‘কোথাও কেউ নেই...’ -আনিস রায়হান

Print Friendly and PDF

কাগজে কলমে বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। বিশ্বের বিভিন্ন পক্ষ যদিও বাংলাদেশের গণতন্ত্র সম্পর্কে নানা প্রশ্ন তোলে, কিন্তু বাংলাদেশ সরকার জোর গলায় নিজেদের গণতান্ত্রিক আখ্যা দেয়। তারা দাবি করে যে, এখানে মতপ্রকাশের অধিকার আছে, আছে আইনের শাসন এবং জনগণের সাংবিধানিক অধিকারগুলো এখানে সমুন্নত। কিন্তু কোটা সংস্কার আন্দোলনের প্রেক্ষিতে যা ঘটে গেল, তা নিশ্চিতভাবেই এসব দাবিকে নতুন করে কাঠগড়ায় তুলেছে। গত এপ্রিলে সরকারি চাকরিতে কোটাপ্রথা সংস্কারের দাবিতে ছাত্রদের আন্দোলন তীব্র হয়। পুলিশ, ছাত্রলীগের সঙ্গে দ্বন্দ্ব-সংঘর্ষের একপর্যায়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাড়ি ভাঙচুর হয়। ছাত্র আন্দোলন চরম রূপ ধারণ করলে সংসদে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী কোটাব্যবস্থা বাতিলের ঘোষণা দেন। কিন্তু এরপর প্রায় তিন মাস পেরিয়ে গেলেও যখন প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার বাস্তবায়ন হয় না, জারি হয় না কোনো প্রজ্ঞাপন, তখন ছাত্ররা আবার তাদের দাবি নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করে।
৩০ জুন ২০১৮ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এ সংক্রান্ত এক সংবাদ সম্মেলনের প্রস্তুতিকালে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালায় ছাত্রলীগ। এর প্রতিবাদে শহীদ মিনারে ০২ জুলাই প্রতিবাদ সমাবেশ করতে গেলে আবারও হামলা হয়। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যেখানেই শিক্ষার্থীরা কোটা সংস্কারের পক্ষে কথা বলতে চেয়েছে, তাদের ওপর ছাত্রলীগ চড়াও হয়েছে, নৃশংস হামলা হয়েছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। হামলাকারীদের পুলিশ কোথাও বাধা দেয়নি, কিন্তু উদ্বিগ্ন অভিভাবক ও নাগরিকরা এই হামলার বিরেুদ্ধে প্রতিবাদ সমাবেশ করতে গেলে পুলিশ সেই সভা পণ্ড করে দেয়। আহতরা চিকিৎসা পায়নি হাসপাতালে, তাদের সতীর্থরা পালিয়ে বেড়াচ্ছে, অনেকে গ্রেপ্তার হয়ে আদালতের আদেশে পুলিশের রিমান্ডে। এর মধ্যেই আন্দোলনকারী নারীদের ওপর ঘটেছে শারীরিক নির্যাতন, চরিত্র হনন, হুমকি তো আছেই।
সবার চোখের সামনেই এসব ঘটনা ঘটছে। ছাত্রদের দাবির মধ্যে কোনো অপরাধ ছিল না। কিন্তু চিহ্নিত অপরাধীরা দিনে দুপুরে তাদের ধরে ধরে পেটাচ্ছে। পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করছে, আদালত তাদের রিমান্ডে পাঠাচ্ছে। হাসপাতাল তাদের বের করে দিচ্ছে। সংবাদ মাধ্যমগুলো মিনমিনে ভাষায় কথা বলছে, সরকার কোটা সংস্কারের জন্য কমিটি গঠন করেছে, এই খবর ফলাও করে প্রচার করছে। মোটকথা, নাগরিক সমাজ, সংবাদ মাধ্যম ও সংগ্রামী ছাত্র সমাজ সবার চোখের সামনে দিয়েই আন্দোলনকারীদের ওপর ব্যাপক নিপীড়ন চলছে। রাষ্ট্রের কোনো অংশই এই অনাচার, দমন, পীড়নের বাধা হয়নি, হচ্ছে না। এরকমটা আগেও হয়েছে, বিশেষত শ্রমিক-কৃষকদের অধিকারের প্রশ্ন এলেই এরকম সবাই নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। কিন্তু এবার ছাত্রদের ক্ষেত্রে এরূপ পরিস্থিতির উদ্ভব হওয়ায় গোটা রাষ্ট্র কাঠামোর অগণতান্ত্রিক চরিত্রটা সামনে চলে এলো।

