি ফাঁপা রাজনীতির দল, তা ধরা পড়ে গেছে।
সাপ্তাহিক :  কিন্তু রাজনীতি নিয়ে তো জনমনে অস্বস্তি অস্বীকার করা যায় না।
খালিদ মাহমুদ চৌধুরী : কোনো অস্বস্তি নেই। জনমনে অস্বস্তি থাকলে তো উন্নয়নে এমন সফলতা আসত না। প্রতিটি সূচকে বাংলাদেশ এখন এগিয়ে। শিক্ষা, শিল্প, পরিবহনে স্থিতিশীল অবস্থা বিরাজ করছে। সর্বত্রই এখন উন্নয়নের স্বাক্ষর।
সাপ্তাহিক : এই উন্নয়নে কি মানুষের চিন্তার উন্নয়ন ঘটাতে পারছে?
খালিদ মাহমুদ চৌধুরী : আপনি বাংলাদেশে বাস করছেন। কয়েক সপ্তাহ ইউরোপ-আমেরিকায় থেকে এসে সেখানকার উন্নয়ন, চিন্তার কথা বলতে পারেন না। দেশের গন্ধ ধারণ করে আপনাকে কথা বলতে হবে।
সামনে কীভাবে আগানো যায়, তাই নিয়েই ভাবতে হবে। আমরা পেছনে ফিরতে চাই না।

সাপ?তাহিক পতিবেদন

সাক্ষাৎকার
 মতামত সমূহ
পিছনে 
 আপনার মতামত লিখুন
English বাংলা
নাম:
ই-মেইল:
মন্তব্য :

Please enter the text shown in the image.