২.
শুরুতে ধরা যাক হাসপাতালের কথা। যুদ্ধের সময়েও আশা করা হয় যে, আহত ব্যক্তি হাসপাতালে গেলে চিকিৎসা পাবেন। রোগী কোন পক্ষের তা বিবেচনা করা চিকিৎসকের কর্ম নয়, তার কাজ হলো রোগীকে সেবা দেয়া। সাধারণ এই সত্যটি কোটা আন্দোলনকারীদের ক্ষেত্রে মিথ্যা প্রতিপন্ন হয়েছে। হাসপাতালগুলোর মূল পরিচয় হয়ে গেছে তারা রাষ্ট্রীয় তথা সরকারি। ৩০ জুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে সংবাদ সম্মেলন করতে চেয়েছিল কোটা সংস্কার আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ। সংবাদ সম্মেলনের প্রস্তুতি নেওয়ার সময় সকাল ১১টার দিকে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালায়। এ সময় সংগঠনটির যুগ্ম আহ্বায়ক নুরুল হককে বেধড়ক মারধর করা হয়। আহত অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে তাকে চিকিৎসা দেওয়া হয়নি। পরে আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হলে সেখান থেকেও তাকে মধ্যরাতে বের করে দেওয়া হয়।
০২ জুলাই বিকালে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীরা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে পতাকা মিছিল বের করে। তখন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা তাদের ওপর হামলা চালায়। এতে ১৫ জন শিক্ষার্থী আহত হন। আহতদের মধ্যে ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের মাস্টার্সের ছাত্র সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার যুগ্ম আহ্বায়ক তরিকুলকে একা পেয়ে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা রামদা, হাতুড়ি ও লাঠি দিয়ে বেধড়ক মারধর করে। এতে তার ডান পায়ের দুটি হাড় হাঁটুর নিচ থেকে ভেঙে যায়। মাথায়ও গুরুতর জখম হয়। আহত অবস্থায় গত মঙ্গলবার রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৩১ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়েছিল। সেদিনই তার ঊরু থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত ব্যান্ডেজ করে দেওয়া হয়। কিন্তু ০৬ জুলাই তাকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দিয়ে জোরপূর্বক বের করে দেওয়া হয়। তার বন্ধুরা এখন তাকে একটি প্রাইভেট ক্লিনিকে ভর্তি করিয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট ছাত্ররা কোনো অপরাধ করেননি, দেশে সামরিক শাসনও চলছে না, তা সত্ত্বেও এরকম ঘটনা ঘটছে। এর মধ্য দিয়ে স্পষ্ট যে, সরকার পক্ষের আনুকূল্য ভোগটা চিকিৎসকদের কাছেও মহার্ঘ্য হয়ে পড়েছে। হাসপাতালের মতো প্রতিষ্ঠানও তার চরিত্র হারিয়েছে, রোগীকে সেবা দেয়া বা সুস্থ করা নয়, সরকারের ইচ্ছা অনিচ্ছা অনুযায়ী কাজ করাটা তাদের দায়িত্ব হয়ে গেছে। হাসপাতালের যখন এহেন দশা, তখন রাষ্ট্রীয় অপরাপর প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থা যে আরও ভয়াবহ, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

৩.
সারা পৃথিবীর অভিভাবকরা শিক্ষাঙ্গনকে নিরাপদ বিবেচনা করে থাকেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে সন্তানকে পাঠিয়ে তারা নিশ্চিন্ত থাকেন। ধারণা করেন যে, শিক্ষকরা পিতা-মাতার মতো স্নেহ দিয়ে তাদের আগলে রাখবেন। কিন্তু আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন শিক্ষকদের প্রতিষ্ঠা অর্জনের মোক্ষ ছাড়া কিছুই নয়। কোটা আন্দোলনের এই পর্যায়ে সেই সত্যটা আরও বড় করে সামনে এলো।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালালো ছাত্রলীগ। অথচ দুদিন পর প্রক্টর এ কে এম গোলাম রব্বানী জানালেন, তিনি ওই হামলা সম্পর্কে কিছুই জানেন না। ওইদিন বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ছিল, তাই ছাত্রদের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিতেও তিনি অস্বীকৃতি জানান। এভাবে প্রক্টর সরকারি দলের কর্মকা-ের পক্ষে নিজের মনোভাব ব্যক্ত করেন। উপাচার্য এবং প্রক্টর ছাত্রদের আন্দোলনকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়, একে বাইরের বিষয় বলে আখ্যা দিয়েছেন এবং তাদের ওপর ছাত্রলীগের হামলা বা সরকারি দমন নিপীড়ন, গ্রেপ্তারের দায় দায়িত্ব নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। উল্টো ছাত্রলীগের মতো হুবহু একই ভাষায় তারা বলেছেন, শিক্ষার্থীদের কাঁধে ভর দিয়ে যেন কোনো অশুভ শক্তি তাদের স্বার্থ উদ্ধার করতে না পারে, সে জন্য সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এম আব্দুস সোবহান তো আরও এক ধাপ এগিয়ে। তিনি কোটাবিরোধী আন্দোলনকে ‘সরকারবিরোধী আন্দোলন’ ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারছেন না। কোটা আন্দোলন যারা করছে তাদের ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবেও আখ্যা দিয়েছেন তিনি। আরও বলেছেন, ‘যারা কোটা আন্দোলন করছে সরকার তাদের লাগামহীনভাবে ছেড়ে দেবে না। সরকার ও প্রশাসনের একটা সহ্যের সীমা আছে। আমরা এখানে প্রশাসনে যারা আছি, তারা সরকারের অনুমোদিত ব্যক্তিবর্গ।’
এভাবে শিক্ষকরা জানান দিচ্ছেন, তারা সরকারের লোক, শিক্ষার্থীদের অভিভাবকত্বের দায়িত্ব তাদের নয়। কোটার আন্দোলন দেখিয়ে দিল শিক্ষাঙ্গনে, শিক্ষকদের কাছে শিক্ষার্থীদের দায়িত্ব অর্পণ করার আর কোনো সুযোগ নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরেই শিক্ষার্থীদের ওপর চিহ্নিত দলীয় লোকেরা হামলা করবে, তাদের মারবে, আহত করবে, বিশ্ববিদ্যালয় তার দায় নেবে না। শিক্ষার্থীকে হাসপাতালে নেয়ার দায়িত্বও তারা নেবে না, এমনকি হাসপাতাল থেকে বের করে দেয়া হলেও তার প্রতিবাদ করবে না। আর পুলিশ যদি ছাত্রদের ধরে নিয়ে যায় তাহলে তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মোহাম্মদ আখতারুজ্জামানের সঙ্গে গলা মিলিয়ে বলবে, ‘গ্রেপ্তার আছে নাকি? যা হবে আইনি কাঠামোর মধ্যেই হবে। আইনি প্রক্রিয়ায় ১৮ বছর বয়স হলে ব্যক্তিকে তার নিজের দায়দায়িত্ব নিতে হয়। সবার জন্যই এই আইন প্রযোজ্য।’

৪.
শিক্ষকরা যখন সরকারের ‘অনুমোদিত ব্যক্তিবর্গে’ রূপান্তরিত হয়েছেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই সরকারি দলের লোকেরা হয়ে উঠেছে তাদের পথপ্রদর্শক ও পূজনীয়। আর তাই সারা দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ছাত্রলীগই হয়ে উঠেছে প্রকৃত প্রশাসন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভালো-মন্দ তারাই দেখে। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনশৃঙ্খলাও তারাই রক্ষা করে। ছাত্রলীগ নেতারা বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা রক্ষার নিমিত্তেই কোটা আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালানোর কথা স্বীকার করেছেন। শুরুতে তারা কোটা আন্দোলনকারীদের দুই গ্রুপের সংঘর্ষ হিসেবে একে চিহ্নিত করার চেষ্টা করে। কিন্তু পরবর্তীতে বিভিন্ন ভিডিও ও স্থিরচিত্রে দেখা যায় যে, ছাত্রলীগের পদধারী নেতারা এসব হামলায় অংশ নিয়েছেন। তখন তারা দাবি করেন যে, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টাকে প্রতিহত করার চেষ্টা করেছেন তারা।
ছাত্রলীগের এই ভূমিকা শিক্ষাঙ্গনে প্রশাসনের কার্যকারিতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। পাশাপাশি দেশের আইনি কাঠামো, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সরকার তোষণের ভূমিকাকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। দেখা যাচ্ছে, পুলিশের অপরাধী, হামলাকারী ধরার কোনো চেষ্টা নেই, তারা আগ্রহী সরকারি দলের লোকজনকে তুষ্ট করতে। প্রতিটি হামলার সময় পুলিশকে নিষ্ক্রিয় ভূমিকায় দেখা গেছে। বিপরীতে ছাত্রলীগের নেতারাই শিক্ষার্থীদের আটক করেছে। তাদের ধরে নিয়ে পুলিশের হাতে তুলে দিয়ে এসেছে তারা। পুলিশ এরপর শুধু মামলার ধারা-উপধারা বসানোর দাপ্তরিক কাজটুকু করেছে। এই দায়িত্বটা অবশ্য তারা খুব নিষ্ঠার সঙ্গেই পালন করেছে।

৫.
পুলিশ সব সময় নিষ্ক্রিয় থাকে না। সরকারপক্ষ হিসেবে তাদের দায়িত্ব অনেক। সেগুলো তারা নিষ্ঠার সঙ্গেই পালন করে থাকে। যেমন কোটা আন্দোলনকারীদের ওপর হামলার সময় নিষ্ক্রিয় থাকলেও উদ্বিগ্ন অভিভাবক ও নাগরিকদের সমাবেশ প্রতিহত করতে তাদের সক্রিয়তা ছিল চোখে পড়ার মতো। সমাবেশস্থল পুলিশ নিজেরাই দাঁড়িয়ে থেকে দখল করে রেখেছিল, যাতে সেখানে দাঁড়ানোর জায়গা না থাকে। তারপরও যখন প্রতিবাদকারীরা পাশে সরে গিয়ে সমাবেশ করতে গেল তখন তাদের ওপর শারীরিকভাবে চড়াও হয় পুলিশ। অকথ্য ভাষায় কথা বলে অধ্যাপক, রাজনীতিক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বসহ অভিভাবকদের সঙ্গে। সভাস্থল থেকে কয়েকজনকে প্রিজন ভ্যানে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। যদিও পরে তাদের ছেড়ে দেয়া হয়। পুলিশের এই ভূমিকা কেবল ঢাকা নয়, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যেখানেই আন্দোলনকারীদের পক্ষে সমাবেশের চেষ্টা হয়েছে, সেখানেই দেখা গেছে। ব্যতিক্রমহীনভাবে প্রতিটি হামলার সময় পুলিশ নীরব ছিল। হামলাকারীদের বিরুদ্ধে কোনো আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজন তারা অনুভব করেনি।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের মাস্টার্সের ছাত্র তরিকুল ইসলামের ওপর হামলার ভিডিওচিত্রটি খুবই পরিষ্কার। এতে দেখা যায় তরিকুলের শরীরে হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করছে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী ছাত্রলীগের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সহসম্পাদক আবদুল্লাহ আল মামুন। তার বাড়ি রাজশাহীর পবা উপজেলার হরিয়ান এলাকায়। রামদা হাতের ছেলেটির নাম লতিফুল কবির ওরফে মানিক। সে ইতিহাস বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী ও মুক্তিযোদ্ধার সন্তান কমান্ডের নেতা। তার বাড়ি লালমনিরহাট। বড় লাঠি হাতে হামলা চালাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী ও ছাত্রলীগের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক মেহেদী হাসান ওরফে মিশু। তার বাড়ি রাজশাহীর পবা উপজেলার কাটাখালী এলাকায়। তরিকুলের মাথায় লাথি মারতে দেখা যায় একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী রমিজুল ইসলাম ওরফে রিমুকে। সে ছাত্রলীগের সহসভাপতি। তার বাড়ি নাটোর। অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, হামলাকারীদের মধ্যে আরও ছিলেন আইন বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী ও ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হাসান লাবন, ফলিত গণিত বিভাগের শিক্ষার্থী ও ছাত্রলীগের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সহসভাপতি আহমেদ সজিব ও বঙ্গবন্ধু হল শাখার সহসভাপতি মিজানুর রহমান সিনহা।
এরা সবাই চিহ্নিত হলেও পুলিশ এদের কাউকে গ্রেপ্তার করেনি বা কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। দেশের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় এ সংক্রান্ত খবর প্রকাশ হলেও কোনো আদালত স্বপ্রণোদিত হয়ে এ বিষয়ে কথা বলার প্রয়োজন বোধ করেনি বরং কোটা আন্দোলনের অন্যতম নেতা রাশেদের বিরুদ্ধে ছাত্রলীগ নেতার করা মামলায় আদালত তাকে পাঁচ দিনের রিমান্ড দিয়েছেন। এসব ঘটনার মধ্য দিয়ে আইনের শাসনের বাস্তব রূপটা দেশের জনগণের সামনে মূর্ত হয়েছে। দেখা গেছে, আইন-আদালতের চোখ মোটেই অন্ধ নয় বরং তারা একপক্ষের চোখ দিয়েই সবকিছুকে দেখছে। দেশের মানুষের দায়িত্ব তারা নেয় না নিচ্ছে না বরং কাজ করছে সরকারি মনোভাবের অনুকূলে।

৬.
সংবাদ মাধ্যমগুলোও তাদের ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হয়নি। এর প্রত্যেকটিই বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগ। ফলে নিজ নিজ উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ রক্ষা করেই তাদের কথা বলতে হয়। তাই কোটা আন্দোলনকারীদের ওপর সরকারপক্ষের এই ব্যাপক নিপীড়নের পর্বে তারা বরং বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে ব্যস্ত থেকে নিজেদের নিরাপদ রেখেছে। দায়সারা কিছু খবর ছেপেছে এবং অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে।
সরকারপক্ষ অভিযোগ তুলেছে কোটা আন্দোলনকারীদের পেছনে বিএনপি-জামায়াতের সরকারবিরোধী আন্দোলনের উসকানি কাজ করেছে। সংবাদ মাধ্যমগুলো বাস্তব চিত্র উদ্ধার করে মানুষের সামনে হাজির করেনি। এমনকি ছাত্রদের ওপর দিনে দুপুরে হামলা হলেও অনেক সংবাদ মাধ্যম লিখেছে ছাত্রলীগ হামলা করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের পথে তারা হাঁটেনি। আন্দোলনকারীদের গ্রেপ্তার করা হলেও তার পেছনের কারসাজিটা কী, তারা আদৌ কোনো অপরাধী কিনা, সেটা সংবাদ মাধ্যম তুলে ধরতে পারেনি। হাসপাতাল থেকে আহতদের বের করে দেওয়ার অভিযোগের কথা উল্লেখ করলেও সত্যতা যাচাই করে তারা সত্যের পক্ষে অবস্থান নেয়নি বরং সরকার কমিটি গঠন করেছে, ৮ জুলাই এই কমিটি বসবে, ১৫ কর্মদিবসের মধ্যে তাদের সুপারিশ জমা দেবে। সরকারের এই পদক্ষেপকেই বড় করে দেখা হয়েছে, তাকে স্বাগত জানিয়ে বিশেষজ্ঞ, প-িতেরা কলামও প্রসব করেছেন। অথচ এই কমিটিতে যে আমলারা ছাড়া কেউ নেই, কমিটির লোকেরা শিক্ষার্থীদের দাবি-দাওয়াকে মোটেও শ্রদ্ধা করে কিনা সেসব বিষয় তারা সামনে আনেনি।
নাগরিক সমাজের দিক থেকেও বড় ধরনের ব্যর্থতা দৃশ্যমান। দু একটি কর্মসূচি গ্রহণের চেষ্টা হলেও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও সহযোগিতা প্রদানে গুটিকয়েক ব্যক্তির সাহসভরে এগিয়ে আসা ছাড়া সামষ্টিক উদ্যোগ সেভাবে দেখা যায়নি। এমনকি রাজনৈতিক দলগুলো অনেকেই কোটা আন্দোলনকারীদের পক্ষে থাকলেও তাদের ওপর হামলা-মামলার প্রেক্ষিতে সেই অর্থে শক্তিশালী কোনো কর্মসূচি দেখা যায়নি। কিছু সমাবেশ ও মিছিলের চেষ্টা হয়েছে, ব্যস, এ পর্যন্তই।
দেখা যাচ্ছে, সত্যের পক্ষে সাহসী অবস্থান নেয়ার প্রবণতা আজ একেবারেই স্তিমিত। প্রতিরোধের চিহ্ন নেই, প্রতিবাদের সীমাও খুব সংকুচিত।

৭.
আন্দোলনকারীরা কোটাপ্রথার সংস্কার চেয়েছিল, কিন্তু সরকারপ্রধান কোটাব্যবস্থাই বিলোপ করার ঘোষণা দিয়েছিলেন সংসদে দাঁড়িয়ে। আন্দোলনকারীরা তখন সেই ঘোষণা মেনে নিয়ে বলেছিল, দ্রুত প্রজ্ঞাপন জারি করা হোক। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর সেই ঘোষণার পর প্রায় তিন মাস অতিবাহিত হতে চললেও প্রজ্ঞাপনের কোনো দেখা মিলল না। সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে এটা প্রতিশ্রুতির প্রচলিত রাজনীতি হিসেবেই সাব্যস্ত হয়েছে। সরকার প্রধানের ঘোষণা বাস্তবায়ন হতে এতদিন লাগার কথা নয়, শিক্ষার্থীরা এতে হতাশ হয়েছে। প্রজ্ঞাপন জারি না হওয়া, ছাত্রলীগের ঝাঁপিয়ে পড়া, পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা, হাসপাতালে রোগী রাখতে অনীহা এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কিছু না দেখার ভান করা, আন্দোলনকারীদের সন্ত্রাসী আখ্যা দেয়া, এসব ঘটনার মধ্য দিয়ে এটাই প্রতীয়মান হয়েছে যে, রাষ্ট্রের কোথাও কেউ নেই শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানোর মতো।
শিক্ষার্থীরা যে দাবিতে আন্দোলন করেছিলেন দেশের সব মানুষের যে তাতে সমর্থন ছিল, ব্যাপারটা তেমন নয়। তবে সেই দাবি করার জন্য তাদের ওপর হামলা হবে, অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতাল থেকে বের করে দেয়া হবে, মামলা দিয়ে তাদের জেলে ঢোকানো হবে, এটা মানুষ মেনে নিতে পারছে না। রাষ্ট্রের কোনো একটা অংশও যে নিপীড়িতদের পক্ষে দাঁড়ায়নি, এটাও মানুষের চোখে লাগছে। কোটা আন্দোলন জয় পাবে কিনা, অনেকের জীবনে যে বিপর্যয় নেমে এসেছে তার অবসান কবে হবে, এসব প্রশ্নের উত্তর যত ধীরেই আসুক না কেন, এই আন্দোলন যে কতগুলো সত্য মানুষের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, এটাই এর সবচেয়ে ইতিবাচক দিক। বাংলাদেশ রাষ্ট্রেরই আজ আমূল পরিবর্তন দরকার।

সাপ?তাহিক পতিবেদন

 মতামত সমূহ
পিছনে 
 আপনার মতামত লিখুন
English বাংলা
নাম:
ই-মেইল:
মন্তব্য :

Please enter the text shown in the image.